কারিকুলামে প্রতিভার মূল্যায়ন

আমরা যখন চাকুরীর আবেদনের জন্য একটি সিভি তৈরি করি তখন সেখানে আবেদনকারীর কোন্ কোন্ প্রতিভাগুলো বাদ দেয়া হয়? কারো কোন প্রতিভা আছে আর সেটা সে সিভিতে উল্লেখ করবে না, এমন হয় কখনো? হয় না। দেখুন! চাকুরীর বাজারে যে প্রতিভাগুলোর দাম আছে, বাস্তব জীবনে প্রয়োজন আছে, কারিকুলামের উচিৎ সেগুলোকে মূল্যায়ন করা। এটাই আমরা চাই। আমাদের সিভিতে যে ছোট্ট ছকে পরীক্ষার নাম, পাসের সন আর ফলাফল লেখা থাকে সেটা কমবেশী সবারই একই রকম। এজন্য ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা একে অপরকে বলেন, ‘ওটা রাখ! আর কি কি যোগ্যতা আছে সেটা দেখ’।

‘ওটা রাখ’ বলার সাথে সাথেই কিন্তু আপনার ১৫ বছরের শিক্ষাগত যোগ্যতা অবমূল্যায়িত হ’ল। এভাবে অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণ, আপনার কারিকুলাম শুধু পাঠ্যপুস্তকের মাঝে সীমাবদ্ধ। ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা আপনার সিভিতে ‘আর যে যোগ্যতাগুলো’ খুঁজছেন সেগুলো যদি আপনার কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত হ’ত তবে তিনি ‘ওটা রাখ’ বলতে পারতেন না। আর আমরা এমনই একটি কারিকুলামের স্বপ্ন দেখি, যে কারিকুলামের নাম্বার শীটই হবে একেকটি সিভি। সেটা কবে বাস্তবায়িত হবে আমরা জানি না। তবে আল্লাহর কাছে দো‘আ করি, যেন তিনি আমাদের অচিরেই এমন একটি শিক্ষাক্রম দেখার তাওফীক দান করেন- আমীন।

প্রস্তাবিত কারিকুলামে আমরা ঐ সকল মেধাকে কাজে লাগাতে চাই যারা শুধুমাত্র কিতাব কেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে। একটু সহজ করে বোঝালে বুঝতে পারবেন। আমরা আমাদের ক্লাসে এমন অনেক মেধাবী ছাত্র পাই, যারা এই দুনিয়ার বুকে শুধু বইয়ের ঐ কালো কালো হরফগুলো ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। কোন খেলা সে খেলতে পারে না। কারো সাথে বসে দু’টো গল্প করতে পারে না। কোন কষ্টের কথায় সে কষ্ট পায় না। কোন কৌতুক তাকে হাসাতে পারে না। সে কখনো মোবাইলও ব্যবহার করে না। কারণ মোবাইল তাকে আকর্ষণই করে না। সে শুধু পড়া মুখস্থ করে এবং শিক্ষককে শোনায়। এতটুকুর মাঝেই তার জীবন সীমাবদ্ধ।

অনেকে বলবেন, আমরা তো এমনই ছাত্র চাই। দেখুন! এই ধরনের ছাত্র নিজের উপকার ছাড়া আর কারো উপকারে আসে না। তাদের মাধ্যমে পরবর্তীতে দেশ ও দশের তেমন একটা খিদমত হয় না। এই দোষ আমাদেরই। কেননা সে মেধাবী, সুতরাং আমরা চাইলে তার মেধাকে সার্বজনীন করতে পারতাম। তবে মেধাকে সার্বজনীন করার সেই সুবিধাগুলো আমাদের কারিকুলামে নেই। নেই বললে ভুল হবে। আমরা রাখিনি। আমরা আজকে সেই বিষয়গুলোই প্রস্তাবনায় রাখব। যে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হ’লে কারিকুলাম শুধু যোগ্য মানুষ তৈরি করবে না, বহুমাত্রিক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করবে ইনশাআল্লাহ। 

