ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ্জ। সামর্থ্যবানদের জন্য জীবনে একবার হজ্জ ফরয। একজন মুমিনের সারা জীবনের স্বপ্ন থাকে হজ্জ পালনের। তবে হজ্জ কেবল মক্কা সফর কিংবা কাবা পরিদর্শন নয়; নয় কেবল এক লম্বা শারীরিক সফর, বরং এটি রূহ বা আত্মার এক পরম যাত্রা। এটি মহান রবের সান্নিধ্যে মহা তৃষিত হৃদয়ের এক বিনীত আত্মসমর্পণের মহাকাব্য। হজ্জের দীর্ঘ, ক্লান্ত-শ্রান্ত সফর আমাদের গভীরভাবে শেখায়- সব কোলাহলের শেষে আমরা সত্যিই ভীষণ একা। আমাদের পরম আশ্রয় কেবলই এক এবং একক সেই সত্ত্বা আমাদের মহান রব আল্লাহ রাববুল আলামীন। এই যে সফরের কষ্ট, এই যে রোদপোড়া ধূলিমলিন চেহারা-এ সবের মাঝে যেন লুকিয়ে থাকে মাটির মানুষের পক্ষ থেকে তার মহান স্রষ্টার প্রতি এক প্রাণঢালা ভালোবাসা, যেখানে ভাষা হারিয়ে যায়, যেখানে চোখের পানি আর ‘লাববাইক’ ধ্বনিতে বান্দার নীরব প্রেমের ভাষা আকাশের পানে ছুটে চলে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মুসলমান আল্লাহর ঘরের দিকে ছুটে আসেন একই পোশাকে, একই তালবিয়ার স্বরে, একই উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু হজ্জের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে যে গভীর আধ্যাত্মিকতা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক তাৎপর্য লুকিয়ে আছে, তা অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না। এই প্রবন্ধে হজ্জের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হ’ল।
১. পরকালীন প্রস্ত্ততির সফর :
হজ্জ এমন এক সফর যার মাঝে ফুটে ওঠে মৃত্যু পরবর্তী ক্বিয়ামত দিবসের এক জীবন্ত মহড়া। যখন কোন হাজী তার সেলাই করা নিত্য পরিহিত পোশাকগুলো খুলে দু’টুকরো সাদা ইহরাম পরিধান করেন, তখন সেটি তাকে ভিতর থেকে মনে করিয়ে দেয় কবরে শেষ যাত্রার পোষাক তথা কাফনের কথা। এই কাফন গায়ে জড়িয়ে সে যেন যাবতীয় দাম্ভিকতা, আত্মমর্যাদার দাবী বিসর্জন দিয়ে পরম বিনয়ের চাদর গায়ে জড়িয়ে নেয়। ইহরামের শুভ্রতা তার হৃদয়ের যাবতীয় অপবিত্রতা আর কলুষতাকে ধুয়ে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় সেই চিরন্তন বার্তা যে, আমি মাটি থেকে এসেছি, একদিন মাটিতেই মিশে যাব; মাঝখানে বেঁচে থাকবে কেবল আমার সৎআমলগুলো।
হজ্জের প্রতিটি কাজই যেন পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মিনার তাঁবু যেন অস্থায়ী দুনিয়ার প্রতীক। মানুষ তার স্থায়ী ঠিকানাকে সাজাতে কতই না আয়োজন করে! কিন্তু মিনার তাঁবুতে এসে সে বুঝতে পারে, সামান্য একটি তাঁবু বা কাপড়ের ছাদের নিচেও জীবন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব। এভাবে দুনিয়ার মোহমুক্তির এক বড় পাঠ সে পেয়ে যায়। রাসূল (ছা.) বলেছেন, كُن في الدُّنيا كأنَّكَ غريبٌ أو عابِرُ سبيلٍ ‘পৃথিবীতে এমনভাবে থাক যেন তুমি একজন আগন্তুক বা পথচারী (বুখারী হা/৬৪১৬)।’ মিনার তাঁবু যেন ঠিক এই হাদীছেরই বাস্তব রূপ। এখানে হাজীরা মাত্র কয়েক দিনের জন্য আসেন, সাথে থাকে সামান্য কিছু আসবাবপত্র। এই বিশাল পৃথিবীটাও যেন আমাদের জন্য এক অস্থায়ী তাঁবুর মত, যেখান থেকে একদিন আমাদের বিদায় নিতেই হবে। তাঁবুতে বসে হাজীদের মনে সবসময় একটা তাড়া থাকে যে, কখন আরাফায় যেতে হবে, কখন মক্কায় ফিরতে হবে। এই ‘অস্থায়ীত্বের বোধ’ আমাদের শেখায় যে, দুনিয়াটাও একটা মুসাফিরখানা, এখান থেকেও একদিন হুট করে বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠবে।
মিনার তাঁবু আমাদের আরো শেখায় আমাদের জীবনটা এমন এক অপেক্ষা, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ডাকের জন্য অপেক্ষা করছি। পরকালের দীর্ঘ সফরের তুলনায় আমাদের এই কয়েক ঘন্টার জীবনটা মিনার কয়েকটা দিনের অবস্থানের মতই সংক্ষিপ্ত। বিলাসবহুল অট্টালিকা ছেড়ে তাঁবুর অতি সাধারণ ঠিকানা হাজীদেরকে শেখায় ধৈর্য আর অল্পে তুষ্টি। মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রকৃত আরাম এই দুনিয়ায় নয় বরং জান্নাতের স্থায়ী নিবাসে।
তারপর আরাফার ময়দানে পৌঁছে যখন হাজীরা একই পোষাক গায়ে জড়িয়ে মহান রবের দরবারে হাত তোলে, তখন যেন মনে হয় হাশরের ময়দানকে সে স্বচক্ষে দেখে। কী ভয়ংকর সুন্দর সে দৃশ্য! সেই ময়দানের সুবিশাল জনস্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে সততই মনে হয়, কিয়ামত দিবস বুঝি উপস্থিত, আজ সব ভেদাভেদ মিলিয়ে গেছে, দুনিয়াবী সব চাওয়া-পাওয়া ভোলার দিন আজ, আজ শুধু প্রভুর সান্নিধ্য লাভের দিন। সুবহানাল্লাহ!
