মুসলিম উম্মাহ একটি অবিচ্ছেদ্য দেহের মতো, যার এক অংশ ব্যথাতুর হ’লে অপর অংশও ব্যথিত হয়, যার রূহানী ও আত্মিক স্পন্দন হচ্ছে পবিত্র নগরী মক্কা-মদীনা তথা সঊদী আরব। সঊদী আরব হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের হার্ট তথা হৃদপিন্ড। এটি কেবলমাত্র একটি ভূখন্ড নয়, নয় একটি ভৌগোলিক সীমান্ত বা মানচিত্রের টুকরো। বরং এটি তাওহীদের আলোকবর্তিকা, অহি-র অবতরণভূমি এবং বিশ্বমুসলিম ঐক্যের চিরন্তন কেন্দ্রবিন্দু। বায়তুল্লাহর তাওয়াফ আর মসজিদে নববীর শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ মুসলিম হৃদয়ে যে ঈমানী স্পন্দন সৃষ্টি করে, তা ভৌগোলিক দূরত্বকে অতিক্রম করে বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে। সেকারণ এই পুণ্যভূমিতে সামান্যতম আঘাত, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অপচেষ্টা কিংবা আক্রমণের কালো ছায়া নেমে এলে তা কেবল কোন একটি রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ থাকে না, বরং তা আঘাত হানে প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের ঈমানী অনুভূতির মূলে। আর এই আক্রমণ যদি হয় কোন স্বজাতির পক্ষ থেকে তখন সেটি কতটা বেদনাবিধুর, কতটা লজ্জাজনক ও কতটা মর্মান্তিক তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
সম্প্রতি ইয়েমেনের উগ্রবাদী সশস্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘হুছী’ (حوثي) কর্তৃক সঊদী আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। চলতি অক্টোবর মাসে সে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় অন্তত ২৩ জন নিহত এবং ৩৭৪ জন আহত হয়েছেন বলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ৬ই অক্টোবর জাযান বিমানবন্দরে, ৭ই অক্টোবর আভা ও রিয়াদ বিমানবন্দরে, ৮, ১০ ও ১১ই অক্টোবর রিয়াদ বিমানবন্দরে, ১৩ই অক্টোবর সঊদী আরামকোর যাহরান সদর দফতরে, ২১শে অক্টোবর দাম্মাম বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্রে এসব হামলা চালানো হয়।
সঊদী নেতৃত্বাধীন জোটের ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিমানবন্দরগুলোতে হামলায় ১৯ জন নিহত ও ৩৬৪ জন আহত হয়। পরবর্তীতে ২১শে অক্টোবর দাম্মাম বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্রের ঘটনায় আরও চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে সর্বমোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ ও আহত হয় ৩৭৪ জন। এসব হামলার মাধ্যমে বিমান চলাচল ও জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে আরামকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবী আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে- কারা এই হুছী? কী তাদের পরিচয়? কেন তারা বিশ্ব মুসলিমের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ভূখন্ড সঊদী আরবকে টার্গেট করেছে? এ পর্যায়ে আমরা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো-
হুছী কারা?
ইয়েমেনের উত্তরে সউদী আরবের সীমান্ত (আসীর প্রদেশ) ঘেঁষে একটা পাহাড়ী প্রদেশ ‘ছা‘দা’ (صَعْدَة)। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ শী‘আদের একটি গ্রুপ ‘যায়দিয়া’দের অনুসারী। যায়দিয়ারা ইরানী শী‘আদের একটি শাখা। ইরানী শী‘আরা ১২ ইমামে বিশ্বাস করে। কিন্তু যায়দিয়ারা ৫ ইমামে বিশ্বাস করে। হুসাইন (রাঃ)-এর নাতি যায়েদ বিন আলীকে তারা ৫ম ইমাম হিসাবে বিশ্বাস করে বলে তাদেরকে ‘যায়দিয়া’ বলা হয়। তাঁর পরে নির্দিষ্ট কোন ইমামে তারা বিশ্বাস করে না, বরং আহ’লে বায়তের বংশধর হওয়ার শর্তে যে কোন জ্ঞানী, ধার্মিক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইকারী তাদের দৃষ্টিতে ইমাম হ’তে পারে। তবে রাফেযী শী‘আদের বিপরীতে আলী (রাঃ) ব্যতীত অন্য খলীফাদের খেলাফতকেও স্বীকৃতি দেয়া, গায়েবী ইমাম ও তাকিয়া নীতিতে বিশ্বাসী না হওয়া, মু‘তা বিবাহকে নিষিদ্ধ মনে করা, কবরকে গুরুত্বপূর্ণ না মনে করা ইত্যাদি কারণে তাদেরকে আহ’লে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের সবচেয়ে নিকটবর্তী মনে করা হয়। তাদের জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি, যা ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ।
