রামাযান মাসের গুরুত্ব, ফযীলত ও প্রয়োজনীয় মাসায়েল

মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম বান্দাদেরকে জান্নাতে নেওয়ার যেসকল ব্যবস্থা রেখেছেন রামাযান তার অন্যতম। ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে এ মাসের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আল্লাহভীতি বা তাক্বওয়া অর্জনের মূল প্রশিক্ষণ এ মাসেই হয়ে থাকে। রামাযান ছিয়ামের মাধ্যমে ছায়েমকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে পূত-পবিত্র ও খাঁটি মানুষরূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এ মাসে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব কুরআন নাযিল হয়েছে। এ মাসেই রয়েছে ‘লায়লাতুল ক্বদর’ যা হাযার মাসের চেয়েও উত্তম। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে রামাযানের ফযীলত ও অতি প্রয়োজনীয় কিছু বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।-

রামাযান মাসের পরিচয় :

আল্লাহ তা‘আলা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই বারো মাসে বছর নির্ধারণ করে দিয়েছেন (তওবা ৯/৩৬)[1] এই বারোটি মাসের নবম মাস হ’ল ‘রামাযান’। ‘রামাযান’ (رمضان) শব্দটির অর্থ- দগ্ধ হওয়া, উত্তপ্ত হওয়া ইত্যাদি।[2] অতএব অধিক জ্বলে পুড়ে খাক হওয়াকে রামাযান বলা হয়। একটানা একমাস ছিয়াম সাধনার ফলে মুমিনের জৈব প্রবৃত্তিকে ক্ষুৎ-পিপাসার আগুন জ্বালিয়ে দুর্বল করে ফেলা হয় বলে এ মাসটিকে ‘রামাযান’ মাস বলা হয়েছে।[3]

রামাযান মাসের ফযীলত

(১) কুরআন নাযিলের মাস রামাযান : মানব জাতির হেদায়াতের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব নাযিল হয়েছে এ রামাযান মাসে। আল্লাহ বলেন,شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ، ‘রামাযান হ’ল সেই মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। যা মানুষের জন্য সুপথ প্রদর্শক ও সুপথের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (বাক্বারাহ ২/১৮৫)

শুধু কুরআন নয় বরং সকল আসমানী কিতাবই রামাযান মাসে নাযিল হয়েছে। ওয়াছেলাহ বিন আসক্বা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন যে, ‘ইবরাহীম (আঃ)-এর ছহীফাসমূহ রামাযানের ১ম রাত্রিতে, তওরাত ৬ষ্ঠ রাত্রিতে, ইনজীল ১৩তম রাত্রিতে, যবূর ১৮তম রাত্রিতে নাযিল হয়েছে এবং কুরআন ২৪তম রাত্রিতে নাযিল হয়’।[4] অতএব কুরআন নাযিলের মাসে কুরআনের পঠন, পাঠন ও অনুসরণের মাধ্যমে রামাযান মাসকে মূল্যায়ন করা সকলের কর্তব্য।

(২) ছিয়াম পালনের মাস : ইসলামের পাঁচটি রুকনের[5] অন্যতম হ’ল ছিয়াম। সুস্থ, বালেগ ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর জন্য রামাযানের এক মাস ছিয়াম পালন করা ফরয। এই ফরয অস্বীকার করলে কাফের এবং অবহেলা ও অলসতা বশে ছিয়াম পরিত্যাগ করলে ঐ ব্যক্তি কবীরা গোনাহগার হবে। তাই এ মাসের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হ’ল রামাযানের ছিয়াম পালন করা।

(৩) নেকী অর্জনের মাস : রামাযান মাস নেকী অর্জনের বসন্তকাল। এ মাসে প্রতিটি ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক নেক আমলের ছওয়াব দশগুণ হ’তে সাতশত গুণ পর্যন্ত প্রদান করা হয়। আল্লাহ বলেন, কিন্তু ছাওম ব্যতীত। কেননা ছাওম কেবল আমার জন্যই (রাখা হয়) এবং আমিই তার পুরস্কার প্রদান করব। সে তার যৌনাকাঙ্ক্ষা ও পানাহার কেবল আমার জন্যই পরিত্যাগ করে। ছিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে। একটি ইফতারকালে, অন্যটি তার প্রভুর সাথে দীদারকালে। তার মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকটে মিশকের খোশবুর চেয়েও সুগন্ধিময়। ছিয়াম (অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে) ঢাল স্বরূপ। অতএব যখন তোমরা ছিয়াম পালন করবে, তখন মন্দ কথা বলবে না ও বাজে বকবে না। যদি কেউ গালি দেয় বা লড়াই করতে আসে তখন বলবে, আমি ছায়েম’।[6]

