অভিভাবক হিসাবে আমরা আমাদের সন্তানদের কল্যাণ চাই। কল্যাণকামিতায় আমরা সকলেই এক। তবে এই কল্যাণ কতদিনের জন্য হবে বা এটা কেমন পরিসরে হবে সেটা নির্ধারণে আমরা বিভিন্ন চিন্তাধারা লালন করি। কেউ হয়ত শুধু কর্মজীবন পর্যন্ত কল্যাণ চান। কেউ চান দুনিয়াবী জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। কেউ আবার দুনিয়া আখেরাত উভয় জীবনে কল্যাণ চান। এই তিন ধরণের চাওয়ার মধ্যে যারা সন্তানের উভয় জীবনে সার্বিক কল্যাণ চান তারাই প্রকৃতপক্ষে আদর্শ অভিভাবক।
সন্তানের সার্বিক কল্যাণের চিন্তা করে অনেকেই সন্তানকে দ্বীনী জ্ঞান শিক্ষা দেন। এটাই আপাতত সহজ, পরীক্ষিত এবং নির্ভুল পথ। এছাড়া যারা ভিন্ন পথে চলেছেন তাদেরকে আমরা একসময় আফসোস করতে দেখেছি। অনেকেই একটা সময় নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন। আবার অনেকে এই অজ্ঞতার মাঝেই জীবনের সফলতা খুঁজে নিয়েছেন। তাদের বিষয়ে আমরা কথা বলব না। আমরা আজ ঐসকল অভিভাবকের বিষয়ে কথা বলব, যারা সঠিক রাস্তায় এসেও নিজেদের ভুলের কারণে ব্যর্থ হচ্ছেন। আমরা তাদের সমীপে কিছু দিকনির্দেশনা রাখব। যা তাদের সফল অভিভাবক হ’তে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।
নিয়তের পরিশুদ্ধতা : সন্তানকে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার অর্থই তাকে আমি ‘ইলমে অহি’ শিক্ষা দিতে চাই। এই দুনিয়ায় কোন কাজই উদ্দেশ্য ছাড়া সাধিত হয় না। ঠিক তেমনই ইলমে অহি-র শিক্ষাও উদ্দেশ্যহীন হ’তে পারে না। এর একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। আর তা হ’ল, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার উদ্দেশ্যে এই জ্ঞানকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং অপরকে এই জ্ঞান পৌঁছে দেয়া। এই উদ্দেশ্যের বাইরে যা কিছু কামনা করা হোক না কেন সে উদ্দেশ্যে ‘ইলমে অহি’র অর্জন মুখ থুবড়ে পড়বে। অভিভাবকও নিজ উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হবেন। সন্তানও তার জীবনে সফলতার দেখা পাবে না।
সুতরাং অভিভাবক হিসাবে আমি প্রথমেই আমার নিয়তকে পরিশুদ্ধ করব। বিভিন্ন আলেমের দুনিয়াবী যশ-খ্যাতি দেখে যদি সন্তানকে দ্বীনী প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে থাকি তবে সেখান থেকে তওবা করব। কারণ ইলমে দ্বীন দুনিয়াবী যশ লাভের মাধ্যম নয়। হ্যা, আল্লাহ যদি আমার সন্তানকে যশ-খ্যাতি, সম্পদ দান করেন তবে সেটা ভিন্ন বিষয়। এটা তার রিযিকের নির্ধারিত বিষয়। আমার পরিশুদ্ধ নিয়তের মাঝে এগুলো কখনো স্থান নিতে পারবে না। যদি আমার নিয়ত এমন না হয় তবে আমি আদর্শ অভিভাবক হ’তে পারব না।
আমার নিয়তকে শুদ্ধ করার পাশাপাশি সন্তানকেও আমি এই শিক্ষা দেব যে, হে আমার আদরের সন্তান! মনে রাখবে, রিযিক্বের পরিমাণ আসমানে নির্ধারিত হয়। এটার পেছনে ছুটে বেড়ানো মানুষের কাজ নয়। মানুষকে আল্লাহ দুনিয়ায় তাঁর ইবাদতের জন্য প্রেরণ করেছেন। আর রিযিক্বের দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেছেন। ইবাদতই মানুষের জীবনের মুখ্য কাজ। বাকি সবকিছু এটাকে আরো সবল করার উদ্দেশ্যে করা হয়। অর্থাৎ তুমি খাবার গ্রহণ করবে যেন সেখান থেকে তুমি ইবাদতের শক্তি পাও। তুমি ঘুমাবে যেন ইবাদতের জন্য তুমি রাত্রি জাগরণ করতে পার। তুমি টাকা উপার্জন করবে যেন পারিবারিক সমস্যা তোমার ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে। এই চিন্তাধারা যদি আমি সন্তানের মাঝে দিতে ব্যর্থ হই তবে আমার সকল পরিশ্রম ব্যর্থ হবে।
