ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় করবেন যেভাবে (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

৭. রিয়া ও লৌকিকতা পরিহার করা :

ইলম অর্জনের ক্লান্তিকর ও দীর্ঘ সফরে আমরা কতই না সময় ব্যয় করি! কত রাত জেগে কিতাবের পাতা উল্টাই, কত শত জ্ঞানীর কথা শুনি। কিন্তু এই সমস্ত জ্ঞান যখন আমলের রূপ নিতে যায়, তখন এক নীরব ঘাতক এসে তার সমস্ত সৌন্দর্যকে বিষাক্ত করে দিতে চায়। সেই ঘাতকের নাম ‘রিয়া’ বা লৌকিকতা। নেক আমলের এক ভয়ংকর শত্রু হ’ল রিয়া, যা ইলম ও আমলের মধ্যবর্তী সেতুকে ধ্বংস করে দেয়। আমরা যখন কোন ভালো কাজ করি- হ’তে পারে তা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, সুন্দর একটি বক্তৃতা, ছালাতের ধীরস্থিরতা ও দীর্ঘ সিজদা, কিংবা গোপনে দান-ছাদাক্বা, তখন আমাদের হৃদয়ের গভীরে একটি সূক্ষ্ম আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে, ‘আহা! মানুষ যদি দেখত! যদি তারা আমার প্রশংসা করত! যদি তারা আমাকে ‘বড় আলেম’, ‘বড় পরহেযগার’ বা ‘দানবীর’ বলে চিনত! এই ক্ষুদ্র আকাঙ্ক্ষাটিই হ’ল শয়তানের পাতানো এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ। এই ফাঁদে পা দেওয়া মাত্রই আমাদের আমলের পাল্লাটি ওলটপালট হয়ে যায়। যে কাজটি হচ্ছিল মহান রবের জন্য, তা মুহূর্তেই হয়ে যায় নশ্বর মানুষের জন্য, যারা না পারে আমাদের কোন উপকার করতে, না পারে কোন ক্ষতি করতে।

এই আত্মপ্রবঞ্চনা দেখে অবাক হয়ে ইয়াহইয়া ইবনু মু‘আয (মৃ. ২৫৮হি.) বলেন, عَجِبْتُ مِنْ ثَلَاثٍ: رَجُلٍ يُرَائِي بِعَمَلِهِ مَخْلُوقًا مِثْلَهُ، وَيَتْرُكُ أَنْ يَعْمَلَهُ لِلهِ. وَرَجُلٍ يَبْخَلُ بِمَالِهِ وَرَبُّهُ يَسْتَقْرِضُهُ مِنْهُ، فَلَا يُقْرِضُهُ مِنْهُ شَيْئًا. وَرَجُلٍ يَرْغَبُ فِي صُحْبَةِ الْمَخْلُوقِينَ وَمَوَدَّتِهِمْ، وَاللهُ يَدْعُوهُ إِلَى صُحْبَتِهِ وَمَوَدَّتِهِ، ‘তিন শ্রেণীর মানুষকে দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই- (১) সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর জন্য আমল সম্পাদন পরিহার করে তার মতোই অপর সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য আমল করে, (২) ঐ ব্যক্তি, যে তার সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয়ে কৃপণতা করে। আল্লাহ তার কাছে ঋণ চান, অথচ সে তাঁকে ঋণ দেয় না (৩) সেই ব্যক্তি, যে সৃষ্টিকূলের সাহচর্য ও ভালোবাসা লাভের জন্য উদ্গ্রীব থাকে, অথচ আল্লাহ তাঁর সন্নিধ্য ও ভালোবাসার দিকে তাকে আহবান করেন’।[1] বর্তমান যুগেও এই উক্তির বাস্তবতা চাক্ষুষ বিদ্যমান। আমরা অধিকাংশই এখন আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, শেয়ার ও প্রশংসার আশায় নিজেদের ইবাদত, দান বা ভালো কাজ প্রদর্শন করে থাকি। যখন বিলাসিতা, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা জমকালো অনুষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়, তখন মনে কোন কার্পণ্য থাকে না; উদার হস্তে খরচ করি। কিন্তু আমাদেরকে যখন আল্লাহর দ্বীনের জন্য, মসজিদ নির্মাণ, গরীব-দুঃখীর সাহায্যে, কোন দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে সাহায্যের জন্য আহবান করা হয়, তখনই অন্তরজুড়ে যনমের কৃপণতা জেঁকে বসে। নেককার মানুষের সাহচর্য, দ্বীনি বৈঠক, কুরআন ও যিক্রের মজলিসে আমাদের মন বসে না; অথচ দুনিয়াবী খ্যাতি, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রভাবশালী মানুষের সাহচর্য ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমরা কতই না ব্যাকুল থাকি। মূলত ইখলাছের অভাবেই আমাদের আজ এই করুণ পরিণতি।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) ইখলাছ ও রিয়াকে হৃদয়ের দু’টি গাছের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইখলাছ ও তাওহীদ হৃদয়ের একটি গাছের মত, আমল সমূহ যার শাখা-প্রশাখা। এর দুনিয়ার ফল হ’ল পবিত্র জীবন এবং আখেরাতে ফল হ’ল চিরস্থায়ী জান্নাত। জান্নাতের ফল-ফলাদি যেমন কখনো শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধ হবে না। তাওহীদ ও ইখলাছের ফলাফলও ঠিক সেই রকমই হবে। আর মিথ্যা ও লৌকিকতাও হৃদয়ের একটি গাছের মত, দুনিয়াতে তার ফল হ’ল ভয়, দুশ্চিন্তা, পেরেশানি এবং হৃদয়ের সংকীর্ণতা ও অন্ধকার। আর আখেরাতে এর ফল হ’ল যাক্কুম ও চিরস্থায়ী আযাব। মহান আল্লাহ সূরা ইবরাহীমে (১৪/২৪-২৬) এই দু’টি গাছের কথা উল্লেখ করেছেন’।[2] ভাবুন তো! এত জ্ঞান, এত আমল, এত দাওয়াতী কার্যক্রম ও তৎপরতার পরেও কেন আমাদের হৃদয়ে এত অশান্তি? কেন এত ডিপ্রেশন, এত ভয় আর এত সংকীর্ণতা? ইবনুল ক্বাইয়িমের কথায় এর জবাব লুকিয়ে আছে। সম্ভবত আমরা আমাদের হৃদয়ের যমীনে ইখলাছের গাছের বদলে রিয়ার বিষবৃক্ষ রোপণ করে ফেলেছি। সুতরাং ইলমকে আমলে পরিণত করার জন্য এই ‘রিয়া’ নামক ক্যান্সার থেকে মুক্ত থাকা অপরিহার্য কর্তব্য।

