‘দাওরাতুল হাদীছ’ একটি সীমানার নাম। প্রতিটি দেশের যেমন একটি সীমানা রয়েছে তেমনই ‘দাওরা’ হ’ল মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ছাত্রজীবনের সীমানা। যদিও এরপরে অনেক পড়াশোনা রয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে সেগুলো একাডেমিকভাবেই শুরু হয়েছে। তবু এটাও সত্য যে, দাওরার সীমানা পেরিয়ে একজন ছাত্র চলে যায় ভিন্ন জীবনে। সে আর আগের মত ‘ছাত্র’ থাকে না। তাই দেশের সীমানা যেমন গুরুত্বপূর্ণ; ছাত্রজীবনে ‘দাওরা’ তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা এখানে এসেই যেন নেতিয়ে পড়ে। তাদের শিরা-উপশিরায় নেমে আসে রাজ্যের ক্লান্তি। ফলে এই স্তরে শিক্ষার্থীদের যেমন উদ্যমী থাকার কথা তার ছিটেফোঁটাও তাদের মাঝে পাওয়া যায় না। তারা অনাগত ভবিষ্যতের কথা না ভেবে সময়কে উপভোগ করতে থাকে।
দাওরায়ে হাদীছকে গুরুত্ব দেওয়ার দু’টি কারণ রয়েছে। প্রথমত এটা একাডেমিক লেখাপড়ার উচ্চস্তর। দ্বিতীয়ত এখানে হাদীছ পড়ানো হয়। যা সরাসরি ‘ইলমে অহি’। অবশ্য ইলমে অহি হিসাবে বিশ্লেষণ করলে আমাদের অবহেলাগুলো বেআদবীতে রূপান্তরিত হবে। কারণ অনেক মাদ্রাসায় ‘দাওরায়ে হাদীছ’ যেন নিছক খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন-আমীন! আমরা এই প্রবন্ধে দাওরায়ে হাদীছের বিভিন্ন সমস্যাকে সামনে রেখে সমাধান প্রস্তাবের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
যেমন চেয়েছিলাম : মাদ্রাসা শিক্ষায় ‘দাওরায়ে হাদীছ’ যেহেতু মাস্টার্স সমমানের, সুতরাং শুধু গদবাঁধা পড়া ও পরীক্ষার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক হয়নি। এখানে গবেষণার প্রয়োজন আছে। এ্যসাইনমেন্টের প্রয়োজন আছে। সিলেবাস বহির্ভূত বিভিন্ন সক্রিয়তার প্রয়োজন আছে। দাওরায়ে হাদীছও যদি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীর মত শুধু পড়া ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে মাদ্রাসা কারিকুলাম অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এদিকে আমরা দাওরার শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে কোন কাজ দিতে পারব না। ওদিকে তারা পড়ালেখা খুঁজে পাবে না। তাদের মস্তিষ্ক হবে অমূলক চিন্তার কারখানা। আর বাস্তবেও তাই হচ্ছে। ‘ইলমে অহি’ অর্জনের পরেও তারা নিজেদের ভেতরে কোন সচেতনতাবোধ আনতে পারছে না। তারা নিজেদের সম্মান ও দায়িত্ব বুঝতে পারছে না।