আমি আমার সন্তানকে বলব, ‘হে আমার ছেলে! আমি তোমকে বড় আলেম বানাতে চাই। তুমি বড় হয়ে দ্বীনের পথে কাজ করবে। তোমাকে দুনিয়াবী কোন কিছু বানানো আমার উদ্দেশ্য নয়। তুমি লেখাপড়া শিখে অনেক অর্থ উপার্জন করবে, এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং তুমি মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য তোমার জীবনকে উৎসর্গ করবে। তোমার কাছ থেকে আর্থিকভাবে আমরা উপকৃত হ’তে চাই না। কারণ আমাদের তাক্বদীরে লিপিবদ্ধ রিযিক্ব আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আমরা তোমার কাছে ছওয়াবের মাধ্যমে উপকৃত হ’তে চাই। আমরা যখন দুনিয়া থেকে চলে যাব তখন তুমি আমাদের জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়া হিসাবে পরিগণিত হবে। তোমার সৎ আমলের কারণে আমরা হাশরের ময়দানে সম্মানিত হব। এতটুকুই আমাদের চাওয়া। যদি অভিভাবক ও সন্তান উভয়ের চিন্তাধারা এমন হয় তবে আল্লাহর রহমতে তারা সফল হবে- ইনশাআল্লাহ।
নিজেদের জীবন ইসলামী অনুশাসনে পরিচালনা করা : একজন হাফেয বা আলেমের পিতা-মাতা হওয়ার জন্য কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন আছে। আল্লাহ এমনিতেই আমাদেরকে হাশরের ময়দানে সম্মানিত করবেন না। এজন্য আমাদের নিজেদের জীবনও ইসলামী অনুশাসনের মাঝে পরিচালিত হ’তে হবে। কারণ ইসলামী বিধি-বিধান মানার যে গুরুত্ব রয়েছে তা সন্তান পিতা-মাতাকে দেখেই শিখে। কিন্তু আমাদের পরিবারের মাঝেই যদি ছালাতের গুরুত্ব না থাকে, পর্দার বিধান না থাকে, হালাল-হারামের প্রতি গুরুত্বারোপ করা না হয় তবে আমাদের সন্তান ছোট থেকেই এগুলো হালকাভাবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
সে হয়তো আলেম হবে, কিন্তু ছালাত আদায় করবে না। হালাল-হারাম মানবে না। পর্দা মেনে চলবে না। মোটকথা সে যতই মেধাবী হোক না কেন সে আমলকারী আলেম হয়ে গড়ে উঠবে না। আর এর জন্য দায়ী হব আমরা। ফলে আমাদের সন্তান আমাদের জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়ার মাধ্যমও হবে না। আমরা দুনিয়াতে ক্ষতিস্ত হব, আখেরাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হব। এজন্য সন্তানকে দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত করে আমলকারী আলেম হিসাবে গড়ে তুলতে নিজ পরিবারে ইবাদতের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
শিক্ষকগণের প্রতি আচার-ব্যবহার : শিক্ষকগণ আমাদের সন্তানদের পথপ্রদর্শক। শিক্ষকগণ তাদের যে পথে পরিচালিত করবেন, তারা সে পথেই পরিচালিত হবে। কোনটি ভাল, কোনটি মন্দ ইত্যাদির জ্ঞান তারা শিক্ষকগণের কাছেই পায়। আমি যত বড়ই জ্ঞানী হই না কেন, আমি আমার সন্তানের সামনে একজন বাবা বা মা। আমি তার কাছে কখনোই শিক্ষকের ভূমিকায় আসতে পারি না। সন্তান আমার কাছে শিখতে চায় না। সুতরাং শিক্ষক আমার সন্তানকে যে শিক্ষা দান করছেন এটা আমার ও সন্তানের প্রতি তার অনুগ্রহ। এটা সব সময় মনে রাখতে হবে।
