ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানবজীবনের প্রতিটি দিক নিয়ে বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছে। বিবাহ ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যাকে আল্লাহ তা‘আলা শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসার মাধ্যম হিসাবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামী শরী‘আতে সাধারণ বিধান হ’ল একজন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। তবে বিশেষ প্রেক্ষাপট, সামাজিক প্রয়োজন ও সুনির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে পুরুষদের জন্য সর্বোচ্চ চারটি বিবাহের অনুমতি রয়েছে। এই বিধানটি প্রায়শই আধুনিক সমাজে ভুল বোঝাবুঝি ও বিতর্কের জন্ম দেয়। তাই এর তাৎপর্য এবং শর্তাবলী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা আবশ্যক।
একাধিক বিবাহের বিধান :
আয়াতটির মূল উদ্দেশ্য হ’ল ইয়াতীম মেয়েদের সম্পদ ও অধিকার রক্ষা করা। আয়েশা (রাঃ)-এর ভগ্নী উরওয়াহ ইবনু যুবায়ের (রাঃ) তাঁকে উক্ত আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘হে ভাগ্নে! এই আয়াতটি সেই ইয়াতীম বালিকা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে, যে তার অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে থাকে এবং তার সম্পত্তিতে অংশীদার হয়। সেই অভিভাবক মেয়েটির সৌন্দর্য ও সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহ করতে চায়, কিন্তু তাকে অন্যান্য নারীদের মতো প্রচলিত ও ন্যায্য মোহরানা দিতে চায় না (অর্থাৎ কম মোহরে বিবাহ করে তার সম্পদ আত্মসাৎ করতে চায়)। আল্লাহ তা‘আলা উক্ত আয়াত নাযিল করে অভিভাবকদের নিষেধ করেছেন যে, তারা যেন ইনছাফের সাথে পূর্ণ মোহর দিয়ে সেই ইয়াতীমদের বিবাহ করে। যদি ইয়াতীমদের হক নষ্ট করার ভয় করে সেক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ, অন্য নারীদের মধ্য থেকে যাদের তোমরা ভাল মনে কর দুই, তিন বা চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে পার।[1]
এছাড়া আয়াতটিতে একজন পুরুষের জন্য একত্রে সর্বোচ্চ চারটি পর্যন্ত বিবাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে আয়াতে ‘বিবাহ করো’ (فَانْكِحُوا) শব্দটি দ্বারা আদেশটি উৎসাহ বা মুস্তাহাব (ندب) বোঝানোর জন্য আসেনি, বরং এটি বৈধতা বা অনুমতি (إباحة) বোঝানোর জন্য এসেছে। আয়াত নাযিলের প্রেক্ষাপটও প্রমাণ করে যে, এর উদ্দেশ্য একাধিক বিবাহে উৎসাহ দেওয়া বা মুস্তাহাব বলা নয়, বরং এটি একটি বৈধ ও উন্মুক্ত পথ একথা জানিয়ে দেওয়া।
আয়াতের শেষাংশে একাধিক বিবাহকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শর্তের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ভরণ-পোষণ, আবাসন, রাত্রি যাপন এবং অন্যান্য অধিকারের ক্ষেত্রে সকল স্ত্রীর মধ্যে সাধ্যমত সমতা ও ইনছাফ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদি কেউ আশঙ্কা করে যে, সে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, তবে তাকে কেবল একজনকেই বিবাহ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا‘এটাই অবিচার না করার অধিক নিকটবর্তী’ (অর্থাৎ এক স্ত্রীতে তোমাদের পক্ষপাতিত্ব না করার অধিকতর সম্ভাবনা রয়েছে)। যা দ্বারা এক স্ত্রী রাখাকে অধিকতর নিরাপদ ও উত্তম পথ হিসাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, وَالأَولَى أَنْ لاَ يَزِيدَ عَلَى امْرَأَةٍ وَاحِدَةٍ، ‘উত্তম হ’ল একজনের বেশী বিবাহ না করা’।[2]
উছায়মীন (রহঃ) বলেন, الِاقْتِصَارُ عَلَى الْوَاحِدَةِ أَسْلَمُ ‘একজন স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ থাকাই অধিক নিরাপদ’।[3]
উপরোক্ত আলোচনায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, একাধিক বিবাহ ইসলামে শর্তসাপেক্ষে অনুমোদিত। কোন ব্যক্তি ন্যায়-ইনছাফের ভিত্তিতে একাধিক বিবাহ করতে পারে। এতে কোন বাধা নেই।[4]
একাধিক বিবাহ অনুমোদনের তাৎপর্য :
ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমোদনের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটি ভোগ-বিলাসের কোন মাধ্যম নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় বিধান। এর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হ’লে তৎকালীন সামাজিক ব্যবস্থা এবং ইসলামের মূল লক্ষ্য উভয়কেই বিবেচনায় রাখা অপরিহার্য। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল, ইসলাম এই প্রথার উদ্ভাবক নয়। বরং ইসলাম আরব জাহানসহ বিশ্বের সর্বত্র প্রচলিত সীমাহীন, শর্তহীন এবং প্রায়শই যুলুমপূর্ণ বহুবিবাহকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনী ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে এনে সংস্কার করেছে, যার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিহিত রয়েছে। যেমন-
১. সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা প্রদান :
ইসলামে একাধিক বিবাহের অনুমোদনের প্রধান এবং সরাসরি প্রেক্ষাপট ছিল বিধবা ও ইয়াতীমদের সুরক্ষা। সূরা নিসার যে আয়াতে এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা নাযিল হয়েছিল ওহোদ যুদ্ধের পটভূমিতে। সেই যুদ্ধে অসংখ্য মুসলিম পুরুষ শহীদ হন। ফলে মদীনার বহু নারী বিধবা এবং শিশুরা ইয়াতীম হয়ে পড়ে। আর সেই সময়ে একজন নারীর জন্য স্বামী বা পিতা তথা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা এবং সামাজিক সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল। এমতাবস্থায় ইসলাম সচ্ছল ও সক্ষম পুরুষদেরকে এই বিধবা ও ইয়াতীমদের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছে। এই নারীদেরকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করা ছিল তাদের এবং তাদের সন্তানদের জন্য যেমন অর্থনৈতিক সাহায্য তেমনি সামাজিক মর্যাদা, আইনি অধিকার এবং পূর্ণাঙ্গ পারিবারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার সর্বোত্তম উপায়।
২. জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা :
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে (বিশেষত যুদ্ধ, মহামারী বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কাজের কারণে) সমাজে প্রায়শই পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। যদি সমাজে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশী হয় এবং প্রত্যেক পুরুষ কেবল একজনকেই বিবাহ করে, তবে বহু নারী অবিবাহিত থেকে যাবে। একাধিক বিবাহ এই ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান দেয়, যাতে প্রত্যেক নারী একটি পরিবার ও সামাজিক পরিচয় পেতে পারে।
৩. ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ :
কখনো কখনো ব্যক্তিগত বিশেষ পরিস্থিতি, যেমন স্বামীর জৈবিক চাহিদার আধিক্যের বিপরীতে স্ত্রীর অক্ষমতা, স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, যা তাকে দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম করে তোলে। এসব ক্ষেত্রে স্বামী যেন স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় বিবাহের মাধ্যমে নিজের প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন, ইসলাম সেই পথ খোলা রেখেছে। এর মাধ্যমে স্বামী একদিকে যেমন নিজের নৈতিকতা রক্ষা করতে পারেন, অন্যদিকে অসুস্থ স্ত্রীর ভরণপোষণ ও সম্মানজনক জীবন পরিচালনা নিশ্চিত করতে পারেন।
সন্তানরা অনেক সময় বাধা হয়ে দাড়ায় এবং পিতাকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়। যা তার প্রতি চরম অসম্মান ও অবাধ্যতার শামিল। বরং সন্তানরা যদি সহমর্মিতার সাথে পিতার সাথে আলোচনা করে এবং পিতার মানবিক প্রয়োজনের বিষয়টি অনুধাবন করে, তবে পরিবারে অশান্তি দূর হয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিবেশ বজায় থাকে।
৪. বংশ রক্ষা ও পারিবারিক সমস্যার সমাধান :
কিছু বিশেষ পারিবারিক পরিস্থিতিতেও এই অনুমতি যরূরী হয়ে ওঠে। যেমন স্ত্রী যদি বন্ধ্যা হন এবং স্বামী সন্তানের আকাঙ্ক্ষা করেন, তবে ইসলাম স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর পথে না গিয়ে, দ্বিতীয় বিবাহের মাধ্যমে সন্তান লাভের সুযোগ দিয়েছে। এটি প্রথম স্ত্রীর জন্যও অধিক সম্মানজনক। স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী বা দুরারোগ্য ব্যাধির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
একাধিক বিবাহের শর্তাবলী :
একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে শরী‘আতে কিছু শর্তারোপ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এই শর্তগুলো পূরণে সক্ষম, তার জন্য একাধিক বিবাহের অনুমতি রয়েছে। যেমন :
১. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা :
এটিই একাধিক বিবাহের প্রধান শর্ত। আল্লাহ তা‘আলার স্পষ্ট বাণী, ‘যদি তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না বলে আশংকা কর, তাহ’লে মাত্র একটি বিয়ে কর’ (নিসা ৪/৩)। এই ইনছাফ বা ন্যায়বিচারের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। যেমন-
