ভূমিকা :

মহান আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদীর উপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত ফরয করেছেন। তন্মধ্যে ফজরের ছালাত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এটা ঈমান ও নিফাক্বের পার্থক্য নিরূপণকারী ছালাত। কেননা কেবল প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিরাই এই ছালাতের ব্যাপারে যত্মশীল হ’তে পারেন। মুনাফিক্বদের কাছে এই ছালাত কঠিন মনে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, বহু মুসলিম এই মহামূল্যবান ইবাদতের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না। ফজর ছালাতের ব্যাপারে চূড়ান্ত গাফেলতি করে থাকেন। ফলে তারা নিজেদের অজান্তেই অসংখ্য বরকত, নিরাপত্তা ও নাজাতের পথ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা ফজরের ছালাতের গুরুত্ব, ফযীলত ও তাৎপর্য সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

ফজর ছালাতের গুরুত্ব ও ফযীলত

১. আল্লাহ্র নিরাপত্তা ও যিম্মাদারী লাভ :

মানুষ স্বভাবতই নিরাপত্তাকামী। আমরা সবাই নিজেদের জীবন, পরিবার, সম্মান ও রিযিকের নিরাপত্তা চাই। এজন্য আমরা কত শত মাধ্যম খুঁজি; প্রভাবশালী মানুষের সুপারিশ নিই, ক্ষমতাধরদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকতে চাই। মুনিনের জীবনে ফজরের ছালাত হ’ল সেই ইলাহী চুক্তিনামা, যার মাধ্যমে একজন মুমিন প্রতিদিন ভোরে আল্লাহ্র সাথে তার নিরাপত্তার চুক্তি নবায়ন করে নেয়। জুন্দুব ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فَهُوَ فِي ذِمَّةِ اللهِ، فَلَا يَطْلُبَنَّكُمُ اللهُ مِنْ ذِمَّتِهِ بِشَيْءٍ فَيُدْرِكَهُ، فَيَكُبَّهُ فِي نَارِ جَهَنَّمَ، ‘যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত (জামা‘আতে) পড়ল, সে আল্লাহ্র যিম্মায় চলে এল। সুতরাং আল্লাহ যেন অবশ্যই তোমাদের কাছে তার জামানতের কিছু দাবী না করেন। কারণ যার কাছেই তিনি তাঁর জামানতের কিছু দাবী করবেন, তাকে পাকড়াও করবেন। অতঃপর তিনি তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’।[1] অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি ইখলাছের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করবে, সে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহ্র অঙ্গীকার, নিরাপত্তা ও হেফাযতে থাকে’।[2] আর যে ব্যক্তি ফজর ছালাতে গাফেলতি করে আল্লাহ্র দেওয়া নিরাপত্তা ভঙ্গ করবে বা হালকাভাবে নিবে, আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।

আমাদের বাস্তব জীবনে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রের কোন শীর্ষ নেতা বা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে বিশেষ প্রটোকল বা নিরাপত্তা দেয়, তখন তার হাঁটাচলা ও আত্মবিশ্বাস কতটা বদলে যায়! সমাজ বা শত্রুপক্ষের কেউ তখন তার দিকে চোখ তুলে তাকাতেও ভয় পায়। সে তুলনায় মহাবিশ্বের একমাত্র অধিপতি, তাঁর নিরাপত্তা ক্ষমতা কত বিশাল হ’তে পারে! যে ব্যক্তি তীব্র ঘুম আর আরামের বিছানা ত্যাগ করে, কনকনে শীত বা বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে ভোরবেলা আল্লাহ্র দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন, মহান আল্লাহ তাকে তাঁর নিজের বিশেষ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে নেন। ফলে আমাদের দৈনন্দিন কর্মস্থল, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবার-পরিজন কিংবা রাস্তা-ঘাটের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদাপদ এবং মানুষের হিংসা ও ক্ষতিকর চক্রান্ত-এই সবকিছুর বিপরীতে স্বয়ং আল্লাহ রাববুল আলামীন আমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে যান।

ছাহাবায়ে কেরাম এই নিরাপত্তার মূল্য কতই না গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। ছাহাবী হারেছ ইবনে হাসসান (রাঃ) যেদিন বিয়ে করেন, পরদিন সকালেই তিনি ফজরের ছালাতে উপস্থিত হন। তখন তাঁকে বলা হ’ল, আজ রাতেই কেবল আপনার বাসর হ’ল, অথচ সকালেই আপনি ছালাতের জন্য বেরিয়ে আসলেন?’ তিনি উত্তরে বললেন,وَاللهِ إِنَّ امْرَأَةً تَمْنَعُنِي مِنْ صَلَاةِ الْغَدَاةِ فِي جَمِيعٍ لَامْرَأَةُ سُوءٍ، ‘আল্লাহ্র কসম! যে স্ত্রী আমাকে ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে বাধা দেয়, সে নিঃসন্দেহে একজন মন্দ স্ত্রী’।[3] অথচ সমাজে বিয়ে বা কোন অনুষ্ঠানের পরদিন ফজর পড়া তো দূরের কথা, যোহর পর্যন্ত ঘুমানোকে একপ্রকার ‘ট্রেন্ড’ বা স্বাভাবিক বিষয় বানিয়ে ফেলা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।

