ভূমিকা :

ইসলামের ইতিহাসে নবী করীম (ছাঃ)-এর পরিবারবর্গ বা ‘আহলে বায়ত-এর মর্যাদা ও সম্মান এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে এই পবিত্র বংশধারার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পোষণ করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাঁদের প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমান ধ্বংস ও জাহান্নামে প্রবেশের অন্যতম কারণ। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তাঁদের নিষ্কলুষ পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় উম্মতকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষার্থে পবিত্র কুরআনের পাশাপাশি তাঁর আহলে বায়তকে শক্তভাবে অাঁকড়ে ধরার এবং তাঁদের অধিকারের প্রতি যত্নবান হওয়ার জোর তাকীদ দিয়েছেন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আহলে বায়তের প্রকৃত মর্যাদা, তাঁদের অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব, তাঁদের সুনির্দিষ্ট অধিকার এবং তাঁদের প্রতি উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

আহলে বায়তের পরিচয় :

আহলুল বায়ত (أَهْلُ ٱلْبَيْتِ) একটি আরবী শব্দবন্ধ। ‘আহল’ (أهل) অর্থ পরিবার বা সদস্য এবং ও বায়ত (بيت) অর্থ ঘর। শাব্দিক অর্থে ‘আহলে বায়ত’ বলতে ঘরে বসবাসকারী আপনজন বা পরবিাররে সদস্যদরে বোঝায়। পারিভাষিক অর্থে ‘আহলে বায়েত’ বলতে মূলত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সম্মানিত পরিবারবর্গকে বোঝানো হয়। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা ও সুন্নাহ্র আলোকে আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত হ’লেন-

১. নবী পত্নীগণ : এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا، ‘হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। উক্ত আয়াত অনুযায়ী তাঁরা আহলে বায়তের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিভিন্ন সময়ে রাসূল (ছাঃ)-এর মোট ১১ জন স্ত্রী ছিলেন। তন্মধ্যে হযরত খাদীজা ও যয়নব বিনতে খুযায়মা (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন। বাকী ৯ জন স্ত্রী রেখে তিনি মারা যান। যারা হ’লেন যথাক্রমে হযরত সাওদা, আয়েশা, হাফছাহ, উম্মে সালামাহ, যয়নব বিনতে জাহশ, জুওয়াইরিয়াহ, উম্মে হাবীবাহ, ছাফিইয়াহ ও মায়মূনা বিনতুল হারেছ (রাঃ)। এতদ্ব্যতীত আরও দু’জন মহিলার সাথে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সহবাসের পূর্বেই তারা পরিত্যক্ত হন। প্রথমজন আসমা বিনতে নু‘মান আল-কিনদিয়াহ। যিনি ‘জাউনিয়াহ’ (الْجَوْنِيَّةُ) বলেও পরিচিত।[1] তাকে কিছু মাল-সম্পদ দিয়ে বিদায় করা হয়। দ্বিতীয়জন ‘আমরাহ বিনতে ইয়াযীদ আল-কিলাবিয়াহ।[2]

২. ফাতেমা, আলী, হাসান, হোসাইন (রাঃ) : আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সকালে বের হ’লেন। তার পরনে ছিল কালো নকশাবৃত একটি পশমী চাদর। হাসান ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনি তাকে চাদরের ভেতর প্রবেশ করিয়ে নিলেন। হোসাইন ইবনু আলী (রাঃ) এলেন, তিনিও চাদরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লেন। ফাতেমা (রাঃ) এলেন, তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললেন। তারপর ’আলী (রাঃ) এলেন তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন। তারপরে বললেন, ‘হে আহলে বায়ত আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের হ’তে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করে তোমাদের পবিত্র করতে চান’(আহযাব ৩৩/৩০)।[3]

৩. যাদের উপর ছাদাক্বা হারাম : আহলে বায়ত বলতে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাদের উপর চিরদিন ছাদাক্বা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। তাঁরা হ’লেন বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালিব অথবা কেবল বনু হাশেম, কিংবা বনু হাশেম এবং তাঁদের ঊর্ধ্বমুখী বংশধারা গালিব ইবনে ফিহর পর্যন্ত। অধিকাংশ আলেম ও গবেষক এই মতামতকেই গ্রহণ করেছেন। ইবনু কাছীর (রহ.) বলেন, আহলে বায়ত বলতে কেবল নবীপত্নীগণ নয় বরং তাঁর পরিবারগণও এর অন্তর্ভুক্ত। আর এটিই এ বিষয়ে বর্ণিত কুরআন ও হাদীছসমূহকে শামিল করে’।[4]

যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) তাঁদের উদ্দেশ্যে খুৎবা দিয়েছিলেন। সেই খুৎবায় তিনি আল্লাহ্র কিতাবকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর বললেন, وَأَهْلُ بَيْتِي أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، ‘আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে আমি তোমাদের আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে আমি তোমাদের আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তখন (হোসাইন (নামক এক ব্যক্তি) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে যায়েদ! তাঁর আহলে বায়ত কারা? তাঁর স্ত্রীগণ কি তাঁর আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত নন? যায়েদ (রাঃ) বললেন, তাঁর স্ত্রীগণও তাঁর আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত, তবে তাঁর আহলে বায়ত হ’লেন তাঁরা যাদের জন্য তাঁর ওফাতের পর ছাদাকা গ্রহণ করা হারাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁরা কারা? যায়েদ (রাঃ) বললেন, তাঁরা হ’লেন আলী (রাঃ)-এর পরিবার, আক্বীলের পরিবার, জা‘ফরের পরিবার এবং আববাসের পরিবার। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাদের সবার জন্যই কি ছাদাক্বা হারাম? যায়েদ (রাঃ) বললেন, হ্যঁা।[5]