(ক) ভরণ-পোষণে সমতা : খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা এবং আনুষঙ্গিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ক্ষেত্রে সকল স্ত্রীর মধ্যে সমতা বজায় রাখা।
স্ত্রীদের সাথে সমতা ও সম্প্রীতি রক্ষাকে রাসূল (ছাঃ) এত গুরুত্ব দিয়েছেন যে, মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বে প্রবল শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও বারবার স্ত্রীদের জিজ্ঞেস করতে থাকেন, أَيْنَ أَنَا غَدًا؟ ‘আগামীকাল আমি কোথায় থাকব? তাঁর একথার তাৎপর্য উপলব্ধি করে স্ত্রীরা তাঁকে আয়েশার ঘরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বলেন, حَيْثُ شَاءَ‘যেখানে তিনি চান’।[8] তখন ফযল বিন আববাস ও আলী (রাঃ)-এর কাঁধে ভর করে অতি কষ্টে তিনি আয়েশা (রাঃ)-এর কক্ষে প্রবেশ করেন ও জীবনের শেষ সপ্তাহটি সেখানেই কাটান।[9]
২. আর্থিক সক্ষমতা তথা ভরণপোষণের সামর্থ্য :
ইসলামে স্ত্রী গ্রহণ করার অর্থ হ’ল তার ও তার সন্তানের পূর্ণ ভরণ-পোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপর ওয়াজিব হয়ে যাওয়া। যখন একজন পুরুষ দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেন, তখন তার উপর নতুন এই পরিবারের পূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত হয়। এই নতুন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি প্রথম স্ত্রী বা তার সন্তানদের অধিকারে ত্রুটি হয়, তবে তা ‘যুলুম’ বলে গণ্য হবে।[10]
৩. শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা :
স্বামীকে অবশ্যই শারীরিকভাবে এমন সক্ষম হ’তে হবে যেন তিনি সকল স্ত্রীর বৈধ জৈবিক ও মানসিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন। যদি তিনি এই অধিকার পূরণে অক্ষম হন, তবে এতে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা হয়, যা ইসলামে সিদ্ধ নয়।
উপরের শর্তাবলী পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম একাধিক বিবাহের অনুমতি দিলেও তা নানা শর্তাবলীর অধীনে এবং যৌক্তিক কারণেই দেয়া হয়েছে।
স্বামীর একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীর করণীয় :
অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন স্বামী যখন একাধিক বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন বা করে ফেলেন, তখন স্বভাবতই প্রথম স্ত্রীর জন্য তা এক কঠিন মানসিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও এমতাবস্থায় স্ত্রীর জন্য অনুধাবন করা আবশ্যক যে, একাধিক বিবাহের অনুমতি স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত। এটি কোন মানব সৃষ্ট আইন বা সামাজিক প্রথা নয়। তাই একজন মুমিন নারীর জন্য আল্লাহর বিধানকে মনে-প্রাণে মেনে নেওয়া কর্তব্য।
আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নয় :
স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের কারণে অনেক স্ত্রী ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ডিভোর্সের দিকে অগ্রসর হন, যা নিতান্তই অনুচিত। কেননা আবেগের বশে গৃহীত সিদ্ধান্ত প্রায়শই ভুল হয়। এরূপ সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে আরও অধিক বিপদে ফেলে দিতে পারে। বিশেষত স্ত্রী যদি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হন বা তার পিতার সহযোগিতা পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকে, তবে তালাকের পরের জীবন আরও ভয়াবহ হ’তে পারে। স্বামীর আশ্রয় অপেক্ষা একাকী জীবন আরও বেশী অসহনীয় ও অনিরাপদ। সর্বোপরি দেশের সমাজিক প্রেক্ষাপটে একজন ‘তালাকপ্রাপ্তা’ নারীকে খুব সম্মানের চোখে দেখা হয় না। তাকে একাকী নানামুখী অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হ’তে হয়।
স্মর্তব্য যে, ইসলামে পুরুষদেরকে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। কেননা তাদেরকে আল্লাহ নারীদের অভিভাবক করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ، ‘পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক’ (নিসা-মাদানী ৪/৩৪)। সুতরাং যৌক্তিক বা শারঈ কারণে স্বামী একাধিক বিবাহ করলে স্ত্রীর কর্তব্য হবে এমন পরিস্থিতিতে স্বামীকে বাধা না দেওয়া। এর মধ্যে এমন কল্যাণ থাকতে পারে, যা তারা জানেন না। হ’তে পারে এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন সন্তান আসবে, যা পিতা-মাতার মর্যাদাকে আরও উচ্চকিত করবে।
স্ত্রী তালাক চাইতে পারবেন কি?