২. ক্বিয়ামতের ঘোর অন্ধকারে পূর্ণ নূরের সুসংবাদ :

ক্বিয়ামতের দিন হবে আন্ধকারাচ্ছন্ন। সেই ভয়াবহ দিনে মানুষের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হবে আলোর। দুনিয়াতে লোডশেডিং হ’লে বা অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে গেলে আমরা যেমন মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট বা টর্চ খুঁজি, সেদিনকার সেই অন্ধকারে আমাদের পথ দেখাবে নেক আমলের আলো। ফজরের ছালাতের উদ্দেশ্যে যারা রাতের অাঁধার মাড়িয়ে মসজিদে যান, তাদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলোর সুসংবাদ দিয়েছেন। বুরায়দা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,بَشِّرِ الْمَشَّائِينَ فِي الظُّلَمِ إِلَى الْمَسَاجِدِ بِالنُّورِ التَّامِّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ‘অন্ধকারে মসজিদে গমনকারী ব্যক্তিদের ক্বিয়ামতের দিন পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও’।[4] ফজরের সময় যখন চারদিক নিস্তব্ধ থাকে, তখন একজন মুমিন যখন ওযূ করে গুটিগুটি পায়ে মসজিদের দিকে হাঁটেন, তার প্রতিটি কদমে কদমে আখেরাতের জন্য নূর বা আলো জমা হ’তে থাকে। এই কষ্টকর আমলের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনু রজব হাম্বলী (৭৩৬-৭৯৫ হি.) বলেন, ‘ফজর ও এশার এই দুই সময়ে মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়া অধিক কষ্টসাধ্য। কারণ এতে অন্ধকারে চলার কষ্ট রয়েছে। এ কারণেই এ আমলের ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনায় ক্বিয়ামতের দিন পূর্ণাঙ্গ নূরের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে’।[5] ইমাম ইবরাহীম নাখঈ (রহ.) বলেছেন, ‘সালাফগণ মনে করতেন, অন্ধকার রাতে ছালাতের উদ্দেশ্যে হেঁটে যাওয়া জান্নাত লাভের কারণ’।[6]

বর্তমানে আমাদের রাস্তাঘাট হয়তো স্ট্রিটলাইটের আলোয় আলোকিত থাকে, কিন্তু আমাদের অনেকের হৃদয়টাই যেন গাফেলতির অন্ধকারে ডুবে আছে। আরামদায়ক বিছানা ছেড়ে, ভোরের মিষ্টি ঘুমকে কুরবানী দিয়ে যখন আমরা আল্লাহ্র ডাকে সাড়া দেব, তখন এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সামান্য কষ্টের বিনিময়ে মহান আল্লাহ ক্বিয়ামতের সেই কঠিন বিপদের দিনে আমাদের পূর্ণাঙ্গ নূর দান করবেন, যা দিয়ে আমরা অনায়াসে পুলছিরাত পার হয়ে জান্নাতে পৌঁছে যাব ইনশাআল্লাহ। আপনি ফজরের সুনসান নীরবতা ভেদ করে মসজিদে যাবেন, তখন এই চিন্তাটা মাথায় রাখবেন যে, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে আখেরাতে এক ফালি করে নূর জমা হচ্ছে। দেখবেন এক এলাহী প্রশান্তি আপনার অন্তরকে শীতল করে দিচ্ছে।

৩. সারারাত ইবাদতের সমান ছাওয়াব :

মানুষ বড়ই দুর্বল। সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম আর জীবনসংগ্রামের পর রাতের বেলায় একটু স্বস্তির ঘুম সবারই কাম্য। সারারাত জেগে আল্লাহ্র ইবাদত করা, ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আল্লাহ্র দরবারে চোখের পানি ফেলা নিখাঁদ তাকবওয়াশীল ছাড়া সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। রহমানুর রহীম বান্দাদেরকে বিনা হিসাবে অঢেল নেকী দিতে ভালোবাসেন। তাই তিনি আমাদের জন্য এমন এক সুবর্ণ সুযোগ রেখেছেন, যার মাধ্যমে আমরা রাতভর ঘুমিয়েও সারারাত ইবাদত করার বিশাল ছওয়াব লাভ করতে পারি। ওছমান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا قَامَ نِصْفَ اللَّيْلِ، وَمَنْ صَلَّى الصُّبْحَ فِي جَمَاعَةٍ فَكَأَنَّمَا صَلَّى اللَّيْلَ كُلَّهُ، ‘যে ব্যক্তি এশার ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত দাঁড়িয়ে (ক্বিয়ামুল লায়ল বা তাহাজ্জুদ) ছালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারারাত দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করল’।[7]

