খ. বিশেষ উদ্দেশ্য :
১. সৎকর্মশীল মানুষ তৈরী করা : জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলির অন্যতম হ’ল সৎকর্মশীল মানুষ গড়ে তোলা । যদি আমরা এই বিষয়ে পবিত্র কুরআন এবং ছহীহ সুন্নাহ অধ্যয়ন করি, তাহ’লে আমরা এমন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যগুলি জানতে পারব যে, সে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী, তার প্রভুকে ভয় করে এবং তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। আল্লাহ বলেন,الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِي الصَّلَاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ‘আল্লাহর নাম স্মরণ করা হ’লে যাদের হৃদয় ভীত হয়, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে, ছালাত কায়েম করে এবং তাদেরকে আমরা যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে’ (হজ্জ ২২/৩৫)। তিনি আরো বলেন, ‘মুমিন কেবল তারাই, যখন তাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করানো হয়, তখন তাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’ (আনফাল ৮/২)।
আয়াতদ্বয়ে বর্ণিত ব্যক্তিরা হ’লেন সেইসব মুমিন যাদের জন্য শরী‘আত নাযিল হয়েছিল। আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ ‘তিনিই সেই সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মধ্যে তাদের মধ্য থেকেই একজনকে রাসূল হিসাবে প্রেরণ করেছেন। যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াত সমূহ পাঠ করেন ও তাদেরকে পবিত্র করেন। আর তাদেরকে কিতাব ও সুন্নাহ শিক্ষা দেন। যদিও তারা ইতিপূর্বে স্পষ্ট ভ্রান্তির মধ্যে ছিল’ (জুমু‘আহ ৬১/২)।
২. ইসলামী পরিবার গঠন করা :
একজন সৎ ব্যক্তি গঠনের পর জীবনের লক্ষ্য হ’ল একটি সৎ পরিবার গঠন করা। আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (তাহরীম ৬৬/৬)। আমরা পবিত্র কুরআনে পরিবারের সাথে সম্পর্কিত বিধান এবং শিষ্টাচার সম্বলিত অসংখ্য সূরা দেখতে পাই। যেখানে পরিবারের সাথে সম্পর্কিত কিছু বিধি-বিধান উল্লেখিত হয়েছে। যেমন পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী ইত্যাদির সাথে আচরণ। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন সূরায় পারিবারিক ব্যবস্থার প্রতি এলাহী নির্দেশনা সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, পরিবার হ’ল ইসলামী সমাজের ভিত্তি ও মূল। এটি ছাড়া এই সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
পারিবারিক জীবনের লক্ষ্য হ’ল নিম্নলিখিত স্তম্ভগুলির উপর ভিত্তি করে একটি ইসলামী পরিবার গড়ে তোলা:
ক. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অধিকার ও কর্তব্যের উত্তম বিনিময়। আল্লাহ বলেন,وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ، ‘আর স্বামীদের উপর স্ত্রীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে’ (বাক্বারাহ ২/২২৮)। আর কর্তব্য পালন, অধিকার পূরণ এবং লালন-পালনের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া।
খ. স্বামীর উপর পরিবারের অভিভাবকত্ব, তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ: আল্লাহ বলেন,الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ، ‘পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক। এজন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যকে প্রাধান্য দান করেছেন এবং এজন্য যে, তারা (নারীদের ভরণ-পোষণের জন্য) তাদের মাল-সম্পদ হ’তে ব্যয় করে থাকে’ (নিসা ৪/৩৪)।
গ. স্ত্রীকে ঘরের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করা: হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। যেমন শাসক তার জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। একজন পুরুষ তার পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল, সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর গৃহের এবং তার সন্তানের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর ক্রীতদাস আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে ঐ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই স্ব স্ব অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে’ (أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ) ।[1]
