শিক্ষকতায় মু‘আশারাত

ছাত্রজীবনের অধ্যায় শেষ করে আমরা শিক্ষকতায় আসি। শিক্ষকতায় আমরা এমন অনেক বিষয়ের সাথে পরিচিত হই যা আমরা কোনদিনই ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করিনি। কখনো ভাবা হয়নি যে, পড়া ও পড়ানোর বাইরে এই বিষয়গুলোও খেয়াল করতে হয়। অজ্ঞতায় বা বেখেয়ালে আমরা হরহামেশাই ভুল করে যাই। আজকে আমরা এমন কিছু বিষয় উপস্থাপন করব যেগুলো পড়াশোনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। তবে এই আলোচনা আমাদের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে আরো সমৃদ্ধ করবে ইনশাআল্লাহ। 

দায়িত্বের প্রতি ভালোবাসা : আমাদের মাঝে অনেকেই রয়েছেন যারা শুধু পরিবার চালানোর নিমিত্তে শিক্ষকতায় এসেছেন। দায়িত্বের প্রতি তাদের কোন ভালোবাসা নেই। জ্ঞান বিতরণে তারা কোন তৃপ্তি পান না। কারণ তাদের কাছে ইলম বিতরণ একটি বোঝা। এমন শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীরা তেমন একটা উপকৃত হ’তে পারে না। এজন্য শিক্ষক হিসাবে আমাদেরকে অবশ্যই ইলম বিতরণের মাঝে আনন্দ খুঁজে পেতে হবে। অন্যথা এই পেশা আমাদের জন্য নয়। আমাদের মনে হ’তে পারে, কাজের ভেতরে আবার কেমন আনন্দ! আমরা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহঃ)-এর নাম শুনেছি। ইলমে শরী‘আহ্র প্রায় প্রতিটি বিষয়ের ওপর তার লেখা কিতাব রয়েছে। তিনি যে ঘরে বসে লেখালেখি করতেন সেই ঘরের জানালা দিয়ে নীলনদের মনোরম দৃশ্য দেখা যেত। তিনি ঐ ঘরে বিশ বছর ধরে লেখালেখির কাজ করেছেন। তবে কোনদিন জানালা খুলে নীলনদ দেখেননি। এটাই হচ্ছে কাজের মাঝে আনন্দের দৃষ্টান্ত। যা শুধু আনন্দই নয়; অনেকটা নেশার মত।

এই পেশাকে ভালোবেসেই আমরা শিক্ষকতায় এসেছি। এখন ভালোবাসার মাঝে যদি আসক্তিই না থাকে তবে এটাই বা কেমন ভালোবাসা হ’ল! আর আমরাই বা কেমন শিক্ষক হ’লাম! বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষকই একটু অলস প্রকৃতির হয়ে থাকেন। কাজকে ফাঁকি দিতে পারলে তারা শান্তি পান। মনে রাখতে হবে, দায়িত্বকে ভালোবাসতে হ’লে বা সফলতার দেখা পেতে হ’লে আমাদেরকে ‘না’ বলা পরিহার করতে হবে। ‘না’ শব্দটি একেবারেই ভুলে যেতে হবে। যে কোন দায়িত্ব আসলে সেটাকে নে‘মত হিসাবে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। তবেই কেবল শিক্ষকতায় সফলতার ছোঁয়া পাওয়া সম্ভব হবে, নচেৎ নয়। কারণ বই পড়ে মানুষ জ্ঞানী হয়। তবে দক্ষতা বইয়ের পাতা থেকে আসে না। এটা আসে কেবল দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আর দুনিয়ায় দক্ষ ব্যক্তির কদর সবসময় বেশী। 

