মহাকালের স্রোতে মানব মনের এক অনন্ত জিজ্ঞাসা, আমি কে? কেন আমার আগমন? এ জীবনের উদ্দেশ্য কি? কোথায় আমার চূড়ান্ত গন্তব্য? যুগ যুগ ধরে অগণিত দার্শনিক, চিন্তাবিদ এবং সাধারণ মানুষ এই গভীর আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে ফিরেছেন।
বস্ত্তবাদী জগতের চাকচিক্য আর ক্ষণস্থায়ী মোহের মরীচিকায় মানুষ যখন তার অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত হয়, ঠিক তখনই ইসলাম তাকে এক মহিমান্বিত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট জীবনদর্শন দান করে। একজন মুসলিমের জীবন নিছক জন্ম, জীবিকা নির্বাহ এবং মৃত্যুর চক্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী ও অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্য; দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়।
এই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এক ইলাহী মহাপরিকল্পনার অংশ, যা পরিচালিত হয় মহান আল্লাহর নির্দেশনায়। মানুষ এ পৃথিবীতে কেবল পানাহার, পেশা কিংবা জাগতিক সুখ ভোগের জন্য প্রেরিত হয়নি। একজন মুসলিমের জীবন শুধু দুনিয়াবী সাফল্যের পেছনে ছুটে চলার জন্য নয়; বরং তার সম্পূর্ণ অস্তিত্বই স্রষ্টার ইবাদতের জন্য নিবেদিত। অতএব আমাদের প্রত্যেকের জন্য এটি অপরিহার্য যে, মুসলিম হিসাবে জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা এবং সেই আলোকবর্তিকা অনুসারে আমাদের জীবনকে পরিচালিত করা। কারণ এই পথেই নিহিত রয়েছে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি।
কুরআন ও হাদীছের আলোকে মুসলিম জীবনের এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রধানত দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। (ক) আম বা ব্যাপক উদ্দেশ্য (খ) বিশেষ উদ্দেশ্য।
(ক) আম বা ব্যাপক উদ্দেশ্য :
১. আল্লাহর ইবাদত করা :
মুসলিমের জীবনের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হ’ল আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ তা‘আলা যা সুস্পষ্টভাবে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ‘আমি জিন ও ইনসানকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য’ (যারিয়াত ৫১/৫৬)। এই আয়াতটি মুসলিম জীবনের উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দু। ‘ইবাদত’ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এটি শুধু ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাতের মত আনুষ্ঠানিক পর্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়! বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে সেটিও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (রহ.) বলেন, العبَادَةُ هِيَ اسْمٌ جَامِعٌ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللهُ وَيَرْضَاهُ مِنَ الأَقْوَالِ وَالأَعْمَالِ الظَّاهِرَةِ وَالْبَاطِنَةِ ‘ইবাদত হচ্ছে এমন এক সামগ্রিক নাম, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সবকিছু যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও সন্তুষ্ট হন, তা হোক কথা বা কাজ, প্রকাশ্য বা গোপন’।[1] সুতরাং একজন মুসলিমের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে পরিণত হ’তে পারে, যদি তার উদ্দেশ্য বা নিয়ত থাকে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তার ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, পড়াশোনা, পারিবারিক জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, এমনকি খাওয়া-দাওয়া ও নিদ্রা সবই ইবাদতের অংশ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল’।[2]
ইবাদতের মূল হ’ল তাওহীদ বা একত্ববাদ। অর্থাৎ কাজটি কেবল সর্বশক্তিমান আল্লাহর জন্যই হওয়া, অন্য কারো জন্য নয়। প্রত্যেক নবীই তাঁর জাতিকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার এবং অন্য সবকিছু পরিহার করার আহবান জানিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ‘আর নিশ্চয়ই প্রত্যেক জাতির নিকট আমরা রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর দাসত্ব কর এবং ত্বাগূত থেকে বিরত হও’ (নাহল ১৬/৩৬)।