ঘ. পিতামাতার কর্তব্য হ’ল তাদের সন্তানদের যত্ন নেওয়া, সঠিক আদর্শ এবং তাদের নীতি ও জাতির ঐতিহ্যের প্রতি তাদের চরিত্র গড়ে তোলা, তাদেরকে বিশ্বাস, সৎকর্ম এবং সদগুণ দিয়ে ঘিরে রাখা, তাদের চারপাশের প্রভাব মোকাবেলায় দৃঢ় থাকা, মিথ্যার কাছে পরাজিত না হওয়া অথবা মিথ্যা বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতের দ্বারা দুর্বল না হওয়া। আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ، وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللهَ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহে খেয়ানত করো না। আর জেনে রাখ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষার বস্ত্ত মাত্র। বস্ত্ততঃ আল্লাহর নিকটে রয়েছে মহা পুরস্কার’ (আনফাল ৮/২৭-২৮)।
৩. সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করা :
জীবনের তৃতীয় লক্ষ্য হ’ল একটি সৎ ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সেটা এমন সমাজ যা আল্লাহর আদেশে প্রতিষ্ঠিত, যা তাঁর সীমানা সমুন্নত রাখে, যা এই পৃথিবীকে আখেরাতের জন্য একটি ক্ষেত্রে পরিণত করে, যার সদস্যরা সম্প্রীতি ও সদ্ভাবের বন্ধনে আবদ্ধ, যাদের হৃদয় ঐক্যবদ্ধ এবং যাদের প্রচেষ্টা আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য একত্রিত। যেখানে আল্লাহর দ্বীন প্রকাশ পায় এবং তাঁর কালিমা সুউচ্চ হয় এবং অবিশ্বাসীদের বাক্য অবনত হয়।
আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যারা তাদের দায়িত্ব পালন করে তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী করবেন, তাদের জন্য তাদের দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাদের ভয়কে নিরাপত্তায় পরিবর্তন করে দিবেন। তিনি বলেন,وَعَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্মসমূহ সম্পাদন করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতা প্রদান করবেন, যেমন তিনি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদেরকে। আর তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে যা তিনি তাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি অবশ্যই তাদের ভয়-ভীতিকে নিরাপত্তায় বদলে দিবেন। (শর্ত হ’ল) তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপরে যারা অবাধ্য হবে তারাই হবে পাপাচারী’ (নূর ২৪/৫৫)।
আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহ এই সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা নির্দেশ করে। আল্লাহ বলেন, هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর রাসূল-কে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীন সহকারে। যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারেন। যদিও অংশীবাদীরা এটি অপসন্দ করে’ (ছফ ৬১/৯)। অন্যত্র তিনি বলেন,كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْرًا لَهُمْ مِنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎকাজের আদেশ দিবে ও অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখবে। যদি আহলে কিতাবগণ ঈমান আনত, তাহ’লে সেটা তাদের জন্য কল্যাণকর হ’ত। তাদের কিছু লোক মুমিন ও অধিকাংশ ফাসেক’ (আলে ইমরান ৩/১১০)। অর্থাৎ আল্লাহ এই জাতিকে সৃষ্টি করেছেন কেবল তাঁর উপর ঈমান আনার জন্য, তাঁর দিকে অন্যদের ডাকার জন্য, সৎকাজের আদেশ দেওয়ার জন্য এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করার জন্য।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা কুরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত এই আদর্শ সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ তুলে ধরতে পারি:
(ক) আক্বীদা সংশোধন : এটি আল্লাহ, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, শেষ দিবস, তাক্বদীর বিশ্বাসের মাধ্যমে এবং ইবাদত ও লেনদেনের ক্ষেত্রে এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলির মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন,لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ، ‘পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফেরানোটাই কেবল সৎকর্ম নয়, বরং প্রকৃত সৎকর্মশীল ঐ ব্যক্তি, যে বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহর উপর, ক্বিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাগণের উপর, আল্লাহর কিতাব সমূহের ও নবীগণের উপর’ (বাক্বারাহ ২/১৭৭)। হাদীছে এসেছে, একদিন রাসূল (ছাঃ) লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ঈমান কি? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর দর্শন ও পুনরুত্থানের উপর ঈমান আনবে’।[2]