কিছু অমূলক ভুল থেকে বেঁচে থাকা : আমরা অনেকেই বেখেয়ালে এমন কিছু ভুল করে ফেলি যার মাধ্যমে আমাদের এবং প্রতিষ্ঠানের বদনাম হয়। যেমন, কিছু আচরণ রয়েছে যা আমার সাথে বা আমার সন্তানের সাথে করা হ’লে আমার খারাপ লাগবে, এমন কোন আচরণ শিক্ষার্থীর সাথে করা যাবে না। শিক্ষার্থীকে কখনো মাত্রাতিরিক্ত শাসন করা যাবে না। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যদি কখনো প্রহার করা হয় তবে বাসায় জানাতে নিষেধ করা যাবে না। এতে শিক্ষার্থীর কাছে আমাদের অবস্থান নষ্ট হয়ে যাবে। পাশাপাশি যে উদ্দেশ্যে তাকে নিষেধ করা হয়েছে সেটাও ব্যাহত হবে।

অতিরিক্ত শাসনের কারণে কর্তৃপক্ষ কোন উপদেশ দিলে নিজের ভুল অস্বীকার করা যাবে না বা নিজের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো যাবে না। শিক্ষার্থী অথবা অভিভাবকের কাছে কখনো কোনকিছু চাওয়া যাবে না। কখনোই শিক্ষার্থীর ভুল লেখার ওপরে টিক দেওয়া যাবে না না। তাদেরকে ‘তুই’ সম্বোধন করা যাবে না। অভিভাবককে না জানিয়ে শিক্ষার্থীদের চুল কাটা যাবে না। তাদের সামনে ইশারায় বা সরাসরি প্রতিষ্ঠানের বা অন্য কোন শিক্ষকের সমালোচনা করা যাবে না।

ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রদের শাসন করানো যাবে না। এতে শাসিত ছাত্রের মনে আমাদের সম্পর্কে খারাপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। এই বিষয়গুলো বাইরে আলোচনা হ’লেও সবাই এটাকে নিন্দনীয় হিসাবেই দেখবে। ছোটখাট বিষয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি নেওয়া যাবে না। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন নিজের প্রয়োজনের ওপরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে তখন প্রতিষ্ঠানও আমাদেরকে প্রাধান্য দিবে। পাড়া-পড়শী চাচার অসুস্থতায় যদি আমাদের ছুটি নিতে হয় তবে একসময় আমরা এতটাই গ্রহণযোগ্যতা হারাবো যে, নিজের অসুস্থতায় ছুটি পাওয়া যাবে না।

যারা নতুন শিক্ষকতায় আসেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই কিছু নিজস্ব নিয়ম আছে। যেগুলো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আলাদা। সব নিয়মই যে পসন্দনীয় হবে এমনটা নয়। তবে পসন্দ হোক বা না হোক, কোন প্রতিষ্ঠানের মৌলিক ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বিষয়ে মাথা ঘামানো যাবে না। দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হ’তে হবে। তবে যখন আপনি সে অঙ্গনে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন এবং আপনার কথা সেখানে মূল্যায়িত হবে, তখন আদবের সাথে বিকল্প প্রস্তাব করতে পারেন।

আমাদের নবীন শিক্ষকগণ এক বছরের মাথায় আশায় থাকেন যে, আমার বেতন বৃদ্ধি হবে। বিভিন্ন চিন্তা তাদের মনে আঁকিবুঁকি করে। মনে রাখবেন, বছর ঘোরার বিষয়টি যেমন আপনার মাথায় আছে তেমনই কর্তৃপক্ষের মাথাতেও আছে। আপনি যেমন বেতন বৃদ্ধির আশায় আছেন, তেমনই কর্তৃপক্ষও আশায় আছে যে, এক বছর পূর্বে তারা যে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন তার যোগ্যতা একবছরে কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে? এদিক থেকে আপনি তাদেরকে আশাহত করলে তারাও আপনাকে আশাহত করবেন। এজন্য যোগ্যতা অর্জনের কোন বিকল্প নেই। নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।

