সমাজে অপরাধ যখন বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে, মযলূমের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, তখন মানুষের ভেতরকার কৃত্রিম অহংকারগুলো সব ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের ১৯ মে। ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তার ঘরে ফেরেনি। সদ্য ক্লাসে প্রথম হওয়ার আনন্দ বুকে নিয়ে যে মেয়ে বের হয়েছিল, তাকে প্রতিবেশী সোহেল রানা ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। রামিসার ছোট্ট লাশ যখন উদ্ধার হ’ল, কাঁদল পুরো দেশ। ঘটনার নির্মমতা স্তব্ধ করে দেয় দেশের বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে। সভ্যতার খোলসমুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষ ভাবতে বসল, আসলেই কি আমরা সভ্য জগতে বসবাস করছি? অনুরূপভাবে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পর রাজপথ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- সর্বত্র একটি অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা আদর্শিক ভিন্নতা ভুলে সেক্যুলার থেকে শুরু করে ইসলামপন্থী, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ এক আওয়াযে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক প্রকাশ্য শাস্তি দাবী করল। গণমানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত চিৎকারে কোন তাত্ত্বিক বিলাসিতা বা সুশীল পান্ডিত্যের রং ছিল না, বরং ছিল ন্যায়বিচারের জন্য এক আকুল মানবিক হাহাকার। আর এই দাবীর মধ্যেই ফুটে উঠেছে ইসলামী বিচারব্যবস্থার অমোঘ সত্যতা এবং বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তা।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হ’ল, জনগণের এই ন্যায়সংগত ও তীব্র দাবীর মুখে দাঁড়িয়ে যখন সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রকাশ্য শাস্তির দাবী নিয়ে সরকারের অবস্থান কী? তখন তিনি নিজে একজন মুসলিম হয়ে অবলীলায় মন্তব্য করে বসেন যে, ‘আমরা এখন মধ্যযুগে নেই। আমরা আধুনিক যুগে। আইন সংস্কারটা একটা চলমান প্রক্রিয়া’। তিনি আরো বললেন, ‘ক্ষোভের মুহূর্তে ইমোশনালি আইন বানানো ঠিক না, কঠোর আইনের অপব্যবহার হ’তে পারে’। অর্থাৎ তার দৃষ্টিতে ইসলামী বিচারব্যবস্থা ‘মধ্যযুগীয়’, আর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইনই ‘আধুনিকতা‘।

তার এই বক্তব্য কেবল মযলূমের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে নুনের ছিটাই দেয় না, বরং আধুনিক সভ্যতাকামীদের মন ও মননের গভীর মানসিক দেউলিয়াত্ব ও ঔপনিবেশিক দাসত্বকে উন্মোচিত করে। শিক্ষাব্যবস্থা ও মিডিয়ার মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিশ্ব যে কত গভীরভাবে ইসলামফোবিয়াকে আমাদের সেক্যুলার সমাজে অনুপ্রবেশ করিয়েছে, তা ভাবার সময় এখন এসেছে। বিশেষ করে আল্লাহ প্রে্ররিত শাশ্বত বিচারব্যবস্থাকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে তাচ্ছিল্য করার এই যে আধুনিক ফ্যাশন, তা যে কতটা অসার এবং মানবতা বর্জিত, তা আজ গভীরভাবে তলিয়ে দেখার সময় এসেছে।

তাত্ত্বিক বিলাসিতা বনাম বাস্তবতার নির্মম কশাঘাত

মানুষ যখন ঘরে বসে পারিবারিক আড্ডায় কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গোলটেবিল বৈঠকে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দর্শন কিংবা মানবাধিকারের তত্ত্ব ঝাড়ে, তখন সে অনেক অবাস্তব ও গালভরা কথা বলতে পারে। অপরাধীর ‘মানবাধিকার’, ‘মনস্তাত্ত্বিক সংশোধন’ কিংবা ‘শাস্তির আধুনিকায়ন’ নিয়ে লম্বা লম্বা বুলি আওড়ানো খুবই সহজ, কারণ পরনিন্দা বা পরের ট্র‍¨vজেডি নিয়ে সুশীল সাজতে কোন মূল্য চোকাতে হয় না। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম কশাঘাত যখন নিজের পিঠে এসে পড়ে, তখন এই সমন্ত কৃত্রিম তত্ত্ব আলাপন তাসের ঘরের মতো হারিয়ে যায়।