(৪) রহমত ও বরকতময় মাস : রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ، ‘তোমাদের জন্য রামাযানের বরকতময় মাস এসেছে। এ মাসে ছিয়াম রাখা আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন’।[7] বরকতময় এ মাসে ছিয়াম, ক্বিয়াম, সাহারী, ইফতার সহ অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর বরকত অর্জন করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। এ মাসে আদম সন্তানের প্রত্যেক নেক আমলের ছওয়াব দশগুণ হ’তে সাতশ’ গুণ প্রদান করা হয়।[8] রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন, ‘যখন রামাযান মাস আগমন করে তখন আসমানের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়’। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়’। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়’।[9]

(৫) ক্বদরের রাত হাযার মাসের চেয়ে উত্তম : রামাযান মাসের শেষ দশকের পাঁচটি বেজোড় রাতের যেকোন এক রাতে ক্বদর তালাশ করতে হয়।[10] সেই রাতটি হাযার মাসের চেয়ে উত্তম (ক্বদর ৯৭/৩)। আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ، وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ، وَلاَ يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلاَّ مَحْرُومٌ، ‘এই মাস তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়েছে, যার মধ্যে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাযার মাসের চাইতে উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হ’ল, সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হ’ল। আর হতভাগারাই কেবল এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়’।[11]

(৬) গুনাহ মাফের মাস : রামাযান মাস মুমিনের জন্য গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়ার এবং আত্মশুদ্ধি অর্জনের এক সুবর্ণ সুযোগ। রামাযান মাস আসার সাথে সাথে যেমন ছাগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যায় তেমন রামাযানের প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার প্রার্থনা কবুল করেন। রাসূলুল­লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রামাযানের ছিয়াম পালন করে, তার বিগত সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়’।[12] তিনি আরো বলেন, وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانُ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ، ‘ঐ ব্যক্তির নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক যার নিকট রামাযান মাস এলো অথচ তার গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা পার হয়ে গেল’।[13]

প্রয়োজনীয় মাসায়েল

১. ছিয়ামের নিয়ত : নিয়ত অর্থ- মনন করা বা সংকল্প করা। অতএব মনে মনে ছিয়ামের সংকল্প করাই যথেষ্ট। হজ্জের তালবিয়া ব্যতীত ছালাত, ছিয়াম বা অন্য কোন ইবাদতের শুরুতে আরবী বা অন্য ভাষায় নিয়ত পড়া বিদ‘আত।

২. ইফতারের দো‘আ : ‘বিসমিল­লাহ’ বলে শুরু ও ‘আলহামদুলিল­লাহ’ বলে শেষ করবে।[14] ইফতারের দো‘আ হিসাবে প্রসিদ্ধ ‘আল­লাহুম্মা লাকা ছুমতু...’ হাদীছটি ‘যঈফ’। ইফতার শেষে নিম্নোক্ত দো‘আ পড়া যাবে- ‘যাহাবায যামাউ ওয়াবতাল­লাতিল উরূকু ওয়া ছাবাতাল আজরু ইনশাআল­লাহ’ (পিপাসা দূরীভূত হ’ল ও শিরাগুলি সঞ্জীবিত হ’ল এবং আল­লাহ চাহেন তো পুরস্কার ওয়াজিব হ’ল)।[15]

৩. রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘দ্বীন চিরদিন বিজয়ী থাকবে, যতদিন লোকেরা ইফতার দ্রুত করবে। কেননা ইহূদী-নাছারাগণ ইফতার দেরীতে করে’।[16] তিনি বলেন, ‘তোমরা ইফতার দ্রুত কর এবং সাহারী দেরীতে কর’।[17] তিনি আরো বলেন, ‘আহলে কিতাবদের সাথে আমাদের ছিয়ামের পার্থক্য হ’ল সাহারী খাওয়া’।[18]