আমরা অনেকেই পোষাকের ব্যাপারে সচেতন নই। আরবীতে একটি প্রবাদ আছে, ‘বাহ্যিক অবস্থা ভেতরের অবস্থার প্রতিচ্ছবি’। এছাড়াও একটি গোপনীয় সত্য হ’ল, পদোন্নতির জন্য বেশভূষারও প্রয়োজন রয়েছে। আমাকে দেখে যদি মুহাদ্দিছ মনে না হয় তবে আমাকে মুহাদ্দিছ পদে উন্নীত করার সময় অনেকেই এই বিষয়ে আপত্তি তুলবে। নীতি-নির্ধারকদের আপত্তির সামনে আমার যোগ্যতা তখন খুব একটা কাজে আসবে না। সুতরাং মার্জিত পোষাকে অভ্যস্ত হ’তে হবে।

দায়িত্ব পালনে নিখুঁত হ’তে হবে : প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আমাদের ওপরে বিভিন্ন দায়িত্ব আসে। এই কাজগুলো কর্তৃপক্ষের করা সম্ভব নয় বলেই আমাদের কাছে তা হস্তান্তর করেন। এখন আমাদের কাজের মান যদি এমন হয় যে, আমরা কাজগুলো করার পরে তা কাউকে পুনরায় করা লাগে তবে আমরা কেমন দক্ষতার পরিচয় দিলাম! আমাদেরকে কোনকিছু দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়ার পরে যদি আমাদেরকে দেখাশোনা করার জন্য আবার আরেকজনকে দায়িত্ব দেয়া লাগে তবে এটাই বা কেমন দায়িত্বশীলতা! এভাবে আমাদের ক্যারিয়ার কতটুকু সামনে যেতে পারে! এজন্য আমাদেরকে নিখুঁতভাবে কাজ করা শিখতে হবে।

বর্তমানে আমাদের অবস্থা হ’ল, কর্তৃপক্ষের কোন কাজে আমরা সাহায্য করতে পারি না। আবার শিক্ষকতায় যে ছোট ছোট দায়িত্বগুলো রয়েছে সেই কাজগুলোও ঠিকমত করতে আমরা অপারগ। যেমন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করা, ঠিকমত খাতা দেখা, নাম্বার শীটে নাম্বারগুলো নির্ভুলভাবে তোলা। এসব কাজে ভুল করার পরে আমরা এমন ভাব ধরি যে, নির্ভুল প্রশ্নপত্র তৈরি করা যেন কোন মহামানবের কাজ। এগুলো আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়! দেখুন! এতকিছুর পরেও দিনশেষে আমাদেরই অভিযোগ যে, আমাদের পদোন্নতি হয় না। আমাদের বেতন বাড়ে না। সত্যি, আশ্চর্য হ’তে হয়!

বন্ধু নির্বাচন : আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের অনেক বন্ধু ছিল। যার সাথে ইচ্ছা চলেছি। তবে কর্মজীবনে এসে আর সেই স্বাধীনতা নেই। আমরা এখন অনেকের পর্যবেক্ষণে রয়েছি। এটা মনে রাখতে হবে। যে প্রতিষ্ঠানে আমরা যোগদান করেছি এই প্রতিষ্ঠান আমাদের। এখানে যারা আমাদের সাথে রয়েছেন তারাই আমাদের আপন। প্রতিষ্ঠানের যারা ভাল চান তারাই আমাদের স্বজন। এখানে আমাদের উদারতা ও প্রশস্ততা দেখাতে গিয়ে এমন কারো সাথে বন্ধুত্ব করার প্রয়োজন নেই যারা প্রতিষ্ঠানের অকল্যাণ কামনা করে। এই ভুলটা কখনো করা যাবে না।