রিয়া থেকে বাঁচার অন্যতম কার্যকরী অস্ত্র হ’ল গোপন ইবাদত। এমন কিছু আমল নিজের জন্য নির্দিষ্ট করুন, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ, এমনকি আপনার স্ত্রী, সন্তান বা সবচেয়ে কাছের বন্ধুও জানবে না। সেটা হ’তে পারে গভীর রাতের দু’ফোঁটা চোখের পানি, হ’তে পারে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা কোন এতিমখানায় গোপনে পাঠানো, অথবা হ’তে পারে এমন কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া, যে আপনার ওপর চরম যুলুম করেছে ইত্যাদি। এভাবে নিজের জন্য উপযোগী গোপন আমল নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলুন, যা পৃথিবীকের কেউ জানবে না; জানবেন কেবল রাববুল আলামীন।

হজ্জ-ওমরাহ করা, কোন সেবামূলক কাজ করা, তাহাজ্জুদ পড়া প্রভৃতি কোন ভালো কাজ করার তাওফীক্ব হ’লে সাথে সাথে সোশাল মিডিয়ায় প্রচার করার মানসিকতা অবশ্যই পরিহার করা উচিত। নেক আমলের প্রতি অন্যকে উৎসাহিত করার জন্য প্রচার করা হ’লে সেটা হয়ত দূষণীয় নয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে লৌকিকতার ছোবলে আক্রান্ত হন। হয়ত প্রথম পর্যায়ে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য কাজ করা হয়; কিন্তু পরবর্তিতে ইখলাছের পাল্লাটা ক্রমান্বয়ে হালকা হয়ে যায়। সুতরাং আমাদে প্রতিজ্ঞা করা উচিত, যেন আমাদের অর্জিত প্রতিটি জ্ঞান, প্রতিটি নেক আমল কেবলই আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়। আমাদের জ্ঞান যেন আলোহীন প্রদীপে পরিণত না হয়; বরং তা যেন হয় ইখলাছে পরিপূর্ণ এক উজ্জ্বল বাতি, যা দিয়ে আলোকিত হবে আমাদের পার্থিব জীবন, কবরের জগৎ এবং নিশ্চিত হবে পরকালীন মুক্তির ঠিকানা।

৮. ছোট-বড় সব ধরণের পাপ থেকে বেঁচে থাকা :

ইলম হ’ল নূর বা আলো, আর পাপ হ’ল অন্ধকার। আলো এবং অন্ধকার কখনো এক পাত্রে অবস্থান করতে পারে না। ক্ষুদ্র একটি ছিদ্র যেমন বিশাল জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি ছোট পাপও আমলের বিশাল সৌধকে ধসিয়ে দিতে পারে। বকর বিন আব্দুল্লাহ আল-মুযানী (মৃ. ১০৮ হি.) বলেন, رَحِمَ اللهُ عَبْدًا أُعْطِي قُوَّةً فَعَمِلَ بِهَا فِي طَاعَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ، أَوْ قَصَرَ بِهِ ضَعْفٌ فَكَفَّ عَنْ مَحَارِمِ اللهِ، ‘আল্লাহ সেই বান্দাকে অনুগ্রহ করুন, যাকে তিনি শক্তিমত্তা দান করেছেন। আর সে আল্লাহর আনুগত্যে সেই শক্তি কাজে লাগিয়েছে। অথবা দুর্বলতার কারণে আমল করতে অপারগ হ’লে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বিরত থাকেছে’।[3] অর্থাৎ একজন মানুষ হয়ত শারীরিক ও আর্থিক শক্তিমত্তা পেয়েছে। তিনি যদি এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাতে তাহাজ্জুদ পড়েন এবং আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করেন, তবে তিনি যেমন আল্লাহর ইবাদত করলেন। ঠিক তেমনি আরেকজন ব্যক্তি অসুস্থতা বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে হয়তো রাতে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করতে পারেন না, কিন্তু তিনি এই দুর্বলতার অজুহাতে মোবাইল বা টেলিভিশনে হারাম কনটেন্ট, গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা দেখা থেকে বিরত থাকেন, তবে তিনিও আল্লাহর ইবাদত করলেন। কেননা নেক আমল করা যেমন ইবাদত, তেমনি সুযোগ থাকা সত্তেও পাপ থেকে বিরত থাকাও ইবাদত। এভাবে শক্তিতে নেক আমল করা অথবা দুর্বলতায় পাপ বর্জন করা-দুটোই আল্লাহর কাছে প্রিয়। এই দুই প্রকার ইবাদতই আল্লাহর কাছে প্রিয়তর। ধরুন! আপনি একজন চাকুরীজীবি। আপনার অফিসে সবই ঘুষ খায়, কিন্তু আপনি সুযোগ থাকা সত্তেও খান না। অথবা আপনি ব্যবসায়ী। বাজারের সবাই খাদ্যে ভেজাল দেয়, কিন্তু আপনি দেননা, গ্রাহককে ঠকান না; তখন এই ‘পাপ থেকে বিরত থাকার আমল’ নফল ছালাতের চেয়েও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হ’তে পারে।

ইয়াহ্ইয়া ইবনে মু‘আয আর-রাযী (মৃ. ২৫৮ হি.) বলেন, لست آمركم بترك الدنيا، آمركم بترك الذنوب، ترك الدنيا فضيلة وترك الذنوب فريضة، وأنتم إلى إقامة الفريضة أحوج منكم إلى الحسنات والفضائل، ‘আমি তোমাদের দুনিয়া পরিত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছি না। বরং তোমাদেরকে পাপ পরিত্যাগের নির্দেশ দিচ্ছি। কেননা দুনিয়াকে উপেক্ষা করা অতিরিক্ত মর্যাদাপ্রাপ্তির বিষয়। কিন্তু পাপ পরিহার করা ফরয। সৎ আমল ও ফযীলতপূর্ণ কাজসমূহের চেয়ে তোমাদের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হ’ল ফরযকে প্রতিষ্ঠা করা’।[4]

অনেক সময় আমার হৃদয়ের মনিকোঠায় নেক আমলের স্বপ্ন জাগে। রাত জেগে আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে, তাহাজ্জুদ পড়তে মন চায়। কিন্তু যখনই হাতের মোবাইল ফোনে কোন হারাম কনটেন্ট আসে, তখন মুহূর্তেই সেই অনুভূতিগুলো হারিয়ে যায়। যদি একজন বান্দা আল্লাহর ভালোবাসার খাতিরে সেই মুহূর্তে মোবাইলটা দূরে সরিয়ে দিতে পারে, তবে সেই ‘গুনাহ বর্জন করার আমল’ হয়তো রাতের দীর্ঘ তাহাজ্জুদের চেয়েও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হ’তে পারে। কারণ, এই পাপ বর্জনের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেন যে, তার হৃদয়ে আল্লাহর নির্দেশই সর্বোচ্চ স্থান দখল করে আছে। তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনে কা‘ব আল-কুরাযী (৪০-১০৮হি.) বলেন, مَا عُبِدَ اللَّهُ بِشَيْءٍ أَحَبَّ إلَيْهِ مِنْ تَرْكِ الْمَعَاصِي ‘গুনাহ বর্জন করার চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক পসন্দনীয় কোন ইবাদত করা হয় না’।[5]

