মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করলেও অদৃশ্য ইশারায় এমন সব নতুন নতুন রোগব্যাধির উদ্ভব হচ্ছে, যা মানব জীবনের জন্য এক গভীর অশনিসংকেত। ডেঙ্গু তেমনই এক মশাবাহিত রোগ, যা কেবল মানুষের দেহকেই দুর্বল করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপরও সৃষ্টি করে বহুমাত্রিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অভিঘাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য ডেঙ্গু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ, পরিবারের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, চিকিৎসাব্যয়ের বোঝা এবং প্রিয়জন হারানোর বেদনা-সব মিলিয়ে ডেঙ্গু এখন শুধু একটি চিকিৎসাবিষয়ক সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক সংকটের রূপ ধারণ করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলতি বছরে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫৫ হাযার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৬৮তে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনে আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হাযার ৯৯১ জন, মৃত্যু হয়েছে ৫২ জনের। অথচ পুরো আগস্ট মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ২০ হাযার ৫৩৬ জন। মারা গেছে ৪৩ জন। এর আগের মাস জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছিল ৯ হাযার ২০৬ জন এবং মারা গেছে ৩৬ জন (কালের কণ্ঠ)। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অক্টোবরে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। উল্লেখ্য, এই পরিসংখ্যান কেবলমাত্র কিছু সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, মা-বাবা, সন্তান, স্বজন, একটি কর্মজীবন এবং কখনো কখনো একটি অপূরণীয় শূন্যতা।
প্রশ্ন হচ্ছে-কেন জনপদের ওপর বারবার বিপর্যয় নেমে আসে? কেন বিভিন্ন সময়ে নানাবিধ রোগব্যাধি মহামারীর আকার ধারণ করে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে? এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলমানের ঈমানের দৃঢ়তা কেমন হওয়া উচিত? একই সঙ্গে একজন মানুষ হিসাবে সমাজ ও মানবতার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাই বা কতটুকু? এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করাই হবে আলোচ্য নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
যেভাবে শুরু : ডেঙ্গু মহামারী আকারে প্রথম দেখা দেয় ১৭৮০ সালে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে। অতঃপর ঊনিশ শতকে ও বিশ শতকের প্রথম দিকে ডেঙ্গুজ্বরের মহামারী ঘটে আমেরিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াতে। ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবিয়ান সাগরের কিছু কিছু দ্বীপেও ডেঙ্গুর সন্ধান মেলে। তবে এইসব ডেঙ্গু প্রাণঘাতী ছিল না। পরবর্তীতে হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণজনিত প্রাণঘাতী ডেঙ্গুজ্বর (DHF) প্রথম মহামারী আকারে দেখা দেয় ১৯২২ সালে আমেরিকার টেক্সাস ও লুসিয়ানা নগরীতে। ১৯৮১ সালে কিউবাতে এবং ১৯৮৯ সালে ভেনেজুয়েলাতেও এই জ্বর মহামারী আকারে দেখা দেয়। তবে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফেভার সবচেয়ে বেশী হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ (WHO)-এর হিসাব মতে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত এই রোগে এই অঞ্চলে আক্রান্ত হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাযার ৩৮৬ জন এবং মারা গেছে ৯ হাযার ৭৭৪ জন। ১৯৯৭ সালে নয়াদিল্লীতে ডেঙ্গুজ্বর ভয়াবহরূপে দেখা দেয়। যাতে ৩০ হাযার লোক আক্রান্ত হয় এবং সহস্রাধিক লোক মারা যায়। ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুজ্বর দেখা দেয় ১৯৬৪ সালে। অতঃপর ১৯৭৭-৭৮ সালে পুনরায় দেখা দেয়। তবে এগুলি ছিল সামান্য আকারে। তখন একে ‘ঢাকা ফেভার’ বলা হ’ত। অতঃপর ১৯৯৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে যখন ঢাকায় হঠাৎ করে ডেঙ্গুজ্বরে দুই তরুণ মারা যায়, তখন সরকারের টনক নড়ে। ঢাকা মহানগরীকে ২৩টি জোনে ভাগ করে ২১টিতেই ডেঙ্গু স্ত্রী জাতীয় এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপরে ১৯৯৮ সালের জুলাই-আগস্টে ভয়াবহ বন্যার পরপরই ‘বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা’র পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে ডেঙ্গুজ্বর সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়। অতঃপর ২০০০ সালের জুন মাস থেকে ডেঙ্গু মহামারী আকারে ঢাকা মহানগরীকে গ্রাস করে। সেই সাথে সারা দেশে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে (সূত্র : আত-তাহরীক)।
