শী‘আদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অপতৎপরতা

ধর্মীয় অপতৎপরতার মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান হরণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর শী‘আরা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু করে। নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদকে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে তারা একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ড ও সাম্রাজ্যের তীব্র অভাববোধ করে। ফলে একটি স্থায়ী রাষ্ট্র গঠনে তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। আববাসীয় যুগে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দী থেকেই তাদের এই রাজনৈতিক অপতৎপরতা প্রকট আকার ধারণ করে। নিম্নে যুগে যুগে তাদের এমন কিছু অপতৎপরতার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হ’ল।-

(ক) আববাসীয় যুগে শী‘আদের অপতৎপরতা :

১. উত্তর আফ্রিকায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা :

বিশ্বে তখন মুসলিমদের তৃতীয় খেলাফত ব্যবস্থা আববাসীয় খেলাফত সুপ্রতিষ্ঠিত। তা সত্ত্বেও শী‘আরা নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠে। অমুসলিম অঞ্চলগুলোতে ইসলাম প্রচার বা বিজয়ী পতাকা উড্ডীন করার পরিবর্তে তারা মুসলিম খেলাফতের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোই দখল করতে চায়। তাদের হাতে লাখ লাখ সুন্নী আলেম, ফক্বীহ ও মুহাদ্দিছ নির্মমভাবে নিহত হন এবং সাধারণ সুন্নী মুসলমানরা দেশত্যাগে বাধ্য হন। তাদের এই আচরণই কি প্রমাণ করে না যে, তারা মুসলমানদের বন্ধু তো নয়ই; বরং কাফেরদের চেয়েও জঘন্য মুনাফিক শত্রু?

এই ধারাবাহিক দমন-পীড়ন ও ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ শী‘আরা (ইছনা আশআরিইয়া সম্প্রদায়) ২৯৭ হিজরীতে (৯০৯ খ্রি.) উত্তর আফ্রিকায় (তিউনিসিয়া) ‘উবাইদিয়্যাহ’ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়। হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ)-এর বর্ণনানুযায়ী তাদের প্রথম শাসক ছিল সালামিয়ার হাদ্দাদ বংশীয় ইহুদী বংশোদ্ভূত ‘উবাইদ’। উত্তর আফ্রিকায় এসে সে নিজেকে ‘উবায়দুল্লাহ’ নামে পরিচয় দেয় এবং আলী (রাঃ) ও ফাতেমা (রাঃ)-এর বংশধর তথা প্রতীক্ষিত মাহদী হিসাবে মিথ্যা দাবী করে। ৪র্থ শতকের পর অনেক আলেম ও ইমামগণ তার এই ব্যাপারগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। একদল অজ্ঞ মানুষের সমর্থন নিয়ে এই মিথ্যা দাবীদার ঐ অঞ্চলে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে সে ‘মাহদিয়া’ নামে একটি শহরের গোড়াপত্তন করে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং রাফেযী মতবাদ প্রচার করে নিজের কুফরী আদর্শ ছড়াতে থাকে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র মুহাম্মাদ ও তারপর মানছূর ইসমাঈল শাসনভার গ্রহণ করে। সর্বশেষ খলীফার দায়িত্ব পালন করে তার চাচাতো ভাই ‘আযিদ আব্দুল্লাহ’। সে-ই ছিল উবাইদী শী‘আ সাম্রাজ্যের সর্বশেষ খলীফা। পর্যায়ক্রমে ১৪ জন শাসক প্রায় ১৮০ বছর এই সাম্রাজ্য পরিচালনা করে। পক্ষান্তরে উমাইয়া খলীফার সংখ্যাও ছিল ১৪ জন। তারা শাসন করেছিলেন মাত্র ৯০ বছর।[1] এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে, সে যুগে তারা কতটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিল। যার আধুনিক দৃষ্টান্ত হ’ল বর্তমান ইরান।

২. উত্তর আফ্রিকায় তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি :

বিশ্বের বুকে আফ্রিকার মাটিতেই শী‘আরা সর্বপ্রথম একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডভিত্তিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হয়। আববাসীয় খেলাফতের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছিল। শাসনক্ষমতা দখলের পর তারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসারীদের ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাদের সেই অপকর্মের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হ’ল।-

ক. উবায়দুল্লাহর নিজেকে রাসূল দাবী এবং সুন্নী আলেম ও সাধারণ মানুষ হত্যা :