ইমাম শাফে‘ঈ (রহঃ) বলেন, اجتِنَابُ ‌المَعَاصِي، ‌وَتَرْكُ ‌مَا ‌لَا ‌يَعْنِيْكَ يُنَوِّرُ القَلْبَ ‘গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করা অন্তরে নূর পয়াদা করে’।[6]হাসান আল-মুযাইয়িন (রহঃ) বলেন, ‌الذَّنْبُ ‌بَعْدَ ‌الذَّنْبِ ‌عُقُوبَةُ الذَّنْبِ وَالْحَسَنَةُ بَعْدَ الْحَسَنَةِ ثَوَابُ الْحَسَنَةِ ‘গুনাহের পরে গুনাহ করা আগের গুনাহের শাস্তি। আর নেক আমলের পরে নেক আমল করতে পারা আগের নেক আমলের প্রতিদান’।[7] যেমন, আপনি হয়তো সকালে আলসেমি করে ফজরের ছালাত জামা‘আতে পড়তে পারলেন না, এটি একটি পাপ। এই পাপের শাস্তি স্বরূপ দেখবেন, যোহরের সময় আপনার মন আরও আলসে হয়ে গেছে বা আপনি দিনের বেলায় কোন হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে গেছেন। অথবা আপনি যদি একটি মিথ্যা কথা বলেন, দেখবেন সেই মিথ্যাকে ঢাকার জন্য আরো কয়েকটি মিথ্যা কথা আপনাকে বলতে হবে। এটিই হ’ল পাপের পর পাপের চক্র। অপরদিকে আপনি যদি একটি ছোট নেক কাজ করেন- যেমন, ঘর থেকে বের হওয়ার সুন্নাতী দু‘আটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। দেখবেন, এই ছোট আমলের প্রতিদান স্বরূপ আল্লাহ আপনাকে পথ চলতে আরেকজনকে হাসিমুখে সালাম দেওয়ার বা কোন বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সাহায্য করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ছোট-বড় যে কোন ধরণের পাপ থেকে বাঁচার মাধ্যমে এই নেক আমলের প্রতিদানের চক্রকে আমাদের জীবনে পরম যত্নে আগলে রাখা উচিত।

৯. নেক আমলের সুযোগ লাভের সাথে সাথে দ্রুত সম্পাদন করা :

আমল করার সুযোগ আমাদের জীবনে বসন্তের ক্ষণস্থায়ী মেঘের মতোই আসে এক পলকে আসে, আবার দেখতে না দেখতেই দ্রুত মিলিয়ে যায়। ইসলাম আমাদের শেখায় যে, যখনই নেক আমল করার সুযোগ আসবে, সাথে সাথে সেটা সম্পাদন করতে হবে। কারণ ইলম অনুযায়ী আমল করতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হ’ল ‘পরে করব’ বা ‘আগামীকাল করব’ নামক অলসতার ফাঁদ। আমলের ক্ষেত্রে দ্রুততা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন পরিব্যপ্ত। যা প্রস্ত্তত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য’ (আলে ইমরান ৩/১৩৩)। এখানে দ্রুত ধাবিত হওয়ার অর্থ হ’ল- سارعوا إلى ما يوجب المغفرة من الطاعات ‘সেই সব আনুগত্যমূলক কাজের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যা ক্ষমাকে অনিবার্য করে তোলে’।[8] আর ‘তোমাদের রবের ক্ষমার দিকে’ দ্রুত ধাবিত হওয়ার অর্থ হ’ল- ‘আল্লাহর সেই ব্যাপক রহমতের দিকে ছুটে যাওয়া, যা আমাদের পাপসমূহকে তাঁর দয়ার চাদরে ঢেকে দিয়ে গোপন করে রাখে এবং যার ফলে তিনি আমাদের গুনাহের কারণে প্রাপ্য শাস্তি থেকে পূর্ণ মুক্তি দান করেন’।[9] মূলত আলোচ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদেরকে নেক আমলের সুযোগ আসার সাথে সাথে তা দ্রুত সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ সুযোগ চলে গেলে আমলও হাতছাড়া হয়ে যায়।

সুফইয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.) বলেন, إِذَا هَمَمْتَ بِصَدَقَةٍ أَوْ بِبِرٍّ أَوْ بِعَمَلٍ صَالِحٍ فَعَجِّلْ مُضِيَّهُ مِنْ سَاعَتِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَحُولَ بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ الشَّيْطَانُ ‘যখন তুমি কোন ছাদাক্বা, সৎকাজ অথবা কোন নেক আমল করার মনস্থ করবে, তখন তোমার ও তোমার সেই আমলের মাঝে শয়তান কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার আগেই খুব দ্রুত সেটা সম্পাদন করে ফেল’।[10] ধরুন! হঠাৎ আপনার মনে হ’ল যে, পাশের বস্তির গরিব লোকটি খুব কষ্টে আছে, তাকে এখনই এক হাযার টাকা দিয়ে সাহায্য করা উচিত। আপনার ইলম আপনাকে ছাদাক্বাহ্ করার ফযীলত সম্পর্কে বলেছে এবং আপনার মন সায় দিয়েছে। কিন্তু আপনি ভাবলেন, ‘আচ্ছা, এখন তো ক্যাশ নেই, কাল অফিস থেকে ফেরার পথে দেব’। শয়তান ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে তখনই আপনার মনে কুমন্ত্রণা দেবে- ‘তোমার তো আরও কিছু বিল বাকি আছে, এক হাযার টাকা বেশী হয়ে যায়, কাল বরং পাঁচশো দিও’। ফলস্বরূপ, আপনি কাল পাঁচ শত টাকা দান করলেন, অথবা দেখা যাবে ছাদাক্বাহ্ করলেনই না। আপনার ইলম অনুযায়ী আমলের সুযোগটি চিরতরে হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই যখনই মনের মধ্যে নেক কাজের ইচ্ছা জন্মায়, তখনই সামান্য বিলম্ব না করে তা দ্রুত সম্পাদন করে ফেলুন।

আমল করার সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, তার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ হ’লেন আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)। তিনি ইলমের আলোকে আমলের জন্য সর্বদা প্রস্ত্তত থাকতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ ছিয়াম রেখেছ? আবুবকর (রাঃ) উত্তর দিলেন, আমি। আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বললেন, কে আজ জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ করেছ? আবুবকর বললেন, আমি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ মিসকীনকে খাদ্য দান করেছ? আবুবকর বললেন, আমি। রাসূল (ছাঃ) বললেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ পীড়িতকে দেখতে গিয়েছ? আবুবকর বললেন, আমি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, مَا اجْتَمَعْنَ فِي امْرِئٍ إِلاَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‘(জেনে রেখ!) যে ব্যক্তির মধ্যে এই গুণাবলীর একত্রে সমাবেশ ঘটবে, সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[11] অর্থাৎ আবুবকর (রাঃ) সময়কে এত সুন্দরভাবে কাজে লাগাতেন যে, নেক আমলের কোন সুযোগকে তিনি হাত ছাড়া করতেন না। যখনই কোন সৎকাজের সুযোগ পেয়েছেন, তখনই সেটা করার চেষ্টা করেছেন।

