পূজামন্ডপ পাহারা : ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

আলোচনা-সমালোচনার মধ্যদিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হ’ল গত ৫ই আগষ্ট। এরি মধ্যে আরো অতিক্রান্ত হয়েছে তিন মাস। ইতিমধ্যে ফেব্রুয়ারী’২৬-কে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য মাস ঘোষণা করা হয়েছে। চারিদিকে নির্বাচনী ইমেজও শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়নের কাজও ধীরে সুস্থে এগিয়ে নিচ্ছে। অনেকে স্ব স্ব এলাকায় দলীয় মনোনীত প্রার্থী হিসাবে নিজেকে জনগণের সামনে তুলে ধরছেন সাগ্রহে। সকলেই উদগ্রীব হয়ে আছেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। ক্ষমতার লোভে অন্ধ নেতৃবৃন্দ নিজেদের ব্যক্তিত্ব, স্বকীয়তা, আদর্শ জলাঞ্জলি দিতেও সামান্যতম কসুর করছেন না। ইসলামী দল হোন বা অনৈসলামিক হোন গণতন্ত্রের মঞ্চে সকলের যেন একই অভিনয়। ইসলামের শাশ্বত বিধানকে এক পাশে রেখে মানব রচিত মতবাদের পিছনে গলদঘর্ম কোশেশ চলছে প্রতিনিয়ত। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীনতম শিরক মূর্তিপূজাকে মুসলমানদের পবিত্রতম ইবাদত রোযার সঙ্গে তুলনা করার ধৃষ্টতাও প্রদর্শন করা হয়েছে অতি সম্প্রতি। পূজামন্ডপে গিয়ে মাথায় টুপি ও মুখ ভরা দাড়ি নিয়ে পাঠ করা হয়েছে গীতা। খাওয়া হয়েছে প্রসাদ। আমাদের লজ্জায় মাথা হেট হয় তখন যখন দেখি এই ন্যক্কারজনক কাজগুলো করছেন কোন ইসলামী দলের দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিগণ।

বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এ দেশের শতকরা ৯২ ভাগ নাগরিক মুসলমান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্যসাধারণ দেশ বাংলাদেশ। যুগ যুগ ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এ দেশে সর্বোচ্চ শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে বসবাস করে আসছে। একই গ্রামে মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাস হ’লেও কেউ কারো ধর্মীয় আয়োজনে বাধাও দেয় না অংশগ্রহণও করে না। আর এটি হয়ে থাকে স্রেফ ধর্মীয় আক্বীদা বা বিশ্বাস থেকে। কিন্তু দিনশেষে চায়ের দোকানের আড্ডায় দেখা যায় এক টেবিলে। হাট-বাজারের কেনাকাটায়ও দেখা যায় এক সঙ্গে। মুসলমানদের কুরবানীর ঈদে দা-ছুরিতে শান দেয়ার কাজটিও করেন হিন্দু ভাইয়েরা। কারণ এটি তাদের পেশা। গরু তাদের নিকটে পবিত্র বা দেবতা তুল্য হ’লেও সেই গরু কাটার যন্ত্র প্রস্ত্ততকরার পেশায় অধিকাংশ সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই সম্পৃক্ত।

হিন্দুদের পূজা-পার্বণ নিয়ে ইতিপূর্বে মুসলিম সমাজে তেমন কোন বিতর্ক দেখা দেয়নি। কারণ এটি স্রেফ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এ নিয়ে মুসলমানদের কোন মাথা ব্যথা নেই। থাকার কথাও নয়। যেমনটি মুসলমানদের ছিয়াম-ক্বিয়াম, ওয়ায-মাহফিল ও ঈদ আয়োজনে হিন্দুদের মাথা ব্যথার কোন কারণ নেই। তবে পারিবারিক ও সামাজিক চাপ ছিল যেন কোন মুসলমান হিন্দুদের পূজা বা মেলায় না যায়। কারণ এগুলো শিরক। আর মুসলমান কখনো শিরক ধারণ, লালন বা সমর্থন করতে পারে না। ছোট বেলায় দেখেছি হিন্দুদের পূজা-পার্বণে যাওয়ার অপরাধে সামাজিক বিচার হ’ত। তারপরও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জায়গায় সামান্যতম চিড় ধরেনি। কেননা ধর্মীয় বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের কোন গোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে বা নিরাপত্তা হুমকি মনে করলে তাদের নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রযন্ত্রের। রাষ্ট্র তার বিভিন্ন বাহিনীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিরাপত্তা প্রদানের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে কোন বিবেচনায়ই মুসলামনরা শিরকের সহযোগী হ’তে পারে না।

পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর শ্লোগান ছিল- ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। সংখ্যালঘুদের মন জয় করতে এবং তাদের সমর্থন ঠিক রাখতেই হয়তো তার এই ন্যাক্কারজনক উক্তিটি ছিল। মূলত এই বাক্যটি যে অন্তসারশূন্য তা বলাই বাহুল্য। কেননা কোন মুসলমানের পক্ষে হিন্দুদের পূজা উৎসবে শরীক হওয়া যেমন অসম্ভব। ঠিক তেমনি কোন হিন্দুর পক্ষেও মুসলমানদের ঈদ অনুষ্ঠানে শরীক হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এবছরের দূর্গাপূজায় দেখা গেছে এর বিপরীত চিত্র। রাজনৈতিক মাঠের প্লেয়াররা এ বছর পূজামন্ডপ মাত করে রেখেছিলেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের খুশী করে নিজ ও নিজ দলের পক্ষে ভোটার বৃদ্ধির নিরন্তর প্রচেষ্টা ছিল সকলের। শুভেচ্ছা বিনিময়, আতিথেয়তা গ্রহণ, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, নিয়মিত পাহারা, চিকিৎসা সেবা, অক্সিজেনের ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক মনিটরিং টীম ইত্যাদি সব আয়োজন ছিল মুসলিম নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে? শুধু তাই নয় এ সময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তারা শুনিয়েছেন নানা রকম আশ্বাস বাণী। শুনিয়েছেন নিরাপত্তার বয়ান। পূজা উদযাপনে দিয়েছেন আর্থিক সহায়তা। এছাড়াও মন্ডপ দেখতে গিয়ে যে সমস্ত জঘন্য মন্তব্য তারা ছুড়েছেন, তা রীতিমত ঈমান বিধ্বংসী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত এ রকম উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মন্তব্য যেমন-

(১) জনৈক ইসলামী নেতা সাথীদের নিয়ে পূজামন্ডপে গিয়ে হাস্যোজ্জ্বল বদনে মন্দির সভাপতির হাতে পূজার জন্য নগদ অর্থের খাম তুলে দিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন। এ সময়ে হিন্দু নেতাদের পক্ষ থেকে ঐ নেতাকে ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দেয়া হয়।

(২) অন্য একটি ইসলামী দলের নেতাদেরকে দেখা গেছে পূজামন্ডপে গিয়ে সোফায় বসে হিন্দুদের সাথে মতবিনিময় করছেন এবং তাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করছেন।

(৩) এক নেতা পূজা মন্ডপে গিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় শুরুত মহান আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করেন এভাবে যে, ‘আমি আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া এই জন্য আদায় করছি যে দীর্ঘদিন পরে আপনাদের মাঝে এসে এই পূজা উদযাপন উপলক্ষে সমবেত হতে পেরেছি’।

(৪) ইসলামী সংগঠনের আরেকজন শীর্ষ নেতা বলেন, ‘মোরা একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন মণি হিন্দু তার প্রাণ। এটাই হ’ল একদিকে রোযা আরেকদিকে পূজা। এই রোযা আর পূজা মিলে বাংলাদেশ। আমরা একই মুদ্রার এপার এবং ওপার।..এই বিষ্ণু, এই কৃষ্ণ, এই মুহাম্মাদ, এই মূসা, এই ঈসা, আমাদের সামনে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতীক’ (নাঊযুবিল্লাহ)।

(৫) আরেক নেতাকে বলতে শুনা গেছে, ‘আমরা নিজেরাও ধর্মানুরাগী, আপনারাও ধর্ম চর্চা করেন, অনুশীলন করেন, আপনাদের ধর্মে যে জ্ঞান, আপনাদের যে পড়াশুনা এবং আপনাদের ধর্ম আপনাদেরকে যেভাবে আপনার জীবনকে পরিচালনা করার জন্য বলে, যদি সেটুকুও আপনি সুন্দরভাবে পালন করতে পারেন তাহ’লে আপনি যে স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন সে স্রষ্টা আপনার বিশ্বাসের আলোকে আপনার সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে’।

