১৯০ বছরের (১৭৫৭-১৯৪৭) দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের পর ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র অস্তিত্ব লাভ করে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতায় বৃটিশ সরকার ভারত ত্যাগে বাধ্য হ’লে অবশেষে বৃটিশ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের রূপরেখা অনুযায়ী দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে (TWO NATION'S THEORY) ভারতবর্ষ ভাগ করা হয়। একমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই বাংলা ও পাঞ্জাবকে সেদিন দু’টুকরো করা হয়। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ববঙ্গকে (বাংলাদেশ) পৃথক করে প্রায় দুই হাযার কিলোমিটার দূরত্বের পাকিস্তানের সাথে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম দিয়ে একীভূত করে দেওয়া হয় ইসলামের কারণেই। যার পথ বেয়েই ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। মুসলিম অধ্যুষিত না হ’লে সেদিন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান হ’ত না, আর পাকিস্তান না হ’লে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নও থাকত সুদূর পরাহত। সুতরাং ইসলাম-ই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা। ইসলামের কারণেই আমরা পাকিস্তান পেয়েছিলাম এবং ইসলামের কারণেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। দুর্ভাগ্য, বর্তমানে বিভিন্ন চেতনার ভিড়ে নতুন প্রজন্ম প্রায় ভুলতে বসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা কী ছিল। ফলে স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। পেয়েছে মাত্র একটি ভৌগলিক মানচিত্র।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানী চেতনাহীন ও নীতিভ্রষ্ট শাসকদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এই স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। সে সময় এ দেশের মানুষ বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর এই পরম বন্ধু (?) ভারতই বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের উপরে এক জগদ্দল পাথর হয়ে দেখা দেয়। দেশ স্বাধীনের মাত্র এক বছরের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনী নাম দিয়ে অপতৎপরতা শুরু করে, যা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলে। এই শান্তিবাহিনী গঠন, প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্র সরবরাহ এ সবকিছুর নেপথ্যে ছিল ভারত। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ করা হয় তথাকথিত ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি’ নামীয় ২৫ বছর মেয়াদী গোলামী চুক্তি। ১৯৭৫ সালে পটপরিবর্তনের পর শুধু শান্তিবাহিনী নয়, একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত করা হয়। বাংলাদেশের অপরাধ জগতের বড় বড় গডফাদারদের অভয়ারণ্য হচ্ছে ভারত। বিগত সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিস্ট ও খুনীদেরও ঠিকানা হয়েছে এই ভারতেই। এ ছাড়া এ যাবত ভারত-বাংলাদেশ যত চুক্তি হয়েছে এর সিংহভাগই ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি (১৯৯৬), ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তি (২০১০), বন্দি প্রত্যর্পন চুক্তি (২০১৬), ফেনী নদীর পানি প্রত্যাহার চুক্তি (২০১৯), উপকূলে রাডার নযরদারি চুক্তি (২০১৯), ডিজেল আমদানী চুক্তি (২০২৩), মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার চুক্তি (২০১৮), তিন বিঘা ও দহগ্রাম করিডোর (২০২১) প্রভৃতি সকল চুক্তিই হয়েছিল ভারতের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে। সূত্র মতে, বিগত সরকারের আমলে ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, আর সমঝোতা স্মারক সই হয় ৬৭টি। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন বলতে বাধ্য হন, ‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি তা ভারত সারাজীবন মনে রাখবে’। বাস্তবে মনেও রেখেছে। আর এ কারণেই বিগত সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদের নায়ক-নায়িকা ও গুম-খুনের কারিগরদের জামাই আদরে আশ্রয় দিয়ে ষোলআনা প্রতিদান দিয়েছে ভারত।
