ভূমিকা :
ইসলামী জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হ’ল হাদীছ, যা মূলতঃ রাসূল মুহাম্মাদ (ছা.) প্রদত্ত পবিত্র কুরআনের ভাষ্য বা ব্যাখ্যা। এজন্য কুরআনের সাথে সাথে হাদীছও ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম মূল উৎস। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় হাদীছ শিক্ষাদান, হাদীছের পঠন-পাঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই হাদীছ অধ্যয়ন ও পঠন-পাঠনের কাজ শুরু হয়। অতঃপর যুগ যুগ ধরে হাদীছ সংরক্ষণ ও শিক্ষাদানে মুসলিম ওলামায়ে কেরাম বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, যা মূলত সনদ (বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা) এবং মতন (মূল পাঠ)-এর বিশুদ্ধতা রক্ষায় বিশেষ মনোযোগী ছিল। বাংলাদেশে মাদ্রাসাসমূহে হাদীছ শিক্ষাদান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে সাধারণতঃ যুগ যুগ ধরে চলে আসা সনাতন (Traditional) পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসারের এই যুগে এসে শিক্ষাবিজ্ঞানে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক শিক্ষানীতিতে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষণ, সক্রিয় অংশগ্রহণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে হাদীছ শিক্ষার পদ্ধতিও আধুনিক শিক্ষাগত চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করা প্রয়োজন।[1] শুধু মুখস্থকরণ বা শ্রবণের পরিবর্তে হাদীছের গভীর অনুধাবন, বিশ্লেষণ এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের উপর গুরুত্বারোপ করা এখন সময়ের দাবী।
বাংলাদেশে হাদীছ শিক্ষা কাঠামো :
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় হাদীছ পাঠদান মূলত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় প্রধান দু’টি ধারা বিদ্যমান- (১) আলিয়া মাদ্রাসা এবং (২) কওমী মাদ্রাসা। অপর একটি ধারা হ’ল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক উচ্চতর বিভাগ। নিম্নে উভয়বিধ মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে হাদীছ পাঠদানের বর্তমান চিত্র উল্লেখ করা হ’ল।
কামিল পাঠ্যক্রমে কুতুবে সিত্তাহ (বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, আবূ দাউদ), উছূলুল হাদীছ (হাদীছ শাস্ত্রের মূলনীতি), ইলমুর রিজাল (বর্ণনাকারী রাবীদের জীবনী) এবং ইলমুল জারাহ ওয়াত-তা‘দীল (বর্ণনাকারী রাবীদের সমালোচনা)-সহ প্রধান প্রধান হাদীছ গ্রন্থগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। ১৯০৭ সালে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ হাদীছ ক্লাস চালু হয় এবং কামিল স্তরে হাদীছ বিষয়ে তিন বছরের কোর্স চালু করা হয়।[2]
তবে পদ্ধতিগতভাবে এতে পাঠদান পদ্ধতি এখনও প্রাচীন ও টেক্সট-নির্ভর। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়শই হাদীছের মূল বার্তা অনুধাবন না করে মুখস্থনির্ভরতা অর্জন করে। এতে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির সাথে সমন্বয়ের বিশেষ সুযোগ নেই এবং প্রযুক্তির ব্যবহারও এতে খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের প্রচলিত হাদীছ পাঠদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা
প্রাচীনকাল থেকে হাদীছ শিক্ষাদানের প্রধান পদ্ধতিগুলো হ’ল সামা‘ (السَّمَاع) (শ্রবণ), ক্বিরাআত (الْقِرَائَةُ) (পাঠ), ইজাযাহ (الْإِجَازَة) (অনুমতি), মুনাওয়ালাহ (الْمُنَاوَلَةُ) (হস্তান্তর)[5] ইত্যাদি। সামা‘ এবং ক্বিরাআত পদ্ধতি হাদীছের বিশুদ্ধতা রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর হ’লেও আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারার পাঠদানে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন-
(১) শিক্ষার্থীর নিষ্ক্রিয়তা ও অনুধাবনের অভাব :
সামা‘ (শ্রবণ) পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা মূলত নিষ্ক্রিয় শ্রোতা হিসাবে থাকে, যা তাদের মধ্যে অনেক সময় শেখার আগ্রহ ও উদ্দীপনা কমিয়ে দেয়। এতে শুধুমাত্র মুখস্থকরণ বা শ্রবণের উপর জোর দেওয়ায় হাদীছের গভীর অর্থ, প্রেক্ষাপট এবং সমকালীন প্রয়োগ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন ক্ষমতা খুব সীমাবদ্ধ থাকে।
(২) মুখস্থ ও অনুবাদনির্ভর শিক্ষা :
বাংলাদেশে হাদীছ পাঠদানের স্বাভাবিক চিত্র হ’ল একজন শিক্ষক বা মুহাদ্দিছ কোন নির্দিষ্ট হাদীছ গ্রন্থ থেকে ধারাবাহিকভাবে হাদীছের অনুবাদ করবেন আর শিক্ষার্থীরা তা শুনবেন। কখনও শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকবে। আর শিক্ষক শুনতে থাকবেন এবং প্রয়োজন মনে করলে কোন হাদীছের অর্থ করে দিবেন। এইভাবে পুরো গ্রন্থ পড়া ও শোনার মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়। আর কিছু হাদীছ মুখস্থ করার এবং তা পরীক্ষায় উপস্থাপন করার মাধ্যমে হাদীছ পাঠের এই গুরুদায়িত্ব সম্পন্ন করেন। এক শিক্ষাবর্ষে একটি বড় হাদীছ গ্রন্থ ধারাবাহিকভাবে পড়ে শেষ করা অথবা নির্ধারিত সিলেবাস পড়ে শেষ করাই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হিসাবে ধরা হয়। হাদীছের অর্থ অনুধাবন, শরী‘আতের বিধান উদ্ভাবন, নিজ সমাজ ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট থেকে হাদীছকে বিশ্লেষণের বিশেষ কোন আবেদন সেখানে উপস্থিত থাকে না। ফলে হাদীছ পাঠদান স্রেফ মুখস্থ এবং আংশিক অনুবাদ নির্ভর হয়ে যায়, যা থেকে শিক্ষার্থীদের হাদীছের ইবারত বা টেক্সট পাঠে দক্ষতা অর্জন ছাড়া আর বিশেষ কিছু অর্জন করার সুযোগ থাকে না।
