কখনো কি এমন হয়েছে যে, বিশেষ কোন কাজে একটি ঘরে ঢুকলেন, কিন্তু ঢোকার পরই ভুলে গেলেন আপনি কেন এসেছিলেন? কিংবা পরীক্ষার হলে বসে খুব পরিচিত একটি প্রশ্নের উত্তর কিছুতেই মনে পড়ছে না? দৈনন্দিন জীবনে চাবি হারিয়ে ফেলা বা পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়ার মতো ঘটনা আমাদের সবার সাথেই ঘটে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘বিস্মৃতি’ (Forgetting) বা ভুলে যাওয়া, যা মানুষের স্মৃতি প্রক্রিয়ার (Memory Process) একটি স্বাভাবিক ঘটনা বা বৈশিষ্ট্য। এই প্রক্রিয়ায় আমরা যেমন প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখি, তেমনি অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু ভুলেও যাই। আমরা যা শিখি এবং পরবর্তীতে মনে করতে পারি, তা হ’ল ‘স্মৃতি’। আর যা মস্তিষ্কে সংরক্ষণ বা পুনরায় মনে করতে ব্যর্থ হই, তা-ই ‘বিস্মৃতি’। সহজভাবে বলা যায়, শেখা কোন তথ্যের যে অংশটুকু স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে না বা পরবর্তী সময়ে মনে করা যায় না, সেটিই বিস্মৃতি। বিশেষ করে এই বিষয়টির সাথে বেশী পরিচিত আমাদের শিক্ষার্থীরা। প্রতিনিয়ত তাদেরকে নিত্য নতুন বিভিন্ন বিষয় ও তথ্য শিখতে হয়। ক্লাসের পড়া মুখস্থ করতে হয় ও পরীক্ষা দিতে হয়। পরীক্ষার সময় অনেক জানা বিষয়ও তখন মনে আসে না। ফলে পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নোত্তর সুন্দর ও মনের মতো করে উপস্থাপন করতে পারে না। মানুষ আসলে ভুলে যায় কেন? এর পেছনে একক কোন কারণ নেই। মূলত একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও পরিবেশগত কারণে আমরা ভুলে যাই। বিষয়টির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে এই প্রবন্ধে আমরা বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণসমূহ জানা ও উপলব্ধি করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার মনোবৈজ্ঞানিক কারণসমূহ :
আমরা ভুলে যাই কেন? এই প্রশ্নটি যেমন সকলের মনেই জাগ্রত হয় তেমনি প্রশ্নটি মনোবিজ্ঞানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। প্রকৃতপক্ষে বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার পেছনে একক কোন কারণ কাজ করে না। সাধারণত যে উদ্দীপক তথ্য বা অভিজ্ঞতা স্পষ্ট, অর্থবহ, সুসংগঠিত, দীর্ঘস্থায়ী এবং পুনঃপুনঃ অনুশীলিত হয়, সেগুলো স্মৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকে। অন্যদিকে অস্পষ্ট, অপ্রাসঙ্গিক বা কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজেই বিস্মৃত হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও বিস্মৃতির পেছনে আরও নানা কারণ রয়েছে, যা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হ’ল।-
১. মনোযোগের ঘাটতি ও তথ্য প্রক্রিয়াজাত যথাযথ না হওয়া :
আমরা সাধারণত সেই বিষয়গুলোই ভুলে যাই যেগুলো আমরা অতীতে শিখেছি। যে বিষয়ে আমাদের কোন ধারণাই নেই বা যা আমরা কখনো পড়িনি, তা ভুলে যাওয়ার তো কোন প্রশ্নই আসে না! মূল সমস্যাটা হয় শেখার সময়। কোন কিছু পড়ার বা শেখার সময় আমরা যদি পুরোপুরি মনোযোগ না দেই, তবে সেই তথ্য আমাদের স্মৃতিভান্ডারে সঠিকভাবে জমা হ’তে পারে না। ফলে পরবর্তীতে তা মনে করতে বেশ কষ্ট হয় বা আমরা সহজেই তা ভুলে যাই। মানুষের স্মৃতিভান্ডার মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। যেমন সংবেদী স্মৃতি, স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি ও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি।
সংবেদী স্মৃতি (Sensory Memory) : এটি চোখের দেখা বা কানে শোনার মতো অনুভূতিগুলোকে এক সেকেন্ডরও কম সময়ের জন্য ধরে রাখে।