(৬) আরেক নেতার বক্তব্য হচ্ছে, ‘ভক্তবৃন্দ এবং আমার সফরসঙ্গী ভাইয়েরা ও মা বোনেরা সবার প্রতি আমার সালাম আসসালামু আলাইকুম এবং আদাব। যাক আমি আপনাদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানানোর জন্য এসেছি। আমি এইটুকু শুধু বলব, আজকে আপনারা যে পূজা করতেছেন, মা দুর্গার কাছে চাচ্ছেন, কী চাচ্ছেন? আপনারা চাচ্ছেন যে, এই পৃথিবীতে সুখ-শান্তি মঙ্গল যেন বয়ে আনে এবং মৃত্যুর পর যেন ঈশ্বর আমাদেরকে ও আপনাদেরকে স্বর্গবাসী করে ..’।

আরো কিছু মন্তব্য, যেমন-(৭) ‘হিন্দুরা আমাদের ভাই ভাই, আমাদের পূর্ব পুরুষরা হিন্দু ছিল। আমরা ট্রান্সফার হয়ে মুসলমান হয়েছি’। (৮) ‘আমরা ইবাদত করি, আর আপনারা পূজা করেন। এটা শুধুমাত্র একটা ভাষার পার্থক্য। কিন্তু কাজ সকলেরই এক’। (৯) ‘এই মর্তটা যখন পাপ-পঙ্কিলতায় ডুবে যায়, অন্যায়-অত্যাচার ও মিথ্যায় সয়লাব হয়ে যায় তখনই প্রতিবছর দুর্গার আগমন হয়’। (১০) ‘মা দুর্গা ২০২৩ সালে ১০ হাত নিয়ে এসেছিল এ দেশে শান্তির জন্য, সেই জন্য এক বছর উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই ৫ই আগস্ট ২০২৪ সালে এই দেশের মানুষকে...’। (১১) ‘আপনাদের উলুধ্বনি আর আমাদের আযান কত সুন্দর সময়ে হয় দেখেন, কত সুন্দর মৈত্রি’। (১২) ‘দুর্গার যে শক্তি অসুরকে বিদায় করে দেওয়ার জন্য, দমন করে দেওয়ার জন্য এ শক্তি বিশাল ভাবে কাজ করে এবং এ শক্তিতে আমরা শক্তি অর্জন করি..’। (১৩) ‘শেখ হাসিনা দীর্ঘ সতের বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ শত মডেল মসজিদ নির্মাণ করেছে, হিন্দুরা হাসিনাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করেছে। কিন্তু এই হিন্দুদের জন্য বাংলাদেশের কোথাও মন্দির নির্মাণ করে নাই। আমরা কথা দিচ্ছি যে, জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় আসলে প্রত্যেকটি এলাকায় একটি করে মডেল মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা করব’।

প্রিয় পাঠক! এর বাইরে হয়তো আরো অনেক মন্তব্য থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সর্বাধিক নযরে আসা বক্তব্যগুলো থেকেই আমরা উল্লেখ করলাম। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, তীব্র সমালোচনার মুখে কোন কোন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা পরবর্তীতে তার বক্তব্যের জন্য দেশবাসীর নিকটে ক্ষমা চেয়েছেন, আবার কেউ বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গেয়ে ব্যখ্যা করেছেন। সে যাই হোক কোন তাওহীদবাদী মুসলমান এই বক্তব্যগুলোর সাথে একমত হ’তে পারেন না। উক্ত বক্তব্যগুলো এবং এ বছরের দুর্গাপূজায় মুসলিম নেতাদের অযাচিত অংশগ্রহণ ও বাগাড়ম্বরে ঈমানদার মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। সেই অনুভূতি থেকেই আমরা এ বিষয়ে কলম ধরতে বাধ্য হয়েছি।

আমরা দল-মত নির্বিশেষে সকল মুসলমান এ বিষয়ে একমত যে, মূর্তিপূজা ‘শিরকে আকবর’ বা বড় শিরক। যা তওবা ব্যতীত ক্ষমা হবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় পাপ’ (লোক্বমান ৩১/১৩)। ‘আব্দুর রহমান তার পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করব না? আমরা বললাম, অবশ্যই সতর্ক করবেন হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক গণ্য করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা’।[1] আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা..’।[2]

শিরকী আক্বীদা ও বিশ্বাস নিয়ে কোন মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হচ্ছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্যকে শরীক করে, আল্লাহ অবশ্যই তার উপরে জান্নাতকে হারাম করে দেন, তার ঠিকানা হ’ল জাহান্নাম। আর যালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই’ (মায়েদাহ ৫/৭২)। জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, দু’টি বিষয় অপরিহার্য। জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) উক্ত বিষয় কি? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক না করে মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শরীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।[3]

