২. দুনিয়াবীর প্রতিযোগিতা বনাম আখেরাতের প্রতিযোগিতা :

বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট সম্পদের অভাব নয়, বরং লক্ষ্যের বিভ্রান্তি। আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্ব আমাদের মস্তিষ্কে অত্যন্ত সুকৌশলে ঢুকিয়ে দিয়েছে এক অদৃশ্য ‘ইঁদুর দৌড়’ বা র‍¨vট রেস (Rat race)। সমাজে কার ব্যাংক ব্যালান্স কত ভারী হ’ল, কে কত বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দামী গাড়ির মালিক হ’ল, কার সন্তান কত নামিদামী স্কুলে পড়ে অন্যের চেয়ে বেশী জাঁকজমকপূর্ণ ফলাফল করল- এই প্রতিযোগিতাই আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। একবার কি আমরা থমকে দাঁড়িয়ে ভেবেছি, এই প্রতিযোগিতার শেষ কোথায়? মৃত্যুর এক সেকেন্ড পরেই কি এই সকল পার্থিব বৈভব ধুলোয় মিশে যাবে না? পক্ষান্তরে ইসলাম মানুষের মন ও চিন্তাজগতে এক অসাধারণ পরিবর্তন ঘটায়। ইসলাম আমাদের শেখায় পার্থিব সম্পদ উপার্জন করতে হবে কেবল জীবনযাপনের প্রয়োজন মেটানোর তাকীদে, কিন্তু জীবনের মূল প্রতিযোগিতাটা নির্ধারণ করতে হবে চিরস্থায়ী আখেরাতকে সুন্দর করার জন্য।

আখেরাতের এই প্রতিযোগিতায় মুমিন কতটা সক্রিয় ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা রাসুলুল্লাহ (ছাঃ)-এর একটি হাদীছে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন,إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَفِي يَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا تَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَغْرِسْهَا، ‘যদি ক্বিয়ামত এসে যায় এবং তখন তোমাদের কারো হাতে একটি চারাগাছ থাকে, তবে কিবয়ামত হওয়ার আগেই তার পক্ষে সম্ভব হ’লে যেন চারাটি রোপন করে’।[1] অত্র হাদীছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যদি কিবয়ামতও এসে যায়, আর সেই অবস্থাতে কোন ভালো কাজ করার সুযোগ থাকে, তবে সেটা কালক্ষেপন না করে দ্রুত সম্পাদন করতে হবে।

একবার ভেবে দেখুন! চোখের সামনে যখন মহাবিশ্ব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ক্বিয়ামত নেমে আসছে, সেই সময় একটি চারাগাছ পুঁতে তার ছায়া বা ফল পাওয়ার কি কোন আশা থাকে? জাগতিক যুক্তিতে এটি একেবারেই অর্থহীন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এখানেই মুমিনের আসল দর্শন উন্মোচন করেছেন। আর সেটা হ’ল মুমিন কখনো জাগতিক ফলাফলের দাস নয়; সে কেবল তার রবের সন্তুষ্টি আর নিষ্ঠাপূর্ণ চেষ্টার জন্যই দায়বদ্ধ। তাই পার্থিব হিসাব-নিকাশ ছাপিয়ে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকুও সে বিলিয়ে দেয় কল্যাণের কাজে।

আবূ ওবাদাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ) যখন ইয়ামেন থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ নিয়ে মদীনায় এসেছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবায়ে কেরামকে সতর্ক করে বলেছিলেন, وَاللهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُم، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا، كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا وَتُلْهِيَكُمْ كَمَا أَلْهَتْهُمْ، ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্রের ভয় করি না; বরং ভয় করি যে, তোমাদের উপর দুনিয়া প্রশস্ত করে দেয়া হবে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর দুনিয়া প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছিল। আর তোমরা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করবে যেমন তারা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করেছিল। ফলে এটা (পার্থিব প্রাচুর্য) তোমাদেরকে ধ্বংস করবে, যেরূপ তাদেরকে ধ্বংস করেছিল’।[2] আজকের সমাজের দিকে তাকালে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর এই সতর্কবাণীর বাস্তবতা আমরা পদে পদে দেখতে পাই। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পত্তি নিয়ে মামলা, সামান্য প্রমোশনের জন্য কলিগকে ফাঁসানো; এসবই দুনিয়ার প্রতিযোগিতার করুণ ফলাফল। ইমাম ত্বীবী (রহ.) فَتَنَافَسُوهَا -এর ব্যাখ্যায় বলেন,تَرْغَبُونَ فِيهَا فَتَشْتَغِلُونَ بِجَمْعِهَا أَوْ تَحْرِصُونَ عَلَى إِمْسَاكِهَا فَتَطْغَوْنَ فِيهَا فَتَهْلِكُونَ، ‘তোমরা তাতে (পার্থিব সম্পদে) তীব্র আগ্রহী হয়ে পড়বে, ফলে তা একত্রিত ও পুঞ্জীভূত করার কাজে লিপ্ত হয়ে পড়বে অথবা তা আটকে রাখার তীব্র লোভ পোষণ করবে; যার কারণে তোমরা তাতে সীমালঙ্ঘন করে বসবে, অবশেষে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে’।[3]

চারপাশের মানুষগুলো যখন হারাম উপার্জনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মত্ত, তখন আমরা নিজেরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। আমাদের পুরুষেরা যখন শত প্রলোভন মাড়িয়ে ঘুষ ও অসদুপায় এড়িয়ে সততায় অবিচল থাকেন, আর আমাদের নারীরা যখন লোকদেখানো ফ্যাশনের জোয়ারে গা না ভাসিয়ে পর্দা ও তাক্বওয়ার পথ আঁকড়ে ধরেন; তখন প্রমাণিত হয়, আমাদের হৃদয় ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনে নয়, বরং ছুটছে অনন্ত আখেরাতের অমূল্য নে‘মতের পানে।

৩. নেক আমলে ধীরস্থিরতা বনাম তাড়াহুড়া :