কারণ : কেন জনপদের ওপর বারবার বিপর্যয় নেমে আসে? এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে- ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও জলে সর্বত্র বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের কিছু কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (আল্লাহর দিকে) ফিরে আসে’ (রূম ৩০/৪১)। অর্থাৎ মানুষের অন্যায় কর্ম সমাজে বিপর্যয় ডেকে আনে। মানুষ আক্রান্ত হয় নানাবিধ এলাহী গযবে। যদিও ইসলাম বারংবার মানুষকে তওবা, ন্যায়বিচার, সৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে আসছে। কিন্তু মানুষ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বরং প্রতিনিয়ত পাপের সাগরে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হচ্ছে। ফলে এলাহী নির্দেশে আসমানী বালা-মুছীবতও বিভিন্ন নামে নতুন নতুন রূপে আক্রমণ করছে। সুতরাং এ কথা বলাবহুল্য যে, মানুষের পাপ যত বৃদ্ধি পাবে, বালা-মুছীবতও সেভাবে বৃদ্ধি পাবে। পাপের প্রকৃতি যত পরিবর্তন হবে, গযবের প্রকৃতিও তেমনি পরিবর্তিত হবে। একসময় কলেরা, ম্যালেরিয়া, গুটি বসন্ত, যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, কুষ্ঠরোগ ইত্যাদি রোগে মানুষ আতঙ্কিত থাকত। এ সবের স্থান এখন দখল করেছে করোনা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ আধুনিক সব রোগব্যাধি। আর এ সবই পরিকল্পিতভাবে বিশ্বপালক মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর নির্দেশেই আসে। যেমন তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে বা তোমাদের জীবনে এমন কোন বিপদ আসে না, যা তা সৃষ্টির পূর্বে আমরা কিতাবে লিপিবদ্ধ করিনি’ (হাদীদ ৫৭/২২-২৩)।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও। (১) যখন কোন জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব রোগের উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকেদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (২) যখন কোন জাতি ওযন ও পরিমাপে কম দেয়, তখন সে জাতি দুর্ভিক্ষ, খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হয়। (৩) যে জাতি তাদের মালের যাকাত দেওয়া বন্ধ করে দেয়, সে জাতির জন্য আকাশ হ’তে বৃষ্টি বন্ধ করে দেওয়া হয়। যদি অন্যান্য প্রাণীকুল না থাকত, তাহ’লে তাদের জন্য আদৌ বৃষ্টি হ’ত না। (৪) যখন কোন জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের উপর তাদের বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাশীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ কেড়ে নেয়। (৫) যখন শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব মোতাবেক মীমাংসা না করে এবং আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে গ্রহণ না করে, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেন’।[1]
প্রিয় পাঠক! আমরা বা দেশের সরকার ও প্রশাসনের কোন কর্তা ব্যক্তি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো যে, উক্ত অপরাধগুলো থেকে আমরা মুক্ত আছি বা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত রাখতে পারছি। বরং উপরোক্ত অপরাধগুলোর সবই প্রায় সে যুগের তুলনায় এ যুগে আরো ব্যাপকহারে চালু আছে এবং আরো আধুনিক ও ডিজিটাল ফরমেটে দেদারসে চলছে। সুতরাং আমরা কি করে আশা করতে পারি যে, আমাদের উপরে আসমানী বালা-মুছীবত নেমে আসবে না। অতএব এলাহী গযব থেকে বাঁচতে আমাদের তওবা করা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই।
ঈমানী দৈন্যতা: এক্ষণে মহামারী দেখা দিলে আমাদের ঈমানের হাল-হকিকত কেমন হয় সেদিকে একটু নযর দেয়া যাক। আমরা যেহেতু জেনেছি যে, মহামারী ছোঁয়াচে রোগ, সেকারণ এ থেকে বাঁচা তথা মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য আমরা কমবেশী সকলেই আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্ত এজন্য কিছু মানুষের নিষ্ঠুরতা জাতিকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। কোভিড-১৯ য়ে যেটা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আক্রান্ত ব্যক্তি যত নিকটাত্মীয়ই হোন না কেন তার থেকে দূরে থাকা, তার সেবা না করা, জানাযা ও কাফন-দাফনে শরীক না হওয়া, লাশ ফেলে পালিয়ে যাওয়া, বৃদ্ধা মাকে জঙ্গলে ফেলে আসার মত লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটেছে সেসময়। সকলের মধ্যে যেন বাঁচার এক মর্মস্পর্শী আকুতি। কবির ভাষায়-
মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!