যে ব্যক্তি ইবাদতের অর্থ উপলব্ধি করতে পারে সে হ’ল ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর আদেশ ও তাঁর সন্তুষ্টির কাছে আত্মসমর্পণ করে। সে তার জীবন ও আচরণকে আল্লাহর নির্দেশনা ও তাঁর আইনের অধীন করে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলে। তিনি যতটা সম্ভব তা করেন এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকেন।
আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, دَعُونِى مَا تَرَكْتُكُمْ، إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِسُؤَالِهِمْ وَاخْتِلاَفِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ، فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَىْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ، وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘তোমরা আমাকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাক। কেননা তোমাদের আগে যারা ছিল, তারা তাদের নবীদেরকে বেশী বেশী প্রশ্ন করা ও নবীদের (নবীদের) সঙ্গে মতভেদ করার কারনেই ধ্বংস হয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন ব্যাপারে নিষেধ করি, তখন তাত্থেকে বেঁচে থাক। আর যদি কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহ’লে সাধ্য অনুসারে মেনে চল’।[3]
যখনই কোন মুসলিমকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আদেশ করেন বা নিষেধ করেন তখন এই সবকিছুতে তার অবস্থান হ’ল, سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ‘আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম। আমরা তোমার নিকট ক্ষমা চাই হে আমাদের প্রতিপালক! আর তোমার নিকটেই তো আমাদের প্রত্যাবর্তন’ (বাক্বারাহ ২/২৮৫)। এটিই হ’ল সেই সাধারণ লক্ষ্য যা একজন ব্যক্তি বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করেন।
২. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা :
গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলির অন্যতম হ’ল সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মুসলমানরা সর্বশক্তিমান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে তার লক্ষ্য নির্ধারণ করে আল্লাহর নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামের উদাহরণ অনুসরণ করে, যখন তিনি তার সৎকর্মের জন্য তাঁর প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে তাঁর নিকটে দো‘আ করেছিলেন। যেমন পবিত্র কুরআন উল্লেখিত হয়েছে,فَتَبَسَّمَ ضَاحِكًا مِنْ قَوْلِهَا وَقَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ ‘তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসল এবং বলল, হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার নে‘মতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ। আর যাতে আমি এমন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পসন্দ কর এবং আমাকে তোমার অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর’ (নামল ২৭/১৯)।
এই লক্ষ্য মানুষকে পার্থিব জীবনে আল্লাহর পথ অনুসরণ করতে এবং তাঁর নির্দেশনা পালন করতে অনুপ্রাণিত করে, যা কেবলমাত্র আল্লাহর আদেশ মেনে চলার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে জান্নাত, যা আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَعَدَ اللهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ وَرِضْوَانٌ مِنَ اللهِ أَكْبَرُ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ ‘মুমিন পুরুষ ও নারীদের প্রতি আল্লাহ জান্নাতের ওয়াদা করেছেন, যার তলদেশ দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং ওয়াদা করেছেন ‘আদন’ নামক জান্নাতের উত্তম বাসস্থান সমূহের। আল্লাহর পক্ষ হ’তে সামান্য সন্তুষ্টিই হ’ল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বস্ত্তত এটিই মহান সফলতা’ (তওবা ৯/৭২)।