(৩) শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা বিকাশের ঘাটতি : হাদীছের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়, সনদ বিশ্লেষণ, শারঈ মাসআলা উদ্ভাবন, সমকালীন প্রেক্ষাপটের আলোকে হাদীছের নির্দেশনা অনুধাবন ইত্যাদির তেমন কোন সুযোগ নেই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায়। এর পিছনে প্রধানত দু’টি কারণ রয়েছে। প্রথমতঃ একজন শিক্ষককে খুব সীমিত সময়ের মধ্যে বিশাল সিলেবাস পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হয়, যা তাকে শিক্ষার্থীদের সাথে নতুন উদ্ভাবনী আলোচনায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ দেয় না। এতে হাদীছের জটিল বিষয়বস্ত্ত বিশ্লেষণ করার সুযোগ খুব কম থাকে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশ হ’তে দেয় না। দ্বিতীয়তঃ সুনির্দিষ্ট কোন মাযহাবকে কেন্দ্র করে হাদীছ অধ্যয়নের কারণে অন্য মাযহাবসমূহের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজের অনুসৃত মাযহাবী বিদ্বানদের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার প্রদানই হাদীছের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাধারার উন্মুক্ত অনুশীলনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদেরকে একমুখী চিন্তাধারায় গন্ডিবদ্ধ করে ফেলা হয়।
(৪) প্রাচীন আরবী ভাষার সাথে সম্পর্ক না থাকা ও পরিভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা : হাদীছ পাঠদানের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রাচীন আরবী ভাষারীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও বিভিন্ন অপ্রচলিত পরিভাষার সাথে পরিচিত না থাকা। উচ্চতর আরবী ভাষা, অলংকার শাস্ত্র, মূলনীতি শাস্ত্র প্রভৃতি সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান না থাকার কারণে হাদীছ পাঠদান, পঠন ও অনুধাবন প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়।[6]
(৫) প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকা : আধুনিক যুগে হাদীছ পাঠদানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হ’ল প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে না জানা। কেননা হাদীছের বিশাল বিশাল গ্রন্থসমূহ বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে ডিজিটাল গ্রন্থে পরিণত হয়েছে, যা থেকে খুব সহজেই যে কোন হাদীছ ও তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণগুলো জানা সম্ভব হয়। কেবল মাকতাবা শামেলা নামক ওয়েবসাইটে প্রযুক্তির যে অপরূপ সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে, তা যেন হাদীছ পাঠদানের সমস্ত উপকরণকে হাতের মুঠোয় নিয়ে চলে এসেছে। হাদীছের শব্দ বিশ্লেষণ, অর্থ বিশ্লেষণ, সনদ বিশ্লেষণ, রাবীদের জীবনী ও তাদের গ্রহণযোগ্যতা নির্ণয় ইত্যাদি এখন কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার, যা ইতিপূর্বে দিনের পর দিন গবেষণা করেও বের করা সহজ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় বিদ্বানগণ প্রযুক্তি ব্যবহারে বিশেষ স্বচ্ছন্দ না থাকার কারণে এই বিরাট জগতের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক তৈরী হয় না। ফলে হাদীছ পাঠদানে প্রযুক্তি তারা নিজেরাও ব্যবহার করেন না, অপরকেও উৎসাহিত করেন না। যা হাদীছ পাঠদানের ক্ষেত্রে এক বিশাল ব্যবধান তৈরী করেছে। এটি বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য হাদীছ শিক্ষাকে অধিকতর উপযোগী করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।[7]
(৬) পাঠদানের সাথে সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ না থাকা : বর্তমান সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে শরী‘আতের দিক-নির্দেশনা কি হবে তা নির্ণয় করতে হাদীছের সঠিক ও যুগোপযোগী ব্যাখ্যার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে হাদীছ পাঠদান কালে শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের সাথে হাদীছের সামগ্রিক অর্থের চেয়ে নির্দিষ্ট অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন বলে হাদীছ পাঠদান হয়ে যায় একঘেঁয়ে এবং অতীত নির্ভর, যা সমকালীন যুগের চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট হয় না।[8]
(৭) পাঠদানের ক্ষেত্রে গবেষণা উপকরণের অভাব :
হাদীছ পাঠদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বই-পত্রসহ অন্যান্য গবেষণা উপকরণ না থাকা হাদীছ পাঠদানে এক বিশাল অনগ্রসরতার পরিচয় বহন করে। সকল বিষয়ের ব্যবহারিক (Practical) অংশে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে তার অর্জিত শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু হাদীছ শিক্ষার্থী দেরকে অনুরূপ কোন ব্যবহারিক ক্লাস সাধারণতঃ দেয়া হয় না, যার মাধ্যমে তারা একক বা দলগত উপায়ে হাদীছ থেকে অর্জিত শিক্ষাকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া কম্পিউটার, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা না থাকায় হাদীছ গবেষণাও প্রাচীন আবহেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।[9]
আধুনিক শিক্ষাকাঠামোর বৈশিষ্ট্য :