লক্ষ্য করুন! আবুবকর (রাঃ) কেবল ইলম অর্জন করেননি; তিনি সেই ইলমের প্রতিটি ক্ষেত্রকে কাজে লাগানোর জন্য সারাদিন সচেষ্ট থাকতেন। তিনি সকালে ছিয়ামের নিয়ত করেছেন, জানাযায় শরীক হয়েছেন, রুগী দেখতে গিয়েছেন এবং ছাদাক্বাহ করেছেন। সবই এক দিনে। আজকের যুগে আমরা যারা চাকরি করি বা ব্যবসা করি, তারাও যদি ইলম অনুযায়ী আমল করার জন্য দিনের শুরুতে একটি ‘নেক কাজের রুটিন’ তৈরি করতে পারি, তবে আমরাও এভাবে একাধিক আমলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারব। যেমন: অফিসে যাওয়ার পথে কোন গরীব ব্যক্তিকে দু’টাকা ছাদাক্বাহ্ করা, মসজিদে কৌটাতে কিছু টাকা দান করা, কাজের ফাঁকে অসুস্থ সহকর্মীর খোঁজ নেওয়া, বৃহস্পতি ও সোমবার ছিয়াম রাখা, সফরে গাড়িতে বসে থাকার সময়কে কাজে লাগিয়ে যিকর করা বা কুরআন তেলাওয়াত করা, ব্যাংকে লাইনে দাড়িয়ে-ড্রাইভিংয়ে-সাংসারিক কাজের সময় যিকির করা, ইত্যাদি। এটাই হ’ল সেই দ্রুততা, যা একজন মুমিনকে জান্নাতের হক্বদার করে তোলে।

তবে নেক আমলের দ্রুততা মানে এই নয় যে, আপনি সব আমল একাই করবেন; বরং আপনি সেই আমলের সুযোগটিতে মনোযোগী হবেন, যা আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহঃ) বলেন, إِنَّ اللهَ قَسَمَ الأَعْمَالَ كَمَا قَسَمَ الأَرْزَاقَ، فَرُبَّ رَجُلٍ فُتِحَ لَهُ فِي الصَّلاَةِ، وَلَمْ يُفتَحْ لَهُ فِي الصَّوْمِ، وَآخَرَ فُتِحَ لَهُ فِي الصَّدَقَةِ وَلَمْ يُفتَحْ لَهُ فِي الصَّوْمِ، وَآخَرَ فُتِحَ لَهُ فِي الجِهَادِ. فَنَشْرُ العِلْمِ مِنْ أَفْضَلِ أَعْمَالِ البِرِّ، وَقَدْ رَضِيْتُ بِمَا فُتِحَ لِي فِيْهِ، ‘আল্লাহ রিযিক্ব বণ্টনের মতো আমলও বণ্টন করে দিয়েছেন। কতক ব্যক্তির জন্য ছালাত সহজ করা হয়েছে, কিন্তু ছিয়াম সহজ করা হয়নি। আবার আরেক জনের জন্য দান-ছাদক্বাহর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাকে ছিয়ামের জন্য সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। আবার কাউকে জিহাদ করার তাওফীক্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নেক আমলসমূহের মধ্যে ইলমের প্রচার-প্রসারই সর্বোত্তম। আর আল্লাহ আমার জন্য যে ইবাদত সহজ করে দিয়েছেন, আমি তাতেই সন্তুষ্ট’।[12] এটা বাস্তব যে, সবার ইবাদতের ধারা এক নয়। করো জন্য হয়ত আল্লাহ ছিয়াম রাখা সহজ করেছেন, আবার আরেকজন হয়ত শারীরিকভাবে দুর্বল, তাই ছিয়ামের চেয়ে তাহাজ্জুদ তার কাছে সহজ করে দেওয়া হয়েছে। কারো জন্য অফলাইনে দাওয়াতী কাজকে সহজ করেছেন, কাউকে হয়ত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সঠিক ইলম প্রচার করা সহজ করেছেন। ইলম অনুযায়ী আমল করার ক্ষেত্রে আমাদের সেই আমলের সুযোগটি দ্রুত লুফে নেওয়া উচিত, যা আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন এবং যাতে আমরা মন থেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করব। কেননা কালক্ষেপণ না করে নিজের সুযোগ ও সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত নেক কাজ করে ফেলা প্রকৃত মুমিন ও জান্নাতী মানুষের বৈশিষ্ট্য।

১০. সুন্নাত মোতাবেক নেক আমল করা :

কোন আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে। একটি হ’ল ইখলাছ, অপরটি হ’ল রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইত্তেবা। এই দু’টি শর্তের কোন একটি অনুপস্থিত থাকলে আমাদের সকল আমল ও ইবাদত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সেজন্য ইলমকে আমলে রূপদানের করতে হ’লে সেই আমল আবশ্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী হওয়া বাঞ্ছনীয়। ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহঃ) বলেন,إنَّ الْعَمَلَ إذَا كَانَ خَالِصًا وَلَمْ يَكُنْ صَوَابًا لَمْ يُقْبَلْ، وَإِذَا كَانَ صَوَابًا وَلَمْ يَكُنْ خَالِصًا لَمْ يُقْبَلْ، حَتَّى يَكُونَ خَالِصًا صَوَابًا فَالْخَالِصُ أَنْ يَكُونَ لِلَّهِ، وَالصَّوَابُ أَنْ يَكُونَ عَلَى السُّنَّةِ، ‘আমল একনিষ্ঠ হ’লেও যদি তা সঠিক না হয়, তাহ’লে সেই আমল কবুল হবে না। আবার যদি সঠিকভাবে আমল সম্পাদন করা হয়, কিন্তু সেটা যদি একনিষ্ঠভাবে করা না হয়, সেই ক্ষেত্রেও আমল কবুল হবে না। যতক্ষণ সেই আমল একইসাথে খালেছ ও সঠিক না হবে। আমল খালেছ হওয়ার অর্থ হ’ল তা কেবল আল্লাহর জন্যই সম্পাদিত হওয়া। আর সঠিক হওয়ার অর্থ হ’ল সেই আমল রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাত মোতাবেক হওয়া।[13]

ধরুন! আপনি একজন ব্যক্তিকে দান করছেন। যদি আপনি কেবল মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করেন, তবে সেই দান সুন্নাত অনুযায়ী হলেও ইখলাছ না থাকার কারণে কবুল হবে না। আবার আপনি হয়তো সম্পূর্ণ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে খুশী করার জন্য একটি নতুন পদ্ধতিতে ছালাত আদায় করলেন, যা নবী করীম (ছাঃ) কখনো করেননি, তবে সেই আমলও কবুল হবে না। কেননা এই আমল ইখলাছের সাথে সম্পাদিত হ’লেও রাসূল (ছাঃ)-এর পদ্ধতি অনুযায়ী হয়নি। যে কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ইলমটুকু যদি আমাদের আত্মস্থ না হয়, তবে আমাদের সকল শ্রম পশুশ্রমে পর্যবসিত হ’তে পারে। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, الْعَمَلُ بِغَيْرِ إِخْلَاصٍ وَلَا اقْتِدَاءٍ كَالْمُسَافِرِ يَمْلَأُ جِرَابَهُ رَمْلًا يُثْقِلُهُ وَلَا يَنْفَعُهُ ‘ইখলাছ ও নবীর আনুগত্য বিহীন আমল হচ্ছে সেই মুসাফিরের মতো যে তার পকেট বালু দিয়ে ভর্তি করে। সেই বালু তার পকেট ভারী করলেও তার কোন উপকার করতে পারে না’।[14]