দীর্ঘ এক হাযার বছর যাবত এই যায়দিয়ারা উত্তর ইয়েমেন শাসন করে আসছিল। ১৯৬২ সালে মিসরের সমর্থনে একটা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের শাসন ক্ষমতার অবসান ঘটে এবং ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র চালু হয়। নববই এর দশকের শেষে যায়দিয়া সম্প্রদায়ের পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের অংশ হিসাবে যুবকদের মাধ্যমে জন্মলাভ করে এই গ্রুপ। প্রথমে নাম ছিল ‘আশ-শাবাব আল-মুমিন’। তাদের আরেকটি নাম হচ্ছে ‘আনছারুল্লাহ’। ইরানী বিপ্লব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত এবং ইয়েমেনে সালাফী আক্বীদার প্রসারে ক্ষুব্ধ এই গ্রুপটি শুরুতে সশস্ত্র ছিল না। এর নেতৃত্বে ছিল হুছী পরিবারের সন্তান হুসাইন বদরুদ্দীন আল-হুছী (১৯৫৯-২০০৪)। তার নামানুসারে এই গ্রুপটির নামকরণ হয় ‘হুছী’। ২০০৪ সালের জুন মাসে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ ছালেহ-এর নির্দেশে সেদেশের সেনাবাহিনী এই হুছী নেতাকে গ্রেফতার করার জন্য অভিযান চালালে তিনি আত্মসমর্পন না করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিন মাস যুদ্ধ চলার পর তিনি নিহত হন। এরপর তার ভাই আব্দুল মালেক আল-হুছী (জন্ম : ১৯৭৯) তার স্থলাভিষিক্ত হন। সেই থেকে অদ্যাবধি তিনিই হুছীদের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ২০০৪ সালে ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে তাদের বিদ্রোহী তৎপরতা তীব্র হয়। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী ‘ছান‘আ’ দখলের পর হুছীরা দেশটির ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রধান শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। ২০১৫ সালে সঊদী আরবের নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করলে হুছীদের সঙ্গে সঊদী আরবের সংঘাত ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই সংঘাতের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের পাশাপাশি ইরান ও সঊদী আরবের আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বর্তমানে আব্দুল মালিক আল-হুছীর নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠী ইয়েমেনের উল্লেখযোগ্য ভূখন্ড ও জনবহুল অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বর্তমানে তারা ইরানের মদদপুষ্ট হয়ে এবং তাদের অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তায় প্রক্সি যোদ্ধা হিসাবে কাজ করছে। তারা সঊদী আরবের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করেও অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
উল্লেখ্য যে, বিগত এক যুগ থেকে চলে আসা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে সঊদী আরব ও হুছীদের এই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইয়েমেনের সাধারণ জনগণ। ইতিমধ্যে দেড় লাখেরও বেশী মানুষ মারা গেছে সরাসরি যুদ্ধে। হাযার হাযার মানুষ মারা গেছে অনাহারে-দুর্ভিক্ষে। ২০১৬-১৭ সালে সবচেয়ে ভয়াবহ কলেরা হয় এই ইয়েমেনে। এতে আক্রান্ত হয় প্রায় দশ লাখ মানুষ। ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যা ৪ কোটি ৩০ লাখ। তার মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ বেঁচে আছে এখন শুধুমাত্র ত্রাণের উপরে। এক সময়ের সমৃদ্ধ ইয়েমেন এখন কোথায়? যে ইয়েমেন বহু ছাহাবীর পদধূলিধন্য পুণ্যভূমি, যে ইয়েমেনের মুসলমানরা রক্তপাতহীনভাবে শুধুমাত্র কালেমার দাওয়াত পেয়ে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিল, যে ইয়েমেনে দাওয়াতের জন্য বিখ্যাত ছাহাবী মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)-কে রাসূল (ছাঃ) দাওয়াতের পদ্ধতি ও নছীহতসহ প্রেরণ করেছিলেন, যে ইয়েমেনে যাকাত নেওয়ার কোন প্রার্থী ছিল নাসে ইয়েমেনের এই হালচিত্র বড়ই নিষ্করুণ।
মক্কা ও মদীনার নিরাপত্তা :
মক্কা ও মদীনা মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মক্কায় অবস্থিত পবিত্র কা‘বা মুসলমানদের ক্বিবলা এবং মদীনায় অবস্থিত মসজিদে নববী ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এই কা‘বার ক্ষতিসাধন করার ক্ষমতা কারো নেই। মহান আল্লাহ তার ঘর ক্বিয়ামত পর্যন্ত নিরাপদে রাখবেন ইনশাআল্লাহ। বিগত যুগে হস্তিবাহিনী কা‘বা ধ্বংস করতে এসে যেমন নিজেরা ধ্বংস হয়েছিল, এমনকি চর্বিত ঘাসে পরিণত হয়েছিল (ফীল ১০৫/৫), ঠিক এ যুগেও আবরাহার কোন অনুসারী যদি আল্লাহর পবিত্র ঘর ও পবিত্র নগরী ধবংসে অগ্রসর হয় সেও একইভাবে ধ্বংসে নিপতিত হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা হজ্জ ও ওমরাহ পালনের জন্য এই নগরীতে আসেন। ফলে সঊদী আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হ’লে হাজী, ওমরাহযাত্রী ও সাধারণ ভ্রমণকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। সেকারণ পবিত্র নগরীর নিরাপত্তার জন্য আগাম সতর্কতা, আকাশ প্রতিরক্ষা, যরূরী চিকিৎসা, নিরাপদ পরিবহন এবং হাজীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা সঊদী সরকারের বিশেষ দায়িত্ব হ’লেও এর সঙ্গে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় অনুভূতি ও মানবিক স্বার্থ জড়িত। তাই এই সংকটকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে দেখতে হবে।
সংঘাতের প্রভাব :