ছোটবেলা থেকেই আমরা একটি কথা খুব শুনে আসছি- ‘তাড়াহুড়ো শয়তানের কাজ,[4] আর ধীরস্থিরতা হ’ল প্রশংসনীয় গুণ’। দুনিয়াবী জীবনের ক্ষেত্রে কথাটি পুরোপুরি সত্য। কিন্তু ইসলাম আমাদের অগ্রাধিকারের এক অনন্য ভারসাম্য শিখিয়েছে। পবিত্র কুরআনের ভাষাভঙ্গির দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে এক চমৎকার ইলাহী দর্শন ফুটে ওঠে। যেখানে পার্থিব জীবিকা ও রিযিক অন্বেষণের প্রসঙ্গ এসেছে, সেখানে আল্লাহ ধীরেসুস্থে শান্ত ভঙ্গিতে হাঁটার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِنْ رِزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ، ‘তিনিই তো পৃথিবীকে তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা তার দিকে দিকে বিচরণ কর এবং আল্লাহর দেওয়া রিযিক ভক্ষণ করে থাক। আর তাঁর দিকেই হবে তোমাদের পুনরুত্থান’ (মুলক ৬৭/১৫)। এখানে আল্লাহ ‘ফামশূ’ (فَامْشُوا) শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ- তোমরা ধীরেসুস্থে হাঁটো, পদব্রজে চলো। একজন চাকরীপ্রার্থী তরুণ যখন চাকরীর জন্য চেষ্টা করছে, কিংবা হালাল ব্যবসার চেষ্টা করছেন; তখন ইসলাম বলছে, চেষ্টাটুকু করে যাও, কিন্তু এ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম করো না। কারণ রিযিক মহান আল্লাহ তোমার ভাগ্যে লিখে রেখেছেন, তা তোমার কাছে ঠিকই পৌঁছাবে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হ’ল , যখনই ক্ষমা লাভ, তওবা করা কিংবা জান্নাতের আমলের কথা এসেছে, সেখানে শান্তভাবে চলার কোন অবকাশ রাখা হয়নি! সেখানে আল্লাহ ব্যবহার করেছেন- ‘সাবিক্বূ’ (প্রতিযোগিতা করে দৌড়াও), ‘সারি‘ঊ’ (ক্ষিপ্রগতিতে দ্রুত ধাবিত হও), ‘ফাসতাবিক্বূ’ (অগ্রণী হয়ে ছিনিয়ে নাও)। কারণ রিযিক বান্দাকে খুঁজবে, কিন্তু জান্নাত ও আল্লাহর ক্ষমা পেতে হ’লে মুমিন বান্দাকে অলসতা ছুঁড়ে ফেলে ময়দানে দৌড়াতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,التُّؤَدَةُ فِى كُلِّ شَىْءٍ خَيْرٌ إِلاَّ فِى عَمَلِ الآخِرَةِ، ‘প্রতিটি বিষয়েই ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা উত্তম; কিন্ত আখেরাতের আমল ব্যতীত’।[5] কেননা পার্থিব বিষয়ে জানা যায় না যে, সেগুলো কি প্রশংসনীয় পরিণতির অধিকারী; যাতে তাতে তাড়াহুড়ো করা যাবে, নাকি নিন্দনীয় পরিণতির অধিকারী; যাতে তা থেকে বিরত থাকা যাবে। পক্ষান্তরে পরকালীন বিষয়াবলী এর সম্পূর্ণ বিপরীত, যার শুভ পরিণাম সুনিশ্চিত।[6]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন,إِنَّ لِلْقُلُوبِ شَهْوَةً وَإِقْبَالًا، وَإِنَّ لِلْقُلُوبِ فَتْرَةً وَإِدْبَارًا، فَاغْتَنِمُوهَا عِنْدَ شَهْوَتِهَا، وَدَعُوهَا عِنْدَ فَتْرَتِهَا وَإِدْبَارِهَا، ‘নিশ্চয়ই অন্তরের আগ্রহ ও উদ্যম রয়েছে, আবার অন্তরের ক্লান্তি ও অনীহাও রয়েছে; সুতরাং যখন তা আগ্রহী ও উদ্যমী থাকে তখন তাকে কাজে লাগাও, আর যখন তা পরিশ্রান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে তখন তাকে ছেড়ে দাও (বিশ্রাম দাও)’।[7] আমাদের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সাথেও এই কথার অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। যেমন ধরুন, আছরের ছালাতের পর হঠাৎ আপনার মনে কুরআন তিলাওয়াতের এক তীব্র আকুলতা জাগল কিংবা পথে কোন অভাবী মানুষকে দেখে পকেটে থাকা কিছু টাকা নির্দ্বিধায় ছাদাক্বা করে দেওয়ার ইচ্ছে হ’ল। অন্তরের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমকে এক মুহূর্তের জন্যও হাতছাড়া করা উচিত নয়। এ কারণেই বিজ্ঞ তাবেঈ সুফইয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.) বলেন,إِذَا هَمَمْتَ بِصَدَقَةٍ أَوْ بِبِرٍّ أَوْ بِعَمَلٍ صَالِحٍ فَعَجِّلْ مُضِيَّهُ مِنْ سَاعَتِهِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَحُولَ بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ الشَّيْطَانُ ‘যখন তুমি কোন ছাদাক্বা, সৎকাজ অথবা কোন নেক আমল করার মনস্থ করবে, তখন তোমার ও তোমার সেই আমলের মাঝে শয়তান কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার আগেই খুব দ্রুত সেটা সম্পাদন করে ফেল’।[8] কেননা, আপনি যদি ভাবেন- ‘এখন তো খুচরো টাকা নেই, থাক কাল দেব’ কিংবা ‘কুরআনটা আছরে নয়, মাগরিবের পরেই পড়ব’। তবে দেখবেন, শয়তান অবচেতনভাবেই আপনাকে এমন সব তুচ্ছ কাজে জড়িয়ে ফেলবে যে, সেই শুভ সংকল্পটি আর কখনোই বাস্তবে রূপ নেবে না। অন্তরের সেই জীবন্ত অনুভূতিটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। এজন্যই ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি./৭৮০-৮৫৫ খ্রি.) বলেন,كُلُّ شَيْءٍ مِنَ الخَيْرِ يُبَادَرُ بِهِ ‘কল্যাণের প্রতিটি কাজেই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এগিয়ে যেতে হয়’।[9]

অতএব জান্নাতের মেহমান হওয়ার এই অনন্ত প্রতিযোগিতায় আমাদের কারও জন্যই পিছিয়ে থাকার অবকাশ নেই। একজন বান্দা জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর দাসত্ব কায়েমের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে, একজন সৎ ব্যবসায়ী তার সততা দিয়ে, একজন চাকরিজীবী তাঁর হালাল উপার্জনের আপসহীন লড়াই দিয়ে, একজন তরুণ চরিত্র ও দৃষ্টির পবিত্রতা বজায় রেখে, আর একজন নারী সংসারের সহস্র ব্যস্ততার মাঝেও নিষ্ঠা ও তাক্বওয়ার আবহে এই প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। শুধু প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সামান্য একটু পরিবর্তন। দুনিয়ার পেছনে অন্ধের মতো ছুটে চলার যে তাড়াহুড়োয় আমরা ক্লান্ত হচ্ছি, আজ থেকে সেই গতিশীলতাটুকু নিবেদিত হোক শুধুই আমাদের রবের ক্ষমার পানে; অনন্ত জান্নাতের চিরসুখের তরে। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন! আমীন!