সালাফে ছালেহীন ফজরের এই অফুরন্ত নেকী লুফে নেওয়ার জন্য কতটা মরিয়া ছিলেন, তার একটি জীবন্ত উপমা ছিলেন প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহঃ) (১৫-৯৪ হি.)। তাঁর মুক্তদাস বারদ (রহঃ) বলেন,ما نودي بالصلاة ‌منذ ‌أربعين ‌سنة إلا وسعيد في المسجد، ‘গত চল্লিশ বছর ধরে যখনই ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়েছে, তখনই সাঈদ (ইবনুল মুসাইয়িব) মসজিদে উপস্থিত ছিলেন’।[8] দীর্ঘ চল্লিশটি বছর! শীত, গ্রীষ্ম, বৃষ্টি, ঝড় কিংবা অসুস্থতা- কোন কিছুই তাঁকে ফজরের জামা‘আত থেকে দূরে রাখতে পারেনি। যেখানে সালাফগণ চল্লিশ বছর ধরে তাকবীরে উলার সাথে জামা‘আত ছাড়েননি, সেখানে আমরা চল্লিশ দিন তো দূরের কথা, টানা চল্লিশ ওয়াক্ত জামা‘আত পেতেই হাঁপিয়ে উঠি! আসুন! দুনিয়ার সব হিসাব বাদ দিয়ে সারারাত ইবাদতের এই অশেষ ছাওয়াবটি লুফে নিতে আজ থেকেই এশা ও ফজরের ছালাত জামা‘আতে পড়ার দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দিন।

৪. সম্মানিত ফেরেশতা মন্ডলীর সাক্ষ্য লাভ :

ফজর ও আছর ছালাতের ব্যাপারে যারা যত্নশীল, তাদের জন্য অন্যতম মর্যাদার ব্যাপার হ’ল, অগণিত ফেরেশতা তাদের চারপাশ ঘিরে রাখেন এবং তাদের ইবাদতের সরাসরি সাক্ষী হয়ে যান। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,يَتَعَاقَبُونَ فِيكُمْ مَلاَئِكَةٌ بِاللَّيْلِ وَمَلاَئِكَةٌ بِالنَّهَارِ، وَيَجْتَمِعُونَ فِى صَلاَةِ الْفَجْرِ وَصَلاَةِ الْعَصْرِ، ثُمَّ يَعْرُجُ الَّذِينَ بَاتُوا فِيكُمْ ، فَيَسْأَلُهُمْ وَهْوَ أَعْلَمُ بِهِمْ كَيْفَ تَرَكْتُمْ عِبَادِى فَيَقُولُونَ تَرَكْنَاهُمْ وَهُمْ يُصَلُّونَ، وَأَتَيْنَاهُمْ وَهُمْ يُصَلُّونَ، ‘ফেরেশতামন্ডলী পালা বদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন; একদল দিনে, একদল রাতে। ফজর ও আছরের ছালাতে উভয় দল একত্র হন। অতঃপর তোমাদের মাঝে রাত্রি যাপনকারী দলটি উঠে যান। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কোন্ অবস্থায় রেখে আসলে? অবশ্য তিনি নিজেই তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত। উত্তরে তাঁরা বলেন, আমরা তাদের ছালাতে রেখে এসেছি, আর আমরা যখন তাদের নিকট গিয়েছিলাম তখনও তারা ছালাতরত অবস্থায় ছিলেন’।[9]

ফজরের ছালাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآَنَ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا، ‘সূর্য ঢলে পড়ার পর থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত তুমি ছালাত কায়েম কর এবং ফজরের ছালাত আদায় কর। নিশ্চয়ই ফজরের ছালাত সাক্ষ্যপ্রাপ্ত হয়’ (বানী ইসরাঈ ১৭/৭৮)। শায়খ আব্দুর রহমান আস-সা‘দী (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) বলেন, ‘ফজরের কুরআন’ বলতে ফজরের ছালাতকে বোঝানো হয়েছে। একে ‘কুরআন’ নামে অভিহিত করার কারণ হ’ল, এতে অন্যান্য ছালাতের তুলনায় দীর্ঘ কুরআন তেলাওয়াত করা শরী‘আত সম্মত। আর এতে কুরআন তেলাওয়াতের বিশেষ ফযীলত রয়েছে। কেননা এ সময়ের তেলাওয়াতে স্বয়ং আল্লাহ এবং রাতের ফেরেশতা ও দিনের ফেরেশতাগণ উপস্থিত থাকেন (সাক্ষী হন)’।[10]

৫. প্রতিদিন হজ্জ ও ওমরাহ্র নেকী লাভের সুযোগ :