সুফিয়ান ছাওরী (রাঃ) বলেন-لَا يُقْبَلُ قَوْلٌ إِلَّا بِعَمَلٍ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ إِلَّا بِنِيَّةٍ وَلَا يَسْتَقِيمُ قَوْلٌ وَعَمَلٌ وَنِيَّةٌ إِلَّا بِمُوَافَقَةِ السُّنَّةِ ‘কোন কথা গ্রহণযোগ্য হয় না, যতক্ষণ না সেই কথার উপর আমল করা হয়। কোন কথা ও আমল সঠিক হয় না, যতক্ষণ না তার নিয়ত বিশুদ্ধ করা হয়। আর কোন কথা, আমল ও নিয়ত বিশুদ্ধ হয় না, যতক্ষণ না তা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাত অনুযায়ী হয়’।[15] আমরা অনেক সময় সুন্নাতকে অবহেলা করি। যা আমাদের আমলী যিনেদগীর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ব্যাপারে সতর্ক করে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন, ‌مَنْ ‌تَهَاوَنَ ‌بِالْأَدَبِ ‌عُوقِبَ ‌بِحِرْمَانِ ‌السُّنَنِ، وَمَنْ تَهَاوَنَ بِالسُّنَنِ عُوقِبَ بِحِرْمَانِ الْفَرَائِضِ، وَمَنْ تَهَاوَنَ بِالْفَرَائِضِ عُوقِبَ بِحِرْمَانِ الْمَعْرِفَةِ، ‘যে ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, তাকে সুন্নাত (আমল সম্পাদনের সুযোগ) থেকে বঞ্চিত করে শাস্তি দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি সুন্নাত আমল উপেক্ষা করে চলে, তাকে ফরয ইবাদত থেকে বঞ্চিত করে শাস্তি দেওয়া হয়। আর যে ব্যক্তি ফরয আমল সম্পাদনে অবহেলা করে, তাকে আল্লাহর পরিচয় লাভের তাওফীক্ব থেকে বঞ্চিত করে শাস্তি দেওয়া হয়’।[16] আমরা কি কখনো ভেবেছি যে, সুন্নাতী পদ্ধতিতে খাওয়া বা ঘুমানোর মতো ছোট ছোট আদব উপেক্ষা করার কারণেই হয়তো আমরা ফজরের ছালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হওয়ার মতো ফরয আমল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? এটি ইলমের এক গভীর উপলব্ধি। সুন্নাত আমল হ’ল ফরয ইবাদতের রক্ষাকবচ। সুন্নাতের প্রতি যত্নশীল হ’লে আল্লাহ ফরযকে রক্ষা করার তাওফীক্ব দেন। পক্ষান্তরে সুন্নাতকে তুচ্ছ জ্ঞান করলে এক সময় ফরযও হাতছাড়া হয়ে যায়। ফলে বান্দা আল্লাহর শাস্তির হকদার হয়ে যায়। সুতরাং একজন সফল মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য হ’ল ইলমকে সুন্নাহর রঙে রাঙিয়ে তোলা এবং আক্বীদা-আমলকে বিদ‘আত মুক্ত করা।

১১. আত্মমুদ্ধতা ও নেক আমলের ধোঁকা থেকে সতর্ক থাকা :

আমল সম্পাদন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ সফলতা। কিন্তু আমলের পরে যে বিপদটি ওঁৎ পেতে থাকে, তা হ’ল ‘উজব’ বা আত্মমুগ্ধতার ধোঁকা। এটি এমন এক গোপন শত্রু, যা আমলকে তার রবের দরবারে পৌঁছানোর আগেই ভেতরে ভেতরে ধ্বংস করে দেয়। একটি ইবাদতের পর যখন আমাদের মনে এই ধারণা জন্মায় যে, ‘আমি কত বড় ইবাদতকারী’! বা ‘আমার মতো নেক কাজ ক’জন করে?’, তখনই সেই উজব আমাদের আমলকে বাতিল করে দেওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে।

ইলম আমাদের শেখায় যে, আমরা যখন যত্মশীলতার সাথে ফরয ইবাদত করি, দ্বীনের খেদমত করি বা অন্যকে সাহায্য করতে পারি, তখন আমাদের দৃঢ় বিশ^াস রাখতে হবে যে, এই আমল সমূহের কোন কৃতিত্ব আমাদের নয়; বরং এটা মহান আল্লাহর এক বিশাল তাওফীক্ব ও অনুগ্রহ। আমরা যখন এই অনুগ্রহের অনুভূতি ভুলে যাই, ঠিক তখনই আমাদের হৃদয়ে অহংকার ও আত্মমুগ্ধতা জন্ম নেয়।

আমাদের পূর্ববর্তী নেককার বান্দারা এই উজব থেকে কতটা সতর্ক থাকতেন, তা জানলে আমরা আজকের যুগে নিজেদের আমল নিয়ে কী পরিমাণ ধোঁকায় আছি, তা বুঝতে পারবো। বিশর আল-হাফী (রহঃ) বলেন, لَقَدْ أَدْرَكْنَا النَّاسَ وَلَهُمْ أَعْمَالٌ صَالِحَةٌ كَالْجِبَالِ، وَمَعَ ذَلِكَ كَانُوا لَا يَغْتَرُّونَ، وَأَنْتُمْ لَا أَعْمَالٌ لَكُمْ وَمَعَ ذَلِكَ تَغْتَرُّونَ، وَاللهِ إِنَّ أَقْوَالَنَا أَقْوَالُ الزَّاهِدِينَ، وَأَعْمَالُنَا أَعْمَالُ الْجَبَابِرَةِ وَالْمُنَافِقِينَ ‘আমরা এমন মানুষের সাক্ষাত পেয়েছি, যাদের পাহাড় সমপরিমান নেক আমল থাকা সত্তেও তারা আমলের ধোঁকায় পড়তেন না। অথচ তোমাদের উল্লেখ্যযোগ্য আমলই নেই, তথাপি তোমরা ধোঁকায় পড়ে আছ। আল্লাহর কসম! আমরা দুনিয়া বিমুখ ব্যক্তিদের মত কথা বলি, কিন্তু আমাদের কর্মকান্ড অহংকারী ও মুনাফিকদের মত’।[17]

