সূদান উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার একট বৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র। আয়তন ১৮ লক্ষ ৮৬ হাযার ৬৮ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালে দক্ষিণ-সূদান ভাগ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। মোট জনসংখ্যা ৪ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে ৭০% মুসলিম, ২৫% আদিবাসী এবং ৫% খৃষ্টান। ভাষা আরবী ও ইংরেজী। মিসর, লিবিয়া, চাঁদ, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়াসহ সাতটি দেশের সঙ্গে সীমান্তের পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূল থাকায় সূদান কৌশলগত দিক থেকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীল নদ এই দেশের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। দেশটি বিশাল আবাদযোগ্য জমি এবং প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। যার মধ্যে রয়েছে পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, রূপা, ক্রোমাইট, ম্যাঙ্গানিজ, জিপসাম, মাইকা, দস্তা, লোহা, সীসা, ইউরেনিয়াম, তামা, গ্রানাইট, নিকেল, টিন ও অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি।
ভৌগলিক গুরুত্বপূর্ণ এই দেশটি বিগত আড়াই বছরেরও অধিক সময় ধরে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে। সে দেশের সরকারী বাহিনী ‘সূদান আর্ম ফোর্সেস’ (এসএএফ) ও আধা-সামরিক ‘র¨vপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (আরএসএফ)-এর ক্ষমতার লড়াই দেশটিকে মৃত্যুপুড়িতে পরিণত করেছে। ঠেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সূদান আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মুখোমুখি। ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া সংঘাতে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে দেড় লাখের বেশী মানুষ। বাস্ত্তচ্যুত হয়েছে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ। যা ইউক্রেন ও ফিলিস্তীনের গাযাকেও হার মানিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- কেন এই গৃহযুদ্ধ? কি কারণে মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশটি ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?
জবাব হচ্ছে- ক্ষমতার লড়াই। জোর করে ক্ষমতা দখল করা, ক্ষমতা আগলে রাখা, যেকোন মূল্যে ক্ষমতায় যেতেই হবে এই মানসিকতা, আদল ইনছাফ থেকে যোজন দূরে থাকা, সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা, শাসনের নামে শোষণ ও যুলুম-নির্যাতন করা, সর্বোপরি সৃষ্টির জন্য স্রষ্টার বিধান তথা ইসলামী খেলাফতের আদলে রাষ্ট্র পরিচালনা না করে মানব রচিত বিধানের আলোক রাষ্ট্র পরিচালনা করা ইত্যাদি কারণে আজ বিশ্বব্যাপী মুসলিম রাষ্ট্রগুলি অধঃপতনের অতল তলে হারিয় যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বর্তমান সংকটের সূত্রপাত হয় ২০১৯ সালে দীর্ঘ ৩০ বছর যাবত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশীরের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে। তাঁর শাসনকাল ১৯৮৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। প্রেসিডেন্ট বশীরও এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসেন এবং দীর্ঘ ৩০ বছর এক নাগাড়ে দেশ শাসন করেন। তার বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, ব্যাপক দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাসহ নানা অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এক পর্যায়ে তা বিদ্রোহে রূপ লাভ করে। আমজনতা ওমর আল-বশীরের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে। অবশেষে জেনারেল আবুল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বে সে দেশের সামরিক বাহিনী (এসএএফ) এবং জেনারেল মুহাম্মাদ হামদান দাগালোর নেতৃত্বে আধা-সামরিক বাহিনী (আরএসএফ) যৌথভাবে ২০১৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট বশীরই জেনারেল দাগালোর নেতৃত্বে আরএসএফ নামের আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করেছিলেন নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত ও স্থায়ী করার জন্য। এই আধা-সামরিক বাহিনীটি গঠিত হয় ২০১৩ সালে, যাদের নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক বিতর্ক রয়েছে। এই বাহিনীর মূলে রয়েছে কুখ্যাত ‘জানজাওয়িদ মিলিশিয়া গ্রুপ’, যারা দারফুরের বিদ্রোহীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিল। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে দারফুর সংঘাতে এই মিলিশিয়া প্রায় ২ লক্ষ আদিবাসী কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এই গ্রুপের নেতা ছিলেন জেনারেল দাগালো। আন্তর্জাতিক নিন্দা ও সমালোচনা সত্ত্বেও ওমর আল-বশীর এই গ্রুপটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি আধা-সামরিক বাহিনী হিসাবে স্বীকৃতি দেন, যার নামকরণ করা হয় ‘বর্ডার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটস’। পরে এই গ্রুপটির সদস্যরা সূদানের গোয়েন্দা বিভাগের অংশ হয়ে ওঠে। এর কয়েক বছর পর ওমর আল-বশীর আরএসএফ বাহিনীটি গঠন করেন। তিনি নিজে এই বাহিনীর কার্যক্রম তদারকী করলেও এর প্রধান ছিলেন জেনারেল দাগালো। এই দাগালো পরে প্রেসিডেন্ট ওমরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অতঃপর তাকে উৎখাতের পর সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি উপ-প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জেনারেল দাগালো পরে আরএসএফকে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলেন এবং এর মধ্য দিয়ে খুব দ্রুত তার ক্ষমতার উত্থান ঘটতে শুরু করে।
আরএসএফ বাহিনী ইয়েমেন ও লিবিয়ার সংঘাতেও জড়িয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় সূদানের বেশ কয়েকটি সোনার খনিতেও তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনেরও অভিযোগ উঠেছে। তার মধ্যে রয়েছে ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশীরের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে ১২০ জনেরও বেশী প্রতিবাদকারীকে হত্যা করা। দেশটির সেনাবাহিনীর বাইরে এরকম শক্তিশালী একটি বাহিনীর উপস্থিতিকেও সূদানের অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ বলে বিশ্লষকগণ মনে করেন। অন্যদিকে ওমর আল-বশীরকে যখন ক্ষমতা থেকে সরানো হয় তখন জেনারেল বুরহান ছিলেন সেনাবাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেল। দারফুর সংঘাতের সময় তিনি আলোচনায় আসেন এবং এই সময়েই তার ক্ষমতার উত্থান ঘটে।