হজ্জ ও ওমরাহ পালন করা প্রতিটি মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাসনা। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে অনেকের পক্ষেই এই পবিত্র সফর সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মহান আল্লাহ্র রহমতের বিশালতা এমনই যে, তিনি তাঁর বান্দাদের হৃদয়ের এই আকুতি ফিরিয়ে দেন না। তিনি আমাদের জন্য নিজ এলাকায়, নিজ শহরে বসেই প্রতিদিন হজ্জ ও ওমরাহ্র সমান নেকী অর্জনের এক অভাবনীয় সুযোগ করে দিয়েছেন। যেমন কেউ যদি একনিষ্ঠতার সাথে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত জামা‘আতে সাথে আদায় করে, তবে সে প্রত্যেক ছালাতের বিনিময়ে একটি করে হজ্জের নেকী লাভ করবেন। উমামা বাহেলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ مُتَطَهِّرًا إِلَى صَلَاةٍ مَكْتُوْبَةٍ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْحَاجِّ الْمُحْرِمِ، وَمَنْ خَرَجَ إِلَى تَسْبِيْحِ الضُّحَى لَا يَنْصِبُهُ إِلَّا إِيَّاهُ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْمُعْتَمِرِ، ‘যে ব্যক্তি বাড়ী থেকে পবিত্র হয়ে ফরয ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করবে, তার প্রতিদান ইহরাম পরিহিত একজন হজ্জ পালনকারীর ন্যায়। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র চাশতের ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করবে, তার প্রতিদান একজন ওমরাহ পালনকারীর ন্যায়’।[11]

আবার ফজরের ছালাত কেন্দ্রিক একটি ছোট্ট আমলের মাঝেও এই সুযোগটি নিহিত আছে। আর সেটা হ’ল ইশরাক্বের ছালাত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ صَلَّى الْغَدَاةَ فِيْ جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ، ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহ্র যিকিরে মশগূল থাকে, অতঃপর (সূর্যোদয়ের পর) দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে, তার জন্য একটি পূর্ণ হজ্জ ও একটি পূর্ণ ওমরাহ্র নেকী রয়েছে’।[12] ফজরের ছালাতের পর দুনিয়াবী কথাবার্তা না বলে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে যিকির করা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর ছাহাবীদের নিয়মিত আমল ছিল। জাবের ইবনু সামুরাহ (রাঃ) বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى الْفَجْرَ جَلَسَ فِي مُصَلَّاهُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ حَسَنًا، ‘নবী করীম (ছাঃ) যখন ফজরের ছালাত আদায় করতেন, তখন তিনি তাঁর ছালাতের স্থানে (মুছাল্লায়) বসে থাকতেন, যতক্ষণ না সূর্য ভালোভাবে উদিত হ’ত’।[13] আব্দুল মালেক ইবনে মুহাম্মাদ (১০৫-২০০হি.) বলেন,كَانَ الْأَوْزَاعِيُّ لَا يُكَلِّمُ أَحَدًا بَعْدَ صَلَاةِ الْفَجْرِ حَتَّى يَذْكُرَ اللَّهَ، فَإِنْ كَلَّمَهُ أَحَدٌ أَجَابَهُ، ‘ইমাম আওযাঈ (৮৮-১৫৭হি.) ফজরের ছালাতের পর আল্লাহ্র যিকির সম্পন্ন না করা পর্যন্ত কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। তবে কেউ তার সাথে কথা বললে তিনি তার জবাব দিতেন’।[14]

ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মোটামুটি চল্লিশ মিনিট সময় পাওয়া যায়। সকালের এই বরকতময় সময়ে মসজিদে বসে কুরআন তেলাওয়াত ও যিকির করে দুই রাক‘আত ছালাত আদায়ের মাধ্যমে আমরা আল্লাহ্র কাছ থেকে একটি কবুল হজ্জ ও ওমরাহ্ সমান নেকী লাভ করতে পারি। কোন বুদ্ধিমান মুসলিম কি এত সস্তা ও লাভজনক এই আসমানী ব্যবসা হাতছাড়া করতে পারে? প্রতিদিন সম্ভব নাও হয়, অন্তত সপ্তাহে দুই-এক দিনও তো আমরা এই সুযোগটা কাজে লাগতে পারি।

৬. জান্নাতের নিশ্চিত সুসংবাদ :

জান্নাত লাভের নিশ্চয়তা রয়েছে ফজর ছালাতের মাঝে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ صَلَّى الْبَرْدَيْنِ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‘যে ব্যক্তি দুই ঠান্ডার সময়ের ছালাত (অর্থাৎ ফজর ও আছর) আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[15] ইমাম আবুল হাসান আল-বাগাভী (৪৩৩-৫১৬ হি) বলেন, ‘এখানে দুই ঠান্ডা (البردان) বলতে ফজর ও আছরের ছালাতকে বুঝানো হয়েছে। কারণ এ দু’টি ছালাত দিনের দুই প্রান্তে অবস্থিত’।[16] শায়খ উছায়মীন (১৯২৯-২০০১ খ্রি.) বলেন, ‘দুই ঠান্ডা বলতে ফজর ও আছরের ছালাতকে বোঝানো হয়েছে। কারণ, ফজরের ছালাত আদায় করা হয় রাতের সবচেয়ে শীতল সময়ে এবং আছরের ছালাত আদায় করা হয় সূর্য ঢলে যাওয়ার পর দিনের অপেক্ষাকৃত শীতল সময়ে। যে ব্যক্তি এ দুই ছালাত যথাযথভাবে আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অর্থাৎ এ দুই ছালাত সংরক্ষণ করা এবং নিয়মিত আদায় করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ’।[17]

আমরা সবাই জীবনের নিশ্চয়তা চাই। চাকরির নিশ্চয়তা, ব্যবসায় লাভের নিশ্চয়তা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামান্য নিশ্চয়তার জন্য আমরা কত কাঠখড় পোড়াই, অথচ চিরস্থায়ী জীবনের চূড়ান্ত আবাসস্থল ‘জান্নাত’-এর নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। ফজরের সময় বিছানার উষ্ণতা আর আছরের সময় কর্মব্যস্ততা বা আড্ডার মোহ ত্যাগ করা অনেকটা কঠিন মনে হ’তে পারে। অথচ এই সামান্য আরাম ত্যাগের বিনিময়ে আপনি চিরস্থায়ী জান্নাত পাচ্ছেন। এই ব্যবসা কি লাভজনক নয়?