৪. সাহারীর আযান : রাসূলুল­লাহ (ছাঃ)-এর যামানায় তাহাজ্জুদ ও সাহারীর আযান বেলাল (রাঃ) দিতেন এবং ফজরের আযান অন্ধ ছাহাবী আব্দুল­লাহ ইবনু উম্মে মাকতূম (রাঃ) দিতেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘বেলাল রাত্রে আযান দিলে তোমরা খানাপিনা কর, যতক্ষণ না ইবনু উম্মে মাকতূম ফজরের আযান দেয়’।[19] বুখারীর ভাষ্যকার হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন, ‘বর্তমান কালে সাহারীর সময় লোক জাগানোর নামে আযান ব্যতীত যা কিছু করা হয় সবই বিদ‘আত’।[20]

৫. রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘খাদ্য বা পানির পাত্র হাতে থাকা অবস্থায় তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ফজরের আযান শোনে, তবে সে যেন প্রয়োজন পূরণ না করে পাত্র রেখে না দেয়’।[21]

৬. তারাবীহর ছালাতের ফযীলত : রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযানের রাত্রিতে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রাত্রির ছালাত আদায় করে, তার বিগত সকল গোনাহ মাফ করা হয়’।[22]

৭. তারাবীহর রাক‘আত সংখ্যা : (ক) আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল­লাহ (ছাঃ) রামাযান বা রামাযানের বাইরে (তিন রাক‘আত বিতরসহ) এগারো রাক‘আতের বেশী রাতের নফল ছালাত আদায় করতেন না’।[23]

(খ) সায়েব বিন ইয়াযীদ (রাঃ) বলেন, ‘ওমর ফারূক (রাঃ) উবাই ইবনু কা‘ব ও তামীম আদ-দারী (রাঃ)-কে রামাযানের রাত্রিতে লোকদেরকে সাথে নিয়ে জামা‘আত সহকারে এগারো রাক‘আত ছালাত আদায়ের নির্দেশ দান করেন’।[24] এ সময় তাঁরা প্রথম রাত্রিতে ইবাদত করতেন।[25] শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন, মুওয়াত্ত্বায় (হা/৩৮০) ইয়াযীদ বিন রূমান কর্তৃক যে বর্ণনাটি এসেছে যে, ‘লোকেরা ওমর ফারূক (রাঃ)-এর যামানায় ২৩ রাক‘আত তারাবীহ পড়ত’ একথাটি ‘যঈফ’। কেননা ইয়াযীদ বিন রূমান ওমর (রাঃ)-এর যামানা পাননি।[26] অতএব ইজমায়ে ছাহাবা কর্তৃক ওমর, ওছমান ও আলী (রাঃ)-এর যামানা থেকে ২০ রাক‘আত তারাবীহ সাব্যস্ত বলে যে কথা চালু রয়েছে, তার কোন শারঈ ভিত্তি নেই। একথাটি ‘মুদরাজ’ বা পরবর্তীকালে অনুপ্রবিষ্ট। এতদ্ব্যতীত চার খলীফার কারো থেকেই ছহীহ সনদে ২০ রাক‘আত তারাবীহ প্রমাণিত নয়।[27] বিশ রাক‘আত তারাবীহ -এর প্রমাণে বর্ণিত হাদীছটি জাল।[28]

(গ) জামা‘আতের সাথে রাতের ছালাত (তারাবীহ) আদায় করা রাসূলুল­লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত এবং দৈনিক নিয়মিত জামা‘আতে আদায় করা ‘ইজমায়ে ছাহাবা’ হিসাবে প্রমাণিত।[29] অতএব তা বিদ‘আত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

৮. লায়লাতুল ক্বদরের দো‘আ :‘আল­ল-হুম্মা ইন্নাকা ‘আফুবুন তুহিববুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী’। অর্থ-‘হে আল­লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পসন্দ কর, অতএব আমাকে তুমি ক্ষমা কর’।[30]

৯. ই‘তিকাফ : ই‘তিকাফ তাক্বওয়া অর্জন করার একটি বড় মাধ্যম। এতে লায়লাতুল ক্বদর অনুসন্ধানের সুযোগ হয়। রাসূলুল­লাহ (ছাঃ) মসজিদে নববীতে রামাযানের শেষ দশকে নিয়মিত ই‘তিকাফ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীগণও ই‘তিকাফ করেছেন’।[31] নারীদের জন্য বাড়ীর নিকটস্থ মসজিদে ই‘তিকাফ করা উত্তম।[32] সেক্ষেত্রে অবশ্যই নারীদের জন্য পর্দাসহকারে পৃথক ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। ২০শে রামাযান সূর্যাস্তের পূর্বে ই‘তিকাফ স্থলে প্রবেশ করবে এবং ঈদের আগের দিন বাদ মাগরিব বের হবে।[33] তবে বাধ্যগত কারণে শেষ দশদিনের সময়ে আগপিছ করা যাবে।[34]

