ভূমিকা : আকাশের কোণে রামাযানের বাঁকা চাঁদ দেখার সাথে সাথে মুমিন হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি হয়। তনু-মনে পবিত্রতার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বর্তমান সমাজে আমরা অনেকেই সেই অনুভূতি প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের কাছে রামাযান এখন অনেকটা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো এক অভ্যস্ততায় পরিণত হয়েছে। সাহারী ও ইফতারের বাহারী আয়োজন, মধ্যরাত পর্যন্ত শপিং মলের চাকচিক্য আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা যেন আমাদের বর্তমানের রামাযান। অথচ আমাদের পূর্বসূরী বা সালাফদের কাছে এই মাসটি ছিল হৃদয়ের মরূদ্যান, যেখানে তারা সারা বছরের আত্মিক কালিমা ধুয়ে মুছে সাফ করে নিতেন। সালাফদের সেই সোনালী দিনগুলোর দিকে তাকালে আমাদের মনে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার প্রেরণা জাগে। তারা কিভাবে এর প্রতিটি মুহূর্তকে মণি-মুক্তার মতো আগলে রাখতেন এবং তাদের সেই ইবাদতে মশগূল রাতগুলো আমাদের আজকের এই নামমাত্র ছিয়ামের সাথে কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ সেসব নিয়েই এই আলোচনা।
১. রামাযানের আগমনে ব্যাকুলতা ও পূর্বপ্রস্ত্ততি :
আমাদের সমাজে রামাযানের প্রস্ত্ততি শুরু হয় বাজারের ফর্দ দিয়ে। তেল, চিনি, চাল আর ছোলার মওজুদ কতটুকু হ’ল তাই নিয়ে। কিন্তু সালাফদের প্রস্ত্ততি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মু‘আল্লা ইবনুল ফায্ল (রহঃ) বলেন, كَانُوا يَدْعُونَ الله سِتَّةَ أَشْهُرِ أَنْ يُبَلِّغَهُمْ رَمَضَانُ، ثُمَّ يَدْعُونَهُ سِتَّةَ أَشْهُرٍ أَنْ يَتَقَبَّلَهُ مِنْهُمْ، ‘তারা ছয় মাস ধরে আল্লাহর কাছে দো‘আ করতেন যেন তাদের কাছে রামাযান (আরেক বার) আগমন করে। অতঃপর (রামাযানের পরে) ছয় মাস ধরে দো‘আ করতেন যেন (রামাযানে সম্পাদিত আমলগুলো) আল্লাহ কবুল করেন’।[1] অর্থাৎ সালাফদের পুরো বছরটাই ঘুরপাক খেত রামাযানকে কেন্দ্র করে।
যখন রামাযান মাস আগমন করে তখন আসমানের দরজা, জান্নাতের দরজা এবং রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজা সমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।[2] আর এজন্য ওমর (রাঃ) এ মাসকে স্বাগতম জানিয়ে বলতেন, ‘আমাদের পবিত্রকারী মাসকে স্বাগতম। রামাযানের পুরোটাই কল্যাণকর। দিনের বেলায় ছিয়াম রাখা এবং রাতের বেলায় ক্বিয়াম করা। আর এই মাসে দান-ছাদাক্বা করা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার সমতুল্য’।[3]
তবে রামাযানের এই সুসংবাদ সবার জন্য প্রযোজ্য হয় না। ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘রামাযান মাস শুরু হ’লে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করা এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা- এগুলো কেবল সেইসব মুসলিমদের জন্য যারা রামাযানের ছিয়াম পালন করে; সেইসব কাফেরদের জন্য নয়, যারা এই মাসের কোন পবিত্রতা বা মর্যাদা রক্ষা করে না’।[4] অর্থাৎ শয়তান বন্দী থাকলেও আমাদের ভেতরের অবাধ্য ‘নফস’ যদি মুক্ত থাকে, তবে জান্নাতের খোলা দরজা আমাদের জন্য কোন উপকারে আসবে না।
সঊদী আরবের গ্রান্ড মুফতী ড. ছালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযান মাস পেল এবং আল্লাহ তাকে এর দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ দান করলেন, আল্লাহ তাকে এমন এক মহান নে‘মত দান করলেন যার সমতুল্য আর কিছুই নেই। আল্লাহর কসম! কোটিপতি, অট্টালিকার মালিক কিংবা ভূ-সম্পত্তির মালিকরা কখনোই এর সমকক্ষ হ’তে পারবে না’।[5] একজন ব্যবসায়ী যেমন সারা বছর অপেক্ষা করেন একটি বড় ‘সেল’-এর জন্য, যেখানে তিনি কয়েক দিনে কোটি টাকা লাভ করবেন; রামাযান হ’ল মুমিনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু আমরা কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রামাযানের মহামূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করছি। এমাসকে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাসে পরিণত করেছি।
রামাযানের প্রস্ত্ততিতে মহিলা সালাফদের অবস্থাও ছিল উল্লেখযোগ্য। আজকের মা-বোনদের বড় অংশ রামাযানের দিনের অর্ধেক সময় কাটান রান্নাঘরে রকমারি ইফতারি তৈরীতে। অথচ মহিলা সালাফগণ ছিলেন এর উল্টো। তাঁরা রামাযানের আগেই ঘরদোর গুছিয়ে নিতেন যেন রান্নাবান্নার ধোঁয়ায় তাঁদের ইবাদতের সুঘ্রাণ হারিয়ে না যায়। তাঁরা নিজেদের সন্তানদের এমনভাবে তৈরী করতেন যে, ছোট ছোট শিশুরা পর্যন্ত সাহারী খাওয়ার আনন্দ খুঁজে পেত।
২. কুরআন চর্চা এবং তেলাওয়াতে গভীর মগ্নতা :
রামাযান হ’ল কুরআনের মাস। সালাফদের কাছে রামাযান ছিল কুরআনের সাথে এক সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাস। আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, كان المسلمون إذا دخل شعبان انكبوّا على المصاحف فقرؤها وأخرجوا زكاة أموالهم تقوية للضعيف والمسكين على صيام رمضان، ‘যখন শা‘বান মাস আগমন করত, তখন মুসলিমরা মুছহাফের প্রতি নিবিষ্ট হ’তেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতেন। আর তারা (শা‘বান মাসেই) তাদের সম্পদের যাকাত দিয়ে দিতেন, যেন গরীব-মিসকীনরা রামাযানের ছিয়াম সাধনায় সাবলম্বী হ’তে পারে’।[6] আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা যাকাত দিই রামাযানের শেষে, লুঙ্গি-শাড়ী বিতরণের উৎসব করে। অথচ সালাফগণ যাকাত দিতেন রামাযানের আগে, যেন অভাবী মানুষগুলো খাবারের চিন্তা ছেড়ে এই মাসে কুরআন তেলাওয়াত ও ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যস্ত থাকতে পারে। কতটা গভীর ছিল তাঁদের সামাজিক মমতা!
মূলতঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণে সালাফগণ কুরআনের প্রতি নিমগ্ন থাকতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রামাযান মাসের প্রতি রাতেই জিবরীল (আঃ) আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে দেখা করতেন এবং তাঁরা একে অপরকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন’।[7] ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুসরণ করে রামাযান মাসে মানুষের জন্য আমি অধিক পরিমাণে দান-ছাদাক্বা করা পসন্দ করি। কেননা এই মাসে মানুষের প্রয়োজনীয় চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং অনেকে ছিয়াম ও ছালাতে মশগূল থাকার কারণে উপার্জনের কাজে সময় দিতে পারেন না’।[8]
একজন মুসাফির যেমন দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দেওয়ার আগে পানির মশক ভরে নেয়, সালাফগণ তেমনি রামাযান মাসে কুরআনের নূর দিয়ে নিজেদের কলবের মশক ভরে নিতেন। তাঁদের খতমের সংখ্যা শুনলে মাথা লজ্জায় নুয়ে পড়ে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) রামাযানের বাইরে সাধারণত প্রতি জুম‘আতে একবার কুরআন খতম করতেন। আর রামাযান মাসে তিনি প্রতি তিন দিনে কুরআন খতম করতেন’।[9] ক্বাতাদা (রাঃ) রামাযানের শেষ দশকে প্রতিদিন একবার করে কুরআন খতম করতেন।[10] সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.) রামাযান মাসে প্রতি দুই রাতে একবার কুরআন খতম করতেন।[11] এমনকি উমাইয়া খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালেক পুরো রামাযানে ১৭ বার কুরআন খতম করতেন।[12] সুফিয়ান ছাওরী (রাঃ) রামাযান মাসে অন্যান্য সকল নফল ইবাদত পরিহার করে শুধু কুরআন নিয়ে পড়ে থাকতেন। আয়েশা (রাঃ) রামাযান মাসে কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে দিন শুরু করতেন। তিনি সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত মুছহাফ দেখে তেলাওয়াত করতেন। অতঃপর ঘুমিয়ে যেতেন’।[13]
রামাযান এলে বড় বড় ইমামগণ তাঁদের হাদীছের দারস ও ইলমী মজলিস পর্যন্ত স্থগিত করে দিতেন। ইবনুল হাকাম (রহ.) বলেন, كان مالك إذا دخل رمضان يفرّ من قراءة الحديث ومجالسة أهل العلم، وأقبل على تلاوة القرآن من المصحف، ‘যখন রামাযান মাস আসত, তখন ইমাম মালেক (রহ.) হাদীছ অধ্যয়ন এবং ইলমী মজলিসগুলো থেকে দূরে সরে যেতেন এবং মুছহাফ দেখে কুরআন তেলাওয়াতের দিকে পুরোপুরি নিবিষ্ট হয়ে যেতেন’।[14] ইমাম মালেকের মতো প্রখ্যাত আলেম যদি এই মাসে ইলমী আলোচনা ছেড়ে শুধু কুরআন পড়েন, তবে আমরা কেন আজ রামাযানেও ফেইসবুকে বিতর্ক আর ইউটিউবে অনর্থক ভিডিও দেখে সময় কাটাই? আসুন! আসন্ন রামাযানে ধুলোমলিন মুছহাফটি হাতে নিই। একটি একটি আয়াত পড়ি আর স্বীয় সৃষ্টিকর্তার মহান সকাশে মশগূল হই। অহি-র নূরে হৃদয় বাগানকে আলোকিত করি। ঐশী দ্যোতনায় নিজেকে জান্নাতের মুসাফির হিসাবে প্রস্ত্তত করি।
স্মর্তব্য যে, হাদীছে তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করতে যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে[15] সেটা মূলত নিয়মিত অভ্যাসের পরিণত করার ক্ষেত্রে। যেমন এব্যাপারে ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন, ‘তিন দিনে কুরআন খতমের নিষেধাজ্ঞাটি মূলত নিয়মিত অভ্যাসের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। তবে ফযীলতপূর্ণ সময় (যেমন রামাযান মাস ও লায়লাতুল ক্বদরের রাত) এবং ফযীলতপূর্ণ স্থানে (যেমন মক্কায় আগন্তুকদের জন্য) সময় ও স্থানের গুরুত্ব বিবেচনায় অধিক তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। এটিই ইমাম আহমাদ ও ইসহাকসহ অন্যান্য ইমামদের সিদ্ধান্ত এবং সালাফদের অনুসৃত পদ্ধতি দ্বারাও এটি সমর্থিত’।[16]
৩. নেক আমলে কঠোর সাধনা :
রামাযান একটি প্রতিযোগিতার মাস। আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে নিরন্তর ছুটে চলার মাস। খারাপ অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করে নিজেকে নেক আমলে অভ্যস্ত করার মাস। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হ’ল- আমরা রামাযানে কিছুটা ইবাদতমুখী হ’তে পারলেও রামাযানের পরে সেই নেক আমলের ধারা অব্যাহত রাখতে পারি না। একবার বিশর আল-হাফী (রহঃ)-এর কাছে এসে এক ব্যক্তি বলল, ‘কওমের কিছু লোক রামাযানে খুবই ইবাদত করে এবং নেক আমলে অনেক পরিশ্রম করে, কিন্তু রামাযান চলে গেলে তারা সেই ইবাদত ও আমল পরিত্যাগ করে’। তখন তিনি জবাবে বললেন, بئس القوم قوم لا يعرفون الله إلا في رمضان، ‘সেই সম্প্রদায় কতই না নিকৃষ্ট, যারা শুধু রামাযান মাসেই আল্লাহকে চেনে’।[17]
সালাফগণ বৃদ্ধ বয়সেও শরীরের দুর্বলতাকে তোয়াক্কা করতেন না। আহনাফ ইবনু ক্বায়েস (রহ.) বৃদ্ধ বয়সেও ছিয়াম রাখতেন। তখন তাকে বলা হ’ল, إِنَّكَ شَيْخٌ كَبِيرٌ وَإِنَّ الصِّيَامَ يُضْعِفُكَ، ‘আপনি তো একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ, আর ছিয়াম আপনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে’। উত্তরে তিনি বললেন,إِنِّي أَعُدُّهُ لِشَرٍّ طَوِيلٍ، ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (ছিয়ামের কষ্ট) এক দীর্ঘ অনিষ্টের (পরকালীন কঠিন সময়ের) জন্য জমা রাখছি’।[18] তিনি বৃদ্ধ হওয়ার পরেও আল্লাহর অনুগত্যের ব্যাপারে হাল ছাড়েননি; অথচ আমরা যুবক হওয়ার পরেও কত ঠুনকো অজুহাতে ইবাদতে গাফেলতি করি।
একজন সৈনিক যেমন যুদ্ধের ময়দানে তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে, সালাফগণ তেমনি রামাযানে শয়তান আর নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। হাসান বাছরী (রহ.) একদা একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যারা (অহেতুক) হাসাহাসি করছিল। তখন তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ রামাযান মাসকে তাঁর সৃষ্টির জন্য একটি প্রতিযোগিতার ময়দান বানিয়ে দিয়েছেন, যেখানে তারা তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে একে অপরের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে একদল লোক নেক আমলে অগ্রগামী হ’ল এবং তারা সফল হ’ল আর অন্য একদল লোক পিছিয়ে পড়ল এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত হল। সুতরাং সেই ব্যক্তির জন্য আফসোস, যে এমন দিনে (দুনিয়ার আমোদ-প্রমোদে) হাসাহাসি ও খেলাধুলায় মত্ত রয়েছে, যে দিনে নেককাররা সফল হচ্ছে আর বাতিলপন্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’।[19]