হজ্জের সারাংশই হল এই আরাফাত। আরাফাতের এই বিশাল ময়দানে দাঁড়িয়ে লাখো লাখো মানুষ একসাথে কাঁদে, একসাথে দো‘আ করে। সূর্যের খরতাপে ঘাম ঝরে, পাপের স্মৃতি চোখের জলে ধুয়ে যায়। আত্মা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সামনে নত হয়, অহংকারের প্রাচীর ভেঙেচুরে সমান হয়ে যায়, রহমতের বৃষ্টিতে হৃদয়-মন ধুয়ে নতুন সত্ত্বার জন্ম হয়। এই দিনে মহান রব যত ইনসানকে ইহসান করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, তা অন্য কোন দিনে আর হয় না (মুসলিম হা/১৩৪৮)।
সুফিয়ান ছওরী (রহ.)-এর মত মনীষীরা আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর ভয়ে এমনভাবে কম্পিত হ’তেন, যেন তারা সরাসরি আল্লাহর দরবারে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের কাছে তালবিয়া বা ‘লাববাইক’ বলা ছিল মহান রবের কাছে নিঃশর্ত আত্মোৎসর্গের এক আকুল আর্তি। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে তাঁরা অনুভব করতেন যেন ক্বিয়ামতের দিন এসে গেছে। পাপের ভার মাথায় নিয়ে অঝোর ধারায় কাঁদতেন, আর মরু বিয়াবানে আল্লাহর রহমতের বৃষ্টিতে ভেজার আশায় চেয়ে থাকতেন। তাদের দৃষ্টিতে হজ্জ ছিল আত্মার পরিশুদ্ধির সবচেয়ে কোমল এবং গভীরতম মুহূর্ত, যেখানে মানুষ নিজেকে ভুলে শুধু আল্লাহকে খুঁজে পায়।
‘আরাফাত’ শব্দটি এসেছে ‘আরাফা’ থেকে, যার অর্থ ‘জানা’ বা ‘চিনতে পারা’। এখানে মানুষ আল্লাহকে চেনে শুধু জ্ঞানের মাধ্যমে নয়, বরং হৃদয়ের অনুভূতিতে। এটি যেন ‘আলাস্ত্ত বিরবিবকুম’-‘আমি কি তোমাদের রব নই?-এই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিকাল। আত্মা এখানে স্মরণ করে কোথায় তার আসল উৎস আর কী ছিল রবের কাছে দেয়া তার সেই প্রতিশ্রুতি!
আরাফাতের বিশাল আবেগঘন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নেমে এসে শান্ত সমাহিত পরিবেশে নিরাভরণভাবে আল্লাহকে ডাকার স্থানই মুযদালিফা।
যদি মিনার তাঁবু হয় দুনিয়ার অস্থায়ী জীবনের প্রতীক, তবে মুযদালিফা হ’ল কবর জীবনের এক ক্ষুদ্র মহড়া, যেখানে মানুষের জাগতিক পদমর্যাদার কোন মূল্য নেই। এখানে কোটিপতি থেকে রাস্তার ফকীর, নারী-পুরুষ আবালবৃদ্ধবণিতা- সবাই একই আকাশের নিচে, একই বালুর বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকে। অবতারণা হয় এক অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয় দৃশ্যের; যার কোন তুলনা নেই।
এখানে মানুষে মানুষে কোন দেয়াল থাকে না, কোন লুকোচুরি থাকে না, কোন আভিজাত্য থাকে না। খোলা আকাশের নিচে কয়েক লক্ষ মানুষের এই নীরব রাত্রিযাপন যেন চিৎকার করে বলে যায়- ‘হে মানুষ! তুমি শূন্য হাতে এসেছিলে, এই ধুলিমাখা প্রান্তরের মাটির বিছানাই তোমার শেষ শয্যা হতে যাচ্ছে, তাই তাড়াতাড়ি পাথেয় গুছিয়ে নাও।’
‘মুযদালিফা’ শব্দটির অর্থ হ’ল নিকটে আসা বা মিলিত হওয়ার স্থান। বান্দা যখন দুনিয়ার সব আরাম আয়েশ ত্যাগ করে এই মরুপ্রান্তরে ধূলিমলিন অবস্থায় রাত কাটায়, তখন সে আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়। সে হৃদয় দিয়ে খুব গভীরভাবে অনুভব করে-‘দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকা বা প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয় (সূরা আলে-ইমরান ১৮৫)।
সর্বোপরি হজ্জের মূল উদ্দেশ্য হ’ল দুনিয়াবী মোহমুক্তি ঘটিয়ে আখেরাতমুখী নতুন জীবন শুরু করা। যাবতীয় পাপ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন সংকল্প গ্রহণ করা। আরাফাতে দাঁড়িয়ে মানুষ অনুভব করে ক্বিয়ামতের প্রস্ত্ততি। তার পাপের বোঝা হালকা হয়ে হৃদয় নতুন করে জন্ম নেয়। এজন্যই এই সফর পরকালীন সফরের এক আদর্শতম প্রস্ত্ততিস্বরূপ।
২. তাওহীদের মূর্ত প্রতীক :
হজ্জ কেবল পরকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়া ক্লান্ত সফর নয়; বরং এটি হ’ল তাওহীদের এক উন্মুক্ত প্রশিক্ষণকাল। মিনার তাঁবু, আরাফাতের ময়দান থেকে শুরু করে মুজদালিফার রাত এবং মিনার কঙ্কর নিক্ষেপ-সবই যেন এক আল্লাহর অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। একজন হাজী যখন হজ্জ শেষে ফিরে আসেন, তখন তার হৃদয়জুড়ে কেবলই থাকে তাওহীদের বিকীর্ণ নূর ।