পরিস্থিতি এমন এক চরম আকার ধারণ করেছিল যে, রাফেযী উবায়দুল্লাহ নিজেকে রাসূল হিসাবে দাবী করে বসে। মুহাম্মাদ ইবনু খোরাসানের বর্ণনানুসারে, উবায়দুল্লাহ যখন রাক্কাদাহ[2]-তে পৌঁছে, তখন সে কায়রাওয়ান[3] থেকে ইবনুল বারদূন (রহঃ) ও আবুবকর ইবনু হুযাইল (রহঃ)-কে তলব করে। তারা তার রাজকীয় দরবারে উপস্থিত হয়। সে তার এক অনুচরকে কানে কানে নির্দেশ দেয়। অনুচরটি শায়খদ্বয়কে জিজ্ঞেস করে, তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, ইনি আল্লাহর রাসূল? তাঁরা দ্ব্যার্থহীনভাবে জবাব দেন,والله لو جاءنا هذا والشمس عن يمينه والقمر عن يساره يقولان: إنه رسول الله، ما قلنا ذلك، ‘আল্লাহর কসম! যদি সে আমাদের ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চন্দ্রও এনে দেয়, আর তারা উভয়েও যদি বলে যে সে আল্লাহর রাসূল, তবুও আমরা এরূপ কথা বলব না’। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সে দু’জনকেই হত্যা করার নির্দেশ দেয়।

অন্য একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, আবু আবদুল্লাহ আশ-শী‘ঈর কাছে কিছু শী‘আ অভিযোগ করেছিল যে, এই দুই আলেম উবাইদী রাষ্ট্রের সমালোচনা করে এবং আলী (রাঃ)-কে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠ মনে করে না। ফলশ্রুতিতে তাদের উভয়কে কারারুদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে কায়রাওয়ানের শাসককে নির্দেশ দেওয়া হয় ইবনু হুযাইলকে ৫০০ বেত্রাঘাত করতে এবং ইবনুল বারদূনের গর্দান উড়িয়ে দিতে। কিন্তু শাসক ভুলবশত ইবনু হুযাইলকে হত্যা করে এবং ইবনুল বারদূনকে বেত্রাঘাত করে। পরদিন ইবনুল বারদূনকেও হত্যার জন্য প্রস্ত্তত করা হয়। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, أَترجعُ عَنْ مَذْهَبِك؟ ‘তুমি কি তোমার মতাদর্শ থেকে ফিরে আসবে?’ তিনি কণ্ঠে উত্তর দেন, أَعنِ الإِسْلاَم أَرجِع؟ ‘আমি কি ইসলাম থেকে ফিরে আসব’?

কেউ কেউ বলেন, উবায়দুল্লাহর নির্দেশে কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য ইবনুল বারদূনকে (রহঃ) পা দিয়ে পিষ্ট করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।[4]

ইমাম আবুল হাসান আল-কাবিসী (৩২৪-৪০৩হি.) বলেন, ‘মাহদিয়া শহরে উবাইদিদের অনুপ্রবেশের পর থেকে তাদের ‘দারুল বাহর’ নামক কারাগারে প্রায় চার হাযার আলেম, আবেদ ও নেককার মানুষ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আর যারা কারাগারের বাইরে কায়রাওয়ানের রাস্তায় গাছে ঝুলিয়ে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাদের হিসাব এর বাইরে’। আবু মুহাম্মাদ আল-ওয়ারদানীর মতো অসংখ্য আলেম, যারা ইসলামবিরোধী ফিৎনা দমনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিলেন, নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তাদের নাম ও অবদান ইতিহাসের পাতায় সেভাবে লেখা হয়নি।[5] সেই যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আলেমদের হত্যার এই ধারা অব্যাহত আছে। সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের মতো অঞ্চলগুলো আজও শী‘আদের হাতে অসংখ্য সুন্নী আলেমের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে।

খ. আহলুস সুন্নাহর দাওয়াতে প্রতিবন্ধকতা ও স্বীয় মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা :

তারা আহলুস সুন্নাহ মতাদর্শী আলেমদেরকে মসজিদে দারস-তাদরীস ও ইলমের প্রচার-প্রসার করতে বাধা দিত। ছাত্রদের একত্রে নিয়ে কোন বৈঠকও করতে বাধা দিত। তখন বনু উবাইদের লোকদের ভয়ে লোকেরা ঘরের নিভৃত কোণে বসে কুরআন-সুন্নাহর কিতাবাদি অধ্যয়ন করতেন। বলা হয়ে থাকে আবু মুহাম্মাদ বিন আবু যায়েদ ও আবু মুহাম্মাদ বিন আল-বাত্তানসহ অন্যান্যরা কায়রাওয়ানের প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ আবুবকর ইবনে লাববাদ (রহঃ)-এর কাছে সঙ্গোপনে আসতেন। তারা বনু উবাইদের ভয়ে দুই রানের চিপায় এমনভাবে বইপত্র রাখতেন যে, তাদের রগে টান পড়ে যেত। বনু উবাইদ মানুষকে নিজেদের মতাদর্শ গ্রহণ করতে বাধ্য করত। যারা তাদের দাওয়াত গ্রহণ করত, তারা মুক্তি পেয়ে যেত। কখনো কখনো ব্যক্তি বিশেষকে ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করত। আর যে দাওয়াত পরিহার করত তাকে হত্যা করত। হাযার হাযার আলেম কেবল ইসলামী আদর্শ গ্রহণ এবং সুন্নাহর বিপরীত কর্মতৎপরতা প্রতিরোধ করার কারণে নিহত হন বা ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেন।[6]