উল্লেখ্য, যারা নবী পরিবারের মুক্তদাস ছিলেন তারাও আহলে বায়তের অর্ন্তভুক্ত। মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের (মাওয়ালী) ব্যাপারে যে হাদীছটি মেহরান থেকে বর্ণিত হয়েছে সেখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা মুহাম্মাদের পরিবার (আল-মুহাম্মাদ), আমাদের জন্য ছাদাক্বা হালাল নয়; আর কোন কওমের মুক্তিপ্রাপ্ত দাসও তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’।[6] অতএব, নবী করীম (ছাঃ)-এর পরিবার-পরিজন হ’লেন তাঁর সম্মানিত স্ত্রীগণ, তাঁর সন্তান ও বংশধরগণ, বনু হাশেম, বনু মুত্তালিব এবং তাদের মুক্তদাসগণ।

আহলে বায়তের মর্যাদা

১. আহলে বায়তের পবিত্রতা ঘোষণা :

মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে নবী পরিবারের (আহলে বায়েত) পবিত্রতা ঘোষণা করে বলেন, إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا، ‘হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। এর তাফসীরে ইবনু আতিয়্যা (রহ.) বলেন, আয়াতে উল্লেখিত الرِّجْسُ ‘রিজস’ শব্দটি পাপ, শাস্তি, অপবিত্রতা এবং ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, যা আল্লাহ তা‘আলা আহলে বায়ত থেকে সম্পূর্ণরূপে দূর করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইবনে হাজার আল-হায়তামী (রহ.)-এর মতে, এই আয়াতটি নবী পরিবারের অনন্য ফযীলত ও মর্যাদার মূল উৎস। কারণ আয়াতটি إِنَّمَا (নিশ্চয়ই) শব্দ দ্বারা শুরু হয়ে কেবল তাঁদের ব্যাপারেই মহান আল্লাহ্র পবিত্র করার ইচ্ছাকে নির্দিষ্ট করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য হ’ল তাঁদেরকে যাবতীয় পাপ, ঈমানের ক্ষেত্রে সংশয় এবং সকল প্রকার নিন্দনীয় চরিত্র ও স্বভাব-বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র রাখা।[7]

২. নবী পরিবারের প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। (অতএব) হে মুমিনগণ! তোমরা তার প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর’ (আহযাব ৩৩/৫৬)। কা‘ব ইবনে উজরাহ (রাঃ) বলেন, ‘যখন উক্ত আয়াতটি নাযিল হ’ল তখন এক ব্যক্তি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকটে এসে আরয করল, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনার প্রতি সালাম জানানোর নিয়ম তো আমরা জানলাম, কিন্তু আপনার প্রতি ছালাত (দরূদ) পাঠের নিয়ম কি? তিনি বললেন, ‘তোমরা বল, ‘আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ’ (হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের ওপর ছালাত বা রহমত বর্ষণ করুন...’।[8] এর মধ্যেই আহলে বায়ত বা নবী পরিবারের জন্য এক মহান মর্যাদা ও ফযীলত নিহিত রয়েছে। কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে তাঁর পরিবারের ওপরও ছালাত (দরূদ) পাঠ করার জন্য উম্মতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর বিস্ময়কর ব্যাপার হ’ল, ভৌগোলিক সময়ের পার্থক্যের কারণে আযান, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত এবং মুমিনদের ব্যক্তিগত ইবাদতের মাধ্যমে দিবারাত্রির ২৪ ঘণ্টা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে অবিরত রাসূল (ছাঃ) ও তাঁর পরিবারের প্রতি এই দরূদ ও সালাম উচ্চারিত হচ্ছে। সুবহানাআল্লাহ।

৩. মুবাহালার আয়াতে নবী পরিবারের অন্তর্ভুক্তি :

ইসলামী ইতিহাসের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হ’ল ‘মুবাহালা’ বা সত্য প্রতিষ্ঠায় মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্র লা‘নত বা অভিশাপ কামনা করা। নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে ঈসা (আঃ)-কে নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত পর্যায়ে যখন সত্যের প্রমাণের জন্য আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করার নির্দেশ আসে, তখন রাসূল (ছাঃ) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও বিশ্বস্ত মানুষদেরই এই ঐতিহাসিক পরীক্ষার জন্য বেছে নেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ، ‘অনন্তর তোমার নিকট নিশ্চিত জ্ঞান এসে যাওয়ার পরেও যদি তারা ঈসা সম্পর্কে তোমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তবে তুমি বল, এসো আমরা ডাকি আমাদের ও তোমাদের সন্তানদের, স্ত্রীদের ও নিজেদের। অতঃপর সকলে আল্লাহ্র নিকট বিনীতভাবে প্রার্থনা করি এই মর্মে যে, মিথ্যুকদের উপর আল্লাহ্র লা‘নত বর্ষিত হোক’ (আলে ইমরান ৩/৬১)। সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন এই আয়াতটি নাযিল হ’ল... তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আলী, ফাতেমা, হাসান এবং হুসাইনকে ডাকলেন। অতঃপর বললেন, ‘হে আল্লাহ! এরাই আমার পরিবার’।[9] সত্যের সাক্ষ্য হিসাবে নবী পরিবারের এই অন্তর্ভুক্তি তাঁদের অসামান্য মর্যাদাকেই প্রমাণ করে।

৪. নবী (ছাঃ) ও তাঁর বংশের শ্রেষ্ঠত্ব :

পৃথিবীতে যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাঁর বার্তা পৌঁছানোর জন্য সর্বোত্তম মানুষদের মনোনীত করেছেন। শুধু ব্যক্তি হিসাবেই নয়, বংশ ও পারিবারিক আভিজাত্যের দিক থেকেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এবং তাঁর পরিবার সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। সৃষ্টির সূচনা থেকেই আল্লাহ তা‘আলা এই পবিত্র বংশধারাকে বিশেষভাবে নির্বাচিত করে ধাপে ধাপে উৎকর্ষের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। ওয়াসিলা ইবনুল আসকা‘ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ اللهَ اصْطَفَى كِنَانَةَ مِنْ وَلَدِ إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى قُرَيْشًا مِنْ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা ইসমাঈল (আঃ)-এর সন্তানদের মধ্য থেকে কিনানাহ গোত্রকে মনোনীত করেছেন, কিনানাহ থেকে কুরাইশ বংশকে মনোনীত করেছেন, কুরাইশ থেকে বনু হাশিম-কে মনোনীত করেছেন এবং বনু হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন’।[10]