শিল্পবিপ্লবের পর থেকে প্রাচীন শ্রুতি ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষার লক্ষ্যে যেমন পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি শিক্ষার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন এসেছে। পূর্বযুগে পড়াশোনার মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিকতা ও মানবিকতার উৎকর্ষ সাধন। কিন্তু আধুনিককালে উপার্জন, কর্মসংস্থান ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনই শিক্ষার মূল লক্ষ্য। এজন্য ধর্ম, সাহিত্য ও দর্শনের চেয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরী বিদ্যাই মানুষের আগ্রহের বিষয়বস্ত্ত। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ, গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তনের বিকাশ আধুনিক শিক্ষাধারার অন্যতম দিক। শিক্ষকগণ এতে যতটা না গুরুর ভূমিকায়, তার চেয়ে বেশী মেন্টর বা গাইডের ভূমিকায় থাকেন। ছাত্ররা এখানে কেবল শিক্ষার্থী নয় বরং জ্ঞানার্জনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। পাঠ্যবই ভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে বাস্তবমুখী শিক্ষা এখানে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নয় বরং শিক্ষার্থীই মূল কেন্দ্রবিন্দু। পড়াশোনায় প্রযুক্তি ও মাল্টিমিডিয়া এখন অপরিহার্য মাধ্যম। নিয়মিত পড়াশোনার বাইরে সহপাঠমূলক কার্যক্রমকে অপরিহার্য যোগ্যতা হিসাবে দেখা হয়। সর্বোপরি আধুনিক শিক্ষাকাঠামোতে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিটি মানুষের একটি আবশ্যিক চাহিদা হিসাবে পরিগণিত হয়।
আধুনিক শিক্ষা কাঠামোতে হাদীছ পাঠদানের উদ্ভাবনী পন্থাসমূহ
আধুনিক শিক্ষা কাঠামোতে হাদীছ শিক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী এবং আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন উদ্ভাবনী শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিগুলো মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উপলব্ধি, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। বিশ্বায়নের এই যুগে হাদীছ পাঠদান পদ্ধতিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যুগোপযোগী করার জন্য নিম্নোক্ত পন্থাসমূহ অবলম্বন করা যেতে পারে।
ক. পারস্পরিক আলোচনাভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি :
সরাসরি হাদীছ ধারাবাহিকভাবে পাঠ করা কিংবা অনুবাদের পরিবর্তে শ্রেণীকক্ষে হাদীছ পাঠদানকে আকর্ষণীয় করার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-
(১) নির্দিষ্ট হাদীছ গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায় (كتاب)-কে প্রথমে মূলপাঠ হিসাবে ধরে নিয়ে দারস বা পাঠদান শুরু করা এবং সারাংশমূলক আলোচনা করা।[10]
(২) উক্ত অধ্যায়ভুক্ত অনুচ্ছেদ (باب) গুলো সম্পর্কে প্রথমে সামগ্রিক ধারণা দেয়া, অতঃপর অন্তর্ভুক্ত হাদীছগুলোকে অধ্যায় ও অনুচ্ছেদের সাথে সমন্বয় (التطبيق) প্রদান করা, তার অন্যান্য সূত্র (طرق الحديث) গুলো সম্পর্কে ধারণা দেয়া এবং সবশেষে তার উপর সাধারণ আলোচনা-ভিত্তিক ক্লাস, শব্দ ও অর্থ বিশ্লেষণ, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং সমাজের বাস্তব সমস্যা শারঈ দৃষ্টিভঙ্গিতে (مقاصد الشريعة) পর্যালোচনার মাধ্যমে পাঠদান করা।[11] এই পদ্ধতির পাঠদানকে হাদীছের বিষয়বস্ত্ত ভিত্তিক পাঠদান (الحديث الموضوعي) বলা হয়, যার মাধ্যমে হাদীছের বিষয়ভিত্তিক একটি পরিপূর্ণ ধারণা দেয়া যায়।[12]
(৩) হাদীছের তাখরীজ (التخريج) বা অন্যান্য সূত্রের বর্ণনাগুলোকে আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে হাদীছটির বিভিন্ন সনদ বিশ্লেষণ, অন্যান্য সূত্রের বর্ণনা থেকে হাদীছটির পাঠভিন্নতা, শব্দ ও অর্থগত বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি ফিক্বহী বিশ্লেষণের মাধ্যমে হাদীছটির উপর পূর্ণ ধারণা অর্জন করা যায়। এই পদ্ধতির পাঠদানকে হাদীছ ভিত্তিক পাঠদান (الحديث التحليلي) বলা হয়, যার মাধ্যমে কোন একটি
হাদীছের আদ্যোপান্ত সবিস্তার জানা সম্ভব হয়।[13]
(৪) হাদীছের রাবী এবং সংযোগসূত্রের রাবী (مدار الإسناد) সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা, যাতে হাদীছের সনদ ও মতনগত আলোচনা আরো বেশী সূক্ষ্ম হয় এবং হাদীছের সনদ ও মতনের জটিল বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা আয়ত্ত করতে পারে। এই পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই সমানভাবে সক্রিয় থাকে। ফলে স্বল্পসময়ে পাঠদানের মূল উদ্দেশ্য হাছিল হয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের সচেতন অংশগ্রহণের কারণে পাঠ্যবিষয়টি শিক্ষার্থীরা সামগ্রিকভাবে ধারণ করতে পারে।[14]
খ. সক্রিয় শিক্ষণ (Active Learning) পদ্ধতি :
সক্রিয় শিক্ষণ শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত করে, যা তাদের জ্ঞান ধারণ ক্ষমতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বৃদ্ধি করে। এক্ষেত্রে কয়েকটি কাজ করা যেতে পারে। যেমন- (১) শিক্ষার্থীদের ছোট দলে ভাগ করে নির্দিষ্ট হাদীছের উপর গবেষণা, বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপনার কাজ (Project) দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে জ্ঞান আদান-প্রদান করতে পারবে এবং উপস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। (২) শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধভাবে ‘পিয়ার লার্নিং’ (Peer Learning)-এর মাধ্যমে একে অপরকে হাদীছ শেখাতে পারে, যাতে তাদের বোধগম্যতা ও উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। প্রাচীন طريقة التكرار (Group Discussions) পদ্ধতির সাথে এর মিল রয়েছে, তবে এর পার্থক্য হ‘ল প্রত্যেকেই এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং দলগতভাবে সমস্যার সমাধান করে। ফলে সকল শিক্ষার্থীর মাঝেই গড়পড়তা দক্ষতা অর্জিত হয়। (৩) হাদীছের পাঠ শেষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর এবং বিতর্ক সেশনের আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে তারা হাদীছের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে পারবে এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করতে পারবে। এক্ষেত্রে কেস স্টাডি (Case Studies), এবং হাতে-কলমে অনুশীলন (hands-on practice) পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। (৪) ক্ষেত্র অধ্যয়ন (Field Study) তথা হাদীছের বিষয়বস্ত্তর সাথে সম্পর্কিত বাস্তব স্থান বা পরিস্থিতি পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা, যা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানমূলক জ্ঞান (Problem-based Learning) এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্ঞান (Experiential Learning) অর্জনে সহায়তা করবে। (৫) বিশেষ গবেষণা প্রকল্প (Research Project) তৈরী করা, যার মাধ্যমে হাদীছ শিক্ষার্থীরা উচ্চতর গবেষণামুখী হবে এবং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে রাসূল (ছা.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি যেমন পর্যালোচনা করতে পারবে, তেমনি সুন্নাহভিত্তিক সমাধানের পথ উন্মুক্ত করতে পারবে।[15] এভাবে দলগত আলোচনা, সহপাঠ্য কার্যক্রম এবং অনুকূল শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা উৎসাহিত করে, পাঠ আত্মস্থ করতে সহায়তা করে এবং তাদের ভুল শনাক্ত করতে, জবাবদিহিতা বজায় রাখতে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।
গ. প্রসঙ্গভিত্তিক শিক্ষণ (Contextual Learning) পদ্ধতি :
সমকালীন কেস স্টাডি ও বাস্তব জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতি উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীদেরকে হাদীছের আলোকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। যেমন একটি সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে কোন হাদীছটি প্রযোজ্য এবং কিভাবে তা সমাধান করা যায়। এছাড়া নির্দিষ্ট কোন হাদীছকে বিষয়বস্ত্ত হিসাবে নিয়ে গবেষণা প্রকল্প (Project assignments) তৈরী করা যেতে পারে। এতে হাদীছটির ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করা ও তার সামাজিক প্রভাব ব্যাখ্যা করা, তার শিক্ষাগুলো বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে (Real-world contexts) কিভাবে প্রযোজ্য এবং তার বাস্তবিক প্রয়োগ কি হ’তে পারে, তা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা ও বিশ্লেষণী (Critical Thinking) দক্ষতার উন্মেষ ঘটে।[16] এই ধরনের কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের চিন্তাশীলতা ও গবেষণামনস্কতা বাড়ায়। এজন্য সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক প্রজেক্ট নির্ধারণ করার মাধ্যমে হাদীছ পাঠদানকে অধিকতর কার্যকর করা সম্ভব।[17]
ঘ. বিভিন্ন জ্ঞানের সাথে সমন্বয় পদ্ধতি :
হাদীছ পাঠদানকালে হাদীছের বিষয়বস্ত্তর সাথে সীরাহ, ইতিহাস, ফিক্বহ, আরবী ভাষা, সমাজবিজ্ঞান, প্রকৃতি বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমকালীন বিশ্ব ইত্যাদির সাথে সমন্বয় ঘটালে বিষয়বস্তুর গভীরতা ও প্রাসঙ্গিকতা বেড়ে যায়।[18] শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরদর্শিতা ও জ্ঞানার্জনের প্রতি প্রবল তৃষ্ণা বৃদ্ধি পায়। এটি তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক।[19] তদুপুরি এর মাধ্যমে হাদীছের শিক্ষাকে পরিবেশ সচেতনতা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা এবং সামাজিক সংঘাত সমাধানের মতো সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।[20] এভাবে এই আন্তঃবিষয়ক পদ্ধতির[21] মাধ্যমে প্রথমতঃ হাদীছ শিক্ষাকে সমসাময়িক জীবনের জন্য আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলা সম্ভব হবে এবং এর মাধ্যমে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হ’তে পারে যারা ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিক সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে, যার ফলে তাদের কর্মসংস্থান এবং সমাজের সাথে সম্পৃক্ততা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়তঃ হাদীছ শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট মাযহাব কেন্দ্রিক হওয়ার পরিবর্তে আন্তঃমাযহাব সমন্বয়মূলক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটবে এবং এর মাধ্যমে মাযহাবী ফিক্বহ (فقه المذاهب) -এর পরিবর্তে হাদীছ ভিত্তিক ফিক্বহ (فقه الحديث والسنة)-এর অনুশীলন জোরদার হবে, যা মুসলিম উম্মাহর মধ্যকার ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে লঘু করে উম্মাহর সামগ্রিক ঐক্যসাধন এবং জ্ঞানগত উৎকর্ষ সাধনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।[22]
ঙ. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার :
২০১৩ সাল থেকে শিক্ষাবিজ্ঞানে টেকনোলজির ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হ’তে থাকে। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারীর আবির্ভাবের পর বিশ্ব শিক্ষা ব্যবস্থা টেকনোলজির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে মিডিয়া ও প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার যুগে হাদীছ পাঠদানে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার অতীব যরূরী।[23] বিশেষত বর্তমানে ডিজিটাল হাদীছ ডেটাবেজ ও হাদীছ অ্যাপের মাধ্যমে হাদীছ অনুসন্ধান, সনদের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাই, হাদীছের সামগ্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে, যার সাথে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পরিচিত হওয়া অত্যাবশ্যক।[24] এছাড়া মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাদীছ অনুধাবনে ব্যাপকভাবে আগ্রহী করা যায়। এভাবে ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ও ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম হাদীছ পাঠদানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।[25]
এক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া যায়। যেমন-
১. ডিজিটাল হাদীছ লাইব্রেরী ও সফটওয়্যার : শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ডিজিটাল হাদীছ লাইব্রেরী (যেমন: মাকতাবাতুশ শামেলা, জাওয়ামিউল কালিম) এবং হাদীছ সফটওয়্যার ব্যবহারের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর মাধ্যমে তারা অতি সহজে হাদীছ অনুসন্ধান, সনদ যাচাই এবং ব্যাখ্যা দেখতে পারবে।[26]
২. অনলাইন কোর্স ও লেকচার : অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের উচ্চমানের অনলাইন লেকচার, কোর্স, সেমিনার এবং ওয়েবিনার আয়োজন করা। দূরবর্তী শিক্ষার্থীরাও এর মাধ্যমে উপকৃত হ’তে পারবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে এগুলোর সরাসরি সম্প্রচার করা যেতে পারে।
৩. মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপন : হাদীছের ব্যাখ্যা, শানে উরুদ (বর্ণনার প্রেক্ষাপট) এবং প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো ভিডিও, অ্যানিমেশন, ইনফোগ্রাফিক্স এবং অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া উপাদানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।
৪. শিক্ষামূলক অ্যাপ : হাদীছের বিষয়বস্ত্ত নিয়ে শিক্ষামূলক মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা ইন্টার্যাক্টিভ কুইজ তৈরি করা, যা শিক্ষার্থীদেরকে মজাদার উপায়ে শিখতে সাহায্য করবে।
৫. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা এনালিটিক্স (Artificial Intelligence and Data Analytics)-এর ব্যবহার : বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যারের আবিস্কার শিক্ষা ও অধ্যয়নকে একেবারেই সহজসাধ্য করে দিয়েছে। অতএব শিক্ষার্থীদেরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার শিক্ষা করতে হবে, যা তাদেরকে সময় থেকে এগিয়ে রাখবে।
বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও সুফারিশমালা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠদান আধুনিকীকরণের জন্য বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্ভাবনী পন্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, পাঠ্যপুস্তকের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক অনাগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ। তবে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে এসব পদ্ধতি চালু করে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছে।[27] সকলের সহায়তা ও আন্তরিকতা নিশ্চিত করা গেলে এসব পদ্ধতি বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়ন সম্ভব। নিম্নে বাংলাদেশে হাদীছ পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ মুকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সুফারিশমালা উপস্থাপন করা হ’ল-
(১) নীতিগত সংস্কার ও পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ :
হাদীছ পাঠদান আধুনিকীকরণের জন্য সবচেয়ে বড় কর্তব্য হ’ল, আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম মানসম্মত ও যুগোপযোগী করা। নতুন হাদীছ পাঠ্যক্রমে সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তাতে প্রচলিত নিয়মে ঢালাওভাবে হাদীছ পাঠদান না করে হাদীছের বিষয়বস্ত্ত ভিত্তিক পাঠদান (الحديث الموضوعي) করা হয় এবং তাতে মৌলিক বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই সাথে হাদীছ ভিত্তিক পাঠদান الحديث التحليلي))-এর মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের উপর জোর দেওয়া হয়। এতে ধারাবাহিক অধ্যয়নের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের জন্য হাদীছের গভীর উপলব্ধি এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তার বাস্তবভিত্তিক অনুশীলন সহজ হবে।[28]
(২) শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বেসরকারী শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা :
বাংলাদেশ সরকার উচ্চশিক্ষার জন্য প্রণীত কৌশলগত পরিকল্পনা (SPHE 2018-2030) উচ্চশিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে চায়, যেখানে শক্তিশালী আইসিটি ফোকাস এবং শিক্ষাবিজ্ঞান প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নীতিগত নির্দেশিকা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, যার লক্ষ্য মাদ্রাসা শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।[29] এই পরিকল্পনার সাথে একীভূত হয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারীভাবে হাদীছ শিক্ষায় উদ্ভাবনী গবেষণার সুযোগ তৈরী করতে পারে। এছাড়া কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, আহলেহাদীছ মাদ্রাসা ভিত্তিক আহলেহাদীছ তা‘লীমী বোর্ড, হাদীছ ফাউন্ডেশন শিক্ষা বোর্ড প্রভৃতি বেসরকারী বোর্ড নিজস্ব পাঠ্যক্রম, সিলেবাস, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল পদ্ধতি আয়ত্ত করার মাধ্যমে হাদীছ পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকীকরণ করতে পারে। এই উদ্যোগগুলো মাদ্রাসাশিক্ষার নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক চাহিদা পূরণের জন্য তৈরী করা হ’লে, তা হাদীছ শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষা লক্ষ্যমাত্রার সাথে একীভূত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ খুলে দেবে।
(৩) এনজিও ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা :
বাংলাদেশে এনজিওগুলো শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য বিশেষত ইসলামী ঘরানার এনজিওগুলো এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, আহলেহাদীছ তা‘লীমী বোর্ড, হাদীছ ফাউন্ডেশন শিক্ষা বোর্ডের মতো বিশেষায়িত বোর্ডগুলো হাদীছ পাঠদানে উদ্ভাবক এবং অনুঘটক হিসাবে কাজ করতে পারে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ফলপ্রসূ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। সরকারী নীতি একটি সামগ্রিক কাঠামো এবং সংস্থান সরবরাহ করলেও বিশেষায়িত শিক্ষা বোর্ড এবং গতিশীল এনজিওগুলো হাদীছ শিক্ষার উদ্ভাবনী পদ্ধতিগুলো তৈরী ও বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেখানে মূলধারার শিক্ষা সরাসরি ধর্মীয় বিষয়গুলি মোকাবেলা করে না বা যেখানে কওমী ও ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলি সরাসরি সরকারী নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করে, সেক্ষেত্রে এসকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি বা মেধাবৃত্তির ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।[30]
(৪)শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন :
মুহাদ্দিছ বা হাদীছ শিক্ষকদের জন্য আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি (সক্রিয় শিখন, সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনা, পাঠদানে প্রযুক্তির ব্যবহার)-এর উপর ব্যাপক শিক্ষাবিজ্ঞান প্রশিক্ষণ প্রদান করা উচিৎ। এজন্য বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যেমন- (১) হাদীছ শিক্ষাবিজ্ঞানের জন্য বিশেষায়িত প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। (২) শিক্ষকদের জন্য ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি এবং মেন্টরশিপের ব্যবস্থা করা। (৩) শিক্ষক নেতৃত্বের সমস্যা এবং মানসিক সন্তুষ্টির অভাব মোকাবেলা করে একটি ইতিবাচক শিক্ষণ পরিবেশ গড়ে তোলা। (৪) শিক্ষকদের শিক্ষাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য উৎসাহিত করা এবং নতুন শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
(৫) প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি :
মাদ্রাসাগুলোতে প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো (গ্রন্থাগার, ল্যাব, ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার) নিশ্চিত করা যরূরী। এছাড়া অনলাইন শিখন প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও প্রচার করা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে।
(৬) গবেষণা ও উন্নয়ন :
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে[31] হাদীছ শিক্ষার উপর একাডেমিক গবেষণা উৎসাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদ্ভাবনী হাদীছ শিক্ষণ পদ্ধতির পাইলট প্রোগ্রাম এবং কেস স্টাডিগুলোর জন্য তহবিল সরবরাহ করা যেতে পারে। এছাড়া আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক সমস্যাগুলির সাথে হাদীছের মূল্যবোধের একীকরণ নিয়ে গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
উপসংহার : আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় হাদীছ পাঠের গুণগত মান উন্নয়নে উদ্ভাবনী পন্থার প্রয়োগ সময়ের দাবী। এজন্য গবেষণাধর্মী পাঠদান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য হাদীছ পাঠকে অধিকতর ফলপ্রসূ করতে হবে। সরকার ও বেসরকারী উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম আধুনিকায়ন এবং গবেষণায় সহায়তা প্রদান করতে হবে। এর মাধ্যমে হাদীছ শিক্ষাকে এমনভাবে আধুনিকীকরণ করা উচিত যাতে কওমী ও আলিয়া মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতার পাশাপাশি সমসাময়িক দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদেরকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গড়ে তোলে। সর্বোপরি এই প্রবন্ধের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশে হাদীছ পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হ’লে আমাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তব প্রয়োগ এই তিনটির সম্মিলন প্রয়োজন। সেই সাথে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল অংশীজনের (শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক, অভিভাবক এবং গবেষক) সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য।
[1].Rosdi, A. Z., Hassan, S. N. S., & Muhamad, N. A. F. Traditional and Modern Hadith Studies: A Literature Review. al-Qanatir: International Journal of Islamic Studies, (2019, 13(2), P. 40-53.