আজ যারা অপরাধীর মানবাধিকার রক্ষায় এত সোচ্চার, একটিবারের জন্য কি তারা ভাবেন যে, এই একই বীভৎস ঘটনা যদি তাঁদের নিজেদের জীবনে ঘটত? আজ যে নরপশুরা অন্যের কোল খালি করেছে, তারা যদি এই সুশীল তাত্ত্বিকদের নিজেদের পরম আদরের সন্তান, সহোদর ভাই কিংবা জন্মদাত্রী মায়ের ওপর এমন পৈশাচিক বর্বরতা চালাত, তখনো কি তাঁরা এই একই রকম নমনীয় তত্ত্ব আর সুশীলতার বুলি ঝাড়তেন? তখনো কি তাঁরা খুনিকে রাষ্ট্রীয় কারাগারে জামাই আদরে রেখে ‘সংশোধন’ করার ওকালতি করতেন? নাকি সমস্ত আধুনিকতার খোলস ভেঙে ডুকরে কেঁদে উঠে বলতেন, ‘আমি এই পশুর প্রকাশ্য ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই’? অথবা রামিসার বাবার মত সমাজব্যবস্থার প্রতি চরম হতাশা নিয়ে বলতেন, ‘আমি বিচার চাই না, আপনারা এই বিচার করতে পারবেন না’।

নিশ্চিতভাবেই তখন কোন ফাঁপা তত্ত্ব খাটত না। কারণ মানুষের ভেতরের ‘ফিতরাত’ বা আল্লাহর তরফ থেকে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি কখনোই অন্যায়কে মেনে নেয় না। ইতিপূর্বে ২০১১ সালে ইভটিজিং-এর প্রতিবাদ করায় নাটোরের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান হত্যার পর যেভাবে আধুনিক সুশীল সমাজকেও ‘ফায়ার স্কোয়াডে গুলি করা’ বা ‘জনসম্মুখে টেনে-হিঁচড়ে মারার’ মত চরম শাস্তির দাবী তুলতে দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে, পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন পরম নাস্তিক বা কট্টর সেক্যুলার ব্যক্তিটিও অবচেতনভাবে আল্লাহর দেওয়া ‘কিবছাছ’ বা চোখের বদলে চোখ, প্রাণের বদলে প্রাণ-এই শাশ্বত নীতির দিকেই হাত বাড়াতে বাধ্য হয়।

ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার অসারতা ও আধুনিক সভ্যতার সংকট :

বাংলাদেশে আজ যে বিচার-কাঠামোকে ‘আধুনিক’ বলা হচ্ছে তা আসলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের তৈরি করা এক জরাজীর্ণ ও পঙ্গু উত্তরাধিকার। এর শিকড় প্রোথিত তিনটি ঔপনিবেশিক দলীলে-রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩, ইন্ডিয়ান পেনাল কোড ১৮৬০ এবং ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড ১৮৯৮। এগুলো রচনা করেছিলেন লর্ড মেকলে এবং তাঁর সহযোগীরা।[1] তথাকথিত এই ‘আধুনিক আইন’ সমাজকে শান্তি দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো অপরাধের চারণভূমিতে পরিণত করেছে। এই মানবরচিত আইনের প্রধানতম ব্যাধিগুলো আজ আমাদের সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। মন্ত্রীর আহবান ‘আধুনিক যুগে’র দিকে। চলুন সেই আধুনিক বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা একটু দেখা যাক। যেমন :

(১) শাস্তি নিরূপণে অনিশ্চয়তা ও ভিকটিমের অবমাননা : ব্রিটিশ আইনের সবচেয়ে বড় ট্র‍¨vজেডি হ’ল, এটি অপরাধের ভয়াবহতা এবং ভিকটিমের পরিবারের মানসিক যন্ত্রণার গভীরতা পরিমাপ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এতে প্রকৃত শাস্তি নিরূপণ করা ভীষণ অনিশ্চিত এবং ভিকটিম আরো ভিকিটিম হবে-এটাই স্বাভাবিক। এতে একজন খুনী বা ধর্ষক অপরাধী হয়েও বছরের পর বছর ধরে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাষ্ট্রীয় কারাগারে অন্ন-বস্ত্র ও চিকিৎসা পেয়ে আয়েশ করার সুযোগ পায় এবং অন্য অপরাধীদের সাথে মিশে আরো বড় অপরাধের জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে। অন্যদিকে ভিকটিমের পরিবার চোখের পানি ফেলে আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘোরে। আর শেষ বেলায় অধিকাংশ সময় আইনী ফাঁকফোকর গলে কিংবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় কুখ্যাত অপরাধীরাও মুক্ত হয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। এই আইন অপরাধীর অধিকার রক্ষায় যতটুকু তৎপর, মযলূমের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ততটুকুই উদাসীন।