রামাযান মাসে আমরা ইবাদত-বন্দেগী করতে পারলে আত্মতুষ্টিতে ভুগি। অথচ আমল করার পরে সালাফদের অবস্থা ছিল ভিন্ন রকম। আব্দুল আযীয ইবনে আবূ রাওয়াদ (রহঃ) তাবে‘ঈদের ব্যাপারে বলেন,أدركتهم يجتهدون في العمل الصالح، فإذا فعلوه وقع عليهم الهم أيقبل منهم أم لا، ‘আমি তাদেরকে দেখেছি যে, তারা সৎ আমলে অনেক পরিশ্রম করতেন। যখন আমল করে ফেলতেন, তখন উৎকণ্ঠায় পড়ে যেতেন এই ভয়ে যে, তাদের এই আমল কবুল করা হবে কি-না’।[20] কাসেম বিন আলী তাঁর পিতা ইবনে আসাকির (রহ.)-এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি জামা‘আতে ছালাত আদায় এবং কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। প্রতি জুম‘আতে তিনি একবার কুরআন খতম করতেন, তবে রামাযান মাসে প্রতিদিন একবার খতম করতেন এবং (দামেশক জামে মসজিদের) পূর্ব কোণে ই‘তিকাফ করতেন’।[21]
৪. মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো ও ছায়েমকে ইফতার করানো :
সালাফদের কাছে রামাযান ছিল নিজের পেট খালি রেখে নেক আমলের ফুল ফোটানোর এক রবকতময় মাস। আবু হুরায়রা (রাঃ) খুবই কম খেতেন। তিনি বলতেন, আমার ১৫টি খেজুর থাকত। যার মধ্যে ৫টি দিয়ে ইফতার ও ৫টি দিয়ে সাহারী করতাম। বাকী ৫টি পরের দিনের ইফতারের জন্য রেখে দিতাম’।[22] একটু ভাবুন তো! আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)-এর প্রিয় এই ছাহাবী মাত্র ৫টি খেজুর দিয়ে সাহারী করে সারাদিন কাটিয়ে দিতেন। আর আমরা সাহারীতে রাজকীয় খানা খেয়েও দিনের বেলা ক্লান্তির অজুহাতে ইবাদতে ফাঁকি দিই। আমাদের সাহারী ও ইফতারের আয়োজন আজ আমাদের অলস করে দিচ্ছে, অথচ সালাফদের অল্পাহার তাঁদেরকে ইবাদতে আরও তেজস্বী করে তুলত।
সালাফদের মাঝে একা খাওয়ার কোন সংস্কৃতি ছিল না। তাঁরা মনে করতেন, অন্যকে খাওয়াতে পারাই হ’ল ইবাদতের প্রাণ। প্রসিদ্ধ আছে যে, বনু ‘আদীর একদল লোক ছিল। যারা কখনোই একা ইফতার করতেন না। সাথে কাউকে পেলে খেতেন। নইলে খানা মসজিদে নিয়ে যেতেন ও মুছল্লীদের সাথে নিয়ে খেতেন’।[23] রামাযান আসলে ইবনে শিহাব যুহরী (রহ.) তাঁর শিষ্যদের বলতেন, فإنّما هو تلاوةُ القرآنِ وإطعامُ الطعام، ‘এ মাস তো কেবল কুরআন তেলাওয়াত এবং খাদ্য দান করার মাস’। আর তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল’।[24] একজন মমতাময়ী মা যেমন নিজে না খেয়ে তাঁর সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতে সবচেয়ে বেশী আনন্দ পান, সালাফগণও ক্ষুধার্তের মুখে লোকমা তুলে দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি পেতেন। অথচ বর্তমান যুগে আমরা ইফতার পার্টি করি সামাজিক মর্যাদা যাহির করতে। যেখানে দাওয়াত পায় কেবল সামর্থ্যবানরা।
সালাফদের যুগে মুসলিম জাহানের বাদশাহগণও রামাযানে বিলাসিতা ছুঁয়ে দেখতেন না। আবু আববাস হাশেম ইবনে কাসেম (রহঃ) বর্ণনা করেন, ‘রামাযানের এক বিকেলে আমি খলীফা আল-মুহ্তাদী বিল্লাহ (২১৮-২৫৬হি./৮৩৩-৮৭০খ্রি.) -এর কাছে ছিলাম। তিনি আমাদের নিয়ে মাগরিবের ছালাত আদায় করলেন এবং খাবার আনতে বললেন। তখন একটি বড় পাত্র আনা হ’ল যাতে কিছু রুটি এবং ছোট ছোট বাটিতে লবণ, জয়তুনের তেল ও সিরকা ছিল। তিনি আমাকে খেতে বললেন। আমি এমনভাবে খাচ্ছিলাম যেন মূল খাবারের (গোশত বা ভালো কোন তরকারী) অপেক্ষা করছি। তখন তিনি বললেন, ‘আপনি কি ছিয়াম ছিলেন না?’ আমি বললাম, অবশ্যই। তিনি বললেন, তবে পেট ভরে খেয়ে নিন, কারণ যা দেখছেন তাছাড়া এখানে আর কোন খাবার নেই (এটাই রাতের খাবার)’।[25]
৫. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছিয়াম :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ، إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ، فَإِنْ سَابَّكَ أَحَدٌ أَوْ جَهِلَ عَلَيْكَ فَلْتَقُلْ : إِنِّي صَائِمٌ، إِنِّي صَائِمٌ- ‘খানা-পিনা থেকে বিরত থাকার নাম ছিয়াম নয়; বরং ছিয়াম হ’ল বাজে কথা ও কাজ এবং ভোগ-সম্ভোগ ও বেহায়াপনা হ’তে বিরত থাকা। অতঃপর যদি কেউ তোমাকে গালি দেয় বা তোমার প্রতি মূর্খতাসূলভ আচরণ করে, তাহ’লে তুমি বল, আমি ছায়েম, আমি ছায়েম’।[26] অন্যত্র তিনি বলেছেন,رُبَّ صَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ صِيَامِهِ الْجُوعُ وَالْعَطَشُ، وَرُبَّ قَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ- ‘বহু ছায়েম রয়েছে যার মধ্যে ছিয়ামের কিছুই নেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ব্যতীত এবং বহু রাত্রি জাগরণকারী আছে, যাদের মধ্যে কিছুই নেই রাত্রি জাগরণ ব্যতীত’।[27] ছাহাবায়ে কেরাম এই হাদীছগুলোর প্রতি কঠোরভাবে আমল করতেন। জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, إِذَا صُمْتَ فَلْيَصُمْ سَمْعُكَ وَبَصَرُكَ وَلِسَانُكَ عَنِ الْكَذِبِ وَالْمَآثِمِ، وَدَعْ أَذَى الْخَادِمِ وَلْيَكُنْ عَلَيْكَ وَقَارٌ وَسَكِينَةٌ يَوْمَ صِيَامِكَ، وَلَا تَجْعَلْ يَوْمَ فِطْرِكَ وَيَوْمَ صِيَامِكَ سَوَاءً، ‘যখন তুমি ছিয়াম রাখবে, তখন যেন তোমার কান, চোখ ও যবান সকল প্রকার মিথ্যা ও গোনাহ হ’তে ছিয়াম রাখে বা মুক্ত থাকে। এসময় খাদেমের দেওয়া কষ্ট এড়িয়ে যাও। ছিয়ামের দিন তুমি ভাবগম্ভীর থাক। আর ছিয়াম থাকা ও না থাকার দিনকে তুমি সমান গণ্য করো না’।[28]
ছিয়াম যতই দামী হোক, পাপাচারের বাতাস লাগলে তার ছওয়াবের সুঘ্রাণ কমে যায়। এই কারণেই আবূ হুরায়রা (রাঃ) এবং অন্যান্য ছাহাবায়ে কেরাম ছিয়ামরত অবস্থায় মসজিদে বেশী অবস্থান করতেন। তাদেরকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হ’লে বলতেন, نُطَهِّرُ صِيَامَنَا، ‘আমরা আমাদের ছিয়ামকে পবিত্র রাখার জন্য এমন করে থাকি’।[29] মুজাহিদ (রহঃ) বলেন,مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَسْلَمَ لَهُ صَوْمُهُ فَلْيَجْتَنِبِ الْغِيبَةَ وَالْكَذِبَ، ‘যে ব্যক্তি তার ছিয়ামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, সে যেন গীবত ও মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকে’।[30]
মনে রাখা উচিত যে, ছিয়াম কেবল পেটের ট্রেনিং নয়, এটি নফসের ট্রেনিং। আবূ ইমরান আল-জাওনী (মৃ. ১২৩হি.) বলেন, مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُنَوَّرَ قَلْبُهُ، فَلْيُقِلَّ طُعْمَهُ، ‘যে ব্যক্তি তার অন্তরকে আলোকিত করতে পসন্দ করে, সে যেন তার আহার কমিয়ে দেয়’।[31] আমরা ইফতারে অতিভোজন করে আমাদের কলব বা হৃদয়কে পাথরের মতো শক্ত করে ফেলছি, যার ফলে ইবাদতে কোন স্বাদ পাচ্ছি না। সুতরাং আমাদের হাতে থাকা এই যন্ত্রটি যেন তোমার জান্নাতের পথে বাধা না হয়। আমাদের গল্পের আসরগুলো যেন গীবত, মিথ্যা ও অশালীনতার আসরে পরিণত না হয়। সালাফদের মতো আমরাও যেন ‘অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছিয়াম’ পালন করতে পারি। আমীন!