হজ্জের মূল মন্ত্র হ’ল তালবিয়াহ- ‘লাববাইক আললাহুম্মা লাববাইক, লাববাইকা লা শারীকা লাকা লাববাইক...’। এর অর্থ হ’ল, ‘আমি উপস্থিত হে আল্লাহ! তোমার কোন শরীক নেই।’ লাখ লাখ মানুষের কণ্ঠে একই সাথে এই ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে কুঠারাঘাত করা হয় শিরকের মূলে এবং প্রকাশ পায় তাওহীদের অনুপম শ্রেষ্ঠত্ব ।
হজ্জ মূলত হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই তাওহীদী আহবানের উত্তর, যা তিনি হাযার বছর আগে দিয়েছিলেন। তিনি যেভাবে এক আল্লাহর জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন, হাজীরা তাদের হজ্জের মাধ্যমে শপথ নেন সেই একত্ববাদের আদর্শেই নিজের জীবন গড়ার।
কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘুরে, তখন তা এটিই প্রমাণ করে যে- মুমিনের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কেবল একজনই, আর তিনি হলেন আল্লাহ। যেমন গ্রহ-নক্ষত্র সূর্যের চারপাশে ঘোরে, তেমনি সকল সৃষ্টি আল্লাহর চারপাশে ঘুরে চলেছে। প্রতিটি তাওয়াফে মানুষ অনুভব করে-আমি আল্লাহরই দাস, তাঁরই কেন্দ্রে আমার জীবনের সবকিছু। প্রতি চক্করে তার পাপের বোঝা হালকা হয়, হৃদয় নরম হয়, আর দো‘আ যেন যমীন থেকে আকাশ ছুঁয়ে যায়। এ যেন আত্মার কেন্দ্রস্থলে ফিরে আসার এক মহা উপলক্ষ্য। হাজীরা কখনও কাবার পূজা করে না, বরং কাবার মালিকের ইবাদত করে। এভাবেই তাওয়াফ তাওহীদে রবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যাহর এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে ওঠে।
অনুরূপভাবে শয়তানকে পাথর মারার অর্থ এক আল্লাহর আনুগত্যের পথে আসার পথে সমস্ত বাধাকে প্রত্যাখ্যান করা। এটি তাওহীদের সেই দাবীকে শক্তভাবে ধারণ করে যেখানে বলা হয়- ‘লা ইলাহা’ (নেই কোন হক্ব উপাস্য) অর্থাৎ মিথ্যা সব উপাস্য ও শক্তিকে আগে বর্জন করা, তারপর ‘ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া) বলে এক সত্তাকে গ্রহণ করা।
হজ্জ এভাবে শুধুমাত্র ক্লান্তিকর দীর্ঘ সফর নয়, বরং হৃদয়ের পূর্ণ ভাবাবেগ আর আনুগত্য নিয়ে মহান প্রভুর দরবারে হাজিরা দেয়ার নাম। হজ্জের প্রতিটি পদক্ষেপ হাজীদের হৃদয়ে তাওহীদের এক জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে ধরা দেয়। তাকে শিখিয়ে দেয় যে, জীবন ও মরণের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হলেন মহান আল্লাহ। তিনি বিনা সবকিছুই অর্থহীন। তার কাছে নিখাদ আত্মসমার্পণই মানবজীবনের মূল সার্থকতা।
৩. আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত :
ইহরামের শুভ্র কাপড় ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, সকলকে একাকার করে ফেলে। দুনিয়ার সব সাজ-সজ্জা, সব অহংকার, সব মোহ ত্যাগ করে মানুষ আত্মহারা হয়ে যায়। ফলে আত্মার পরিশুদ্ধির এক শুভ্র সূচনা হয়, নফসের দাবী চুপ হয়ে যায়, আর হৃদয় ভরে ওঠে আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসায়।
বিদ্বানদের দৃষ্টিতে হজ্জ হ’ল বান্দার এক ‘বিপ্লবী রূপান্তর’-এর নাম। কেননা হজ্জ নিজের ক্ষুদ্র আমিত্বকে (Ego) কুরবানী করে মহান আল্লাহর ইচ্ছার সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ার নাম। এটি কোন পাথরের ঘরের চারদিকে ঘুরা নয়, বরং মানুষের নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র খুঁজে পাওয়ার এক অবিরাম চেষ্টা।
জামরাতের যে প্রতীকী যুদ্ধ, যা শয়তানকে পাথর ছোড়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা শুধু বাইরের শয়তান নয়; বরং নিজের অন্তরের কুপ্রবৃত্তি, অহংকার, লোভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এটি শেখায় আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এবং শয়তানের প্ররোচনা প্রত্যাখ্যান করার অসাধারণ পাঠ। হাজী পাথর নিক্ষেপ করে তার নিজের অন্তরের ভেতর লুকিয়ে থাকা ‘নফস’ বা অহংকারের মূর্তিকে চূর্ণ করে, তার ভেতরের কুপ্রবৃত্তিকে ঘৃণাভরে আঘাত করে।