অন্যদিকে কোন অপরাধে আসামী ধনী ও প্রভাবশালী হ’লে মুক্তি পাবে, আর গরীব কারাগারে থাকবে- এটা এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফলাফল। ক্ষমতাবান আসামীর উকিল সাক্ষীর সাক্ষ্য ভন্ডুল করে দেয়, ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘায়িত করে বিচার। ফলে বাস্তবে এই বিচারব্যবস্থা স্রেফ একটি সমাধানহীন জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। যেমন ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪৬ লাখ ৫২ হাযারেরও অধিক।[2] ২০২৫ সালের শেষে শুধু নিম্ন আদালতে ৪০ লাখ ৪১ হাযার মামলা।[3] ২০০৮ থেকে প্রতি বছর গড়ে আরো ১ লাখ ৬০ হাযার মামলা বাকি তালিকায় যোগ হচ্ছে। হিসাব সোজা। এই পথে এগোলে ২০২৬ সালে সংখ্যাটা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলে থাকে, যার কোন শেষ নেই। একসময় বাদী-বিবাদী উভয়ই পরলোকগত হয়, কিন্তু মামলার শেষ হয় না। শুধু মামলার জটই নয়, বিচারের ফলাফলও উদ্বেগজনক। আর সাজার হার? সে আরেক চরম পরিহাস। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র‍¨vকের যেŠথ গবেষণা জানাচ্ছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। ৭০ শতাংশ আসামী বেকসুর খালাস পায়। একই গবেষণায় আরও দেখা যায়, আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা থাকলেও একটি মামলার গড় নিষ্পত্তিকাল ১,৩৭০ দিন (প্রায় ৩.৭ বছর) এবং গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হয়।[4] শুধু ধর্ষণ মামলায় হিসাব করলে সাজার হার ১ শতাংশেরও কম। মানবাধিকার সংস্থা HRW এই তথ্য দিয়েছে। অর্থাৎ ১০০ জন ধর্ষক বা শিশু হত্যাকারীর মধ্যে মাত্র ৩ জনের সাজা হচ্ছে![5] পুলিশ নিজেই হতাশ হয়ে বলছে, আমরা কষ্ট করে মাদকসেবীদের ধরি আর আদালত দু’দিন পর তাদেরকে যামিন দেয়। এই হচ্ছে তথাকথিত ‘আধুনিক’ বিচারব্যবস্থার নমুনা!

(২) অন্তহীন দীর্ঘসূত্রিতার অভিশাপ : Justice delayed is justice denied (বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতার শামিল)। এই প্রবাদটি আজ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে ধ্রুব সত্য। একজন অপরাধী অপরাধ স্বীকার করার পরও এবং সব রকম প্রমাণ হাযির থাকার পরও তার বিচার নামে প্রহসন পর্ব শেষ হ’তে লেগে যায় বহু বছর। একটি হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় হ’তে সর্বনিম্ন পক্ষে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ততদিনে ভিকটিমের বাবা-মা দুনিয়া ছেড়ে চলে যান, মামলার সাক্ষী উধাও হয়ে যায় এবং মানুষের স্মৃতি থেকে অপরাধের ভয়াবহতা মুছে যায়। সবকিছু ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার পর যে রায় আসে, তা সমাজে আর কোন প্রভাব ফেলে না। এভাবে চলছে বিচারের নামে এক ভয়াবহ স্ক্যাম, যার বিরুদ্ধে কিছু বললে তা নাকি হয়ে যায় মধ্যযুগীয় আলাপ আর ধর্মান্ধতা! বিজ্ঞজনেরা দেশের বিচারব্যবস্থার এই করুণ দশা দেখে আক্ষেপ করে বলে থাকেন, ‘বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা একটি জুয়ার আড্ডায় পরিণত হয়েছে’। যেখানে টাকা, ক্ষমতা আর আইনী মারপ্যাঁচে ন্যায়বিচার কেনাবেচা হয়, যতই সেখানে পোষাকধারী জজ-ব্যারিস্টারের দবদবা থাকুক না কেন, তাকে যতই আধুনিক বা সভ্য বলা হোক না কেন, এই ব্যবস্থা এক নির্মম তামাশা, প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।

(৩) অপরাধ দমনে চরম ব্যর্থতা : আধুনিক আইনের মূল দর্শন নাকি অপরাধীকে সংশোধন করা। কিন্তু কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োগ না থাকার কারণে অপরাধীরা অবলীলায় ছাড় পেয়ে যাচ্ছে এবং নতুন উদ্যমে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। ফলে সমাজে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। যেই আইনী ব্যবস্থা অপরাধীর মনে আল্লাহভীতি বা রাষ্ট্রীয় দন্ডের ভয় তৈরি করতে পারে না, সেই আইন কখনো সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে পারে না। বর্তমান ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা আজ সমাজকে অপরাধমুক্ত করার চেয়ে অপরাধীদের ঢাল হিসাবেই বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন শাস্তির নিশ্চয়তা, তীব্রতা ও দ্রুততা। যদি ৯৯ জন ধর্ষক মুক্ত হয়ে বের হয়, তাহ’লে ১০০তম ধর্ষকের মনে ভয় জন্মাবে কেন? প্রতিটি ‘সাজা না হওয়া’ কি পরবর্তী অপরাধীর জন্য সবুজ সংকেত নয়?

