সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুম‘আর দিন হ’ল সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই দিনটিকে ‘সাইয়্যিদুল আইয়াম’ বা দিবসসমূহের সর্দার এবং মুমিনের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসাবে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা এই দিনে স্বীয় বান্দাদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও মাগফিরাতের দুয়ার খুলে দেন। তবে জুম‘আর দিনের ফযীলত ও বরকত পূর্ণরূপে লাভ করার জন্য প্রয়োজন সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণ। অনেকেই জুম‘আর দিনটিকে কেবল জুম‘আর ছালাত আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করেন। অথচ এই দিনের রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র আমল ও আদব। যা পালন করলে ছওয়াব বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই সাথে এমন কিছু কাজ রয়েছে, যা এই দিনে বর্জন করা অত্যন্ত যরূরী। অন্যথা নেকীর পরিবর্তে গুনাহ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে জুম‘আর দিনের মর্যাদা, করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হ’ল।
জুম‘আর দিনের মর্যাদা
মহান আল্লাহ তা‘আলা জুম‘আর দিনকে অনেক মর্যাদামন্ডিত করেছেন। এই মর্যাদার উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে-
১. অন্যান্য দিন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,خَيْرُ يَوْمٍ طَلَعَتْ عَلَيْهِ الشَّمْسُ يَوْمُ الْجُمُعَةِ فِيهِ خُلِقَ ادَمُ وَفِيْهِ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ وَفِيْهِ أُخْرِجَ مِنْهَا وَلَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ لَا فِىْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، ‘যেসব দিনে সূর্য উদিত হয় তন্মধ্যে সর্বোত্তম দিন হ’ল জুম‘আর দিন। এ দিনে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। এ দিনে তাঁকে জান্নাত থেকে বের করে (দুনিয়ায় পাঠিয়ে) দেওয়া হয়েছে। আর ক্বিয়ামতও এ দিনেই সংঘটিত হবে’।[1] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেন,إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمُ الْجُمُعَةِ فِيهِ خُلِقَ ادَمُ وَفِيهِ قُبِضَ وَفِيْهِ النَّفْخَةُ وَفِيْهِ الصَّعْقَةُ فَأَكْثِرُا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ فِيهِ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَليّ"فَقَالُوْا: يَا رَسُوْلَ الله وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلَاتُنَا عَلَيْك وَقَدْ أَرَمْتَ؟ قَالَ: يَقُولُونَ: بَلِيْتَ قَالَ: إِنَّ اللّهَ حَرَّمَ عَلَى الْأَرْضِ أَجْسَادَ الْأَنْبِيَاءِ ‘জুম‘আর দিন হ‘ল তোমাদের সর্বোত্তম দিন। এ দিনে আদম (আঃ)- কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ দিনে তাঁর রূহ কবয করা হয়েছে। এ দিনে প্রথম শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে। এ দিনে দ্বিতীয় শিঙ্গা ফুৎকার দেয়া হবে। কাজেই এ দিনে তোমরা আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে। কারণ তোমাদের দরূদ আমার নিকটে পেশ করা হবে। ছাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমাদের দরূদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার হাড়গুলো পঁচে-গলে যাবে? ...তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা নবী-রাসূলদের শরীর মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন (অর্থাৎ মাটি তাদের দেহ নষ্ট করতে পারবে না)।[2]