এই কথাগুলো যেন আমাদের যুগের মুসলিমদের জন্য আয়নার মতো। আমরা হয়তো দু’চারটে নফল ছালাত আদায় করেই নিজেকে আল্লাহর অলী মনে করতে শুরু করি। কোন বান্দা হয়তো প্রতি রাতেই তাহাজ্জুদ পড়েন। এই ইলম তার আছে যে, এটি বিরাট ফযীলতের কাজ। কিন্তু যখন তার পরিবারের অন্য কেউ অলসতা করে ফযরের জন্য উঠতে পারে না, আর তখন তার মনে যদি গোপন অহংকার জন্ম নেয় যে, ‘আমিই কেবল ইবাদতকারী, বাকিরা সব অলস’, তখন তার এই আত্মমুগ্ধতা তার সেই তাহাজ্জুদের পাহাড়সম ছওয়াবকে ধ্বংস করে দিতে পারে। অথচ সালাফে ছালেহীনদের আমল পাহাড়সম ছিল, কিন্তু তাদের হৃদয় ছিল ধূলিকণার মত বিনয়ী।

আমলের পর আত্মমুগ্ধতা আসার মূল কারণ হ’ল, আমরা আমলকে নিজের অর্জন মনে করি এবং এর কবুলিয়াতের ব্যাপারে নিশ্চিত হ’তে চাই। অথচ আমল কবুল হ’ল কিনা, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আওন (রহঃ) বলেন, لَا تَثِقْ بِكَثْرَةِ الْعَمَلِ، فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي أَيُقْبَلُ مِنْكَ أَمْ لَا، وَلَا تَأْمَنْ ذُنُوبَكَ، فَإِنَّكَ لَا تَدْرِي كُفِّرَتْ عَنْكَ أَمْ لَا، إِنَّ عَمَلَكَ مَغِيبٌ عَنْكَ كُلَّهُ- ‘তুমি তোমার আমলের অধিক্য দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থেকো না। কেননা তুমি তো জাননা যে, তোমার সেই আমলগুলো কবুল করা হয়েছে কিনা। আর তোমার গুনাহ থেকেও নিজেকে নিরাপদ মনে করো না। কেননা তুমি তো জাননা যে, সেগুলি মাফ করা হয়েছে কিনা। (সুতরাং, তুমি জেনে রাখ!) তোমার আমলের নেকী তোমার নিকট থেকে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য রয়েছে’।[18] ইবরাহীম ইবনে আশ‘আছ (রহঃ) বলেন, أَكْذَبُ النَّاسِ الْعَائِدُ فِي ذَنْبِهِ، وَأَجْهَلُ النَّاسِ الْمُدِلُّ بِحَسَنَاتِهِ، وَأَعْلَمُ النّاسِ أَخْوَفُهُمْ مِنَ اللَّهِ ‘সবচেয়ে মিথ্যুক মানুষ সেই ব্যক্তি, যে (তওবা করেও) বারবার পাপাচারে ফিরে আসে। নিরেট মূর্খ সেই ব্যক্তি, যে নেক আমল নিয়ে আহংকার করে। আর সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করে’।[19] মাসরূক্ব (মৃ.৬২হি.) বলেন, كَفَى بِالْمَرْءِ عِلْمًا أَنْ يَخْشَى اللَّهَ. ‌وَكَفَى ‌بِالْمَرْءِ ‌جَهْلا أَنْ يُعْجَبَ بِعَمَلِهِ ‘মানুষের জ্ঞানী হওয়ার জন্য একটুকুই যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করবে। আর মানুষের মূর্খ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে নিজের আমল নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগবে’।[20]

প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবন জুবায়ের (৪৪-৯৫হি.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, مَنْ أَعْبَدُ النَّاسِ؟ ‘কে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার ব্যক্তি?’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, رَجُلٌ اجْتَرَحَ مِنَ الذُّنُوبِ ‌فَكُلَّمَا ‌ذَكَرَ ‌ذَنْبَهُ ‌احْتَقَرَ ‌عَمَلَهُ ‘ঐ ব্যক্তি, যে (অতীতে) কোন একটা পাপ কাজ করেছিল, তারপর যতবার ঐ পাপের কথা তার মনে আসে, ততবার নিজের আমল তুচ্ছ মনে করে’।[21]

এক্ষণে হৃদয়যমীন থেকে আত্মমুগ্ধতার আগাছা পরিস্কার করার উপায় কি? এ ব্যাপারে শাক্বীফ ইবনে ইবরাহীম বলখী (রহঃ) বলেন, حُسْنُ الْعَمَلِ ثَلَاثَةُ أَشْيَاءَ: أَوَّلُهَا أَنْ يَرَى أَنَّ الْعَمَلَ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى لِيَكْسِرَ بِهِ الْعُجْبَ، وَالثَّانِي أَنْ يُرِيدَ بِهِ رِضَا اللَّهِ لِيَكْسِرَ بِهِ الْهَوَى، وَالثَّالِثُ أَنْ يَبْتَغِيَ ثَوَابَ الْعَمَلِ مِنَ اللَّهِ تَعَالَى لِيَكْسِرَ بِهِ الطَّمَعَ وَالرِّيَاءَ، وَبِهَذِهِ الْأَشْيَاءِ تَخْلُصُ الْأَعْمَالُ ‘তিনটি বিষয় আমলকে পরিশুদ্ধ বা রিয়ামুক্ত রাখে : (১) এই মর্মে বিশ্বাস রাখা যে, নেক আমলের তাওফীক্ব আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়, তাহ’লে আত্মমুগ্ধতা দূর হয়ে যাবে। (২) আমলের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করা, তাহ’লে প্রবৃত্তির চাহিদা দমিত হবে। (৩) নেক আমলের নেকী একমাত্র আল্লাহর নিকটেই কামনা করা, তাহ’লে রিয়া ও লোভ দমে যাবে। এই তিনটি বিষয়ের মাধ্যমে আমল পরিশুদ্ধ বা রিয়ামুক্ত হয়’।[22]

১২. ইলমের যাকাত দেওয়া :

ইসলামে সম্পদের যাকাত যেমন সম্পদকে পবিত্র করে এবং তাতে বরকত নিয়ে আসে, ঠিক তেমনি আমাদের অর্জিত ইলমের যাকাতও আত্মাকে পবিত্র করে এবং জ্ঞানকে আরও বৃদ্ধি করে স্থায়িত্ব দান করে। যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে তাকে সিন্দুকের মধ্যে ভরে রাখে, সে কৃপণের মত। আর অর্জিত ইলমের যাকাত হ’ল অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী নিজে আমল করা, অজ্ঞকে শেখানো এবং বিভ্রান্তকে পথ দেখানো। ইলমের যাকাত আদায় না করলে সেই জ্ঞান ক্বিয়ামতের দিন আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ইলম অনুযায়ী আমল করার একটি অপরিহার্য ধাপ হ’ল এই যাকাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে জা‘ফর বলেন, আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)-কে এক লোকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হ’ল- যে প্রচুর হাদীছ লিখে এবং প্রচুর পরিমাণে জ্ঞান আহরণ করে। তবে এই লোকের কী করা উচিত। তখন তিনি বললেন, ‘তার উচিত যতটা সে জ্ঞান বাড়ায়, ততটাই যেন সে তার ওপর আমলও বাড়ায়। কেননা, سَبِيْلُ العِلْمِ مِثْلُ سَبِيْلِ المَالِ، إِنَّ المَالَ إِذَا زَادَ: زَادَتْ زكَاتُهُ ‘ইলমের উদাহরণ সম্পদের মতো। সম্পদ যখন বেড়ে যায়, তখন তার যাকাতও বৃদ্ধি পায়’।[23]