(৪) বিনা বিচারে বন্দীত্ব : দেশের কারাগারে মোট বন্দীদের প্রায় ৮০ শতাংশ বিচারাধীন (under trial)। অর্থাৎ বিচারিক জট ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই ধরনের আসামীরা সাজা ছাড়াই কারাগারে। এই ব্যবস্থায় অভিযুক্ত গরীব মানুষ শাস্তি পায় কোন রকম বিচারের আগেই। আর রাজনৈতিক প্রভাবশালী, সম্পদশালী অপরাধীরা আপীলের মারপ্যাঁচে বছরের পর বছর মুক্ত থাকে। এই ব্যবস্থাকে ‘আধুনিক’ বলতে নূন্যতম হ’লেও তো লজ্জা থাকা উচিৎ!

ইসলামী বিচারব্যবস্থা : শাশ্বত ও ফিতরাত-সম্মত সমাধান

যারা ইসলামের এলাহী বিচারব্যবস্থাকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে তাচ্ছিল্য করেন, তাঁরা মূলত এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা বুঝতে অক্ষম। ইসলামী দন্ডবিধি (হুদূদ ও কিবছাছ) কোন প্রতিহিংসামূলক বর্বরতা নয়, বরং তা সমাজ থেকে অপরাধের শিকড় উপড়ে ফেলার এক বিজ্ঞানসম্মত ও এলাহী পদ্ধতি। বিচারব্যবস্থায় টাকা ও ক্ষমতার কোন মূল্য নেই। এখানে শাস্তি নির্ধারিত এবং ব্যক্তির পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য।

মূলত: ইসলামের এই কঠোর শাস্তি ব্যবস্থা একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (Deterrent)। আর জনসম্মুখে প্রকাশ্যে কিবছাছ বা হুদূদ কার্যকর করার মূল উদ্দেশ্যই হ’ল, যেন তা দেখে অন্য কোন সম্ভাব্য অপরাধীর বুক কেঁপে ওঠে। আল্লাহ তাই স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! কিবছাছের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা বেঁচে থাকতে পার’ (বাক্বারাহ ২/১৭৯)। অর্থাৎ একজন খুনীর প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড মূলত শত শত নিরপরাধ মানুষের জীবনকে নিরাপদ করার গ্যারান্টি।

দ্বিতীয়ত : ইসলামে ভিকটিমের পরিবারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এমনকি কিবছাছের ক্ষেত্রে খুনীকে ক্ষমা করার বা রক্তপণ (দিয়াত) গ্রহণের অধিকারও দিয়েছে ভিকটিমের পরিবারকে। রাষ্ট্রের এখানে জোর করে কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি যেমন ভিকটিমের পরিবারের ক্ষোভ প্রশমন করে, তেমনি সামাজিক প্রতিশোধের অন্তহীন চক্রের অবসান ঘটায়।

তৃতীয়ত : তাছাড়া ইসলামী বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত হওয়ায় এখানে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে না। ফলে এতে যালিমকে আরো অপরাধে সিদ্ধহস্ত করা এবং মযলূমকে কাঁদানোর কোন সুযোগ নেই। সঊদী আরবের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে রায় কার্যকর করা হয়, যা সমাজের অপরাধীদের প্রতি এক শক্তিশালী বার্তা দেয়।

‘মধ্যযুগ’ আসলে কী?

ল্যাটিন medium aeuvm শব্দটি থেকে মধ্যযুগ বা ‘মাঝের যুগ’ (Medieval) শব্দটি এসেছে। ইউরোপের ৫ম শতাব্দী থেকে ১৫শ শতাব্দী (রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে রেনেসাঁ বা তথাকথিত নবজাগরণের পূর্ব পর্যন্ত) সময়কালকে ‘মধ্যযুগ’ বলা হয়। এই সময়ে ইউরোপে চার্চের অন্ধ শাসন, বিজ্ঞানের বিরোধিতা, সামন্তবাদ (Feudalism) এবং ডাইনী শিকারের মতো কুসংস্কারের রাজত্ব ছিল। পরে রেনেসাঁর চিন্তাবিদরা এবং এনলাইটেনমেন্টের দার্শনিকরা এই শব্দটাকে ব্যবহার করল চার্চ, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে আক্রমণ করার অস্ত্র হিসাবে। তখন থেকে ‘মধ্যযুগীয়’ মানে হয়ে গেল অন্ধকার, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বর্বর, অযৌক্তিক, অন্ধ।[6] এখানেই সমস্যার শুরু।