হজ্জের প্রতিটি রুকন, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফায় অবস্থান-একেকটি আধ্যাত্মিক সেতু, যার মাধ্যমে মানুষের অন্তর আল্লাহর সান্নিধ্যে বিগলিত হয়, আত্মশুদ্ধি গভীর চর্চা হয় এবং জীবনের গতিপথ বদলে যায়। এটি যেন আল্লাহর রহমতের একটি নরম আলিঙ্গন, যার পরশে মানুষ পুরনো জীবন ভুলে নতুন করে জেগে ওঠে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) তাঁর অমর গ্রন্থ ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’য় হজ্জের অভ্যন্তরীণ দিকগুলোকে উন্মোচন করেছেন যেন একটি মায়াবী আয়নায়। তিনি বলেন, ‘যেহেতু হজ্জ একটি দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য সফর, যা শারীরিক শ্রম আর মানসিক দৃঢ়তা ছাড়া সম্পন্ন হওয়া অসম্ভব, তাই এই ইবাদতটি যখন একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তা মানুষের অতীত জীবনের সকল পঙ্কিলতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়। হজ্জের এই ত্যাগ ও সাধনা পূর্বের সমস্ত গুনাহকে এমনভাবে গুঁড়িয়ে দেয়, যেমনটি একজন অবিশ্বাসী ইসলাম গ্রহণ করলে তার পূর্বের সব পাপ মুছে গিয়ে সে নতুন জীবন পায় (পৃ. ১/১৪২)।’ তিনি একে ‘ঈমান আনয়ন’-এর সাথে তুলনা করেছেন এজন্য যে, ইসলাম গ্রহণের পর যেমন মানুষ নিষ্পাপ হয়ে যায়, মাক্ববূল হজ্জও একজন মানুষকে তেমনি পবিত্র করে দেয়।
তিনি আরো বলেন, ‘হজ্জ সমাজের যত কুপ্রথা আর অসার রসম-রেওয়াজ (শিরক-বিদআত)-কে সমূলে বিনাশ করে দেয়। সালাফে ছালেহীনদের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য হজ্জের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কিছুই নেই’ (ঐ)।
তিনি নিজের হজ্জের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, ‘কোন মানুষ যখন সেই পবিত্র স্থানে গিয়ে উপনীত হয়, তখন ঐ মহিমান্বিত পরিবেশের রূহানী রং আর নূরানী আভা তার নিজের আত্মার ওপর প্রবলভাবে বিজয়ী হয়। আর আমি (শাহ ওয়ালিউল্লাহ) নিজে স্বচক্ষে এই সত্য প্রত্যক্ষ করেছি’ (ঐ)।
তিনি আরো বলে, وَرُبمَا يشتاق الْإِنْسَان إِلَى ربه أَشد شوق، فَيحْتَاج إِلَى شَيْء يقْضِي بِهِ شوقه فَلَا يجد إِلَّا الْحَج ‘যখন মানুষের হৃদয়ে রবের বিরহ-বেদনা আর মিলনের আকুলতা সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেই ব্যাকুল তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সে এমন এক কিছু খোঁজে, যা তার অন্তরে গভীর অনুরাগের তৃপ্তি দিতে পারে। তখন হজ্জই হয়ে ওঠে সেই তৃষিত হৃদয়ের একমাত্র প্রশান্তি’ (ঐ)।
হজ্জ কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতই নয়, বরং এটি মানুষের চরিত্র সংশোধন এবং তাকে সব ধরনের অন্যায় ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার এক কার্যকর প্রশিক্ষণ। হজ্জের সময় যাবতীয় অন্যায় ও অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَّعْلُومَاتٌ - فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ ‘হজ্জের মাসসমূহ সুনির্ধারিত। সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ্জের সংকল্প করে, তার জন্য হজ্জের সময় স্ত্রী-সহবাস (অশ্লীল কথা ও কাজ), পাপাচার এবং ঝগড়া-বিবাদ করা জায়েয নেই’ (সূরা বাক্বারাহ ২/১৯৭)। এই আয়াতে ‘ফুসূক’ (পাপাচার) এবং ‘জিদাল’ (বিবাদ) নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর অপরাধকেও হজ্জের পবিত্রতার পরিপন্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রাসূল (ছা.) ঘোষণা করেছেন যে, ‘হজ্জ মানুষকে এমনভাবে পাপমুক্ত করে যে তার চরিত্রে অপরাধের কোন চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে না’ (বুখারী হা/১৮১৯)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (ছা.) বলেন, مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্জ করল এবং তাতে অশ্লীল কাজ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকল, সে (হজ্জ শেষে) এমনভাবে ফিরে আসল যেন আজই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে (অর্থাৎ সে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হয়ে গেল)।[1]
তাছাড়া ইহরাম বাঁধার পর হাজীদের জন্য এমন কিছু কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায় যা সাধারণত হালাল (যেমন, শিকার করা, সুগন্ধি মাখা বা চুল কাটা)। এই কঠোর নিয়ম হাজীকে শেখায় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হালাল ছোট ছোট কাজ ছাড়তে পারে, তার পক্ষে মানুষের হক নষ্ট করা বা বড় বড় অন্যায় ছেড়ে দেওয়া আরও সহজ। অনুরূপভাবে হজ্জের ভিড় ও প্রতিকূলতা হাজীকে প্রচন্ড ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ফলে রাগের মাথায় গালি দেওয়া বা বিবাদে লিপ্ত হওয়ার মত কুপ্রবৃত্তি দমন হয়। এভাবেই হজ্জের মাধ্যমে একজন মানুষ তার ভেতরের পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে এবং ছোট-বড় সকল অন্যায় থেকে আত্মরক্ষার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এক নতুন ‘মুত্তাকী’ মানুষ হিসাবে পুনর্জন্ম লাভ করে।