[2]. Md. Safiqul Islam, A Brief History of Govt. Madrasah-E-Alia, Dhaka. (1780-2025), accessed June 10, 2025, https://www.dhkgovmalia.edu.bd/index.php?request=about-us-eng
[3]. Muhammad Boni Amin, Madrasah Education in Bangladesh (IDEAS FOR DEVELOPMENT (IFD) note series-2, www.ideasfd.org/), 2013, p.3.
[4]. Latifah Abdul Majid & others, Exploring Innovations and Challenges in The Study of Hadith in The Digital Era, International Journal of Academic Research in Business and Social Sciences, Vol. 1 4 , No. 3, 2024. p. 1048. https://doi.org/10.6007/IJARBSS/v14-i3/20957.
[5]. খত্বীব আল-বাগদাদী, আল-কিফায়াহ ফী ইলমির রিওয়ায়াহ (মদীনা : আল-মাকতাবাতুল ইলমিয়াহ, তাবি), পৃ. ৩১১-২৬।
[6]. Klaina, M.. Facilitation and Understanding in Hadith Studies, AL-IKHSAN: Interdisciplinary Journal of Islamic Studies, (2024) 2(2), 120–143. https://doi.org/10.61166/ikhsan. v2i2.85.
[7]. Bin Sayeed Dr Mahmud, Major Challenges of Islamic Education in Bangladesh and Solutions, (January 12, 2025), https://dazzlingdawn.com/ .
[8]. Ibid.
[9]. Ali, R.. Paradigm Shifts in Islamic Curriculum: A Literature Review. Journal of Islamic Studies and Education, (2019, 8(3), 210–225.
[10]. ড. ওয়াজীহ আল-মুরসী আবুলাবান, ইলমুল হাদীছ আশ-শারীফ ওয়া ইজরাআতু তাদরীসিহি https://kenanaonline.com/ users/maiwagieh/posts/268198), সংগ্রহ : ২৬.০৬.২০২৫।
[11]. ড. ত্বহা আহমাদ আয-যায়দী, ইমকানিয়াতুত তাতাওউর ফী দিরাসাতিল হাদীছ ওয়া উলূমিহি (একতা ইসলামিকা, ৪র্থ খন্ড, ১ম সংখ্যা, জানুয়ারী-জুলাই ২০১৬খ্রি.), পৃ. ১৪৮।
[12]. هو علمٌ يبحث في الموضوعات التي تناوَلتها السُّنة النبوية الشريفة، والمتحدة معنىً، أو غاية، من خلال جمْع أحاديث الموضوع من مصدر حديثي أصلي، أو عدة مصادر، أو في ضوء السُّنة النبوية، بحيث يقوم الباحث بتحليل النصوص الحديثية المقبولة ومقارنتها ونقْدها ثم محاولة ربْطها للوصول إلى روح النصِّ النبوي من أجل تطبيقه في الواقع المعاصر-রামাযান ইসহাক আয-যাইয়ান, আল-হাদীছুল মাওযূঈ দিরাসাহ নাযরিয়াহ (গাযা : মাজাল্লাতুল জামিআহ আল-ইসলামিয়াহ, ১০ম খন্ড, ২য় সংখ্যা, ২০০২ খ্রি.), পৃ. ২১৪।
[13]. هو التركيز على حديثٍ واحدٍ بتخريجه، وبيان درجته قبولًا وردًّا، وجمع الألفاظ التي رُوي بها قدر الطاقة والإمكان، لأنها تساعد على فهمه، وخصوصًا في التأليف بين المتعارضات، وبيان معاني المفردات والجمل والبلاغة والإعراب، لما لذلك من دورٍ في إبراز المعنى وتوضيحه. وأيضًا سبب الورود - إن وُجد - لمعرفة اللفظ وما يُراد به، وبيان فقهه في ضوء لفظه، وفي ضوء النصوص الأُخرى، ثم ما يُستفاد منه من أحكامٍ إجمالًا -ড. আব্দুস সামী আল-আনীস, মানহাজুল বাহছ ফিল হাদীছিত তাহলীলী বায়নাল আছালাতি ওয়াল মুআছারাহ (মাজাল্লাতু জামিআতুশ শারিকাহ, ২০২০), পৃ. ৫। www.spu.sharjah.ac.ae/index.php /JSIS/article/view/2289.