আসলে আমাদের দাওরায়ে হাদীছে শুধু কুরআন-হাদীছ পড়তে শেখানো হচ্ছে; কুরআন-হাদীছ যা শিখাতে চায় তা শেখানো হচ্ছে না। যদি সেই বিদ্যা শেখানো হ’ত তবে তারা হাদীছ পড়ার পরেও দুনিয়ার পেছনে ছুটত না, সারারাত ফেসবুকে বুঁদ হয়ে থাকত না, ভাইরাল হওয়ার জন্য যাচ্ছেতাই করে বেড়াত না। অন্তত তাদেরকে এগুলো বুঝাতে হ’ত না যে, এই দুনিয়া আমাদের আবাসস্থল নয়। নিশ্চয়ই আখেরাতের সফলতাই প্রকৃত সফলতা। সময় অত্যন্ত মূল্যবান; সময় নষ্ট করা যাবে না ইত্যাদি। সুতরাং দাওরায়ে হাদীছে যেমন হাদীছ পড়তে শেখানো হবে তেমনই হাদীছ আমাদেরকে যা শেখাতে চায় তাও শেখানো হবে। তবেই আমাদের দাওরায়ে হাদীছ হবে রিজাল তৈরির সূতিকাগার।
এখানে তালিবুল ইলম অহির জ্ঞান আহরণে উপযুক্ত হয়ে ঢুকবে। যখন তারা বের হবে তখন তারা হবে ইলম, আমল ও হিকমায় পরিপূর্ণ। জাতির রাহবার হিসাবে যোগ্য। যাদের বাহুতে থাকবে হাল ধরার শক্তি। যাদের নামের শুরুতে মাওলানা শব্দটি যুক্ত করলে বেশ সুন্দর মানাবে। যাদের অন্তরে উম্মাহর জন্য দরদ থাকবে। উম্মাহর পদস্খলনে যাদের রাতের ঘুমে সমস্যা হবে। ন্যায়ের পথে বরণ করা দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনাই হবে যাদের অহংকার। আমরা এমনই দাওরায়ে হাদীছ চাই।
যেমন পেয়েছি : যেখানেই দাওরায়ে হাদীছ রয়েছে, সেখানেই রয়েছে স্বাধীনতা। দাওরায়ে হাদীছ মানেই সুখের জীবন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার কোন জবাবদিহীতা নেই, ক্লাসে উপস্থিতির কোন বালাই নেই, কোন বিষয়েই কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। যেখানে ছাত্রদের ছাত্রজীবন আর ছাত্রত্ব দুটোই কোনরকম চলে যাচ্ছে সেটাই দাওরায়ে হাদীছ। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে ক্লাসে সামনের সারির একজন মাত্র ইবারত দেখে আসে। বাকীরা জানেই না যে, কোন হাদীছ থেকে আজকের দারস শুরু হবে। দারস শুরু হ’লে তারা কিতাবের দিকে তাকিয়ে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে।
শিক্ষক ইচ্ছামত আলোচনা করছেন। শিক্ষকের আলোচনায় ছাত্রদের কোন মনোযোগ নেই। কোন আপত্তি নেই, কোন প্রশ্ন নেই। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে তো শিক্ষকগণ দাওরার ক্লাসে কোন কথাই বলেন না। শুধু উ... হু... আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেন। তাদের সামনে ভুল ইবারত পড়ে গেলেও তারা কিছুই বলেন না। অথচ তারা যে খুব ভারত্বের কারণে চুপ আছেন এমনও নয়। এই শিক্ষকই যখন ফিক্বহের ক্লাসে আসছেন তখন একটি শব্দ নিয়ে পুরো ঘন্টা গলা ফাটিয়ে আলোচনা করেন। অথচ হাদীছের মসনদে বসলেই তাদের মাথায় চেপে বসে রাজ্যের ভাবনা।
