ভূমিকা :

মানুষের জীবন এক বৈচিত্র‍¨ময় ক্যানভাসের মতো, যার কিছু অংশ জনসমক্ষে উন্মোচিত আর কিছু অংশ একান্তই ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। সমাজের সামনে আমরা নিজেদের যতটা মার্জিত ও আদর্শবান হিসাবে উপস্থাপন করি, নির্জনতার অাঁধারে অনেক সময় সেই অবয়ব আমূল বদলে যায়। লোকচক্ষুর অন্তরালে বান্দা যখন আল্লাহর উপস্থিতিকে ভুলে গিয়ে কোন গুনাহ বা পাপে লিপ্ত হয়, তখন সেটাকে গোপন পাপ বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই পাপকে নগণ্য মনে হ’লেও এর আধ্যাত্মিক ও জাগতিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি কেবল ব্যক্তির নৈতিক পতনই ঘটায় না, বরং অন্তরের প্রশান্তি ও ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয়, হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে এবং পরকালীন জীবনে চরম লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ঈমানকে কলুষমুক্ত রাখা এবং চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জনে গোপন পাপের ভয়াবহতা অনুধাবন করা প্রতিটি জান্নাতপিয়াসী মানুষের জন্য অপরিহার্য। অত্র প্রবন্ধে এই গোপন পাপের স্বরূপ এবং এর মারাত্মক পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করা হ’ল।

গোপন পাপের স্বরূপ :

গোপন পাপ বলতে সেই সব পাপাচারকে বোঝায়, যা একজন ব্যক্তি লোকচক্ষুর অন্তরালে বা নির্জনে সম্পাদন করে। মূলত এটি অন্তরে আল্লাহর ভয়ে ঘাটতি থাকা এবং মহান আল্লাহকে মানুষের চেয়েও কম গুরুত্ব দেওয়ার নামান্তর। বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে এই পাপের দুয়ার অবারিত হয়েছে। গোপন পাপ কেবল বাহ্যিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানসিক ও যান্ত্রিক উভয় ক্ষেত্রেই বিস্তৃত। কতিপয় গোপন পাপের স্বরূপ হ’ল-

ক. ডিজিটাল পাপাচার : পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল চলচ্চিত্র দেখা, সোশ্যাল মিডিয়ায় বেগানার সাথে অনৈতিক কথোপকথন (চ্যাটিং) বা প্রেমালাপে মত্ত হওয়া, কুরুচিপূর্ণ ছবি বা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করা।

খ. দৈহিক ও চারিত্রিক স্খলন : নির্জনে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি দৃষ্টিপাত, হস্তমৈথুন, অবৈধ প্রেম বা পরকীয়া, রাস্তা-ঘাটে বা মার্কেটে বেগানার প্রতি গোপন দৃষ্টিপাত, যেনা-ব্যভিচার।

গ. ইবাদতে অবহেলা ও রিয়া : মানুষের সামনে দীর্ঘ ও সুন্দর করে ছালাত আদায় করা, কিন্তু নির্জনে অলসতা করা বা একাগ্রতাহীন ইবাদত করা। কোন নেক আমল কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করাও এক প্রকার সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ গোপন পাপ।

ঘ. অন্তরের ব্যাধি : হৃদয়ে অন্যের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার পোষণ করা এবং মানুষের সম্পর্কে মনে মনে মন্দ ধারণা রাখা, প্রকাশ্যে পরহেযগারিতা প্রকাশ করে নির্জনে সেটা ধরে না রাখা ইত্যাদি। মূলত গোপন পাপ হ’ল সেই নীরব ঘাতক যা একজন মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জিত সম্মান, আমল এবং মানসিক প্রশান্তিকে নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

গোপন পাপের পরিণাম ও ভয়াবহতা

১. নেক আমল বিনষ্ট হয় :

একজন মুমিনের সারা জীবনের পুঁজি হ’ল তার নেক আমল। হাশরের ময়দানে যখন সূর্যের প্রখরতায় মগজ টগবগ করে ফুটবে, তখন এই আমলগুলোই হবে আমাদের ছায়া, আমাদের বাঁচার অবলম্বন। কিন্তু কিবয়ামতের ময়দানে গোপন পাপ সর্বগ্রাসী আগুন হয়ে আমাদের সারাজীবনের নেক আমলের সঞ্চয়কে নিমিষেই ভস্মীভূত করে দিবে। ছাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) বলেন,لَأَعْلَمَنَّ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيضًا، فَيَجْعَلُهَا اللهُ هَبَاءً مَنْثُورًا، قَالَ ثَوْبَانُ: يَا رَسُولَ اللهِ صِفْهُمْ لَنَا، جَلِّهِمْ لَنَا أَنْ لَا نَكُونَ مِنْهُمْ، وَنَحْنُ لَا نَعْلَمُ، قَالَ: أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ، وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ، وَيَأْخُذُونَ مِنَ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُونَ، وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللهِ انْتَهَكُوهَا ‘আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি, যারা ক্বিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। ছাওবান (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছা.)! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদেরকে বলুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বললেন, ‘তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে’।[1]

আল্লাহুল মুস্তা‘আন! তারা কিন্তু কাফের বা মুনাফিক না। তারা তাহাজ্জুদের মতো মর্যাদামন্ডিত ইবাদতে অভ্যস্ত এবং রাত্রিকালীন কুরআন তেলাওয়াতকারী। আর এটা সবাই স্বীকার করবে যে, অন্তত তাহাজ্জুদগুযার ব্যক্তিরা কখনো বেনামাযী হয় না। বরং তারা সমাজের অন্যান্য বান্দার চেয়ে একটু হ’লেও উঁচু স্তরের বান্দা হিসাবে পরিগণিত। অথচ তাদের আমলনামার পাহাড় ক্বিয়ামতের দিন ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কারণ একটাই, তারা নির্জনে আল্লাহকে ভয় করত না; বরং গোপনে পাপ করে ফেলত। একটু ভাবুন তো! জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা আল্লাহর ইবাদতে কত কষ্ট করছি। কত দীর্ঘ ক্বিয়ামুল লায়ল, কত তৃষ্ণার্ত দুপুর কাটানো ছিয়াম, আর কত দান-ছাদাক্বাহ দিয়ে আমরা আমাদের নেক আমলের পাল্লা ভারী করার চেষ্টা করি। আমারা আকাঙ্ক্ষা করি এই আমলগুলোই হবে জান্নাতের চাবিকাঠি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এমন কিছু ‘গোপন ছিদ্র’ আমাদের আমলের পাত্রে থাকতে পারে, যা আমাদের অজান্তেই সবটুকু নেক আমল নিঃশেষ করে দিচ্ছে? হ্যাঁ, সেই নীরব ধ্বংসকারীর নামই হ’ল ‘গোপন পাপ’।

আমরা যখন লোকজনের সামনে থাকি, তখন আল্লাহর যিকির ও তাসবীহ-তাহলীলে আমাদের জিহবা সচল থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের প্রোফাইলে দ্বীনদারিতার ছাপ ফুটে ওঠে। আমাদের কথাবার্তা, পোশাক-আশাক ও আচরণে আল্লাহভীতির নিদর্শন দেখা যায়। কিন্তু আমরা যখন নির্জনে থাকি, ঘরের দরজাটি আটকে দেই, জানালার পর্দাটা টেনে দেই, তখন আমাদের সেই আল্লাহভীতি কি থাকে? তখন কি আমরা ভুলে যাই যে, এই অন্ধকার ঘরেও আল্লাহ আমাদের পর্যবেক্ষণ করছেন? যে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ দিয়ে আমরা দাওয়াতী কাজ করি, দ্বীনি আলোচনা শুনি- সেই একই ডিভাইসের সার্চ বক্সে যখন নির্জনে আমরা কোন অশ্লীল নীল ছবির সন্ধান করি, তখন আমরা মূলত মানুষের চেয়ে আল্লাহকে ছোট মনে করছি। এই অসম্মানই আমাদের আমল ধ্বংসের মূল কারণ।