২. পূর্ববতীদের থেকে শ্রেষ্ঠতম দিন : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,أَضَلَّ اللهُ عَنِ الْجُمُعَةِ مَنْ كَانَ قَبْلَنَا فَكَانَ لِلْيَهُود يَوْمُ السَّبْتِ وَكَانَ لِلنَّصَارَى يَوْمُ الأَحَدِ فَجَاءَ اللهُ بِنَا فَهَدَانَا اللهُ لِيَوْمِ الْجُمُعَةِ فَجَعَلَ الْجُمُعَةَ وَالسَّبْتَ وَالأَحَدَ وَكَذَلِكَ هُمْ تَبَعٌ لَنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ نَحْنُ الآخِرُوْنَ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا وَالأَوَّلُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمَقْضِيُّ لَهُمْ قَبْلَ الْخَلاَئِقِ، ‘আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তীদেরকে জুম‘আর দিন সম্পর্কে সঠিক পথের সন্ধান দেননি (বিরোধে লিপ্ত হওয়ার কারণে)। তাই ইহুদীদের জন্য শনিবার এবং খৃষ্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত হয়েছে। আল্লাহ আমাদেরকে (পৃথিবীতে) আনলেন এবং আমাদেরকে জুম‘আর দিনের সঠিক সন্ধান দিলেন। অতএব তিনি জুম‘আর দিন, শনিবার ও রবিবার এভাবে (বিন্যাস) করলেন। এভাবে তারা ক্বিয়ামতের দিন আমাদের পশ্চাদবর্তী হবে। আমরা পৃথিবীবাসীর মধ্যে শেষে আগমনকারী উম্মত এবং ক্বিয়ামতের দিন হব সর্বপ্রথম। যাদের সমগ্র সৃষ্টির প্রথম বিচার অনুষ্ঠিত হবে’।[3]
৩. সাপ্তাহিক ঈদের দিন : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ سَيِّدُ الأَيَّامِ وَأَعْظَمُهَا عِنْدَ اللهِ وَهُوَ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ مِنْ يَوْمِ الأَضْحَى وَيَوْمِ الْفِطْرِ فِيهِ خَمْسُ خِلاَلٍ خَلَقَ اللهُ فِيهِ آدَمَ وَأَهْبَطَ اللهُُ فِيهِ آدَمَ إِلَى الأَرْضِ وَفِيهِ تَوَفَّى اللهُُ آدَمَ وَفِيهِ سَاعَةٌ لاَ يَسْأَلُ اللهَ فِيهَا الْعَبْدُ شَيْئًا إِلاَّ أَعْطَاهُ مَا لَمْ يَسْأَلْ حَرَامًا وَفِيهِ تَقُومُ السَّاعَةُ مَا مِنْ مَلَكٍ مُقَرَّبٍ وَلاَ سَمَاءٍ وَلاَ أَرْضٍ وَلاَ رِيَاحٍ وَلاَ جِبَالٍ وَلاَ بَحْرٍ إِلاَّ وَهُنَّ يُشْفِقْنَ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ، ‘জুম‘আর দিন হ’ল সপ্তাহের দিনসমূহের সরদার এবং তা আল্লাহ্র নিকটে অধিক সম্মানিত। এ দিনটি আল্লাহ্র নিকটে কুরবানীর দিন ও ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়ে অধিক সম্মানিত। এ দিনে রয়েছে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য। এ দিন আল্লাহ আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেন, এ দিনই আললাহ তাঁকে পৃথিবীতে পাঠান এবং এ দিনই আল্লাহ তাঁর মৃত্যু দান করেন। এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, কোন বান্দা তখন আল্লাহ্র নিকট কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তাকে তা দান করেন, যদি না সে হারাম জিনিসের প্রার্থনা করে আর এ দিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। নৈকট্যশীল ফেরেশতাগণ, আসমান-যমীন, বায়ু, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র সবই জুম‘আর দিন শংকিত হয়’।[4]
জুম‘আর দিনের ফযীলত
জুম‘আর দিনের বহু ফযীলত রয়েছে। হাদীছে এ দিনের বিভিন্ন ফযীলতের কথা উল্লেখিত হয়েছে। নিম্নে সে বিষয় উল্লেখ করা হ’ল।-
১. উট কুরবানীর নেকী : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الْخَامِسَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً فَإِذَا خَرَجَ الْإِمَامُ حَضَرَتْ الْمَلَائِكَةُ يَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ، ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন জানাবাত গোসলের ন্যায় গোসল করে এবং ছালাতের জন্য গমন করে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে সে যেন একটি গাভী কুরবানী করল। তৃতীয় পর্যায়ে যে আগমন করে সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। চতুর্থ পর্যায়ে আগমন করল সে যেন একটি মুরগী দান করল। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমন করল সে যেন একটি ডিম দান করল। পরে ইমাম যখন খুৎবা দেয়ার জন্য বের হন তখন ফেরেশতাগণ যিকির শ্রবণের জন্য উপস্থিত হয়ে থাকে’।[5]
২. পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত গুনাহ মাফ : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوْءَ ثُمَّ أَتَى الْجُمُعَةَ فَاسْتَمَعَ وَأَنْصَتَ غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ وَزِيَادَةُ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ وَمَنْ مَسَّ الْحَصَى فَقَدْ لَغَا، ‘যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওযূ করার পর জুম‘আর ছালাতে আসল, নীরবে মনোযোগ সহকারে খুৎবা শুনল, তার পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত এবং আরো অতিরিক্ত তিন দিনের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি (অহেতুক) কঙ্কর স্পর্শ করল সে অনর্থক কাজ করল’।[6]