নেকীর কাজে প্রতিযোগিত কেন করব?

পার্থিব জীবনে মানুষ জ্ঞান, সম্পদ, ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিরন্তর ব্যস্ত। পার্থিব সফলতা লাভের জন্য আমরা দীর্ঘ পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম করি। অথচ সৎকাজে ও আখেরাতের প্রতিযোগিতায় আমাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। দুনিয়ার সুযোগ হাতছাড়া হ’লে আমরা অনুতপ্ত হই; কিন্তু প্রতিদিন আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অসংখ্য সুযোগ হারিয়েও উদাসীন থাকি। ফলে আমাদের ঈমান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আর আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে জীবনযাত্রাও দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সেজন্য একজন জান্নাত পিয়াসী মুমিন কখনো দুনিয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় গা ভাসিয়ে দেন না; তিনি সর্বদা আখেরাতের সফলতা অর্জনে উন্মুখ থাকেন। এপর্যায়ে আমরা নেকীর কাজে প্রতিযোগিতার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ।

১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ পালন :

নেকীর কাজে প্রতিযোগিতার সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হ’ল, এটি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ। একজন প্রকৃত মুমিনের কাছে আল্লাহর নির্দেশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হ’তে পারে না। আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يَحُولُ بَيْنَ الْمَرْءِ وَقَلْبِهِ وَأَنَّهُ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ، ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহবানে সাড়া দাও। যখন তিনি তোমাদের আহবান করেন ঐ বিষয়ের দিকে যা তোমাদেরকে জীবন দান করে। জেনে রেখ, আল্লাহ মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকেন (অর্থাৎ তিনিই তাওফীক্ব দাতা)। আর তাঁর কাছেই তোমাদের সমবেত করা হবে’ (আনফাল ৮/২৪)। অত্র আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আহবানকে মানুষের প্রকৃত জীবন লাভের মাধ্যম হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশে সাড়া দিয়ে নিজের জীবনকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করে, তার জীবনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণময় হয়ে ওঠে।

পার্থিব জীবনে আমরা দেখতে পাই কোন মুমূর্ষু রোগীকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক যদি এমন কোন প্রেসক্রিপশন দেন, যা তাকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচাবে। তবে সেই রোগী কোন কালক্ষেপন না করে ঔষধ খাওয়া শুরু করবেন। ঠিক তেমনি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশগুলো আমাদের মৃতপ্রায় আত্মাকে জিন্দা করার প্রেসক্রিপশন। এতে কালক্ষেপণ করা মানে আত্মিক মৃত্যু ডেকে আনা। এজন্যই তাবেঈ রাবী‘ ইবনে আনাস (মৃ.১৩৯ হি./৭৫৬ খ্রি.) বলেন,السَّابِقُونَ إِلَى إِجَابَةِ الرَّسُولِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الدُّنْيَا هُمُ السَّابِقُونَ إِلَى الْجَنَّةِ فِي الْعُقْبَى، ‘যারা দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আহবানে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগামী, তারাই আখেরাতে জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রগামী হবে’।[10] শুধু ডাকে সাড়া দেওয়াই শেষ কথা নয়; বরং ভালো কাজে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করতে হবে। কারণ আল্লাহ বলেন, فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ‘অতএব তোমরা সৎকর্মসমূহে প্রতিযোগিতা কর’ (বাক্বারাহ ২/১৪৮)। অত্র আয়াতে আল্লাহ শুধু নেক আমল করতে বলেননি; বরং নেকীর কাজে অগ্রগামী হওয়ার এবং প্রতিযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন। শায়খ আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘দী (১৩০৭-১৩৭৬ হি./১৮৮৯-১৯৫৬ খ্রি.) বলেন, ‘কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হওয়ার নির্দেশ কল্যাণকর কাজ সম্পাদনের নির্দেশের চেয়ে অতিরিক্ত তাৎপর্য বহন করে। কেননা কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হওয়ার মধ্যে সেসব কাজ সম্পাদন করা, সেগুলোকে পূর্ণতা দেওয়া, সর্বোত্তম পন্থায় সম্পন্ন করা এবং দ্রুত সেগুলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হয়, সে-ই আখেরাতে জান্নাতের দিকে অগ্রগামী হবে। অতএব, অগ্রগামীরা সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী। আর কল্যাণকর কাজের অন্তর্ভুক্ত হ’ল যাবতীয় ফরয ও নফল ইবাদত- যেমন ছালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ, ওমরাহ, জিহাদ এবং অন্যের উপকারে আসে এমন এবং কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এমন যাবতীয় কল্যাণকর কাজ’।[11]

এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, নেকীর প্রতিযোগিতা শুধু আমলের পরিমাণ বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমলের গুণগত উৎকর্ষতা অর্জনও এর অন্তর্ভুক্ত। একজন ব্যক্তি ছালাত আদায় করলেন, আরেকজন ছালাতের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ প্রস্ত্ততি নিয়ে খুশূ-খুযূর সঙ্গে তা আদায় করলেন। উভয়ে ছালাত আদায় করলেও দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে ইবাদতকে সুন্দর ও পরিপূর্ণ করার বিশেষ প্রচেষ্টা রয়েছে। অনুরূপভাবে একজন ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দান-ছাদাক্বাহ করতে বিলম্ব করেন, অথচ অন্যজন কোন অসহায় মানুষের প্রয়োজনের কথা জানতে পেরে সাথে সাথেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই তৎপরতা ও আন্তরিকতার মধ্যেই নেক আমলে অগ্রগামী হওয়ার মানসিকতা প্রকাশ পায়।

এই অগ্রগামী হওয়ার ধারা অব্যাহত রাখার জন্য অন্তরে প্রবল স্পৃহা থাকা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ، ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার জন্য আগ্রহী হও; আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।[12] হাদীছটির এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশনায় সফলতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে: (১) কল্যাণকর বিষয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকতে হবে, (২) আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে এবং (৩) অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তা পরিহার করতে হবে। একজন মুমিন তাই শুধু নেক আমলের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেই সন্তুষ্ট থাকেন না; বরং সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব কর্মপ্রচেষ্টায় রূপদানের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন।