(খ) রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ :
পবিত্র কুরআন হ’ল আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো জীবন বিধান, আর রাসূল (ছাঃ) হ’লেন সেই বিধানের জীবন্ত নমুনা। কিভাবে ছালাত পড়তে হবে, কিভাবে মানুষের সাথে লেনদেন করতে হবে, পরিবার ও সমাজে কিভাবে চলতে হবে এই সবকিছুর নিখুঁত উদাহরণ তাঁর জীবনে পাওয়া যায়।
মুসলিমের জীবনে ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম। তবে সেই ইবাদত হ’তে হবে রাসূল (ছাঃ)-এর দেখানো পথ ও পদ্ধতি অনুসারে। তাঁরই আদর্শ অনুসারে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ, তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে’ (আহযাব ৩৩/২১)। অর্থাৎ একজন মুসলিমের জীবনের লক্ষ্য হ’তে হবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদর্শে নিজের জীবন গঠন করা। তাঁর চরিত্র, জীবনদর্শন, দাওয়াহ, ইবাদত, পারিবারিক ও সামাজিক আচরণ সবকিছুই আমাদের অনুসরণীয়। তার সুন্নাহ অনুসরণ ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়।
(গ) নৈতিক ও চারিত্রিক উৎকর্ষ অর্জন :
ইসলাম শুধু কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে উত্তম চরিত্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই একজন মুসলিমের চরিত্র হবে তার ঈমানের প্রতিচ্ছবি। সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, দয়া, বিনয় ও ধৈর্য প্রভৃতি গুণাবলী অর্জন করা জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে নৈতিকতায় সর্বশ্রেষ্ঠ’।[3] ‘পরকালে ভালো আমলের পাললা ভারী করার জন্য উত্তম চরিত্রের কোন বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে কোন বস্ত্তই অধিক ভারী হবে না’।[4] একজন মুসলিমের আচরণ এমন হওয়া উচিত, যা দেখে অন্যেরা শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করে। তার কথা ও কাজে মিল থাকবে এবং তার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সুন্দর চরিত্রই ইসলামের নীরব দাওয়াত।
(ঘ) ইসলামী ভ্রাতৃত্ব স্থাপন :
আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ، ‘মুমিনগণ পরস্পরে ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দু’ভাইয়ের মধ্যে সন্ধি করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও’ (হুজুরাত ৪৯/১০)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘এক মুমিন আপর মুমিনের জন্যে প্রাচীর, যার একাংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে থাকে। এই বলে তিনি তাঁর হাতের আঙগুলগুলো একটার মধ্যে আরেকটা প্রবেশ করালেন’।[5]
(ঙ) মানবতার কল্যাণে কাজ করা :
সমাজসেবা এবং মানুষের উপকার করাও ইবাদতের অংশ। একজন মুসলিম শুধু নিজের জন্য কাজ করে না, বরং সমাজ ও মানবতার কল্যাণ সাধনও তার জীবনের একটি বড় লক্ষ্য। যেমন- দরিদ্রকে সাহায্য করা, প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর রাখা, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ইত্যাদি। একজন মুসলিম বিশ্বাস করে যে, সৃষ্টির সেবা করার মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা যায়। সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা তার ঈমানী দায়িত্ব। ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালন ছাড়া জীবন অপূর্ণাঙ্গ থেকে যায়।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পারস্পরিক সহানুভূতি ও ভালোবাসাকে ঈমানের অংশ বলেছেন। যেমন তিনি বলেন,لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হ’তে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পসন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পসন্দ করে’।