এভাবে চলতে চলতে পরীক্ষা আসছে। শিক্ষকগণ দারসে বলে দিচ্ছেন, ‘অমুক কিতাবের শুরুর দিকের হাদীছগুলো পরীক্ষায় দেওয়ার মত। অমুক ঘটনার হাদীছটি দেখে রাখবে’। আর ছাত্ররাও জানে, পরীক্ষায় এই হাদীছগুলোই থাকবে। হারাকাতযুক্ত করে অনুবাদ করতে হবে। দু’একটি ছীগাহর তাহক্বীক্ব থাকবে। হাদীছে উল্লেখিত মাসআলা সম্পর্কে মদভেদ জানতে চাওয়া হবে। আর কিছু নয়। ফলে ছাত্ররা শুধু সাজেশন ফলো করেই শতভাগ উত্তর লিখে আসছে।
শিক্ষকদের মাইন্ড সেটাপ : দাওরায়ে হাদীছের ছাত্রদের পড়ালেখার আগ্রহ ও নৈতিক সচেতনতা যখন একেবারে তলানীতে নেমেছে ঠিক তখনই আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। যদিও কর্তৃপক্ষ শিক্ষাবৃত্তির নামে এটা প্রদান করছেন, তবুও ‘ভাতা’ শব্দ ব্যবহারের জন্য আমি মোটেও দুঃখিত নই। কারণ তাদের উদ্দেশ্যই হ’ল কিছু ছাত্র পাওয়া, বিভাগগুলো সচল রাখা। এই সুযোগ লুফে নিতে ছাত্ররাও দলে দলে ভর্তি হচ্ছে। যেখানে সচ্ছল ছাত্ররা পড়ালেখা নয়, বরং বেতনের জন্যই ভর্তি হচ্ছে সেটা শিক্ষাবৃত্তি হয় কিভাবে! এটাকে পারিশ্রমিক বা ভাতাই বলতে হবে। যা ছাত্ররা প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট বিভাগ চালু রাখার পারিশ্রমিক হিসাবে গ্রহণ করছে।
এই ভাতা কোন ফান্ড থেকে দেয়া হচ্ছে বা সেটা কতটুকু শরী‘আত সম্মত হচ্ছে সেদিকে আমি যাবো না। আলোচনার বিষয় হ’ল, এই বেতনপ্রথার মাধ্যমে ছাত্রদের কতটুকু উপকার হয়েছে! আমরা কি তাদেরকে অক্ষম করে ফেলছি না! ছাত্র যদি সত্যিই মেধাবী হয় তবে তাদেরকে বিভিন্ন শ্রেণীতে কলাস নেয়ার দায়িত্ব দেয়া যায় বা দু’একজন দূর্বল ছাত্রকে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে বেতনের টাকা তাকে পারিশ্রমিক হিসাবে দেয়া যায়। ইমামতি বা জুম‘আর খুৎবার ব্যবস্থা করে দেয়া যায়। সে জানবে যে, এটা আমার রোজগারের পয়সা। সে জানবে যে, দুনিয়াতে রোজগার করেই চলতে হয়। দেখুন! এটা দায়িত্বশীল গড়ার জায়গা। এখানে যেভাবে যোগ্যতা গড়তে হবে তেমনি চিন্তাধারাও গড়তে হবে। যাদের ভবিষ্যতের রাহবার হিসাবে গড়ে তুলছি তাদের আমরা ফ্রি নেওয়া বা হাত পাতা কখনোই শিখাতে পারি না!