তারা আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে সর্বক্ষণ দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখত। তারা মেষ, গাধার মাথা, দোকানপাট ও বাহক জন্তুর মাথায় স্থাপন করত। সেগুলোতে ছাহাবায়ে কেরামের নাম লিখত। এরা ছাহাবায়ে কেরামকে প্রকাশ্যে গালমন্দ করত। তারা মনে করত নবী করীম (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তারা মুরতাদ হয়ে গেছেন (নাঊযুবিল্লাহ)। তারা বাযারে বাযারে দাওয়াত দেওয়ার জন্য নিজেদের বিশেষ দা‘ঈ নিয়োগ করত। কেউ কোন ছাহাবীর ভালো গুণের কথা বললে কিংবা কাউকে আলী (রাঃ)-এর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করলে তাকে হত্যা করত বা কারাবন্দী করে রাখত।[7] এমনকি উবায়দীয়ারা বিদ্রোহ ও তাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের আশঙ্কায় জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিল। এজন্য তারা রাতের শুরুর ভাগে একটি শিঙ্গা বাজানোর ব্যবস্থা করেছিল। এরপর যে ব্যক্তিকে বাইরে পাওয়া যেত, তাকে হত্যা করা হ’ত। একইভাবে কোন আলেম মারা গেলে তাঁর জানাযায় যারা সমবেত হ’ত, তাদেরও তারা ছত্রভঙ্গ করে দিত।[8]

এছাড়াও তারা আহলুস সুন্নাহর আলেমদের রচিত গ্রন্থসমূহ ধ্বংস করেছিল এবং জনগণকে সেগুলো প্রচার ও আদান-প্রদান থেকে বিরত রেখেছিল। যেমনটি তারা আবু মুহাম্মাদ ইবনু আবী হাশিম আত-তুজীবী-এর গ্রন্থগুলোর সঙ্গে করেছিল। তিনি ৩৪৬ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁর কাছে সাত কান্তার (প্রায় ৩৫০-৪০০ কেজি) পরিমাণ গ্রন্থ ছিল, যেগুলোর সবই তাঁর নিজের হাতের লেখা ছিল। সেগুলো বনু উবায়দের শাসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষবশত সে পান্ডুলিপিগুলো নিয়ে নেয় এবং জনগণকে সেগুলো থেকে বিরত রাখে।

তারা তৎকালীন ফকবীহদের উপর ইমাম মালেকের মাযহাব অনুযায়ী ফতোয়া দেওয়াকে এমন অপরাধ হিসাবে গণ্য করত, যার জন্য বেত্রাঘাত, কারাবাস এমনকি কখনো কখনো মৃত্যুদন্ডও দেওয়া হ’ত। এই সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সন্ত্রাসবাদও চালানো হ’ত। নিহত ব্যক্তিকে কায়রাওয়ানের বাজারগুলোতে ঘুরিয়ে বেড়ানো হ’ত এবং ঘোষণা করা হ’ত, هذا جزاء من يذهب مذهب مالك ‘যে ব্যক্তি ইমাম মালেকের মাযহাব অনুসরণ করে, এটাই তার শাস্তি’। তারা কেবল তাদের নিজস্ব মাযহাব অনুসরণকারী ব্যক্তিকেই ফতওয়া দেওয়ার অনুমতি দিত।[9] তাদের এই ঘৃণ্য আচরণেই প্রকাশ পায় যে, তারা নিজেদেরকে দখলদার মনে করত। তাদের শাসন ক্ষমতা নিয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতো। তারা তাদের উত্তম আখলাক্ব ও আদর্শ দিয়ে জনগণের মন জয় করতে পারেনি। ঠিক আজকের যুগের গণতন্ত্রপন্থীরা যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে।

গ. আল্লাহর বিধানে হস্তক্ষেপ :

সেসময় তারা ফজরের আযান থেকে الصلاة خير من النوم বাদ দিয়ে তদস্থলে حي على خير العمل বাক্য সংযুক্ত করেছিল। মানুষকে রামাযানের ক্বিয়ামুল লাইল ছালাত পড়তে নিষেধ কছেছিল। বলা হয় বনী উবাইদের পক্ষে এই ছালাত আদায় করা বা কাউকে আদায় করতে দেখা দুঃসহ যন্ত্রণার বিষয় ছিল। তারা চাশতের ছালাত পড়তে নিষেধ করেছিল। মানুষকে ফিৎনায় ফেলার জন্য যোহরের ছালাতের সময় এগিয়ে দিয়েছিল। তারা জুম‘আর খুৎবায় ছাহাবায়ে কেরামকে গালিগালাজ করত। যদিও মানুষ সেটা মেনে নেয়নি। তাদের যুগে মসজিদগুলো বিরান করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের কোন কোন ইমাম রাক্কাদার[10] দিকে ফিরে ছালাত আদায় করত। উবায়দুল্লাহ যখন মাহদিয়ায় আগমন করে, তখন তারা সেদিকে ফিরে ছালাত আদায় করতে থাকে। আবার মাঝে মধে তারা মানুষকে শাওয়ালের চাঁদ দেখার আগেই ঈদুল ফিৎর উদযাপন করতে বাধ্য করত। বরং কেউ যদি ‘চাঁদ দেখা ছাড়া ঈদুল ফিৎর উদযাপন অবৈধ’ ফতওয়া দিত, তবে তাকে হত্যা করা হ’ত। সেসময় তারা বারাকা বিচারপতি ফক্বীহ মুহাম্মাদ বিন হুবলাকে চাঁদ দেখার পূর্বেই ঈদের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি তা অস্বীকার করেন। ফলে তাকেও নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়।[11]