১০. ফিৎরা : (ক) ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল­লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতের ক্রীতদাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সকলের উপর মাথাপিছু এক ছা‘ খেজুর, যব ইত্যাদি (অন্য বর্ণনায়) খাদ্যবস্ত্ত ফিৎরার যাকাত হিসাবে ফরয করেছেন এবং তা ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বেই আমাদেরকে আদায়ের নির্দেশ দান করেছেন’।[35] ঈদুল ফিতরের ১ বা ২ দিন আগে বায়তুল মাল জমাকারীর নিকট ফিৎরা জমা করা সুন্নাত, যা ঈদের পরে হকদারগণের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।[36]

(খ) রাসূলুল­লাহ (ছাঃ)-এর যুগে মদীনায় গম ছিল না। মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর যুগে সিরিয়ার গম মদীনায় আমদানী হ’লে উচ্চ মূল্যের বিবেচনায় তিনি গমে অর্ধ ছা‘ ফিৎরা দিতে বলেন। কিন্তু ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরীসহ অন্যান্য ছাহাবীগণ মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর এই ইজতিহাদী সিদ্ধান্ত অমান্য করেন এবং রাসূলুল­লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশ ও প্রথম যুগের আমলের উপরেই কায়েম থাকেন। ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘যারা অর্ধ ছা‘ গমের ফিৎরা দেন, তারা মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর ‘রায়’-এর অনুসরণ করেন মাত্র’।[37] (গ) মদীনার হিসাবে এক ছা‘ এদেশের আড়াই কেজি চাউলের সমান অথবা প্রমাণ সাইজ হাতের পূর্ণ চার অঞ্জলী চাউল। টাকা দিয়ে ফিৎরা আদায় করার কোন দলীল নেই।

১১. ঈদের তাকবীর : ছালাতুল ঈদায়েনে প্রথম রাক‘আতে সাত, দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচ মোট ১২ তাকবীর দেওয়া সুন্নাত।[38] ছহীহ বা যঈফ সনদে ৬ (ছয়) তাকবীরের পক্ষে রাসূলুল­লাহ (ছাঃ) হ’তে কোন হাদীছ নেই।[39]

১২. মহিলাদের ঈদের জামা‘আত : মহিলাগণ শারঈ পর্দা বজায় রেখে পুরুষদের ঈদের জামা‘আতে শরীক হ’তে পারবেন। উম্মে ‘আতিয়া (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আমাদের ঋতুবতী এবং বিবাহিতা ও অবিবাহিতা মহিলাদের ঈদগাহে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ঋতুবতী মহিলারা ঈদগাহে মুসলমানদের জামা‘আতে ও তাদের দো‘আতে শরীক হবে। কিন্তু ছালাত আদায় থেকে বিরত থাকবে।[40]

১৩. ছিয়াম ভঙ্গের কারণ সমূহ : (ক) ছিয়াম অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে খানাপিনা করলে ছিয়াম ভঙ্গ হয় এবং তার কাযা ওয়াজিব হয়। (খ) ছিয়াম অবস্থায় যৌনসম্ভোগ করলে ছিয়াম ভঙ্গ হয় এবং তার কাফফারা স্বরূপ একটানা দু’মাস ছিয়াম পালন অথবা ৬০ (ষাট) জন মিসকীন খাওয়াতে হয় (নিসা ৪/৯২; মুজাদালাহ ৪)। (গ) ছিয়াম অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে ক্বাযা আদায় করতে হবে। তবে অনিচ্ছাকৃত বমি হ’লে, ভুলক্রমে কিছু খেলে বা পান করলে, স্বপ্নদোষ বা সহবাসজনিত নাপাকী অবস্থায় সকাল হয়ে গেলে, চোখে সুর্মা লাগালে বা মিসওয়াক করলে ছিয়াম ভঙ্গ হয় না।[41]