ইমাম গাযালীর দৃষ্টিতে হজ্জ কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি নিজের ভেতরের ‘আমি’কে চেনার একটি বড় পরীক্ষা। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেন, ‘বলা হয়ে থাকে, সফরকে ‘সফর’ নামকরণ করা হয়েছে এই কারণে যে, তা মানুষের লুকানো চরিত্রকে উন্মোচিত (يسفر) করে দেয়। এই কারণেই হযরত উমর (রা.) যখন এক ব্যক্তিকে জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে জানার দাবী করতে দেখলেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তার সাথে কোন সফরে সঙ্গী হয়েছিলে, যার মাধ্যমে মানুষের উন্নত চরিত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়?’ লোকটি উত্তর দিল, ‘না’। তখন উমর (রা.) বললেন, ‘তাহলে আমি মনে করি, তুমি তাকে চেনো না’।[2]
সুতরাং হজ্জ হ’ল সেই ‘ল্যাবরেটরী’ যেখানে একজন মুমিনের সামাজিক সততা ও ছবরের পরীক্ষা হয়। হজ্জের সফরে মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা, পাওনা আদায়ে ছাড় দেওয়া এবং অন্যের কষ্ট সহ্য করা-এসব গুণই হ’ল ‘মাকারিমুল আখলাক’ বা উন্নত চরিত্র। যেমন ইমাম গাযালী বলেন, لَيْسَ حُسْنُ الْخُلُقِ كَفَّ الْأَذَى بل احتمال الأذى ‘উত্তম চরিত্র কেবল কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং অন্যের দেয়া কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করার নামই হ’ল উত্তম চরিত্র (ঐ)।’
সুতরাং যার হজ্জ তাকে অন্যের প্রতি দয়াশীল ও ধৈর্যশীল করতে পারল না, তার সফর কেবল দৈহিক পরিশ্রমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ সামাজিক আদব বা লোকলজ্জার খাতিরে নিজের রাগ, লোভ বা সংকীর্ণতাকে লুকিয়ে রাখতে পারে। কিন্তু হজ্জের মত দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য সফরে যখন ক্ষুধা, ক্লান্তি এবং ভিড়ের চাপ তৈরি হয়, তখন মানুষের ভেতরের প্রকৃত রূপটি বেরিয়ে আসে। এভাবে হজ্জ আত্মনিরীক্ষার পথ ধরে আত্মশুদ্ধির কাজটি সহজতর করে তোলে।
৪. মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ :
বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক হিসাবে হজ্জ অসামান্য গুরুত্ব রাখে। বিশ্বজুড়ে যখন লাখ লাখ হাজী একত্রিত হন, তখন তা ইসলামের গাম্ভীর্য ও শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এক বিরাট প্লাটফর্ম। এটি তাওহীদী পতাকাতলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষদের এক বার্ষিক সমাবেশ; যেখানে মুমিনের ঈমান শাণিত হয়, মিল্লাতের ঐক্যবোধ সুদৃঢ় হয়।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) চমৎকারভাবে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্র যেমন নির্দিষ্ট সময় পরপর সামরিক কুচকাওয়াজ বা শক্তির মহড়ার আয়োজন করে, যাতে অনুগত ও বিদ্রোহীদের চেনা যায়, রাষ্ট্রের শৌর্য-বীর্য বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং নাগরিকরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারে; ঠিক তেমনি মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘হজ্জ’ হ’ল এক আবশ্যিক মহাসম্মিলন। হজ্জের মাধ্যমেই খাঁটি মুমিন আর কপট মুনাফিকের তফাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে, কীভাবে অগণিত মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের পতাকাতলে আশ্রয় নিচ্ছে। হজ্জের এই প্রাঙ্গণে পৃথিবীর এক প্রান্তের মুসলমান অন্য প্রান্তের ভাইয়ের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে একে অপরের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও মহৎ গুণাবলী বিনিময় করতে পারে। কেননা মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর উন্নত চরিত্র মূলত একে অপরকে দেখা এবং সৎ সাহচর্যের মাধ্যমেই বিকশিত হয়’ (ঐ)।
হজ্জ হ’ল বিশ্বের সমস্ত প্রান্তের মুমিনদের এক অভিন্ন মিলনমেলা, যেখানে বংশ, বর্ণ ও আভিজাত্যের দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। হৃদয়ে গেঁথে দেয় ‘উম্মাহ’র চেতনা। সাদা কাপড়ে সবাই সমান, ধনী-গরীব, আরব-আজমের কোন পার্থক্য নেই। এ সত্যিই এক অপরূপ দৃশ্য!