শুরুতেই আপনাকে প্রয়োজনীয়তা বুঝাই। মনে করুন, আপনার ক্লাসের একজন শিক্ষার্থী শুধু বই মুখস্থ করতে পারে। আর কিছুই পারে না। আরেকজন শিক্ষার্থী মুখস্থ খুব একটা ভাল পারে না। তবে সে খুব সুন্দর লিখতে পারে। ভাল আঁকতে পারে। সুমধুর কন্ঠে তিলাওয়াত করতে পারে। ভাল বক্তব্যও দেয়। উপস্থিত বুদ্ধি খুব ভাল। আপনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবার পরে সে সকল ছাত্রদের গুছিয়ে রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠানের যে কোন প্রোগ্রামে আপনাদের তাকে দরকার হয়। এবার বলুন, বার্ষিক পরীক্ষায় কার ফলাফল ভাল আসবে? প্রতিষ্ঠান কাকে ভাল শিক্ষার্থী হিসাবে স্বীকৃতি দেবে? নিশ্চয়ই যে শুধু বই মুখস্থ করতে পারে তাকে। তাহ’লে আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিভার মূল্য কোথায়? আর প্রতিভার যদি কোন মূল্য না থাকে তবে প্রতিভাবান কিভাবে তৈরি হবে? মনে রাখবেন! বছরে দুইটা চিনামাটির থালা আর কিছু বই উপহার দিয়ে প্রতিভার মূল্যায়ন হয় না। প্রতিভার মূল্যায়নের জন্য প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে হয়।

শিক্ষার্থীদের মাঝে আমরা অনেক প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। সেখানে তারা বিভিন্ন প্রতিভা প্রদর্শন করে পুরস্কৃত হয়। একবার ভেবে দেখুন! আমরা তো কোন ধ্বংসাত্মক প্রতিভার কারণে শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করি না। যে প্রতিভাগুলো প্রশংসনীয় ও জীবন ঘনিষ্ঠ সেগুলোর কারণেই তারা পুরস্কৃত হয়। এখন এই প্রতিভাগুলো কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত হ’লে সমস্যা কি! যে বিষয়গুলো তারা বছরে একবার চর্চা করত সেটা প্রতি সপ্তাহে একবার চর্চা হবে। বার্ষিক পরীক্ষায় এই বিষয়গুলোও সীমিত কিছু নম্বরে মূল্যায়িত হবে। এই বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা কম। তবুও আমাদের মনে হয়, প্রতিভা যতদিন কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত না হবে ততদিন ভিন্ন কিছু দিয়ে প্রতিভার মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

আমি বাংলা ভাষা চর্চা করি মাধ্যমিক থেকে। মাধ্যমিকে আমি যে প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছি সেখানে বাংলা চর্চায় অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমরা কয়েক বন্ধু লুকিয়ে লুকিয়ে সাহিত্য চর্চা করতাম। বিভিন্ন অজুহাতে ছুটি নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে যেতাম। ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠাতাম। তারপরও এই বিষয়গুলো শিক্ষকদের অজানা ছিল না। সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করে তারা বিভিন্ন মজলিসে আমাদেরকে অপমানজনক কথা শুনাতেন। তাদের বক্তব্য এমন ছিল, ‘এখন শুধু পড়াশোনার সময়। এগুলো অনর্থক কাজ করার অনেক সময় আছে’। তারপরও তাদের কথাকে উপেক্ষা করেই আমরা নিজেদের কাজ করে যেতাম। এখন মনে হয়, আল্লাহ ভাল চান বলেই পড়াশোনার পাশাপাশি এই ‘অনর্থক কাজগুলো’ চর্চা করেছিলাম। অন্যথা এই ‘অনর্থক কাজগুলো’ শেখার সময় আর হ’ত না। আমরা যে প্রতিকূল পরিবেশে শিখেছি সেই বৈরি আবহওয়ায় আমাদের কচি-কাচা প্রতিভাগুলো মারা যাক এটা আমরা চাই না। আমরা তাদেরকে সুযোগ দিতে চাই। যে অঙ্গন না পাওয়ার জন্য আমাদের মন কেঁদেছে আমরা আজ তাদেরকে সেই প্রশস্ত অঙ্গন উপহার দিতে চাই।

আমরা আজকের আলোচনায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে আরো কোন্ কোন্ প্রতিভাগুলোকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে তার একটি প্রস্তাবনা পেশ করব। পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতিও সংক্ষেপে আলোচনা করব। এখানে বাড়তি যে বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে এগুলো সপ্তাহে ছয়দিন পাঠদানের মত কোন বিষয় নয়। তবে পরিপূর্ণ কারিকুলামে এগুলো প্রয়োজনীয়। এই পন্থায় একটু সময় নিয়ে যদি প্রতিভাগুলো পরিচর্যা করা যায় তবে আমাদের প্রতিভাগুলো আরো সুন্দরভাবে বিকশিত হবে ইনশাআল্লাহ। শুরুতেই আমরা কিছু বিশেষ বিষয়ে আলোচনা করব, যেগুলো সকল ক্লাসের জন্য যরূরী এবং সকল ক্লাসেই এই বিষয়গুলো মূল্যায়িত হবে।