একবার আমার পরিচিত এক প্রতিষ্ঠানে খাবারের মান নিয়ে আমি মুহতামিম ছাহেবের সাথে আলোচনা করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘ছাত্রদের খাবারের মান আরেকটু ভাল করা যায় না’! তখন তিনি আমাকে যে উত্তর দিয়েছিলেন তা আমার খুব মনে ধরেছিল। তিনি বললেন, ‘দেখ! আমরা এখানে ভবিষ্যতের জন্য ইলমে দ্বীনের খাদেম তৈরি করছি। আর আলেম এবং খাদেম এক নয়। আলেম যে কেউ হ’তে পারে। তবে খাদেম সবাই হ’তে পারে না। কারণ তারা যখন ইলমের খিদমতে আসবে তখন তাদের রোজগার অনেক বেশী হবে না। যা হবে তা দিয়ে তাদের জীবন সাধারণভাবে চলে যাবে। তবে সব মানুষই কর্মজীবনে একটু সুখ-সমৃদ্ধি চায়।
এবার তুমি বল সুখ কাকে বলে’? আমি বললাম, ‘মানসম্মত একটি জীবন-যাপন করাই সুখ’। তখন তিনি বললেন, ‘না! মানুষকে যতই মানসম্মত পরিবেশে রাখা হোক না কেন, কিছুদিনের জন্য সে পরিবেশ তার কাছে স্বাভাবিক মনে হবে, এরপর তার চেয়ে বেশী মানসম্মত জীবনকে সুখ এবং তুলনামূলক কম মানসম্মত জীবনকে তার কাছে কষ্টকর মনে হবে। তাই আমরা চাই, কর্মজীবনে গিয়ে কম রোজগারেই তারা সুখ খুঁজে পাক। ছাত্র জীবনে যদি কেউ ৯০ টাকা কেজির চাউলে অভ্যস্ত হয় তবে শিক্ষক জীবনে গিয়ে তার কাছে এটাই কষ্ট মনে হবে। একটু সুখের জন্য তাদের ইলমের খেদমত ছেড়ে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা থাকবে না। আর আমরা চাই না, তারা একটু সুখের আশায় ইলমে দ্বীনের খিদমতে অনিহা প্রকাশ করুক।
এজন্য আমরা সামর্থ্য থাকলেও ছাত্রদের থাকার ঘরে এয়ারকন্ডিশনার দেব না। আমরা কখনোই তাদেরকে বিলাসিতায় অভ্যস্ত করব না। কারণ বিলাসীরা আলেম হয় তবে তাদের দিয়ে খেদমত হয় না। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছ। এখন আমরা তোমাদের অভিযোগগুলো সহ্য করে নিচ্ছি বৃহত্তর স্বার্থে। তা হ’ল, তোমরাই ভবিষ্যতে আমাদের ছাদাক্বায়ে জারিয়ার অংশ হবে। এর বাইরে আমাদের কোনই স্বার্থ নেই’! আমি তার এই উত্তরে কেবল অবাক হয়েছিলাম। উপস্থিত তার উত্তরটি অমূলক মনে হ’লেও পরে অনেক ভেবে দেখেছি, বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখেছি যে, তিনি যথার্থই বলেছেন।
সুতরাং আমরাও চাই, আমাদের দাওরায়ে হাদীছগুলো খাদেম তৈরির কারখানা হোক। ইলমের খিদমতে আমরা দুনিয়ার মোহ-মায়া পরিত্যাগ করেছি। এখন আমাদের ছাত্ররা যদি ইলমের খেদমতে না আসে। এই পরম্পরা যদি চালু না থাকে তবে আমাদের জীবনে ইলমের খেদমত করা পরিপূর্ণ লস প্রজেক্ট। কারণ এই পথের একমাত্র প্রাপ্তি হ’ল বিরাট একটি ছাদাক্বায়ে জারিয়ার মালিক হওয়া। হাশরের ময়দানে এটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। এখন সবকিছুকে আধুনিক করতে গিয়ে সেটাই যদি ব্যাহত হয় তবে কিসের আশায় আমরা জীবনে কষ্ট করছি!