ভাবুন তো! আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যখন সম্পদ বাড়ে, তখন কি আমরা যাকাত দেওয়া বন্ধ করে দেই? না; বরং সম্পদের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে যাকাতের পরিমানও বাড়ে। ঠিক তেমনি, আমরা যখন একটি নতুন মাসআলা বা একটি নতুন হাদীছ শিখি, তখন আমাদের ইলমের সম্পদ বাড়ে। এই অতিরিক্ত ইলমের যাকাত হ’ল সেই নতুন জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা। এখন আপনি যদি জানেন যে, রাতে ঘুমানোর আগে অমুক দো‘আটি পড়া সুন্নাত; কিন্তু আপনি তা আমল করছেন না, তবে আপনি আপনার ইলমের যাকাত আদায় করছেন না বলেই গণ্য হবে।

সালাফে ছালেহীন মনে করতেন, কোন হাদীছ বা ইলম শোনার সাথে সাথেই তা আমল করাই হ’ল সেই জ্ঞানের যাকাত। কাসেম ইবনে ইসমাঈল বলেন, আমরা বিশর ইবনে হারেছ আল-হাফী (রহঃ)-এর দরজায় ছিলাম। তিনি বেরিয়ে আসলে আমরা বললাম, হে আবূ নাছর! আমাদের হাদীছ কোন ন। তিনি বললেন, তোমরা কি হাদীছের যাকাত আদায় কর? তখন আমি বললাম, يَا أَبَا نَصْرٍ، وَلِلْحَدِيثِ زَكَاةٌ؟ ‘হে আবূ নাছর! হাদীছেরও কি যাকাত আছে? তিনি বললেন, نَعَمْ، ‌إِذَا ‌سَمِعْتُمُ ‌الْحَدِيثَ ‌فَمَا ‌كَانَ ‌فِي ‌ذَلِكَ ‌مِنْ ‌عَمَلٍ ‌أَوْ ‌صَلَاةٍ ‌أَوْ ‌تَسْبِيحٍ ‌اسْتَعْمَلْتُمُوهُ ‘হ্যাঁ, যখন তোমরা হাদীছ শুনবে, আর তাতে যে আমল, ছালাত বা তাসবীহের কথা থাকবে, তা তোমরা আমল করবে (এটাই হ’ল হাদীছের যাকাত)’।[24]

ইলমের যাকাত শুধু ব্যক্তিগত আমলেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি বৃহৎ অংশ হ’ল উম্মাহর প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন। আল্লামা বকর বিন আব্দুল্লাহ আবু যায়েদ (রহঃ) বলেন, أدِّ زكاة العلم صادعًا بالحق، أمَّارًا بالمعروف، ونهَّاءً عن المنكر، موازنًا بين المصالح والمضارِّ، ناشرًا للعلم، وحبِّ النفع ‘তুমি ইলমের যাকাত আদায় করো, সত্যকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে, সৎকাজের আদেশ দিয়ে, অসৎ কাজে নিষেধ করে, কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে ভারসাম্য রেখে, ইলম প্রচার করে এবং (মানুষের) উপকার করার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে’।[25]

সম্মানিত পাঠক! বর্তমান মুসলিম সমাজ যখন শিরক-বিদ‘আত, অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতির গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাচ্ছে, ইহুদী-নাছারাদের বস্তাপঁচা মতবাদ আমদানী করে মুসলিম সমাজের ঈমানী পরিবেশকে দূষিত করে ফেলছে, তখন আপনার ইলম আপনাকে চিৎকার করে বলছে- অভ্রান্ত সত্যের চিরন্তন উৎস পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের বাণী সাহসের সাথে উচ্চকণ্ঠে প্রচার করুন, নববী আদর্শে সমাজকে ঢেলে সাজানোর শপথ নিন, তাওহীদের ঝান্ডাকে আপোষহীনভাবে উড্ডীন রাখুন, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ব্যাপারে সর্বদা সোচ্চার থাকুন। যখন আপনি এটা করতে পারবেন, তখন যেন আপনি আপনার অর্জিত ইলমের যাকাত আদায় করলেন। এই ইলমের যাকাত আদায়ের মাধ্যমেই আপনার জ্ঞান শুদ্ধ হবে, বৃদ্ধি পাবে এবং ক্বিয়ামতের দিনে তা আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। আর এভাবে অর্জিত ইলম সার্বিক জীবনে বাস্তবায়িত হবে।

১৩. আল্লাহর কাছে তাওফীক্ব কামনা করা :

ইলম অনুযায়ী আমল করার এই দীর্ঘ, বন্ধুর ও পবিত্রতম সফরের চূড়ান্ত চালিকাশক্তি হ’ল আল্লাহর তাওফীক্ব বা একচ্ছত্র সাহায্য। আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, আল্লাহর তাওফীক্ব ছাড়া কোন নেক কাজ করা সম্ভব নয়। ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব আল্লাহরই হাতে। তাই একজন মুমিন জ্ঞান অর্জনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে দো‘আ করে যে, তিনি যেন তাকে আমল করার সামর্থ্য দেন এবং কবুল করেন। এই দো‘আ হ’ল আমাদের দীনতা ও রবের প্রতি মুখাপেক্ষিতার বহিঃপ্রকাশ এবং আমলের পথে অবিচল থাকার প্রধান উপায়। যখন শু‘আইব (আঃ)-এর কওম তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللهِ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَإِلَيْهِ أُنِيبُ، ‘আর আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্ল­াহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁর উপরেই নির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (হূদ ১১/৮৮)

প্রত্যেক নবী আমলের তাওফীক্ব কামনা করে আল্লাহর কাছে দো‘আ করতেন। যেমন সুলাইমান (আঃ) প্রার্থনা করতেন এভাবে,‌رَبِّ ‌أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ، ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার নে‘মতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা তুমি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছ। আর যাতে আমি এমন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পসন্দ কর এবং আমাকে তোমার অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর’ (নামল ২৭/১৯)

আল্লাহর কাছে তাওফীক্ব চাওয়ার এবং আমলের পথে স্থির থাকার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হ’ল নবী করীম (ছাঃ)-এর শেখানো দো‘আগুলি পাঠ করা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রায়শই দো‘আ করতেন, اَللَّهُمَّ إِنِّىْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ، وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ، وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا ‘হে আল্লাহ ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই এমন ইলম থেকে, যা কোন উপকারে আসে না। এমন হৃদয় থেকে যা (আপনাকে) ভয় করে না। এমন নফস থেকে যা কখনো পরিতৃপ্ত হয় না এবং এমন দো‘আ থেকে যা কবুল হয় না’।[26]