ইমাম যাহাবী তাঁর জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, মহামান্য শহীদ ইমাম মুহাম্মাদ বিন হুবলা ছিলেন বারাকা শহরের বিচারপতি। একবার বারাকা শহরের প্রশাসক তার সঙ্গে দেখা করতে এসে বললেন, আগামীকাল ঈদ। তিনি বললেন,حَتَّى نرَى الهِلَال، ‌وَلَا ‌أُفَطِّر ‌النَّاس، ‌وَأَتقلَّد ‌إِثمَهُم ‘আমরা ঈদের চাঁদ না দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আমি মানুষের ছিয়াম ভেঙ্গে তাদের পাপে বোঝা নিজের কাঁধে নিতে রাজী নই। প্রশাসক বললেন, মানছূরের পত্রে এমন নির্দেশই এসেছে। উবায়দিয়াদের সিদ্ধান্ত হ’ল, তারা দিন গুণে ঈদ করবে। তারা চাঁদ দেখা ধর্তব্য মনে করে না। তখন আর চাঁদ দেখা হ’ল না। সকাল বেলা প্রশাসক ঢোল-তবলা ও ঈদের দফ বাজালেন। বিচারপতি ইমাম মুহাম্মাদ বিন হুবলা বললেন, আমি বের হব না, ছালাতও আদায় করব না। তখন প্রশাসক অপর এক লোককে নির্দেশ দিলে সে খুৎবা পড়ে এবং মানছূরের পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি পড়ে শোনায়।

এরপর প্রশাসক বিচারপতিকে ডেকে পাঠান। তাকে বললেন, আপনি আপনার মত পরিবর্তন করুন। আমি আপনার পক্ষ থেকে সুলতানের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেব। বিচারপতি তা থেকে বিরত থাকেন। এর শাস্তিস্বরূপ প্রশাসক তাকে সারাদিন রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে রাখে। এক পর্যায়ে তিনি নিদারুণ পিপাসায় কাতর হয়ে পানি খেতে চান। কিন্তু তাকে পানি দেওয়া হয়নি। এরপর তারা তাকে শূলে চড়ায়। এমন যালিমদের ওপর আল্লাহ তা‘আলার অভিশাপ নাযিল হোক।[12] আবার যে সকল লোক তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করেছে তারা তাদের থেকে শরী‘আতের ফরয বিধিবিধান পালন শিথিলযোগ্য করে দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে শারঈ বিধান তাদের থেকে রহিত করে দিয়েছে। যাতে তাদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়িত হয়। তারা লোকদেরকে প্রভাবিত করে নির্জনকক্ষে নিয়ে যেত। সেখানে উবায়দুল্লাহ দুই হাত পা ছেড়ে চাদর উল্টিয়ে পরিধান করে প্রবেশ করত। তাদের বলা হ’ত,أنكم مثل البهائم لاشيء، لا وضوء ولا صلاة ولا زكاة ولا أي فرض من الفروض، وسقط جميع ذلك عنكم، وأما لباس الفرو مقلوباً فإنما أردت أن أعلمكم أنكم قلبتم الدين، وأما قولي لكم بح، فإنما أردت أن أعلمكم أن الأشياء كلها مباحة لكم من الزني وشرب الخمر، وجميع ما حرّم الله -تعالى الله عمّا يقول الظالمون علوّا كبيرا ‘তোমরা পশুর মতো; তোমাদের ওপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই; না ওযূ, না ছালাত, না যাকাত। আর না ফরযসমূহের কোন কিছু। এর সবই তোমাদের থেকে রহিত হয়ে গেছে। আর উল্টো করে পশমী পোষাক পরিধানের উদ্দেশ্য ছিল তোমাদের জানিয়ে দেওয়া যে, তোমরা পূর্বে যে দ্বীনের ওপর ছিলে তা উল্টে দিয়েছো এবং এই (নতুন) দ্বীনে প্রবেশ করেছ। আর তোমাদের জন্য আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল তোমাদের জানিয়ে দেওয়া যে, সমস্ত কিছুই তোমাদের জন্য বৈধ- যেমন ব্যভিচার, মদ্যপান এবং আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন তার সবই। যালেমরা যা বলে তা থেকে আল্লাহ অতি মহান ও বহু ঊর্ধ্বে’[13] নাঊযুবিল্লাহ। এমন ঘোষণা কোন অমুসলিম নেতাও তাদের অনুসারীদের জন্য দিতে পারেনি কখনো।