আদর্শিক ভিত্তি : আমি যদি বলি, বর্তমানে অধিকাংশ কারিকুলামে আদর্শিক কোন ভিত্তি নেই তবে তা হয়তো ভুল হবে না। আমরা তো কারিকুলামকে শুধু ক্লাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কিন্তু আদর্শ তো ক্লাসে পড়ানো হয় না। দুধের সাথে চিনি মিশিয়ে যেমন ছোট বাচ্চাকে খাওয়ানো হয়, তেমনই পাঠদানের সাথে শিক্ষার্থীদের আদর্শ খাওয়ানো হয়। তাদের মস্তিষ্কে এমনভাবে আদর্শের বীজ বপন করে দেয়া হয়, যেন একজন শিক্ষার্থী যখন চোখ বন্ধ করে তখন তার আদর্শিক প্রতিচ্ছবিগুলোই দেখতে পায়। দশ/বার বছরের একটি লম্বা সময় যদি তারা এই অভিন্ন আদর্শিক চেতনা লালন করে তবে পরবর্তীতে তারা যেখানেই যাক, যে পরিবেশেই থাকুক তাদের মস্তিষ্কে অন্য কেউ জায়গা দখল করতে পারে না। 

অনেকে বলবে, ‘কারিকুলামে আদর্শিক ভিত্তি সংকীর্ণতার পরিচয়। এতে করে ছাত্রদের বিকশিত হ’তে বাধা দেয়া হয়’। তবে আমরা বলব, অনুসরণ করা মানুষের ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ মাত্রই কাউকে অনুসরণ করে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে তাদের চিন্তাধারা ছোটাছুটি করে। সে নিজে নিজে অনুসরণের রূপরেখা তৈরি করে নেয়। ফলে যা হবার তাই হয়। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবো। অবশ্য আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থাতেও এটা বিদ্যমান। দেখা যায়, সারা বছর একই বই পড়ে একজন স্বপ্নে মদীনা দেখে, আরেকজন স্বপ্নে দেখে ইউরোপের কোন উলঙ্গ শহর। কেউ নিজেকে ইবনে তায়মিয়া মনে করে, কেউ আবার নিজেকে রবীন্দ্রনাথ মনে করে। আবার কেউ নিজেকে নিউটন ভাবে।

আপনিই বলুন! আদর্শের জায়গা এত বিক্ষিপ্ত হবে কেন? এখন আপনি বলতে পারেন, ‘আপনারাই তো বলেন যে, আমাদের আলেম দরকার আছে। আবার ডাক্তারও দরকার আছে’। হ্যঁা, সত্যিই দরকার আছে। তবে আদর্শিক জায়গায় আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কঠিন সংকীর্ণতা রয়েছে। আমাদের একমাত্র আদর্শ মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তাঁকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করার পরে আমাদের বাকী আলাপ হয়। তাঁকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা যদি বিজ্ঞানী হ’তে পারে তবে হোক। যদি না পারে তবে না হোক। বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীরা নিউটনকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করবে এটা মেনে নেয়া যায় না। আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখের সামনে বখাটের মত চুল রাখবে আর বেশ-ভূষায় পশ্চিমাদের অনুসরণ করবে এটাও মানা যায় না।

এবার আসি আদর্শের প্রয়োগ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে। আদর্শ অনেকগুলো বিষয়ের সমষ্টি। এর মাঝে ইবাদতে পাবন্দী, পোষাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, চুল-দাড়ি ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত। আদর্শের আলোচনা থাকবে শিক্ষকদের নছীহতে। আদর্শ অনুসরণের সুবিধার্থে মাদ্রাসা থেকে একটি লিখিত নীতিমালা থাকবে। শিক্ষকরা সারা বছর সে বিষয়গুলো নোট করবেন এবং বার্ষিক পরীক্ষায় ১০০ নম্বরে আদর্শের মূল্যায়ন করা হবে। যদি বলেন, ১০০ নম্বর অনেক বেশী হয়ে যায়, তবে আমরা বলব, আদর্শে ১০০ নম্বর কমই হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদর্শে আরো বেশী নম্বর রাখা প্রয়োজন।