[14]. ড. ত্বহা আহমাদ আয-যায়দী, তাদরীসুল হাদীছ আন-নাবাভী ওয়া উলূমিহি : আল-আছালাতু ওয়াল মুআছারাহ (জর্ডান : দারুন নাফায়েস, ২০১৩ খ্রি.), পৃ. ১৪১, ১৫৭-৫৮;
[15]. ড. ত্বহা আহমাদ আয-যায়দী, ইমকানিয়াতুত তাতাওউর ফী দিরাসাতিল হাদীছ ওয়া উলূমিহি , পৃ. ৪২৪।
[16]. Muniroh Nunung, Critical Thinking and Attitude in Islamic Education: A Literature Review, (BESTARI: Jurnal Pendidikan Islam), Vol. 21, No. 2, 2024, 164-174.
[17]. Paul, R., & Elder, L. Critical Thinking: The Nature of Critical and Creative Thought. Journal of Developmental Education, 2006, 34.
[18]. Rahmiati & others, Enhancing Qur'an-Hadith Education through Science, Technology, and Society Approach: A Developmental Study (Al-Ishlah: Jurnal Pendidikan Vol.17, 2, June, 2025), p. 2302-2314.
[19]. Maspul, Kurniawan. Interdisciplinary Education with Islamic Principles: Nurturing Sustainable Minds for Islamic Educational Excellence. Vol. 2. No. 1, 2023). 10.37850/rihlah.v2i01.589.
[20]. Yaacob, S., & Embong, R. The concept of an integrated Islamic curriculum and its implications for contemporary Islamic schools. International Conference, Islamic Republic of Iran ((2008, February, p. 20–22). http://irep.iium.edu.my/id/eprint/2470.
[21]. Dr, Shariqa Nasreen & Others, Interdisciplinary Approaches to Islamic Education and Environmental Awareness (International Journal of the Universe and Humanity in Islamic Vision and Perspective, Vol. 1 No. 1, 2024).
[22]. Husni, H., & Bisri, H. Inclusivism and Exclusivism: Responses of Prospective Islamic Religious Teachers towards Islamic Sects. HTS Teologiese Studies / Theological Studies, (2024, 80(1), 1–8. https://doi.org/10.4102/hts.v80i1.9361.
[23]. Latifah Abdul Majid & others, Exploring Innovations and Challenges in The Study of Hadith in The Digital Era, p. 1048.
[24].Zulkipli, S. N. & others, Takhrij al-Hadith via websites: A study of al-Durar al-Saniyyah, Mawqi’ al-Islam, and Islamweb, International Journal of Science and Research, (2017, Vol. 73 (4), P. 83-100.
[25]. Ismail, Z., & Alas, Y. Integration of Information and Communication Technology (ICT) in Islamic Education: A Review on Its Challenges and Opportunities. Journal of Islamic Studies and Culture (2017), 27.
[26]. Fadlan Mohd Othman & others, The Use of Technology in Hadith Pedagogy, International Journal of Academic Research in Progressive Education and Development, (2024, vol. 13, no. 2), P. 27.
[27]. এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাজশাহী থেকে পরিচালিত হাদীছ ফাউন্ডেশন শিক্ষা বোর্ড-এর মাধ্যমে ‘তাখাছছুছ ফিল হাদীছ ওয়াল ফিকহ’ বিভাগ খোলা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে হাদীছ পাঠদান পদ্ধতি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বি. দ্র. www.hfeb.net.
[28]. Abdul Rohman & others, Challenges in Islamic Education Curriculum Development: A Comparative Study of Indonesia, Pakistan, and India, International Journal of Learning, Teaching and Educational Research (Vol. 23, No. 6, June 2024), p. 504-523. https://doi.org/10.26803/ijlter.23.6.23
[29]. Strategic plan for higher education in bangladesh; 2018-2030, accessed June 10, 2025, https://ugc.portal.gov.bd/sites/default/files/files/ugc.portal.gov.bd/publications/c768558c_2126_41c5_83ab_4a17004eb1af/2020-10-20-10-45-e20b0b095947032e58b70c32314be187.pdf
[30]. Rustam ependi, Solution to islamic education problems transitive islamic perspective, International journal of creative research thoughts (ijcrt), www.ijcrt.org, volume 8, issue 11, november 2020, p. 730–738.
[31]. Teaching-Learning Practices in Higher Education: An Exploratory Study at University Level in Bangladesh, accessed June 10, 2025, https://naem.portal.gov.bd/ sites/default/files/files/naem.portal.gov.bd/page/c9f704e0_25bf_487f_bfc2_c3d091445df4/2021-09-15-05-43-0358c444d70146f2ca3de94c8bb1307f.pdf