স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি (Short-term Memory) : এই স্তরে কোন তথ্য সাধারণত ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর যদি সেই তথ্য নিয়ে আমরা আর না ভাবি বা অনুশীলন না করি, তবে তা মুছে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি (Long-term Memory) : এই স্তরে পৌঁছানো তথ্য বছরের পর বছর এমনকি সারাজীবন পর্যন্ত আমাদের মনে থাকতে পারে এবং এর ধারণক্ষমতাও অসীম। গবেষণায় দেখা গেছে তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এনকোডিং (Encoding) পদ্ধতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কে তথ্য মওজূত করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘এনকোডিং’ বা সংকেতায়ন। এনকোডিং হ’ল এমন একটি প্রক্রিয়া, যা বাইরের যেকোন তথ্যকে একটি বিশেষ সংকেত বা কোডে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে জমা রাখে, যাতে পরবর্তীতে আমরা তা সহজেই মনে করতে পারি। এই সংকেত বিভিন্ন রকম হ’তে পারে। যেমন:
দৃশ্যগত সংকেত : কোন কিছুর ছবি, আকার বা রঙের মাধ্যমে মনে রাখা।
শ্রুতিগত বা ধ্বনিগত সংকেত : কোন শব্দের উচ্চারণ বা শব্দের ঝংকারের মাধ্যমে মনে রাখা।
অর্থগত সংকেত : যখন আমরা কোন কিছুর অর্থ বা মূল ধারণাটি বুঝে তা মনে রাখি।
উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা নতুন একটি শব্দ মুখস্থ করতে যাই, তখন হয়তো আমরা শব্দটির বানান, উচ্চারণ বা এর অর্থের ওপর জোর দেই-এটাই হ’ল সংকেতায়ন। আর এই সংকেতায়ন সঠিকভাবে হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন মনোযোগের। শেখার সময় সামান্য অমনোযোগী হ’লেই মস্তিষ্কের এই সংকেত তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমরা খুব সহজেই শেখা বিষয় ভুলে যাই।
২. স্মৃতির ক্ষয় বা সময়ের সাথে মুছে যাওয়া (Decay) :
স্মৃতির ক্ষয় বলতে বোঝায় কোন কিছু দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার ফলে মস্তিষ্ক থেকে তা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। আমরা যা শিখি বা মুখস্থ করি, তা যদি দীর্ঘদিন চর্চা বা অনুশীলন (Rehearsal) না করি তবে তা একসময় আমাদের স্মৃতিভান্ডার থেকে হারিয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একেই স্মৃতির ক্ষয় বলা হয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যখন নতুন কিছু শিখি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের শারীরবৃত্ত্বীয় পরিবর্তন ঘটে বা স্মৃতির দাগ (Memory trace) তৈরি হয়। কিন্তু সেই শেখা বিষয়টি যদি পরবর্তীতে আর কাজে লাগানো না হয় বা চর্চায় না থাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্কের সেই দাগটি নিজে থেকেই মিলিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে কালক্রমে আমরা আমাদের শেখা বিষয়গুলো আর মনে করতে পারি না এবং তা সম্পূর্ণ ভুলে যাই।
৩. শিক্ষণ প্রতিবন্ধকতা (Interference) :
আমাদের স্মৃতিভান্ডারের কোন তথ্য যখন অন্য আরেকটি তথ্য মনে করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে, তখন তাকে প্রতিবন্ধকতা বলা হয়। অর্থাৎ একটি স্মৃতি যখন অন্য স্মৃতিকে মনে করতে বাধা দেয়, তখন আমরা ভুলে যাওয়ার সমস্যায় পড়ি। এই প্রতিবন্ধকতা বা হস্তক্ষেপ মূলত দুই ধরনের হ’তে পারে।
ক. পশ্চাৎমুখী বাধা (Retroactive Interference)। যেমন নতুন শেখা কোন বিষয় যখন আগের শেখা বিষয়কে মনে করতে বাধা দেয়। সহজ কথায়, নতুন স্মৃতির চাপে পুরনো স্মৃতি ভুলে যাওয়া। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা ডেভিড স্টার জর্ডানের (David Starr Jordan) কথা ধরা যাক। তিনি যখন তাঁর শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন নাম মুখস্থ করতে শুরু করলেন, তখন তিনি আগের শেখা বিভিন্ন মাছের নাম ভুলে যেতে শুরু করলেন।