আমাদের দুর্বলতা ও আলস্য যেন ক্বিয়ামতের দিন আমাদের ক্ষতির কারণ না হয়, সেজন্য নবী করীম (ছাঃ) আমাদের আরেকটি দো‘আ শিখিয়েছেন, اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا عَمِلْتُ، وَمِنْ شَرِّ مَا لَمْ أَعْمَلْ ‘হে আল্লাহ ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই যা আমল করেছি তার অনিষ্ট থেকে এবং যে আমল করিনি তার অনিষ্ট থেকে’।[27] তিনি বলতেন, يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ ‘হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার হৃদয়কে আপনার দ্বীনের উপর দৃঢ় রাখুন’।[28] তিনি আরো বলতেন, اللهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ ‘হে হৃদয়ের পরিবর্তনকারী! আমার হৃদয়কে আপনার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে রাখুন’।[29]

যদি আল্লাহর তাওফীক্ব না থাকে, তবে আমাদের জ্ঞান কেবল মুখে উচ্চারিত হবে, আর আমলের ক্ষেত্রে তা ভুলে ভরা থাকবে। এটি ইলম অনুযায়ী আমল না করার এক করুণ পরিণতি। মালেক ইবনে দীনার (রহঃ) বলেন, تَلْقَى الرَّجُلَ ‌وَمَا ‌يَلْحَنُ ‌حَرْفًا ‌وَعَمَلُهُ ‌لَحْنٌ ‌كُلُّهُ ‘তুমি এমন ব্যক্তির সাক্ষাত পাবে, যে একটি বর্ণও ভুল উচ্চারণ করবে না। কিন্তু তার আমলের সবটাই হল ভুল’।[30]

আজকের যুগে এমন আলেমের অভাব নেই, যারা বিশুদ্ধ আরবী উচ্চারণে কুরআন ও হাদীছের ব্যাখ্যা করেন, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত জীবন সুদের লেনদেন, মিথ্যা, গীবত বা অন্য পাপাচারে ভরা। তাদের কথা নিখুঁত, কিন্তু আমল ভুলে ভরা। এটাই সেই করুণ দৃশ্য, যখন বান্দা নিজের জ্ঞানের উপর ভরসা করে আল্লাহর তাওফীক্ব চাইতে ভুলে যায়।

উপসংহার :

ইলম অনুযায়ী আমল করার এই দীর্ঘ আলোচনা শেষে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হ’তে পারি যে, ইলম তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন তা ইখলাছ ও সুন্নাতের শর্তে পরিশুদ্ধ হয় এবং জীবনের প্রতিটি পাপ থেকে সতর্ক থেকে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। আমাদের জ্ঞানের অহংকার বা আমলের আত্মতৃপ্তি যেন আমাদের ধ্বংস না করে; বরং আমলের ক্ষেত্রে সবসময় আল্লাহর তাওফীক্বের উপর নির্ভর করা এবং জ্ঞানের যাকাত স্বরূপ তা জীবনে প্রতিফলিত করাই হ’ল মুমিনের চূড়ান্ত সফলতা। মহান আল্লাহ আমাদের জীবনকে তার সীমাহীন রহমতের বারি ধারায় সিক্ত করুন; আমাদের ইলম ও আমলে অফুরান বরকত দান করুন; অর্জিত ইলমকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের তাওফীক্ব দান করুন; আমাদের যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী কবুল করে জান্নাতুল ফেরদাউসের চিরস্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

-আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ*

*. শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।


[1]. ইবনুল ক্বাইয়িম জাওযিইয়াহ, আল-ফাওয়ায়েদ পৃ. ১১৯।

[2]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ, পৃ. ১৬৪।

[3]. আবূ নু‘আইম ইস্পাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ২/২২৯।

[4]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/২৯৭।

[5]. ইবনু হাজার হায়তামী, আয-যাওয়াজির আন ইক্বতিরাফিল কাবায়ের, ১/২০।

[6]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ১০/৯৮।

[7]. ইবনুল জাওযী, যাম্মুল হওয়া, পৃ. ১৮৫।

[8]. তাফসীরে কুরতুবী, ৪/২০৩; ফাৎহুল কাদীর ১/৪৩৬।

[9]. তাফসীরে তাবারী (জামে‘উল বায়ান), ৭/২০৭।

[10]. আবূ নু‘আইম ইস্পাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৭/৬১।

[11]. মুসলিম হা/১০২৮; মিশকাত হা/১৮৯১।

[12]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৭/১৮৮।

[13]. ইবনু তাইমিয়াহ, ইক্বতিযাউছ ছিরাত্বিল মুস্তাক্বীম, ২/৩৭৩।

[14]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ ১/৬৬।

[15]. ইবনুল জাওযী, তালবীসে ইবলীস, পৃ: ১১।

[16]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান ৪/৫৫৯।

[17]. আব্দুল ওয়াহহাব শা‘রানী, তাম্বীহুল মুগতার্রীন, পৃ. ৫৫।

[18]. ইবনু রজব হাম্বলী, জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল হিকাম ২/৫২২।

[19]. শামসুদ্দীন যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ১২/৩৪৩।

[20]. ইবনু সা‘দ, আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা ৬/১৪২।

[21]. হাফেয ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯/১১৯; আহমাদ ইবনে হাম্বাল, কিতাবুয যুহদ, পৃ. ৩১৪।

[22]. সামারকান্দি, তাম্বীহুল গাফেলীন, পৃ: ৩০।

[23]. ইবনু আবী ইয়া‘লা, তাবাক্বাতুল হানাবিলা, ২/২৩; ইবনু মুফলিহ, আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ ২/১৭৫।

[24]. খত্বীব বাগদাদী, আল-জামে‘ লি আখলাক্বির রাবী, ১/১৪৩।

[25]. বকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবূ যায়েদ, হিলয়াতু ত্বালিবুল ইলম (রিয়াদ : দারুল আছিমাহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৬হি.), পৃ. ১৯১।

[26]. মুসলিম, হা/২৭২২; মিশকাত হা/২৪৬০।

[27]. মুসলিম, হা/২৭১৬; মিশকাত হা/২৪৬২।

[28]. তিরমিযী হা/৩৫২২; মিশকাত হা/১০২; সনদ ছহীহ।

[29]. মুসলিম হা/২৬৫৪; মিশকাত হা/৮৯।

[30]. নববী, বুস্তানুল আরেফীন, পৃ. ৫৬।






বিষয়সমূহ: আমল
সালামের আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু পদচিহ্ন (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত (৯ম কিস্তি) - মুযাফফর বিন মুহসিন
যাকাত সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
বৃদ্ধাশ্রম : মানবতার কলঙ্কিত কারাগার - মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম
নারী-পুরুষের ছালাতের পার্থক্য : বিভ্রান্তি নিরসন - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
যাকাত ও ছাদাক্বা - আত-তাহরীক ডেস্ক
ছিয়ামের ন্যায় ফযীলতপূর্ণ আমল সমূহ - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
অভ্যাসকে ইবাদতে পরিণত করার উপায় - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
ইয়াতীম প্রতিপালন - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
ইখলাছ (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আরও
আরও
.