মুসলিমের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হ’ল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। আর তার ফলাফল হ’ল জান্নাত যা হবে চিরস্থায়ী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টিই হ’ল মুসলিমের জীবনের সবচেয়ে বড় নে‘মত এবং মহাসফলতা।
এ সম্পর্কে আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, إِنَّ اللهَ يَقُولُ لأَهْلِ الْجَنَّةِ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ. فَيَقُولُونَ لَبَّيْكَ رَبَّنَا وَسَعْدَيْكَ وَالْخَيْرُ فِى يَدَيْكَ. فَيَقُولُ هَلْ رَضِيتُمْ فَيَقُولُونَ وَمَا لَنَا لاَ نَرْضَى يَا رَبِّ وَقَدْ أَعْطَيْتَنَا مَا لَمْ تُعْطِ أَحَدًا مِنْ خَلْقِكَ. فَيَقُولُ أَلاَ أُعْطِيكُمْ أَفْضَلَ مِنْ ذَلِكَ. فَيَقُولُونَ يَا رَبِّ وَأَىُّ شَىْءٍ أَفْضَلُ مِنْ ذَلِكَ فَيَقُولُ أُحِلُّ عَلَيْكُمْ رِضْوَانِى فَلاَ أَسْخَطُ عَلَيْكُمْ بَعْدَهُ أَبَدًا ‘আল্লাহ জান্নাতবাসীদের বলবেন, হে জান্নাতবাসীগণ! তখন তারা বলবেন, হে আমাদের রবব! আমরা উপস্থিত, আপনার কাছে উপস্থিত হ’তে পেরে আমরা ভাগ্যবান। আপনার হাতেই কল্যাণ। আল্লাহ বলবেন, তোমরা কি সন্তুষ্ট? তারা বলবে, আমরা কেন সন্তুষ্ট হব না? আপনি আর কোন সৃষ্টিকে যা দান করেননি, তা আমাদেরকে দান করেছেন। তখন আল্লাহ বলবেন, আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম বস্ত্ত দান করব না? তারা বলবে, এর চেয়ে উত্তম বস্ত্ত কোন্টি? আল্লাহ বলবেন, তোমাদের ওপর আমার সন্তুষ্টি বিধিবদ্ধ করলাম। অতঃপর আমি তোমাদের উপর আর কখনো অসন্তুষ্ট হবো না’।[4] সুতরাং আমাদের একমাত্র কাজ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। এতে মানুষ খুশি হ’ল কি-না এটা মুখ্য নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنِ الْتَمَسَ رِضَاءَ اللهِ بِسَخَطِ النَّاسِ كَفَاهُ اللهُ مُؤْنَةَ النَّاسِ وَمَنِ الْتَمَسَ رِضَاءَ النَّاسِ بِسَخَطِ اللهِ وَكَلَهُ اللهُ إِلَى النَّاسِ' ‘যে ব্যক্তি মানুষের অসন্তুষ্টির বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ মানুষের দায়িত্ব নির্বাহে তার সাহায্যকারী হিসাবে যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির বিনিময়ে মানুষের সন্তুষ্টি কামনা করে, আল্লাহ তাকে মানুষের উপরই সোপর্দ করে দেন’।[5]
আল্লাহর সন্তুষ্টি সম্পর্কে ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,ثمرة الرّضى: الفرح والسّرور بالرّبّ تبارك وتعالى ‘সন্তুষ্টির ফলাফল হ’ল, প্রভুর প্রতি প্রফুল্লতা ও আনন্দচিত্ততা’।[6]
অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির ফলাফল হ’ল আল্লাহর সকল সিদ্ধান্তের উপর পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকা। মানুষের জীবন, রিযিক, কষ্ট, সুখ-দুঃখ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা। এর উপরে মন থেকে সন্তুষ্ট থাকা। আবার আল্লাহর দেওয়া বিধান, হালাল-হারাম সব মেনে চলা, এতে কোন বিরক্তি না থাকা।
জীবনের প্রতিটি কাজ ইবাদত হ’তে পারে যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়। এমনকি দুনিয়াবী কাজও যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা ইবাদত হয়ে যায়। উদাহারণ স্বরূপ হালাল উপার্জন করা, পরিবারকে খাওয়ানো, মানুষের উপকার করা, সৎকাজের আদেশ, মন্দ কাজের নিষেধ ইত্যাদি। এই সবই ইবাদত যদি উদ্দেশ্য হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ।
৩. সৌভাগ্য অর্জন করা :
সৌভাগ্য অর্জন মানব জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। কেবলমাত্র প্রকৃত বিশ্বাস এবং সৎকর্মের মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব।