প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও আমাদের দেখতে হবে, কারা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকামী এবং কারা হুমকি স্বরূপ। যারা প্রতিষ্ঠানের জন্য অকল্যাণকর তাদের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভাল। কারণ তারা তো নিজেরা কোন কাজ করবেই না আমাদেরও করতে দিবে না। কাজ করতে চাইলে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস শুনিয়ে আমাদের মনোযোগ নষ্ট করবে। আবার এই ধরনের ব্যক্তিদের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরাও অপসন্দের পাত্র হব। সুতরাং বিষয়টি ছোট হ’লেও এড়িয়ে যাওয়ার মত নয়।

ছাত্রের দুর্বলতার অজুহাত দেওয়া যাবে না : ভাল ছাত্র মানেই ভাল শিক্ষক নয়। আবার খারাপ ছাত্র মানেই খারাপ শিক্ষক নয়। কেউ খুব ভাল ছাত্র ছিল, তবে শিক্ষকতায় সে ভাল নয়। আবার কেউ খারাপ ছাত্র ছিল তবে শিক্ষকতায় সে বেশ ভাল। এমন হ’তে পারে। কারণ শিক্ষকতা হ’ল শিখানো। আর শিখানোর যোগ্যতা সবার মাঝে থাকে না। ইমাম শাফেঈ তার এক ছাত্রকে একই মাসআলা ৪০ বার বোঝানোর পরেও সে যখন বুঝতে পারেনি তখন তিনি বললেন, ‘অবসর সময়ে আমার কাছে এসো। তখন আমি বুঝিয়ে দিবো’। এভাবে বুঝানোর মানসিকতা ও ধৈর্য যে শিক্ষকের মাঝে যত বেশী থাকবে তিনি তত ভাল শিক্ষক। শুধু ইলমের জাহাজ হ’লেই ভাল শিক্ষক হওয়া যায় না।

আদর্শ শিক্ষকগণ মেধাবী ছাত্র কামনা করেন ঠিকই, তবে শিক্ষার্থী দুর্বল হ’লে তাদের দুর্বলতার অভিযোগ দিয়ে নিজের সাফাই গান না। তারা দুর্বলদেরকে শিখানোর শত শত পন্থা আবিষ্কার করেন। অনেকগুলো পন্থা ব্যবহার করেও যখন তারা ছাত্রদের শিখাতে ব্যর্থ হন, তখন তারা নিজেদের অপারগতা স্বীকার করেন। এই ধরনের শিক্ষক এখন নেই বললেই চলে। তবুও আমরা আশায় বুক বেঁধে এই গুণাবলীগুলো লিখছি, যদি কেউ এমন হওয়ার চেষ্টা করেন তবে আমাদের লেখা স্বার্থক হবে।

সবসময় মনে করতে হবে, শিক্ষক হিসাবে আমরা দুর্বল। শিক্ষক হিসাবে আমরা দুর্বল বলেই দুর্বল প্রতিষ্ঠানে আমাদের কর্মক্ষেত্র হয়েছে। যেখানে ছাত্ররাও দুর্বল। আমরা যদি সবল হ’তাম তবে আমাদের কর্মক্ষেত্র এমন কোন প্রতিষ্ঠানে হ’ত যেখানকার ছাত্ররাও সবল। আমরা দুর্বল তাই আমাদের কাছে দুর্বলরা পড়তে আসবে এটাই স্বাভাবিক। তাই তাদেরকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। দায়ভার সর্বদা নিজের ওপরে নিতে হবে। শুকরিয়া আদায় করতে হবে, কিছু দুর্বল ছাত্রের মাধ্যমে হ’লেও আল্লাহ আমাকে ইলমের খিদমতে কবূল করেছেন।

শাস্তি প্রদানের কৌশল : আমরা যে যুগে শিক্ষকতা করছি এই যুগে শাস্তি প্রদানের পদ্ধতি আগের যুগের মত নয়। কোন এক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শাস্তি দেয়া মানেই ছিল সরাসরি বদদো‘আ করা, কঠোরভাবে বেত্রাঘাত করা, প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়া, ঘরে বন্দী করে রাখা ইত্যাদি। তবে এই যুগে শাস্তি মানে চোখ ও কথার মাধ্যমে শাসন, স্নেহপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতকরণ, জায়গা পরিবর্তন, বাড়ির কাজ বেশী দেয়া, পরীক্ষার ভয় দেখানো, ছুটি দিতে বিলম্ব করা ইত্যাদি। সুতরাং শাস্তি দিতে গিয়ে পূর্বের ফেলে আসা রীতি অবলম্বনের কোন প্রয়োজন নেই।