বর্ণবাদ ও বৈষম্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ মানবাধিকার কর্মী ম্যালকম এক্স (১৯২৫-১৯৬৫ খৃ.) ইসলাম গ্রহণ করার পর ১৯৬৪ সালে যখন হজ্জের ময়দানে পা রাখলেন, তখন তাঁর চোখ খুলে গেল। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, যে ভ্রাতৃত্বের কথা তিনি কিতাবে পড়েছেন, হজ্জের ময়দান তার এক মূর্ত বাস্তবতা। তিনি দেখেছিলেন যে, আমেরিকায় যে ভ্রাতৃত্বের জন্য তাঁরা লড়াই করছেন, ইসলাম তা চৌদ্দশ বছর আগেই হজ্জের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। তিনি বিমুগ্ধ চিত্তে তাঁর বন্ধুদের কাছে লিখেছিলেন, 'I have never before seen sincere and true brotherhood practiced by all colors together, irrespective of their color.' ‘আমি আমার জীবনে আগে কখনো এমন অকৃত্রিম ও সত্যিকার ভ্রাতৃত্ব দেখিনি, যেখানে সব রঙের মানুষ একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে’ (The Autobiography of Malcolm X)। হজ্জের এই শিক্ষা তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, তাওহীদ কেবল পরকালে মুক্তির পথ নয়, বরং ইহকালে মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠারও চূড়ান্ত সনদ।
মহাকবি ইকবালের চিন্তায় হজ্জ হ’ল উম্মাহর শক্তির উৎস। তিনি মনে করতেন, হজ্জ মুসলিমদের শিখিয়ে দেয় যে, তাদের আসল গন্তব্য কোন ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং মক্কা। হজ্জ আমাদের ‘শিকড়’ বা উৎসের সাথে যুক্ত করে, যা আধুনিক যুগের আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে আমাদের রক্ষা করে। তাঁর ‘আসরারে খুদী’-তে তিনি কা‘বাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন,
تو ہمہ سرِ مایی و ما ہمہ پا + از تو داریم ایں ہمہ عز و وقار از تو داریم
(তুমিই আমাদের মস্তক, আমরা তোমার পদতলে; আমাদের সকল সম্মান ও গাম্ভীর্য তোমার (কাবার) সাথেই যুক্ত)। অর্থাৎ কাবার সাথে বিচ্ছেদ মানেই উম্মাহর ধ্বংস। হজ্জ আমাদের সেই উৎসের সাথে পুনর্মিলন ঘটায়।
তিনি আরো বলেন, হজের মাধ্যমে মুসলিমরা তাদের কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ (Territorial Nationalism) ভুলে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের সাথে যুক্ত হয়। তার দৃষ্টিতে হজ্জ হ’ল মুসলিম উম্মাহর বার্ষিক Renewal বা নবায়ন, যা তাদের হৃদয়কে ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ করে। ‘খিজরে রাহ’ কবিতায় তিনি হজ্জের বিশাল সমাবেশের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন এভাবে-
ایک ہوں مسلم حرم کی پاسبانی کے لیے
نیل کے ساحل سے لے کر تابخاکِ کاشغر
(নীলনদ থেকে শুরু করে কাশগরের সীমান্ত পর্যন্ত-সব মুসলমানকে এক হতে হবে এই ‘হারম’ বা কাবার পাহারাদারীর জন্য)। এখানে তিনি বুঝিয়েছেন যে, মক্কাকে কেন্দ্র করেই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শক্তির উত্থান সম্ভব।
তিনি হজ্জকে দেখেছেন উম্মাহর জাগরণের প্রতীক হিসাবে যেখানে বিশ্বের সকল মুসলিম এক হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, আর তাদের হৃদয়ে জেগে ওঠে এক অখন্ড ঐক্যের স্বপ্ন। তিনি বলেন,
قافلہ ہو جائے گا پھر گرمِ سفر + نعرہ-ی تکبیر سے گونجے گا دشت و در