৬. সুদীর্ঘ ও আবেগঘন ক্বিয়ামুল লায়ল :
আমরা যেখানে তারাবীহতে সবচেয়ে দ্রুতগতির ইমাম খুঁজি, সেখানে ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফগণ সারা রাত কুরআনের মাঝে ডুবে গিয়ে তৃপ্তির অশ্রু ফেলতেন। তাদের কাছে রামাযান ছিল দুনিয়ার সব কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে কেবল আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক তৈরীর এক ঐকান্তিক মাধ্যম। তাদের অভ্যাস ছিল যে, তারা তারাবীহর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতেন এবং ছালাত শেষ না করে বাড়ী ফিরতেন না।[32] কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا صَلَّى مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ حُسِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ- ‘ছালাত শেষ করা পর্যন্ত ইমামের সাথে ক্বিয়ামকারী ব্যক্তি সারা রাত্রি ক্বিয়ামের নেকী পায়’।[33] আমীরুল মুমিনীন ওমর (রাঃ)-এর যুগে উবাই বিন কা‘ব ও তামীম আদ্দারী (রাঃ) ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়াতেন।[34] কিন্তু সেই ১১ রাক‘আত কেমন ছিল? কনিষ্ঠ ছাহাবী সায়েব ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, ইমাম ছাহেব শতাধিক আয়াত সম্বলিত বড় বড় সূরা পড়তেন। দীর্ঘ ক্বিয়ামের কারণে মানুষ লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত এবং ফজরের ঠিক আগ মুহূর্তে তারা বাড়ি ফিরত।[35] বিখ্যাত তাবেঈ মাসরূক (রহ.) রামাযান মাসের কিবয়াম বা তারাবীহতে এক রাকআতেই পূর্ণ সূরা আনকাবুত তেলাওয়াত করতেন।[36] সাঈদ বিন ওবায়েদ (রহ.) বলেন, আমি সাঈদ বিন জুবায়ের (রহ.)-কে দেখেছি যে, তিনি রামাযান মাসে লোকদের ইমামতি করতেন। তিনি ছালাতে এই আয়াতটি বারবার তেলাওয়াত করতেন,إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلُ يُسْحَبُونَ، فِي الْحَمِيمِ ثُمَّ فِي النَّارِ يُسْجَرُونَ، ‘যখন তাদের গলদেশে বেড়ী ও শৃংখল সমূহ পরানো হবে এবং তাদেরকে উপুড়মুখী করে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে উত্তপ্ত জাহান্নামে। অতঃপর সেখানে তাদেরকে আগুনে দগ্ধ করা হবে’ (মুমিন ৪০/৭১-৭২)।[37]
ইমাম বুখারী (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, ‘রামাযান মাসের প্রথম রাত এলে তাঁর সাথীরা তাঁর কাছে সমবেত হ’তেন। তিনি তাদের নিয়ে ছালাত আদায় করতেন এবং প্রতি রাক‘আতে ২০ আয়াত করে তেলাওয়াত করতেন। এভাবে তিনি পুরো কুরআন খতম করতেন। এছাড়া তিনি সাহারীর সময় কুরআনের অর্ধেক থেকে এক-তৃতীয়াংশ তেলাওয়াত করতেন এবং প্রতি তিন রাতের সাহারীর সময় একবার খতম সম্পন্ন করতেন। আবার দিনের বেলা প্রতিদিন একবার কুরআন খতম করতেন এবং ইফতারের সময় খতম শেষে বলতেন, عِنْدَ كُلِّ خَتْمٍ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ ‘প্রতিটি খতমের সময় একটি দো‘আ কবুল হয়’।[38] শাদ্দাদ ইবনে আউস (রাঃ) যখন বিছানায় যেতেন, তখন জাহান্নামের ভয়ে তিনি কড়াইয়ের ওপর রাখা তপ্ত দানার মত ছটফট করতেন। এরপর তিনি বলতেন,اللَّهُمَّ إِنَّ جَهَنَّمَ لا تَدَعُنِي أَنَامُ فَيَقُومُ إِلَى مُصَلاهُ، ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই জাহান্নাম আমাকে ঘুমাতে দিচ্ছে না’ অতঃপর তিনি তাঁর মুছল্লায় দাঁড়িয়ে যেতেন’।[39] আর তাউস (রহ.) তাঁর বিছানা পাততেন। অতঃপর তিনি লাফিয়ে উঠতেন, ওযূ (পবিত্রতা অর্জন) করতেন এবং সকাল পর্যন্ত কিববলামুখী হয়ে ক্বিয়ামুল লায়লে মগণ থাকতেন আর বলতেন, طَيَّرَ ذِكْرُ جَهَنَّمَ نَوْمَ الْعَابِدِينَ ‘জাহান্নামের স্মরণ ইবাদতকারীদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে’।[40]
বর্তমানে আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে হাফেয ছাহেবরা দ্রুত তিলাওয়াত করেন, কারণ মুছল্লীরা তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য চাপ দেয়। অপরদিকে প্রখ্যাত তাবেঈ আব্দুর রহমান ইবনু হুরমুয (৩৭-১১৭হি.) বলেন, ‘(ছাহাবায়ে কেরামের যুগে) ক্বারীগণ (তারাবীহর ছালাতে) সূরা বাক্বারাহ ৮ রাক‘আতে শেষ করতেন। আর যদি ক্বারীগণ তা ১২ রাকআতে পড়তেন, তবে লোকেরা মনে করত- তিনি তাদের জন্য হালকা করে দিয়েছেন’।[41] আবূ ওছমান আন-নাহদী (মৃ. ৯৫হি.) বলেন, ওমর (রাঃ) রামযানে তিনজন ক্বারীকে তারাবীহর ছালাত পড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যিনি দ্রুত পড়তেন তাকে ৩০ আয়াত, যিনি মাঝারি গতিতে পড়তেন তাকে ২৫ আয়াত এবং যিনি ধীর গতিতে পড়তেন তাকে ২০ আয়াত তেলাওয়াত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন’।[42] প্রখ্যাত তাবেঈ ইবনে আবী মুলাইকা (১১৭হি.) বলেন, ‘আমি রামাযান মাসে লোকজনকে নিয়ে (তারাবীহর) ছালাত পড়তাম। আমি এক রাক‘আতে (৪৫ আয়াত বিশিষ্ট) ‘সূরা ফাতির’ বা এই জাতীয় বড় সূরা পড়তাম, কিন্তু কেউ তাতে বিরক্তি প্রকাশ করত না’।[43] আবূ আশহাব (রহঃ) বলেন, ‘আবূ রাজা রামাযানের কিবয়াম বা তারবীহতে আমাদের নিয়ে প্রতি দশ দিনে একবার কুরআন খতম করতেন’।[44] আবূ সা‘দ আল-বাক্কাল (রহ.) বলেন, ‘আমি ও আব্দুর রহমান ইবনুল আসওয়াদ (রহ.) রামাযান মাসের রাতগুলোতে (তারাবীহতে) সুন্দর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শোনার জন্য বিভিন্ন মসজিদে ঘুরে বেড়াতাম’।[45]
ইবনে শাওযাব (রহ.) বলেন, প্রখ্যাত তাবেঈ আইয়ুব সাখতিয়ানী (৬৬-১৩১হি.) রামাযান মাসে তাঁর মসজিদের মুসল্লীদের ইমামতি করতেন। তিনি প্রতি রাক‘আতে প্রায় ৩০ আয়াত পরিমাণ তেলাওয়াত করতেন। .... তারাবীহর জামা‘আতে আসার জন্য তিনি নিজেই লোকদের ‘ছালাত’ ‘ছালাত’ বলে ডাকতেন। তিনি মুছল্লীদের অগ্রাধিকার দিতেন এবং কুরআনে বর্ণিত দো‘আগুলো দিয়ে কুনূতের মুনাজাত করতেন, আর তাঁর পেছনের মুছল্লীরা ‘আমীন’ বলতেন। তাঁর দো‘আর সর্বশেষ অংশে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ওপর দরূদ পাঠ করতেন এবং বলতেন,اللَّهُمَّ اسْتَعْمِلْنَا بِسُنَّتِهِ وَارْعِنَا بِهَدْيِهِ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا، ‘হে আল্লাহ! আমাদের তাঁর (আল্লাহর রাসূলের) সুন্নাতের ওপর পরিচালিত করুন, তাঁর হেদায়াতের ওপর আমাদের অবিচল রাখুন এবং আমাদের মুত্তাকবীদের জন্য অনুসরণীয় ইমাম বানিয়ে দিন’। এরপর তিনি সিজদা করতেন। আর ছালাত শেষে আরও কিছু দো‘আ করতেন।[46]