উল্লেখ্য, কারো অপরাধে যদি রাগ হয় তবে সেই রাগের উপস্থিতিতে তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। আগে নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এরপরে তাকে শাস্তি দিতে হবে। কখনোই কাউকে অতিরিক্ত প্রহার করা যাবে না। দরকার হ’লে তাকে একদিনের জন্য খেলাধুলা বা অন্যান্য বিনোদন থেকে বিরত রাখতে হবে। তার বিভিন্ন স্বাধীনতা সীমিত করতে হবে। এভাবে শাস্তি দিলে উদ্দেশ্যও পূরণ হবে আবার শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার ওপরও চাপ পড়বে না।

নিজস্ব প্রতিষ্ঠান করার প্রবণতা পরিহার করা : আমাদের মাঝে যখনই কোন শিক্ষক পাঠদানে সুনাম অর্জন করেন তখনই তিনি মনে করেন, আমি নিজেই যদি একটি প্রতিষ্ঠান দেই তবে খারাপ হবে না। শিক্ষার্থীরা আমার কাছে আসবে। তবে এটা সবসময় সঠিক চিন্তা হয় না। কারণ শিক্ষার্থীরা কখনো উদ্দেশ্যপরায়ণ হয়ে শিক্ষকের প্রশংসা করে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের প্রশংসার ধোঁকায় পড়া যাবে না।

যিনি পাঠদানে ভাল তিনি পরিচালনায় ভাল হবেন এমনটা কখনোই নয়। বরং আমরা এটাই দেখেছি যে, অধিকাংশ পরিচালক ভাল মুদাররিস নন। আবার ভাল মুদাররিস ভাল পরিচালক নন। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেন, ‘আল্লাহ যেমনভাবে মানুষের মাঝে রিযিক বণ্টন করে দিয়েছেন তেমনই আমলও বণ্টন করে দিয়েছেন’। সুতরাং সবাইকে দিয়ে সব হয় না। আবার জীবনে সফল হওয়ার জন্য যে পরিচালক হ’তেই হবে এমনও নয়। বরং পরিচালক হ’লে তাদের মাধ্যমে খিদমাহ আর আগের মত হয় না। মাদ্রাসার হিসাব আর প্রশাসন সামলাতেই তাদের বাকী জীবন কেটে যায়। সুতরাং যদি সত্যিই আমরা ইলমের খিদমতে থাকতে চাই তবে তাদরীসেই থাকতে হবে। ইহতেমাম অন্যদের সামলাতে দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের সাফল্য প্রচার করা : প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে গিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে হ’ল। যদিও এই শিরোনামের আলোচনা প্রতিষ্ঠান প্রধানের জন্য। তবুও এটা উল্লেখ না করে পারলাম না। আমরা সর্বদাই প্রচার বিমুখতা পসন্দ করি। যদি আপনার প্রতিষ্ঠান অপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে যায় তবে সেটাই ভাল। তবে যদি কখনো বিপরীত অবস্থা সামনে আসে। আপনার প্রতিষ্ঠান অনিচ্ছায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে যায়। হিংসুকরা আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। সেখানকার ব্যবস্থাপনা ভাল নয়, পড়ালেখা উন্নত নয়, শিক্ষার্থীরা কিছু শিখতে পারে না এই ধরনের গুঞ্জন আপনার শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় তবে আপনার বসে থাকা উচিৎ হবে না। কারণ আপনার সাফল্য শুভাকাঙ্ক্ষীরা দেখতে পায় না। আপনি তো এগুলো প্রচার করেন না। ফলে তারা অপপ্রচারে একসময় কান দেবেই এবং খুব ধীরে ধীরে আপনার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রিয়তা কমতে থাকবে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং-এ মনোযোগ দিতে হবে। ছাত্রদের মাঝে যে প্রতিভাগুলো আছে সেগুলোকে কেনদ্র করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। কুইজ, বিতর্ক, বিভিন্ন ভাষায় বক্তব্য ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। যোগ্যদের পারফরমেন্স মিডিয়ায় প্রচার করতে হবে। যে কোন সাফল্য অবলিলায় প্রচার করুন। যে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে ভয় করবেন না। আপনার ব্যবস্থাপনার আপডেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন। খাবারের মান সরাসরি লাইভ ভিডিওতে দেখান। পড়ালেখার পরিবেশ দেখান। শিক্ষকদের বিভিন্ন দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রচার করুন। কারণ আপনি কুৎসাকারীদের মুখে হাত রাখতে পারবেন না। তবে এই পদ্ধতিতে তাদের মুখ বন্ধ করতে পারবেন।