কিং আব্দুল আযীয বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. ইব্রাহীম বিন হাসান আল-হাযরীতী বলেন, ‘কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এমন দেখা যায় যে, যখন সে একা থাকে এবং নিজের মোবাইল, কম্পিউটার বা এমন কোন টিভি চ্যানেলের সামনে বসে, যেখানে আল্লাহ হারাম করেছেন এমন বিষয় দেখানো হয়, তখনই সে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে ফেলে’।[2] ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন,الْحَذَرَ الْحَذَرَ مِنَ الذُّنُوبِ، خُصُوصًا ‌ذُنُوبَ ‌الْخَلَوَاتِ، فَإِنَّ الْمُبَارَزَةَ لِلَّهِ تَعَالَى تُسْقِطُ الْعَبْدَ مِنْ عَيْنِهِ ‘গুনাহ থেকে অত্যন্ত সাবধান থাক, বিশেষ করে নির্জনের গুনাহ থেকে। কারণ আল্লাহর অবাধ্যতায় দুঃসাহস দেখানো বান্দাকে তাঁর দৃষ্টি থেকে নামিয়ে দেয় (মর্যাদাহীন করে দেয়)। তুমি নির্জনে তোমার ও আল্লাহর মাঝের সম্পর্ক সংশোধন করে নাও, তিনি তোমার প্রকাশ্য অবস্থাকে সংশোধন করে দেবেন’।[3] আল্লামা ইবনু হাজার হাইতামী (রহ.) বলেন, إِظْهَارُ ‌زِيِّ ‌الصَّالِحِينَ ‌فِي ‌الْمَلَأِ ‌وَانْتِهَاكُ ‌الْمَحَارِمِ وَلَوْ صَغَائِرَ فِي الْخَلْوَةِ ‘জনসমক্ষে নেককারদের বেশভূষা ও আমল প্রকাশ করা, অথচ নির্জনে গেলেই আল্লাহর নিষিদ্ধ হারামে লিপ্ত হওয়া অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়, যদিও সেটা ছাগীরা গুনাহ হয়’।[4]

ভদ্র সমাজে অতি পরিচিত আরেকটি গোপন পাপ হ’ল হিংসা। এটি অত্যন্ত জঘন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শায়খ ইবনে উছায়মীন (রহ.)-এর মতে, অন্যের ওপর আল্লাহর নে‘মত দেখে অন্তরে কষ্ট পাওয়া বা তা অপসন্দ করাই হ’ল হিংসা। যখন কোন ব্যক্তি মানুষের সামনে তাদের প্রতি ভালোবাসা ও শুভকামনা প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তরে তাদের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করে, তখন সে মূলত অন্তরের গোপন পাপে লিপ্ত হয়।[5]

২. খারাপ মৃত্যু :

মানুষের জীবনের চূড়ান্ত সফলতা কিংবা ব্যর্থতা নির্ভর করে তার শেষ পরিণতির ওপর। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কৃত ইবাদতগুলো তখনই সার্থক হয়, যখন মৃত্যুটি ঈমানের সাথে ঘটে। কিন্তু গোপন পাপ অনেক সময় এই শেষ মুহূর্তের চিরস্থায়ী কামিয়াবির পথে অলঙ্ঘনীয় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। যারা লোকচক্ষুর অন্তরালে অবলীলায় আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তাদের জন্য অন্তিম মুহূর্তটি অত্যন্ত ভয়াবহ হ’তে পারে। মহান আল্লাহ বলেন,يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ ‘তারা লোকদের থেকে লুকাতে চায়, কিন্তু আল্লাহ থেকে লুকাতে পারে না। তিনি তাদের সঙ্গে থাকেন’ (নিসা ৪/১০৮)।

রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন,إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ الجَنَّةِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ النَّارِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ ‘নিশ্চয়ই কোন ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতবাসীদের মত আমল করে, অথচ সে জাহান্নামী। আবার কোন ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জাহান্নামীদের মত আমল করে, অথচ সে জান্নাতী’।[6] এই হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু রজব আল-হাম্বলী (রহ.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মন্দ পরিণতি বা অশুভ মৃত্যু হয়ে থাকে বান্দার কোন অভ্যন্তরীণ গোপন ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে, যা মানুষ জানতে পারে না; সেটি হ’তে পারে কোন মন্দ কাজ বা অনুরূপ কিছুর কারণে। সুতরাং সেই গোপন স্বভাবটিই মৃত্যুর সময় অশুভ পরিণতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়’।[7]

শায়খ উছায়মীন (রহ.) বলেন, ‘সে মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতবাসীদের মতো আমল করে ঠিকই, কিন্তু যা মানুষের কাছে গোপন থাকে তা হ’ল তার অন্তরের এক মন্দ গোপন রহস্য, যা তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। এজন্যই আমি সর্বদা মানুষকে তাদের অন্তর পরিষ্কার করার এবং অন্তরের প্রতি নজর রাখার তাগিদ দেই। কারণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল হ’ল গাছের গোড়ায় দেওয়া পানির মতো, কিন্তু মূল হ’ল গাছের শিকড় অর্থাৎ অন্তর। অনেক মানুষই বাহ্যিক আমলে ভুল না করার ব্যাপারে খুব যত্নশীল, অথচ তার অন্তর মুসলিমদের প্রতি, ওলামাদের প্রতি এবং ভালো মানুষদের প্রতি বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। এমন ব্যক্তির পরিণতি মন্দ হওয়ার ভয় থাকে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। কারণ অন্তরে যদি কোন মন্দ গোপন অভিসন্ধি থাকে, তবে তা তার মালিককে অতল গহবরে নিক্ষেপ করে।[8]

সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) এক রাতে খুব কান্নাকটি করছিলেন। সকাল হ’লে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল- আপনি কি আপনার পাপের ভয়ে এভাবে কাঁদছিলেন? তখন তিনি মাটি থেকে একটি খড়কুটো হাতে নিয়ে বললেন,الذُّنُوبُ أَهْوَنُ مِنْ هَذَا، وَإِنَّمَا أَبْكِي مِنْ خَوْفِ سُوءِ الْخَاتِمَةِ ‘গুনাহ তো এর চেয়েও তুচ্ছ (অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমার তুলনায় গুনাহ তো এই খড়কুটোর মতোই নগণ্য), আমি তো কাঁদছি মন্দ মৃত্যুর ভয়ে’। ইবনুল ক্বাইয়িম বলেন, মুমিন ব্যক্তির এই ভয় থাকা উচিত যে, তার কৃত পাপগুলো মৃত্যুর সময় তাকে অপদস্থ ও নিঃস্ব করবে এবং তার ও উত্তম মৃত্যুর মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে’।[9] সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর এই কথাটির অর্থ এই নয় যে, তিনি গুনাহকে ছোট মনে করতেন; বরং তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তওবার মাধ্যমে গুনাহ মাফ করা আল্লাহর জন্য খুব সহজ। কিন্তু আসল ভয় হ’ল- পাপের কারণে অন্তরে যে কালো দাগ পড়ে, তা যেন মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে ঈমানের ওপর অটল থাকতে বাধা না দেয়। কারণ, মানুষের সারাজীবনের অভ্যাসগুলোই মৃত্যুর সময় তার সামনে ফুটে ওঠে।