খ. সম্মুখমুখী বাধা (Proactive Interference)। যেমন আগের শেখা কোন বিষয় যখন নতুন কোন বিষয় মনে রাখতে বাধা দেয়। অর্থাৎ পুরনো স্মৃতির প্রভাবে নতুন স্মৃতি মস্তিষ্ক ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না। ধরুন, আপনি নতুন একটি ফোন নম্বর পেয়েছেন এবং সেটি মুখস্থ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আপনার স্মৃতিতে আগে থেকে জমা থাকা পুরনো ফোন নম্বরটি বারবার মনে পড়তে থাকে। যা নতুন নম্বরটি মনে রাখার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
মূলত আগে শেখা বিষয় এবং পরে শেখা বিষয়ের মধ্যে যত বেশী মিল বা সাদৃশ্য থাকে, আমাদের মস্তিষ্কে এই দ্বন্দ্ব বা প্রতিবন্ধকতার পরিমাণও তত বেশী বৃদ্ধি পায়।
৪. প্রেষণা বা আগ্রহের ঘাটতি (Lack of Motivation) :
যেকোন কাজ করার প্রতি আমাদের যে ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, আগ্রহ বা ভেতরের তাড়না কাজ করে, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় ‘প্রেষণা’ বা মোটিভেশন (Motivation)। প্রেষণা মূলত মানুষের ভেতরের এমন একটি শক্তি, যা তাকে যেকোন কাজ করতে অনুপ্রেরণা দেয় বা চালিত করে। কোন কিছু শেখার বা পড়ার সময় যদি আমাদের এই প্রেষণা বা আগ্রহের ঘাটতি থাকে, তবে সেই বিষয়ে আমাদের শেখা বা উপলব্ধি কখনোই সম্পূর্ণ হয় না। আর কোন বিষয় পুরোপুরিভাবে না শিখলে তা খুব দ্রুত ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, একজন শিক্ষার্থীর যদি গণিতের প্রতি মোটেও আগ্রহ না থাকে, তবে সে যতই চেষ্টা করুক না কেন গণিতের সূত্র বা নিয়মগুলো সে সহজেই ভুলে যাবে। ফলে পরীক্ষার খাতায় সে ভালো লিখতে পারবে না এবং তার ফলাফলও সন্তোষজনক হবে না। অর্থাৎ আগ্রহের অভাবেই স্মৃতি তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
৫. অবদমন বা স্মৃতির আত্মগোপন (Repression) :
মানুষ তার অতীতের সব অভিজ্ঞতা সমানভাবে মনে রাখতে পারে না। আমাদের জীবনে এমন অনেক স্মৃতি থাকে, যেগুলো মনে পড়লে আমরা মনে মনে আনন্দ পাই বা আমাদের ইগো আত্মতৃপ্তি লাভ করে। আবার এমন অনেক অতীত অভিজ্ঞতা থাকে, যা আমাদের মনে তীব্র কষ্ট বা পীড়া দেয়। যেসব স্মৃতি বা ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাবোধ বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য হুমকিস্বরূপ, কিংবা যেগুলো আমাদের আত্মসম্মানের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো মনে পড়লে মনের ভেতর এক ধরনের উদ্বেগ, হীনম্মন্যতা ও অস্বস্তি তৈরি হয়। মানসিক এই কষ্ট থেকে বাঁচতে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই অপ্রীতিকর ও কষ্টদায়ক স্মৃতিগুলোকে জোর করে তার অবচেতন মনে (Unconscious mind) চাপা দিয়ে রাখে।
দীর্ঘ দিন ধরে অবচেতন মনে এভাবে চাপা পড়ে থাকার ফলে একসময় এই স্মৃতিগুলো আর সহজে আমাদের সচেতন মনে ফিরে আসে না। ফলে আমরা ধীরে ধীরে তা সম্পূর্ণ ভুলে যাই। মানসিক প্রশান্তির স্বার্থে বা কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য স্মৃতিকে এভাবে লুকিয়ে ফেলার এই প্রক্রিয়াকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘ইচ্ছাকৃত বিস্মৃতি’ (Motivated forgetting) বা অবদমন বলে আখ্যায়িত করেছেন।
৬. সংকেত-নির্ভর বিস্মৃতি (Cue-dependent Forgetting) :
অনেক সময় মস্তিষ্কে তথ্য জমা থাকা সত্ত্বেও কেবল উপযুক্ত সংকেতের অভাবেই আমরা তা ভুলে যাই। অর্থাৎ স্মৃতি থেকে কোন কিছু টেনে বের করার জন্য আমাদের একটি নির্দিষ্ট সংকেত (Cue) বা যোগসূত্রের প্রয়োজন হয়, যার অভাবে ঘটে সংকেত-নির্ভর বিস্মৃতি। উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আপনি আপনার বাসা বা অফিসের চাবির গোছা কোথায় রেখেছেন তা বেমা‘লূম ভুলে গেছেন। সারাদিন আপনি কোথায় কোথায় ঘুরেছেন তা মনে মনে না ভাবা পর্যন্ত চাবির কথা কিছুতেই মনে পড়ে না। কিন্তু যখনই ভাবতে ভাবতে নির্দিষ্ট কোন জায়গার কথা যেমন লাইব্রেরীর কথা স্মরণ করেন, ঠিক তখনই মনে পড়ে যায় যে চাবিগুলো তো আপনি লাইব্রেরীর ডেস্কের ওপর রেখে এসেছেন! এখানে ‘লাইব্রেরী’ নামক স্থানটি আপনার স্মৃতি পুনরুদ্ধারের একটি শক্তিশালী সংকেত বা যোগসূত্র হিসাবে কাজ করেছে। উপযুক্ত এই সংকেতটি না পেলে চাবির অবস্থান হয়তো আপনার আর মনেই পড়ত না।