নবী করীম (ছাঃ)-এর এই বংশগত মর্যাদার বিষয়টি এতটাই ঊর্ধ্বে যে, একবার কিছু মানুষের মাঝে এ নিয়ে কথা উঠলে তিনি সরাসরি মিম্বরে আরোহণ করে এর জবাব দেন। মুত্তালিব ইবনে আবি ওয়া‘দায়াহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আববাস (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে মানুষের কিছু কথাবার্তা (বংশ মর্যাদা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য) পৌঁছাল। তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? তারা বললেন, আপনি আল্লাহ্র রাসূল। তখন তিনি বললেন, ‘আমি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং আমাকে তাদের সর্বোত্তম সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে দু’টি দলে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে সর্বোত্তম দলের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এরপর তিনি বিভিন্ন গোত্র সৃষ্টি করেছেন এবং আমাকে সর্বোত্তম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তারপর তিনি পরিবারসমূহ (ঘরসমূহ) তৈরি করেছেন এবং আমাকে তাদের সর্বোত্তম পরিবারের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অতএব আমি পারিবারিক দিক থেকেও তোমাদের চেয়ে সর্বোত্তম এবং ব্যক্তিগত সত্তার দিক থেকেও তোমাদের চেয়ে সর্বোত্তম’।[11]

উম্মতকে কুরআন ও আহলে বায়তকে অাঁকড়ে ধরার তাকীদ :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতের হেদায়াত ও মুক্তির ব্যাপারে কতটা চিন্তাশীল ছিলেন, তা জীবনের অন্তিম মুহূর্তের উপদেশগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি পৃথিবীতে চিরকাল থাকবেন না, কিন্তু তাঁর অবর্তমানে উম্মত যেন কখনো পথভ্রষ্ট না হয় সেজন্য তিনি নাজাতের দু’টি অবিচ্ছেদ্য আলোকবর্তিকা রেখে গেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, জেনে রেখো, হে লোকসকল! আমি তো কেবল একজন মানুষ। শীঘ্রই আমার প্রতিপালকের দূত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আমার কাছে আসবেন এবং আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেব। وَإِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ، أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ، فَخُذُوا بِكِتَابِ اللهِ تَعَالَى، وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ " فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللهِ، وَرَغَّبَ فِيهِ. قَالَ: وَأَهْلُ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، ‘আর আমি তোমাদের মাঝে দু’টি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) বস্ত্ত রেখে যাচ্ছি। তার প্রথমটি হ’ল মহান আল্লাহ্র কিতাব; এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো। অতএব তোমরা আল্লাহ্র কিতাবকে আঁকড়ে ধরো এবং এর উপর শক্তভাবে অবিচল থাকো। অতঃপর তিনি আল্লাহ্র কিতাবের প্রতি (অনুসরণের) উৎসাহ দিলেন এবং এর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করলেন। এরপর তিনি বললেন, আর (দ্বিতীয় বস্ত্তটি হ’ল) আমার আহলে বায়ত (পরিবার)। আমি আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আহলে বায়তের ব্যাপারে তোমাদেরকে আল্লাহ্র কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি’।[12] উম্মতের দিকনির্দেশনার এই বার্তাটি তিনি বিদায় হজ্জেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, যা তোমরা শক্তভাবে অাঁকড়ে ধরলে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না; তা হ’ল আল্লাহ্র কিতাব এবং আমার পরিবার বা আহলে বায়েত।[13]

ছালাতের দরূদে নবী পরিবারের অন্তর্ভুক্তি :

মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ইবাদত হ’ল নবী কারীম (ছাঃ)-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করা। আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এটি। তবে ইসলামী শরী‘আতে এই দরূদ পাঠের ক্ষেত্রে কেবল রাসূল (ছাঃ)-কে স্মরণ করাই শেষ কথা নয়, বরং তাঁর পরিবার অর্থাৎ পুণ্যবতী স্ত্রীগণ ও পবিত্র বংশধরদেরও এই দো‘আয় অন্তর্ভুক্ত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ছাহাবায়ে কেরাম যখন আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে দরূদ পড়ার তাকীদ পেলেন, তখন তাঁরা নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে ছাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদেরকে আপনার প্রতি ছালাত (দরূদ) পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আমরা আপনার প্রতি কিভাবে দরূদ পাঠ করব? তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা বল, আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আজওয়াজিহি ওয়া যুররিয়্যাতিহি, কামা ছাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা; ওয়া বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আযওয়াজিহি ওয়া যুররিয়্যাতিহি, কামা বারাকতা আলা আলি ইবরাহীমা, ফিল আলামীনা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। (অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ, তাঁর স্ত্রীগণ এবং তাঁর বংশধরদের ওপর ছালাত (রহমত) বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ছালাত বর্ষণ করেছিলেন ইবরাহীমের ওপর। আর আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ, তাঁর স্ত্রীগণ এবং তাঁর বংশধরদের ওপর, যেরূপ আপনি বরকত নাযিল করেছিলেন ইবরাহীমের পরিবারের ওপর সারা জাহানের মধ্যে; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত’।[14]

আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা ও তার প্রতি ভালোবাসা :