এই অনুগ্রহের দিকে লক্ষ্য করে হ’লেও আমাকে শিক্ষকের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করতে হবে। কখনোই তিনি আমার কাছে ছোট নন। তিনি আমার সন্তানের শিক্ষক। এখন আমি যদি তাকে আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে অসন্তুষ্ট করি তবে এর একটি কুপ্রভাব আমার সন্তানের ওপর পড়বে। তিনি আমার সন্তানকে পড়ানোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। কারণ তিনি আমার মতই মানুষ। রাগ-ক্ষোভ তারও রয়েছে। এগুলো কারণে হয়তো আমার সন্তান ইলমে দ্বীন থেকে মাহরূম হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এই বিষয়গুলো খুব খেয়াল করতে হবে।
সন্তানের খোঁজ-খবর রাখা : রাস্তায় চলাচলের সময় আমরা সাবধানতার সাথে রাস্তা অতিক্রম করি। যেন কোন যানবাহনের সাথে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনার শিকার না হই। আমরা কিন্তু সেখানে বলি না যে ‘গাড়ীর চালক তো দেখে চালাচ্ছেন, সুতরাং আমি নিশ্চিন্ত’। সেখানে আমি নিজের সুরক্ষা নিজেই নিশ্চিত করি। কারণ আমি জানি, চালক যদি ভুলে আমার শরীরের ওপর চাপিয়ে দেয় তবে সে ভুল করবে। এই ভুলের জন্য তার শাস্তি হবে, জরিমানা হবে। তবে আমি যে জীবনটা হারাব সেটার ক্ষতিপূরণ হবে না।
ঠিক তেমনই আমার সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দেয়ার পরে যদি আমি মনে করি, এখন থেকে সব দায়িত্ব শিক্ষকের, তবে কখনো যদি শিক্ষক তার দায়িত্বে অবহেলা করেন তবে তিনি ভুল করবেন। এই ভুলের জন্য হয়তো তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নেয়া হবে। তবে আমার যে ক্ষতি হয়ে যাবে তার ক্ষতিপূরণ সম্ভব হবে না। এজন্য সন্তান লেখাপড়া করছে কি-না, তার চারিত্রিক অবস্থা কেমন এগুলো বিষয়ে আমাকেই খোঁজ নিতে হবে। শুধু শিক্ষকের ওপর সমস্ত দায়িত্ব চাপিয়ে নিজে হালকাবোধ করার কোন সুযোগ নেই।
সন্তানের খোঁজ-খবর রাখা অবশ্যই শিক্ষকের মাধ্যমেই হ’তে হবে। অন্যথায় তিনি সন্তানের বিষয়ে দেখ-ভাল করা কমিয়ে দিবেন। সন্তানের ভাল-মন্দের পরামর্শ তার সাথেই করতে হবে। যেন তার এমন মনে হয় যে, অভিভাবক হিসাবে আমি বেশ সচেতন এবং তার সাথে পরামর্শ করেই আমি সন্তানকে পরিচালনা করি। তাহ’লে দেখা যাবে, আমার সন্তানের প্রতি তার সুনযর সৃষ্টি হবে। যা একজন ছাত্রের জন্য বেশ উপকারী।
প্রতিষ্ঠানের নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া : প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বেতন প্রদান, ছুটি, পরীক্ষা সংক্রান্ত ইত্যাদি বিষয়ে কিছু নিয়ম রয়েছে। সে নিয়মগুলোর সবই যে আমার কাছে যৌক্তিক মনে হবে এমন নয়। কিছু নিয়ম আমার কাছে অযৌক্তিকও মনে হ’তে পারে। তবে কখনোই আমি কোন নিয়মকে ছোট করে দেখব না। হ’তে পারে আমি এমন সেক্টরে কখনো কাজ করিনি বলেই এর প্রয়োজনীয়তা বুঝছি না। আবার এমনও হ’তে পারে যে, আমি একই সেক্টরে কাজ করি তবে আমার প্রতিষ্ঠান এবং এই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশে পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং নিজের অজ্ঞতা মেনে নিয়েই প্রতিষ্ঠানের নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হ’তে হবে।