এটি সম্পূর্ণ ইউরোপ কেন্দ্রিক একটি ধারণা। ‘মধ্যযুগ’ বলতে যা বোঝানো হয়, তা শুধু ইউরোপের ইতিহাসের জন্য প্রযোজ্য। মূলত ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দটি ইউরোপের ইতিহাসবিদরা তাদের নিজেদের অন্ধকার যুগ বর্ণনা করতে তৈরী করেছিলেন। ইউরোপ যখন মধ্যযুগে নোংরামি, অজ্ঞতা আর চার্চের অত্যাচারে ‘অন্ধকার যুগে’ (Dark Ages) নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই একই সময়ে (৭ম থেকে ১৫শ শতাব্দী) ইসলামী বিশ্ব পার করছিল তার ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় ‘স্বর্ণযুগ’ (Islamic Golden Age)।

যখন ইউরোপে গোসল করাকে পাপ মনে করা হ’ত, তখন বাগদাদ, কর্ডোভা আর দামেশকে গড়ে উঠেছিল আলো-ঝলমলে আধুনিক শহর, বিশাল লাইব্রেরী, বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্রী হাসপাতাল এবং একটি সুসংহত ও সুশৃঙ্খল বিচারিক আদালত। যেখানে খলীফারাও সাধারণ জনগণের সাথে একই আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হ’তেন।[7] কাজেই ইউরোপের অন্ধকার অতীতকে মাপকাঠি বানিয়ে ইসলামের শাশ্বত ও প্রগতিশীল আইনকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলা চরম ঐতিহাসিক মূর্খতা এবং অন্ধ পশ্চিমামুখী দাসত্ব ছাড়া কিছুই নয়।

তাছাড়া ইসলামী আইন ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দের আড়ালে তিনটি Logical Fallacy বা ভ্রান্ত যুক্তি রয়েছে।

(১) Genetic Fallacy (উৎসগত ভ্রান্তি) : কোন ধারণার উৎস বা বয়স দিয়ে তার সত্য বা মিথ্যা হওয়া প্রমাণ করার চেষ্টা। অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে শুধু তার উৎস দেখে কোন কিছু গ্রহণ বা বর্জন করা। যেমন ‘কথাটি কে বলেছে’ বা ‘কোথা থেকে এসেছে’ এটাকে ভিত্তি করে কোন প্রমাণ ছাড়াই মন্তব্য করা। ইসলামের কিবছাছ আইন ১৪০০ বছরের পুরনো বলেই যদি পরিত্যাজ্য হয়, তবে এই যুক্তিতে গণিতের পিথাগোরাস উপপাদ্যও ২,৫০০ বছর পুরনো বলে ‘মধ্যযুগীয়’ হয়ে যায়?

(২) Appeal to Novelty (নতুন বলেই শ্রেষ্ঠ মনে করার ভ্রান্তি) : ‘নতুন মানেই উন্নত, পুরনো মানেই নিকৃষ্ট’ এই অনুমান কি সর্বদা গ্রহণযোগ্য? এই নীতির ভিত্তিতে চিন্তা করলে বাংলাদেশের বিচারিক আইনও কি ‘নতুন’? কেননা এটি ১৬৫ বছরের পুরনো ঔপনিবেশিক কাঠামো। তাহ’লে সেটি কিভাবে ‘আধুনিক’ হয়?

(৩) Chronological Snobbery : এর অর্থ ‘নিজের যুগকে সর্বোচ্চ সভ্যতার শিখর মনে করা এবং অতীতকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হেয় করা’। দার্শনিক C.S. Lewis এই ভ্রান্তির নাম দিয়েছেন।[8] কিন্তু এই ‘আধুনিক যুগে’ই যে হিরোশিমায় লক্ষ মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে, গণহত্যা হয়েছে রুয়ান্ডা, বসনিয়া, সুদানে। গণহত্যা এখনও চলছে গাযায় কিংবা সিরিয়ায়। তাহ’লে এই আধুনিকতা কিভাবে অতীতের তুলনায় নৈতিকভাবে উন্নত, কোন দৃষ্টিতে এই সভ্যতা উন্নত মানবিক সভ্যতা?

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আরো অত্যধিক হতাশাজনক বিষয় হ’ল যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন মুসলিম হয়ে যে আইনকে ‘আধুনিক’ বলছেন, সেটি স্বয়ং এসেছে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে। অর্থাৎ বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে এরকম যে, বিদেশী শাসকের আনা বিদেশী আইন ‘আধুনিক’, আর নিজ ধর্ম ও সভ্যতার আইন ‘মধ্যযুগীয়’। এই মানদন্ডটি নিজেই একটি ঔপনিবেশিক দাসত্ব মানসিকতার নিদর্শন। ইংরেজরা যাকে বলত civilizing mission অর্থাৎ ‘বর্বরদের সভ্য করার মিশন’। সেই মিশনের মনোভাব আজও টিকে আছে, শুধু পোষাক বদলেছে।

প্রকাশ্য শাস্তি কি মধ্যযুগীয়?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর হ’ল প্রকাশ্য শাস্তি মধ্যযুগীয়, আমরা এখন আধুনিক। তার এই ভিত্তিহীন বক্তব্য নিম্নে খন্ডন করা হ’ল।

(১) ‘আধুনিক’ রাষ্ট্রে প্রকাশ্য শাস্তি এখনো বিদ্যমান :

যেমন সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্রীয় বেত্রাঘাত (Caning) আইনসংগত ও নিয়মিত কার্যকর হয়। ১৯৯৪ সালে আমেরিকান কিশোর মাইকেল ফেইকে ভাঙচুরের অভিযোগে বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হ’লে আমেরিকা প্রচন্ড চাপ দিয়েছিল। সিঙ্গাপুর নতি স্বীকার করেনি।[9] ফলাফল? সিঙ্গাপুরের Crime Index মাত্র ২৫। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে Sex Offender Registry যৌন অপরাধীর নাম, ঠিকানা, ছবি সর্বজনের জন্য অনলাইনে প্রকাশিত। এটা কি প্রকাশ্য সামাজিক লজ্জা নয়? আমেরিকায় বিখ্যাত Perp Walk তথা সদ্য গ্রেফতার অপরাধীকে মিডিয়ার সামনে হাঁটিয়ে নেওয়া, এটি সরকারি নিয়ম।[10] সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরাধীর মুখ ভাইরাল করা, নাম প্রকাশ করা, এগুলো কি প্রকাশ্য শাস্তির আধুনিক রূপ নয়?

অর্থাৎ ‘আধুনিক’ বিশ্ব প্রকাশ্য শাস্তি বাতিল করেনি। শুধু এর ধরন পাল্টেছে। তাহ’লে আপত্তি কি মূলত ইসলামী পদ্ধতিতে, নাকি ‘প্রকাশ্য শাস্তি’তে?

(২) দৃশ্যমান শাস্তি অপরাধ কমায় :

যেমন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ Gary Becker তাঁর সুবিখ্যাত Crime and Punishment (১৯৬৮) গ্রন্থে প্রমাণ করেন, অপরাধী একজন যুক্তিবাদী মানুষ। সে ঝুঁকি-সুবিধা হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেয়। শাস্তির দু’টি উপাদান অপরাধ কমায়- নিশ্চয়তা (Certainty) এবং তীব্রতা (Severity)। প্রকাশ্য শাস্তি এই দুটোই বাড়ায়। কারণ সবাই সেটা দেখে। ফলে সবাই জানে যে, পরিণতি নিশ্চিত।[11]

Jeremy Bentham-এর Panopticon তত্ত্বও একই কথা বলে। তার মতে, দৃশ্যমান কিন্তু অনিশ্চিত নযরদারী (visible surveillance) মানুষের আচরণকে স্ব-নিয়ন্ত্রণের দিকে পরিবর্তিত করে। অর্থাৎ দৃশ্যমান নযরদারী ও শাস্তি মানুষকে অবচেতনভাবে শৃংখলাবদ্ধ করে। আধুনিক Behavioral Economics-এ এটি সুপ্রতিষ্ঠিত বক্তব্য।[12]

বাস্তবে যেসব দেশে দৃশ্যমান ও কঠোর শাস্তি প্রচলিত রয়েছে, সেসব দেশে Crime Index সর্বনিম্নে। যেমন বৈশ্বিক অপরাধের গতিপ্রকৃতি ও সূচক মূল্যায়নকারী আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘নামবিও’ (Numbeo)-এর সর্বশেষ ‘ক্রাইম ইনডেক্স’-এর দিকে তাকালে দেখা যায়, আরব আমিরাতের ইনডেক্স মাত্র ১৬, সঊদী আরব ২৩, সিঙ্গাপুর ২৫। আর তথাকথিত ‘আধুনিক বিচারব্যবস্থা’র দেশগুলোর ইনডেক্স যেমন যুক্তরাষ্ট্র ৪৭, যুক্তরাজ্য ৪৫। অর্থাৎ অনেক বেশী অপরাধপ্রবণ। যে বাংলাদেশ ব্রিটিশ আইন মেনে চলে, তার সূচক সবচেয়ে খারাপ ৫৭।[13] আমেরিকায় মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের ৬৮ শতাংশ তিন বছরের মধ্যে পুনরায় গ্রেফতার হয়।[14]