৭. আল্লাহ্র দীদার লাভের সৌভাগ্য :

জান্নাতের সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ নে‘মত হ’ল দয়াময় আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া। আর এই পরম সেŠভাগ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফজর ও আছরকে অাঁকড়ে ধরতে বলেছেন। জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমরা নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম। তিনি পূর্ণিমার রাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললেন,إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ هَذَا الْقَمَرَ لاَ تُضَامُّونَ فِى رُؤْيَتِهِ ، فَإِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَنْ لاَ تُغْلَبُوا عَلَى صَلاَةٍ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَصَلاَةٍ قَبْلَ غُرُوبِ الشَّمْسِ، فَافْعَلُوا، ‘তোমরা শীঘ্রই তোমাদের রবকে দেখতে পাবে, যেমন তোমরা এ চাঁদটিকে দেখতে পাচ্ছ। অথচ এটিকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না। অতএব তোমরা সক্ষম হ’লে সূর্য উঠার আগের ছালাত ও সূর্য ডুবার পরের ছালাত (যথাযথভাবে) আদায় করতে যেন পরাজিত না হও। তাহলে তাই কর’।[18]

দুনিয়াতে প্রিয় ব্যক্তিত্বকে একটিবার এক ঝলক দেখার জন্য আমরা কত কষ্টই না করি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অধীর আগ্রহে দাঁড়িয়ে থাকি; এমনকি দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে যায় প্রিয় মানুষের দেখা পেতে। অথচ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাঁর অফুরন্ত দয়া ও ভালোবাসা দিয়ে গোটা বিশ্বকে মমতায় আগলে রেখেছেন, সেই পরম রবের সান্নিধ্য ও দীদার (দর্শন) লাভের জন্য আমরা কি প্রতিদিন ভোরে সামান্য আরামের ঘুমটুকু ত্যাগ করে ফজরের ছালাতে হাযির হ’তে পারি না?

৮. ফজরের সুন্নাত পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে উত্তম :

পৃথিবীর ধন-সম্পদ, ক্ষমতা আর বিত্তবৈভবের প্রতি মানুষের আকর্ষণ মজ্জাগত। একটুখানি সম্পদের লোভে মানুষ দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে বেড়ায়। অথচ আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য এমন এক অমূল্য সম্পদের ভান্ডার উন্মুক্ত করে রেখেছেন, যার কাছে পৃথিবীর তাবৎ ঐশ্বর্য একেবারেই তুচ্ছ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,رَكْعَتَا الْفَجْرِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، ‘ফজরের দুই রাক‘আত (সুন্নাত) ছালাত দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম’।[19] অন্যত্র তিনি বলেন, لَهُمَا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا جَمِيعًا، ‘এই দু’টি (রাক‘আত) আমার কাছে সমগ্র দুনিয়া ও দুনিয়ার সকল সম্পদের চেয়েও অধিক প্রিয়’।[20] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সফরে থাকা অস্থাতেও ফজরের এই দুই রাক‘আত সুন্নাত ছালাত ছাড়তেন না। মা আয়েশা ছিদ্দীক্বা (রাঃ) বলেন,لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى شَيْءٍ مِنَ النَّوَافِلِ أَشَدَّ مِنْهُ تَعَاهُدًا عَلَى رَكْعَتَيِ الفَجْرِ، ‘নবী করীম (ছাঃ) নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে কোন কিছুর প্রতি এত বেশী গুরুত্ব দিতেন না, যতটা গুরুত্ব দিতেন ফজরের দুই রাক‘আতের (সুন্নাতের) ব্যাপারে’।[21]

এখানে একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবার মতো। যদি ফরয ছালাতের আগের মাত্র দুই রাক‘আত সুন্নাতের মর্যাদা এমন আকাশচুম্বী হয়, তবে মূল ফরয ছালাতের মর্যাদা ও প্রতিদান কত বিশাল হ’তে পারে, তা মানুষের কল্পনারও অতীত। দুনিয়ার সামান্য কিছু টাকা বা পদের জন্য আমরা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করি। অথচ প্রতিদিন ভোরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পুরো পৃথিবীর চেয়েও দামি সম্পদ অর্জন করার এই সুবর্ণ সুযোগ আমরা নিছক অলসতার ঘোরে অবলীলায় নষ্ট করে দিচ্ছি। জীবনের এই চূড়ান্ত ক্ষতি ও বঞ্চনা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা অত্যন্ত যরূরী।