আমরা তো চাই, আমাদের সকল ছাত্র আলেম হোক। সকলে ইলমে দ্বীনের খিদমতে আসুক। আমরা যখন ক্লাসে ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করি, ভবিষ্যতে তোমরা কে কি হবে? তখন তারা একেকজন একেরকম পেশার কথা বলে। কাউকে আমরা নিষেধ করি না। কটূ কথা বলি না। তবে আমরা মন থেকে চাই, শতভাগ ছাত্র বলুক যে, তারা কুরআন-হাদীছের ইলমের খাদেম হবে। এই বিষয়ে আমরা খুবই স্বার্থপর। খুবই সংকীর্ণমনা। কারণ আমাদের কল্পনায় ভাসে যে, আমরা হাশরের ময়দানে ছওয়াবের জন্য সবার কাছে ছুটে বেড়াচ্ছি! এদিকে আমাদের ছাত্রগুলো তো একেকটি ছওয়াবের খাযানা! তাদেরকে আমরা কিভাবে নষ্ট হ’তে দেই! সে হয়ত এখন বুঝতে পারছে না যে, তার জন্য কোন পথটি সঠিক। তাই আমরা তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে সেই পথে পরিচালিত করব যে পথে তারও কল্যাণ রয়েছে; তার চেয়েও বেশী আমার কল্যাণ রয়েছে।
দাওরাতুল হাদীছের পাঠ্যক্রম : দাওরায়ে হাদীছ মানেই সেখানে হাদীছের আলোচনা হবে। এটা স্বাভাবিক। তবে একাডেমিকভাবে এর একটি মান রয়েছে। তাই এখানে আরো কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় সংযোজনের দরকার আছে বলে মনে করছি। হ’তে পারে এই বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের অবসরের খোরাক হবে। তারা হয়তো আরেকটু যোগ্য হবে। এতটুকুই চাওয়া। এখানে আমরা সেই বিষয়গুলো প্রস্তাব করব। তবে এটাই চূড়ান্ত রূপ নয়। এটা প্রাথমিক খসড়া মাত্র। তবে এটি পরিমার্জন করে যদি সিলেবাসে সংযুক্ত করা হয় এবং মার্কের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয় তবে সুন্দর একটি ফলাফল পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
আমরা মনে করি, একটি মানসম্মত দাওরায়ে হাদীছে বছরে দুইটি পরীক্ষা থাকবে। তিনটি পরীক্ষা হ’লে পাঠ্য দিবসে ঘাটতি হয়। প্রতিটি বিষয় ১০০ নম্বরে মূল্যায়িত হবে। তবে প্রশ্নপত্রে ৯৫ নম্বর থাকবে এবং বাকী ৫ নম্বর আরবী লেখার ওপরে থাকবে। কারণ এই স্তরে এসেও যদি আরবী ভাষা পাঠ্যক্রমে মূল্যায়িত না হয়, তবে এটা আমাদের আফসোস বৈ কিছুই নয়। পুরো ছাত্রজীবন কুরআন-হাদীছের জ্ঞান আহরণ করার পরেও যদি উত্তর পত্র আরবীতে লেখা না যায় তবে আর কি বলার থাকে!
প্রতিটি বিষয়ের আওতায় বছরে ১০টি বাড়ির কাজ দেয়া হবে। প্রতিটি বাড়ির কাজ ৫ নম্বরে মূল্যায়িত হয়ে মোট ৫০ নম্বর মূল বিষয়ের সাথে যুক্ত হবে। তাহ’লে প্রতিটি বিষয়ের মোট নম্বর ২৫০ এ গিয়ে দাঁড়াল। নিয়মানুবর্তিতা, আদব-আখলাক ও ক্লাসে উপস্থিতির ওপরে থাকবে ১০০ নম্বর। প্রতি বছর ব্যক্তিগত মুতালা‘আর জন্য ৫টি কিতাব নির্ধারণ করে দেয়া হবে। এই বইগুলোর ওপরে ১০০ নম্বরের একটি মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি বক্তব্যে পারদর্শিতা, সাংগঠনিক সক্রিয়তা, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ইত্যাদি বিষয়ে আরো ১০০ নম্বর থাকবে। এভাবে যদি প্রতিটি মেধা নম্বরে মূল্যায়িত হয় তবে শিক্ষার্থীরা এগুলো বিষয় শিখতে বাধ্য হবে। তারা যদি নাও শেখে, অন্তত বুঝতে পারবে যে, এগুলোও প্রয়োজনীয়।