বিশেষত আমি যদি আমার সন্তানের প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন দায়িত্বশীল হই, তবে আমাকে নিয়মের প্রতি আরো বেশী শ্রদ্ধাশীল হ’তে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের নিয়মগুলো কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না। নিয়ম বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে পদক্ষেপই গ্রহণ করা হোক না কেন, তা পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ হবে। চাপা সমালোচনার শিকার হবে। আমি তো অভিভাবক হিসাবে আমার সন্তানের অকল্যাণ চাই না, আবার প্রতিষ্ঠানেরও অকল্যাণ চাই না। তবে কেন আমি উভয়কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেব? এই বিষয়গুলো সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে।
সন্তানকে গুনাহের পরিবেশ ও উপকরণ থেকে রক্ষা করা : সন্তানকে দ্বীনী শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে সন্তান দ্বীনী জ্ঞান ধারণের উপযুক্ত পাত্র হয়ে গড়ে উঠছে কি-না এটা খেয়াল রাখা খুবই দরকার। কারণ কুরআন-হাদীছের জ্ঞান আল্লাহ কোন গুনাহগারকে দান করেন না। আমরা খেয়াল করে দেখি, আমাদের সন্তান কুরআন-হাদীছ সংক্রান্ত জ্ঞানগুলো অর্জন করতে পারে না। তারা মুখস্থ করে, তবে মনে রাখতে পারে না। বাইরের শিক্ষক রেখেও তাদেরকে পড়াগুলো ষোলআনা বোঝানো যায় না। তখন আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। আমরা তাদেরকে আরো পড়ার চাপ দিতে থাকি।
তবে সমস্যা যেখানে, সেখানে হয়তো আমাদের গুরুত্ব পৌঁছাতে পারে না। ঘরে বা বাইরে আমাদের সন্তানদের চোখের হিফাযত হয় না। তাদের কান বাদ্যযন্ত্র থেকে নিরাপদ নয়। তাদের মস্তিষ্ক অপবিত্র চিন্তার নোংরা গুদাম। তবে তাদের মস্তিষ্কে কিভাবে পবিত্র ইলমের জায়গা হবে! সেটা তো প্রতিনিয়ত অপবিত্র অবস্থায় রয়েছে। এদিকে আমার ধারণা হ’ল, বর্তমানের ছেলে-মেয়েরা উঠতি বয়সে স্মার্টফোনের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তবে আমার ছেলে-মেয়ে ব্যতীত। তারা এমন নয়, তারা খুব ভাল। মনে রাখবেন, সকল অভিভাবকই তাদের সন্তানদের এমনই মনে করেন। পরে যখন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তখন বুক চাপড়াতে থাকেন। দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত সকলেই নিষ্পাপ থাকে। সুতরাং সন্তানদের গুনাহ থেকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। অন্যথায় আমাদের পরিশ্রম বৃথা যাবে।
সন্তানকে আদব শিক্ষা দেওয়া : সন্তানকে আদব শেখানো আমাদের দায়িত্ব। বড়দের সাথে তার আচরণ কেমন হবে, শিক্ষকের সাথে তার কথা-বার্তা কেমন হবে, বন্ধুদের সাথে সে কিভাবে ওঠা-বসা করবে এগুলো বিষয় শিক্ষাদান করা আমাদের কর্তব্য। আমি যদি তাকে শিক্ষকের প্রতি, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে না পারি, তবে সে তাদের সাথে ভাল আচরণ করতে পারবে না। এটাই স্বাভাবিক। এজন্য পারিবারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া এবং সেখানে খুব ভালভাবে আদব শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি বে-আদবী সহ্য করতে পারতেন না। বে-আদবী দেখলেই শাস্তি দিতেন। অন্যান্য সকল অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দিতেন। তার যুক্তি এমন ছিল যে, একজন শিক্ষার্থীর পড়া না হ’তেই পারে। হয়তো তার মেধা কম। একজন শিক্ষার্থী ক্লাস টাইমে ঘুমাতে পারে। হয়তো সে শারীরিকভাবে দুর্বল। তবে একজন শিক্ষার্থী বে-আদব হ’তে পারে না। কারণ, আদব রক্ষা করার জন্য না মেধার দরকার আছে, না শারীরিকভাবে সবল হওয়ার প্রয়োজন আছে। সুতরাং বে-আদবী কখনোই মানা যায় না।