সম্প্রতি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কওমী শিক্ষাবোর্ডের দাওরায়ে হাদীছ পরীক্ষায় ক্বিরাআত নামে ১০০ নম্বরের একটি মৌখিক পরীক্ষা রয়েছে। সেখানে শুধু কুরআন তিলাওয়াত শোনা হয় এবং বেশ-ভূষা, মুখের দাড়ি ইত্যাদি দেখা হয়। আর কিছু নয়। যদি কেউ ক্বিরাআত পরীক্ষায় পাশ নম্বর না পায় তবে তাকে পরের বছর আবার বোর্ড পরীক্ষা দিতে হবে। অন্যান্য বিষয়ে যতই ভাল নম্বর পাক সে অকৃতকার্য বলেই গণ্য হবে। দেখুন! যে কুরআন তিলাওয়াত একজন ছাত্র মক্তবে শিখেছে সে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে দাওরায়ে হাদীছে! বোর্ডের উদ্দেশ্য যে, অশুদ্ধ তিলাওয়াতকারী বা বেশ-ভূষায় তাদের আদর্শের বহির্ভুত কোন শিক্ষার্থীকে তারা দাওরার সনদপত্র দেবে না। তাদের এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাবার যোগ্য। প্রত্যেকটি শিক্ষাধারায় আদর্শের জায়গাটা মযবূত থাকা যরূরী।

সৃজনশীলতা : এরপরেই সকল স্তরের ছাত্রের জন্য যে বিষয়টিকে কারিকুলাম মূল্যায়ন করবে সেটা সৃজনশীলতা। আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে দিনে দিনে সৃজনশীলতা বিদায় নিচ্ছে। তারা বইয়ের বাইরে কিছু শেখেও না, শেখার প্রয়োজনও মনে করে না। তাদেরকে এই ধারা থেকে বের করে নিয়ে আসার জন্য সৃজনশীলতাকে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। আমি প্রবন্ধ সংক্ষিপ্ত করার জন্য শুধু প্রস্তাবনাগুলো বলছি। এটাই চূড়ান্ত রূপ নয়। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা হ’তে পারে পাঠ্যবইয়ের কবিতাগুলো অভিনয় করে আবৃতি করা, সুন্দরভাবে জাগরণী পরিবেশন করা, সুমধুর কন্ঠে আযান দেয়া, সুন্দরভাবে ছবি আঁকা ইত্যাদি। মাধ্যমিকের সৃজনশীলতা হ’তে পারে আরবী ভাষায় কথা বলতে পারা, ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে পারা, উর্দূ ভাষায় কথা বলতে পারা, যে কোন বিষয়ে উপস্থিত বক্তব্য দিতে পারা ইত্যাদি। উচ্চমাধ্যমিকে সৃজনশীলতা হ’তে পারে যেকোন বিষয়ে উপস্থিত বক্তব্য দিতে পারা, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করা ইত্যাদি। 

প্রত্যেক স্তরের সৃজনশীলতায় কমপক্ষে ৩টি বিষয় থাকবে। যা মোট ৬০ নম্বরে মূল্যায়ন করা হবে। প্রত্যেক ক্লাসের নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল শিক্ষক সৃজনশীলতার মূল্যায়ন করবেন। তিনিই সারা বছরে তাদেরকে বিভিন্নভাবে যাচাই করে একটি নোট তৈরি করবেন। প্রাথমিকে কোনদিন ক্লাসে জাগরণী গাইতে বলবেন। যারা গাইতে পারে তাদের বিষয়টি নোট নিবেন। কোনদিন বলবেন, ইচ্ছামত একটি ছবি আঁক। যারা আঁকতে পারে তাদের বিষয়টি নোট নিবেন। মাধ্যমিকে হঠাৎ একদিন উপস্থিত কোন ইস্যু নিয়ে উপস্থিত বক্তব্য আহবান করবেন। তবে উচ্চমাধ্যমিকে সৃজনশীলতা শিক্ষার্থীদের এ্যাকটিভিটি লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে ইনশাআল্লাহ।