আল্লাহ বলেন, مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ‘পুরুষ হৌক বা নারী হৌক মুমিন অবস্থায় যে ব্যক্তি সৎকর্ম করে, আমরা তাকে অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করব এবং অবশ্যই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম অপেক্ষা অধিক উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করব’ (নাহল ১৬/৯৭)।
সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি ঈমানের মধ্যে রয়েছে আক্বীদা সম্পর্কিত সবকিছু এবং সৎকর্মের মধ্যে রয়েছে চারিত্রিক, পারিবারিক এবং সমাজের সাথে সম্পর্কিত সবকিছু। আর মুমিন তার সৎকর্মের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্য অর্জন করে। তার মূল লক্ষ্য থাকে আখেরাতের সুখ, কারণ এই পৃথিবীর সুখ সীমিত ও তুচ্ছ। পক্ষান্তরে আখেরাতের সুখ স্থায়ী ও অফুরন্ত। আল্লাহ বলেন, قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا ‘তুমি বল, দুনিয়ার সম্পদ তুচ্ছ। আর আখেরাতই হ’ল মুত্তাক্বীদের জন্য উত্তম। সেদিন তোমরা সুতা পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না’ (নিসা ৪/৭৭)।
আর পরকালের সুখই হ’ল এই পৃথিবীর সকল কাজের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আল্লাহ বলেন,وَمِنْهُمْ مَنْ يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ، أُولَئِكَ لَهُمْ نَصِيبٌ مِمَّا كَسَبُوا وَاللهُ سَرِيعُ الْحِسَابِ، ‘আর তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের ইহকালে কল্যাণ দাও ও পরকালে কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও! ঐসব লোকদের কৃতকর্মের জন্য পুণ্যফল রয়েছে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (বাক্বারাহ ২/২০১-২০২)।
আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) এই বলে দো‘আ করতেন,اللهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ ‘হে আল্লাহ, হে আমাদের প্রভু! দুনিয়াতেও আমাদের কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং জাহন্নামের আযাব থেকে আমাদের রক্ষা কর’ (বাক্বারাহ ২/২০১)।[7]
হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘এটি হ’ল আল্লাহর আদেশ পালন, যা বান্দার দুনিয়া ও আখেরাতের চূড়ান্ত সৌভাগ্য। দুনিয়া ও আখেরাতে বান্দার জন্য তার প্রভুর আদেশ পালন অপেক্ষা অধিক কল্যাণকর কিছু নেই। তাঁর আদেশ পালন না করলে কেউই দুনিয়া ও আখেরাতে সুখী হ’তে পারে না।[8]
৪. নেক আমল বেশী বেশী করা :
দুনিয়াতে মানুষের আগমনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করা। সুতরাং সেই ইবাদত অধিক হারে করাই আল্লাহর নির্দেশ। তিনি বলেন,وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন পরিব্যপ্ত। যা প্রস্ত্তত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য’ (আলে ইমরান ৩/১৩৩)।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেন,بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ، يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا، يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنَ الدُّنْيَا، ‘অন্ধকার রাতের মত ফিৎনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হ’লে বিকালে সে কাফের হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হ’লে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে’।[9]
৫. ইলাহী শাস্তি থেকে পরিত্রাণ :
আল্লাহ বান্দাদের সাথে তাদের আমল অনুযায়ী ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন,وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ‘অথচ জনপদের অধিবাসীরা যদি বিশ্বাস স্থাপন করত ও আল্লাহভীরু হ’ত, তাহ’লে আমরা তাদের উপর আকাশ ও পৃথিবীর বরকতের দুয়ারসমূহ খুলে দিতাম। কিন্তু তারা মিথ্যারোপ করল। ফলে তাদের কৃতকর্মের দরুণ আমরা তাদেরকে পাকড়াও করলাম’ (আ‘রাফ ৭/৯৬)। আর যদি তারা তাদের প্রভুর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তাহ’লে তাদের উপর শাস্তি আসবেই। আল্লাহ বলেন,وَضَرَبَ اللهُ مَثَلًا قَرْيَةً