আহলে বায়তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সদস্য এবং ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী (রাঃ)-এর মর্যাদা এক অতুলনীয় উচ্চতায় আসীন। তাঁর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বয়ং তাঁকে যে অসামান্য স্বীকৃতি দিয়েছেন, তা ‘গাদীরে খুম’-এর ঐতিহাসিক ভাষণে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাহাবাহ নামক স্থানে আলী (রাঃ)-কে উপস্থিত থাকতে দেখেছি, যখন তিনি উপস্থিত লোকজনকে আল্লাহ্র কসম দিয়ে আহবান জানিয়ে বলছিলেন, ‘আমি আল্লাহ্র কসম দিয়ে সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করছি, যে ব্যক্তি গাদীরে খুমের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছে যে, ‘আমি যার মাওলা (অভিভাবক), আলীও তার মাওলা; সে যেন দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেয়। আব্দুর রহমান বলেন, তখন বারোজন বদরী ছাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি যেন এখনো তাঁদের একজনের দিকে তাকিয়ে আছি! অতঃপর তাঁরা বললেন, আমরা সাক্ষ্য দিচিছ যে, আমরা গাদীরে খুমের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি কি মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক প্রিয় বা নিকটবর্তী নই? আমার স্ত্রীগণ কি তাদের মাতা নন? আমরা আরয করলাম, হ্যাঁ, হে আল্লাহ্র রাসূল! তখন তিনি বললেন, অতএব, আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, আপনিও তাকে ভালোবাসুন; আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে, আপনিও তার সাথে শত্রুতা করুন।[15]

আলী (রাঃ)-এর প্রতি এই ভালোবাসাকে স্বয়ং নবী কারীম (ছাঃ) মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্যকারী হিসাবে নির্ধারণ করে গেছেন। যির্র ইবনু হুবাইশ (রহঃ) বলেন, আলী (রাঃ) বলেছেন,وَالَّذِي فَلَقَ الْحَبَّةَ، وَبَرَأَ النَّسَمَةَ، إِنَّهُ لَعَهْدُ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَيَّ: أَنْ لَا يُحِبَّنِي إِلَّا مُؤْمِنٌ، وَلَا يُبْغِضَنِي إِلَّا مُنَافِقٌ، ‘সেই সত্তার কসম, যিনি শস্যদানা অংকুরিত করেছেন এবং প্রাণ সৃষ্টি করেছেন! নিশ্চয়ই উম্মী নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আমার প্রতি এই মর্মে অঙ্গীকার করেছেন যে, কোন মুমিন ব্যক্তি ছাড়া কেউ আমাকে ভালোবাসবে না এবং কোন মুনাফিক ছাড়া কেউ আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না’।[16]

ফাতেমা (রাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব :

আহলে বায়তের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হ’লেন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আদরের কন্যা ফাতেমা (রাঃ)। নারী জাতির জন্য দুনিয়াতে তিনি কেবল এক অনন্য আদর্শই নন, বরং পরকালীন জীবনে তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী। তাঁর এই অসামান্য শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গর্বের সাথে ব্যক্ত করেছেন। জান্নাতবাসী নারীদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন। যেমন উরওয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘আয়েশা (রাঃ) আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-কে বললেন, আমি কি তোমাকে সুসংবাদ দেব না যে, আমি আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,سَيِّدَاتُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ أَرْبَعٌ: مَرْيَمُ ابْنَةُ عِمْرَانَ، وَفَاطِمَةُ ابْنَةُ رَسُولِ اللهِ، وَخَدِيجَةُ ابْنَةُ خُوَيْلِدٍ، وَآسِيَةُ ابْنَةُ مُزَاحِمٍ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ، ‘জান্নাতবাসী নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ চারজন হ’লেন ইমরানের কন্যা মারিয়াম, আল্লাহ্র রাসূলের কন্যা ফাতেমা, খুওয়াইলিদের কন্যা খাদীজা এবং ফেরাউনের স্ত্রী মুজাহিমের কন্যা আসিয়া’।[17] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘হে ফাতেমা! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি মুমিন নারীদের নেত্রী অথবা এই উম্মতের নারীদের নেত্রী হবে?’[18] এই হাদীছগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ফাতেমা (রাঃ) কেবল নবী পরিবারেরই অহংকার নন, বরং তিনি সারা বিশ্বের মুমিন নারীদের জন্য পরকালীন জীবনের শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য প্রতীক।

ফাতেমা (রাঃ)-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ভালোবাসা :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হৃদয়ে তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-এর জন্য অসীম স্নেহ ও ভালোবাসা ছিল। মিসওয়ার ইবনে মাখরামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,فَاطِمَةُ بَضْعَةٌ مِنِّى، فَمَنْ أَغْضَبَهَا أَغْضَبَنِى وفي روية فَإِنَّمَا هِىَ بَضْعَةٌ مِنِّى، يُرِيبُنِى مَا أَرَابَهَا وَيُؤْذِينِى مَا آذَاهَا، ‘ফাতেমা (রাঃ) আমারই একটি অংশ। অতএব যে তাকে রাগান্বিত করল, সে যেন আমাকেই রাগান্বিত করল। অন্য বর্ণনায় এসেছে ‘নিশ্চয়ই সে (ফাতেমা) আমারই একটি অংশ। যা তাকে সংশয় বা উদ্বেগে ফেলে, তা আমাকেও উদ্বেগে ফেলে এবং যা তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়’।[19] আলী (রাঃ) আবু জাহলের মেয়েকে বিবাহ করার ইচ্ছা পোষণ করলে রাসূল (ছাঃ) ফাতেমা (রাঃ)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই মুহাম্মাদের কন্যা ফাতেমা আমারই একটি অংশ। যা কিছু তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়। আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর (আবু জাহলের) কন্যা কখনো একজন পুরুষের অধীনে একসাথে একত্রিত হতে পারে না। নবী করীম (ছাঃ)-এর এই অসন্তুষ্টির কথা শুনে আলী (রাঃ) বিয়ের প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিলেন।[20] আয়েশা (রাঃ) বলেন, ওঠাবসা, আচার-আচরণ, চালচলন এবং স্বভাব-চরিত্রে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে আল্লাহ্র রাসূলের কন্যা ফাতেমার চেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে আমি দেখিনি। ফাতেমা (রাঃ) যখন নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে আসতেন, তখন নবীজী (ছাঃ) নিজে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতেন, তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাঁকে বসাতেন। অনুরূপভাবে নবী করীম (ছাঃ) যখন ফাতেমার ঘরে প্রবেশ করতেন, তখন ফাতেমাও নিজের বসার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যেতেন, তাঁকে চুম্বন করতেন এবং নিজের বসার জায়গায় তাঁকে বসাতেন।[21] কন্যা ফাতেমা (রাঃ)-এর প্রতি নবী কারীম (ছাঃ)-এর এই অবিমিশ্র ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, আহলে বায়তের সাথে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আত্মার সম্পর্ক কতটা নিবিড় ছিল।