অতএব গোপন পাপে অভ্যস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে আশঙ্কা থাকে যে, মৃত্যুর সময় সেই পাপই তার ওপর প্রবল হয়ে উঠবে এবং তওবা করার আগেই শয়তান তাকে ঈমান থেকে বিচ্যুত করবে। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি নির্জনেও আল্লাহকে ভয় করে এবং অন্তর পরিষ্কার রাখে, আল্লাহ তার শেষ পরিণতি অবশ্যই সুন্দর করবেন। সুতরাং নিজের প্রকাশ্য ও গোপন উভয় জগতকে আল্লাহর অনুগত রাখাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

৩. অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয় :

গোপন পাপের অন্যতম ভয়ংকর পরিণতি হ’ল অন্তরের সংবেদনশীলতা হারিয়ে যাওয়া। মানুষের প্রতিটি অঙ্গের যেমন সুস্থতা ও অসুস্থতা রয়েছে। ঠিক তেমনি অন্তরের সুস্থতা হ’ল সত্যকে গ্রহণ করার এবং মিথ্যার প্রতি ঘৃণা পোষণ করার সক্ষমতা। কিন্তু নির্জনে ক্রমাগত পাপাচার এই সক্ষমতাকে চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়। এটি এমন এক পর্যায়, যেখানে মানুষের অন্তর পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। ফলে আল্লাহর রহমতের আলো সেখানে আর প্রবেশ করতে পারে না।

রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন,تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا، فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا، نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا، نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ، حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ، عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلَا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ، وَالْآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًّا كَالْكُوزِ، مُجَخِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا، وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا، إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ، ‘মানুষের হৃদয়ে ফিতনাসমূহ এমনভাবে প্রবেশ করে, যেমন অাঁশ একটির পর আরেকটি বিছানো হয়ে থাকে এবং যে হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তা প্রবেশ করে তাতে একটি কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর তাকে জায়গা দেয় না, তাতে একটি সাদা দাগ পড়ে। ফলে মানুষের অন্তর সমূহ পৃথক পৃথক দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক প্রকার অন্তর হয় মর্মর পাথরের মতো শ্বেত, যাকে আসমান ও যমীন বহাল থাকা পর্যন্ত (ক্বিয়ামত পর্যন্ত) কোন ফিতনাই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। অপরদিকে দ্বিতীয় প্রকার অন্তর হয় কয়লার মতো কালো। যেমন উপুড় হওয়া পাত্রের মতো, যাতে কিছুই ধারণ করার ক্ষমতা থাকে না। তা ভালোকে ভালো জানার এবং মন্দকে মন্দ জানার ক্ষমতা রাখে না। ফলে শুধুমাত্র তাই গ্রহণ করে যা তার প্রবৃত্তির চাহিদা হয়’।[10]

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন,إِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللهُ {كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} ‘বান্দা যখন একটি গোনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে। অতঃপর যখন সে গোনাহের কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তওবা করে তখন তার অন্তর পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। এটাই সেই মরিচা আল্লাহ তা‘আলা যার বর্ণনা করেছেন, ‘কখনো নয়, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে’ (মুত্বাফফিফীন ৮৩/১৪)।[11] ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন,أَنَّ الذُّنُوبَ إِذَا تَكَاثَرَتْ طُبِعَ عَلَى قَلْبِ صَاحِبِهَا، فَكَانَ مِنَ الْغَافِلِينَ ‘নিশ্চয়ই পাপ যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন সেই পাপ সম্পাদনকারীর অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়; ফলে সে চরম উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’।[12] গোপন পাপ মূলত বিষক্রিয়ার মতো ধীরে ধীরে হৃদয়কে অকেজো করে দেয়। বাহ্যিক ইবাদতের শরীর ঠিক থাকলেও ভেতরে আত্মিক স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। উপুড় করা পাত্রে যেমন বৃষ্টির পানি পড়েও তাতে স্থির হয় না, অন্তরে মোহর লেগে যাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রেও দ্বীনের জ্ঞান বা নছীহত কোন কাজে আসে না। সুতরাং অন্তরের এই চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব ও আধ্যাত্মিক মৃত্যু থেকে বাঁচতে হ’লে নির্জনের পাপাচার বর্জন করে অন্তরের আয়নাকে সর্বদা তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে উজ্জ্বল রাখা অপরিহার্য।

৪. তাওফীক্ব থেকে বঞ্চিত :

গুনাহের কারণে মানুষ যেসব অদৃশ্য ও গোপন শাস্তির সম্মুখীন হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় শাস্তি হ’ল নেক কাজের তাওফীক্ব হারিয়ে ফেলা। অনেক সময় আমরা বুঝতেও পারি না যে, নির্জনে করা একটি পাপাচার কিভাবে আমাদের পুরো জীবনকে বরকতহীন করে দিচ্ছে। গোপন পাপের ফলে মানুষের বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাধারায় বিকৃতি ঘটে, সত্য-মিথ্যা চেনার ক্ষমতা লোপ পায় এবং সময়ের ভয়াবহ অপচয় ঘটে। সবচেয়ে খারাপ পরিণতি হল, এর ফলে বান্দা মহান রবের সাথে নিভৃত মুনাজাত ও ইবাদতের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,فَمَا لَكُمْ فِي الْمُنَافِقِينَ فِئَتَيْنِ وَاللَّهُ ‌أَرْكَسَهُمْ ‌بِمَا ‌كَسَبُوا أَتُرِيدُونَ أَنْ تَهْدُوا مَنْ أَضَلَّ اللَّهُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا ‘অতঃপর তোমাদের কি হ’ল যে, তোমরা মুনাফিকদের বিষয়ে দু’দল হয়ে গেলে? অথচ আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছেন তাদের কৃতকর্মের জন্য। তাহ’লে কি তোমরা পথ প্রদর্শন করতে চাও, যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেছেন? আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি তার জন্য কোন (মুক্তির) পথ পাবে না’ (নিসা ৪/৮৮)।

অত্র আয়াতের وَاللَّهُ ‌أَرْكَسَهُمْ ‌بِمَا ‌كَسَبُوا (আল্লাহ তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছেন তাদের কৃতকর্মের জন্য)-এর ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, এর অর্থ হ’ল- তাদের পাপের কারণে, বিশেষ করে তাদের সংকল্প বা মন্দ নিয়তের কারণে আল্লাহ তাদেরকে তাদের সেই (বিপথগামী) অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছেন যে অবস্থায় তারা ছিল। বস্ত্তত পাপ বান্দাকে নেক আমল করার তাওফীক্ব থেকে বঞ্চিত করে। আর পাপসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হ’ল গোপন পাপ। সেটা হ’তে পারে অন্তরের মন্দ নিয়তের মাধ্যমে, অথবা লোকসমক্ষে আনুগত্য প্রকাশ করে নির্জনে গুনাহে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে’।[13]

অনেক সময় দেখা যায়, একজন মানুষ ছালাত আদায় করতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না, কুরআন তেলাওয়াতের ইচ্ছা থাকলেও পারছে না কিংবা দ্বীনি কোন মজলিসে বসার সুযোগ পাচ্ছে না। তিনি হয়তো মনে করছেন এটি তার সময়ের অভাব, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি তার ‘গোপন পাপের’ এক অদৃশ্য শিকল যা তাকে কল্যাণ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। বিশেষত কেউ যখন ইচ্ছাকৃতভাবে নির্জনতার সুযোগে আল্লাহর অবাধ্য হয়, তখন আল্লাহ তার নেক আমলের আগ্রহ কেড়ে নেন। তাই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর বিশেষ তাওফীক্ব ও সহযোগিতা প্রার্থনা করতে হ’লে নির্জনতার এই বিষাক্ত ছোবল থেকে আত্মরক্ষা করা অপরিহার্য।