একজন যুবক যখন মসজিদে নিয়মিত ছালাত আদায় করে, তখন তার সঙ্গীরাও অনুপ্রাণিত হ’তে পারে। একজন ব্যবসায়ী যখন সততা ও আমানতদারিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তখন অন্য ব্যবসায়ীরাও সেই আদর্শ অনুসরণে উৎসাহিত হন। একজন মা যখন সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষায় গড়ে তোলেন, তখন তার কল্যাণকর প্রভাব পরিবার থেকে সমাজে বিস্তৃত হ’তে পারে। এভাবে নেক আমলের প্রতিযোগিতা কেবল ব্যক্তির আত্মশুদ্ধির মাধ্যম নয়; বরং একটি সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠারও অন্যতম উপায়।

২. সময়ের স্বল্পতা ও জীবনের অনিশ্চয়তা :

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র‍¨vজেডি হ’ল, আমরা সব সময় মনে করি যে, আমাদের হাতে এখনো অনেক সময় বাকী আছে। আমরা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করি- পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করব, আগামী পাঁচ বছর পর ক্যারিয়ার কোথায় যাবে, রিটায়ারমেন্টের পর কোথায় বাড়ি করব, সঞ্চয় কত হবে- সবকিছুর নিখুঁত হিসাব আমাদের ডায়েরীতে সাজানো থাকে। কিন্তু যে কোন মুহূর্তে জীবনের ডায়েরীটা যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, সেই হিসাব আমরা রাখি না। অথচ আল্লাহ বলেন,لِكُلِّ أُمَّةٍ أَجَلٌ إِذَا جَاءَ أَجَلُهُمْ فَلَا يَسْتَأْخِرُونَ سَاعَةً وَلَا يَسْتَقْدِمُونَ، ‘প্রত্যেক উম্মতের একটা মেয়াদ আছে। যখন তাদের সেই মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা তাকে এক মুহূর্ত পিছাতেও পারবে না, আগাতেও পারবে না’ (ইউনুস ১০/৪৯)। খ্যাতনামা তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০হি.) বলেন, ابْنَ آدَمَ، إِنَّمَا أَنْتَ أَيَّامٌ، كُلَّمَا ذَهَبَ يَوْمٌ، ذَهَبَ بَعْضُكَ ‘হে আদম সন্তান! তুমি তো কতগুলো দিনের সমষ্টি মাত্র। যখনই তোমার জীবনের একটি দিন চলে যায়, তখনই তোমার একটি অংশ চলে যায়’।[13]

সময়ের মূল্য সম্পর্কে সালাফে ছালেহীনের উপলব্ধি ছিল অত্যন্ত গভীর। তাঁরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের মূল্যবান সুযোগ মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে তাবেঈ আবূ বকর ইবনু আইয়াশ (৯৫-১৯৩ হি./৭১৩-৮০৯ খ্রি.) বলতেন,لَوْ سَقَطَ مِنْ أَحَدِكُمْ دِرْهَمٌ لَظَلَّ يَوْمَهُ يَقُولُ: إِنَّا لِلَّهِ، ذَهَبَ دِرْهَمِي، وَهُوَ يَذْهَبُ عُمُرُهُ، وَلَا يَقُولُ: ذَهَبَ عُمُرِي، وَقَدْ كَانَ لِلَّهِ أَقْوَامٌ يُبَادِرُونَ الْأَوْقَاتَ، وَيَحْفَظُونَ السَّاعَاتِ، وَيُلَازِمُونَهَا بِالطَّاعَاتِ، ‘তোমাদের কারও একটি দিরহাম হারিয়ে গেলে সে সারাদিন বলতে থাকবে, ‘ইন্না লিললাহ! আমার দিরহামটি হারিয়ে গেল! অথচ তার জীবন প্রতিনিয়ত ফুরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে বলে না, ‘আমার জীবনটি ফুরিয়ে যাচ্ছে! আল্লাহর এমন কিছু বান্দা ছিলেন, যাঁরা সময়ের সদ্ব্যবহারে অগ্রগামী হ’তেন, প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব রাখতেন এবং সেই সময়গুলোতে আনুগত্যমূলক কাজে লিপ্ত থাক’।[14] টাকা হারিয়ে গেলে আমরা খুঁজে বেড়াই, কোথায় হারাল, কিভাবে হারাল এবং তা ফিরে পাওয়ার কোন উপায় আছে কি-না। অথচ প্রতিদিন আমাদের জীবন থেকে যে চবিবশ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে, তার কতটুকু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যয় হয়েছে, সে হিসাব নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করি না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে আমাদের ক্লান্তি আসে না। কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত, দ্বীনী ইলম অর্জন কিংবা আত্মসমালোচনার জন্য সামান্য সময় বের করাও অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়।

যেহেতু আমাদের আয়ু খুব সামান্য এবং যেকোন মুহূর্তে এই পার্থিব জীবনের খেলা সাঙ্গ হয়ে যেতে পারে, তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিন শুধু পার্থিব জীবনের জন্যই নেকী কামাই করে না; বরং সে এমন কিছু নেক কাজ করে যায়, মৃত্যুর পর অন্ধকার কবরে শুয়েও যার মুনাফা সে নিরবচ্ছিন্নভাবে পেতে থাকতেন। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,سَبْعٌ يَجْرِي لِلْعَبْدِ أَجْرُهُنَّ وَهُوَ فِي قَبْرِهِ بَعْدَ مَوْتِهِ: مَنْ عَلَّمَ عِلْمًا، أَوْ أَجْرَى نَهْرًا، أَوْ حَفَرَ بِئْرًا، أَوْ غَرَسَ نَخْلًا، أَوْ بَنَى مَسْجِدًا، أَوْ وَرَّثَ مُصْحَفًا، أَوْ تَرَكَ وَلَدًا يَسْتَغْفِرُ لَهُ بَعْدَ مَوْتِهِ ‘সাতটি কাজের প্রতিদান বান্দার মৃত্যুর পরও তার কবরে থাকা অবস্থায় তার আমলনামায় পৌঁছতে থাকে: (১) যে ব্যক্তি কাউকে ইলম শিক্ষা দিয়েছে, (২) নদী-খাল প্রবাহিত করেছে, (৩) কূপ খনন করেছে, (৪) খেজুরগাছ রোপণ করেছে, (৫) মসজিদ নির্মাণ করেছে, (৬) কোন মুছহাফ (কুরআনের লিখিত কপি) উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গেছে, অথবা (৭) এমন সন্তান রেখে গেছে, যে তার মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে’।[15] মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তার কল্যাণকর কর্মপ্রচেষ্টার প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। একজন শিক্ষক হয়তো বহু বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন; কিন্তু তাঁর শেখানো ইলমের মাধ্যমে কোন শিক্ষার্থী দ্বীনের ওপর আমল করছে কিংবা অন্যদের শিক্ষা দিচ্ছে। একজন ব্যক্তি হয়তো একটি মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন; কিন্তু সেই মসজিদে এখনো মানুষ ছালাত আদায় করছে। কোন মহিলা ভাবতে পারেন, মসজিদ নির্মাণ বা কূপ খনন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তো আমার নেই। কিন্তু তিনি যদি তার সন্তানকে দ্বীনদার হিসাবে গড়ে তোলেন, যে তার মৃত্যুর পর দু’হাত তুলে তার জন্য কাঁদবে, অথবা মহল্লার কোন শিশুকে কুরআন পড়া শিখিয়ে যান, তবে সেটিই হবে তার জন্য কবরের অাঁধারে আলো ছড়ানোর সবচেয়ে বড় ও লাভজনক বিনিয়োগ।