আমাদের ঈমানের দৈন্যতা এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে, আমরা ভাইরাসকেই যেন হায়াত-মওতের মালিক ধরে নিয়েছি। সেকারণ ভাইরাস থেকে পালানোর জন্য ব্যস্ত, কিন্তু আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল আমাদের কোথায়? তবে কি আমরা বেমালুম ভুলে গেছি যে, ভাইরাসের যিনি স্রষ্টা তিনি আমারও স্রষ্টা। তিনি মায়ের পেটে ১২০ দিন বয়সে আমার আয়ুষ্কাল লিখে দিয়েছেন (বুখারী হ/৩২০৮)। আমার তাক্বদীর পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাযার বছর আগে লেখা হয়েছে (মুসলিম হা/২৬৫৩)। সুতরাং আমাকে ক্ষতি করার ভাইরাসের নিজস্ব কোন ক্ষমতা নেই। সে যতই ছোঁয়াচে হোক মহান রবের ইশারা ব্যতীত সে আমাকে স্পর্শ করার এখতিয়ার রাখে না। আল্লাহ যদি চান এই ভাইরাসের আক্রমণে আমার মৃত্যু হবে তবেই আমার মৃত্যু হবে। মহান আল্লাহ না চাইলে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই, যে আমাকে মারতে পারে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একত্রিত হয়ে চেষ্টা করলেও আমার কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারবে না (তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৩০২)। ঈমানের এই দৃঢ়তা আমাদের কোথায়? যার অভাবে আজ আমরা দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটছি। মানবিকতার লেবাস পরে অমানবিক হয়ে ওঠেছি। এতএব যেকোন মূল্যে আমাদেরকে ঈমানী দৈন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিপদে ঈমান না হারিয়ে বরং ঈমানকে আরো দৃঢ় ও মযবুত করতে হবে।
করণীয় : মহামারী দেখা দিলে ঈমানী দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের করণীয় হচ্ছে- (১) আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্যধারণ করা। কেননা বিপদাপদ একদিকে যেমন কৃতকর্মের ফল, অপরদিকে তেমনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘আর অবশ্যই আমরা তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, ধন ও প্রাণের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে এবং ফল-শস্যাদি বিনষ্টের মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যাদের কোন বিপদ আসলে তারা বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব’ (বাক্বারাহ ২/১৫৫-১৫৭)। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্লেগ মহামারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটি একটি আযাব। আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা করেন তার উপর এটি প্রেরণ করেন। তিনি তাঁর মুমিন বান্দাদের জন্য এটাকে ‘রহমত’ স্বরূপ করেছেন। ফলে কোন ব্যক্তি যদি মহামারী এলাকায় ধৈর্যের সাথে ও ছওয়াবের আশায় অবস্থান করে এবং হৃদয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন তাই হবে, তবে সে একজন শহীদের মর্যাদা লাভ করবে’ (বুখারী হা/৩৪৭৪)।
(২) তাক্বদীরের উপর বিশ্বাস রাখা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি আল্লাহ তোমাকে কোন কষ্টে নিপতিত করেন, তবে তিনি ছাড়া তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কোন কল্যাণ চান, তবে তার অনুগ্রহকে প্রতিরোধ করার কেউ নেই। স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে খুশী তিনি তা দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ইউনুস ১০/১০৭)। তিনি স্বীয় রাসূলকে বলেন, ‘তুমি বল, আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, তা ব্যতীত কিছুই আমাদের নিকট পৌঁছবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর উপরেই মুমিনদের ভরসা করা উচিত’ (তওবা ৯/৫১)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইবনু আববাস (রাঃ)-কে বলেন, ‘যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর নিকটেই চাইবে। আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন আল্লাহর টিকটেই সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রাখ, যদি উম্মতের সবাই তোমার কোন উপকারের জন্য একত্রিত হয়, তারা তোমার কোন উপকার করতে সক্ষম হবে না অতটুকু ব্যতীত, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর তারা যদি সবাই তোমার কোন ক্ষতি করতে চায়, তবে কেবল অতটুকুই পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন’...।[2]
(৩) কৃত পাপ থেকে তওবা করা ও অধিকহারে নেক আমলে ব্রতী হওয়া। হাদীছে ঘোষিত যে সকল পাপের কারণে আসমানী গযব নেমে আসে, সে সকল পাপ থেকে খাঁটি তওবা করা এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা। উল্লেখ্য যে, তওবা হচ্ছে- কৃত পাপ বর্জন করা, ঐ পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ঐ পাপে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এই তিনটি শর্ত পূরণ হলে তবে একে কুরআনে ঘোষিত ‘তওবায়ে নাছূহা’ বা খাঁটি তওবা বলে। সেই সাথে বেশী বেশী নেক আমল করতে হবে। ফরযের পাশাপাশি নফল ইবাদতে অভ্যস্ত হবে হবে। আখলাকে হাসানার অধিকারী হতে হবে। কারো প্রতি যুলুম-নির্যাতন করা যাবে না। যেনার সকল উপসর্গ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততার স্বাক্ষর রাখতে হবে। মাপে ও ওযনে ন্যায়নীতি বজায় রাখতে হবে। যাকাত আদায় ও দান-ছাদাক্বায়ও অগ্রগামী হ’তে হবে। তবেই আমাদের উপর আসমানী গযবের পরিবর্তে আসমানী মদদ নেমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