ঘ. উবাইদিয়্যাহ সাম্রাজ্যকে মিশরে স্থানান্তরসহ বিভিন্ন মুসলিম ভূখন্ড দখল :

মিশর প্রথম দিকে আববাসীয় খেলাফতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হ’লেও পরে ২৫৪ হিজরীার ১২ রামাযান (৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) মামলূক বংশোদ্ভূত সাহসী সেনাপতি আহমাদ ইবনে তুলুন গভর্নর হিসাবে মিশরে প্রবেশ করেন।[14] আববাসীয় খেলাফতের দুর্বলতার সুযোগে তিনি মিসরে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র ‘তুলুনি সালতানাত’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার শাসন দক্ষতায় মিসরকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং উন্নত প্রশাসনিক কাঠামো কায়রোকে তৎকালীন বাগদাদের সমকক্ষ করে তোলে।[15] এটি ছিল সুন্নী রাষ্ট্র। পরবর্তীতে মিশরের সর্বশেষ সফল শাসক ছিলেন আল-কাফূর ইখশিদী। যিনি মিশর ও সিরিয়ার অত্যন্ত প্রতাপশালী শাসক ছিলেন।[16]

পক্ষান্তরে সে সময়ে আফ্রিকায় উবাদিয়্যাহ সাম্রাজ্যের চতুর্থ খলীফা হিসাবে ক্ষমতাসীন ছিলেন আল মুঈয। ৩৫৪ হিজরীতে ইহুদীরা আফ্রিকায় প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে আল মুঈয এর সীমানা বিস্তৃত হয়ে মিশরের সীমানা পর্যন্ত পেঁŠছে। ফলে তার দৃষ্টি পড়ে মিশরের উপর। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ৩৫৫ হিজরীতে ‘আল-কাফূর ইখশিদী’ মৃত্যুবরণ করার ফলে মিশরে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তখন মুঈয এই সুযোগ গ্রহণ করে। সে ৩৫৮ হিজরীতে তার একনিষ্ঠ সেনাপতি জাওহার এর নেতৃত্বে প্রায় এক লক্ষ সৈন্য মিশরে প্রেরণ করে। সে মিশরকে উবাইদিয়া সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে কোন চেষ্টার কমতি রাখে না। ৩৬১ হিজরীতে সে আল-আযহার বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। (যাতে শিক্ষানীতি পরিবর্তন করে তারা সেখানে রাফেযী মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে পারে)। পরবর্তীতে মিশরে উবাইদিয়্যাহ সাম্রাজ্য উৎখাতকারী সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়্যুবী (রহঃ)-এর ভূমিকায় আহলুস সুন্নাত ওয়াল জাম‘আতের ইলম বিতরণের একটি প্রধান দূর্গ হিসাবে অধিষ্ঠিত হয়।

বিভিন্ন চাড়াই উৎরাই পেরিয়ে মিশরভূমি যখন উবাইদিদের অনুকূল হয়, তখন আল-মুঈয ৩৬২ হিজরীতে পরিবার পরিজন নিয়ে মিশরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এ সময় সে জায়নবাদী শাসক বালকীন বিন জারিরের হাতে অফ্রিকার পুরো ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায়।[17] আফ্রিকায় যে সাম্রাজ্যের নাম ছিল ‘উবাইদিয়্যাহ’। মিশরে গিয়ে সেই সাম্রাজ্যের নাম হয় ‘ফাতেমিয়্যাহ’। যাকে সংক্ষেপে ‘ফাতেমী’ বলা হয়। শায়খ তাহের যাভি (রহঃ) বলেন, ফাতেমী সাম্রাজ্য টিকে ছিল ২৬০ বছর। ৫২ বছর মরক্কোয় ও ২০৮ বছর মিশরে। তাদের শাসক বা খলীফা ছিল ১৪ জন। প্রথম খলীফার নাম উবায়দুল্লাহ মাহদী। শেষজনের নাম ছিল আল-আযীদ। সে ৫৬৭ হিজরী সনে ১০ই মুহাররম মিসরে মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর মাধ্যমেই পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চল ফাতেমীদের শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়।[18]