অভিযোগ সহ্য করা : যে কাজ করে তার ভুল হয়, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। আপনার প্রতিষ্ঠানে আপনাকে ঘিরে কর্তৃপক্ষ, ছাত্র ও অভিভাবকের আলাদা আলাদা চাওয়া রয়েছে। খুব স্বাভাবিকই সেগুলো আপনি শতভাগ পূরণ করতে পারবেন না। তখন আপনাকে ঘিরে নানান কথাবার্তা হ’তে পারে। অনেক অযাচিত অভিযোগ আসতে পারে। কখনো কর্তৃপক্ষ বা কোন সিনিয়র শিক্ষক অকারণেই আপনাকে দুয়েকটি কথা শোনাতে পারেন। হঠাৎই কোন অভিভাবক আপনাকে রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, ‘আমার ছেলে কেন পড়া পারে না’? এসব আলোচনায় যদি আপনি ইগোকে সামনে আনেন তবে অবশ্যই ক্ষতি হবে।

এতে হয়তো অভিভাবক ছাত্রকে প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ে চলে যাবে। ছেলেটি ইলমে দ্বীন থেকে বঞ্চিত হবে। অথবা কর্তৃপক্ষের সাথে ঝামেলা করে আপনিই প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাবেন। তখন আপনার মাধ্যমে ইলমে দ্বীনের খিদমত ব্যাহত হবে। সুতরাং বৃহৎ স্বার্থকে সামনে রেখে এ পরিস্থিতিতে মাথা খুব ঠান্ডা রাখতে হবে। মনে রাখবেন, এই দুনিয়া মোটা চামড়ার মানুষদের জন্যই। পাতলা চামড়ার মানুষদের জন্য নয়। এখানে অপমান সহ্য করে যারা হাসতে পারে তারাই দিনশেষে সফল হয়। 

আন্তরিকতা প্রদর্শন : প্রতিষ্ঠান যতটুকু দায়িত্ব দিয়েছে ঠিক ততটুকুই দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠানকে কখনো আপন করা যায় না। যে শিক্ষক ক্লাস শুরু হওয়ার ৫ মিনিট পূর্বে মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে ক্লাশ শেষ করেই মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে যান তিনি দায়িত্ব পালন করলেন ঠিকই, তবে আন্তরিকতা প্রদর্শন করলেন না। এ ধরনের শিক্ষকগণ শিক্ষকতাকে অনেকটা কর্পোরেট জবের মতই বানিয়ে নিয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠান যখন তাদের সাথে কর্পোরেট আচরণ করবে তখন তারা নীতি-নৈতিকতা ও মানবিকতার বাণী শোনাবে।