দাওরার ছাত্রদের মাইন্ড সেটাপ : বর্তমান কর্পোরেট দুনিয়া শিক্ষার প্রলেপ লাগানো একটি জাতি চায়। যারা দেখতে হবে শিক্ষিতদের মত, বেশ-ভুষা হবে উন্নত, ভাষা হবে মার্জিত। তবে তাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকবে না। কারণ এমন জাতি থেকে সস্তা দরে শিক্ষিত শ্রমিক পাওয়া যায়। আমি বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছি না। ক্যারিয়ারের জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই বলছি। এমন জাতি থেকে সস্তায় কেন শ্রমিক পাওয়া যায় জানেন! কারণ তাদের না আছে উদ্যোক্তা হওয়ার মত জ্ঞান ও হিম্মত, না আছে তাদের ক্ষেত-খামারে কাজ করার মত শারীরিক অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে তাদের সম্মানজনক পেশা বলতে ‘জব’ ছাড়া আর কিছু নেই।
দামী পোশাক পরে, দামী পারফিউম লাগিয়ে, আধুনিক ভাষায় কথা বলা একজন লোক আপনার কাছে একটি সাবান বিক্রি করতে আসবে। আপনি রেস্টুরেন্টে খেতে বসলে আপনাকে খাবার পরিবেশন করবে। আপনি বিভিন্ন শো-রুম ভিজিট করলে আপনাকে ‘স্যার স্যার’ বলে ডাকবে অথচ সে আপনাকে চেনেও না। এগুলো ৫০ বছর আগে কেউ ভাবতেও পারেনি। তবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে তথাকথিত কর্পোরেট দুনিয়া। আপনি আরো আশ্চর্য হবেন যে, এদের মাসিক বেতন একজন চা বিক্রেতার ১০ দিনের রোজগারের চাইতেও কম। তাহ’লে এতশত ডিগ্রি নিয়ে কেন এরা এগুলো করছে! কারণ তারা অপারগ। তারা এখন যে লাঞ্ছনা ভোগ করছে তা একটি ফুর্তিময় শিক্ষাজীবনের খেসারত। সুতরাং আপনি কি জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হবেন, নাকি দুনিয়াদারদের সেবায় জীবন অতিবাহিত করবেন সে বিষয়ে আজই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমরা চাই আমাদের দাওরায়ে হাদীছের শিক্ষার্থীরা বিপথগামী না হোক। তারা চিন্তা-চেতনায় জাগ্রত হোক। তাদের কর্মজীবন হৌক বর্ণিল। এজন্য প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে আমাদের মস্তিষ্ক সাজিয়ে নিতে হবে। মস্তিষ্ককে গুছাতে হ’লে আগে আমাদের জানতে হবে, মানুষের মস্তিষ্ক কিভাবে কাজ করে। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ কোন বস্ত্তর প্রভাবে প্রভাবিত। এগুলোর ওপরে প্রাথমিক ধারণা না থাকলে মাইন্ড সেটাপ সম্ভব নয়। আমরা এই বিষয়গুলো খুব সংক্ষেপে এখানে আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আমরা দু’চোখে যা দেখি এই সবকিছুর পেছনে রয়েছে চিন্তা। হ্যঁা, চিন্তা ছাড়া কোন কিছুর জন্ম হয় না। আপনি যে কাগজে এই লেখা পড়ছেন সেই কাগজ-কালির মেলবন্ধনেও রয়েছে মানুষের চিন্তা। কেউ ভেবেছে, এটা এভাবে হ’তে পারে। ব্যাস, হয়েছে। আপনি যে কাপড় পরিধান করেছেন এই কাপড়, সুতা, রং সবকিছু নিয়ে কাউকে অনেক ভাবতে হয়েছে। এটা তার বা তাদের চিন্তার ফসল। দুনিয়ায় মানবসৃষ্ট সবকিছু আসলে এভাবেই