৯. জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা :

যারা ফজরের ছালাতে ব্যাপারে যত্মশীল হয়, তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে নিরাপত্তা লাভের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَنْ يَلِجَ النَّارَ أَحَدٌ صَلَّى قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ، وَقَبْلَ غُرُوبِهَا، ‘যে ব্যক্তি সূর্যোদয়ের পূর্বে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে (ফজর ও আছরের) ছালাত আদায় করবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না’।[22] আল্লামা শামসুল হক আযীমাবাদী (১২৭৩-১৩২৯ হি.) বলেন, ‘অত্র হাদীছে ফজর ও আছর ছালাতের ব্যাপারে বলা হয়েছে। বিশেষভাবে এ দুই ছালাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এ কারণে যে, ফজরের সময় মানুষের নিদ্রাকাল এবং আছরের সময় জীবিকা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকার সময়। সুতরাং যে ব্যক্তি এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও এ দুই ছালাত সংরক্ষণ করে, তার বাহ্যিক অবস্থা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, সে অন্যান্য ছালাতের প্রতিও যত্নশীল। তদুপরি এ দু’টি সময়ে রাতের ফেরেশতা ও দিনের ফেরেশতারা একত্রিত হন এবং বান্দাদের আমল আল্লাহ্র নিকট পেশ করেন। তাই আশা করা যায়, এ দুই ছালাত তার গুনাহসমূহের কাফফারা হবে; ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন’।[23]

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (মৃ. ২৩ হি.) একবার ফজরের ছালাতে সুলায়মান ইবনে আবী হাছমাহকে দেখতে না পেয়ে তার বাড়িতে গিয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি তাকে ফজর ছালাতে দেখলাম না কেন?’ তার মা বললেন, ‘সে রাতে দীর্ঘক্ষণ তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, لَأَنْ أَشْهَدَ صَلَاةَ الصُّبْحِ فِي جَمَاعَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَقُومَ لَيْلَةً، ‘ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা আমার কাছে সারারাত নফল ইবাদত করার চেয়ে অধিকতর প্রিয়’।[24]

১০. অফুরন্ত বরকত লাভের নিশ্চয়তা :

বর্তমান সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের জায়গা হ’ল ‘বরকত’। আমরা অনেক টাকা উপার্জন করছি, কিন্তু মাস শেষে পকেটে কিছু থাকছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে কাজ করছি, কিন্তু কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। আমাদের সময়, মেধা এবং যোগ্যতায় আজ যেন বরকতের আকাল। এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা দিনের সবচেয়ে বরকতময় সময়টুকু ঘুমিয়ে নষ্ট করে দিচ্ছি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী (ছাঃ) ভোরে কাজ শুরু করার জন্য আল্লাহ্র কাছে খাসভাবে বরকতের দো‘আ করেছেন। ছাখর আল-গামেদী (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেন,اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا، ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে ভোরের বরকত দান করুন’। তিনি কোন ক্ষুদ্র বা বিশাল বাহিনীকে কোথাও প্রেরণ করলে দিনের ভোরেই পাঠাতেন। বর্ণনাকারী ছাখর (রাঃ) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি তার পণ্যদ্রব্য দিনের প্রথমভাগে (ভোরে) পাঠাতেন, ফলে তিনি সম্পদশালী হয়েছিলেন এবং এভাবে তিনি অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন’।[25]

একটু চারপাশের বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনের দিকে তাকাই। আজকাল ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, লেখালেখি কিংবা গবেষণার মত সৃজনশীল পেশায় যারা যুক্ত আছেন, তাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা চালু হয়েছে যে, রাত জেগে কাজ করলে মনোযোগ ভালো হয়। সারা রাত জেগে ক্লায়েন্টের কাজ বা গবেষণার প্রজেক্ট শেষ করে তারা যখন সকালে ঘুমাতে যান, তখন ফজরের ছালাত তো ছুটেই যায়, সাথে রিযিক বণ্টনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিও হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ বিজ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে প্রমাণিত, ফজর ছালাতের পর একজন মানুষের মস্তিষ্ক যতটা সতেজ ও প্রাণবন্ত থাকে, সারাদিনে আর কখনো তেমন থাকে না। একজন ব্যবসায়ী, ডিজাইনার, লেখক বা গবেষক যদি সকালে ফজর পড়ে আল্লাহ্র নাম নিয়ে তাঁর কাজ শুরু করেন, নবীর দো‘আর বরকতে অল্প সময়ে তিনি যে পরিমাণ ও যে মানের কাজ করতে পারবেন, সারারাত জেগেও তা সম্ভব নয়।