৩. দো‘আ কবূলের বিশেষ সময় : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,فِي الْجُمُعَةِ سَاعَةٌ لاَ يُوَافِقُهَا مُسْلِمٌ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي يَسْأَلُ خَيْرًا إِلاَّ أَعْطَاهُ ‘জুম‘আর দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যদি সে মুহূর্তটিতে কোন মুসলিম দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করে আল্লাহ্র কাছে কোন কল্যাণের জন্য দো‘আ করে আল্লাহ তাকে তা দান করবেন। তিনি এ হাদীছ বর্ণনার সময় আপন হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলে আমরা বললাম (বুঝলাম) যে, মুহূর্তটির সময় খুবই স্বল্প’।[7] এই সময়কালের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তন্মধ্যে দু’টি মত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য (১) ইমাম ছাহেবের মিম্বারে বসা থেকে নিয়ে ছালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত।[8] (২) আছরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।[9]
৪. কবরের ফিৎনা থেকে মুক্তি : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَمُوتُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَوْ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ إِلاَّ وَقَاهُ اللهُ فِتْنَةَ الْقَبْرِ، ‘জুম‘আর দিনে অথবা জুম‘আর রাতে কোন মুসলিম ব্যক্তি যদি মৃত্যুবরণ করে তাহ’লে কবরের ফিৎনা হ’তে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন’।[10]
জুম‘আর দিনে করণীয়
জুম‘আর দিনের মর্যাদা ও ফযীলত যেমন মহান তেমনি এ দিনের আমলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবীগণ জুম‘আর দিনে বিশেষ কিছু আমল করতেন, যা আমাদের জন্য সুন্নাত হিসাবে প্রমাণিত। এই আমলগুলো শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং এতে রয়েছে আল্লাহ্র স্মরণে অগ্রসর হওয়ার পথ ও পদ্ধতি।
১. ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ أَفْضَلَ الصَّلَوَاتِ عِنْدَ اللهِ صَلَاةُ الصُّبْحِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فِي جَمَاعَةٍ، ‘আল্লাহ্র কাছে সর্বোত্তম ছালাত হ’ল জুম‘আর দিনের ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা’।[11]
২. গোসল করে সুন্দর পোষাক ও সুগন্ধি ব্যবহার করা : সালমান ফারেসী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন গোসল করে এবং যথাসাধ্য উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে ও নিজের তেল হ’তে ব্যবহার করে বা নিজ ঘরের সুগন্ধি ব্যবহার করে, অতঃপর বের হয় এবং দু’জন লোকের মাঝে ফাঁক না করে, অতঃপর তার নির্ধারিত ছালাত আদায় করে এবং ইমামের খুৎবার সময় চুপ থাকে, তাহ’লে তার সে জুম‘আ হ’তে আরেক জুম‘আ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়’।[12]
৩. আগে আগে মসজিদে গমন করা : হাদীছে মসজিদে আসার অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও আগে ভাগে মসজিদে এসে তাহিইয়াতুল মসজিদ, তাহিইয়াতুল ওযূ, যিকির-আযকার, ইস্তেগফারসহ বেশী বেশী নফল ছালাত আদায় করলে অনেক নেকী হাছিল করার সুযোগ হয়।
৪. মনোযোগ সহকারে খুৎবা শোনা : আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভালভাবে ওযূ করে জুম‘আর ছালাত আদায় করার জন্য এসে মনোযোগের সাথে খুৎবা শ্রবণ করল এবং চুপ থাকল তার এ জুম‘আ থেকে পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত সংঘটিত গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে এবং এর সাথে অতিরিক্ত আরো তিন দিনের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি খুৎবা চলা অবস্থায় পাথর বা কোন বস্ত্ত স্পর্শ করবে সে ত্রুটিকারী হিসাবে গণ্য হবে’।[13]
৫. অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করা : আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,أكثِروا الصَّلاةَ عليَّ يومَ الجمُعةِ وليلةَ الجمُعةِ، فمَن صلَّى عليَّ صلاةً صلَّى اللهُ عليهِ عَشرًا، ‘তোমরা জুম‘আর দিনে ও জুম‘আর রাতে আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ কর। কারণ যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করেন’।[14]