(এই কাফেলা আবারও তার গন্তব্যের পথে তীব্রভাবে যাত্রা শুরু করবে; আর ‘নারায়ে তাকবীর’-এর ধ্বনিতে মরুপ্রান্তর ও পাহাড়-পর্বত কেঁপে উঠবে)।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর দৃষ্টিতে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে রয়েছে এক অব্যক্ত সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধের পাঠ। এতে রয়েছে পূণ্যবানদের স্মৃতি, ভক্তি এবং সম্মিলিত শক্তির এক অপূর্ব সমন্বয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য তিনটি- (১) এটি ইতিহাসের জীবন্ত পাঠ। কেননা হজ্জের মাধ্যমে নবী, ছিদ্দীক ও ছালেহীনদের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তাঁদের আদর্শকে স্মরণ করা যায়, যা মুমিনকে তাঁর শেকড় বা ঐতিহ্যের সাথে জুড়ে দেয়। (২) হজ্জে রয়েছে সম্মিলিত আকুতির শক্তি। যখন পৃথিবীর চারপ্রান্ত থেকে আসা অগণিত ছালেহীন বা নেককার মানুষের মনের বাসনা, তওবা এবং ক্রন্দন একই সময়ে ও একই স্থানে মিলিত হয়, তখন সেখানে সম্মিলিত ভ্রাতৃত্ববোধের জাগরণ যেমন ঘটে, তেমনই মহান আল্লাহর রহমতের জোয়ার আসা অবধারিত হয়ে পড়ে। এই ঐক্যবদ্ধ রোনাজারীই শয়তানকে সবচেয়ে বেশী লাঞ্ছিত ও পরাজিত করে। হাদীছের বর্ণনায় এসেছে যে, ‘আরাফার দিন ব্যতীত আর এমন কোন দিন নেই, যেদিন শয়তান এত বেশী অপমানিত, এত ছোট এবং এত ক্রুদ্ধ হয়’।[3] (৩) হজ্জের মাধ্যমে পবিত্র নিদর্শন ও ত্যাগের পরম্পরা দেখে হাজীরা উদ্বুদ্ধ হয়। তাছাড়া প্রতিটি জাতির মধ্যেই পবিত্র স্থান বা নিদর্শনের প্রতি অনুরাগের একটি সহজাত প্রবৃত্তি থাকে। হজ্জের মাধ্যমে মানুষ সেই প্রাচীন ইব্রাহিমী ত্যাগের রীতিগুলো পালন করে মূলত আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের সেই মহান পথেরই অনুসরণ করে।[4]
৫. ইসলামী সমাজ গঠন :
হজ্জের সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। এটি কেবল কাবা দর্শন নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে এক নতুন কা‘বা গড়ার সংগ্রাম। ছাফা-মারওয়ার সেই ক্লান্তি আর ইব্রাহীমী ত্যাগের উদ্দীপনা একজন হাজীকে বুঝিয়ে দেয় যে, সামাজিক জীবনের প্রতিটি সংকট আল্লাহর রহমতের এক একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার নামই হ’ল ‘ইসলামী সমাজ গঠন’, যেখানে ব্যক্তিগত শুদ্ধি আর সামাজিক মুক্তি একই সূত্রে গাঁথা।
এভাবে হজ্জ একটি আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণেরও বাস্তব মহড়া। হজ্জের প্রতিটি রুকন আমাদের এক মহান প্রশিক্ষণ শিবিরের সদস্য হিসাবে দীক্ষিত করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই অজেয় ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের স্মৃতি। এতে সমাজগঠনের যে সকল উপাদান দৃশ্যমান হয়, তা নিম্নরূপ- (১) হাজীগণ যখন মিনায় পাথর মারেন বা পশু কুরবানী করেন, তখন তাঁরা মূলত নিজের ভেতরকার ক্ষুদ্র স্বার্থ, অহংকার এবং পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়ার শপথ নেন। একটি আদর্শ সমাজ গঠনে ব্যক্তির এই ‘নফসের কুরবানী’ অত্যন্ত যরূরী। হজ্জের এই শিক্ষা হাজীদের শেখায় কীভাবে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে উৎসর্গ করতে হয়। (২) ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে হাজীদের দৌড়ানো কেবল একটি প্রাচীন স্মৃতিচারণ নয়। এটি মূলত ‘সামাজিক প্রতিকূলতায় অবিচল থাকার প্রশিক্ষণ’। হাজেরা (আ.)-এর সেই নির্জন মরুপ্রান্তরে পানির জন্য ব্যাকুল ছোটাছুটি আমাদের শেখায় একটি আদর্শ সমাজ গড়তে হলে কেবল ঘরে বসে মনস্কামনা পোষণ করা বা দো‘আ করলে হবে না কিংবা হতাশা নিয়ে হিম্মত হারালে চলবে না; বরং প্রচন্ড প্রতিকূলতার মাঝেও ধৈর্যের সাথে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। (৩) হাজেরা (আ.)-এর সেই অসীম সন্তানবাৎসল্য ও আল্লাহর প্রতি ভরসাই আজ ‘যমযম’ নামক অফুরন্ত নে‘মতের উৎস। এটি আমাদের বার্তা দেয় যে, যদি একটি সমাজ সম্মিলিতভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা করে এবং সৎ উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করে, তবে আল্লাহ সেই মরুপ্রান্তর থেকেও সমৃদ্ধির ধারা বইয়ে দিতে পারেন। এখানে আত্মা শেখে সামাজিক মানুষের ত্যাগ ও বিশ্বাসের গভীরতা। এভাবে হজ্জ হয়ে ওঠে কল্যাণমুখী ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের এক মৌলিক হাতিয়ারে। (৪) হজ্জের সময় যখন সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়ায়, তখন কৃত্রিম সামাজিক উঁচু-নিচু দেয়ালগুলো ভেঙে পড়ে। এই সাম্যই হ’ল ইসলামী সমাজ গঠনের মূল হাতিয়ার। হজ্জের এই আধ্যাত্মিক শক্তি মানুষকে স্বার্থপরতা থেকে বের করে এনে ‘পরোপকারী’ ও ‘সমাজ সচেতন’ এক অনন্য মানুষে রূপান্তরিত করে।