শিরক এমন এক মহাপাপ, যা আল্লাহ তওবা ব্যতীত ক্ষমা করেন না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করে। এতদ্ব্যতীত তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে থাকেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করল, সে মহাপাপ রচনা করল’ (নিসা ৪/৪৮)। একই মর্মার্থের অপর আয়াতে তিনি বলেছেন যে, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করল সে দূরতম ভ্রষ্টতায় নিপতিত হ’ল’ (নিসা ৪/১১৬)। তিনি আরো বলেন, ‘তুমি বল, এসো আমি তোমাদেরকে ঐ বিষয়গুলি পাঠ করে শুনাই যা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের উপর হারাম করেছেন। আর তা হ’ল এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না..’ (আন‘আম ৬/১৫১)

শিরক এতটাই ভয়াবহ পাপ যে, শিরক ব্যতীত অন্যান্য পাপ পৃথিবী সমান হ’লেও মহান আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন। আবূ যার (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি নেক আমল করল, তার জন্য রয়েছে তার দশ গুণ। আমি অবশ্য বাড়াতেও পারি। যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজ করল, তার পাপের শাস্তি হবে তার সমপরিমাণ অথবা আমি তা ক্ষমাও করতে পারি। যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই। আর যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক বাহু অগ্রসর হই। যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌঁড়ে যাই। কোন ব্যক্তি যদি আমার সাথে কোন কিছু শরীক না করা অবস্থায় পৃথিবী পূর্ণ গোনাহ নিয়ে আমার সাথে মিলিত হয় আমি অনুরূপ পরিমাণ ক্ষমাসহ তার সাথে মিলিত হব’।[4]

অন্য সকল পাপের সাথে শিরক-কুফরের মেŠলিক পার্থক্য এই যে, সাধরণভাবে পাপের কারণে পুণ্য বিনষ্ট হয় না। কিন্তু শিরকের কারণে মানুষের সকল নেক কর্ম বিনষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চিতভাবে (হে নবী) তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তী (নবীদের) প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছিল যে, যদি তুমি শিরক কর, তাহ’লে অবশ্যই তোমার সমস্ত আমল বিফলে যাবে এবং তুমি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৩৯/৬৫)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের বদলে কুফুরী করে, তার সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (মায়েদাহ ৫/৫)। মহান আল্লাহ ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকূব, নূহ, দাঊদ, সুলায়মান, আইঊব, ইউসূফ, মূসা, হারূন, যাকারিয়্যা, ইয়াহইয়া, ঈসা, ইলইয়াস, ইসমাঈল, ইউনুস, লূত (আলাইহিমুস সালাম) ও তাঁদের বংশের নেককার মানুষদের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এটাই আল্লাহর দেখানো পথ। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান তাকে এ পথে পরিচালিত করেন। তবে যদি তারা শিরক করত, তাহ’লে তাদের সমস্ত সৎকর্ম বিফল হয়ে যেত’ (আন‘আম ৬/৮৮)

শিরকের অপরাধ এতটাই ভয়াবহ যে, মুশরিক ব্যক্তি জাহান্নামী হওয়ার পর দুনিয়ার সর্বস্ব দিয়ে হ’লেও জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাইবে। আনাস বিন মালেক হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘জাহান্নামে সবচেয়ে কম শাস্তি ভোগ কারী ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ বলবেন, ‘পৃথিবীর সবকিছুর মালিকানা যদি তুমি পেতে তবে কি জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সবকিছু ফিদইয়া হিসাবে দান করে দিতে? লোকটি বলবে, হ্যাঁ। আল্লাহ বলবেন, আমি তো তোমার কাছে এর চেয়ে অনেক সহজ একটি বিষয় চেয়েছিলাম। তুমি যখন আদমের পৃষ্ঠদেশে অবস্থান করছিলে তখন আমি তোমার কাছে চেয়েছিলাম যে, তুমি আমার সাথে শিরক করবে না। কিন্তু তুমি শিরক পরিত্যাগ করলে না’।[5]

আওফ ইবনু মালিক আল-আশজাঈ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে একজন আগন্তুক আমার সামনে আসলেন এবং ২টি প্রস্তাবের যে কোন একটি গ্রহণের ইখতিয়ার (স্বাধীনতা) দিলেন। (১) হয় আমার উম্মতের অর্ধেক সংখ্যক ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে অথবা (২) আমার সুপারিশের সুযোগ থাকবে। আমি সুপারিশ করাকেই বেছে নিলাম। আর তা হবে সেই সকল ব্যক্তিদের জন্য যে সকল ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার সাথে কোন শরীক না করে মৃত্যুবরণ করেছে’।[6]

শিরকের উপরোক্ত ভয়াবহ অবস্থার কারণেই রাসূল (ছাঃ) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘তুমি কোন কিছুকে আল্লাহর সাথ শরীক করো না। যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়’।[7]

প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা শিরকের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারলাম। এক্ষণে সচেতন মুসলমানদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন, পৃথিবীর প্রাচীনতম ও জঘন্যতম শিরক মূর্তিপূজার আয়োজনে মুসলমানদের সহযোগিতা করা কতটুকু সঙ্গত? নিজেদের ঈমানের প্রশ্নে আমরা কতটুকু সঠিক কাজ করেছি? আমরা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতে বাধা দিতে বলছি না। তাদের অনুষ্ঠান তারা করবে। তাদের হিসাব তারা দিবে। কিন্তু শুধুমাত্র দুনিয়াবী স্বার্থে ও ক্ষমতার লোভে নিজেদের ঈমান বিক্রি করে দেওয়া কতটা সঙ্গত হয়েছে। যে ইসলামী দলের নেতা-কর্মীদের এই শিরকের সহযোগিতায় সবচেয়ে বেশী ব্যতিব্যস্ত দেখা গেছে তাদেরই খ্যাতিমান আলেম মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী (রহঃ) হিন্দুদের দুর্গোৎসবে যে সকল আলেম-ওলামা অংশগ্রহণ করে তাদের তীব্র প্রতিবাদ করে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘...এরা মাওলানা নামের কলঙ্ক। মানুষ এইভাবে তার ঈমান নষ্ট করতে পারে? দুর্গাপূজা হিন্দুদের উৎসব। আমি এক লক্ষবার এক কোটিবার বলব, দুর্গা পূজার সাথে এ দেশের মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নেই। এটা মুসলানদের অনুষ্ঠান নয়’।

পরিশেষে বলব, ঈমান ও কুফর এবং শিরক ও তাওহীদ এক কলবে থাকতে পারে না। যে কলবে ঈমান ও তাওহীদের নূর থাকে সেখানে শিরক ও কুফরের কোন প্রবেশাধিকার নেই। ছাহাবীদের জীবনী থেকে আমরা এ শিক্ষাই পাই। কাফের-মুশরিকদের নির্যাতনে তাদের জীবন প্রায় ওষ্ঠাগত হ’লেও ঈমানের প্রশ্নে তারা কখনো আপোষ করেননি। জ্বলন্ত আগুনে জীবন্ত নিক্ষেপেও তারা ঈমান থেকে বিন্দুমাত্রও পিছপা হননি। সেই তুলনায় আমাদের পর্যায় কোথায়? শুধুমাত্র লেবাস আর মুখনিঃসৃত সুন্দর সুন্দর বাণী দিয়ে আর যাই হোক আখেরাতে সফলতা লাভ করা যাবে না। সবার আগে প্রয়োজন আদর্শিক দৃঢ়তা। অতএব মুসলিম নেতৃবৃন্দের প্রতি উদাত্ত আহবান, শিরক ও কুফরের সাথে আপোষ না করে এবং মানব রচিত বিধানের পিছনে সময় ক্ষেপণ না করে মহান আল্লাহ প্রদত্ত আসমানী বিধান ইসলামী খেলাফতের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তুলুন। ইনশাআল্লাহ সফলতা একদিন আপনার পদচুম্বন করবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!!


[1]. বুখারী হা/৫৯৭২; মুসলিম হা/২৬৯; মিশকাত হা/৫০

[2]. বুখারী হা/৬৮৭১।

[3]. মুসলিম হা/২৯৭; মিশকাত হা/৩৮

[4]. মুসলিম হা/২৬৮৭; ইবনু মাজাহ হা/৩৮২১; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী হা/৬৬৪৬

[5]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৬৭০।

[6]. তিরমিযী হা/২৪৪১; ইবনু মাজাহ হা/৪৩১৭; মিশকাত হা/৫৬০০।

[7]. আহমাদ হা/২১১২৮; ছহীহুত তারগীব হা/২৫১৬; মিশকাত হা/৬১






বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.