হাসান ও হোসাইন (রাঃ)-এর মর্যাদা :

দেŠহিত্র-হাসান ও হোসাইন (রাঃ) হ’লেন নবী পরিবারের দু’টি প্রস্ফুটিত গোলাপ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র। স্বয়ং নবী কারীম (ছাঃ) তাঁদেরকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন এবং উম্মতকেও তাঁদেরকে ভালোবাসার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁদের পরকালীন শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে তিনি বলেছেন,الحَسَنُ وَالحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الجَنَّةِ، ‘হাসান ও হোসাইন হ’ল জান্নাতবাসী যুবকদের নেতা’।[22] একদিন নবী করীম (ছাঃ) মদীনার এক বাজার থেকে ফিরে তিনবার বললেন, ‘লুকাই (ছোট্ট বালক) কোথায়? হাসান ইবনু আলীকে ডাকো। এরপর হাসান ইবনু আলী (রাঃ) হেঁটে এলেন, আর তাঁর গলায় ছিল একটি হার। তখন নবী করীম (ছাঃ) তাঁর হাত দিয়ে এভাবে (ইশারা) করলেন, আর হাসানও তাঁর হাত দিয়ে এভাবে করলেন। এরপর তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! আমি তাকে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো এবং যে তাকে ভালোবাসে তাকেও তুমি ভালোবাসো’।[23]

ইরাকবাসীদের এক ব্যক্তি ইবনে ওমর (রাঃ)-কে মশার রক্ত কাপড়ে লাগার (হুকুম) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তখন ইবনু ওমর (রাঃ) বললেন, তোমরা এই ব্যক্তির দিকে তাকাও! সে মশার রক্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে, অথচ তারা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রাঃ)-কে হত্যা করেছে! অথচ আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়ই হাসান এবং হোসাইন এই দু’জন দুনিয়াতে আমার দু’টি সুগন্ধি ফুল’।[24] এছাড়া হাসান (রাঃ)-এর দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের বিষয়ে রাসূল (ছাঃ) আগেই সুসংবাদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার এই পুত্র একজন নেতা। আশা করি, আল্লাহ এর মাধ্যমে মুসলমানদের দু’টি বড় দলের মাঝে মীমাংসা করে দিবেন’।[25]

আহলে বায়তের প্রতি আবুবকর (রাঃ)-এর ভালোবাসা :

আহলে বায়তের প্রতি ছাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা কতটা গভীর ছিল, তা ইসলামের প্রথম খলীফা আবুবকর (রাঃ)-এর ঐতিহাসিক বাণী ও আমল থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। উম্মতকে নবীজির পরিবারের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেছেন,ارْقُبُوا مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فِى أَهْلِ بَيْتِهِ، ‘তোমরা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে তাঁর পরিবারের মাঝে খোঁজ করো’।[26] তিনি আরো বলেন,وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَرَابَةُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحَبُّ إِلَيَّ أَنْ أَصِلَ مِنْ قَرَابَتِي، ‘সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও তাদের হক আদায় করা আমার নিকট আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার চেয়েও অধিক প্রিয়’।[27]

আহলে বায়তের প্রতি ওমর (রাঃ)-এর ভালোবাসা :

আহলে বায়তের সাথে ওমর (রাঃ)-এর গভীর সুসম্পর্ক ছিল এবং তিনি তাঁদের স্নেহ ও সম্মান করতেন। এর প্রমাণস্বরূপ দেখা যায়, আলী (রাঃ) তাঁর মেয়ে উম্মে কুলসুমের বিয়ে ওমর (রাঃ)-এর সাথে দিয়েছিলেন।[28] আহলে বায়তের প্রতি তাঁর সম্মানের মাত্রা এমন ছিল যে, যেখানে তাঁর নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর সর্বদা তাঁর কাছে প্রবেশের সুযোগ পেতেন না, সেখানে হুসাইন (রাঃ)-এর জন্য প্রবেশের সাধারণ অনুমতি ছিল।[29] এছাড়া তিনি আহলে বায়তের সদস্যদের সম্মানার্থে তাঁদের জন্য বিশেষ ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন এবং ইরাক ও শাম বিজয়ের পর প্রাপ্ত গনীমতের মালের এক-পঞ্চমাংশ তিনি সর্বপ্রথম আহলে বায়তের সদস্যদের হাতেই তুলে দেন।[30] এমনকি পারস্য সম্রাটের মেয়ে যুদ্ধবন্দি হয়ে ওমর (রাঃ)-এর নিকট উপহার হিসাবে পাঠানো হলে, তিনি তাঁকে নিজে গ্রহণ না করে হোসাইন (রাঃ)-কে প্রদান করেন।[31]

আহলে বায়তের প্রতি বিদ্বেষের পরিণতি :

নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা যেমন ঈমানের অংশ, তেমনি তাঁদের প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষ বা শত্রুতা পোষণ করা ঈমান ধ্বংসের অন্যতম কারণ। নবী পরিবারের প্রতি বিদ্বেষকে অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হ’ল জাহান্নাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُبْغِضُنَا أَهْلَ الْبَيْتِ رَجُلٌ إِلَّا أَدْخَلَهُ الله النار، ‘সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যে কোন ব্যক্তিই আমাদের আহলে বায়ত (পরিবার)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন’।[32] এছাড়া আলী (রাঃ)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করাকে নবীজি (ছাঃ) সরাসরি মুনাফিকের লক্ষণ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন।[33] আহলে বায়তের প্রতি এই বিদ্বেষের পরিণতি সম্পর্কে ইমাম আল-মুনাভী (রহ.) বলেন, ‘তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ বা ক্ষোভ পোষণ করা জাহান্নামকে অবধারিত করে দেয়’।[34]