সুন্দর হস্তাক্ষর ও আরবীতে উত্তরপত্র লেখা : আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতের লেখার মান যে খুবই খারাপ তা না বললেও আপনারা জানেন। হাতের লেখার মূল্যায়ন কোন কোন শিক্ষাধারায় রয়েছে। তবে মূল্যায়নের বিষয়টি সার্বজনীন না করলে শিক্ষার্থীরা হাতের লেখা সুন্দর করার প্রয়োজনীতা অনুভব করছে না। ফলাফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রের হাতের লেখা একই রকম হয়ে গেছে। আমরা লেখা দেখে আর অনুমান করতে পারছি না যে, লেখক কোন ক্লাসে পড়ে। এ অবস্থায় বাড়তি নম্বর দিয়ে হাতের লেখাকে মূল্যায়ন করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এছাড়াও একজন ছাত্রের সুন্দর ঝরঝরে লেখা আরেকজনের অস্পষ্ট ও এবড়ো থেবড়ো লেখার ওপরে প্রাধান্য পাবে না, এটা নীতিগতভাবেও মানা যায় না।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্রে ৯৫ নম্বরের প্রশ্ন হবে। বাকী ৫ নম্বর বরাদ্দ থাকবে সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য। যাদের হাতের লেখা স্পষ্ট শুধু তারাই ৯৫ এর ওপরে মার্কস পাওয়ার আশা করতে পারে। উচ্চমাধ্যমিক থেকে ওপরের দিকেও প্রশ্নপত্র ৯৫ নম্বরেরই হবে। তবে তাদের অতিরিক্ত ৫ নম্বর অরবীতে উত্তরপত্র লেখার ওপরে থাকবে। যখন ছাত্ররা দেখবে, আরবীতে না লিখলে মুমতায (৯০% মার্কস) ধরে রাখা একরকমের অসম্ভব হচ্ছে, তখন তারা নিজ উদ্যোগেই আরবী লিখতে শুরু করবে। এছাড়াও উচ্চমাধ্যমিকের একজন শিক্ষার্থী আরবীতে সম্পূর্ণ উত্তর লিখেছে আরেকজন লিখেছে বাংলায়। এই দুজনের উত্তরপত্র যদি একই মাপকাঠিতে মূল্যায়িত হয়, আরবী যদি প্রাধান্য না পায় তবে ছাত্ররা আরবী লিখবে কেন? সুতরাং আমাদের মনে হয় সুন্দর হস্তাক্ষর ও আরবীতে উত্তরপত্র লেখাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা যরূরী।

প্রাথমিকের মূল্যায়নযোগ্য প্রতিভা : প্রতিটি স্তরের জন্য আমরা দুইটি করে অতিরিক্ত প্রতিভা প্রস্তাব করব। যেগুলো মোট ৪০ নম্বরে মূল্যায়ন করা হবে। তাহ’লে প্রতিটি স্তরে আদর্শে ১০০ এবং সৃজনশীলতা ও অতিরিক্ত প্রতিভায় ১০০, মোট ২০০ নম্বর কারিকুলামে নতুন যোগ করতে হবে। প্রাথমিকের জন্য অতিরিক্ত প্রতিভা হিসাবে প্রথম যেটা প্রস্তাব করা হবে তা হ’ল, ‘দলগত কাজে সহযোগিতার মানসিকতা’। কারণ তারা ছোট। ছোট থেকেই অপরকে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। অন্যথা বড় হওয়ার পরে এই মানসিকতা তৈরি হওয়া কঠিন।

এক্ষেত্রে শিক্ষকগণ অপরকে সাহায্য করার পদ্ধতি উদাহরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝাবেন এবং এটা যে উত্তম এবং ছওয়াবের কাজ তা এদের মস্তিষ্কে গেঁথে দিবেন। সালাফে ছালেহীনের জীবন থেকে অপরকে সাহায্য করার ঘটনাগুলো তাদেরকে শোনাবেন। এরপর কোন একদিন ক্লাসের সকল ছাত্রকে একটি সম্মিলিত কাজের দায়িত্ব দিবেন এবং সেখানে কে কোন ভূমিকায় রয়েছে সেটা নোট করবেন। এভাবে বছরে কয়েকদিন তাদের পরীক্ষা করার মাধ্যমে অপরকে সহযোগিতার মানসিকতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। 

প্রথমিকে এরপরে যে বিষয়টি আমরা প্রস্তাব করতে চাই তা হ’ল, দায়িত্ববোধ। একজন শিক্ষার্থীর মাঝে দায়িত্ববোধও এই বয়স থেকেই তৈরি হ’তে হবে। দায়িত্ব কাকে বলে তাকে বুঝতে হবে। তাদেরকে ক্লাসভেদে দায়িত্ব দিতে হবে। যেমন, কাউকে বলা হ’ল, আমি ক্লাসে আসার পূর্বে তুমি প্রতিদিন আমার চেয়ারটা মুছে রাখবে। কাউকে বোর্ড মুছে রাখার দায়িত্ব দেয়া হ’ল। কাউকে জানালা খুলে রাখার দায়িত্ব দেয়া হ’ল। এই ছোট্ট ছোট্ট দায়িত্বগুলো তারা কতটা নিখুঁতভাবে পালন করতে পারছে সেটা নোট করে সেই অনুযায়ী দায়িত্ববোধ মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রতিমাসে এই কাজগুলোতে নতুন দায়িত্বশীল এনে তাদেরকেও যাচাই করা যাবে। এগুলোর মাধ্যমে একজন ছাত্র আদর্শিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা, সুন্দর হস্তাক্ষর, দায়িত্ববোধ ও অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা নিয়ে প্রাথমিক পাড়ি দেবে ইনশাআল্লাহ। 