৫. ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও ইলমের নূর থেকে বঞ্চিত হওয়া :

গোপন পাপের একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব হ’ল মানুষের মেধা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া এবং অর্জিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা। দ্বীনি জ্ঞান হ’ল বিশেষ এক ধরণের নূর বা আলো, যা আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দেন। কিন্তু যখনই কোন ব্যক্তি নির্জনে পাপাচারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, তখন সেই আলো নিভে যায় এবং হৃদয় এক দীর্ঘস্থায়ী বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন,الْمَعَاصِي تُنْسِي اللَّهَ وَمِنْ عُقُوبَاتِهَا: أَنَّهَا تَسْتَدْعِي نِسْيَانَ اللَّهِ لِعَبْدِهِ، وَتَرْكَهُ وَتَخْلِيَتَهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ نَفْسِهِ وَشَيْطَانِهِ، ‌وَهُنَالِكَ ‌الْهَلَاكُ ‌الَّذِي ‌لَا ‌يُرْجَى مَعَهُ نَجَاةٌ ‘পাপাচার আল্লাহকে ভুলিয়ে দেয়। আর গুনাহের অন্যতম শাস্তি হ’ল- এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাকে ভুলিয়ে রাখার (উপেক্ষা করার) কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং আল্লাহ তাকে তার নিজের প্রবৃত্তি ও শয়তানের কবলে একাকী ছেড়ে দেন। আর এখানে নিহিত রয়েছে এমন চরম ধ্বংস, যেখান থেকে আর মুক্তির কোন আশা থাকে না’।

আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ، وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ أُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিনের জন্য কি অগ্রিম প্রেরণ করছে? আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে আত্মভোলা করে দিয়েছেন। ওরাই হ’ল অবাধ্য’ (হাশর ৫৯/১৮-১৯)।[14]

ইমাম শাফেঈ (রহ.) যখন সর্বপ্রথম ইমাম মালেকের কাছে ইলম হাছিলের জন্য আসেন, তখন ইমাম মালেক (রহ.) তাঁর প্রখর মেধা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং অসাধারণ বোধশক্তি দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি নসিহত করে বললেন,إِنِّي أَرَى اللَّهَ قَدْ أَلْقَى عَلَى قَلْبِكَ نُورًا، فَلَا تُطْفِئْهُ بِظُلْمَةِ الْمَعْصِيَةِ، ‘আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আল্লাহ তোমার হৃদয়ে ইলমের নূর ঢেলে দিয়েছেন। অতএব পাপের অন্ধকারের মাধ্যমে এই নূরকে নিভিয়ে দিও না’।[15] ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর সেই বিখ্যাত কবিতাটি এখানে উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন,

‌شَكَوْتُ ‌إلَى ‌وَكِيْعٍ ‌سُوءَ ‌حِفْظِي * فَأَرْشَدَنِي إلَى تَرْكِ الْمَعَاصِي

وَقَالَ اعْلَمْ بِأَنَّ الْعِلْمَ نُورٌ * وَنُورُ اللَّهِ لَا يُؤْتَاه عَاصِي

‘আমি (আমার ওস্তায) ওকী‘-র কাছে দুর্বল মুখস্ত শক্তির ব্যাপারে অভিযোগ করলাম। ফলে তিনি আমাকে পাপ বর্জনের পরামর্শ দিলেন। আর বললেন, জেনে রেখ! ইলম হ’ল নূর। আর কোন পাপিষ্টকে আল্লাহর নূর প্রাদান করা হয় না’।[16]

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন,وَلِلْمَعَاصِي مِنَ الْآثَارِ الْقَبِيحَةِ الْمَذْمُومَةِ، الْمُضِرَّةِ بِالْقَلْبِ وَالْبَدَنِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ مَا لَا يَعْلَمُهُ إِلَّا اللَّهُ، فَمِنْهَا: حِرْمَانُ الْعِلْمِ، فَإِنَّ الْعِلْمَ نُورٌ يَقْذِفُهُ اللَّهُ فِي الْقَلْبِ، وَالْمَعْصِيَةُ تُطْفِئُ ذَلِكَ النُّورَ، ‘গুনাহ ও নাফরমানীর এমন অনেক কুৎসিত, নিন্দনীয় এবং ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে যা দুনিয়া ও আখেরাতে হৃদয় ও শরীরের ওপর নিপতিত হয়, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তার মধ্যে অন্যতম হ’ল ইলম বা জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া। নিশ্চয়ই ইলম হ’ল এক বিশেষ নূর, যা আল্লাহ বান্দার হৃদয়ে ঢেলে দেন। আর গুনাহ সেই নূরকে নিভিয়ে দেয়।[17]

বর্তমান যুগে অনেক শিক্ষার্থী বা পাঠক অভিযোগ করেন যে, অনেক পড়েও তারা মনে রাখতে পারছেন না। ইবাদতের ছোট ছোট বিষয়গুলোও ভুলে যাচ্ছেন। যখন যে দো‘আ পড়তে হয়, সেটা পড়তে ভুলে যাচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাতে দীর্ঘ সময় ধরে পড়াশোনা করে, কিন্তু পরদিন পরীক্ষার হলে গিয়ে পরিচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর মনে করতে পারে না। আবার কেউ ছালাতে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলার পর থেকে সালাম ফেরা পর্যন্ত কোন দো‘আই মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারেন না, কিংবা রুকু-সিজদার দো‘আ গুলিয়ে ফেলেন। এই বাস্তবতার পেছনে একটি সূক্ষ্ম ও গভীর কারণ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়, আর সেটা হ’ল গোপন পাপাচার। নির্জনে স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটে কৃত পাপাচারগুলো মানুষের বিবেককে আঘাত করে। সেই সময় হয়তো তা তুচ্ছ মনে হয়, কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তার মন ও মস্তিষ্কে এর প্রভাব পড়ে।

তবে এখানে এটাও মনে রাখা যরূরী যে, সব ভুলে যাওয়া বা মনোযোগের সমস্যা শুধু পাপের কারণে নয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, অগোছালো পড়ার পদ্ধতি- এসবও বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু গোপন পাপ এই সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে এবং আত্মিক দিক থেকেও ক্ষতির পরিমাণ বাড়ায়। সুতরাং একজন শিক্ষার্থী বা সাধারণ কোন ব্যক্তি যদি দেখে যে তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হচ্ছে বা ইবাদতে মনোযোগ কমে যাচ্ছে, তাহ’লে শুধু পড়ার পদ্ধতি ও বয়স বাড়ার কারণে নয়; বরং নিজের গোপন জীবন, একাকী সময়ের ব্যবহার এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এই আত্মসমালোচনাই হ’তে পারে তার উন্নতির সোপান।

৬. অন্তর কঠোর হয়ে যায় :