সালাফে ছালেহীন বা আমাদের পূর্বসূরীগণ ভোরের এই সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটানোকে কতটা অপসন্দ করতেন, তা তাদের জীবনী পড়লে আমরা বুঝতে পারি। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) তাঁর এক ছেলেকে ভোর বেলা ফজরের পর ঘুমাতে দেখে বলেন,قُمْ أَتَنَامُ فِي السَّاعَةِ الَّتِي تُقْسَمُ فِيهَا الْأَرْزَاقُ؟ ‘ওঠো! তুমি কি এমন সময়ে ঘুমাচ্ছ, যখন রিযিক বণ্টন করা হয়?’[26] আব্দুর রহমান ইবনু আবী লায়লা (১৭-৮৩ হি.) বলেন, ‘একবার ওমর ইবনু মুলাইক আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন আমি সকালবেলায় (ফজরের পর) ঘুমিয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে পা দিয়ে নাড়া দিয়ে বললেন, أترقد فِي السَّاعَة الَّتِي تَنْتَشِر فِيهَا عِبَاد الله، ‘তুমি কি এমন সময় ঘুমিয়ে আছ, যখন আল্লাহ্র বান্দারা জীবিকা ও কল্যাণের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ে?’[27]

হিশাম ইবনু উরওয়াহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, ‘যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ) তাঁর সন্তানদেরকে সকালে ফজরের পর ঘুমাতে নিষেধ করতেন। প্রখ্যাত তাবেঈ উরওয়াহ ইবনুয যুবাইর (রহ.) (২৩-৯৪ হি.) বলেন,إِنِّي لَأَسْمَعُ بِالرَّجُلِ يَتَصَبَّحُ فَأَزْهَدُ فِيهِ، ‘আমি যখন শুনি যে কোন ব্যক্তি সকালে ঘুমায়, তখন তার প্রতি আমার অনাগ্রহ সৃষ্টি হয় (তাকে অপসন্দ করি)’।[28] একদা প্রখ্যাত তাবেঈ তাউস ইবনু কায়সান (৩৩-১০৬ হি.) ফজরের ছালাতের পর এক ব্যক্তির খোঁজে তার বাড়িতে গেলেন। তাকে বলা হ’ল, সে এখনো ঘুমিয়ে আছে। তখন তাউস অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে বললেন, مَا كُنْتُ أَرَى ‌أَنْ ‌أَحَداً ‌يَنَامُ فِي السَّحَرِ، ‘আমি তো ভাবতেই পারি না যে, ভোর বেলা কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে!’[29]

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হি.) বলেন, وَنَوْمُ الصُّبْحَةِ يَمْنَعُ الرِّزْقَ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ وَقْتٌ تَطْلُبُ فِيهِ الْخَلِيقَةُ أَرْزَاقَهَا، وَهُوَ وَقْتُ قِسْمَةِ الْأَرْزَاقِ، فَنَوْمُهُ حِرْمَانٌ إِلَّا لِعَارِضٍ أَوْ ضَرُورَةٍ، ‘ফজরের পরের ঘুম রিযিককে বাধাগ্রন্ত করে। কারণ এটি এমন এক সময় যখন সৃষ্টিকূল তাদের রিযিক অন্বেষণ করে এবং এটি রিযিক বণ্টনের সময়। তাই এ সময়ের ঘুম হ’ল (রিযিক থেকে) বঞ্চনা; তবে কোন অসুস্থতা বা বিশেষ প্রয়োজন থাকলে ভিন্ন কথা’।[30]

আধুনিক কর্পোরেট বিশ্বেও যদি আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তবে দেখতে পাব পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষদের অন্যতম প্রধান অভ্যাস হলো ভোরে দিন শুরু করা। অথচ আজ আমাদের অনেক মুসলিম যুবক সারারাত সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটায় এবং সূর্য মাথার ওপর ওঠার পর আলস্যভরে ঘুম থেকে জাগে। ফলে তাদের জীবনে নেমে আসে হতাশা, বিষণ্ণতা আর রিযিকের তীব্র সংকট। অফুরন্ত রহমত আর রিযিকের দরজা যখন খোলা থাকে, তখন আমরা অঘোরে ঘুমিয়ে থাকি। জীবনে প্রকৃত বরকত, প্রাচুর্য ও মানসিক প্রশান্তি আনতে হ’লে ফজরের ছালাত আদায় করে রবের কাছে রিযিক প্রার্থনার মাধ্যমে দিন শুরু করার কোন বিকল্প নেই। আমরা আশেপাশে এমন অনেক মানুষের সন্ধান পাব, যারা নিজেদের যোগত্য ও সামর্থ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবার-পরিজনে, কাজ-কর্মে বরকত হারিয়ে ফেলেছেন। এমন ব্যক্তিদের জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখতে পাবো যে, তারা ফজরের বরকতময় সময়গুলোকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে মারাত্মকভাবে গাফেল।

উপসংহার :

জীবনের যে সময়টুকু অবহেলায় পার হয়ে গেছে, তার জন্য আল্লাহ্র কাছে বিনীতভাবে ক্ষমা চাই। আজ থেকেই ফজর ছালাতকে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গ্রহণ করি। শয়তানের দাসত্ব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে প্রতিদিনের ভোরের স্নিগ্ধতায় আমরা যেন আল্লাহ্র রহমত, নিরাপত্তা ও জান্নাতের সুসংবাদ নিয়ে দিনের সূচনা করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত বিশেষ করে ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করার তাওফীক দান করুন-আমীন!