স্বামী যদি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে শরী‘আত নির্দেশিত বিষয় গুলোতে পূর্ণ ইনছাফ বজায় রাখেন, কিন্তু প্রথমা স্ত্রী শুধু এই কারণেই অসন্তুষ্ট যে স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন। অর্থাৎ তিনি সতীনের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। কেবল একারণে তালাক চাওয়া জায়েয নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, أَيُّمَا امْرَأَةٍ سَأَلَتْ زَوْجَهَا طَلَاقًا فِي غَيْرِ مَا بَأْسٍ، فَحَرَامٌ عَلَيْهَا رَائِحَةُ الْجَنَّةِ ‘কোন নারী যথার্থ (শারঈ) কারণ ছাড়াই যদি তার স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণও হারাম।[12] যদি স্বামী প্রথম স্ত্রীর হক যথাযথভাবে আদায় না করেন এবং অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হন, সেক্ষেত্রে স্ত্রী যুলুম থেকে মুক্তি পেতে তালাক চাইতে পারেন। তবে তালাক হ’ল সর্বশেষ পদক্ষেপ। এর আগে স্ত্রীর উচিত : (১) স্বামীকে বারংবার নছীহত করা, আল্লাহর ভয় প্রদর্শন করা, তার অধিকার সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং সর্বোপরি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। (২) বিষয়টি মীমাংসার জন্য উভয় পরিবার থেকে সালিশের সাহায্য নেওয়া। যদি কোনভাবেই স্বামী যুলুম থেকে বিরত না হন এবং স্ত্রী তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হ’তেই থাকেন, তবে তিনি তালাকের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি :
দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেয়া যরূরী নয়। শরী‘আতে এরূপ কোন শর্তারোপ করা হয়নি। তবে আইনগত বৈধতার বাইরেও প্রতিটি আমলের একটি নৈতিক ও মানবিক দিক রয়েছে। দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে এই দিকটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুখময় একটি দাম্পত্য জীবনে প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা তার মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্বিতীয় বিবাহ করা সামাজিক নৈতিকতা ও উত্তম আচরণ পরিপন্থী। কারণ বিবাহ কেবল একটি আইনগত চুক্তি নয়, এটি একটি গভীর বিশ্বাস, ভালোবাসা ও অংশীদারিত্বের সম্পর্ক। যাকে কুরআনে ‘মীছাক্বান গালীযা’ বা ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ বলা হয়েছে। স্ত্রী তার স্বামীর জীবনের একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী। এমন একটি বড় সিদ্ধান্ত যা তার জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে, তা তার অগোচরে করাটা সেই বিশ্বাসের অমর্যাদা বলে বিবেচিত হবে।
একজন নারী স্বভাবগতভাবেই তার স্বামীর ভালোবাসায় একচ্ছত্র থাকতে চান। এটাই তার প্রকৃতি। দ্বিতীয় বিবাহের সংবাদ তার জন্য একটি প্রচন্ড মানসিক আঘাত হিসাবে আসতে পারে। বিশেষত যদি তা আকস্মিক, গোপনে বা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই হয়। এটি তার মধ্যে হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করতে পারে, যা একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এছাড়া গোপন বিবাহ প্রায়শই পারিবারিক জীবনে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি ডেকে আনে। যখন প্রথম স্ত্রী বা সন্তানেরা হঠাৎ করে বিষয়টি জানতে পারে, তখন যে অবিশ্বাস ও ক্ষোভের জন্ম হয়, তা পুরো পরিবারকে ভেঙে দিতে পারে।
সুতরাং শারঈ আবশ্যকতা না থাকলেও সামাজিকতার দাবী হ’ল, স্বামী এই ধরনের বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার প্রথম স্ত্রীকে মানসিকভাবে প্রস্ত্তত করবেন, তার সাথে আলোচনা করবেন এবং তার অনুভূতিকে সম্মান জানাবেন। একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের জন্য আইনের পাশাপাশি মানবিকতা ও নৈতিকতার চর্চা যরূরী।