বিগত ৫৪ বছরে ভারত বাংলাদেশে তার আধিপত্যের ষোলকলা পূর্ণ করেছে। ভারতীয় পরোক্ষ প্রেসকিপশনে চলেছে দেশ। বাজার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মঞ্চ সবজায়গাতেই ছিল দিল্লীর দাদাগিরি। গঙ্গাসহ ৫৪টি নদীর উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশকে ডুবিয়ে ও শুকিয়ে মারছে ফি বছর। সীমান্তে নিরপরাধ বাংলাদেশীদের পাখির মত গুলি করে হত্যা করছে মাঝে মধ্যেই। ভারতীয় পণ্যে সয়লাব আজ বাংলাদেশ। মার্কেটে গেল যা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। যে কোন পণ্যে হাত দিবেন, দেখবেন এটি ইন্ডিয়ান। অথচ লাভ-লোকসানের দোলাচলে আমাদের দেশীয় ইন্ডাস্ট্রিগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনকি সীমান্তের ওপারে ফেনসিডিল কারখানা বানিয়ে দেদারসে বাংলাদেশে ফেনিসডিল পাচার করে এ দেশের তরুণ ও যুবসমাজকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় পৌঁছে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত এ দেশটি। অপরদিকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র পাচারের মাধ্যমে একশ্রেণীর উচ্ছৃংখল যুবককে সন্ত্রাসী বানানো হচ্ছে। এককথায় বাংলাদেশ হচ্ছে কার্যত ভারতের একটি কলোনী, একটি নিরাপদ বাজার। অথচ আমাদের ক্ষমতালোভী স্বার্থান্ধ নেতারা ভারতের লেজুড়বৃত্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকায় ছিল ব্যস্ত। ফলে তাদের যবানে প্রকৃত আযাদীর বাণী শুনা যেত না। দেশের জন্য মেকি ভালোবাসা ছাড়া তাদের কিছুই ছিল না।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরে মোটা দাগে ১৫ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতি, রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা, সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার সব আমলের অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছে এদেশের জনগণ। দেখেছে বড় দুইটি অভ্যুত্থান। ৯০য়ে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান এবং ২৪শে হাসিনার ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান। প্রত্যক্ষ করেছে একাধিক সামরিক শাসন এবং তত্ত্বাবধায়ক ও অন্তবর্তী সরকারের শাসনামল। এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে বহুবার। বায়ান্ন, একাত্তর, নববই ও চবিবশ যার জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়াও লগি-বৈঠার তান্ডব এবং ওয়ান-ইলেভেনও (১/১১) প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। বিগত সাড়ে পনের বছরের আয়নাঘরের নির্মমতার ইতিহাস বিশ্বিইতিহাসের সমস্ত নির্মমতাকে যেন হার মানিয়েছে।
অবশেষে সহস্রাধিক তরতাজা প্রাণের বিনিময়ে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে এ দেশের ছাত্র-জনতা সাড়ে পনের বছরের ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে বাংলাদেশ পুনরায় স্বাধীন করে। দেশবাসী স্বপ্ন দেখে নতুন বাংলাদেশের। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- এরপরও কি এ দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করতে পেরেছে? নিরাপদ একটি জনপদ উপহার পেয়েছে? বাকস্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে? রাজপথে নির্বিঘ্নে চলার সাহস পেয়েছে?