৩. ফিৎনার যুগে ঈমানের উপর অবিচল থাকা :

বর্তমান যুগ ফিৎনা বা পরীক্ষার যুগ। চতুর্দিক থেকে পাপাচারের এমন সব প্রলয়ংকরী ঢেউ ধেয়ে আসছে, যা প্রতিনিয়ত আমাদের ঈমানের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা সকালে ঘুম থেকে উঠে যে পবিত্র মন নিয়ে দিন শুরু করি, কর্মব্যস্ত জীবনের নানা ধোঁকা আর প্রলোভনে পড়ে দিন শেষে সেই পবিত্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এমন ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে সতর্ক করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,بَادِرُوا بِالأعْمَال فتنًا كقطَعِ اللَّيْلِ المُظْلِمِ، يُصْبحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، وَيُمْسِي مُؤمِنًا ويُصْبِحُ كَافِرًا، يَبيعُ دِينَهُ بعَرَضٍ مِنَ الدُّنيا ‘তোমরা অন্ধকার রাতের টুকরো সমূহের মত (একটার পর একটা আসতে থাকা) ফিৎনা সমূহের আগেই নেকীর কাজ দ্রুত করে ফেল। মানুষ সে সময়ে সকালে মুমিন থাকবে এবং সন্ধ্যায় কাফের হয়ে যাবে। অথবা সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে এবং সকালে কাফের হয়ে যাবে। মানুষ নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রয় করবে’।[16] অত্র হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফিৎনাকে ঘোর অন্ধকার রাতের টুকরার সাথে তুলনা করেছেন। রাতের ঘোর অাঁধারে যেমন মানুষ চলার পথ হারিয়ে ফেলে এবং সামনে কি আছে তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না, ফিৎনার বিভ্রান্তিকর সময়েও তেমনি সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা সাধারণ মানুষের চোখে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে দুর্বল ঈমানের মানুষেরা সহজেই বিভ্রান্তির চোরাবালিতে নিমজ্জিত হয় এবং সামান্য পার্থিব স্বার্থ কিংবা ক্ষণিকের মোহে পড়ে নিজের অমূল্য দ্বীন পর্যন্ত বিকিয়ে দেয়।

যখন ফিৎনার এমন ঘোর অমানিশা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে, তখন একমাত্র বাঁচার উপায় হ’ল নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটে যাওয়া। মহান আল্লাহ অত্যন্ত দরদমাখা কণ্ঠে তাঁর বান্দাদের সেই নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ডাক দিয়ে বলেন, فَفِرُّوا إِلَى اللهِ إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ مُبِينٌ، ‘অতএব তোমরা দ্রুত আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি তোমাদের জন্য তাঁর পক্ষ হ’তে স্পষ্ট সতর্ককারী’ (যারিয়াত ৫১/৫০)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু জারীর আত-তাবারী (২২৪-৩১০ হি./৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) (রহঃ) বলেন, فَاهْرُبُوا أَيُّهَا النَّاسُ مِنْ عِقَابِ اللهِ إِلَى رَحْمَتِهِ بِالْإِيمَانِ بِهِ، وَاتِّبَاعِ أَمْرِهِ، وَالْعَمَلِ بِطَاعَتِهِ، ‘হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণ করা এবং তাঁর আনুগত্যের ভিত্তিতে আমল করার মাধ্যমে আল্লাহর শাস্তি থেকে তাঁর রহমতের দিকে পালিয়ে এসো’।[17] ইমাম কুরতুবী (মৃ. ৬৭১ হি./১২৭৩ খ্রি.) বলেন, فِرُّوا مِنْ مَعَاصِيهِ إِلَى طَاعَتِهِ، ‘তোমরা আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে তাঁর আনুগত্যের দিকে ফিরে এসো’। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, فِرُّوا إِلَى اللهِ بِالتَّوْبَةِ مِنْ ذُنُوبِكُمْ ‘তোমরা পাপ থেকে তওবা করার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ধাবিত হও’।[18] ফিৎনার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেছেন,بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ سِتًّا: الدَّجَّالَ، وَالدُّخَانَ، وَدَابَّةَ الْأَرْضِ، وَطُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا، وَأَمْرَ الْعَامَّةِ، وَخُوَيْصَّةَ أَحَدِكُمْ، ‘ছয়টি লক্ষণ প্রকাশ হওয়ার পূর্বে নেক আমল সম্পাদনে তৎপর হও: (১) ধোঁয়া, (২) দাজ্জাল, (৩) দাববাতুল আরয (মাটির গর্ভ হ’তে বের হওয়া জন্তু), (৪) পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া, (৫) সর্বগ্রাসী ফিৎনা ও (৬) তোমাদের ব্যক্তিবিশেষের ওপর আরোপিত ফিৎনা’।[19] অত্র হাদীছে সর্বগ্রাসী ফিৎনার অর্থ হ’ল,الْفِتْنَةَ الَّتِي تَعُمُّ النَّاسَ، أَوِ الْأَمْرَ الَّذِي يَسْتَبِدُّ بِهِ الْعَوَامُّ، وَيَكُونُ مِنْ قِبَلِهِمْ دُونَ الْخَوَاصِّ مِنْ تَأْمِيرِ الْأُمَّةِ، ‘এমন ফিৎনা যা সকল মানুষকে ব্যাপকভাবে গ্রাস করবে; অথবা এমন সংকটময় পরিস্থিতি যাতে সাধারণ মূর্খ লোকেরা একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করবে এবং উম্মতের নেতৃত্ব বাছাইয়ের বিষয়টি বিশিষ্ট ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে তাদের (সাধারণ অযোগ্যদের) নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়বে’। আর ব্যক্তি বিশেষের ওপর আপতিত ফিৎনা হ’ল- মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততা, তার সহায়-সম্পত্তি ও চিন্তা-ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াবলী।[20] আজ আমাদের কর্পোরেট জীবনের দিকে তাকালেই এই হাদীছের বাস্তবতা টের পাওয়া যায়। আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, ফ্ল্যাটের কিস্তি মেটানো, ব্যাংক লোন আর ক্যারিয়ার গড়ার প্রতিযোগিতায় এমন এক ‘ব্যক্তিগত ফিৎনায়’ আটকে গেছি যে, কুরআন তেলাওয়াত করা বা পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতে পড়ার মতো সময় আমাদের নেই। আমরা যেন এমন এক ঘোরের মধ্যে ছুটছি, যেখান থেকে জাগার আগেই হয়তো মালাকুল মাউত হাযির হয়ে যাবেন! এজন্য খলীফা হারূনুর রশীদ (১৪৯-১৯৩ হি./৭৬৬-৮০৯ খ্রি.) প্রায়ই বলতেন, بَادِرُوا ‌بِالأَعْمَالِ ‌الزَّكِيَّةِ ‌فِي ‌هَذِهِ ‌الأَيَّامِ الْخَالِيَةِ قَبْلَ أَنْ يُؤْخَذَ بِالْكَظْمِ، ‘তোমরা এই অতিবাহিত হ’তে থাকা (ক্ষণস্থায়ী) দিনগুলোতে পবিত্র ও নেক আমলসমূহ সম্পাদনে অবিলম্বে ক্ষিপ্রগতিতে অগ্রণী হও, মৃত্যুর শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত এসে শ্বাসরোধ করার পূর্বেই’।[21]