প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও সুনামকে আমানত মনে করা : সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানোর সুবাদে অভিভাবক হিসাবে আমিও প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানে যেমন আমার সন্তানের আসা-যাওয়া রয়েছে, তেমনই আমারও এখানে ওঠা-বসা আছে। আমি যখন এই প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করেছি, তখন এই প্রতিষ্ঠানকে সেরা বিবেচনায় ভর্তি করেছি। পরবর্তীতে যদি কখনো তাদের কোন নিয়ম আমার কাছে অপসন্দ হয় বা আমার সন্তান সেখানে পড়াশোনা করতে ব্যর্থ হয় তখন প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম করার অধিকার আমার নেই। হয়তো এখানে এমন কোন ভেদ রয়েছে, যা বুঝতে আমি সক্ষম নই। অথবা উভয় পক্ষেরই কোন ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। অথবা আমার সন্তানের কোন ভুল হয়েছে তা মমত্ববোধের গাঢ় পর্দা ভেদ করে আমার কাছে প্রকাশিত হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে দ্বীনী স্বার্থকে সামনে রেখে আমরা কখনোই প্রতিষ্ঠানের দুর্নাম করব না।
কখনো যদি মনে হয়, আমার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তবে সেই কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকব। প্রতিষ্ঠানের সাথে আমার চোর-পুলিশের সম্পর্ক নয়। এমন নয় যে, প্রতিষ্ঠান আমার কাছে যতটুকু প্রদেয় আদায় করতে সক্ষম হবে ততটুকুই আমি প্রদান করব। বেতন চাইলে আমি দেব, অন্যথায় আমি বেঁচে যাব। সামর্থ্য থাকার পরেও বেতন মওকূফের আবেদন নিয়ে পিড়াপিড়ি করব। এমন ছোট মানসিকতা যেন আমার না থাকে। বরং আমি থাকব প্রতিষ্ঠানের কল্যাণকামী। বেতন দেব, পারলে নফল ছাদাক্বাও করব।
আমার সন্তান যদি প্রতিষ্ঠানের বো©র্র্ডংয়ে খাবার খায় এবং সেখানে যদি অভিভাবকের আপ্যায়নের ব্যবস্থা না থাকে তবে আমি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত সিস্টেম ছাড়া বোর্ডিংয়ের খাবার গ্রহণ করব না। কারণ আমি শুধু আমার সন্তানের খাবারের প্রদেয় প্রদান করি। আমি সেই সুবিধাগুলো গ্রহণ করব না যেগুলো বেতনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান আমার সন্তানকে প্রদান করে থাকে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে যদি অভিভাবকদের জন্য এই সুবিধাগুলো প্রদান করা হয় তবে সেটা ভিন্ন বিষয়।
আশাকরি, আলোচ্য প্রবন্ধে পূর্ণ রূপরেখা দিতে না পারলেও আদর্শ অভিভাবক হওয়ার জন্য মোটামুটি করণীয় ও বর্জনীয় কিছু বিষয় তুলে ধরতে পেরেছি। এই সবগুলো বিষয় যদি আমরা কর্মে বাস্তবায়ন করতে পারি তবে আমরা আদর্শ অভিভাবক হ’তে পারব ইনশাআল্লাহ। আমরা যতটুকু আদর্শ হব, আমাদের সন্তানরাও ততটুকুই আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠবে। তাই আসুন! সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য নিজেরা আগে সুপথে পরিচালিত হই। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন!