রাগ বা ক্রোধ মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আনন্দ, কষ্ট বা ভয়ের মতোই এটি আমাদের অস্তিত্বের একটি অংশ। কিন্তু যখন এই আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা এক ভয়ংকর দাবানলে পরিণত হয়। এটি মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হ’লেও, শয়তান একে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে মানুষকে ক্ষণিকের জন্য বিবেকশুন্য করে দেয় এবং তার নেক আমল বিনষ্ট করে। অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ কেবল মানুষের অভ্যন্তরীণ প্রশান্তিই কেড়ে নেয় না, বরং সুন্দর সম্পর্কগুলোকেও নিমেষেই ধ্বংস করে দেয়। শরী‘আতে ক্রোধকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার কথা বলা হয়নি, বরং এটিকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক পথে পরিচালিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব, উপকারিতা, পদ্ধতি এবং ক্রোধের লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হ’লে জীবনে কী কী নেতিবাচক পরিণতি নেমে আসতে পারে সে ব্যাপারে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে।
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য :
মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে রাগ নিয়ন্ত্রণের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেন,الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ‘যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে’ (আলে ইমরান ৩/১৩৪)। অন্যত্র তিনি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেন, وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ ‘যখন তারা ক্রুদ্ধ হয় তখন ক্ষমা করে’ (শূরা ৪২/৩৭)।
কুরআনের এই আয়াত দু’টি প্রমাণ করে যে, রাগের মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করা এবং ক্ষমা করে দেওয়া মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহর নিকটে অত্যন্ত প্রিয় আমল।
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণকারীদের অসামান্য পুরস্কার :
যে ব্যক্তি রাগের সময় প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে, কিন্তু শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেয়, তার জন্য রাসূল (ছাঃ) অভাবনীয় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ قَادِرٌ عَلَى أَنْ يُنْفِذَهُ، دَعَاهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ اللَّهُ مِنَ الْحُورِ الْعِينِ مَا شَاءَ ‘যে ব্যক্তি তার রাগ প্রয়োগের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংযত থাকে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে ডেকে নিবেন এবং তাকে হূরদের মধ্য
হ’তে তার পসন্দমত যে কোন একজনকে বেছে নিতে বলবেন’।[1]
তিনি বলেন,مَا مِنْ جُرْعَةٍ أَعْظَمُ أَجْرًا عِنْدَ اللَّهِ، مِنْ جُرْعَةِ غَيْظٍ كَظَمَهَا عَبْدٌ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ ‘কোন বান্দা আল্লাহর সন্তোষ লাভের আকাঙ্ক্ষায় ক্রোধের ঢোক গলধঃকরণ (সংবরণ) করলে, আল্লাহর নিকট ছওয়াবের দিক থেকে তার চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ কোন ঢোক আর নেই’।[2]
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী কোন তর্কে বা ঝগড়ায় জিতে যাওয়া হয়তো আমাদের সাময়িক অহংকারকে তৃপ্ত করতে পারে। কিন্তু আখেরাতের অনন্তকালের সেই অভাবনীয় সম্মান ও পুরস্কারের তুলনায় তা একেবারেই তুচ্ছ।
জান্নাত লাভের সবচেয়ে মূল্যবান ও সংক্ষিপ্ত উপদেশ :
একবার এক ছাহাবী রাসূল (ছাঃ)-এর কাছে এসে বললেন, আমাকে কিছু শিখিয়ে দিন; আমার জন্য যেন তা বেশী না হয়ে যায়। আমি যেন তা সহজে মনে রাখতে পারি। তিনি বললেন, রাগ করো না। লোকটি তার প্রশ্ন কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করলো। প্রতিবারই রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘রাগ করো না’।[3] অন্য বর্ণনায় এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (ছাঃ) কে এসে বললেন, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। তিনি বললেন, لَا تَغْضَبْ وَلَكَ الْجَنَّةُ ‘রাগ করবে না, তাহলেই তোমার জন্য জান্নাত।[4]
এই ছোট্ট একটি বাক্য আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান হ’তে পারে। হ’তে পারে জান্নাত লাভের অন্যতম কারণ। ভেবে দেখুন তো! আমাদের জীবনের বেশিরভাগ অনুশোচনা, ভাঙা সম্পর্ক এবং ভুল সিদ্ধান্তের পেছনে এই ‘রাগ’ই দায়ী থাকে কি না?
রাববুল ‘আলামীনের ক্রোধ থেকে বাঁচার মাধ্যম :
জনৈক ছাহাবী রাসূল (ছাঃ)-কে এসে বললেন, কোন কাজটি আমাকে মহান প্রতিপালকের ক্রোধ থেকে দূরে রাখবে? রাসূল (ছাঃ) বললেন, তুমি রাগ করো না।[5] অতএব আমরা যদি চাই যে দয়াময় আল্লাহ আমাদের ভুলত্রুটি বা অন্যায়ের ব্যাপারে ক্রুদ্ধ না হয়ে ক্ষমা করে দিন, তাহ’লে আমাদেরও উচিত মানুষের অন্যায়ের প্রতি সম্ভবপর ক্রুদ্ধ না হয়ে ক্ষমা করে দেওয়া। যে ব্যক্তি নিজের রাগকে দমন করে মানুষের প্রতি দয়াশীল হয়, আল্লাহ তা‘আলাও তার প্রতি নিজের ক্রোধকে প্রশমিত করে তাকে পরম করুণায় সিক্ত করেন।
প্রকৃত বীরত্বের মাপকাঠি :
রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِى يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ ‘প্রকৃত বীর বা শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়। বরং প্রকৃত বীর সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে’।[6]
একদিন রাসূল (ছাঃ) এমন একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যারা কুস্তি লড়ছিল। এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তাঁকে বলা হ’ল, অমুক ব্যক্তি একজন বড় কুস্তিগীর, যে-ই তার সাথে লড়তে আসে, তাকেই সে হারিয়ে দেয়! তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়েও শক্তিশালী ব্যক্তির কথা বলে দেব না? رَجُلٌ ظَلَمَهُ رَجُلٌ فَكَظَمَ غَيْظَهُ فَغَلَبَهُ وَغَلَبَ شَيْطَانَهُ وَغَلَبَ شَيْطَانَ صاحبه ‘সে হ’ল ওই ব্যক্তি, যার প্রতি কেউ অবিচার করল, কিন্তু সে নিজের রাগ হজম করে নিল এবং এর মাধ্যমে সে নিজেকে জয় করল, তার শয়তানকে হারাল এবং তার সঙ্গীর (প্রতিপক্ষের) শয়তানকেও পরাজিত করল’।
এ হাদীছ দু’টি আমাদেরকে যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা দেয় তা হ’ল, পেশিশক্তির আস্ফালন কেবল একটি বাহ্যিক ক্ষমতা, কিন্তু ভেতরের ক্রোধের দাবানলকে প্রশমিত করে নিজেকে শান্ত রাখার যে আত্মিক শক্তি, তা-ই একজন মানুষকে সত্যিকারের অপরাজেয় করে তোলে। রাগের বশবর্তী হয়ে ধ্বংসাত্মক বা ভুল কিছু করে ফেলা অত্যন্ত সহজ, কিন্তু ক্ষোভের তীব্র ঝড়ের মুখে অটল থেকে ধৈর্য ও আত্মসংযমের পথ বেছে নেওয়াই হ’ল প্রকৃত বীরত্ব।
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা
বলা হয়ে থাকে যে, রাগ হ’ল এমন একটি জ্বলন্ত কয়লার মতো, যা অন্যের দিকে ছুঁড়ে মারার উদ্দেশ্যে নিজ হাতে তুলে নেয়া হয়; কিন্তু এতে সবার আগে নিজের হাতই পুড়ে যায়। ক্রোধকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তবে একে সঠিকভাবে পরিচালনা করা বা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে জীবনে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
১. শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি : রাগ সরাসরি আমাদের শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখলে শরীর বিভিন্ন মারাত্মক রোগের হাত থেকে রক্ষা পায়। অতিরিক্ত রাগের সময় রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে। রাগ নিয়ন্ত্রণ করলে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে।
ক্ষোভ ও রাগ পুষে রাখলে মস্তিষ্কে অস্থিরতা কাজ করে, যার ফলে অনিদ্রা দেখা দেয়। ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি ও সুন্দর নিদ্রা নিশ্চিত হয়।
২. মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় : ক্রোধ কেবল শরীর নয়, মনেরও ব্যাপক ক্ষতি করে। মানসিক সুস্থতার জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ জাদুর মতো কাজ করে। রাগের কারণে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা একসময় বিষণনতা বা উদ্বেগে রূপ নেয়। রাগ দমন করতে পারলে মন অনেক বেশি প্রফুল্ল ও চিন্তামুক্ত থাকে এবং যেকোন কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেকে স্থির রাখার ক্ষমতা তৈরি হয়।
৩. সম্পর্ক সুন্দর ও সুদৃঢ় হয় : পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অশান্তির অন্যতম মূল কারণ হ’ল অনিয়ন্ত্রিত রাগ। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে প্রিয়জনদের সাথে অহেতুক ঝগড়া ও ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো সম্ভব হয়।
৪. আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি : চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও যিনি নিজেকে শান্ত রাখতে পারেন, তার ব্যক্তিত্বে গাম্ভীর্য ও মাধুর্য ফুটে ওঠে। মানুষ তার ওপর আস্থা রাখে এবং তাকে ভরসার জায়গা মনে করে। শান্তভাবে এবং যুক্তি দিয়ে কথা বলার মাধ্যমে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ পায়। কেউ যখন অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে, তখন সমাজেও তার প্রতি মানুষের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
৫. পেশাগত জীবনে সাফল্যের সোপান : কর্মক্ষেত্রে সফলতার জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ একটি অপরিহার্য গুণ। কারণ রাগ মানুষের যৌক্তিক চিন্তার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। রাগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল হয়। রাগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে মাথা ঠান্ডা রেখে বস্ত্তনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
অন্যদিকে, শান্ত ও ধৈর্যশীল মানুষেরা যেকোন দলের জন্য সম্পদ। একজন রগচটা মানুষের সাথে কেউ কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। সহনশীলতা কর্মক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করে এবং ক্যারিয়ারে সফলতার পথ সুগম করে।
৬. শত্রুর সম্মান অর্জন ও মন্দকে ভালো দিয়ে প্রতিহতকরণ : রাগ নিয়ন্ত্রণের সুন্দর আরেকটি দিক হ’ল, এটি শত্রুকেও পরম বন্ধুতে পরিণত করতে পারে। অপসন্দনীয় কাজ ও কঠোরতার জবাব যদি ভালো আচরণ, কোমলতা এবং ক্ষমা দিয়ে দেয়া হয়, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে মানুষের হৃদয়কে জয় করে নেয়।
আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই নীতির কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘ভাল ও মন্দ কখনো সমান নয়। তুমি মন্দকে প্রতিহত কর উত্তম দ্বারা। ফলে তুমি দেখবে যে, তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে, সে যেন (তোমার) অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে। এই গুণের অধিকারী কেবল তারাই হ’তে পারে, যারা ধৈর্যশীল এবং যারা মহাভাগ্যবান (ফুছছিলাত ৪১/৩৪-৩৫)।
এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত ছাহাবী ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, ‘এর অর্থ হ’ল রাগের সময় ধৈর্য ধারণ করা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ করলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। মানুষ যখন এই গুণটি অর্জন করে, তখন তাদের শত্রুরাও তাদের কাছে নমনীয় হয়ে যায়। যেন সে তাদের একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু’ (তাফসীর ইবনু কাছীর, ঐ আয়াতের ব্যাখ্যা)। অর্থাৎ ক্রোধ সংবরণ কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণই নয়; এটি এমন একটি অসাধারণ হাতিয়ার, যার মাধ্যমে মন্দের জবাব ভালো দিয়ে এবং কঠোরতাকে কোমলতা দিয়ে জয় করা যায়। এর ফলে শত্রুতা দূর হয় এবং সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের নববী পদ্ধতি