৪. আমলের সুযোগ হারানোর ভয় :

নেক আমলে অগ্রগামী হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হ’ল, মানুষ জানে না কখন তার আমল করার সামর্থ্য ও সুযোগ হারিয়ে যাবে। আজ যে ব্যক্তি সুস্থ শরীরে মসজিদে যেতে পারছেন, আগামীকাল হয়তো অসুস্থতার কারণে শয্যাশায়ী হয়ে পড়বেন। আজ যে ব্যক্তি নিজের উপার্জন থেকে দান-ছাদাক্বাহ করার সামর্থ্য রাখেন, আগামীকাল হয়তো অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হবেন। আজ যে তরুণ দ্বীনী ইলম অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও শক্তি পাচ্ছেন, ভবিষ্যতে সংসার ও জীবিকার ব্যস্ততায় সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। এজন্য নেক আমলে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার মানসিকতা কেবল একটি প্রশংসনীয় গুণ নয়; বরং জীবনের অনিশ্চয়তার মোকাবেলায় মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্ত্ততি। মহান আল্লাহ তাঁর নবী মূসা (আঃ)-এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন,وَعَجِلْتُ إِلَيْكَ رَبِّ لِتَرْضَى ‘হে আমার রব! আমি দ্রুত আপনার কাছে চলে এসেছি যাতে আপনি সন্তুষ্ট হন’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৪)। মূসা (আঃ)-এর এই বক্তব্যের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে তাঁর তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও গভীর আন্তরিকতা প্রকাশ পেয়েছে। একজন মুমিনের হৃদয়েও অনুরূপ আকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কোন সুযোগ পেলে সে যেন অনীহা ও গাফিলতি ছেড়ে আন্তরিকভাবে তা গ্রহণ করে।

অনুরূপভাবে নবী যাকারিয়া (আঃ) এবং তাঁর পরিবারের প্রশংসায় মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ، ‘নিশ্চয়ই তারা সৎকর্মে দ্রুত অগ্রসর হ’ত এবং আশা ও ভীতির সঙ্গে আমাদের আহবান করত। আর তারা ছিল আমাদের প্রতি বিনীত’ (আম্বিয়া ২১/৯০)। এখানে নেক আমলের প্রতিযোগিতার সঙ্গে অন্তরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থাকে একত্রিত করা হয়েছে: (১) সৎকর্মে দ্রুততা, (২) আল্লাহর রহমতের আশা ও তাঁর শাস্তির ভয় এবং (৩) তাঁর সামনে বিনীত হওয়া। অর্থাৎ নেক আমলে অগ্রগামী হওয়ার অর্থ কেবল কর্মব্যস্ততা নয়; বরং এমন এক আত্মিক অবস্থা, যেখানে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তৎপর হন, তাঁর অসন্তুষ্টির ভয়ে পাপ থেকে দূরে থাকেন এবং নিজের আমল নিয়ে অহংকার না করে বিনয়ী হন।

সুতরাং মুমিনের কর্তব্য হ’ল নেক আমলের কোন সুযোগ লাভের সাথে সাথে সেটা লুফে নেওয়া। আমলের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে সতর্ক করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,اغْتَنِمْ خَمْسًا قَبْلَ خَمْسٍ: شَبَابَكَ قَبْلَ هَرَمِكَ وَصِحَّتَكَ قَبْلَ سَقَمِكَ وَغِنَاكَ قَبْلَ فَقْرِكَ وَفَرَاغَكَ قَبْلَ شُغْلِكَ وَحَيَاتَكَ قَبْلَ مَوْتِكَ، ‘পাঁচটি অবস্থাকে পাঁচটি অবস্থার পূর্বে মূল্যবান মনে কর: (১) বার্ধক্য আসার আগে তোমার যৌবনকে, (২) অসুস্থতা আসার আগে তোমার সুস্থতাকে, (৩) দারিদ্র‍¨ আসার আগে তোমার সচ্ছলতাকে, (৪) ব্যস্ততা আসার আগে তোমার অবসরকে এবং (৫) মৃত্যু আসার আগে তোমার জীবনকে’।[22]