আববাসীয় খলীফাদের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে তারা একের পর এক অঞ্চল দখল করতে থাকে। আর সেখানে তাদের মতাদর্শকে মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে থাকে। সর্বপ্রথম আববাসীয় খলীফা আল-কাদির বিল্লাহ ৪০৮ হিজরীতে মু‘তাযিলা, রাফেযী, ইসমাঈলীদের অপসারণ ও শাস্তি প্রদানের কর্মসূচী শুরু করেন। পরবর্তীতে সুলতান মাহমূদ গযনবী, গাযী আবুল কাসিম প্রমুখ খলীফাগণ তাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের অপসারণের কাজ করেন। ফাতেমী সাম্রাজ্য সম্পর্কে ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘ফাতেমী খলীফাগণ ধন-সম্পদে প্রাচুর্যবান ছিল। তারা অন্যান্য খলীফাদের চেয়ে বেশী ধনী, অধিক জোর-যুলুমকারীও ছিল। চরিত্রগত দিক থেকে খুবই ধূর্ত ও কদাকার চরিত্রের অধিকারী ছিল। তাদের যুগে রাষ্ট্রসমূহে ব্যাপক অন্যায়-অশ্লীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অসংখ্য হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলাকারী বৃদ্ধি পেয়েছে। নেককার আলেম-ওলামা ও সৎকর্মশীল আবেদদের সংখ্যা কমে গেছে। সিরিয়ায় নাছিরিয়‍¨vহ, দারযিয়্যাহ ও হ্যশিশিয়‍¨vহরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে। ফরাসীরা সিরিয়ার উপকূলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।

পর্যায়ক্রমে তারা আল-কুদস, নাবলুস, আজলুন, গূর, গাযা, আসকবালান, কুর্ক, শোবেক, তাবরিয়া, বানিয়াস, সূর, আক্কা, সাইদা, বৈরূত, নকদ, তারাবলুস, ইন্তাশী‘আ ও এর আশেপাশের অঞ্চলসমূহ দখল করে নেয়। তারা অগণিত মুসলমানকে হত্যা করে। যার সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। তারা মুসলিম রমণী, যুবতী ও তাদের সন্তানদেরকে অপহরণ করে। তাদের সঙ্গে এমন পৈশাচিক আচরণ করেছে যা উল্লেখ করার মতো নয়। অথচ ছাহাবায়ে কেরাম এসকল অঞ্চল জয় করে এগুলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তারা নির্বিবাদে মুসলমানদের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে। তারা দামেশকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি করে ফেলেছিল। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা রক্ষা করেছেন। তাদের শক্তি, ক্ষমতা ও সময়কাল শেষ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ তা‘আলা নিজ দয়া, অনুগ্রহ ও স্বীয় ক্ষমতাবলে পুনরায় এসকল অঞ্চলগুলো মুসলমানদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন।[19] ফালিল্লাহিল হামদ।

তবে মনে রাখতে হবে যে, সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ুবী (রহঃ) বায়তুল মাকদিস বিজয়ের পূর্বে এই শী‘আদের দমন করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। নুরুদ্দীন জিনকির মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম ফাতেমী খেলাফতকে উৎখাত করার প্রয়োজন বোধ করেন। এমনকি নুরুদ্দীন জিনকির অভিপ্রায়ও এটাই ছিল। সুতরাং তারা মুসলিমদের জন্য কতটা বিষফোঁড়া ছিল, সেটা খুব সহজেই অনুমেয়।

৩. মুসলিম সালতানাত ‘সেলজুকীদের’ সাথে যুদ্ধ :

এই শী‘আরা সিরিয়ায় সালজুকি সালতানাতের অবস্থান দুর্বল করার দুরভিসন্ধি করে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদেরকে সহায়তা করে। একপর্যায়ে ৪৪৮ হিজরীতে খোরাসানে সেলজুকদের সাথে শী‘আরা যুদ্ধে পরাজয় বরণ করলে খোরাসান তাদের হাতছাড়া হয়। শী‘আরা তাদের শাসন ব্যবস্থা এতটাই মযবূত করেছিল যে তারা সিরিয়া, হালব এমনকি মক্কা মুকাররমাতেও আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে সেলজুক সুলতান আলপ আরসালানের নেতৃত্বে এই অঞ্চলগুলো আবার মুসলিমদের করতলগত হয় এবং ৪৬২ হিজরীতে মক্কা মুকাররমাও শী‘আদের আধিপত্য মুক্ত হয়। তিনি এগুলোকে আবার আববাসীয় খেলাফতের অধীনে নিয়ে আসেন। তখনও সালজুকরা আববাসীয় খেলাফতের অধীনেই ছিল। এছাড়াও শী‘আরা ৫০০ হিজরীতে আবার সেলজুক সুলতান মুহাম্মাদ বিন মালিক শাহের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফলে ইছফাহান কেল্লাও তাদের দখলমুক্ত হয়। তারপর ৫২৩ হিজরীতে খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের সাথে এই মর্মে চুক্তি করে যে, তারা সিরিয়ার দামেশক খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেবে। বিনিময়ে তাদের ‘সূর’ শহর (ভূমধ্য সাগরের তীরবর্তী দক্ষিণ লেবাননে অবস্থিত) প্রদান করবে। এই সংবাদ দামেশকের সুন্নী আমীর বূরী ইবনে তাগতাকীন জানতে পেরে ইসমলঈলী শী‘আ নেতা মারযুকানীকে হত্যা করেন। সাথে সাথে তাদের আরোও ছয় হাযার লোককে হত্যা করে এই অপতৎপরতার অবসান ঘটান। অন্যদিকে সুলতান সিনজার ৫২১ হিজরীতে শী‘আদের আলমাউত কেল্লায় আক্রমণ করে তাদের দুর্বল করে দেন। সেখানে তাদের অনেক লোকও মারা যায়।[20]