১৪. ছিয়ামের অন্যান্য বিধান : (ক) অতি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা অসুস্থ তথা যারা ছিয়াম পালনে অক্ষম, তারা ছিয়ামের ফিদইয়া হিসাবে দৈনিক একজন করে মিসকীন খাওয়াবেন (বাক্বারাহ ২/১৮৪)। ছাহাবী আনাস (রাঃ) গোশত-রুটি বানিয়ে একদিনে ৩০ (ত্রিশ) জন মিসকীন খাইয়েছিলেন।[42] ইবনু আববাস (রাঃ) গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদেরকে ছিয়ামের ফিদইয়া আদায় করতে বলতেন।[43] (খ) মৃত ব্যক্তির ছিয়ামের ক্বাযা তার উত্তরাধিকারীগণ আদায় করবেন অথবা তার বিনিময়ে ফিদইয়া দিবেন।[44] ফিদইয়ার পরিমাণ দৈনিক এক মুদ বা সিকি ছা‘ চাউল অথবা গম।[45] তবে বেশী দিলে বেশী নেকী পাবেন (বাক্বারাহ ২/১৮৪)

পরিশেষে বলব, মাহে রামাযান আমাদের জন্য ক্ষণস্থায়ী অতিথি মাত্র। এই মাসটি কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি আত্মগঠন ও চরিত্র সংশোধনের একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ। রামাযানের প্রকৃত সার্থকতা তখনই অর্জিত হবে, যখন আমরা এই মাসের শিক্ষা সংযম, ধৈর্য, দানশীলতা ও আল্লাহভীতি সারা বছরের জন্য নিজেদের জীবনে ধারণ করতে পারব। তাই অবহেলা ও আলস্যে সময় নষ্ট না করে, এই মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদতের মাধ্যমে রাঙিয়ে তোলা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। আসুন! আমরা ছিয়াম, ক্বিয়াম ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে নিজেদের সমর্পণ করি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে ছিয়াম পালন এবং এর যাবতীয় ফযীলত অর্জনের তাওফীক দান করুন- আমীন!

-মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াদূদ

*তুলাগাঁও নোয়াপাড়া, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।


[1]. আরবী বারো মাস হ’ল মুহাররম, সফর, রবীঊল আউয়াল, রবীঊল আখির, জুমাদাল উলা, জুমাদাল আখিরাহ, রজব, শা‘বান, রামাযান, শাওয়াল, যুলকা‘দাহ, যুলহিজ্জাহ। ছিদ্দীক হাছান খান (মৃত: ১৩০৭ হিঃ), তাফসীর ফাতহুল বায়ান, সূরা তওবা ৩৬নং আয়াতে তাফসীর দ্র:।

[2]. ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, মু‘জামুল ওয়াফী, পৃ. ৫২২।

[3]. মাসিক আত-তাহরীক, জানুয়ারী ১৯৯৮, পৃ. ৪।

[4]. আহমাদ হা/১৬৯৮৪; বায়হাক্বী হা/১৮৬৮৭; ছহীহাহ হা/১৫৭৫।

[5]. বুখারী হা/৮; মুসলিম হা/১৬।

[6]. বুখারী হা/১৯০৪; মুসলিম হা/১১৫১; মিশকাত হা/১৯৫৯।

[7]. নাসাঈ হা/২১০৬; আহমাদ হা/৭১৪৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৫।