আজ হয়তো সংসারের হাযারো কাজের ভিড়ে কেউ ভাবতে পারেন, ‘বয়স হ’লে শান্তিতে বসে বসে কুরআন হিফয করব বা তাহাজ্জুদ পড়ব, বা অমুক অমুক আমল করব’। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা জয়েন্টের তীব্র ব্যথা বাসা বাঁধবে, তখন হয়তো সিজদায় যাওয়ার শারীরিক সক্ষমতাই আর থাকবে না। তাই যৌবনের এই স্বর্ণালী সময় ও সুস্থতাকে অবহেলায় হারিয়ে ফেলা কোনভাবেই কাম্য নয়। প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন,إِنَّكُمْ فِي مَمَرِّ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ فِي آجَالٍ مَنْقُوصَةٍ، وَأَعْمَالٍ مَحْفُوظَةٍ، وَالْمَوْتُ يَأْتِي بَغْتَةً، فَمَنْ زَرَعَ خَيْرًا فَيُوشِكُ أَنْ يَحْصُدَ رَغْبَةً، وَمَنْ زَرَعَ شَرًّا فَيُوشِكُ أَنْ يَحْصُدَ نَدَامَةً، ‘নিশ্চয়ই তোমরা দিন ও রাতের পালাবদলের মাঝে এমন এক আয়ুর মধ্যে রয়েছ যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, আর তোমাদের আমলগুলো সংরক্ষিত হচ্ছে এবং মৃত্যু আসবে হঠাৎ করেই। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণের বীজ বপন করবে, সে অচিরেই কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলবে; আর যে ব্যক্তি মন্দের বীজ বপন করবে, সে অচিরেই অনুশোচনার ফসল কাটবে’।[23] মূসা ইবনু ত্বালহা (মৃ. ১০৩ হি./৭২১ খ্রি.) বলেন,اجْتَهَدَ الْأَشْعَرِيُّ قَبْلَ مَوْتِهِ اجْتِهَادًا شَدِيدًا، فَقِيلَ لَهُ: لَوْ أَمْسَكْتَ أَوْ رَفَقْتَ بِنَفْسِكَ بَعْضَ الرِّفْقِ؟ فَقَالَ: إِنَّ الْخَيْلَ إِذَا أُرْسِلَتْ، فَقَارَبَتْ رَأْسَ مَجْرَاهَا، أَخْرَجَتْ جَمِيعَ مَا عِنْدَهَا، وَالَّذِي بَقِيَ مِنْ أَجَلِي أَقَلُّ مِنْ ذَلِكَ، ‘আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ) তাঁর মৃত্যুর পূর্বে ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করতেন। তখন তাঁকে বলা হ’ল, আপনি যদি একটু বিরত থাকতেন বা নিজের প্রতি কিছুটা সদয় হ’তেন! তিনি বললেন, দৌড়ের ঘোড়াকে যখন ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সে তার গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন সে তার সমস্ত শক্তি উজাড় করে দেয়। আর আমার জীবনের যা বাকী আছে, তা তো এর চেয়েও অনেক কম’।[24] তাই তো ওয়াহিব ইবনুল ওয়ার্দ (মৃ. ১৫৩হি./৭৭০খ্রি.) বলেন,إِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ لَا يَسْبِقَكَ إِلَى اللهِ أَحَدٌ فَافْعَلْ، ‘তুমি যদি সক্ষম হও যে, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যেন তোমার আগে এগিয়ে যেতে না পারে, তাহ’লে তা-ই কর’।[25] অফিসে কলিগ যদি আমাদের আগে প্রমোশন পেয়ে যায়, আমাদের ভেতরে যেমন জেদ চেপে যায়; তেমনি মসজিদে কেউ আমার আগে প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে গেলে বা আমার চেয়ে বেশী দান-ছাদাক্বাহ করলে, মুমিনের হৃদয়েও আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার তীব্র ঈর্ষা বা যেদ জন্ম নিতে হবে।

৫. নেকীর কাজে দেরী করা মুনাফিকের স্বভাব :

নেক আমল বা কল্যাণকর কাজ সম্পাদনে গড়িমসি করা, অলসতা প্রদর্শন করা এবং তা আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা মোটেও সাধারণ কোন বিষয় নয়। এটি এমন এক ভয়ংকর আত্মিক ব্যাধি, যাকে কুরআন মাজিদে ‘মুনাফিকদের স্বভাব’ বলা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন তার রবের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে আনন্দে উদ্বেলিত হবে, এটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু যার অন্তরে মুনাফিকির বীজ লুকিয়ে আছে, নেক আমল তার কাছে বিশাল বোঝা মনে হয়। মুনাফিকদের এই দৈন্যদশা ও ভয়ংকর মানসিকতা তুলে ধরে মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللهَ إِلَّا قَلِيلًا، ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করে। আর তিনিও তাদের বদলা নেন। যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়। তারা লোকদের দেখায় এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে’ (নিসা ৪/১৪২)। ইমাম কুরতুবী (রহঃ) বলেন,يُصَلُّونَ مُرَاءَاةً وَهُمْ مُتَكَاسِلُونَ مُتَثَاقِلُونَ، لَا يَرْجُونَ ثَوَابًا وَلَا يَعْتَقِدُونَ عَلَى تَرْكِهَا عِقَابًا، ‘তারা লোক দেখানোর জন্য ছালাত আদায় করে। এমতাবস্থায় তারা অলসতা ও অনীহার সঙ্গে ভারাক্রান্ত হয়ে ছালাতে দাঁড়ায়। তারা ছালাত আদায়ের জন্য কোন ছওয়াবের আশা করে না এবং তা পরিত্যাগ করার কারণে কোন শাস্তি হবে বলেও বিশ্বাস করে না’।[26]

আজ আমরা দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য সকাল আটটায় অফিসে পৌঁছাতে মোটেও অলসতা করি না। তীব্র শীতের সকালে বা মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও আমরা বাস বা লোকাল ট্রেনের জন্য স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু সেই তীব্র শীতেই ফজরের আযান শুনে আরামের লেপ ছেড়ে মসজিদে যেতে আমাদের শরীরে যেন পাহাড়সম ক্লান্তি নেমে আসে! দুনিয়ার সামান্য কিছু টাকার জন্য আমরা রাতের ঘুম হারাম করতে পারি, অথচ চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য আমরা নেক আমল করতে অলসতা করি। এটাই কি মুনাফিকের স্বভাব নয়? নিজের ভিতর থেকে এই মুনাফিকী স্বভাব দূর করার জন্যই নেকীর প্রতিযোগিয় অবতীর্ণ হওয়া যরূরী।