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৭; মিশকাত হা/৬২৭।

[2]. আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী, ২/১২; মোল্লা আলী ক্বারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ২/৫৪১।

[3]. তাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর ৩/২৫৩; ক্রমিক : ৩৩২৪; হাফেয মিয্যী, তাহযীবুল কামাল, ৫/২২৩।

[4]. আবূদাঊদ, হা/৫৬১; তিরমিযী হা/২২৩; ইবনু মাজাহ হা/৭৮১; মিশকাত হা/৭২১, সনদ ছহীহ।

[5]. আব্দুর রহমান ইবনে রজব হাম্বলী, ফাতহুল বারী, ৬/৩৫।

[6]. বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ, ২/৩৫৮।

[7]. মুসলিম, হা/৬৫৬; মিশকাত হা/৬৩০।

[8]. আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি./১১১৬-১২০১ খ্রি.), ছিফাতুছ ছাফওয়াহ (কায়রো: দারম্নল হাদীছ, ১ম সংস্করণ, ১৪২১ হি./২০০০ খ্রি.), খ- ১, পৃ. ৩৪৬।

[9]. বুখারী হা/৫৫৫; মুসলিম হা/ ৬৩২।

[10]. আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘দী, তাইসীরুল কারীমির রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান (তাফসীরে সা‘দী), পৃ. ৪৬৪।

[11]. আবূদাঊদ হা/৫৫৮; মিশকাত/৭২৮, সনদ হাসান।

[12]. তিরমিযী হা/৫৮৬; ছহীহাহ হা/৩৪০৩; মিশকাত হা/৯৭১, সনদ হাসান।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭০।

[14]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব ৩৫/১৯৬; আবূ নু‘আইম হিলয়াতুল আওলিয়া ৬/১৪৩; ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/৪০৫।

[15]. বুখারী, হা/৫৭৪; মুসলিম হা/৬৩৫; মিশকাত হা/৬২৫।

[16]. ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (১২৮৩-১৪১৪ হি.), মির‘আতুল মাফাতীহ শারহু মিশকাতিল মাছাবীহ, ২/৩৩১।

[17]. শায়খ উছায়মীন, শারহু রিয়াযিস ছালিহীন, পৃ. ১৫১।

[18]. বুখারী হা/৭৪৩৪।

[19]. মুসলিম, হা/৭২৫; তিরমিযী হা/৪১৬; মিশকাত হা/১১৬৪।

[20]. ছহীহ মুসলিম হা/৭২৫।

[21]. ছহীহুল বুখারী হা/১১৬৯।

[22]. মুসলিম, হা/৬৩৪; আবূদাঊদ হা/৪২৭।

[23]. শামসুল হক আযীমাবাদী, আওনুল মা‘বূদ, ২/৬৮।

[24]. ছহীহুত তারগীব হা/৪২৩; সনদ ছহীহ।

[25]. আবুদাঊদ হা/২৬০৬; তিরমিযী হা/১২১২; মিশকাত হা/৩৯০৮; ছহীহ হাদীছ।

[26]. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, যাদুল মা‘আদ ফী হাদয়ি খইরিল ইবাদ, তাহকীক: শু‘আইব আল-আরনাউত্ব ও আব্দুল ক্বাদির আল-আরনাউত্ব (বৈরূত: মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), খ- ৪, পৃ. ২২১।

[27]. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.), আল-লা‘আলি আল-মাছনূ‘আহ (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৬ খ্রি.), ২/১৩৪।

[28]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ হা/২৭০৮৫; ১৪/১৬৭।

[29]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৫/৪২; আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৪/৬; ইবনু কুদামা, মুখতাছার মিনহাজুল ক্বাছেদীন, পৃ. ৬৫।

[30]. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, ৪/২২২।






বিষয়সমূহ: ছালাত
প্রগতি ও সংকট - আফতাব আহমদ রহমানী
রাসূল (ছাঃ)-এর দো‘আয় শামিল হওয়ার উপায় - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
গোপন পাপ : ঈমান বিধ্বংসী এক নীরব ঘাতক - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
মানব জাতির সাফল্য লাভের উপায় (ফেব্রুয়ারী’১৩ সংখ্যার পর) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
বিদ‘আত ও তার পরিণতি (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
শাহ ইসমাঈল শহীদ : ভারতীয় উপমহাদেশে আহলেহাদীছ আন্দোলনের অকুতোভয় সিপাহসালার - ড. নূরুল ইসলাম
জুম‘আর কতিপয় বিধান - মুহাম্মাদ আকমাল হুসাইন
হতাশার দোলাচলে ঘেরা জীবন : মুক্তির পথ - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
জালূলার যুদ্ধ ও হুলওয়ান বিজয় - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
শিশুদের চরিত্র গঠনে ‘সোনামণি’ সংগঠনের ভূমিকা - ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
অনারবী ভাষায় জুম‘আ ও ঈদায়েনের খুৎবা : একটি বিশ্লেষণ - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
জান্নাত লাভের কতিপয় উপায় (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আরও
আরও
.