বাড়াবাড়ি নয়; প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি :
বর্তমানে একাধিক বিবাহের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে দুই ধরনের চরমপন্থী মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। একদিকে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা, অন্যদিকে নারীর অসহিষ্ণুতা। সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে নারী ও পুরুষ উভয়কেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে শরী‘আত নির্দেশিত ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা যরূরী।
পুরুষের বাড়াবাড়ি ও অন্যায় : অনেক পুরুষ একাধিক বিবাহের অনুমতিকে অপব্যবহার করেন। যেমন (ক) স্ত্রীর কোন দোষ-ত্রুটি ছাড়াই কেবল প্রবৃত্তির তাড়নায় বা শখের বশে বিয়ে করা এবং পরে উভয় স্ত্রীর হক আদায়ে ব্যর্থ হওয়া। (খ) দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের খোঁজ-খবর না নেওয়া বা তাদের প্রতি যুলুম করা। (গ) শারঈ শর্ত পূরণ না করেই আবেগের বশে বিয়ে করে পরবর্তীতে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করা। (ঘ) গোপনে বিয়ে করে দিনের পর দিন স্ত্রীর কাছে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া। যা কখনোই আল্লাহভীরু মানুষের পরিচয় নয়। বরং বিবাহে অন্যতম শর্ত হ’ল ঘোষণা দেওয়া।
নারীর বাড়াবাড়ি ও অসহিষ্ণুতা : অন্যদিকে অনেক নারী এবং তাদের পরিবার আল্লাহর দেওয়া এই বিধানকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন না। ফলে এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। যেমন (ক) স্বামী শারঈ প্রয়োজনে বা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে করলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা। (খ) যথাযোগ্য শারঈ কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক দাবী করা। (গ) দ্বিতীয় স্ত্রীকে সতীন হিসাবে শত্রু মনে করা এবং তার সংসার ভাঙার চেষ্টা করা। (ঘ) পাশ্চাত্যের প্রভাবে বা আধুনিকতার নামে আল্লাহ প্রদত্ত এই বৈধ বিধানকে ঘৃণা করা, যা ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ।
সর্বোপরি স্মরণ রাখতে হবে যে, ইসলামে একাধিক বিবাহের বিধানটি বিশেষ সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে প্রদত্ত নির্দিষ্ট শর্তাধীনে অনুমোদিত। এর মূল উদ্দেশ্য ভোগবিলাস নয়, বরং সামাজিক ভারসাম্য, বিধবা ও ইয়াতীমদের সুরক্ষা এবং কখনো কখনো পারিবারিক অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করা। এর মূল ভিত্তি হ’ল ন্যায়বিচার। যে ব্যক্তি সেই ন্যায়বিচারের ন্যূনতম শর্ত পূরণে অক্ষম, তার জন্য আল্লাহ এক বিবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে প্রতিটি অনুমতির সাথেই একটি গুরুদায়িত্ব অর্পিত থাকে এবং চূড়ান্ত বিচারে আল্লাহর কাছে সেই দায়িত্ব সম্পর্কে প্রতিটি ব্যক্তিকে জবাবদিহি করতে হবে।
[1]. বুখারী হা/২৪৯৪; মুসলিম হা/৩০১৮।
[2]. আশ-শারহুল কাবীর ৭/৩৩৯।
[3]. উছয়ামীন, আশ-শারহুল মুমতি‘ ১২/১৩।
[4]. ড. ওয়াহবাহ যুহায়লী, আল-ফিক্বহুল ইসলামী ৯/১৬১।
[5]. আবূদাউদ হা/২১৩৩, সনদ ছহীহ।
[6]. তিরমিযী হা/১১৪১; মিশকাত হা/৩২৩৬, সনদ ছহীহ।
[7]. দারেমী হা/২২০৭; হাকেম হা/২৭৬১, সনদ ছহীহ।
[8]. বুখারী হা/৪৪৫০; মিশকাত হা/৩২৩১।
[9]. মুসনাদ আবু ইয়া‘লা হা/৪৫৭৯।
[10]. মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ইসলাম কিউএ, ফতওয়া নং- ২৬০৬৯
[11]. বুখারী হা/৩০৬৫; মুসলিম হা/১৪৩৬।
[12]. আবুদাউদ হা/২২২৬ প্রভৃতি; মিশকাত হা/৩২৭৯।