হুছী ও সঊদী আরবের সঙ্গে সংঘাতের বিস্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রথমত- বেসামরিক মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাহীনতা : বিমানবন্দর, আবাসিক এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আক্রান্ত হ’লে সাধারণ মানুষ প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং বাস্ত্তচ্যুতির ঝুঁকিতে পড়েন। যুদ্ধের প্রধান ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রায়ই নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও বিদেশী শ্রমিকেরা থাকেন।
দ্বিতীয়ত- হজ্জ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হওয়া : বিমান চলাচল ব্যাহত হ’লে যাত্রীদের যাত্রাসূচী পরিবর্তন, ফ্লাইট বাতিল, অতিরিক্ত ব্যয় এবং আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার সৃষ্টি হ’তে পারে। বিশেষত বয়স্ক ও অসুস্থ হাজীদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন।
তৃতীয়ত- জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা : সঊদী আরব বিশ্ব জ্বালানি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটির তেল স্থাপনা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হবে।
চতুর্থত- আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার : হামলার জবাবে পাল্টা সামরিক অভিযান হ’লে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হ’তে পারে। এতে সঊদী আরব, ইয়েমেন এবং আশপাশের দেশগুলোর জনগণ নতুন মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারেন।
পঞ্চমত- প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ : সঊদী আরবে কর্মরত লাখ লাখ বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা ও জীবিকা এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের মতো শ্রম অভিবাসননির্ভর দেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
মুসলিম বিশ্বের করণীয় :
সঊদী আরবের বিরুদ্ধে হুছীদের সন্ত্রাসী হামলা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় মুসলিম বিশ্বকে সমন্বিত, বাস্তবসম্মত এবং দৃঢ় উদ্যোগ নিতে হবে। ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং আরব লীগের মত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এখনও যদি নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকায় থাকে, সেটা হবে চরম হতাশার। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যরূরী বৈঠক, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা আশু কর্তব্য। সাম্প্রতিক মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে।
একই সঙ্গে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে- ইরান শুরু থেকেই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সঊদী আরবের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে এবং এই সংকটকে দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলেছে। তারা হুছীদের অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে ইয়েমেনে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে এবং সঊদী আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। লোহিত সাগরে জাহাজ আক্রমণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও মুসলিম দেশগুলোর অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। ইরানের এই হস্তক্ষেপ বন্ধ না হ’লে মূলত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। মুসলিম বিশ্বকে ইরানের এই ধ্বংসাত্মক নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।
সর্বোপরি সংকটের সমাধানে সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। তবে সমঝোতা মানে আত্মসমর্পণ নয়। বেসামরিক জনগণের রক্তপাত বন্ধ করা, হাজীদের সুরক্ষা এবং মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র হারামাইনের নিরাপত্তাকেই আলোচনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর যুদ্ধ ও সংঘাত কখনো চূড়ান্ত বিচারে শান্তি বয়ে আনে না। সুতরাং পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির পথ অনুসন্ধানই এখন সময়ের দাবী।
সেই সাথে মনে রাখতে হবে যে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে যেমন দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসে না, তেমনি হুছীদের সশস্ত্র তৎপরতাকে উপেক্ষা করেও শান্তি আসবে না। তাই আলোচনার পাশাপাশি ইরানের হস্তক্ষেপ বন্ধে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
মহান আল্লাহ তাওহীদের দেশ সঊদী আরবকে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র হারামাইনকে সকল চক্রান্ত থেকে হেফাযত করুন এবং মুসলিম জনপদগুলোকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করুন-আমীন!