[ক্রমশ:]

আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।


[1]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৪৭৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৯; ছহীহুল জামে‘ হা/১৪২৪, ছহীহ হাদীছ।

[2]. বুখারী হা/৬৪২৫; মুসলিম হা/২৯৬১; মিশকাত হা/৫১৬৩, রাবী আমর ইবনে আওফ (রাঃ)।

[3]. ইমাম ত্বীবী, আল-কাশিফু ‘আন হাক্বাইক্বিস সুনান, ১০/৩২৭৯।

[4]. সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৭৯৫।

[5]. বায়হাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা হা/২১৩২৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৩০০৯; ছহীহুত তারগীব হা/৩৩৫৬; সনদ ছহীহ।

[6]. ছান‘আনী, আত-তানবীর শারহুল জামি‘ইছ ছগীর, ৫/১১১।

[7]. খত্বীব বাগদাদী (৩৯২-৪৬৩ হি./১০০২-১০৭১ খ্রি.), আল-জামি‘ লি-আখলাক্বির রাবী ওয়া আদাবিস সামি‘, তাহক্বীক্ব: ড. মাহমূদ আত-ত্বাহহান (রিয়াদ: মাকতাবাতুল মা‘আরিফ, তা.বি), ১/৩৩০।

[8]. আবূ নু‘আইম ইস্পাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৭/৬১।

[9]. আবুল হুসাইন ইবনু আবী ইয়া‘লা হাম্বলী (৪৫১-৫২৬ হি./১০৫৯-১১৩১ খ্রি.), ত্বাবাক্বাতুল হানাবিলাহ, (রিয়াদ: দারাতুল মালিক আব্দুল আযীয, ১৪১৯ হি./১৯৯৯ খ্রি.), ১/৩৩৯।

[10]. মুহিউস সুন্নাহ আল-বাগাবী (৪৩৬-৫১৬ হি.), মা‘আলিমুত তানযীল (তাফসীরুল বাগাবী) (রিয়াদ: দারু ত্বায়্যিবাহ লিন-নাশরি ওয়াত তাওযী‘, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), ৭/৯।

[11]. আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘দী, তাইসীরুল কারীমির রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, তাহক্বীক্ব: আব্দুর রহমান ইবনু মু‘আল্লা আল-লুওয়াইহিক্ব (বৈরূত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪২০ হি./২০০০ খ্রি.), পৃ. ৭৩।

[12]. মুসলিম হা/২৬৬৪; ইবনু মাজাহ হা/৭৯।

[13]. শামসুদ্দীন যাহাবী (৬৭৩-৭৪৮হি.), সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, মুহাক্কিক্ব: শু‘আইব আল-আরনাউত্ব ও অন্যান্য (বৈরূত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৫ হি./১৯৮৫ খ্রি.), ৪র্থ খন্ড, পৃ. ৫৮৫; আবু নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ২/১৪৮।

[14]. আবূ আল-ফারাজ আবদুর রহমান ইবনু আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনিল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি.), মাওয়ায়িযু ইবনিল জাওযী (তা.বি), পৃ. ৫৭।

[15]. ছহীহুত তারগীব হা/৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৬০২; সনদ হাসান।

[16]. মুসলিম হা/১১৮; তিরমিযী হা/১৯৫।

[17]. আবূ জা‘ফর আত-তাবারী, জামে‘উল বায়ান ফী তাবীলি কুরআন, তাহকীক্ব: আহমাদ মুহাম্মাদ শাকির (বৈরুত: মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪২০ হি./২০০০ খ্রি.), ২২তম খন্ড, পৃ. ৪৪০।

[18]. মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ আল-কুরতুবী, আল-জামি‘ লি-আহকামিল কুরআন (তাফসীরুল কুরতুবী), ১৭/৫৩।

[19]. মুসলিম হা/২৯৪৭; ইবনু মাজাহ হা/৪০৫৬; মিশকাত হা/৫৪৬৫।

[20]. মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী, (মৃ. ১০১৪ হি./১৬০৬ খ্রি.), মিরক্বাতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ (বৈরূত: দারুল ফিকর, ১ম প্রকাশ, ১৪২২ হি./২০০২ খ্রি.), ৮ম খন্ড, পৃ. ৩৪৫০।

[21]. আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আব্দি রাবিবহী আল-আন্দালুসী (২৪৬-৩২৮ হি.), আল-ইক্বদুল ফরীদ (বৈরূত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪০৪ হি.), ৪র্থ খন্ড, পৃ. ১৯০।

[22]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/ ৩৪৩১৯; বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/ ৯৭৬৭; মিশকাত হা/ ৫১৭৪; ছহীহুত তারগীব হা/৩৩৫৫, ছহীহ হাদীছ।

[23]. আবুল-ফারাজ ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়াহ, মুহাক্কিক্ব: আহমাদ ইবনু আলী (কায়রো, মিসর: দারুল হাদীছ, ১৪২১ হি./২০০০ খ্রি.), ১ম খন্ড, পৃ. ১৫৪; ঐ, যাম্মুল হাওয়া, পৃ. ৬৬৮।

[24]. শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২/৩৯৩।

[25]. শামসুদ্দীন যাহাবী, তারীখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহীর ওয়াল আ‘লাম, মুহাক্কিক্ব: ড. বাশশার আওয়াদ মা‘রূফ (বৈরূত: দারুল গারবিল ইসলামী, ১ম সংস্করণ, ১৪২৪ হি./২০০৩ খ্রি.), খন্ড ৪, পৃ. ২৫০।

[26]. তাফসীরে কুরতুবী, ৫/৪২২।






বিষয়সমূহ: আমল
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (২য় কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা - ড. নূরুল ইসলাম
কিয়ামত আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবী - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
বিদ‘আত ও তার ভয়াবহতা - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ইয়াতীম প্রতিপালন (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
এক নযরে হজ্জ - আত-তাহরীক ডেস্ক
প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের শিষ্টাচার - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
দ্বীনে হক্ব প্রচারে ‘আত-তাহরীক’-এর ভূমিকা - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
তাক্বওয়ার গুরুত্ব ও ফযীলত (পূর্বে প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কতিপয় ভ্রান্ত আক্বীদা (৩য় কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
শিশুদের চরিত্র গঠনে ‘সোনামণি’ সংগঠনের ভূমিকা - ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইসলামে তাক্বলীদের বিধান (প্রথম কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
আরও
আরও
.