রাসূল (ছাঃ) কেবল রাগ নিয়ন্ত্রণের তাত্ত্বিক জ্ঞানই দেননি, রাগ উঠলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে, তার অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও আধ্যাত্মিক সমাধানও দিয়ে গেছেন-
১. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা : রাগের উৎপত্তি হয় শয়তানের প্ররোচনা থেকে। তাই রাগ উঠলে পড়তে হবে ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম’ (আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। একবার রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে এক ব্যক্তি ভীষণ রাগান্বিত হয়ে অপরজনকে গালি দিচ্ছিল। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, আমি একটি কালেমা জানি, যদি লোকটি তা পড়তো, তা হ’লে তার ক্রোধ চলে যেত। সেটি হ’ল ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম’।[7]
২. চুপ হয়ে যাওয়া : রাগের মাথায় মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যার জন্য পরে সারা জীবন অনুশোচনায় ভুগতে হয়। তাই রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْكُتْ ‘তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়ে গেলে, সে যেন চুপ থাকে’।[8]
৩. অবস্থান পরিবর্তন করা : রাগের সময় মানুষের শারীরিক উত্তেজনা বেড়ে যায়। তাই এসময় নিজের অবস্থার পরিবর্তন করা অত্যন্ত কার্যকর সমাধান। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا غَضِبَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ قَائِمٌ فَلْيَجْلِسْ، فَإِنْ ذَهَبَ عَنْهُ الْغَضَبُ وَإِلَّا فَلْيَضْطَجِعْ ‘তোমাদের কারো যদি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন বসে পড়ে। এতে যদি রাগ দূর হয়ে যায় ভালো, অন্যথায় সে যেন শুয়ে পড়ে’।[9]
আরো কিছু কার্যকর পদ্ধতি
১. বিরতি গ্রহণ করুন!
রাগের মুহূর্তে আমাদের মস্তিষ্ক যুক্তির চেয়ে আবেগের দ্বারা বেশি পরিচালিত হয়। তাই যখনই বুঝবেন ভেতরে রাগের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের ‘পজ বাটন’টি চেপে দিন। অর্থাৎ তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না বা কোন কথা বলবেন না। এই ছোট্ট বিরতি আপনার মস্তিষ্ককে রাগের আবেগ থেকে যুক্তির দিকে ফিরে আসার সুযোগ দিবে ইনশাআল্লাহ। এই সময়ে মনে মনে ইস্তেগফার করতে পারেন। এই সামান্য সময়টুকু একটি বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে আপনাকে রক্ষা করতে পারে।
২. ওযূ করুন!
এটি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক কৌশল। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে রাগের সময় শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং স্নায়ুবিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। এমতাবস্থায় শীতল পানি দিয়ে ওযূ করলে বা পানি পান করলে শরীরের তাপমাত্রা হ্রাস পায়, রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এবং মস্তিষ্কে শীতলতার পরশ লাগে। ফলে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং মানুষ হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
৩. গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করুন!
রাগ হ’লে আমাদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়। এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হ’ল গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া। চোখ বন্ধ করে নাক দিয়ে লম্বা শ্বাস নিন, কিছুক্ষণ আটকে রাখুন এবং ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে ছেড়ে দিন। এটি আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং মনের ভেতরে জমে থাকা উত্তেজনা নিমেষেই কমিয়ে দেয়।
৪. ‘তুমি’-এর বদলে ‘আমি’ দিয়ে বাক্য শুরু করুন!