[6] এটিই সেই সৎ সমাজ যার সদস্য এবং পরিবার ইসলামের সর্বোচ্চ মূল্যবোধ এবং আদর্শ নীতির সাথে আবদ্ধ, যা এটিকে একটি জীবন্ত বার্তা করে তোলে। এটিই জীবনের তৃতীয় উদ্দেশ্য। এটিই সেই লক্ষ্য যা অর্জনের জন্য আমাদের যথাযথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। যদি আমরা এটিকে অবহেলা করি, তাহ’লে অন্যায় ব্যাপক আকার ধারণ করবে, বিরোধ দেখা দেবে, বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে যাবে, অবিচার ছড়িয়ে পড়বে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং আল্লাহর ক্রোধ তাঁর বান্দাদের উপর নেমে আসবে, যা আকাশ থেকে রহমত রোধ করবে। এরপর মানুষ সংকটের সম্মুখীন হবে, যার পরবর্তী সংকটের দিকে পরিচালিত করবে, সমাজে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অথবা স্বাস্থ্যগত সংকট ইত্যাদি দেখা দেবে।
৫. পরকালীন মুক্তির প্রস্ত্ততি :
মুসলিম জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হ’ল পরকালীন জীবনে মুক্তি বা জান্নাত লাভ করা। দুনিয়ার জীবন পরকালের জন্য প্রস্ত্ততি নেওয়ার ক্ষেত্র মাত্র। আল্লাহ বলেন,كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ، ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই-ই হবে সফলকাম। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন ধোঁকার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়’ (আলে ইমরান ৩/১৮৫)।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা প্রথমেই বলে দিয়েছেন মৃত্যুর কথা যা হ’তে পরিত্রাণের কোন পথ নেই। সকলকেই এর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আর সে দুনিয়াতে ভাল-মন্দ যা-ই করুক তাকে তার পরিপূর্ণ প্রতিদান পরকালে দেওয়া হবে।
প্রকৃত সফলতা তারাই অর্জন করতে পারবে যারা দুনিয়াবী জীবনে স্বীয় প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করেছে, ফলে তাকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আর এটাই হবে প্রকৃত সফলতা।
এই বিশ্বাস একজন মুসলিমকে দায়িত্বশীল বানায়। সে মনে রাখে যে, দুনিয়ার প্রতিটি কাজের জন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এই জীবনের আরাম-আয়েশ, সম্পদ ও ক্ষমতা সবই অস্থায়ী এবং একটি পরীক্ষা মাত্র। তাই সে তার সময়, সম্পদ ও যোগ্যতা এমনভাবে ব্যবহার করে, যা তার পরকালীন জীবনে সাফল্যের কারণ হবে। এই জবাবদিহিতার অনুভূতি তাকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করে। দুনিয়ার সব ব্যস্ততার মাঝেও তার মূল লক্ষ্য বা চূড়ান্ত গন্তব্য থাকে আখিরাত। তাই একজন মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জান্নাত অর্জনের জন্য ব্যয় করা।
মোদ্দাকথা হ’ল, এই পাঁচটি লক্ষ্য একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাওহীদের বিশ্বাস থেকেই বাকী সবগুলো উৎসারিত হয় এবং পরকালীন মুক্তির আশা সবগুলোকে অর্থবহ করে তোলে।
জীবনের লক্ষ্য অর্জনে যেমন ছিলেন ছাহাবায়ে কেরাম :
জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনে ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ছিলেন এক অতুলনীয় আদর্শ। তাঁদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালীন জীবনে সফলতা লাভ করা। এই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করেই তাঁদের প্রতিটি কাজ, চিন্তা ও অনুভূতি আবর্তিত হ’ত।
তারা পার্থিব জীবনের মোহ ত্যাগ করে পরকালীন জীবনের জন্য প্রস্ত্ততি নিতেন এবং পরকালীন জীবনকেই সবসময় প্রাধান্য দিতেন। তারা জান্নাত লাভের আশায় নেক আমল করতেন। তাদের জীবন ছিল কুরআন ও সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন পর্যন্ত সবকিছুই কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালনা করতেন।
তারা ইসলামকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তারা যেখানেই গিয়েছেন, ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মানুষকে সৎ পথের দিকে আহবান করেছেন। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের আরাম-আয়েশ, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করতেও কুণ্ঠিত হননি। তাদের এই ত্যাগ ও কুরবানী ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তারা সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতেন এবং বাতিলের সাথে কখনো আপোস করতেন না। তারা ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এবং ন্যায় ও ইনছাফের প্রতীক।