অবশেষে তাদের ফাতেমী সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল ৫৬৭ হিজরীতে বায়তুল মাকদিস বিজেতা সুলতান ছালাহুদ্দীন আইয়ূবী (রহঃ)-এর হাত ধরে। ইবনু কাছীর (রহঃ) এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘ফাতেমী সাম্রাজ্যের সময়কাল ছিল প্রায় দুইশ বছর। এরপর তারা কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। যেমন সূরা হূদে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, كَأَن لَّمْ يَغْنَوْا فِيهَا ‘যেন সেখানে তারা কোন কালে ছিলই না’।[21]

৪. শী‘আদের মদদপুষ্ট আববাসীয় খেলাফতের পতন :

হিজরী সন তখন ৬৫৬, সাল ১২৫৮। আববাসীয় শেষ খলীফা আল-মুস্তা‘ছিম। আববাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদেই তার অবস্থান। দুর্ভাগ্যবশত তার উযির ছিল ‘ইবনু আলকামি’ নামের এক ধূর্ত রাফেযী শী‘আ। সে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের খেলাফতকে হটিয়ে তদস্থলে রাফেযী হুকুমত প্রতিষ্ঠার ফন্দি অাঁটছিল। তার এই চক্রান্ত ছিল তিনটি পর্যায়বিশিষ্ট : 

ক. সেনাবাহিনী হ্রাস ও জানগণকে কোনঠাসা করে ফেলা : প্রথমে সে তার মন্ত্রীত্বের ক্ষমতা বলে মুসলিম সেনাবাহিনীর বেতন হ্রাস করে নেয়। এরপর সেনাবাহিনীতে ছাঁটাই শুরু করে তাদের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে। এ সম্পর্কে হাফেয ইবনু কাছীর বলেন, উযির ইবনুল আলকামি সেনাবাহিনীকে তাড়ানো এবং রেজিস্টার থেকে তাদের নাম ছাঁটাই করার প্রচেষ্টা চালায়। ফলে দেখা যায় যেখানে খলীফা মুসতানছিরের যুগে খেলাফতের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ, সেখানে তা কমে মাত্র ১০ হাযারে এসে দাঁড়ায়।[22]

খ. তাতারদের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ : এ সম্পর্কে ইবনু কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘এরপর সে তাতারদের সঙ্গে পত্রযোগাযোগের মাধ্যমে ফন্দি অাঁটে। তাদের বাগদাদ আক্রমণের লোভ দেখায়। তাদের জন্য পথ মসৃণ করে। আর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দুর্বলতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত করে।

গ. তাতারদের বিরোধিতা থেকে বিরত রাখা এবং খলীফা ও জনসাধারণের সাহস ভেঙে ফেলা :

এক্ষেত্রে সে দেশের সাধারণ নাগরিকদের তাতার-বিরোধিতা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা চালায়। খলীফা তাঁর উপদেষ্টা এবং তাঁর নিকটজনদের এই ধোঁকায় ফেলে রাখে যে, তাতাররা তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে ইচ্ছুক। সবচেয়ে ভালো হবে খলীফা যেন নিজে উপস্থিত হয়ে তাদের সঙ্গে সন্ধি নিয়ে আলোচনা করেন, যাতে নিজেদের মর্যী মোতাবেক সন্ধি করা যায়। সন্ধিতে যেন এটা নির্ধারিত হয় যে, ইরাকের রাজস্বের অর্ধেক খলীফা এবং অর্ধেক তাতাররা ভোগ করবে। সুতরাং দেখা যায় খলীফা তাঁর কাযী, ফকবীহশ্রেণী, নেতৃবৃন্দ এবং উঁচু পদের যিম্মাদার ও সহযোগীদের সমন্বয়ে ৭০০ লোককে সঙ্গে নিয়ে তাতারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফলাফল দাঁড়ায়, এই চক্রান্তের মাধ্যমে খুব সহজেই খলীফা তাঁর সঙ্গে যাওয়া অন্যান্য নেতাসহ সরকারী কর্মকর্তা ও সেনাবাহিনীর জেনারেলদের তাতারদের হাতে হত্যা করিয়ে নেয়।[23]

মুজাহিদুল ইসলাম

বিএ (অনার্স) ৪র্থ বর্ষ, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


[1]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, তাহক্বীক্ব: আব্দুল ক্বাদের আরনাঊত্ব, (বৈরূত: দারু ইবনে কাছীর, তৃতীয় সংস্করণ ১৪৩৪ হি;) খন্ড ১২, পৃষ্ঠা ২৮৪।