রাগের সময় আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ি এবং অন্যকে দোষারোপ করতে থাকি। ‘তুমি সবসময় এমন কর’ না বলে ‘কাজটি এভাবে হওয়ায় আমি কষ্ট পেয়েছি’ এমনভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার চেষ্টা করুন। অভিযোগের সুরে কথা না বলে, গঠনমূলকভাবে নিজের প্রত্যাশার কথা জানালে সম্পর্কগুলো অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে। এতে অপরদিকের মানুষটিও দায় এড়ানোর চেষ্টা না করে আপনার কথা বোঝার চেষ্টা করবে।
৫. ক্ষমা করতে অভ্যস্ত হৌন!
রাগকে পুষে রাখার অর্থ নিজের ভেতরে একটি বিষাক্ত কাঁটা জমিয়ে রাখা, যা দিন দিন আপনাকেই ক্ষতবিক্ষত করবে। তাই নিজের মনের শান্তির জন্যই অপরকে ক্ষমা করে দিতে শিখুন। যিনি ক্ষমা করতে পারেন, তার অন্তর সবচেয়ে বেশি প্রশান্ত থাকে। মনে রাখবেন রাগ দমন করা মানে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করা নয় বা হেরে যাওয়া নয়; বরং এটি হ’ল নিজের ওপর চূড়ান্ত বিজয়ের প্রকাশ। যে মানুষ নিজের রাগকে শাসন করতে পারে, সে পৃথিবীর যেকোন কঠিন পরিস্থিতিকেই নিজের অনুকূলে নিয়ে আসার যোগ্যতা রাখে।
৬. শব্দ চয়নে সতর্ক হৌন এবং পরিণতি সম্পর্কে ভাবুন!
রাগের মাথায় বলা একটি রূঢ় শব্দও এমন গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে, যা সহজে শুকায় না। চারপাশের যেসব মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে বা যাদের আপনি পথ দেখান, আপনার একটি রাগান্বিত আচরণ তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কিছু বলার আগে এর পরিণতি সম্পর্কে ভাবুন। আপনার প্রশান্ত ও নিয়ন্ত্রিত আচরণ অন্যদের জন্যও আত্মনিয়ন্ত্রণের এক দারুণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
ক্রোধের বহুমাত্রিক ক্ষতিকর দিক
রাগ বা ক্রোধ মানুষের ভেতরের এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি, যার অগ্ন্যুৎপাত কেবল চারপাশের সৌন্দর্যকেই পুড়িয়ে ছাই করে না, বরং নিঃস্ব করে দেয় মানুষের নিজের সত্তাকেও।
১. বিবেকের সাময়িক মৃত্যু :
রাগের মুহূর্তে মানুষের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়, তা হ’ল তার হিতাহিত জ্ঞান বা বিবেকের সাময়িক মৃত্যু। যখন ক্রোধের আগুন মস্তিষ্কে আঘাত হানে, তখন যুক্তি ও বুদ্ধির দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ তখন নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এমন সব কথা বলে বা এমন সব কাজ করে বসে, যা সে সুস্থ মস্তিষ্কে কখনো করার কথা ভাবতেও পারে না। রাগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত সারাজীবনের কান্না ও অনুশোচনার কারণ হ’তে পারে। ক্ষণিকের এই উত্তেজনায় মানুষ মূলত নিজের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। সেকারণ জনৈক বিদ্বান বলেন, اَلْغَضَبُ أَوَّلُهُ جُنُونٌ وَآخِرُهُ نَدَمٌ ‘অর্থাৎ রাগের শুরুটা হয় পাগলামি দিয়ে, আর এর শেষ হয় অনুশোচনা দিয়ে’। অন্যদিকে মন শান্ত থাকলে যেকোন কঠিন পরিস্থিতি বা সংকটের সমাধান অনেক সহজ ও গঠনমূলকভাবে করা সম্ভব হয়।
২. সম্পর্কের অপমৃত্যু :
একটি সুন্দর সম্পর্ক, বন্ধুত্ব বা পারিবারিক বন্ধন গড়ে তুলতে বছরের পর বছর সময় লাগে। কিন্তু তা ভেঙে চুরমার করে দিতে এক মুহূর্তের অন্ধ ক্রোধই যথেষ্ট। রাগের বশবর্তী হয়ে আমরা অনেক সময় এমন সব তীক্ষ্ণ ও নিষ্ঠুর কথা বলে ফেলি, যা হয়তো আমরা মন থেকে বিশ্বাসও করি না। কিন্তু একবার মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া শব্দ আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না।
৩. শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় :
বৈজ্ঞানিক গবেষণা মতে, অতিরিক্ত রাগ মানুষের শরীরে এক
বিষাক্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্ম দেয়। এটি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি করে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে ফেলে। রাগী মানুষ কখনো মানসিকভাবে শান্তিতে থাকতে পারে না; তার ভেতরটা সবসময় এক অজানা অস্থিরতা ও বিষণ্ণতায় পুড়তে থাকে।
৪. সাফল্যের পথে বড় বাধা :
কর্মক্ষেত্র হোক বা ব্যক্তিগত জীবন, রাগী মানুষ কখনো সুদূরপ্রসারী সাফল্য পায় না। সমাজে বা কর্মক্ষেত্রে তার গ্রহণযোগ্যতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। মানুষ হয়তো তাদের ক্ষণিকের জন্য ভয় পায়, কিন্তু কখনো মন থেকে শ্রদ্ধা করে না। রাগের কারণে মানুষ তার চারপাশের বিশ্বস্ত সহযোগীদের হারায়, যা তাকে ধীরে ধীরে একাকীত্ব ও ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়।
শেষ কথা :
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ হ’ল নিজের প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ। ক্ষণিকের রাগের বশবর্তী হয়ে আমরা অনেক সময় প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি, ক্যারিয়ার ধ্বংস করি, এমনকি নিজের দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই বরবাদ করে ফেলি। রাগ করে হয়তো আমরা তাৎক্ষণিক একটি ‘জয়’ পেতে পারি, কিন্তু দিন শেষে আমাদের ভেতরে একবুক অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই আসুন, রাগের দাসত্ব না করে বরং রাগকে নিজের দাসে পরিণত করি। যে ব্যক্তি নিজের রাগকে জয় করতে পেরেছে, সে মূলত নিজের জীবনকেই জয় করেছে। এই ছোট্ট জীবনে রাগের আগুনে পুড়ে ছাই করার মতো সময় আমাদের নেই। যখনই বুকের ভেতর রাগের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠতে চাইবে, তখন মহান আল্লাহর সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করুন। ভাবুন, আপনার এই এক মুহূর্তের নীরবতা, আপনার এই একটুখানি ছাড় দেওয়া আপনাকে জান্নাতের কতটা কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে! রাববুল আলামীন আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন।
[1]. আবুদাঊদ হা/৪৭৭৭; ইবনু মাজাহ হা/৪১৮৬; মিশকাত হা/৫০৮৮।
[2]. ইবনু মাজাহ হা/৪১৮৯; আহমাদ হা/৬১১৪; মিশকাত হা/৫১১৬।
[3]. বুখারী হা/৬১১৬; তিরমিযী হা/২০২০, মিশকাত হা/৫১০৪।
[4]. তাবারাণী আওসাত্ব হা/২৩৫৩; ছহীহুত তারগীব হা/২৭৪৯।
[5]. আহমাদ, ছহীহুত তারগীব হা/২৭৪৭।
[6]. বুখারী হা/৬১১৪; মিশকাত হা/৫১০৫।
[7]. বুখারী হা/৬১১৫; মিশকাত হা/২৪১৮।
[8]. আহমাদ হা/২১৩৬, সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৩৭৫।
[9]. আবূদাঊদ হা/৪৭৮২, মিশকাত হা/৫১১৪।