প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি জান্নাতে যাওয়ার আশা করে অথচ জান্নাতের যুবকদের নেতা হাসান ও হোসাইন (রাঃ) কিংবা জান্নাতী নারীদের নেত্রী ফাতেমা (রাঃ)-এর প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণ করে, তার জান্নাতের আশা করাটাই অবান্তর। নবী পরিবারের প্রতি বিদ্বেষ ও শত্রুতা পোষণ করার কারণে এই শ্রেণীর মানুষেরা কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, বরং এটি তাদেরকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।

আহলে বায়তের কতিপয় বৈশিষ্ট্য

ছাদাক্বাহ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা :

ইসলামী শরী‘আতে আহলে বায়তের পবিত্রতা ও অনন্য মর্যাদা রক্ষার্থে তাঁদের জন্য মানুষের যাকাত গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে। যাকাতকে মূলত মানুষের সম্পদের ময়লা হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা এই পবিত্র বংশধারার মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আব্দুল মুত্তালিব ইবনে রাবী‘আ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ هَذِهِ الصَّدَقَةَ إِنَّمَا هِيَ أَوْسَاخُ النَّاسِ، وَلَا تَحِلُّ لِمُحَمَّدٍ، وَلَا لِآلِ مُحَمَّدٍ، ‘নিশ্চয়ই এই ছাদাক্বা (যাকাত) হ’ল মানুষের সম্পদের) ময়লা-আবর্জনা। আর এটি মুহাম্মদের জন্য এবং মুহাম্মদের পরিবার-পরিজনের (আহলে বায়তের) জন্য হালাল নয়’।[35] নবীজি (ছাঃ) নিজে এই ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। আনাস (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) কখনো (রাস্তায়) পড়ে থাকা খেজুরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেটি তুলে নিয়ে খাওয়া থেকে কেবল এই ভয়েই বিরত থাকতেন যে তা ছাদাক্বার খেজুর হ’তে পারে।[36] একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঘুমিয়ে ছিলেন। তখন তিনি তাঁর পার্শ্বদেশে একটি খেজুর পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি সেটি নিয়ে খেয়ে ফেললেন। অতঃপর রাতের শেষভাগে তিনি ছটফট করতে লাগলেন। এতে তাঁর কোন কোন স্ত্রী অত্যন্ত ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘আমি আমার পার্শ্বদেশে একটি খেজুর পেয়েছিলাম এবং তা খেয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমি এই আশঙ্কায় (অস্বস্তি বোধ) করছি যে, তা ছাদাক্বার খেজুর ছিল না তো!’।[37]

পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতিও তাঁর এই কঠোর সতর্কতা বিদ্যমান ছিল। একবার হাসান (রাঃ) ছাদাক্বার একটি খেজুর নিয়ে নিজের মুখে প্রবেশ করালেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, ছিঃ ছিঃ, ফেলে দাও! তুমি কি জানো না যে আমরা (আহলে বায়ত) ছাদাক্বার মাল খাই না?।[38] উল্লেখ্য রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবার-পরিজনের জন্য যাকাতের মালের কোন কিছুই হালাল নয়।[39]

গণীমতের এক পঞ্চমাংশ গ্রহণের অধিকার :

আহলে বায়েতদের জন্য যাকাত গ্রহণ হারাম হ’লেও তারা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ পাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ، ‘আর তোমরা জেনে নাও যে, যুদ্ধে তোমরা যে সকল বস্ত্ত গণীমত রূপে লাভ করেছ, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহ্র, তাঁর রাসূলের, তাঁর নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও (দুস্থ) মুসাফিরদের জন্য’ (আনফাল ৮/৪১)। এর ব্যাখ্যায় আল্লামা সা‘দী বলেন, আর এই খুমুস (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ) পাঁচ ভাগে বিভক্ত করা হবে... দ্বিতীয় খুমুস (পঞ্চমাংশ) হ’ল ‘যিল কুরবা’ তথা নিকটাত্মীয়দের জন্য। আর তারা হ’লেন বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের নবী (ছাঃ)-এর আত্মীয়-স্বজন। আল্লাহ তা‘আলা এই অংশটিকে আত্মীয়তার সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন, যা এই বিষয়ের প্রমাণ যে, এখানে মূল কারণ বা ভিত্তি হ’ল কেবলই আত্মীয়তার সম্পর্ক। ফলে এতে তাদের ধনী ও দরিদ্র, পুরুষ ও নারী সকলেই সমান অংশীদার হবে।[40]

ফাই-এর এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণের অধিকার :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,مَا أَفَاءَ اللهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ، ‘আল্লাহ জনপদবাসীদের নিকট থেকে স্বীয় রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহ্র জন্য ও রাসূলের জন্য এবং তার নিকটাত্মীয়দের ও ইয়াতীম-মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য’ (হাশর ৫৯/৭)।

উম্মতের পক্ষ থেকে মহববত বা ভালোবাসা প্রাপ্তির অধিকার : আহলে বায়তের প্রত্যেক সদস্যকে ভালাবাসতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى، ‘তুমি বল, আমি তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চাই না কেবল আত্মীয়তার সৌহার্দ্য ব্যতীত’ (শূরা ৪২/২৩)। অত্র আয়াতে রাসূল পরিবারের উচ্চ মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে।

আববাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! কুরাইশরা যখন একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন তারা হাসিখুশি ও আনন্দিত মুখে সাক্ষাৎ করে। কিন্তু তারা যখন আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন তারা এমন চেহারা নিয়ে সাক্ষাৎ করে যা আমরা চিনি না অর্থাৎ তারা বিরূপ আচরণ করে। এতে নবী করীম (ছাঃ)) অত্যন্ত রাগান্বিত হ’লেন এবং বললেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কোন ব্যক্তির অন্তরে ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য তোমাদেরকে ভালোবাসবে’।[41] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বললেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ مَنْ آذَى عَمِّي فَقَدْ آذَانِي فَإِنَّمَا عَمُّ الرَّجُلِ صِنْوُ أَبِيهِ، ‘হে মানবমন্ডলী! যে ব্যক্তি আমার চাচাকে কষ্ট দিল, সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। কারণ একজন মানুষের চাচা তার পিতার সমতুল্য বা পিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ’।[42]