উপসংহার :
হজ্জ মুসলিম জীবনে এক অনন্য প্রভাববিস্তারকারী ইবাদত, যার ফলাফল মুমিনরা সারা জীবনভর অনুভব করেন। তবে হজ্জের এই আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সুফল পেতে হলে এবং হজ্জকে ‘হজ্জে মাবরূর’ বা কবুল হজ্জের মর্যাদায় উন্নীত করতে চাইলে তিনটি বিষয়ে পরিশুদ্ধিতা একান্ত অপরিহার্য।
১. ইখলাছ বানিয়তের পরিশুদ্ধিতা : হজ্জের প্রতিটি কদম হ’তে হবে রিয়ামুক্ত এবং কেবলই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত। সামাজিক মর্যাদা লাভ, নামের আগে ‘হাজী’ লকব লাগানো, লোকদেখানো মানসিকতা বা হজ্জ সফরকে পারিবারিক ‘ট্যুর’ কিংবা আনন্দভ্রমণ বানিয়ে ফেলা হজ্জের মূল আত্মাকেই ধ্বংস করে দেয়। এজন্য যে কোন ইবাদতের মত হজ্জের ক্ষেত্রেও নিয়তের শুদ্ধতার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা তা ইবাদত হিসাবেই আল্লাহর কাছে গণ্য হবে না।
২. মানহাজের পরিশুদ্ধিতা : হজ্জ পালনকারীর আক্বীদা হ’তে হবে শিরকমুক্ত এবং হজ্জ আদায়ের নিয়ম-কানূন হ’তে হবে সম্পূর্ণ সুন্নাহসম্মত। ইবাদতের ক্ষেত্রে বিদ‘আত বা নিজের মনগড়া পদ্ধতি সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। বরং রাসুলুল্লাহ (ছা.)-এর প্রদর্শিত সুন্নাত এবং সালাফদের বুঝ বা মানহাজ অনুযায়ী হজ্জের প্রতিটি কর্ম সম্পন্ন করা একান্ত আবশ্যক। কারণ রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে হজ্জের নিয়মাবলী শিখে নাও (নাসাঈ হা/৩০৬২)।’ পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ মোতাবেক না হলে সেই ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না।
৩. রিযিকের পরিশুদ্ধিতা : হজ্জ সফরের অর্থ হতে হবে হালালভাবে উপার্জিত। কেননা হারাম রিযিকে লালিত শরীর আর হারাম টাকার পোষাক পরে লাববাইক ধ্বনি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। হালাল রিযিকের পবিত্রতা হাজীকে সেই নূর দান করে, যা তাকে হজ্জের পর একটি কলুষমুক্ত ও আদর্শ জীবন গঠনে সহায়তা করে। নতুবা তার হজ্জ ‘মাবরূর’ হয় না এবং তার পরবর্তী জীবনে হজ্জ কোন প্রভাবও ফেলে না। বরং উল্টোটাই ঘটে। ফলে হজ্জের আধ্যাত্মিক অর্জন থেকে সে দূর্ভাগ্যজনকভাবে বঞ্চিত হয়।
পরিশেষে বলা যায়, হজ্জ হ’ল তাওহীদ ও তাকওয়ার এক অসাধারণ প্রশিক্ষণ এবং ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের এক অবিনশ্বর হাতিয়ার। যদি নিয়ত এবং মালের পরিশুদ্ধিতার সাথে ছাফা-মারওয়ার সেই ক্লান্তি আর আরাফাতের আকুতি একজন মুমিনের জীবনে মিশে যায়, তখনই সে লাভ করে একটি নিষ্পাপ শুভ্র জীবন। হজ্জের সেই পবিত্র নূর তখন কেবল মক্কার প্রান্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং হাজীদের মাধ্যমে সারা বিশ্বের প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ আমাদের সকলকে হজ্জ পালনের মহা সৌভাগ্য দান করুন এবং এর মাধ্যমে আমাদের জীবনকে হেদায়াতের স্নিগ্ধ পবিত্র আলোয় সুশোভিত করুন। আমীন!
[1]. বুখারী হা/১৫২১, মুসলিম হা/১৩৫০।
[2]. ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন পৃ. ১/২৬৩।
[3]. মুওয়াত্তা, সনদ মুরসাল যঈফ, তবে অর্থগতভাবে ছহীহ, যঈফ তারগীব ওয়া তারহীব হা/৬৭৯।
[4]. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ১/১৪২।