সালাফদের যুগে মহিলারাও ইবাদত-বন্দেগী ও ক্বিয়ামুল লাইল থেকে পিছিয়ে থাকতেন না। ওমর (রাঃ) নারীদের জন্য আলাদা ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন যেন তাঁরাও জামা‘আতের সাথে এই আধ্যাত্মিক স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন।[47]
৭. অবারিত দানশীলতা ও বদান্যতা :
সালাফদের কাছে রামাযান ছিল আখেরাতের জন্য বিনিয়োগের শ্রেষ্ঠ মৌসুম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আকাশছোঁয়া দানশীলতা সম্পর্কে ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন,كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّىاللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، ...فَلَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدُ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ، ‘আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রামাযানে তিনি আরো অধিক দানশীল হ’তেন, যখন জিবরীল (আঃ) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ...নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) প্রবাহিত বায়ু অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন’।[48] মুহাল্লাব (রহ.) বলেন, ‘এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, একটি নেক আমল আরেকটি নেক আমলের দরজা খুলে দেয় এবং অন্য নেক কাজে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। লক্ষ্য করে দেখুন! ছিয়ামের বরকত, জিবরাঈল (আঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁর সামনে কুরআন তেলাওয়াতের আমল নবী কারীম (ছাঃ)-এর দানশীলতা কতটা বাড়িয়ে দিয়েছিল? তখন তিনি এত বেশী দানশীল হয়ে উঠতেন যে, তাঁর দানশীলতা প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও দ্রুত ও ব্যাপক হয়ে যেত’।[49]
ইবনে ওমর (রাঃ) ছিয়াম রাখতেন এবং মিসকীন ও দরিদ্রদের সাথে নিয়ে ছাড়া ইফতার করতেন না। যদি কখনো তাঁর পরিবার তাঁকে মিসকীনদের কাছে যেতে বাধা দিত, তবে তিনি সেই রাতে আর খাবার খেতেন না। যখন তিনি খাবার খেতে বসতেন আর কোন ভিক্ষুক তাঁর কাছে আসত, তখন তিনি নিজের খাবারের অংশটুকু তুলে নিতেন এবং উঠে গিয়ে তা ভিক্ষুককে দিয়ে আসতেন।[50] সালাফদের কাছে সাহায্যপ্রার্থীরা ছিল আখেরাতের পথে ছওয়াবের পরিবাহকের মতো। আলী ইবনুল হুসাইন (রহঃ)-এর কাছে যখন কোন সাহায্যপ্রার্থী বা ভিক্ষুক আসত, তিনি তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাতেন এবং বলতেন, مَرْحَبًا بِمَنْ يَحْمِلُ زَادِي إِلَى الْآخِرَةِ ‘স্বাগতম সেই ব্যক্তিকে, যে আমার পাথেয় (ছাওয়াব) বহন করে পরকালের দিকে নিয়ে যাচ্ছে’![51] অথচ আজ আমাদের দুয়ারে কোন মিসকীন এলে আমরা বিরক্তির স্বরে বলি, মাফ কর কিংবা পরে এস। আমরা মনে করি ভিক্ষুক আমাদের সম্পদ কমিয়ে দিচ্ছে। অথচ সালাফরা মনে করতেন, ভিক্ষুক এসে তাঁদের সম্পদকে পবিত্র করছে এবং তা নিরাপদে জান্নাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিচ্ছে। কত বিশাল ব্যবধান আমাদের আর তাঁদের মানসিকতায়!
দানশীলতার এক রাজকীয় উপমা ছিলেন ইমাম হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান (রহ.)। তিনি প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন। তিনি রামাযান মাসে প্রতিদিন পাঁচশ মানুষকে ইফতার করাতেন এবং ঈদের পর তাঁদের প্রত্যেককে একশ’ দিরহাম করে হাদিয়া দিতেন।[52]
৮. সময়ের হেফাযত ও প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার :
সালাফদের কাছে রামাযানের প্রতিটি সেকেন্ড ছিল মণি-মুক্তার চেয়েও দামী। তাঁরা খুব কঠিনভাবে সময়ের হেফাযত করতেন যেন বরকতপূর্ণ মুহূর্তগুলো অনর্থক কাজে ব্যয় না হয়; সময়গুলো যেন সর্বদা আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে ব্যয় হয়। তাবেঈ তালীক বিন কবায়েস (রহঃ) বলেন, আবু যার (রাঃ) বলেছেন, إِذَا صُمْتَ فَتَحَفَّظْ مَا اسْتَطَعْتَ فَكَانَ طَلِيقٌ إِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِهِ دَخَلَ وَلَمْ يَخْرُجْ إِلَّا لِلصَّلَاةِ، ‘যখন তুমি ছিয়াম রাখবে, তখন যথাসম্ভব (পাপ থেকে) নিজেকে রক্ষা করবে’। আর তালীক (রহ.) নিজে যখন ছিয়াম রাখতেন, তখন ঘরে ঢুকে যেতেন এবং ছালাত ছাড়া অন্য কোন প্রয়োজনে বের হ’তেন না’।[53]
ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলতেন, ما ندمت على شيء ندمي على يوم غربت شمسه نقص فيه عمري ولم يزد فيه عملي، ‘আমি কোন জিনিসের ওপর এতটা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হইনি, যতটা সেই দিনের ওপর হয়েছি যার সূর্য ডুবে গেছে- যেদিন আমার আয়ু কমেছে কিন্তু আমল বাড়েনি’।[54] ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, إِضَاعَة الْوَقْت أَشدّ من الْمَوْت لِأَن إِضَاعَة الْوَقْت تقطعك عَن الله وَالدَّار الْآخِرَة، وَالْمَوْت يقطعك عَن الدُّنْيَا وَأَهْلهَا، ‘সময় নষ্ট করা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। কারণ সময় অপচয় করা আপনাকে আল্লাহ এবং পরকাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, আর মৃত্যু আপনাকে কেবল দুনিয়া ও দুনিয়াবাসী থেকে বিচ্ছিন্ন করে’।[55]