মাধ্যমিকের মূল্যায়নযোগ্য প্রতিভা : মাধ্যমিকের জন্য আমরা প্রথমেই ‘উপস্থাপন দক্ষতা’র বিষয়টি প্রস্তাব করব। উপস্থাপন দক্ষতার মৌলিক বিষয় হ’ল ভাষা জ্ঞান। অর্থাৎ বক্তব্যের ভাষা, প্রবন্ধ-নিবন্ধের ভাষা, বিতর্কের ভাষা, সমালোচনার ভাষা ইত্যাদির ওপরে সম্যক ধারণা থাকা। ক্ষেত্রভেদে এই ভাষাগুলো পরিবর্তন হয়ে থাকে। অত্যন্ত দুঃখের সাথেই বলতে হয় যে, আমাদের মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে বক্তব্য চর্চার আধিক্য ধরে রেখেছে কওমী প্রতিষ্ঠান। কওমী প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কিতাব বিভাগে দুই তিন বছরের অধ্যয়নে স্টেজে কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলে। তবে তাদের ভাষাচর্চা সর্বদা আমাদের নিরাশ করেছে। বড় বড় নামী দামী বক্তাদের মুখেও আমরা এমন সব সমালোচনার ভাষা শুনি যা আমাদের ব্যথিত করে। সাধারণ বক্তব্যেও নিরেট শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা বক্তা খুবই কম।

ক্ষেত্রভেদে ভাষাচর্চা নতুন বিষয় নয়। হাযার বছর আগে আমাদের ইমামগণ প্রবন্ধ লিখেছেন। ফৎওয়া লিখেছেন। একে অপরের সমালোচনাও করেছেন। এক ইমাম আরেক ইমামের সাথে দ্বিমত করে ফৎওয়া লিখেছেন। আমাদের সকল ঘরানার ওলামায়ে কেরাম অন্যান্য উপস্থাপনায় বেশ সিদ্ধহস্ত হ’লেও সমালোচনার বেলায় তারা ভাষার খেই হারিয়ে ফেলেন। একে অপরকে গালি দেয়া শুরু করেন। আমরা চাই না, আমাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ জীবনে গালি-গালাজে অভ্যস্ত হোক। তারা এমনি কথা বলুক, প্রবন্ধ লিখুক, বক্তব্য দিক বা কোন অন্যায়ের সমালোচনা করুক, তাদের ভাষা যেন সর্বদা শালীন ও মার্জিত হয়। এ বিষয়গুলোতে ছাত্রদের অভ্যস্ত করতে হবে এবং তাদের লেখাপত্র-কথাবার্তা থেকেই এই বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে।

এরপরে মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বিষয় হিসাবে ‘নেতৃত্বের যোগ্যতা’ থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠান যদি সাংগঠনিক হয় তবে নেতৃত্বের চর্চা ও মূল্যায়ন সহজ হয়। কারণ আমাদের নেতৃত্ব এটা নয় যে, ছাত্রদেরকে নিয়ে রাজপথে নামতে হবে। আমাদের কাছে নেতৃত্বের যোগ্যতা বলতে একজন আদর্শ নেতার যে সকল গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, সে সকল গুণাবলী ছাত্রের মাঝে থাকতে হবে। যোগ্য নেতার গুণাবলীর দিকে লক্ষ্য না করে কেবল ছাত্রদেরকে নিয়ে দলাদলি করা নেতৃত্বের যোগ্যতা হিসাবে গণ্য হবে না। পাশাপাশি শিক্ষার্থী যখন সাংগঠনিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকবে তখনই তাকে নেতৃত্বের যোগ্য হিসাবে বিবেচনা করা হবে। কারণ আমরা রাজপথ কাঁপানো শ্লোগানের ধ্বনির মাঝে যোগ্য নেতা খুঁজি না। আমরা আখেরাতমুখী মানুষ তৈরি করতে চাই। এজন্য আমাদের সকল নীতিতে কিছুটা ভিন্নতা থাকবেই। এই ধারায় একজন ছাত্র আদর্শিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা, সুন্দর হস্তাক্ষর, উপস্থাপন দক্ষতা এবং নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে মাধ্যমিক পাড়ি দেবে ইনশাআল্লাহ।

উচ্চমাধ্যমিকের মূল্যায়নযোগ্য প্রতিভা : এই স্তরে শিক্ষার্থীরা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়। একাডেমিক বা পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে তাদেরকে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। এজন্য এই স্তরে আমরা প্রথম বিষয় হিসাবে ‘সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাবনা’র যোগ্যতাকে রাখতে চাই। আপনারা মনে করতে পারেন, এটা কোন বিষয় হ’ল! এটা তো সবাই পারে। না, এটা সবাই পারে না। প্রত্যেকটি স্থানেই সমস্যা বিদ্যমান। তবে আমাদেরকে যখনই সমস্যা বিশ্লেষণ করতে বলা হয় তখন শতকরা ৯৯ জনই অভিযোগের পসরা সাজিয়ে বসি। দেখুন! সমস্যা উপস্থাপন ও অভিযোগের ভেতরে পার্থক্য রয়েছে। ছাত্রদেরকে যদি বড় ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে তিন দিনের ছুটি চেয়ে দরখাস্ত লেখা শিখানো যায় তবে সমস্যা সংবলিত একটি পরিস্থিতি থেকে সমস্যা বিশ্লেষণ লেখাও শিখানো যায়। 

এবার আসি সমাধান প্রস্তাবনার বিষয়ে। আমরা দীর্ঘ কারিকুলামে শুধু গণিতের সমস্যা সমাধান আর তারকীবের সমস্যা সমাধান করতেই শিখি। আর বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলোতে অভিযোগ করতে শিখি। তবে আমাদের সেটাও সমাধানের কৌশল শেখার দরকার ছিল। শিক্ষার্থীরা সমাধানের কৌশল শিখবে শিক্ষকদের আলোচনা এবং ইতিহাস থেকে। আর তারা এটা চর্চা করবে নিজেদের জীবনে ও অঙ্গনে। শিক্ষকগণ এই বিষয়টি মূল্যায়ন করবেন তাদের বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ দেখে। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তাদেরকে সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধান প্রস্তাবনার এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া যেতে পারে। এতেও তাদের যোগ্যতার স্তর পরিমাপ করা যাবে ইনশাআল্লাহ।

এই স্তরের দ্বিতীয় প্রতিভা হিসাবে আমরা ‘কাউন্সেলিং’ রাখতে পারি। কাউন্সেলিং একটি নববী গুণ। আমাদের নবী (ছাঃ)-এর জীবনীর দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে মানুষ তাঁর কাছে আসত। তিনি কখনো তাদের সান্ত্বনা দিতেন। কখনো পরামর্শ দিতেন। এটাই কাউন্সেলিং। আধুনিক যুগে এটি একটি পেশাতে রূপ নিয়েছে। এর মৌলিক কাজ হ’ল, বয়সতান্ত্রিক সমস্যা, মানসিক ও পারিবারিক চাপ ইত্যাদিতে দ্বীনী দিকনির্দেশনা প্রদান করা। এটা অনেকটা মাসনিক চিকিৎসার মত। যা সবাই পারে না। এজন্য দেখা যায়, পরামর্শদাতা হিসাবে সবাই পারফেক্ট হয় না। এ বিষয়ের মূল্যায়ন হ’তে পারে এ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে। আবার প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের কোন আত্মনিয়ন্ত্রণহীন ছাত্রের কাউন্সেলিং এর দায়িত্ব দিয়েও দেখা যেতে পারে।

শেষকথা : আলোচ্য প্রবন্ধে যে বিষয়টি প্রস্তাবিত হয়েছে তা নিতান্তই অসম্পূর্ণ। এটাই চূড়ান্ত রূপ নয় বা আলোচনা এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে পাড়ি দিতে হবে আরো অনেক পথ। সকলে মিলে এটাকে চূড়ান্ত রূপ দিতে হবে। বিষয়গুলোতে কমবেশী বা নম্বরে কমবেশী হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রস্ত্ততি নিতে হবে। তারা কোন প্রতিভাগুলো কিভাবে বিকশিত করার চেষ্টা করবেন। কিভাবে মূল্যায়ন করবেন। এই বিষয়গুলোর একটি রূপরেখা দরকার হবে। সব মিলিয়ে অনেক সময়ের দরকার। তবে দুঃখের বিষয় হ’ল, এতটা সময় আমাদের নেই।