পার্থিব জীবনে মানুষ সাধারণত ধন-সম্পদের অভাব বা শারীরিক অসুস্থতাকেই বড় বিপদ মনে করে। কিন্তু সালাফে ছালেহীন তথা পূর্বসূরি নেককারগণের নিকট সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল অন্তরের কঠোরতা। গোপন পাপাচার মানুষের হৃদয়কে শক্ত ও পাথর সদৃশ করে দেয়, ফলে সেখান থেকে কোমলতা এবং আল্লাহভীতি বিদায় নেয়। প্রখ্যাত তাবেঈ মালেক বিন দীনার (রহ.) বলেন,إِنَّ لِلَّهِ عُقُوبَاتٍ فِي الْقُلُوبِ وَالْأَبْدَانِ؛ ‌ضَنْكٌ ‌فِي ‌الْمَعِيشَةِ، وَوَهْنٌ فِي الْعِبَادَةِ، وَمَا ضُرِبَ عَبْدٌ بِعُقُوبَةٍ أَعْظَمَ مِنْ قَسْوَةِ الْقَلْبِ ‘নিশ্চয়ই অন্তর ও দেহের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে; যেমন জীবনযাপনে সংকীর্ণতা এবং ইবাদতে অলসতা বা দুর্বলতা। আর কোন বান্দাকেই ‘অন্তর কঠোর হয়ে যাওয়া’র চেয়ে বড় কোন শাস্তি দেওয়া হয়নি’।[18]

যখন মানুষের অন্তর কঠোর হয়ে যায়, তখন সে উপদেশ গ্রহণ ও শিক্ষা লাভের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। তার সামনে পবিত্র কুরআনের ভীতিপ্রদ আয়াত পাঠ করা হ’লেও সে প্রভাবিত হয় না; এমনকি চোখের সামনে কারো মৃত্যু বা কোন বড় দুর্ঘটনা দেখলেও তার হৃদয়ে আখেরাতের চিন্তা উদয় হয় না। নির্জনে কৃত গুনাহের কারণেই মানুষ এই আধ্যাত্মিক পঙ্গুত্বের শিকার হন। আল্লাহ বলেন,فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَكِنْ قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ‘যখন তাদের কাছে আমাদের শাস্তি এসে গেল, তখন কেন তারা বিনীত হ’ল না? বরং তাদের অন্তরসমূহ শক্ত হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাজগুলিকে তাদের নিকটে শোভনীয় করে দেখালো’ (আন‘আম ৬/৪৩)। অত্র আয়াতে তাফসীরে ইমাম তাবারী বলেন, তাদের অন্তর শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হ’ল তারা এমন সব কাজ করত, যা আল্লাহ অপসন্দ করেন এবং যার কারণে তিনি তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন’।[19]

শিক্ষা গ্রহণ বা উপদেশ গ্রহণ মূলত তাক্বওয়ার নূরের মাধ্যমেই সম্ভব হয়। কিন্তু অন্তর যখন কঠোর হয়ে যায়, তখন সেই নূর অন্তর থেকে বিদায় নেয়। আল্লাহ বলেন,سَيَذَّكَّرُ مَنْ يَخْشَى ‘সত্বর উপদেশ গ্রহণ করবে সেই ব্যক্তি, যে ব্যক্তি ভয় করে’ (আ‘লা ৮৭/১০)। অর্থাৎ যারা নির্জনে ও লোকচক্ষুর অনন্তরালে আল্লাহকে ভয় করে, কেবল তাদের অন্তরই উপদেশ গ্রহণের জন্য উর্বর থাকে। পক্ষান্তরে যারা নির্জনে আল্লাহর অবাধ্যতায় দুঃসাহস দেখায়, তাদের অন্তর ক্রমশ সংবেদনহীন হয়ে পড়ে। তাই হৃদয়ের কোমলতা রক্ষা করতে এবং হেদায়াতের নূরে নিজেকে উদ্ভাসিত রাখতে নির্জনতার প্রতিটি মুহূর্তকে পাপাচারমুক্ত রাখা অপরিহার্য।

৭. মনস্তাত্বিক অশান্তি ও গোপন প্রভাব :

পাপের এক ধরণের অদৃশ্য বা গোপন শাস্তি হ’ল গুনাহের পর্দাগুলো অবাধ্য ব্যক্তির অন্তরে এক ভয়াবহ একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা তৈরী করে। পাপীর এই একাকিত্ববোধ তার রবের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে এবং অন্য মানুষের সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রেও অনুভব করে। মূলত গুনাহের এই আবরণ গুলো অনেকটা চুম্বকের মত, যা মানুষের অন্তরে হরেক রকমের ভয়-ভীতি টেনে আনে। যেমনটি মহান আল্লাহ মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেছেন, إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ ‘এরা হ’ল শয়তান! যারা তাদের বন্ধুদের থেকে তোমাদের ভয় দেখায়’ (আলে ইমরান ৩/১৭৫)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুর রহমান আস-সা’দী (রহ.) বলেন, ‘শয়তান তার বন্ধুদের মাধ্যমে সেই সব লোকদের ভয় দেখায়, যাদের ঈমান নেই অথবা (গুনাহের কারণে) যাদের ঈমান দুর্বল হয়ে পড়েছে’।[20]

পাপী ব্যক্তির ভয়ের কোন শেষ নেই, কখনো অসুস্থতার ভয়, কখনো রিযিকের দুশ্চিন্তা, কখনো শত্রুর ভয়, আবার কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা। এমনকি কখনো কখনো এমন এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করে, যার কারণ সে নিজেও জানে না। আবার কেউ হয়ত আগে খুব স্বাভাবিকভাবে মানুষের সাথে মিশত, আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু গোপন পাপে জড়িয়ে পড়ার পর সে নিজেই লক্ষ্য করবে যে, মানুষের সামনে গেলে অকারণে অস্বস্তি কাজ করছে, চোখে চোখ রাখতে সংকোচ হচ্ছে, মনে হয় সবাই যেন তাকে বিচার করছে। যদিও বাস্তবে কেউ কিছু জানে না, তবুও অন্তরের ভেতরে এক ধরণের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়ে যায়। এটা মূলত গোপন পাপের একটি সুক্ষ্ম প্রভাব।

তাছাড়া পাপের আরো কিছু গোপন প্রভাব আছে, যা অধিকাংশ সময় বান্দা বুঝতে পারে না। হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, ‘পাপ কখনোই শাস্তি বা কুপ্রভাব থেকে মুক্ত থাকে না। কিন্তু বান্দা তার অজ্ঞতার কারণে সেই শাস্তির অনুভূতি টেঁর পায় না; কারণ সে তখন এমন এক নেশাগ্রস্ত, অবশ বা ঘুমন্ত ব্যক্তির মতো থাকে যে ব্যথার অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। পাপাচারের পরিণাম হিসাবে শাস্তি আসাটা ঠিক তেমনি অবধারিত, যেমন আগুনে হাত দিলে পুড়ে যাওয়া, আছাড় খেলে ভেঙে যাওয়া, পানিতে পড়লে ডুবে যাওয়া কিংবা বিষপানে দেহ নষ্ট হয়ে যাওয়া অবধারিত। কখনো পাপাচারের ক্ষতি সাথে সাথেই দেখা দেয়, আবার কখনো তা প্রকাশ পেতে কিছুটা দেরি হয়। যেমন রোগের উপসর্গ সাথে সাথে প্রকাশ পায় আবার কিছুটা সময়ও নিতে পারে। এই জায়গাতেই বান্দার বড় ভুল হয়ে যায়। সে পাপ করে কিন্তু সাথে সাথে তার কোন কুফল দেখতে পায় না। সে জানে না যে, বিষ বা ক্ষতিকর বস্ত্ত যেমন তিলে তিলে নিজের কাজ করে যায়, পাপও ঠিক সেভাবেই ধীরে ধীরে কাজ করে। বান্দা যদি তওবা ও আত্মশুদ্ধিরূপ ওষুধের মাধ্যমে নিজেকে সামলে না নেয়, তবে সে ধ্বংসের দিকেই এগিয়ে যায়। একটিমাত্র পাপের পরিণাম যদি এমন হয় যার কোন প্রতিষেধক নেওয়া হয়নি, তবে প্রতিদিন ও প্রতি ঘণ্টায় স্ত্তপ হওয়া পাহাড় সমান পাপের অবস্থা কেমন হবে?’[21]

ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন,فَوَا أَسَفَا لِمَضْرُوبٍ بِالسِّيَاطِ مَا يُحِسُّ بِالْأَلَمِ! وَلِمُثْخَنٍ بِالْجِرَاحِ، وَمَا عِنْدَهُ مِنْ نَفْسِهِ خَبَرٌ! وَلِمُتَقَلِّبٍ فِي عُقُوبَاتٍ مَا يَدْرِي بِهَا! وَلَعَمْرِي ‌إِنَّ ‌أَعْظَمَ ‌الْعُقُوبَةِ أَنْ لَا يَدْرِيَ بِالْعُقُوبَةِ، ‘আফসোস সেই ব্যক্তির জন্য যাকে চাবুক মারা হচ্ছে অথচ সে ব্যথা অনুভব করছে না! আক্ষেপ সেই ক্ষতবিক্ষত ব্যক্তির জন্য যার নিজের অবস্থা সম্পর্কে কোন খবর নেই! পরিতাপ সেই ব্যক্তির জন্য যে শাস্তির আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে অথচ সে তা টেরও পাচ্ছে না! আমার জীবনের কসম! নিশ্চয়ই সবচেয়ে বড় শাস্তি হ’ল নিজের শাস্তি সম্পর্কে কোন অনুভূতি বা জ্ঞান না থাকা’।[22]

৮. ইবাদতের মিষ্টতা হারিয়ে যায় :

গোপন পাপের অত্যন্ত বেদনাদায়ক পরিণাম হ’ল ইবাদতের স্বাদ বা মিষ্টতা হারিয়ে ফেলা। মহান আল্লাহর আনুগত্যের মাঝে যে অনাবিল প্রশান্তি নিহিত রয়েছে, পাপাচারের কলুষতা সেই স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। মূলত ইবাদত তখন কেবল যান্ত্রিক একটি অভ্যাসে পরিণত হয়, যা হৃদয়ে কোন আবেদন তৈরি করতে পারে না। আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহ.) বলেন, উহাইব ইবনুল ওয়ারদ (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, সে কি ইবাদতের স্বাদ পায়? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,وَلَا مَنْ يَهُمُّ بِالمَعْصِيَةِ ‘না, এমনকি সেই ব্যক্তিও পায় না যে গুনাহ করার সংকল্প করে’।[23] বিশর ইবনুল হারেছ (রহ.) বলেন,لَا يَجِدُ الْعَبْدُ حَلَاوَةَ الْعِبَادَةِ حَتَّى يَجْعَلَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الشَّهَوَاتِ حَائِطًا مِنْ حَدِيدٍ ‘বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ইবাদতের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না সে নিজের এবং কুপ্রবৃত্তির কামনার মাঝে লোহার একটি প্রাচীর গড়ে তুলবে’।[24]

ইয়াহইয়া বিন মু‘আয (রহ.) বলেন, إِنَّ الْعَبْدَ عَلَى قَدْرِ إِدَامَتِهِ لِطَاعَتِهِ يُحَلِّيهَا فِي صَدْرِهِ وَعَلَى قَدْرِ لَهْجَتِهِ بِذِكْرِهِ يُدِيمُ أَلْطَافَ بِرِّهِ ‘বান্দা আল্লাহর আনুগত্যে যতটুকু অবিচল থাকে, আল্লাহ সেই আনুগত্যকে তার হৃদয়ে ততটুকুই মধুর করে দেন। তার জিহবা আল্লাহর স্মরণে যতটুকু সিক্ত থাকে, আল্লাহ তার ওপর তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ ততটুকুই নিরবচ্ছিন্ন রাখেন’।[25]

ইবনু রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন,إِنَّ الذُّنُوبَ تَتْبَعُهَا وَلَابُدَّ مِنَ الْهُمُومِ وَالْآلَامِ وَضِيقِ الصَّدْرِ وَالنَّكَدِ، وَظُلْمَةِ الْقَلْبِ، ‌وَقَسْوَتِهِ ‌أَضْعَافُ أَضْعَافُ مَا فِيهَا مِنَ اللَّذَّةِ، وَيَفُوتُ بِهَا مِنْ حَلَاوَةِ الطَّاعَاتِ ‘নিশ্চয়ই পাপের পেছনে আবশ্যিকভাবেই দুশ্চিন্তা, বেদনা, মনের সংকীর্ণতা, অশান্তি, অন্তরের অন্ধকার ও কঠোরতা এমনভাবে ধেয়ে আসে যা সেই পাপের ক্ষণিক স্বাদের চেয়ে বহুগুণ বেশী। আর এর ফলে ইবাদতের মিষ্টতা বা স্বাদও হারিয়ে যায়’।[26]

৯. মানুষের অন্তরের মহববত উঠে যাওয়া ও লাঞ্ছনা :

মানুষের সম্মান ও মর্যাদা কেবল তার পোশাক বা পদমর্যাদার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ দান। গোপন পাপের অন্যতম ভয়াবহ জাগতিক পরিণতি হ’ল মানুষের হৃদয় থেকে সেই অপরাধীর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি উঠে যাওয়া। বান্দা যখন নির্জনে আল্লাহর অবাধ্যতার দুঃসাহস দেখায়, তখন আল্লাহ আসমানবাসী ও যমীনবাসীদের অন্তরে তার প্রতি এক ধরনের ঘৃণা সৃষ্টি করে দেন, যা সে ঘুণাক্ষরেও টের পায় না।

বিশিষ্ট ছাহাবী আবুদ্দারদা (রা.) বলেন,حَذَرَ امْرُؤٌ أَنْ تُبْغِضَهُ قُلُوبُ الْمُؤْمِنِينَ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُ ‘প্রত্যেক ব্যক্তির এই বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত যেন মুমিনদের অন্তর তাকে ঘৃণা করতে শুরু না করে, অথচ সে টেরও পাবে না’। এরপর তিনি প্রশ্ন করলেন, أَتَدْرِي مَا هَذَا؟ ‘তুমি কি জানো সেটা কী?’ বর্ণনাকারী বললেন, ‘না’। তখন আবুদ্দারদা (রা.) বললেন,الْعَبْدُ يَخْلُو بِمَعَاصِي اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فَيُلْقِي اللهُ بُغْضَهُ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ مِنْ حَيْثُ لَا يَشْعُرُ ‘বান্দা যখন নির্জনে আল্লাহর অবাধ্যতায় (পাপে) লিপ্ত হয়, তখন মহান আল্লাহ মুমিনদের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ঢেলে দেন, যা সে নিজেও বুঝতে পারে না’।[27] ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন, ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের নির্জন মুহূর্ত এবং গোপন অবস্থাগুলোকে কখনো অবহেলা করো না। কারণ সব আমলই নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতিদান দেওয়া হয় ইখলাছের পরিমাপ অনুযায়ী’।[28]

অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না কেন মানুষ আমাদের এড়িয়ে চলছে বা কেন আমাদের প্রতি তাদের পূর্বের সেই শ্রদ্ধা ও মায়া অবশিষ্ট নেই। বাহ্যিকভাবে হয়তো আমরা খুব অমায়িক ব্যবহার করছি, কিন্তু আমাদের নির্জন মুহূর্তের পাপাচার আমাদের ব্যক্তিত্বের নূর কেড়ে নিচ্ছে। আমরা যদি আল্লাহর সাথে আমাদের গোপন সম্পর্কটুকু সংশোধন করি, তবে আল্লাহ মানুষের অন্তরে আমাদের জন্য অকৃত্রিম মর্যাদা তৈরি করে দিবেন। উছমান (রা.) বলেন,مَا أَسَرَّ أَحَدٌ سَرِيرَةً إِلَّا وَأَظْهَرَهَا اللَّهُ عَلَى ‌قَسَمَاتِ ‌وَجْهِهِ أَوْ ‌فَلَتَاتِ ‌لِسَانِهِ، ‘কোন ব্যক্তি এমন কোন গোপন বিষয় লুকিয়ে রাখে না, যা আল্লাহ তার চেহারার অভিব্যক্তি অথবা জিহবার অসতর্ক উচ্চারণে প্রকাশ করে দেন না’।[29] অর্থাৎ কেউ যদি নির্জনে কোন পাপে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার অন্তরের কলুষতা তার চেহারার ভাঁজে অথবা কথার ফাঁক দিয়ে মানুষের কাছে প্রকাশ পেয়ে যাবেই। তিনি মানুষের সামনে ভালো সাজার অভিনয় করতে পারেন, কিন্তু ভেতরের অন্ধকারকে বেশীক্ষণ চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন,وَرَأَيْتُ أَقْوَامًا مِنَ الْمُنْتَسِبِينَ إِلَى الْعِلْمِ، ‌أَهْمَلُوا ‌نَظَرَ ‌الْحَقِّ -عَزَّ وَجَلَّ- إِلَيْهِمْ فِي الْخَلَوَاتِ، فَمَحَا مَحَاسِنَ ذِكْرِهِمْ فِي الْجَلَوَاتِ، فَكَانُوا مَوْجُودِينَ كَالْمَعْدُومِينَ، لَا حَلَاوَةَ لِرُؤْيَتِهِمْ، ولا قَلْبَ يَحِنُّ إِلَى لِقَائِهِمْ، ‘আমি ইলমের সাথে সম্পৃক্ত এমন অনেক সম্প্রদায়কে দেখেছি, যারা নির্জনে মহান আল্লাহর দৃষ্টির কথা ভুলে গিয়ে অবহেলায় মত্ত হয়েছে। ফলে আল্লাহ জনসমক্ষে তাদের সুখ্যাতি ও মর্যাদাকে মুছে দিয়েছেন। তারা জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃতদের মতো হয়ে গিয়েছিল; তাদের দর্শনে কোন মাধুর্য ছিল না এবং কারো অন্তর তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হ’ত না’।[30] অতএব আমরা যদি চাই মানুষ আমাদের সম্মান করুক এবং ভালোবাসুক, তবে মানুষের সামনে কৃত্রিম অভিনয় করার চেয়ে নিজের নির্জন জগতকে আল্লাহর কাছে সুন্দর করা অপরিহার্য। কারণ বান্দার ভেতরটা সুন্দর হ’লে আল্লাহ তার চেহারা ও কথাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে দেবেন। পক্ষান্তরে গোপন পাপ হ’ল সেই গ্লানি, যা মানুষের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং তাকে জনসমক্ষে লাঞ্ছিত ও একাকী করে ফেলে। তাই আত্মমর্যাদা ও সামাজিক সম্মান রক্ষার প্রধান শর্ত হ’ল আল্লাহর দৃষ্টিকে ভয় করে নির্জনতাকে পাপাচারমুক্ত রাখা।

১০. আল্লাহর নিয়ামত হাতছাড়া হয়ে যায় :

মানুষের জীবনে সুখ, শান্তি, রিযিক, মেধা, সুস্থতা, ইবাদতের সুযোগ ও আগ্রহ প্রভৃতি আল্লাহর বিশেষ নে‘মত। কিন্তু নির্জনে কৃত পাপাচার এই নে‘মতগুলোকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এক সময় তা জীবন থেকে চিরতরে ছিনিয়ে নেয়। পাপাচার কেবল পরকালেই ক্ষতি করে না, বরং ইহকালেই বান্দাকে প্রাপ্ত নে‘মত থেকে বঞ্চিত করে দেয়। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রা.) বলেন, ‘বান্দা যখনই কোন গুনাহ করে, সেই গুনাহের পরিমাণ অনুযায়ী আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কোন না কোন নে‘মত বিলুপ্ত হয়ে যায়। সে যদি তওবা করে এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসে, তবে সেই নে‘মত (বা তার সমতুল্য কিছু) তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সে যদি পাপে অবিচল থাকে, তবে তা আর ফিরে আসে না। এভাবে গুনাহসমূহ বান্দার কাছ থেকে নে‘মতসমূহ ছিনিয়ে নিতে থাকে, এমনকি একপর্যায়ে তার সমস্ত নে‘মতই অপসৃত হয়ে যায়। আর সবচেয়ে বড় নে‘মত হ’ল ঈমাদ। ব্যভিচার, চুরি, মদ্যপান এবং লুঠতরাজের মত পাপসমূহ এই ঈমানী নে‘মতকে দূর করে দেয় ও ছিনিয়ে নেয়’।[31]

নেক আমলের সুযোগ পাওয়া বা ইবাদতে মনোযোগী হ’তে পারাও অনেক বড় নে‘মত। ফুযাইল ইবনে ইয়ায (১০৭-১৮৭হি.) বলেন,‌مَنْ ‌اسْتَحْوَذَ ‌عَلَيْهِ ‌الْهَـوَى وَاتِّبَاعُ الشَّهَوَاتِ انْقَطَعَتْ عَنْهُ مَوَادُّ التَّوْفِيقِ، ‘কুপ্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা যার উপর বিজয়ী হয়। তার থেকে তাওফীকের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়’।[32] অর্থাৎ পাপ করার কারণে তার থেকে নেক কাজের সুযোগগুলো কেড়ে নেওয়া হয়। সালাফে ছালেহীনের জীবনে এর অনেক চাক্ষুষ উদাহরণ পাওয়া যায়। সুফিয়ান ছাওরী (৯৭-১৬১ হি.) বলেন,‌حرمت ‌قيام ‌الليل خمسة أشهر بذنب أذنبته، ‘একটি পাপের কারণে আমি পাঁচ মাস ক্বিয়ামুল লায়ল থেকে বঞ্চিত হয়েছি’। তাকে বলা হ’ল সেটা কী পাপ?