সালাফগণ কেবল ছিয়াম পালনেই কঠোর যত্নশীল ছিলেন না; বরং তারা ছালাতের ওয়াক্তের ব্যাপারেও ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। অথচ বর্তমান সমাজে অনেককে দেখা যায় যারা ছিয়াম পালনে আগ্রহী হ’লেও ছালাতের ব্যাপারে উদাসীন। ইবনু তায়মিয়াহ (রহ.) এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যদি জানত যে, ছালাত ক্বাযা করা হচ্ছে রামাযান মাস হাতছাড়া করার মতই মারাত্মক, যা সকল মুসলিমের ঐকমত্যে স্বীকৃত, তবে তারা অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছালাত আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাত’।[56] সুতরাং ছিয়ামের পূর্ণ ছাওয়াব হাছিলের জন্য ফরয ছালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা অপরিহার্য।
শায়খ মুহাম্মদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহ.) বলেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! নিশ্চয়ই রামাযান মাস হ’ল নেকী অর্জন এবং মুনাফা লাভের মাস। সুতরাং তোমরা ইবাদত, অধিক পরিমাণে ছালাত, কুরআন তিলাওয়াত, যিক্র, মানুষকে ক্ষমা করা এবং ইহসানের মাধ্যমে এই মাসের সুযোগগুলো লুফে নাও। আর তোমরা নিজেদের মধ্য থেকে পারস্পরিক শত্রুতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ দূর করে দাও’।[57]
তিনি আরো বলেন, ‘হে আমার ভাইয়েরা! রামাযান মাস পর্যন্ত হায়াত পাওয়া সেই ব্যক্তির জন্য আল্লাহর এক বিশাল নে‘মত, যে এই মাসটি পেয়েছে এবং এর যথাযথ হক আদায় করেছে। আর এই হক আদায় হবে আপন রবের কাছে ফিরে আসার মাধ্যমে। আর আল্লাহর দিকে প্রকৃত ফিরে আসার অর্থ হ’ল- পাপের পথ ছেড়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করা, গাফেলতী ঝেড়ে ফেলে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হওয়া এবং আল্লাহ থেকে দূরত্ব কমিয়ে তওবা, ইস্তিগফার ও নেক আমলের মাধ্যমে একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করা’।[58]
রামাযান হ’ল মুমিনের ইবাদতের মাধ্যমে ছওয়াব অর্জনের উপযুক্ত সময়। ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন, يا من دامت خسارته قد أقبلت أيام التجارة الرابحة من لم يربح في هذا الشهر ففي أي وقت يربح ‘ওহে যার লোকসান দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, (সাবধান!) এখন লাভজনক ব্যবসার দিনগুলো তোমার সামনে উপস্থিত। যে ব্যক্তি এই মাসেই (রামাযানে) মুনাফা অর্জন করতে পারল না, সে আর কোন সময়ে লাভবান হবে?[59] আবূ উসামাহ (রহ.) বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন নযর আল-হারেছী-এর নিকট প্রবেশ করলাম। দেখলাম তিনি কিছুটা গুটিয়ে আছেন। আমি বললাম, আপনি মনে হয় কারও আসা বা সাক্ষাত পসন্দ করেন না? তিনি বললেন, হ্যাঁ! আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম, আপনি কি একাকিত্ববোধ করেন না? তখন তিনি উত্তর দিলেন, কীভাবে আমি একাকিত্ববোধ করব, যেখানে আল্লাহ স্বয়ং বলেন- ‘যে আমাকে স্মরণ করে, আমি তার সাথেই থাকি’![60] আসুন! এই রামাযানে আমরা অহেতুক আড্ডা, রাজনৈতিক বিতর্ক আর সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা ত্যাগ করি। প্রতিটি সেকেন্ডকে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আর কুরআন তেলাওয়াতে ব্যয় করি।
৯. শেষ দশকের ইবাদত ও ই‘তিকাফ :
রামাযানের শেষ দশকে সালাফদের ইবাদতের উন্মাদনা কয়েকগুণ বেড়ে যেত। লায়লাতুল ক্বদরের অন্বেষণে তাঁরা কঠোরভাবে আত্মনিয়োগ করতেন। কেননা আয়েশা (রাঃ) বলেন,إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ- ‘রামাযানের শেষ দশক উপস্থিত হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোমর বেঁধে নিতেন। রাত্রি জাগরণ করতেন ও স্বীয় পরিবারকে জাগাতেন’।[61] আজ আমরা শেষ দশকে কোমর বাঁধি মার্কেটে যাওয়ার জন্য, নতুন জুতো আর জামার ম্যাচিং মেলানোর জন্য। অথচ আমাদের নবী (ছাঃ) কোমর বাঁধতেন ইবাদতের জন্য। ইবরাহীম নাখঈ (রহঃ) রামাযান মাসে প্রতি তিন দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। আর শেষ দশকে প্রতি দুই দিনে কুরআন খতম করতেন এবং প্রতি রাতে গোসল করতেন।[62] ইবাদতকে তাঁরা কতটা রাজকীয় মর্যাদা দিতেন। তামীম আদ্দারী (রাঃ) এক হাযার দিরহাম দিয়ে একসেট পোষাক কিনেছিলেন, যা তিনি কেবল লায়লাতুল ক্বদরের আশায় সেই রাতে পরিধান করতেন’।[63] ছাবিত আল-বুনানী (মৃ.১২৭) এবং হুমাইদ আত-ত্ববীল (৬৮-১৪৩হি.) তাঁদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধান করতেন এবং সুগন্ধি মাখতেন। এছাড়া তাঁরা মসজিদকেও সুগন্ধি দিয়ে সুবাসিত করতেন’।[64]
আয়েশা (রাঃ) বলেন, يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ- ‘শেষ দশকে রাসূল (ছাঃ) যত কষ্ট করতেন, অন্য সময় তত করতেন না’।[65] আর আমরা শেষ দশকে ইবাদতে সবচেয়ে বেশী ঢিলেমী করি। রামাযানের শুরুর দিকে আমরা যতটা উদ্যম নিয়ে ইবাদত শুরু করি, অর্ধেক মাস যেতে না যেতেই সেই উদ্যোমে ভাটা পড়ে। অথচ শেষ দশকেই ইবাদতে বেশী ত্যাগ স্বীকার করা উচিত।
একজন ডুবুরি যেমন সাগরের তলদেশে গিয়ে মুক্তো খোঁজার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দম ধরে রাখে, সালাফগণও তেমনি রামাযানের শেষ দশকে ইবাদতের সাগরে ডুব দিতেন লায়লাতুল ক্বদরের মহাপ্রাপ্তির জন্য। তারা স্বার্থপরের মতো একা জান্নাতে যেতে চাইতেন না। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) নিজে তো সারারাত ছালাত পড়তেনই, মধ্যরাত হ’লে পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন’।[66] ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) বলতেন, শেষ দশকে সাধ্য থাকলে ছোট শিশু ও সন্তানদেরও ছালাতের জন্য জাগিয়ে দেওয়া উচিত। তিনি নিজে যেমন লাইলাতুল ক্বদর লাভের জন্য ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করতেন; তদ্রূপ তার পরিবার-পরিজনকেও ক্বিয়ামুল লায়লের জন্য জাগিয়ে দিতেন।