প্রেসিডেন্ট বশীরের অপসারণের পর অসামরিক প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে একটি অন্তর্বতীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অসামরিক এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে দ্রুত এ চুক্তিও ভেঙে যায় এবং ২০২১ সালের অক্টোবরে জেনারেল বুরহান আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বতীকালীন সরকার ভেঙে দিয়ে নিজেই ক্ষমতার মসনদে আসীন হন।
উল্লেখ্য, বশীর বিরোধী অভ্যুত্থানের দুই মূল নায়কই আজ পরস্পরের শত্রু। সেনাপ্রধান জেনারেল বুরহান এবং আরএসএফ প্রধান জেনারেল মুহাম্মাদ হামদান দাগালো। প্রথমে তারা একসঙ্গে বশীরকে ক্ষমতাচ্যুত করলেও পরে ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রশ্নে উভয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। দুই নেতাই তাদের ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব বজায় রাখতে চাওয়ায় দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তাদের দ্বন্দ্বের পেছনে অন্যতম ইস্যু ছিল আরএসএফের এক লাখের বেশী সৈন্যকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেয়ার প্রশ্নে। এই সৈন্যদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হলে নতুন বাহিনীকে কে নেতৃত্ব দেবেন সেটি নিয়েও দ্বন্দ্ব শুরু হয় দুই নেতার মধ্যে। দুই নেতার মধ্যে এমন উত্তেজনা চলাকালীন অবস্থায় ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে আরএসএফ সেনাদের সূদানের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে সেনাবাহিনী হুমকি হিসাবে দেখে। যার ধারাবাহিকতায় সে বছরের ১৫ই এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। কিছুদিনের মধ্যেই আরএসএফের সেনারা রাজধানী খার্তুমের একটা বড় অংশ দখল করে নেয়। প্রায় দুই বছর পর ২০২৫ সালের মে মাসে পুনরায় সেনাবাহিনী খার্তুমের দখল ফিরে পায়।
আরএসএফ সর্বশেষ নৃশংসতা চালায় দারফুর অঞ্চলের আল-ফাশের শহরে। গত অক্টোবর মাসে সূদানের সরকারী বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি বলে পরিচিত আল-ফাশের শহর দখল করে আরএসএফ সেখানে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকান্ড চালায়। মাত্র ৩ দিনে ১৫০০ মানুষকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হ’ল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্লিপ্ততা। ইউক্রেন বা গাযায় সংঘাতের মতো বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া সূদানের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে এই বিপর্যয় তুলনামূলকভাবে অল্প জায়গা পাচ্ছে, আর বড় শক্তিগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে নীরব রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘সূদানে যা ঘটছে তা মানবতার জন্য লজ্জার।’ তবু নিরাপত্তা পরিষদে এখনো কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মানবিক সহায়তা পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ব, কারণ কোন পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত নয়। বিশ্বের নীরবতা এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। যখন গণহত্যা চলছে, তখন ‘রাজনৈতিক ভারসাম্য’ রক্ষার নামে নীরব থাকা মানে নৈতিকভাবে অপরাধে অংশ নেওয়া।
সূদানের মতো দেশগুলোর বিপর্যয় কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ নয়; এটি গোটা বিশ্ববাসীর জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাংলাদেশী হিসাবে আমাদের কণ্ঠস্বরও এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আরও জোরালো হওয়া উচিত। কূটনৈতিকভাবে ও আন্তর্জাতিক ফোরামে সূদানের গণহত্যা বন্ধে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীকাল এই আগুন অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়বে। গণহত্যার ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং তা অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানো। যখন কোন গণহত্যা সংঘটিত হয়, তখন বিশ্ব পরাশক্তিগুলো প্রথমে নীরব থাকে, পরে অনুতপ্ত হয়। আর এতে কোন লাভ হয় না। কারণ ইতিমধ্যে যা ক্ষয়-ক্ষতি হওয়ার হয়েই যায়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় এমন নীরবতাই লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। সূদানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
সুতরাং মানবতার প্রশ্নে জাতিসংঘ, আরব লীগ, ওআইসিসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একত্রিতভাবে শান্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। এখনই যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সূদান ভেঙে যাবে কয়েকটি খন্ডে, আর লাখ লাখ মানুষ হারাবে তাদের ভবিষ্যৎ। জাতিসংঘের ভাষ্য মতে, সূদানে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট চলছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব, যাদের মানবাধিকারের বুলি এত জোরালো, তারা যেন সূদানের নাম ভুলে গেছে। গাযা বা ইউক্রেন নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ শিরোনাম হয়, কিন্তু দারফুরের মৃত্যুর খবর তেমন সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশ করতে দেখা যায় না। এটি আমাদের বিবেকের ওপর এক গভীর ক্ষত। সূদানের আল-ফাশেরে যা ঘটছে, তা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি মানবতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
পরিশেষে বলব, সূদানে চলমান এই মানবিক নৃশংসতা ও গণহত্যা রোধে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক জবাবদিহীতা। প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচেছ- নিরবচ্ছিন্নভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। কারণ প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি অনীহা আরও বহুসংখ্যক প্রাণের মৃত্যু ডেকে আনবে, বহু বনু আদমকে বাস্ত্তচ্যুত করবে এটিই স্বাভাবিক। মহান আল্লাহ মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে সঠিক বুঝ দান করুন-আমীন!