আধুনিক যুগের কারাগারকে অপরাধবিজ্ঞানীরা বলেন Crime University অর্থাৎ এখান থেকে ছোট অপরাধী বড় অপরাধী হয়ে বের হয়। এর বাস্তব প্রমাণ তথাকথিত মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা আমেরিকার দিকে তাকালে দেখা যায়। যেমন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ACLU এবং APA-এর সর্বশেষ ডাটা অনুযায়ী, আমেরিকার জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ, অথচ বিশ্বের মোট কারাবন্দী মানুষের ২৫ শতাংশেরই ঠাঁই হয়েছে সেদেশের কারাগারে! সেখানে ২০ লক্ষেরও অধিক মানুষ বর্তমানে কারাবন্দী জীবন কাটাচ্ছে। অপরদিকে কঠোর ইসলামী দন্ডবিধির দেশ সঊদী আরবে- যেখানে জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটির ওপরে সেখানে আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ World Prison Brief (WPB)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের মোট বন্দী সংখ্যা মাত্র ২৮ হাযার, যা আমেরিকার তুলনায় একেবারেই নগণ্য। এই ব্যবধানই প্রমাণ করে মানবরচিত আইন সমাজে কিভাবে অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে, আর এলাহী আইন কিভাবে সমাজকে অপরাধমুক্ত করে।[15]

এরপরও এই ব্যবস্থাই কি ‘আধুনিক ও মানবিক’? রামিসার পিতা তো এজন্যই আহত হৃদয়ে বলেছেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার দিতে পারবেন না।’ এই একটি বাক্যই তথাকথিত ‘আধুনিক’ বিচারব্যবস্থার চূড়ান্ত ব্যর্থতার ইতিহাস।

(৩) দ্বিচারিতা :

আধুনিক মিডিয়া প্রকাশ্য সহিংসতায় পরিপূর্ণ। অথচ এগুলোকে মোটেও বর্বরতা বলা হয় না। বরং তাকে সুন্দর নাম দিয়ে জায়েয করা হয়। যেমন হলিউড চলচ্চিত্রে হত্যা-ধর্ষণের দৃশ্য ‘শিল্প’, ভিডিও গেমে হাযার মানুষ মেরে ফেলা ‘বিনোদন’, ড্রোন হামলার ফুটেজ টিভিতে ‘সংবাদ’, সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধের বীভৎস ভিডিও ‘সচেতনতা’। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক স্বচ্ছ বিচারিক শাস্তির দৃশ্য নাকি ‘বর্বরতা’!

এই মানদন্ডের ভেতরে কোন সততা নেই। প্রকাশ্য শাস্তি তাদের কাছে মূল সমস্যা নয়- সমস্যাটা হ’ল শাস্তিটা কোন কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে। পশ্চিমা রাষ্ট্র যদি কোন আইন বানায় সেটা সভ্যতা, আর যদি কোন আইন আল্লাহর দেয়া হয় তবে সেটা ‘মধ্যযুগীয়’। খুব স্পষ্টভাবেই এটা ইসলামবিরোধিতা আর পক্ষপাত; যার মধ্যে মোটেও কোন যুক্তি নেই, সততা নেই। আরো বলা দরকার, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো যখন যুদ্ধ করে, তখন লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা, গাযায় নিরীহ মানবহত্যা এগুলো হ’ল তথাকথিত ‘আধুনিক’ রাষ্ট্রগুলোর কাজ। আর এই রাষ্ট্রগুলোই কিনা বিচারকের আসনে বসে ইসলামের বিচারব্যবস্থাকে বলে ‘বর্বর’! মাপকাঠি ঠিক আছে কি?

(৪) কুরআনের সুস্পষ্ট বিধান :

প্রকাশ্য শাস্তি ইসলামের একটি সুচিন্তিত এলাহী বিধান। এটি কোন দুর্ঘটনা নয় কিংবা সাময়িক কোন বিধান নয়। আল্লাহ তা‘আলা সূরা নূরে সুস্পষ্ট বলেছেন, وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِا اللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ- وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ، ‘আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদের না পায়... এবং মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে’ (নূর ২৪/২)

এই প্রকাশ্য শাস্তির নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহর। কারণ উদ্দেশ্য যন্ত্রণা দেওয়া নয়; বরং সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া। রাসূল (ছা.) বলেছেন, حَدٌّ يُقَامُ فِي الأَرْضِ خَيْرٌ لأَهْلِهَا مِنْ أَنْ يُمْطَرُوا أَرْبَعِينَ صَبَاحًا، ‘পৃথিবীতে একটি দন্ড কার্যকর হওয়া মানুষের জন্য চল্লিশ দিনের বৃষ্টির চেয়ে উত্তম’।[16] অর্থাৎ একটি দৃশ্যমান শাস্তি পুরো সমাজে যে নৈতিক বারিধারা সৃষ্টি করে, তা হাযারো সম্ভাব্য অপরাধ ঠেকিয়ে দেয়।

সুতরাং প্রকাশ্য শাস্তি বর্বর, বন্ধ শাহী কারাগার সভ্য-এমন যে ধারণা সমাজে ছড়িয়ে আছে, তা কোন তথ্য-উপাত্ত, ইতিহাস এবং দর্শন সমর্থন করে না। মূলত একটি সভ্য জাতির প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত হবে-কোন ব্যবস্থায় অপরাধ কম হয়, ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পায় এবং সমাজে নিরাপত্তার আস্থা তৈরি হয়? এটাই নির্ধারণ করে দেবে যে, কোন বিচারব্যবস্থা মূলত মধ্যযুগীয় এবং কোন বিচারব্যবস্থা চির আধুনিক।