মানবিক দায়িত্ব : ডেঙ্গু মহামারীতে নিজেদের সুরক্ষার পাশাপাশি আমাদের কিছু মানবিক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন- আক্রান্ত ব্যক্তি ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা। রোগীকে অবহেলা বা সামাজিকভাবে হেয় না করে মানসিকভাবে সাহস জোগানো। তার চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা। প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা এবং সম্ভব হলে নিজে রক্ত দেওয়া। মশার বংশবিস্তার রোধ তথা প্রজননস্থল ধ্বংস করা। নিজের বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা এবং অন্যদেরও এ কাজে উৎসাহিত করা। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। ডেঙ্গু সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা এবং গুজব বা ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। হাসপাতাল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্থানীয় উদ্যোগে সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় রোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসা। এককথায় ডেঙ্গুর মতো সংকটে মানবিক দায়িত্ব হলো- নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি অন্যের জীবন রক্ষায় সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে আসা।
সরকারের দায়িত্ব : ডেঙ্গু বা যেকোন মহামারীতে সরকারের দায়বদ্ধতা অনেক বেশী। জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এ জন্য সরকারের রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তাছাড়া প্রত্যেক যেলাতে রয়েছে যেলা প্রশাসন, সিটির মধ্যে রয়েছে সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বছরের পর বছর ধরে চলা মশাবাহিত এই মহামারীর উৎস ‘এডিস মশা’ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। অতীতে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সিটিতে বা যেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যেলা সদরে ফগার মেশিনে ঔষধ স্প্রে করার মাধ্যমে মশা নিধনের ব্যবস্থা থাকলেও ইদানিং তেমন একটা চোখে পড়ে না। ফলে প্রত্যেকটা শহর যেন এখন মশার নিরাপদ নগরীতে পরিণত হয়েছে। এ খাতের বাজেট কোথায় যায়? কোন সাধু ব্যক্তিরা তা হযম করেন সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবেন। আমরা সাদা চোখে যা দেখি তাই বলছি। সুতরাং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের উল্লেখযোগ্য করণীয়গুলো হচ্ছে-
১. মশা নিয়ন্ত্রণ : নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া। ২. পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা : জলাবদ্ধতা, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনসহ যেসব স্থানে পানি জমে মশা জন্মাতে পারে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। ৩. চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা : সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা -সামগ্রী নিশ্চিত করা। ৪. দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ : রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা। ৫. জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা : ডেঙ্গুর লক্ষণ, সতর্কতা, কখন চিকিৎসা নিতে হবে এবং কীভাবে মশার প্রজনন রোধ করা যায়-এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচার করা। ৬. যরূরী সহায়তা ও সমন্বয় : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, হাসপাতাল ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করা এবং চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা। ৭. ওষুধ ও চিকিৎসা-সামগ্রীর সহজলভ্যতা : প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রী ও পরীক্ষার উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সংকটের সুযোগে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া প্রতিরোধ করা। ৮. দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা : যাদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন, তাদের জন্য সরকারি সহায়তা ও সহজলভ্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
শেষ কথা : ডেঙ্গু আমাদের সামনে এমন একটি দর্পণ, যে দর্পণে শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, দেখা যায় আমাদের সচেতনতা, আমাদের পরিচ্ছন্নতা, আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ এবং আমাদের ঈমানের বাস্তব অবস্থা ও প্রয়োগ। ডেঙ্গু স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের জীবনের ভুল-ভ্রান্তি ও কৃত সব অপরাধের কথা। একটি পরিচ্ছন্ন ঘর যেমন একটি পরিবারের নিরাপত্তা বাড়ায়, তেমনি হাযারো পরিচ্ছন্ন ও দায়িত্বশীল পরিবার একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পারে। মানুষের জীবন রক্ষা, বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পৃথিবীকে পরিচ্ছন্ন রাখা-এসবই একজন মুমিনের দায়িত্বশীল জীবনের অংশ। তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই হোক জ্ঞান ও সচেতনতার, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যয়ে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!!
[1]. ইবনু মাজাহ হা/৪০১৯, ছহীহাহ হা/১০৬, ৪০০৯, সনদ হাসান।
[2]. তিরমিযী হা/২৫১৬; মিশকাত হা/৫৩০২।