আমরা সবকিছু খুব শর্টকার্টে শেষ করতে চাই। কিন্তু পদ্ধতিগত ভুলের কারণে আমাদের ফলাফল সেই শূন্যের কোটায়। ঔষধ খাওয়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য নছীহত করতে করতে আমরা ক্লান্ত। তারপরও তারা চকলেট খেতেই আগ্রহী। আমরা চাই যোগ্যতা। তারা চায় শুধুমাত্র মার্কস। এখন চকলেটের ভেতরে ঔষধ ঢুকিয়ে খাওয়ানো ছাড়া আর কোন পথ নেই। আমরা আলোচ্য প্রবন্ধে সেটাই করার চেষ্টা করেছি। প্রতিভা ও পরীক্ষার একটি মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করেছি। আমাদের মনে হয়েছে, এটা সম্ভব। আমাদের মনে হয়েছে, এই প্রতিভাগুলোর মূল্যায়নে নম্বর যত বাড়ানো হবে তত বহুমাত্রিক যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি হবে।

আমাদের মনে হয়, এই প্রস্তাবনাগুলো ঘষামাজা করলে একটি মানসম্মত কারিকুলাম পাওয়া সম্ভব। তবে আমরা জানি, এটা বাস্তবায়িত হবে না। কারণ স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো দিকে। আজ ছাত্র ও অভিভাবকের কাছে আমরা শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান দায়বদ্ধ। বেশী নয়, মাত্র পাঁচজন অভিভাবক যদি একত্রিত হয়ে বলে, এসব নতুন নিয়ম চলবে না। তাহ’লেই আমাদের টনক নড়ে যাবে। আমরা সাথে সাথেই তা বাতিল করব। কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় হার্ডলাইনে যাওয়ার অধিকার কেবল ছাত্র ও অভিভাবকের রয়েছে। তারা যদি একবার বলে এই নিয়ম মানি না। তাহ’লে সাথে সাথেই আমরা নিয়ম পরিবর্তন করি। তারা যদি বলে, অমুক শিক্ষক চাই না। সাথে সাথেই আমরা শিক্ষক পরিবর্তন করি। আসলে আমাদের শুধু অস্তিত্বটুকুই আছে। কোন স্বকীয়তা নেই।

তবুও আমরা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। পাতার পরে পাতা লিখে যাই। আমরা বিশ্বাস করি, এই ধারায় একদিন পরিবর্তন আসবে। সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে। আজ হয়ত আমরা আগুন জ্বালানোর জন্য মশাল খুঁজে পাচ্ছি না। তবে হঠাৎই কোন একদিন হাযার হাযার মশাল চলে আসবে। সেদিন যেন মশাল জ্বালতে একটি দিয়াশলাইয়ের অভাব না হয়। এজন্যই আমরা নিজেদের চিন্তাধারা জমিয়ে রাখছি। আমি আমার এক মুশফিক ওস্তাদকে শিক্ষাধারার বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ করতাম। তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার কাছে অভিযোগ কর। আমার কি এগুলো সংস্কার করার মত সাধ্য আছে? বরং তুমি তোমার প্রতিদিনের অভিযোগগুলো চিরকুটে লিখে একটি বক্সে রেখে দাও। যদি কোনদিন আল্লাহ তোমাকে সামর্থ্য দান করেন সেদিন বক্স থেকে সব অভিযোগগুলো বের করে সমাধান করো’।

তার কথাটা আমার খুব মনে ধরেছিল। তারপর থেকে আমি আর কারো কাছে অভিযোগ করি না। আবার অভিযোগগুলো ভুলেও যাই না। পুষে রাখি। জিইয়ে রাখি। ছোট্ট চারাগাছকে যেভাবে যত্নে রাখা হয় তেমনই যত্নে রাখি আমার এলোমেলো অযৌক্তিক অভিযোগ ও প্রস্তাবনাগুলো। কখনো মনে হয় এগুলো এভাবেই পড়ে থাকবে। কখনো মনে হয়, এগুলো হবে হাযার মশাল জ্বালানো দিয়াশলাই। তবে আমি এই কথাগুলো জমিয়েই রাখব। হয়ত এগুলো কোনদিন পরিবর্তনের সোপান হবে। নয়ত হবে অনর্থক বক্সে সঞ্চয় করা নিছক চিরকুট।

সারওয়ার মিছবাহ 

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, নওদাপাড়া, রাজশাহী।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
আরও
আরও
.