জবাব হচ্ছে- না। যদি প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হ’ত, তাহ’লে জুলাই বিপ্লবের অগ্রসৈনক, তোজোদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর, অকুতোভয় বীর শরীফ ওছমান বিন হাদীকে (৩২) অকালে রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হ’ত না। গত ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম‘আর ছালাতের পর ২টা ২৫ মিনিটে বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড সংলগ্ন ডিআর টাওয়ারের সামনে তাকে গুলি করা হয়। মোটরসাইকেলে চড়ে দু’জন আততায়ী খুব কাছ থেকে চলন্ত রিক্সায় থাকা ওছমান বিন হাদীর মাথা বরাবর গুলি করে। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর ১৫ ডিসেম্বর সোমবার এয়ার এম্বুলেন্সে করে সিংগাপুর নেওয়া হয়। অতঃপর গত ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১০-টায় সিংগাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন।
ওছমান বিন হাদী ছিলেন জুলাই বিপ্লবের আইকনিক ফিগার। ভারতীয় আগ্রাসন ও আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ে অন্যতম নায়ক। হাদী এক দুরন্ত সাহসী ও অকুতোভয় দ্রোহের নাম। অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। জুলাই বিপ্লবের পর তরুণ নেতৃত্বের সবাই যখন রাজনৈতিক দল গঠন কিংবা ক্ষমতার বলয়ে ঢোকার চেষ্টা করছেন, তখন ওছমান হাদি নীরবে অন্যরকম এক লড়াই শুরু করেন। তিনি একঝাঁক তরুণকে সাথে নিয়ে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নাম দিয়ে কালচারাল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের অন্যতম একটি সেক্টর হ’ল এদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। সাংস্কৃতিক মঞ্চগুলো ব্যবহার করে ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার ক্ষেত্র তৈরি করা হবে। তাই তাঁর লড়াইয়ের একটি লক্ষ ছিল সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টদের রুখে দেওয়া। অল্পদিনের মধ্যে তাঁর এই ইনকিলাব মঞ্চ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে রীতিমতো ঝড় তুলে দেয়।
ওছমান বিন হাদী ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে ওছমান ভর্তি হন ঢাবিতে। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়াশুনার খরচ চালিয়েছেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকাও পালন করেন। একসময় ইংরেজী শেখার কোচিং সেন্টার ‘সাইফুরস’-এ শিক্ষকতা করতেন। ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন। একাধিক বইও লিখেছেন। রাজনীতির মঞ্চে তিনি যেমন ছিলেন তেজস্বী, রাজপথে যেমন আকাশ কাঁপিয়ে দ্রোহের স্লোগান দিতেন, তেমনি টেলিভিশন টক শো তে যুক্তিনির্ভর আলোচনায়ও খ্যাতি ছিল তাঁর। একই সঙ্গে ছিলেন কবি, ছিলেন আবৃত্তিকার। জন্ম ঝালকাঠি যেলার নলছিটিতে। বাবাও ছিলেন আলেম, স্থানীয় এক মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল ও খতীব।
ওছমান বিন হাদী অল্পদিনেই তাঁর সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, বলিষ্ঠতা ও আমানতদারিতা দিয়ে কোটি মানুষের মন জয় করেছিলেন। তাঁর দ্ব্যর্থহীন উক্তিগুলো এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে বার বার ঝংকৃত হবে। ‘জান দিব, তবুও জুলাই দিব না।’ ‘আগামী ৫০ বছর বাঁচলাম কোন ইমপ্যাক্ট তৈরি হ’ল না আমাকে দিয়ে, দেশের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, উম্মাহর জন্য। কিন্তু ধরুন আমি পাঁচ বছর বাঁচলাম সেটার মধ্য দিয়ে যদি আগামী ৫০ বছরের ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়, তাহ’লে অনেকদিন বেঁচে থাকায় কি সাফল্য বলেন?...আমরা সারা দেশের ৫৬ হাযার বর্গমাইল হাঁটতে চাই। আমরা ইনছাফের চাষাবাদ করতে চাই। একটা স্বাধীন সার্বভৌমত্বের সততার বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই’।
একটি টক শো-তে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনার কি মনে হয়? এই জুলাইয়েও যদি আমরা একটি ইনছাফের রাষ্ট্র বানাইতে না পারি, ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধের রাষ্ট্র, আগামী একশ বছরে কি বাংলাদেশের মানুষ এই রাষ্ট্র বাঁচাইতে গিয়া আর জীবন দেয়ার সাহস করবে?’ তিনি বলেন, ‘লম্বা সময় রাজনীতি করার জন্য আমরা আসিনি, আমরা রাজনীতির গতিপথ বদলানোর জন্য এসেছি’।