৭. আবেগী প্রভাব বা অসম্পূর্ণ কাজের চাপ :
ব্যক্তি যখন কোন কাজ সম্পন্ন করতে উদ্বুদ্ধ হন, তখন তাঁর মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়। আর কাজটি সফলভাবে শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেই চাপের উপশম ঘটে। কিন্তু কাজটি যদি মাঝপথে ব্যাহত বা স্থগিত হয়ে যায়, তবে সেই মানসিক চাপটি দীর্ঘক্ষণ বজায় থাকে। এর ফলে সেই অসমাপ্ত কাজ-সংক্রান্ত স্মৃতিগুলো মনে রাখার প্রবণতা প্রবল হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানী জেইগারনিক (Zeigarnik) ১৯২৭ সালে সর্বপ্রথম বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি তাঁর পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের দিয়ে ১৮ থেকে ২২টি কাজের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিয়েছিলেন। এর মধ্যে অর্ধেক কাজ তারা পুরোপুরি শেষ করেছিলেন এবং বাকী অর্ধেক কাজ পরীক্ষক মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছিলেন। কাজ শেষ হওয়ার বা মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঠিক পরপরই অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল তারা যেন যথাসম্ভব কাজগুলির নাম মনে করার চেষ্টা করে।
ফলাফলে দেখা যায়, যে কাজগুলো মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর কথা মনে রাখার হার ছিল অনেক বেশী। এই অসামান্য গবেষণাটি ইতিহাসে ‘জেইগারনিক ইফেক্ট’ (Zeigarnik Effect) নামে পরিচিত। এই ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণার ফলাফল থেকে আমরা জানতে পারি যে, যেসব কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়ে যায় মানুষের মস্তিষ্ক তা দ্রুত ভুলে যায়। অর্থাৎ অসম্পূর্ণ কাজের চেয়ে সম্পূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে বিস্মৃতির পরিমাণ তুলনামূলক বেশী হয়ে থাকে।
৮. শারীরিক ও মানসিক রোগ-ব্যাধি বা অসুস্থতা :
বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে আমরা অনেক সময় আমাদের জানা বিষয়গুলো ভুলে যাই। মস্তিষ্কে আঘাত, ক্ষত বা টিউমার এবং স্ট্রোকের মতো মারাত্মক কারণে আমাদের স্মৃতিশক্তি অনেকাংশে লোপ পেতে পারে। মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে যে স্মৃতিভ্রম বা ‘অ্যামনেশিয়া’ (Amnesia) দেখা দেয়, তা মূলত দুই প্রকার। ক. পশ্চাৎমুখী স্মৃতিভ্রম (Retrograde Amnesia)। এই অবস্থায় একজন ব্যক্তি মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার আগের ঘটনাগুলো ভুলে যান। খ. সম্মুখমুখী স্মৃতিভ্রম (Anterograde Amnesia)। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি আঘাত পাওয়ার পরের কোন নতুন ঘটনার স্মৃতি আর ধরে রাখতে পারেন না।
এছাড়া ‘অ্যালঝেইমার’ (Alzheimer's Disease) হ’ল এক প্রকার স্নায়ুবিক ব্যাধি, যার কারণে মানুষের স্মৃতিশক্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এই রোগটি সাধারণত পরিণত বয়সে বা বয়স্কদের মধ্যেই বেশী দেখা যায়।
৯. মাদকাসক্তি :
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য ব্যবহারের ফলে তা মস্তিষ্কের কাঠামো ও স্নায়ুবিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে স্মৃতি গঠন, সংরক্ষণ ও পুনরায় স্মরণ করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হয়। মাদকাসক্তি মূলত মস্তিষ্কের ‘হিপোক্যাম্পাস’ ও ‘প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশের কার্যক্ষমতা ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতিশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একেক ধরনের মাদক মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তিকে একেকভাবে নষ্ট করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী অ্যালকোহল বা মদ পানের ফলে মানুষের মধ্যে ‘করসাকফ সিনড্রোম’ (Korsakoffs syndrome) দেখা দিতে পারে, যা স্মৃতিভ্রম বা ভুলে যাওয়া রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়মিত গাঁজা বা ক্যানাবিস সেবনে মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানুষের সাময়িক স্মৃতি (Short-term memory) দুর্বল হয়ে পড়ে। মেথামফেটামিন (Methamphetamine)-এর মতো ক্ষতিকর মাদক দীর্ঘকাল সেবন করলে সণায়ুতন্ত্রে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়, যা মারাত্মক স্মৃতিভ্রম ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নষ্ট করে।
১০. স্ক্রিন আসক্তি ও গুগল ইফেক্ট :
টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মস্তিষ্কের গঠনকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করলেও, এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও স্নায়ুবিক সংযোগের (Neural connection) ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে পরোক্ষভাবে মানুষের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাছাড়া রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ডিজিটাল ডিভাইস হ’তে নির্গত নীল আলো (Blue light) মস্তিষ্কের ‘মেলাটোনিন’ নামক হরমোন ক্ষরণে বাধা দেয়। ফলে ঘুমের গুণগত মান মারাত্মকভাবে কমে যায়। আর পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম ব্যাহত হ’লে তা সরাসরি আমাদের স্মৃতিশক্তির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এর পাশাপাশি বর্তমানে আরেকটি ভয়ংকর বিষয় দেখা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘গুগল ইফেক্ট’ (Google effect)। মানুষ যখন জানে যে, যেকোন তথ্য পরবর্তীতে ইন্টারনেটে খুঁজলেই সহজে পাওয়া যাবে, তখন তারা সেই তথ্যটি নিজে মনে রাখার চেষ্টা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এর বদলে তথ্যটি ইন্টারনেটের কোথায় পাওয়া যাবে, তারা কেবল সেটাই মনে রাখে। দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেটের ওপর এই নির্ভরশীলতা মানুষের নিজস্ব স্মরণশক্তি বা স্মৃতি ব্যবহারের স্বাভাবিক প্রবণতা কমিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো ছাড়াও মানুষের তীব্র আবেগ, পরিবেশের ভিন্নতা, অর্থ না বুঝে কোন বিষয় অধ্যয়ন করা ইত্যাদি কারণেও আমরা অনেক সময় তথ্য বিস্মৃত হই বা ভুলে যাই। তাই ভুলে গেলেই নিজেকে অক্ষম ভাবা উচিত নয়; বরং কারণ চিহ্নিত করা যরূরী। তবে বিস্মৃতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বা দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটালে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ড. মুহাম্মাদ তরুণ হাসান
* সহকারী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয়।
তথ্যসূত্র :
১. Weiten, W. (2017). Psychology Themes and Variations (10th Ed.), Cengage Learning, 20 Channel Center Street, Boston, MA 02210, USA
২. Feldman, R. S. (2011). Understanding Psychology (10th Ed.), The Mc Graw-Hill Companies, Inc. 1221 Avenue of the Americas, New York, NY 10020.
৩. Ali, M. R. (1971). Psychology the Science of Behaviour, Mullick Brothers, Dhaka, p. 300-308.
৪. মো: আফছার উদ্দীন (২০০৭), সাধারণ মনোবিজ্ঞান। তাম্রলিপি, ৩৮/২-ক বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০।
৫. Scott, J. C., Woods, S. P., Matt, G. E., Meyer, R. A., Heaton, R. K., Atkinson, J. H., & Grant, I. (2007). Neurocognitive effects of methamphetamine: a critical review and meta-analysis. Neuropsychology review, 17(3), 275-297.