[8]. বুখারী হা/১৯০৪; মুসলিম হা/১১৫১; ইবনু মাজাহ হা/১৬৩৮।

[9]. মুসলিম হা/১০৭৯; বুখারী হা/১৮৯৯।

[10]. বুখারী হা/২০১৪।

[11]. ইবনু মাজাহ হা/১৬৪৪; মিশকাত হা/১৯৬৪; ছহীহুত তারগীব ১৪২৯।

[12]. বুখারী হা/৩৮; মুসলিম হা/৭৬০; মিশকাত হা/১৯৫৮।

[13]. তিরমিযী হা/৩৫৪৫; ছহীহুত তারগীব হা/১৬৮০।

[14]. বুখারী, মিশকাত হা/৪১৯৯; মুসলিম, ঐ, হা/৪২০০।

[15]. আবূদাঊদ হা/২৩৫৭-২৩৫৮; মিশকাত হা/১৯৯৩-৯৪।

[16]. আবূদাউদ হা/২৩৫৩; মিশকাত হা/১৯৯৫।

[17]. ত্বাবারাণী, ছহীহুল জামে‘ হা/৩৯৮৯।

[18]. মুসলিম হা/১০৯৬।

[19]. বুখারী হা/১৯১৯; মুসলিম হা/১০৯২; নায়লুল আওত্বার ২/১২০ পৃঃ।

[20]. ফাৎহুল বারী হা/৬২২-২৩-এর ব্যাখ্যা, ২/১২৩-২৪; নায়ল ২/১১৯।

[21]. আবূদাউদ হা/২৩৫০; মিশকাত হা/১৯৮৮।

[22]. মুসলিম হা/৭৫৯; মিশকাত হা/১২৯৬।

[23]. বুখারী হা/১১৪৭; মুসলিম হা/৭৩৮; মিশকাত হা/১১৮৮।

[24]. মুওয়াত্ত্বা মালেক হা/৩৭৯, সনদ ছহীহ, মিশকাত হা/১৩০২।

[25]. বুখারী, মিশকাত হা/১৩০১।

[26]. দ্রঃ আলবানী, মিশকাত হা/১৩০২ টীকা-২।

[27]. হাশিয়া মুওয়াত্ত্বা পৃঃ ৭১-এর হাশিয়া-৭, ‘রামাযানে ছালাত’ অধ্যায়; দ্রঃ তুহফাতুল আহওয়াযী শরহ তিরমিয়ী হা/৮০৩-এর ব্যাখ্যা ৩/৫২৬-৩২।

[28]. আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৪৪৫, ২/১৯১ পৃঃ।

[29]. মিশকাত হা/১৩০২।

[30]. আহমাদ, ইবনু মাজাহ, তিরমিযী, মিশকাত হা/২০৯১।

[31]. বুখারী হা/২০২৬; মুসলিম হা/১১৭২; মিশকাত হা/২০৯৭।

[32]. ফাৎহুল বারী হা/২০৩৩-এর আলোচনা।

[33]. সাইয়িদ সাবিক্ব, ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৪৩৬।

[34]. বুখারী হা/২০২৯।

[35]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৮১৫, ১৮১৬।

[36]. বুখারী হা/১৫০৮-১২; ঐ দ্রঃ ফাৎহুল বারী, ৩/৪৩৬-৪১।

[37]. দ্রঃ ফাৎহুল বারী (কায়রো : ১৪০৭ হি), ৩/৪৩৮ পৃঃ।

[38]. আহমাদ, আবূদাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৪৪১।

[39]. আলোচনা দ্রষ্টব্য : নায়লুল আওত্বার ৪/২৫৩-৫৬ পৃঃ; ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) পৃ. ২০৬-১২।

[40]. বুখারী হা/৯৮০-৯৮১; মুসলিম হা/৮৯০; মিশকাত হা/১৪৩১।

[41]. শাওকানী, নায়লুল আওত্বার ৫/২৭১-৭৫, ২৮৩; ১/১৬২ পৃঃ।

[42]. ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা বাক্বারাহ ১৮৪ আয়াত।

[43]. বুখারী হা/৪৫০৫; ইরওয়া হা/৯১২; নায়ল ৫/৩১১ পৃঃ।

[44]. নায়ল ৫/৩১৫-১৭ পৃঃ।

[45]. বায়হাক্বী হা/৮০০৫-০৬, ৪/২৫৪ পৃঃ।






বিষয়সমূহ: ছিয়াম-রামাযান
মুসলমানদের রোম ও কন্সটান্টিনোপল বিজয় (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
অল্পে তুষ্টি (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পরিক্রমা (২য় কিস্তি) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
পিতা-মাতার উপর সন্তানের অধিকার (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ শফীকুল আলম
ঈমানের গুরুত্ব ও ফযীলত - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
কুরআনের আলোকে ভূমি জরিপ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান (শেষ কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
আকাশের দরজাগুলো কখন ও কেন খোলা হয়? (৩য় কিস্তি) - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
যাকাত ও ছাদাক্বা - আত-তাহরীক ডেস্ক
আল্লামা আলবানী সম্পর্কে শায়খ শু‘আইব আরনাঊত্বের সমালোচনার জবাব (শেষ কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
নববী চিকিৎসা পদ্ধতি (৫ম কিস্তি) - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
আরও
আরও
.