তিনি বলেন,رأيت رجلاً يبكي، فقلت في نفسي: هذا مراء، ‘আমি এক ব্যক্তিকে কাঁদতে দেখে মনে মনে বলেছিলাম, সে ভান করছে’।[33] সুবহানাল্লাহ! অন্যের ইখলাছ নিয়ে কেবল মনে মনে সন্দেহ করার কারণে যদি তাহাজ্জুদের নে‘মত চলে যায়, তবে আজ আমরা নির্জনে যেসব ভয়াবহ পাপাচার করছি, তার ফলে আমাদের জীবন থেকে কত কল্যাণ যে বিদায় নিচ্ছে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর কাছে যখন কোন মাসআলা জটিল বা অস্পষ্ট হয়ে যেত, তখন তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলতেন,‌مَا ‌هَذَا ‌إِلَّا ‌لِذَنْبٍ ‌أَحْدَثْتُهُ ‘এটি আমার নতুন কোন পাপের কারণেই ঘটেছে’। তারপর তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন, অনেক সময় উঠে ছালাত আদায় করতেন; অতঃপর মাসআলাটি তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে যেত এবং তিনি বলতেন, رَجَوْتُ أَنِّي تِيبَ عَلَيَّ ‘আমি আশা করি আমার তওবা কবুল করা হয়েছে।[34] সুতরাং সবসময় মনে রাখতে হবে যে, গোপন পাপ মানুষের নে‘মত ও সফলতার ভিত্তিগুলোকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। তাই জীবনের প্রতিটি নে‘মতকে টিকিয়ে রাখতে এবং ঈমানের নূর বৃদ্ধি করতে নির্জনতার প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টিমূলক কাজের মাধ্যমে দিয়ে সাজিয়ে তোলা অপরিহার্য।

উপসংহার :

গোপন পাপ বান্দার পাহাড়সম নেক আমলকে নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দেয়। এটি মানুষের অন্তরকে কঠোর করে, মেধা ও ইবাদতের স্বাদ কেড়ে নেয় এবং পরিশেষে এক লাঞ্ছনাকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। যারা নির্জনে আল্লাহকে ভয় করে না, আল্লাহ তাদের মর্যাদা মুমিনদের হৃদয় থেকে মুছে দেন। তাই ইহকালীন সম্মান ও পরকালীন মুক্তির জন্য প্রকাশ্য জীবনের চেয়েও গোপন জগতকে অধিক পবিত্র রাখা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের নির্জনতাকে তাঁরই আনুগত্যের নূরে আলোকিত করুন। আমীন!


[1]. ইবনু মাজাহ হা/৪২৪৫; ছহীহাহ হা/৫০৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৫০২৮।

[2]. ইবরাহীম বিন হাসান আল-হাযরীতী, আছারু আমালিল কলব আলা ইবাদাতিছ ছাওম (সঊদী আরব : দারুল ইলম, ১৪৪২হি./২০২১খ্রি.), পৃ. ১০৮।

[3]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাতের (দামেশক্ব : দারুল কলম, ১ম মুদ্রণ, ১৪২৫হি./২০০৪খ্রি.), পৃ. ২০৭।

[4]. ইবনু হাজার হায়তামী, আয-যাওয়াজির আন ইক্বতিরাফিল কাবায়ের (বৈরূত : দারুল ফিক্র, ১ম মুদ্রণ, ১৪০৭হি./১৯৮৭খৃ.), ২/২০৯।

[5]. ইবনে উছায়মীন, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ২৪/২।

[6]. বুখারী হা/২৮৯৮; মুসলিম হা/১১২; মিশকাত হা/৮৩।

৭. ইবনু রজব হাম্বালী, জামে‘উল উলূম ওয়াল হিকাম, তাহক্বীক : শু‘আইব আরনাঊত্ব (বৈরূত : মু‘আস্সাতুর রিসালাহ, ৭ম সংস্করণ, ১৪২২হি./২০০১খৃ.) ১/১৭২।

৮. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল, ৫/২৩৮।

[9]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফী (মরক্কো : দারুল মা‘রেফাহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৮হি./১৯৯৭খ্রি.), পৃ. ১৬৭।

[10]. মুসলিম হা/১৪৪; ছহীহুত তারগীব হা/২৩১৯; আহমাদ হা/২৩৩২৮; ছহীহুল জামে‘ হা/২৯৬০।

১১. তিরমিযী হা/৩৩৩৪; ছহীহুত তারগীব হা/১৬২০, সনদ হাসান।

১২. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জওয়াবুল কাফী, পৃ. ৬০।

[13]. আব্দুল আযীয আত-ত্বারীফী, আত-তাফসীর ওয়াল বায়ান লি আহকামিল কুরআন, ২/৯২৯।

১৪. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ৭০।

[15]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্বক্বি‘ঈন বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১১হি./১৯৯১খ্রি.), ৪/১৯৯; আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ৫২।

[16]. ক্বাসত্বালানী, আল-মাওয়াহিবুল লাদুননিইয়াহ (কায়রো : আল-মাকতাবাতুত তাওফীক্বিইয়াহ, তা.বি), ৩/১০; আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ৫২।

১৭. ইবনু ক্বাইয়িম, আল-জাওয়াবুল কাফী, পৃ. ৫২।

[18]. আবু নু‘আইম আল-ইছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৬/২৮৭।

[19]. ইমাম ত্বাবারী, জামে‘উল বায়ান ফী তাবীলিল কুরআন (তাফসীরে তাবারী), ১১/৩৫৭।

২০. তাফসীরে সা‘দী, পৃ. ১৫৭।

২১. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-জওয়াবুল কাফী, পৃ. ১১৬।

[22]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃ. ২০৩।

[23]. শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, তাহক্বীক্ব : শু‘আইব আরনাউত্ব ও অন্যান্য (বৈরূত : মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪০৫হি./১৯৮৫খৃ.), ৭/১৯৯; হাফেয মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাঈর রিজাল, ৩১/১৭১।

২৪. আবু নু‘আইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৮/৩৫৪।

২৫. হিলয়াতুল আওলিয়া, ১০/৫৮।

[26]. তাফসীরে ইবনে রজব হাম্বলী, ২/১৩৩।

[27]. আবু নু‘আইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া, ১/২১৫।

[28]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃ. ১৮৬।

[29]. ছালেহ আল-মাগামিসী, তাআম্মুলাত কুরআনিয়্যাহ, ২২/৬।

[30]. ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বের, পৃ. ১৪৮।

[31]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ত্বারীকুল হিজরাতাইন, পৃ. ২৭১।

[32]. সাফ্ফারীনী, গিযাউল আলবাব (মিসর : মুআস্সাসাহ কুরতুবাহ, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৪ হি./১৯৯৩ খৃ.), ২/৪৫৮।

[33]. আব্দুল কাদের জীলানী, গুনয়াতুত ত্বালেবীন ( বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খৃ.), ২/১৫৫; ইহয়াউ ‘উলূমিদ্দীন ১/৩৫৬।

[34]. ইবনুল ক্বাদের আল-কুরাশী, আল-জাওয়াহিরুল মুযিয়্যাহ (হায়দারাবাদ : মাজলিসু দাইরাতুল মা‘আরিফ আন-নিযামিইয়াহ, ১ম সংস্করণ, ১৩৩২হি.), ২/৪৮৭।






বিষয়সমূহ: পাপ
মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (৩য় কিস্তি) - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
রবার্ট ক্লাইভ : ইতিহাসের এক ঘৃণ্য খলনায়ক - ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা - মীযানুর রহমান মাদানী
কুরআন সংকলনের ইতিহাস - ড. মুহাম্মাদ আজীবর রহমান
আশূরায়ে মুহাররম - আত-তাহরীক ডেস্ক
মানবাধিকার ও ইসলাম (১২তম কিস্তি) - শামসুল আলম
মিসওয়াকের গুরুতব ও তাৎপর্য - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
নফসের উপর যুলুম - ইহসান ইলাহী যহীর
উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আহলেহাদীছগণের অগ্রণী ভূমিকা (গত সংখ্যার পর) - ড. নূরুল ইসলাম
যাকাত ও ছাদাক্বা - আত-তাহরীক ডেস্ক
বিজ্ঞান ও ধর্মের কি একে অপরকে প্রয়োজন? - প্রকৌশলী মুহাম্মাদ আরীফুল ইসলাম - টাঙ্গাইল
যেমন ছিল সালাফদের হজ্জ-ওমরাহ - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
আরও
আরও
.