৬. সূরা কাহফ তেলাওয়াত করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ قَرَأَ سُوْرَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ النُّورَ مَا بَيْنَ الْجُمْعَتَيْنِ، ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন সূরা কাহফ পড়বে, তার (ঈমানের) নূর এ জুম‘আ হ’তে পরবর্তী জুম‘আ পর্যন্ত চমকাতে থাকবে’।[15]
জুম‘আর দিনে বর্জনীয়
জুম‘আর দিনটি যেমন মর্যাদা ও ফযীলতে পরিপূর্ণ, তেমনি এই দিনে কিছু নিষিদ্ধ কাজও রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কাজ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যেগুলো শরী‘আতে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। জুম‘আর দিনের নিষিদ্ধ কাজ সমূহ হ’ল :
১. আযান হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকা : জুম‘আর আযান হওয়ার পর কেনা-বেচা করা এবং দুনিয়াবী সকল কাজ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللهِ وَاذْكُرُوا اللهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ، ‘হে মুমিনগণ! যখন জুম‘আর দিনে ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’ (জুম‘আ ৬২/৯)। এখানে বেচা-কেনা ও ব্যবসা বলতে বুঝানো হয়েছে যাবতীয় ব্যস্ততাকে, তা যেকোন প্রকারেরই হোক না কেন। জুম‘আর আযানের পর তা ত্যাগ করতে হবে।
২. জুম‘আর খুৎবার পূর্বে বয়ান করা : খুৎবার পূর্বে বয়ান করার কোন দলীল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবীগণসহ পরবর্তী যুগের সালাফদের মাঝে ছিল না। এ পদ্ধতি নতুন আবিষ্কৃত যা শুধুমাত্র ভারত উপমহাদেশেই চালু আছে। মাতৃভাষাতে খুৎবা এবং দুইটা খুৎবা দেওয়াই ইসলামী রীতি। মাতৃভাষায় সমসাময়িক বিষয় সহ শিক্ষামূলক ইসলামী যে কোন বিষয়ে বক্তব্য দেয়াই হচ্ছে প্রকৃত ইসলামী রীতি। অতঃপর দ্বিতীয় খুৎবার ভূমিকা আরবীতে দেয়ার পরেও কিছু বক্তব্য রাখা যায়।
৩. তাহিইয়াতুল মসজিদ আদায় না করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمُ المَسْجِدَ فَلاَ يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ، ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদ প্রবেশ করবে, তখন সে যেন দু’রাক‘আত ছালাত না পড়া পর্যন্ত না বসে’।[16]
জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন সুলায়ক গাত্বফানী (রাঃ) জুম‘আর দিনে আসলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুৎবা দিচিছলেন। সুলায়ক (রাঃ) বসে পড়লেন। নবী করীম (ছাঃ) বললেন,يَا سُلَيْكُ قُمْ فَارْكَعْ رَكْعَتَيْنِ وَتَجَوَّزْ فِيهِمَا- ثُمَّ قَالَ : إِذَا جَاءَ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالإِمَامُ يَخْطُبُ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ وَلْيَتَجَوَّزْ فِيهِمَا- ‘হে সুলায়ক! তুমি দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নাও। তারপর বললেন, ‘তোমাদের কেউ জুম‘আর দিন মসজিদে আসলে, ইমাম তখন খুৎবারত থাকলে সংক্ষিপ্ত আকারে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নেবে’।[17]
৪. খুৎবা চলাকালীন ঘাড় মাড়িয়ে যাওয়া : খুৎবা চলা অবস্থায় মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনের কাতারে যাওয়া নিষেধ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুৎবা দিচ্ছিলেন এমন সময় দেখলেন জনৈক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে তিনি তাকে বললেন, اجْلِسْ فَقَدْ آذَيْتَ ‘তুমি বসো, তুমি লোকদের কষ্ট দিচ্ছ’।[18]
৫. খুৎবার সময় দু’হাটু উঁচু করে বসা : অনেকে দুই হাঁটু খাড়া করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে বা কাপড় পেঁচিয়ে বসেন। একে আরবীতে ইহতেবা বলা হয়। খুৎবা চলাকালীন এভাবে বসা নিষিদ্ধ। রাসূল (ছাঃ) জুম‘আর দিন ইমামের খুৎবা চলাকালে কাউকে হাঁটু খাড়া করে কাপড় জড়িয়ে বসতে নিষেধ করেছেন’।[19]