তাঁরা দুনিয়াকে প্রয়োজন পূরণের স্থান মনে করতেন, কিন্তু একে কখনো অন্তরে স্থান দেননি। তাঁদের কাছে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ছিল খুবই তুচ্ছ। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এই জীবন পরকালের জন্য প্রস্ত্ততি নেওয়ার একটি পরীক্ষাগার মাত্র। তাই তাঁরা সম্পদ উপার্জন করেছেন, কিন্তু এর দাস হননি। ক্ষমতা লাভ করেছেন, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল আখিরাতের পুঁজি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। অর্ধ পৃথিবীর খলীফা ওমর (রাঃ)-এর জীবনপরিক্রমা এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আল্লাহর দ্বীনের জন্য ছাহাবীগণ জান, মাল, সময়, পরিবার সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্ত্তত ছিলেন। দ্বীনের প্রয়োজনে তাঁরা যেমন মক্কার ঘরবাড়ি ছেড়ে হিজরত করেছেন, তেমনি বদর, ওহোদ ও খন্দকের মতো কঠিন যুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছেন। আবুবকর (রাঃ) তাবুক যুদ্ধের সময় তাঁর সর্বস্ব দান করে দিয়েছিলেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির বিপরীতে তাঁদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু ছিল মূল্যহীন।
তাঁরা জীবনের লক্ষ্য অর্জনের যাত্রায় একা চলেননি, বরং একতাবদ্ধ হয়ে একটি আদর্শ সমাজ গঠন করেছিলেন। রাসূল (ছাঃ) যখন মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনছারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে দেন, তখন আনছার ছাহাবীগণ নিজেদের সম্পদ ও বাড়ির অর্ধেক পর্যন্ত মুহাজির ভাইদের জন্য উৎসর্গ করে দেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাঁরা একে অপরের দুঃখে সমব্যথী এবং সুখে আনন্দিত হ’তেন। সমাজের দুর্বল, ইয়াতীম ও বিধবাদের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ ছিল প্রবাদতুল্য।
ছাহাবীগণ জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনে এমন এক সোনালী প্রজন্ম ছিলেন, যাঁদের ঈমান ছিল পর্বতের মতো অটল, রাসূলের (ছাঃ) প্রতি আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত, দুনিয়ার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নির্মোহ এবং দ্বীনের জন্য ত্যাগ ছিল সর্বোচ্চ। তাঁদের জীবনের একমাত্র সাধনাই ছিল এমনভাবে জীবনযাপন করা, যেন মৃত্যুর পর আল্লাহর সামনে একজন সফল বান্দা হিসাবে দাঁড়াতে পারেন।
উপসংহার :
পরিশেষে বলব, একজন মুসলিমের জীবন একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। এর ভিত্তি হ’ল আল্লাহর একত্ববাদ, চালিকাশক্তি হ’ল রাসূল (ছাঃ)-এর অনুসরণ, সৌন্দর্য হ’ল উত্তম চরিত্র, কর্মক্ষেত্র হ’ল সমাজ ও মানবতা এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য হ’ল পরকালীন মুক্তি। এই সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই মুসলিম জীবনকে অর্থবহ, প্রশান্তিময় ও সফল করে তোলে। ফলে দুনিয়ার জীবনে কষ্ট বা সংগ্রামের মুখোমুখি হ’লেও সে ভেঙে পড়ে না। কারণ সে জানে তার প্রতিটি চেষ্টার পেছনে রয়েছে এক মহৎ উদ্দেশ্য এবং এর প্রতিদান তিনি আল্লাহর কাছে পাবেন। তার হৃদয় থাকে স্থির এবং আত্মা থাকে তৃপ্ত। সুতরাং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন জীবন কেবল একটি ব্যর্থ জীবনই নয়, বরং এটি মানুষের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। প্রকৃত সফলতা ও শান্তি নিহিত আছে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর নির্দেশনাকে ধারণ করে একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপনের মধ্যে। অতএব দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে যেন আমরা কাজে লাগাই। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন-আমীন!
-মুহাম্মাদ রাফাত আনাম
শিক্ষার্থী, ইইই বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
[1]. বুখারী হা/২৫৫৬; মুসলিম হা/১৮২৯; মিশকাত হা/৩৬৮৫।
[2]. বুখারী হা/৪৭৭৭, ৫০; মুসলিম হা/৮; মিশকাত হা/১।
[3]. বুখারী হা/৩৫৫৯; মুসলিম হা/৮; মুসলিম হা/২৩২১।
[4]. তিরমিযী হা/২০০২; সনদ ছহীহ।
[5]. বুখারী হা/৪৮১, ৬০২৬; মুসলিম হা/২৫৮৫; মিশকাত হা/৪৯৫৫।
[6]. বুখারী হা/১৩; মুসলিম হা/৪৫; মিশকাত হা/৪৯৬১।