كَانَتْ آمِنَةً مُطْمَئِنَّةً يَأْتِيهَا رِزْقُهَا رَغَدًا مِنْ كُلِّ مَكَانٍ فَكَفَرَتْ بِأَنْعُمِ اللهِ فَأَذَاقَهَا اللهُ لِبَاسَ الْجُوعِ وَالْخَوْفِ بِمَا كَانُوا يَصْنَعُونَ ‘আল্লাহ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন একটি জনপদের, যা ছিল নিরাপদ ও শান্ত। যেখানে প্রত্যেক স্থান থেকে আসত প্রচুর জীবনোপকরণ। অতঃপর তারা আল্লাহর নে‘মত সমূহের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ ক্ষুধা ও ভীতির দুরবস্থার স্বাদ আস্বাদন করালেন’ (নাহল ১৬/১১২)। পবিত্র কুরআন আমাদের সামনে সেই জনপদগুলির অশুভ পরিণতি উপস্থাপন করেছে এবং বলেছে যে তাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তা তাদের নিজস্ব কর্মকান্ডের কারণে, যার মধ্যে বিদ্রোহ, অকৃতজ্ঞতা এবং কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ আমাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে যে তারা যে ভুলের মধ্যে পড়েছিল, সেই একই ভুলের মধ্যে আমরা যেন না পড়ি, তাহ’লে আমরাও আল্লাহর কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হব।
মানুষ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে তারা নিজেদেরকে এবং সমাজকে সামগ্রিক ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারত। আমরা দেখতে পাই, যে সমাজে অন্যায় কাজ ব্যাপকতা লাভ করে, আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমারেখা লঙ্ঘিত হয়, ফিৎনা-ফাসাদ প্রসার লাভ করে এবং কেউই তার কর্তব্য পালন করে নর, তখন তাদের উপর এমন কঠিন আযাব নাযিল করবেন যা সৎ-অসৎ সকলকে শামিল করবে। এই বিষয়টি সরাসরি জ্ঞান বা বোধশক্তি সম্পন্ন যে কাউকে অনতিবিলম্বে মন্দকে প্রতিহত করার তাকীদ দেয়, যাতে সে নিজে এবং তার সমাজে আসন্ন আযাব এবং শাস্তি থেকে রক্ষা পায়। আল্লাহ বলেন, وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ ‘আর তোমরা ফিৎনা থেকে বেঁচে থাক, যা তোমাদের মধ্যকার যালেমদেরই কেবল পাকড়াও করবে না (বরং সকলের উপরে আপতিত হবে)।
জেনে রেখ আল্লাহ শাস্তি দানে অতীব কঠোর’ (আনফাল ৮/২৫)। ইমাম কুরতুবী বলেন, আয়াতের অর্থ হ’ল- আর এমন এক পরীক্ষার ভয় করো যা অত্যাচারীর বাইরেও বিস্তৃত হবে এবং সৎ ও দুষ্ট উভয়ের উপরেই আপতিত হবে’।[10]
হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘মহান আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদেরকে এমন ফিৎনার বিষয়ে সতর্ক করেছেন, ... যা অন্যায়কারী ও অন্যদের উপর আসবে। এটি কেবল পাপী ও মন্দ ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন নয়, বরং এটি হবে ব্যাপক’।[11] পবিত্র কুরআন মুমিনদের এই আম লক্ষ্যগুলোর দিকে আহবান জানিয়েছে এবং তাকে তার জীবনে এই লক্ষ্যে উন্নীত হ’তে নির্দেশ দিয়েছে। মুমিনদের তাদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক কাজ করতে হবে। কাজ যতই কষ্টকর হোক না কেন দায়িত্বের বিশালতা অনুভব করে তা পালনের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। (ক্রমশঃ)
মুহাম্মাদ রাফাত আনাম
শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
[1]. ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ, আল-উবূদিয়্যাহ, পৃঃ ১।
[2]. বুখারী হা/১; মিশকাত হা/১।
[3]. বুখারী হা/৭২৮৮; মুসলিম হা/১৩৩৭; মিশকাত হা/২৫০৫।
[4]. বুখারী হা/৭৫১৮; মুসলিম হা/২৮২৯; মিশকাত হা/৫৬২৬।
[5]. তিরমিযী হা/২৪১৪; মিশকাত হা/৫১৩০; ছহীহুল জামে‘ হা/৬০৯৭।
[6]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালেকীন, ৩/১৪৮ পৃঃ।
[7]. বুখারী হা/৪৫২২; মুসলিম হা/২৬৯০।
[8]. ইবনুল কাইয়েম (৬৯১-৭৫১ হিঃ), আল-জওয়াবুল কাফী, (মিশর : মাতবা‘আতুল মাদানী, ২য় সংস্করণ তাবি), পৃঃ ২১৯।
[9]. মুসলিম হা/১১৮; মিশকাত হা/৫৩৮৩
[10]. ইমাম কুরতুবী, আল-জামে‘ লিআহকামিল কুরআন, ৭/৩৯৩।
[11]. ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম (বৈরূত : দার ইবনে হাযম, ১ম প্রকাশ ২০০০ খ্রিঃ), পৃঃ ৮৩১।