তৈরি হয়েছে। যে চিন্তা যত গভীর ও সুদূর প্রসারী হয়েছে তার ফলাফলও ততই নিখুঁত ও স্থায়ী হয়েছে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হ’ল, মানুষ তার চিন্তার প্রোগ্রামকে কখনোই বন্ধ করতে পারে না। মানুষের মাথা সবসময় চলতে থাকে। সে কথা বলতেই থাকে। সে কোন না কোন প্লান করতেই থাকে। সে অযথাই আপনাকে একটি পরিকল্পনা দিয়ে বলবে, ‘কেমন হ’ল’? আপনি যদি বলেন, ‘না! এটা সম্ভব না। এখানে এই এই অসংগতি আছে’। সে সাথে সাথেই সেগুলো সংশোধন করে আপনাকে আরেকটি রূপরেখা দিয়ে দিবে। এজন্য আপনাকে নিজ মস্তিষ্ককে কোন কমান্ড করতে হবে না। আপনাকে শুধু চুপ থাকতে হবে। কারণ ঘুমানোর সময় ও কথা বলতে বলতে মানুষের মস্তিষ্ক কাজ করে না। বাকী সময় সে চলতেই থাকে। আর আপনি যদি হাত, পা, কান, মুখ একসাথে বন্ধ রাখেন তবে মস্তিষ্কে চিন্তার তুফান উঠে যাবে। যা আমরা ছালাতের মাঝে অনুভব করি।
এজন্য আমাদের অধিকাংশ সময় চুপ থাকতে হবে। মস্তিষ্ককে কাজ করার ফুরসত দিতে হবে। মস্তিষ্ক যখন আপন কাজে লেগে পড়বে ঠিক তখন চিন্তায় সীমাবদ্ধতা নিয়ে আসতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ টার্গেট অনুযায়ী তাকে সিরিয়াল দিতে হবে যে, হয়তো এটা নয়তো ওটা নয়তো সেটা। এর বাইরে কিছু নয়। এর বাইরের কোন বিষয়ে আমি কোন পরিকল্পনা চাই না। তুমি যা কিছু ভাববে এগুলোর মাঝেই ভাববে। তাহ’লে দেখবেন খুব কম সময়েই আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনার আসলে কি করা দরকার ও কোন কাজ থেকে দূরে থাকা দরকার। আপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আপনার কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা দরকার।
আপনি যদি আপনার মস্তিষ্ককে একবার বুঝিয়ে নিতে পারেন, যে কোন মূল্যে আমাকে পরকালে সফল হ’তে হবে। দুনিয়ার বুকে কিছু ছাদাক্বায়ে জারিয়া রেখে যেতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পদচিহ্ন রেখে যেতে হবে। আর আপনার মস্তিষ্ক এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে আপনাকে পরিকল্পনা দেয়া শুরু করে তবে বুঝবেন, আল্লাহ আপনার কল্যাণ চান। কারণ এই পরিস্থিতিও আল্লাহর রহমতেই সৃষ্টি হয়। তিনি আপনার মাধ্যমে এমন এমন খিদমত নিবেন যা বড় বড় ইলমের অধিকারীদের কাছেও নিবেন না ইনশাআল্লাহ। এজন্য চিন্তাশক্তি শাণিত করুন। চিন্তায় সীমাবদ্ধতা আনুন। যদিও একদিনেই আপনি চিন্তাবীদ হয়ে যাবেন না। কারণ এটা চর্চার বিষয়। একটি ছোট শিশু যেমন ধীরে ধীরে, হোঁচট খেয়ে হাঁটতে শিখে, তেমনই আপনি এক পা দু’ পা করে চিন্তা করতে শিখবেন।
আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখবেন যে, আপনি যখন দ্বীনের রাস্তায় চলেই এসেছেন; তখন আপনার পথচলাও এই রাস্তাতেই শেষ হবে। যতটুকু শক্তি আছে তা এই পথেই ব্যয় হবে। কখনোই দ্বিমুখী বা বহুমুখী হওয়া যাবে না। আপনার ফোকাস একটিই থাকবে, ইলমে দ্বীনে গভীর পান্ডিত্য। এই একটি ফোকাসের ওপর যদি আপনি সারা জীবন অতিবাহিত করে দেন, এমনকি আপনাকে আরো কয়েকটি জীবন দেয়া হয় এবং সেগুলোও যদি অতিবাহিত করেন তবুও আপনি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন কি-না আমাদের জানা নেই। তাহ’লে আপনি এই ছোট্ট জীবনের ভঙগুর পড়াশোনা নিয়ে কয়েকটি লক্ষ্যে কিভাবে পৌঁছাবেন! এজন্য জীবনে বহুমুখী হওয়া ভুল সিদ্ধান্ত। এই পথে আপনি সব পেতে গিয়ে সব হারাবেন। সুতরাং একক লক্ষ্যে অবিচল থাকুন। বিশ্বাস রাখুন, সাফল্য আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
সময়ের গুরুত্ব : প্রিয় ভাই! আপনারা এমন এক স্থানে অবস্থান করছেন যেখান থেকে আপনার কর্মজীবন শুরু হবে। এই সময়টা কখনোই খেল-তামাশায় শেষ করার সময় নয়। রাতভর ফেসবুক চালানো আর রিলসে মজে থাকার সময় নয়। হ’তে পারে আপনি ফেসবুকে অনেক জনসচেতনামূলক এ্যাকটিভিটি রাখেন। তবে আপনার জন্য এটা সংস্কারের সময় নয়। এখন আপনার নিজেকে সংস্কার করার সময়। রসদ জমা করার সময়। যখন আপনার কাঁধে সংস্কারের দায়িত্ব চলে আসবে তখন আপনি দু’চোখে শুধু কাজ আর কাজ দেখবেন। তখন যদি রসদ ফুরিয়ে যায় তবে তা নতুনভাবে জমা করার সুযোগ থাকবে না। আপনি বুঝতে পারবেন, সময়ের দাম কত!
প্রিয় ভাই! একজন মানুষ কখনোই শতভাগ নিখুঁত হয় না। কর্মজীবনে যখন ব্যস্ততা ঠেলে সামনে যাবেন তখন দেখবেন, দুনিয়া শতভাগ নিখুঁত মানুষ চায়। আপনার অনেক গুণ থাকার পরেও ছোট ছোট ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা হবে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আপনার বিভিন্ন অজ্ঞতাগুলো বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়াবে। আপনি যখন সংস্কারের কথা বলবেন তখন আপনার দুর্বলতাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সামনে আনা হবে। তখন আপনি সময়ের জন্য আফসোস করবেন। তবে সে সময়ের জন্য নয় যেগুলো আপনি শৈশবে নষ্ট করেছেন। কারণ তখন চাইলেও আপনি এই স্কিলগুলো অর্জন করতে পারতেন না। আপনি আফসোস করবেন সেই সময়ের জন্য যা আপনি স্কিল অর্জনে যোগ্য হওয়ার পরে নষ্ট করেছেন। অর্থাৎ ছানাবিয়াহ ও দাওরার বছরগুলো।
আপনার মনে হবে, আপনি এই সময়ে চাইলেই নিজেকে আরেকটু সমৃদ্ধ করতে পারতেন। তবে তখন আর এই আফসোসগুলো কোন কাজে আসবে না। কারণ ব্যস্ততা আপনাকে এমনভাবে গ্রাস করবে যে, রাতে বিছানায় যাওয়ার পূর্বে মন খারাপ করে আফসোস করার সময়টুকুও আপনার হবে না। মনে রাখবেন, দুনিয়ার বুকে অনেক দামি বস্ত্ত রয়েছে। সোনা-দানা, জায়গা-জমি রয়েছে। এগুলোর দাম কখনো কমে-বাড়ে। তবে সময়ের দাম কমে-বাড়ে না। সময় সর্বদা অমূল্য। সুতরাং সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজেকে আরো বেশী যোগ্য করে গড়ে তুলুন। ছাত্রজীবনেই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবনকে সাজিয়ে নিন। সবসময় মনে রাখবেন, পুরো একটি জাতি আপনার যোগ্য হয়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।
সারওয়ার মিছবাহ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।