[67] আর আমরা আমাদের সন্তানদের সাহরীতে ভালো খাবারের জন্য জাগাই, কিন্তু জান্নাতের পথ দেখানোর জন্য খুব কম লোক সন্তানদের তাহাজ্জুদে জাগিয়ে দেই। ইবরাহীম বিন শাম্মাস (রহ.) বলেন, ‘আমি আহমাদ বিন হাম্বলকে চিনি যখন তিনি কিশোর ছিলেন, তখনও তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন’।[68] ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী বলেন, ‘ওহে যার জীবন অর্থহীন কাজে নষ্ট হয়ে গেছে! যা হারিয়েছ তা ‘লায়লাতুল কদরে’ পুষিয়ে নাও, কারণ এই একটি রাতই পুরো জীবনের সমতুল্য গণ্য হয়’।[69]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাতের অনুসরণে সালাফগণ রামাযানের শেষ দশকে নিয়মিত ই‘তিকাফ করতেন। ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী (রহ.) ই‘তিকাফ ত্যাগ করা মুসলমানদের দেখে অবাক হয়ে বলতেন,عَجَبًا لِلْمُسْلِمِينَ! تَرَكُوا الِاعْتِكَافَ، وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَتْرُكْهُ مُنْذُ دَخَلَ الْمَدِينَةَ حَتَّى قَبَضَهُ اللَّهُ، ‘আশ্চর্য মুসলমানদের জন্য! তারা ই‘তিকাফ ছেড়ে দিয়েছে! অথচ নবী কারীম (ছাঃ) মদীনায় আসার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো ই‘তিকাফ ছাড়েননি’।[70]
রামাযান শেষ হওয়া মানেই এই নয় যে আমরা মুক্তি পেয়ে গেছি। কারণ আল্লামা ছালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন, আমল শেষে মুমিনের কাজ হ’ল আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার করা এবং বিনয় দেখানো। কারণ কে জানে, আমাদের এই ভাঙাচোরা আমলে কত ভুল রয়ে গেছে![71] ছাহাবী ফুযালা বিন ওবায়েদ (রাঃ) বলতেন, لَأَنْ أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ تَقَبَّلَ مِنِّي مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا؛ ‘যদি আমি জানতে পারতাম যে, আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে একটি সরিষার দানা পরিমাণ আমল কবুল করেছেন, তবে তা আমার কাছে গোটা দুনিয়া ও এর মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে বেশী প্রিয় হ’ত’।[72]
রামাযান যখন বিদায় নেয়, তখন আমরা এমাস চলে যাওয়ার কারণে আনন্দিত হই। আর সালাফদের অন্তর তখন দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে যেত। ইমাম ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) রামাযানের শেষের দিকে আক্ষেপ করে বলতেন, হে রামাযান মাস! একটু ধীর হও! বিদায় নিতে তাড়াহুড়া করো না। প্রেমিকদের অশ্রু আজ প্রবাহিত হচ্ছে। বিচ্ছেদের বেদনায় তাদের অন্তর আজ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। যদি বিদায়ের এই মুহূর্তটুকু একটু দীর্ঘ হ’ত, তবে হয়ত ব্যাকুল প্রাণের এই হাহাকার কিছুটা শান্ত হ’ত। হয়ত এই অবসরে তওবার একটি নিখাঁদ মুহূর্ত মিলে যেত; পাপাচার ত্যাগের দৃঢ় সংকল্প দিয়ে ছিয়ামগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সেলাই করে নেওয়া যেত। কে জানে, হয়ত মকবূল বান্দাদের কাফেলা থেকে ছিঁটকে পড়া কোন পথভোলা পথিক আবার তার গন্তব্য খুঁজে পেত! পাপের শৃঙ্খলে বন্দী কোন অভাগা হয়তো আজই পেয়ে যেত মুক্তির স্বাদ, আর জাহান্নামের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা কোন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি নাজাতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত।[73]
রামাযানের শেষ রজনী যখন উপস্থিত হ’ত, সালাফদের হৃদয়গুলো এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠত। যেখানে আমরা ঈদের নতুন পোষাক আর চাঁদরাতের আনন্দে বিভোর থাকি, সেখানে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছাহাবী আলী (রাঃ) লোকদের ডেকে ডুকরে কেঁদে বলতেন,يا ليت شعري من هذا المقبولُ فنهنيه، ومن هذا المحرومُ فنعزِّيه؟ أيُّها المقبولُ: هنيئًا لك، أيُّهَا المردودُ: جبر اللهُ مصيبتك، ‘হায় আফসোস! আমি তো জানি না, কার আমল কবুল হয়েছে যাকে আমি অভিনন্দন জানাবো, আর কার আমল কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে যাকে আমি সমবেদনা জানাব। হে যার আমল গ্রহণ করা হয়েছে! তোমার জন্য সুসংবাদ। আর হে যার আমল কবুল না হয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে! দো‘আ করছি আল্লাহর তোমার মুছীবত দূর করে দিন’।[74] একটু ভাবুন তো! যাঁর জান্নাতের সার্টিফিকেট ছিল, তিনি যদি আমল কবুল না হওয়ার ভয়ে এমন হাহাকার করতে পারেন, তবে আমি আর আপনি কিসের ভরসায় এত নিশ্চিন্তে ঘুমাই? আমাদের ইবাদতে কি সেই ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা ছিল? নাকি আমরা কেবল মানুষের কাছে ‘ছায়েম’ পরিচিতি পেতেই তৃপ্ত ছিলাম?
আমাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানেই হ’ল বাহারি পোষাক আর কেনাকাটা। অথচ ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) আমাদের সেই ভুল ভেঙে দিয়ে বলেন, ليس العيد لمن لبس الجديد، إنما العيد لمن طاعاته تزيد، ليس العيد لمن تجمل باللباس والركوب، إنما العيد لمن غفرت له الذنوب، ‘যে ব্যক্তি নতুন কাপড় পরিধান করে, তার জন্য ঈদ নয়; বরং ঈদের আনন্দ সেই ব্যক্তির জন্য, আল্লাহর প্রতি যার আনুগত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যে ব্যক্তি বাহন ও পোষাক-পরিচ্ছদে সজ্জিত হয়, ঈদের আনন্দ তার জন্য নয়। ঈদের খুশি তো কেবল সেই ব্যক্তির জন্য, যার পাপরাশি ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে’।[75] অর্থাৎ একজন অপরাধী যখন কারাগার থেকে মুক্তি পায়, তখন নতুন কাপড় তার কাছে মুখ্য নয়, বরং মুক্তির পরওয়ানা বা ক্ষমার নিশ্চয়তা পাওয়াই তার কাছে আসল আনন্দ। আমাদের রামাযান যদি আমাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ লিখে দিতে না পারে, তবে সেই নতুন পোষাকে কিসের আনন্দ?