একটা প্রতিষ্ঠানে কিছু সাপ্তাহিক, মাসিক বা বাৎসরিক কাজ আছে যেসব কাজের জন্য আলাদাভাবে কোন দায়িত্বশীল নিয়োগ দেয়া হয়নি। এসব কাজগুলো যখন সামনে আসে তখন কিছু আগ্রহী শিক্ষক সামনে গিয়ে কাজগুলো নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। এটা আন্তরিকতা। দুনিয়ার সকল প্রতিষ্ঠানই সর্বদা উচ্চপদগুলোতে তাদের আন্তরিক ব্যক্তিদেরই চায়। সময়ের সাথে সাথে যখন তাদের পদোন্নতি হয় তখন আপনি চায়ে চুমুক দিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। আপনি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বিচারে আপনার পদোন্নতি হওয়া উচিৎ ছিল। অথচ আপনি প্রতিষ্ঠানের সাথে বছরের পরে বছর কর্পোরেট আচরণ করে আসছেন!

গ্রুপিং করা থেকে বিরত থাকা : এই কথাগুলো বলতে খারাপই লাগছে। তবুও যা মহামারীর আকার ধারণ করেছে তা আর লুকিয়ে কি লাভ! আমাদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকদের মাঝে দলাদলি বা গ্রুপিং থাকে। শিক্ষকদের মাঝে দলাদলি থাকলে প্রতিষ্ঠান খুব বেশী সামনে আগাতে পারে না। কারণ এসকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে ভাবার সময় পান না। মূল্যবান সময় তারা একে অপরের পেছনে নষ্ট করেন। গীবত চর্চা করেন। সুতরাং দলাদলি থেকে বিরত থাকতে হবে। 

মূলত মতের অমিলের কারণেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলাদলি হয়ে থাকে। শিক্ষকদের মাঝে কারো অভিজ্ঞতার বাহাদুরী, কারো যোগ্যতার বাহাদুরী, কারো পদের বাহাদুরী আবার কারো স্থানীয় হওয়ার বাহাদুরী। এই বাহাদুররা যখন কোন আলোচনায় বসেন তখন স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের মতকে সম্মান করতে পারেন না। ফলে দলাদলির সৃষ্টি হয়। এই বিষয়ে শুধু একটি কথাই বলব, যে যত বড়ই বাহাদুর হোক যদি তার নিজের ভুল মেনে নেয়ার যোগ্যতা না থাকে তবে তিনি কখনোই শিক্ষিত নন।

ভিত্তি চেনা : প্রতিটি সম্পর্কের একটি ভিত্তি আছে। কখনো যদি ভিত্তি ধ্বসে পড়ে তবে সম্পর্ক আপনাতেই ফুরিয়ে যাবে। আমাদের মাঝে একটি দুর্বলতা হ’ল, আমরা ভিত্তি চিনি না। নতুন শিক্ষকতায় আসার পরে অনেকেই নিজ সহকর্মীকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অধিক আপন ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার ছিল, আমাদের সম্পর্কের ভিত্তিই হ’ল প্রতিষ্ঠান। ভিত্তি যদি আমাদের সম্পর্কের মাঝে অবমূল্যায়িত হয় তবে অচিরেই এই সম্পর্কের ইতি ঘটবে। এর বেশ যৌক্তিক কারণও রয়েছে।

অনেক সময় শিক্ষকরা অভিভাবকদের সাথে এতটাই সখ্যতা গড়ে তোলেন যে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোও তাদের মাঝে আলোচিত হয়। অথচ একজন শিক্ষক ও অভিভাবকের সম্পর্কের মাঝে ভিত্তি হিসাবে রয়েছে ছাত্র ও প্রতিষ্ঠান। এই দু’টির কোন একটি চলে গেলে সম্পর্ক আপনাতেই শেষ হয়ে যাবে। অনেক শিক্ষক অভিভাবকদের কাছে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন। পরে দেখা যায় ছাত্রের সাথে কোনদিন রূঢ় আচরণ হয়ে গেলে সেই অভিভাবক কর্তৃপক্ষের কাছে এসে শিক্ষকের গোমর ফাঁস করে দেন। মনে রাখতে হবে, কর্তৃপক্ষের কাছে কখনোই আমরা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আপন নই। অভিভাবকের কাছে তার সন্তানের চেয়ে আপন নই। সুতরাং এসব বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা যরূরী।