৬. খুৎবার সময় অনর্থক কথা বলা ও কাজ করা : খুৎবার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শোনা যরূরী। খুৎবার সময় অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকেই খুৎবার সময় মোবাইল টিপা, মেসেজ চেক করা বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা ইত্যাদি অনর্থক কাজ করেন। এ কাজগুলো জুম‘আর ছওয়াব বাতিল করে দিতে পারে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ، ‘জুম‘আর দিন যখন তোমার সাথীকে চুপ থাক বলবে, অথচ ইমাম খুৎবা দিচ্ছেন, তাহ’লে তুমি অনর্থক কাজ করলে’।[20] অন্য হাদীছে এসছে, যে ব্যক্তি খুৎবা চলা অবস্থায় পাথর বা কোন বস্ত্ত স্পর্শ করবে সে ত্রুটিকারী হিসাবে গণ্য হবে’।[21]
৭. খুৎবা চলাকালীন ঘুমানো : খুৎবার সময় ঘুম চলে আসলে ওযূ ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে এবং খুৎবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَلْيَتَحَوَّلْ مِنْ مَجْلِسِهِ ذَلِكَ إِلَى غَيْرِهِ، ‘যদি মসজিদে কোন ব্যক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, তবে সে যেন স্বীয় স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র সরে বসে।[22]
৮. শুধু জুম‘আর দিনে ছিয়াম রাখা : শুধু জুম‘আর দিন নির্দিষ্ট করে ছিয়াম পালন করা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لاَ يَصُومَنَّ أَحَدُكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلاَّ يَوْمًا قَبْلَهُ أَوْ بَعْدَهُ، ‘তোমাদের কেউ যেন শুধু জুম‘আর দিনে ছিয়াম পালন না করে। তবে তার পূর্বে একদিন অথবা পরের দিন’।[23]
৯. জুম‘আর দিনে কবর যিয়ারত করা : জুম‘আর দিনে বিশেষভাবে কবর যিয়ারতের আয়োজন করা জায়েয নয়।
অথচ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও ছাহাবীগণ এমন কিছু নির্দিষ্ট করে করেননি। কবর যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট কোন দিন নির্ধারণ করা যাবে না। যেকোন দিন যেকোন সময় কবর যিয়ারত করতে পারে। জুম‘আর দিনকে নির্দিষ্ট করে কবর যিয়ারত করা সম্পর্কে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা জাল।[24]
উপসংহার : জুম‘আর দিন সপ্তাহের সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিন। এটি কেবল একটি ছালাত আদায়ের দিন নয় বরং এটি মুমিনের জন্য আত্মার পুনর্জাগরণ, দো‘আ ও তওবার সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ মেনে দুনিয়াবী সকল ব্যস্ততা পরিত্যাগ করে তাঁর স্মরণে নিবেদিত হওয়া এবং খুৎবা ও ছালাতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই এ দিনের মূল দাবী। তাই প্রচলিত ধারার বাইরে এসে জুম‘আর দিনটিকে আমরা সাপ্তাহিক ঈদ হিসাবে উদযাপন করি। সাথে সাথে করণীয় বিষয়গুলি যথাসম্ভব বাস্তবায়ন করে এবং বর্জনীয় কাজগুলো পরিহার করে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক দান করুন- আমীন!
*শিক্ষার্থী, ইইই বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
[1]. মুসলিম হা/৮৫৪; মিশকাত হা/১৩৫৬।
[2]. আবূ দাউদ হা/১০৪৭; মিশকাত হা/১৩৬১।
[3]. মুসলিম হা/৮৫৬।
[4]. ইবনু মাজাহ হা/১০৮৪; আহমাদ হা/১৫১২০; মিশকাত হা/১৩৬৩।
[5]. মুসলিম হা/৮৫০; আহমাদ হা/৯৯৩৩।
[6]. মুসলিম হা/৮৫৭।
[7]. বুখারী হা/৯৩৫।
[8]. মুসলিম হা/৮৫৩; মিশকাত হা/১৩৫৭-৫৮।
[9]. আবুদাউদ হা/১০৪৬; মিশকাত হা/১৩৬০; ছহীহাহ হা/২৫৮৩।
[10]. মিশকাত হা/১৩৬৭; আল-আহকাম হা/৩৫
[11]. ছহীহাহ হা/১৫৬৬।
[12]. বুখারী হা/৮৮৩।
[13]. মুসলিম হা/৮৫৭।
[14]. আল জামে‘ হা/১২০৯; বায়হাকী, সুনানে কুবরা ৩/২৪৯।
[15]. মিশকাতুল মাছাবীহ হা/২১৭৫, ছহীহুত তারগীব হা/৭৩৬, ছহীহ আল-জামে হা/৬৪৭০, আদ-দাওয়াতুল কাবীর হা/৫২৬।
[16]. বুখারী হা/৪৪৪, ১১৬৩, মুসলিম হা/১৬৮৭-১৬৮৮।
[17]. মুসলিম হা/১৮৯৭।
[18]. আবু দাউদ হা/১১১৮, আহমাদ ৪/১৮৮।
[19]. আবুদাউদ হা/১১১০; মিশকাত হা/১৩৯৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৮৭৬।
[20]. বুখারী হা/৯৩৪, মুসলিম হা/৮৫১, আহমাদ হা/৭৬৯০।
[21]. মুসলিম হা/৮৫৭।
[22]. আবু দাঊদ হা/১১১৯, সনদ ছহীহ।
[23]. মুসলিম হা/১১৪৪, আহমাদ হা/১০৮০৮।
[24]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৯০১; সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৬০৫।