তিনি বলতেন, ‘ফ্যাসিজম একটি দল নয়। ফ্যাসিজম একটি মানসিকতা।’ ‘জীবন মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচাই জীবন।’ ‘ভয়কে যদি রাজনীতির ভিত্তি বানানো হয়, তাহলে রাষ্ট্র একদিন জেলখানা হয়ে যাবে।’ ‘আল্লাহ অন্যায়ের সঙ্গে নেই, এই বিশ্বাসটাই আমার রাজনীতি।’
ওছমান হাদী চেয়েছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে, যে বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করবে না, যে বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত, যেখানে সূদ, ঘোষ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুন, রাহাজানি ও যুলুমের রাজনীতি থাকবে না। মাত্র ৩২ বছরের জীবনে তিনি দেখিয়ে গেছেন, রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে আদর্শ। কোটি টাকার নির্বাচনী সংস্কৃতির বিপরীতে তিনি শূন্য হাতে মানুষের কাছ গিয়েছেন। মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছে, আর সে বিশ্বাসের প্রতিটি পয়সার হিসাব তিনি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
তিনি মৃত্যুকে কখনো ভয় পেতেন না। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুকে ভয় পাই না, ভয় পাই যদি বেঁচে থেকেও চুপ থাকতে হয়।’ তিনি বলতেন, ‘মৃত্যুর ফায়ছালা জমিনে না, আসমানে হয়। আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে। তার সন্তান লড়বে। যুগ-যুগান্তরে আযাদের সন্তানরা স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখবেই। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা তো শাহাদতের জন্যই মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি।’ তিনি বলেন ‘আল্লাহ ছাড়া এই যমীনের নীচে আর কাউকে ভয় পাইনা। আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং ইনছাফ এবং সততার জন্য লড়াই করব। এই লড়াই আমাদের জিহাদ ইনশাআল্লাহ। আর যদি আমি মরে যাই, আমি শহীদ হয়ে যাই, আমার ডান পাশের ভাই-বোনেরা এই লড়াই যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন চালায়ে নিবে ইনশাআল্লাহ।’
ওছমান হাদীর জনপ্রিয়তা টের পাওয়া যায় তাঁর জানাযায় লক্ষ লক্ষ জনতার ঢল দেখে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে এত লোকের সমাগম কোন জানাযায় হয়নি। বহু বোন, বহু মা তাঁর বিয়োগ ব্যথায় অঝোর নয়নে কেঁদেছেন। তেমনি একজন নারী ডাক্তারের আড়ষ্ট কণ্ঠের কথাগুলো এটিএন বাংলার ক্যামেরায় ধরা পড়ে। ওছমান বিন হাদীর কবরের কাছে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি জানি না বাংলাদেশে আর কতদিন পরে এরকম একজন ওছমান হাদী আসবে? যে আমার কেউ না কিন্তু তার জন্য আমার বুক ভেঙ্গে যাইতেছে, চোখ দিয়ে পানি পড়তেছে, মুনাজাতে আমার চোখের পানিতে আমার জায়নামায ভিজে যাচ্ছে। আমি জানি না কেন এত কষ্ট মনে হয়। সে আমার কিছুই না, আমার আত্মীয় না, পরিজন না, আমি একজন ডাক্তার, ঢাকা মেডিকেলে চাকুরী করি। তার যে সততা, তার যে সিমপ্লিসিটি (Simplicity), তার যে দেশপ্রেম, সে রয়েছে আমাদের বুকের মধ্যে। তাকে হারানোর পর মনে হচ্ছে যে বুকের ভিতরটা খালি হয়ে গেছে। ওর জন্য অনেক কষ্ট হচ্ছে, আমি আসলে থাকতে পারছিলাম না, সেজন্য আমি অফিস শেষ করে চলে আসলাম ওর সাথে দেখা করার জন্য। প্রায় আসব এর পর থেকে ওছমানের সাথে দেখা করার জন্য। আমি চাই আমার সন্তানরা ওছমানের মত দেশপ্রেম নিয়ে বেঁচে থাকুক। ৩২ বছর বয়সে সে যা করেছে একটা মানুষ ৮০ বছর বয়সেও তা করতে পারবে না।’
পরিশেষে বলব, ওছমান হাদী যুগ-যুগান্তর ধরে বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জুড়ে সততা ও ইনছাফের জয়গান গেয়ে যাবে। থাকবে বাংলার মুক্তিকামী মানুষের কাছে অমর হয়ে। অতএব আর রক্ত নয়, ওছমান হাদীর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আঠারো কোটি মানুষের কণ্ঠে আবারো গর্জে উঠুক এই দাবী, আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা চাই! একটি ইনছাফের রাষ্ট্র চাই! একটি মানবিক মূল্যবোধের রাষ্ট্র চাই!!