যে সকল কারণে কর্মচ্যুত হ’তে পারি : মনে রাখতে হবে, আমরা যে যুগে শিক্ষকতায় এসেছি এটা কর্পোরেট যুগ বললে ভুল হবে না। এখানে ৫০ বছর আগের হিসাব মিলাতে চাইলে কখনোই মিলবে না। আলোচ্য প্রবন্ধে এই বিষয়গুলো আলোচনা করার উদ্দেশ্য হ’ল, আমরা যেন এই বিষয়গুলো থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি। কারণ অনেক শিক্ষকই রয়েছেন, যারা একদম সাদা মনে শিক্ষকতায় আসেন। তাদের মন এতটাই সাদা হয় যে, কোন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা বুঝতে পারেন না। অজান্তেই এমন ভুল করে বসেন যার মাধ্যমে তিনি সকলের চোখে খারাপ হয়ে যান। এই আলোচনা তাদের জন্য।

মনে রাখতে হবে, কর্মক্ষেত্রে কোন সহকর্মীর হিংসার পাত্র হওয়া যাবে না। সকলের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে। হিরো সাজতে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কোন দায়িত্বশীলের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে জড়ানো যাবে না। এতে সবসময় হুমকির মুখেই থাকতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারক প্যানেল যদি অযোগ্য হয় তবুও তাদের সাথে এমন আচরণ করা যাবে না যার কারণে আপনাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য অনিরাপদ মনে করবেন। কারণ তারা যোগ্য হোক বা না হোক, প্রতিষ্ঠান তাদেরই থাকবে। আমাদের অসীম যোগ্যতা দেখে কেউ আমাদের প্রতিষ্ঠান লিখে দিবেন না। সুতরাং হর্তাকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে কখনোই প্রশ্ন তুলা যাবে না। 

দায়িত্ববোধ এবং যোগ্যতা অর্জনে কখনো পিছপা হওয়া যাবে না। কারণ প্রতিযোগিতার মাঠে নিজেকে টিকিয়ে রাখার এটাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। মনে রাখতে হবে, কখনো প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে বলে যদি লোক ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তবে অযোগ্য এবং দায়িত্ববোধহীনরা চাকুরী হারাবে। আবার কখনো যদি প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে যায় এবং আপনার চেয়ে যোগ্য লোক পায় তবুও আপনি চাকুরী হারাতে পারেন। সুতরাং যোগ্যতা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে এমন অবস্থান গড়ে তু তে হবে যেন আপনি সর্বদা সেরাদের মাঝে বিবেচিত হন। সবসময় মনে রাখতে হবে, যোগ্যতা যত কম হবে ততই ঠুনকো কারণে আপনি কর্মচ্যুত হ’তে পারেন। যোগ্যতার বিচারে কখনো বিনা কারণেও অপসারণ করা হ’তে পারে। এসব মৌলিক কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রগুলোতে আমরা বেশী ভুল করে থাকি।

শেষকথা : আলোচ্য প্রবন্ধের আলোচনাগুলো বাস্তবতার নিরিখে করা হয়েছে। শিক্ষকতার বিস্তর ক্যারিয়ারে আমাদেরকে অনেক সময় বিভিন্ন পরিস্থিতি সামলাতে হবে। তখন এই আলোচনাগুলো আমাদের পথচলায় কাজে আসবে ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষক তার কাজকে ভালোবাসুন। দক্ষ হৌন, যোগ্য হৌন। নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য ভরসার পাত্র হৌন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন। আমীন!

সারওয়ার মিছবাহ

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।







বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.