উপসংহার

একটি সমাজকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও বৈষম্যহীন করতে হ’লে আমাদেরকে কৃত্রিম, ব্যর্থ ও বাহির থেকে আমদানীকৃত ঔপনিবেশিক আইনের দাসত্ব থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসতেই হবে। অথচ এর পরিবর্তে একটি মুসলিম দেশের মুসলিম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবলীলায় আল্লাহর আইনকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে নাকচ করে দেওয়া শুধু অজ্ঞতা ও দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং প্রকাশ্য আল্লাহদ্রোহিতা এবং ঈমান নষ্টকারী। সুতরাং তাদেরকে এই অপরাধের জন্য অবশ্যই তওবা করতে হবে।

আর নিষ্পাপ রামিসাদের রক্ত আজ আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে যায় যে, মানুষের তৈরী করা আইন ও মতবাদ মানবাধিকার রক্ষায় সম্পূর্ণ অচল। সুতরাং প্রকৃত অর্থে যদি আমরা আইনের শাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানুষের জান-মালের হেফাযত চাই, তবে বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহর দেওয়া শাশ্বত ও ফিতরাত-সম্মত আইন ও বিচারব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। আল্লাহর দেওয়া আইন কোন নির্দিষ্ট যুগের (প্রাচীন, মধ্য বা আধুনিক) ফ্রেমে বন্দী নয়; বরং তা মানুষের চিরন্তন মনস্তত্ত্বের সাথে মিল রেখে তৈরি এক শাশ্বত ও সর্বজনীন (Universal) বিধান। যা ৭ম শতাব্দীতেও সমাজকে শান্তি দিয়েছিল, আজ ২০২৬ সালেও সমাজকে শান্তি দিতে পারে। সেই সাথে কেবল সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেই নয়, বরং একজন মুসলিম হিসাবে ঈমান রক্ষার স্বার্থেও আমাদের এই এলাহী আইন ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ আমাদের সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফিরে আসার তাওফীক দান করুন- আমীন!


[1]. Dhaka Tribune, Colonial Legacies of the Criminal Justice System, June 2019.

[2]. New Age, 46.52 lakh cases pending, 27 December, 2025.

[3]. Dhaka Stream, Over 40 lakh cases pending in lower courts: Law minister, April 16, 2026.

[4]. Brac Bangladesh, Conviction rate in cases of violence against women and children stands at 3%.

[5]. The Advocates for Human Rights, Establishing the Death Penalty for Rape in Bangladesh Does Little to Protect Victims, December 7, 2020.

[6]. Wikipedia, Middle Ages.

[7]. Wikipedia, Islamic Golden Age.

[8]. Wikipedia, See : C.S. Lewis, Surprised by Joy: The Shape of My Early Life (1955), Chapter XIII

[9]. Wikipedia, Caning of Michael Fay; encyclopedia.com, Corporal Punishment

[10]. Wikipedia, Perp walk.

[11]. Gary S. Becker, “Crime and Punishment: An Economic Approach”, Journal of Political Economy, Vol. 76, No. 2 (March–April 1968), pp. 169–217.

[12]. Bentham, Jeremy. Panopticon; The Inspection-House. 1791; Engel, Christoph. Turning the Lab into Jeremy Bentham’s Panopticon, Max Planck Institute Working Paper, 2010.

[13]. Numbeo. (2026). Crime Index by Country 2026. Numbeo Global Database.

[14]. Bureau of Justice Statistics,2024.

[15]. বিস্তারিত দেখুন:https://www.aclu.org, https://www.apa.org/, https://www.prisonstudies.org/country/saudi-arabia

[16]. ইবনু মাজাহ হা/২৫৩৭, সনদ হাসান।






আল্লাহর উপর ভরসা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
জামা‘আতে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব, ফযীলত ও হিকমত - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ইসলামে সমাজকল্যাণমূলক কাজের গুরুত্ব ও ফযীলত - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
একটি ঐতিহাসিক রায়ের ইতিবৃত্ত - রেযাউল করীম
দ্বীনী খেদমত : কৃতিত্ব নয় সৌভাগ্য - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
মুসলিম জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ রাফাত আনাম
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের শিথিলতা : আমাদের করণীয় (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ : একটি পর্যালোচনা (জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী সংখ্যার পর) - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
তওবা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
ধন-সম্পদ : মানব জীবনে প্রয়োজন, সীমালংঘনে দহন (৩য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
কিভাবে অন্তরকে মসজিদমুখী করবেন? - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব (২য় কিস্তি) - ড. এ এস এম আযীযুল্লাহ
আরও
আরও
.