উপসংহার :
আসুন! সালাফে ছালেহীনের সেই সোনালী আদর্শের পাদপিঠে দাঁড়িয়ে নিজেদের নিয়ে একটু ভাবি। সালাফদের রামাযানের সাথে আমাদের রামাযানের তুলনা করি এবং এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয় করি। রামাযান শেষে নিজের আমলের ডালা পরখ করে দেখি! পরকালের মুক্তির জন্য এবং জান্নাতের মর্যাদা লাভের জন্য কতটুকু সঞ্চয় করলাম। আমরা যেন অন্তত এই রামাযানটা হেলায়-খেলায় কাটিয়ে না দেই। হ’তে পারে এবারের রামাযানই আমাদের জীবনের শেষ রামাযান। অতএব আসুন! জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে এবাবের রামাযানকে যিন্দেগীর শ্রেষ্ঠ রামাযানে পরিণত করার চেষ্টা করি। রামাযানের আগেই পার্থিব ঝামেলা ও ব্যস্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করি। নেক আমলে রামাযানের প্রতিটা মুহূর্তকে সুসজ্জিত করার চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
-আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ*
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।
[1]. ইবনু রজব হাম্বলী, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৪৮; আব্দুল আযীয সালমান, মাওয়ারিদুয যামআন, ১/৩৩৮।
[2]. মুসলিম হা/১০৭৯; বুখারী হা/১৮৯৯; মিশকাত হা/১৯৫৬।
[3]. আবুল লায়েছ সামারকান্দী, তাম্বীহুল গাফেলীন, পৃ. ৩২১।
[4]. ইবনে তায়মিয়াহ, মাজমুউল ফাতাওয়া, ৫/১৩১।
[5]. ড. ছালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান, মাজালিসু শাহরি রামাযান, পৃ. ৭।
[6]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৩৫।
[7]. বুখারী হা/০৬; মুসলিম হা/২৩০৮; মিশকাত হা/ ২০৯৮।
[8]. মুযানী, মুখতাছারুল মুযানী ৮/১৫৬; ইবনুল আছীর, আশ-শাফী ফী শারহি মুসনাদিশ শাফেঈ, ৩/২৫১।
[9]. তাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর হা/৮৭০৬; আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া ৭/১৬৬।
[10]. হিলয়াতুল আওলিয়া, ২/৩৩৯।
[11]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৬/২৭০।
[12]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৪/৩৪৭।
[13]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ৩৯৯-৪০০।
[14]. মুহাম্মাদ হুসাইন ইয়াকূব, আসরারুল মুহিববীন ফী রামাযান, পৃ. ১১৭।
[15]. আবূদাঊদ হা/১৩৯৪; তিরমিযী হা/২৯৪৯; সনদ ছহীহ।
[16]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ৩০৬।
[17]. আব্দুল আযীয সালমান, মিফতাহুল আফ্কার ২/৩৮৩।
[18]. ইবনু সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৭/৬৭।
[19]. গাযালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৩৬; ইবনুল জাওযী, বুস্তানুল ওয়া‘ইযীন, পৃ. ২৩৩।
[20]. আসরারুল মুহিবিবন ফী রামাযান, পৃ.৩৪০।
[21]. ইবনু কাছীর, তাবাকাতুশ শাফেঈয়্যিন, পৃ. ৬৯৪; যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায, ৪/৮৪।
[22]. হিলইয়াতুল আউলিয়া ১/৩৮৪।
[23]. মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ফাতাওয়াল ইসলাম, ক্রমিক ১২৫৯৮।
[24]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ, ৪/৯৮।
[25]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১২/৫৩৬।
[26]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৯৯৬; হাকেম হা/১৫৭০, সনদ ছহীহ।
[27]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৯৯৭; আহমাদ হা/৮৮৪৩; হাকেম হা/১৫৭১।
[28]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান, হা/৩৬৪৬; মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৮৮৮০; ২/২৭১।
[29]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ,৮/১২০; ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ,২/৭৬।
[30]. হান্নাদ ইবনে সির্রী, কিতাবুয যুহ্দ, ২/৫৭২।
[31]. ইবনু আবিদ্দুনয়া, আল-জুউ‘, পৃ. ৯৭।
[32]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৭৯; ইবনু আব্দিল বার্র, আল-ইস্তিযকার, ২/৬৭।
[33]. তিরমিযী হা/৮০৬; আবুদাঊদ হা/১৩৭৫; মিশকাত হা/১২৯৮।
[34]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৭৯; মিশকাত হা/১৩০২; সনদ ছহীহ।
[35]. মুওয়াত্বা মালেক হা/৩৭৯; বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা ২/৬৯৮; ইরওয়াউল গালীল ২/১৯২।
[36]. আবূ বকর ফিরয়াবী, আছ-ছিয়াম, পৃ. ১৩৪।
[37]. মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাক্ব ৩/২০৫।
[38]. খতীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ, ২/১২; ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়াহ, ২/৪৩৬; মিযযী, তাহযীবুল কামাল, ২৪/৪৪৬।
[39]. আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী, আত-তাবছিরাহ, ২/২৯৭।
[40]. ইবনু রজব হাম্বলী, আত-তাখওয়ীফ মিনন-নারি ওয়াত তা‘রীফ, ৪/১২২।
[41]. মুছান্নাফে আব্দুর রায্যাক ৪/২৬১, হা/ ৭৭৩৪; সাইয়িদ সাবেক, ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১/২০৭।
[42]. মুছান্নাফে আব্দুর রায্যাক ৪/২৬১, হা/৭৭৩২।
[43]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/৭৬৭৪; ২/১৬২।
[44]. হিলয়াতুল আওলিয়া ২/৩০৬।
[45]. ইবনু আবিদ্দুনয়া, আল-ইশরাফ ফী মানাযিলিল আশরাফ, পৃ. ১৬৬; ইবনু ‘আদী, আল-কামেল, ৪/৪৩৩।
[46]. যাহাবী, তারীখূল ইসলাম, ৮/২৫৭; তাহযীবু তাহযীবিল কামাল, ১/৩৪৩।
[47]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৩/৪১৯; আত-তাবাক্বাতুল কুবরা, ৬/৫৩৫।
[48]. বুখারী হা/০৬; মুসলিম হা/২৩০৮; মিশকাত হা/ ২০৯৮।
[49]. ইবনু বাত্তাল, শারহু ছহীহিল বুখারী ৪/২২।
[50]. ইবনু রজব হাম্বলী, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৬৮।
[51]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া,১/৩৫৫; আল-মুন্তাযাম ফী তারীখিল মুলূকি ওয়াল উমাম, ৬/৩২৮।
[52]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৫/২৩৪।
[53]. বায়হাক্বী, ফাযায়েলুল আওক্বাত, পৃ. ১৮৭; শু‘আবুল ঈমান ৫/২৪৮।
[54]. আব্দুল আযীয সালমান, মিফতাহুল আফকার, ১/২২১; মাওয়ারিদুয যামআন, ৩/৩০।
[55]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ফাওয়ায়েদ ১/৪৪।
[56]. ইবনে তায়মিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাহ ৫/২৩০।
[57]. মুহাম্মদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, আদ-যিয়াউল লামে‘ মিনাল খুতাবিল জাওয়ামে‘, ২/১৬৫।
[58]. উছায়মীন, মাজালিসু শাহরি রামাযান, পৃ. ১২
[59]. ইবনু রজব হাম্বলী, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৪৮।
[60]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া, ২/৯২; ইবনু রজব হাম্বলী, জামে‘উল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/১৩২।
[61]. বুখারী হা/২০২৪; মুসলিম হা/১১৭৪; মিশকাত হা/২০৯০।
[62]. মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৪/৫৫।
[63]. ইসমাইল ইস্ফাহানী, আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ২/৩৭২।
[64]. ইসমাঈল ইস্ফাহানী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, ২/৩৭২।
[65]. মুসলিম হা/১১৭৫; মিশকাত হা/২০৮৯, রাবী আয়েশা (রাঃ)।
[66]. কানযুল উম্মাল, ১২/৫৫৯; ইবনে রজব, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৮৬।
[67]. হুসাইন আল-আফ্ফানী, নিদাউর রাইয়ান, ২/১৯৭।
[68]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুস ছাফওয়াহ, ১/৪৮৩।
[69]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৯১; নিদাউর রাইয়ান, ১/২৯৯।
[70]. ইবনে হাজার আসক্বালানী, ফাতহুল বারী, ৪/২৮৫।
[71]. ড. ছালেহ আল-ফাওযান, মাজালিসু শাহরি রামাযান, পৃ. ১১৮।
[72]. ইবনুল মুবারক, আয-যুহদু ওয়ার রাক্বায়েক্ব, পৃ. ১৯; ইবনু আবিদ্দুনয়া, আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়াত, পৃ. ৪৯।
[73]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২১৭।
[74]. লাত্বাইফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২১০; আসরারুল মুহিববীন, পৃ. ৩৪১।
[75]. লাত্বাইফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৭৭।