[2]. বর্তমান তিউনিসিয়ার কায়রাওয়ান শহরের নিকটবর্তী অঞ্চল।

[3]. কায়রাওয়ান বর্তমান তিউনিসিয়া রাষ্ট্রের অন্তর্গত একটি ঐতিহাসিক নগরী। উমাইয়া শাসনামলে ৫০ হিজরী মোতাবেক ৬৭০ খ্রিষ্টাব্দে উকবা ইবনে নাফে‘ (১-৬৩হি.) এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেন।

[4]. শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, মুহাক্কিক্ব : শুআইব আরনাঊত্ব, (বৈরূত : মুআসসাতুর রিসালাহ, ১ম প্রকাশ ১৪০৫হি.) খন্ড ১৪, পৃ. ২১৫-২১৭

[5]. আল-হুসাইন ইবনু মুহাম্মাদ শাওয়াত্ব, মাদরাসাতুল হাদীছ ফিল ক্বায়রোয়ান, (রিয়ায : দারুল আ’লামিয়্যা লিল কিতাবিল ইসলামিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ ১৪১১ হি.), ১ম খন্ড, পৃ.৭৪।

[6]. মুহাম্মদ ইবনু রিযক আত-তারহূনী, আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন ফী গারবি আফরীক্বিয়্যাহ, (সঊদী আরব: দারু ইবনুল জাওযী লিন নাশরি ওয়াত তাওযী’ ১ম প্রকাশ১৪২৬ হিজরি) ১ম খন্ড, পৃ. ৭৩।

[7]. ড. আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী, আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ফী লিবিয়া (ওমান: দারুল বায়ারিক্ব, ১ম প্রকাশ ১৪১৮হিজরী) পৃ. ৮৭।

[8]. আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ফী লিবিয়া, পৃ. ৮৮।

[9]. আত-তাফসীর ওয়াল মুফাসসিরুন ফী গারবি আফরীক্বিয়্যাহ ১/৭৪।

[10]. যেখানে তাদের ইমাম উবায়দুল্লাহ থাকতো।

[11]. আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ফী লিবিয়া, পৃ. ৯১

[12]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৫/৩৭৪

[13]. আবূবকর আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-মালিকী, রিয়াযুন নুফূস ফী ত্বাবাক্বাতি উলামাই ক্বায়রাওয়ান, (বৈরূত: দারুল গারব আল-ইসলামী, ২য় প্রকাশ১৪১৪ হি./১৯৯৪ খ্রি.), ২য় খন্ড, পৃ. ৫০৪-৫০৫।

[14]. ইবনু আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৭/২১৫, ১৯৮৭।

[15]. জালালুদ্দীন সুয়ুতী, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা ৩৬৫, ২০০৪।

[16]. https://en.wikipedia.org/wiki/Abu_al-Misk_Kafur

[17]. ত্বাহের আহমাদ আয-যাভী, আল-ফাতহুল আরাবী ফী লিবিয়া (দারুল মাদার আল-ইসলামী, চতুর্থ সংস্করণ : ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ) পৃ. ১৮৮

[18]. ড. আলী মুহাম্মাদ ছাল্লাবী; আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ফী লিবিয়া; (ওমান: দারুল বায়ারিক্ব, ১ম সংস্করণ ১৪১৮হিজরি) পৃ. ৭৩।

[19]. ড. আলী মুহাম্মাদ ছাল্লাবী; আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ওয়াল ফাতিমিয়্যাহ্; (কায়রো: মাকতাবাতুত তাবেঈন) পৃ. ১৩৪।

[20]. আদ্-দাওলাতুল উবাইদিয়্যাহ্ ওয়াল ফাতিমিয়্যাহ্, পৃ. ১১৫-১১৭।

[21]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১২/২৭৮।

[22]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১৩/২০২।

[23]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১৩/২০১।






মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (৬ষ্ঠ কিস্তি) - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
মানব জাতির সাফল্য লাভের উপায় - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
ই‘তিকাফ : গুরুত্ব ও ফযীলত - মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান
আদর্শ চিকিৎসকের করণীয় ও গুণাবলী - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
অশ্লীলতার পরিণাম ঘাতক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব - লিলবর আল-বারাদী - যশপুর, তানোর, রাজশাহী
ক্ষমা প্রার্থনা : এক অনন্য ইবাদত - ইহসান ইলাহী যহীর
সকল সৃষ্টির ইবাদত ও আনুগত্য - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
ইসলামে দাড়ি রাখার বিধান (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
বিশ্ব ভালবাসা দিবস - আত-তাহরীক ডেস্ক
পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণ সমূহ (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
সফল মাতা-পিতার জন্য যা করণীয় - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমামদের দায়িত্ব ও কর্তব্য - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
আরও
আরও
.