আহলে বায়তের মর্যাদার ব্যাপারে বিদ্বাগণের অভিমত :

১. ইমাম শাফেঈ (রহঃ) আহলে বায়তের মর্যাদায় কবিতা আবৃতি করে বলেন, ‘হে আল্লাহ্র রাসূলের আহলে বায়ত (পরিবারবর্গ)! আপনাদের ভালোবাসা, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে ফরয যা তিনি কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন। আপনাদের মহান গৌরবের জন্য এটুকুই তো যথেষ্ট যে, যে ব্যক্তি আপনাদের প্রতি দরূদ পাঠ করে না, তার ছালাতই হয় না’।[43]

২. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল(রহঃ) বলেছেন, ‘তাবেঈ, মুসলমানদের ইমাম, সালাফে ছালেহীন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ফক্বীহগণের মধ্য থেকে নববইজন ইমাম এই বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) যে সুন্নাহ্র ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন তা হ’ল...আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর সমস্ত ছাহাবী, তাঁর সন্তান-সন্ততি, তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ এবং তাঁর শ্বশুরকূল ও জামাতাকূলের সকলের জন্য রহমতের দো‘আ করা..।[44]

৩. শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেছেন, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর আহলে বায়ত (পরিবার-পরিজন)-এর এমন কিছু অধিকার রয়েছে যা রক্ষা করা আবশ্যক। কেননা আল্লাহ তা‘আলা খুমুস (যুদ্ধলব্ধ মালের এক-পঞ্চমাংশ) ও ফাই (বিনা যুদ্ধে অর্জিত সম্পদ)-এর মধ্যে তাদের জন্য অংশ নির্ধারণ করেছেন এবং আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর ওপর ছালাত পাঠ করার পাশাপাশি তাদের ওপরও ছালাত পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব মুহাম্মদের পরিবারের ওপর ছালাত পাঠ করা মুসলমানদের নিকট তাদের একটি প্রাপ্য অধিকার, আর এটি (ছালাত পাঠ) তাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার রহমত বর্ষিত হওয়ার একটি অন্যতম মাধ্যম’।[45]

তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর আহলে বায়তকে ভালোবাসা ওয়াজিব...। বরং এটি আল্লাহ তা‘আলা আমাদের যে সমস্ত বিষয় নির্দেশ করেছেন তারই অন্তর্ভুক্ত, যেভাবে তিনি আমাদের অন্যান্য ইবাদতসমূহের নির্দেশ দিয়েছেন।[46]

৪. হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেছেন, আহলে বায়েত-এর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কর্তৃক যে অছিয়ত করা হয়েছে, এবং তাদের প্রতি সদাচরণ, তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। কেননা তারা এক পবিত্র বংশধারা থেকে এসেছেন। যা আত্মগৌরব, মর্যাদা ও বংশমর্যাদার দিক থেকে পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে সম্মানিত পরিবার। আর এই সম্মান ও মর্যাদা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুনিশ্চিত হয়, বিশেষ করে যখন তারা সুস্পষ্ট, উজ্জ্বল ও সঠিক নববী সুন্নাহ্র অনুসারী হন, যেভাবে তাদের পূর্বসূরীগণ ছিলেন। যেমন আববাস ও তাঁর সন্তানগণ এবং আলী ও তাঁর পরিবার ও বংশধরগণ।[47]

৫. ইমাম আল-আজুর্রী (রহঃ) বলেছেন, প্রত্যেক মুমিন পুরুষ ও নারীর ওপর আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসা ওয়াজিব। আর তারা হ’লেন, বনু হাশেম, আলী ইবনে আবী তালিব এবং তাঁর সন্তান ও বংশধরগণ; ফাতেমা এবং তাঁর সন্তান ও বংশধরগণ; হাসান ও হোসাইন এবং তাদের সন্তান ও বংশধরগণ; জাফর আত-তৈয়ার এবং তাঁর সন্তান ও বংশধরগণ; হামযাহ এবং তাঁর সন্তানগণ; এবং আববাস ও তাঁর সন্তান ও বংশধরগণ। এরাই হ’লেন আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর আহলে বায়েত। মুসলমানদের ওপর কর্তব্য হ’ল তাদেরকে ভালোবাসা, তাদের সম্মান করা, তাদের কোন ভুলত্রুটি বা কষ্টদায়ক আচরণ সহ্য করা, তাদের সাথে উত্তম আচরণ বজায় রাখা, তাদের ওপর ধৈর্য ধারণ করা এবং তাদের জন্য দো‘আ করা। অতঃপর তাদের সন্তান ও বংশধরদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্মশীল হবে।[48]

৬. জামালুদ্দীন আল-গজনভী (রহঃ) বলেন, আমরা আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)-এর আহলে বায়েত, তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ, তাঁর বংশধর, তাঁর নিকটাত্মীয় এবং সকল ছাহাবীকে ভালোবাসি। আমরা তাঁদেরকে কল্যাণের সাথে স্মরণ করি, তাঁদের প্রশংসা করি, তাঁদের জন্য মঙ্গলের দো‘আ করি এবং তাঁদের প্রতি রহমত কামনা করি। আমরা তাঁদের কারও ভালোবাসায় অতিরঞ্জন করি না, আবার তাঁদের কারও কাছ থেকে সম্পর্ক ছিন্নও করি না। যারা তাঁদের ভালোবাসে, আমরা তাঁদের ভালোবাসি; আর যারা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, আমরা তাঁদের ঘৃণা করি..। তাঁদের ভালোবাসা হ’ল দ্বীন ও ঈমান, আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ হ’ল কুফর ও সীমালঙ্ঘন।[49]

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, নবী পরিবার বা আহলে বায়তের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও নাজাতের উপায়। পবিত্র কুরআন ও হাদীছের আলোকে তাঁদের অনন্য মর্যাদা, পবিত্রতা ও সুনির্দিষ্ট অধিকার অকাট্যভাবে প্রমাণিত। তাঁদের প্রতি সামান্যতম বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমান বিনষ্টকারী অপরাধ ও জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। তবে এক্ষেত্রে ইসলাম ও আহলুস সুন্নাহ্র ভারসাম্যপূর্ণ নীতি হ’ল আমরা নবী পরিবারকে প্রাণের চেয়েও বেশী ভালোবাসব এবং যথাযথ সম্মান দেব, কিন্তু ভালোবাসতে গিয়ে শরী‘আতের সীমা লঙ্ঘন বা কোন বাড়াবাড়ি করব না। মহান আল্লাহ আমাদের হৃদয়ে তাঁদের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা দান করুন-আমীন!

-মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম*

 সিনিয়র শিক্ষক, রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ।


[1]. ফাৎহুল বারী হা/৫২৫৫-এর ব্যাখ্যা

[2]. বুখারী হা/৫২৫৪-৫৫; ইবনু হিশাম ২/৬৪৭, গৃহীত : সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), ৩য় মুদ্রণ, পৃ.৭৫৯।

[3]. মুসলিম হা/২৪২৪।

[4]. ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আহযাব ৩৩ আয়াত; বিস্তারিত দ্রঃ সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ৩য় মুদ্রণ ৭৬০ পৃ.

[5]. মুসলিম হা/২৪০৮।

[6]. বুখার হা/৬৭৬১; মুসনাদে আহমাদ হা/১৬৪৪৬, সনদ ছহীহ।

[7]. আস-সাওয়ায়েকুল মুহরিকা: ২/৪২৫।

[8]. ত্বাহাবী, মুশকিলুল আছার হা/২২৩১

[9]. মুসলিম হা/২৪০৪

[10]. ছহীহ মুসলিম হা/২২৭৬; মিশকাত হা/৫৭৪০।

[11]. আহমাদ হা/১৭৮৮, সনদ হাসান।

[12]. মুসলিম হা/২৪০৮; আহমাদ হা/১৯২৮৫

[13]. তিরমিযী হা/৩৭৮৬; মিশকাত হা/৬১৪৩

[14]. বুখারী হা/৩৩৬৯; মিশকাত হা/৯২০

[15]. আহমাদ হা/৯৬১; মিশকাত হা/৬০৯৪; সনদ ছহীহ

[16]. মুসলিম হা/৭৮; মিশকাত হা/৬০৭৯

[17]. হাকেম হা/৪৮৫৩; ছহীহাহ হা/১৪২৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৬৭৮

[18]. বুখারী হা/২৬; মুসরিম হা/২৪৫০

[19]. বুখারী হা/৫২৩০; মিশকাত হা/৬১৩০

[20]. মুসলিম হা/২৪৪৯

[21]. আবুদাউদ হা/৫২১৭; মিশকাত হা/৪৬৮৯, সনদ ছহীহ

[22]. তিরমিযী হা/৩৭৬৮; মিশকাত হা/৬১৫৪

[23]. বুখারী হা/৫৮৮৪; মিশকাত হা/৬১৩৪।

[24]. বুখারী হা/৩৭৫৩; ছহীহুল জামে‘ হা/১৬০০

[25]. বুখারী হা/৩৬২৯; মিশকাত হা/৬১৩৫

[26]. বুখারী হা/৩৭১৩

[27]. বুখারী হা/৩৭১২; মুসলিম হা/১৭৫৯

[28]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৩/৫০১

[29]. শরহু নাহযিল বালাগাহ ৩/১১০

[30]. তারীখুল ইয়াকুবী পৃ. ১৬৬; ইবনু আন্বাহ, উমদাতু-ত্বালেব, পৃ.১৯২।

[31]. মির্যা তাকী খান, নাসিখূত তাওয়ারিখ ৩/১০

[32]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৬৯৭৮; ছহীহাহ হা/২৪৮৮

[33]. মুসলিম হা/৭৮; মিশকাত হা/৬০৭৯

[34]. ফায়যুল কাদীর ২/৫১৯

[35]. ছহীহুল জামে‘ হা/১৬৬৪; ছহীহুত তারগীব হা/৮০৭

[36]. আহমাদ হা/১৩৫৫৭, সনদ ছহীহ

[37]. মুসনাদে আহমাদ হা/৬৭২০, সনদ হাসান

[38]. মুসলিম হা/১০৭২; মিশকাত হা/১৮২২।

[39]. নাসায়ী হা/২৪৪৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৪২৬৫

[40]. তাফসীরুস সা‘দী পৃ. ৩২১

[41]. আহমাদ হা/১৭৭২; মিশকাত হা/৬১৪৭. সনদ সমালোচিত

[42]. তিরমিযী হা/৩৭৫৮; মিশকাত হা/৬১৪৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৭০৮৭

[43]. আব্দুর রহমান মেছত্বাভী, দেওয়ানুল ইমাম শাফেঈ পৃ. ৯৩

[44]. ইবনে আবী ইয়ালা, তাবাকাতুল হানাবিলাহ ১/১৩০

[45]. মাজমূ‘উল ফাতাওয়া ৩/৪০৭

[46]. মিনহাজুস সুন্নাহ ৭/১০২

[47]. তাফসীরে ইবনু কাছীর ৭/২০১

[48]. আশ-শারী‘আহ ৫/২২৭৬

[49]. উছূলুদ্দীন পৃ. ২৮৯-২৯২






উত্তম মৃত্যুর কিছু নিদর্শন ও আমাদের করণীয় - ইহসান ইলাহী যহীর
জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত (৫ম কিস্তি ফেব্রুয়ারী সংখ্যার পর) - মুযাফফর বিন মুহসিন
মহামনীষীদের পিছনে মায়েদের ভূমিকা (৫ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত পরিচিতি (৫ম কিস্তি) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
ধূমপানের ক্ষতিকর দিক
ইসলামের আলোকে সম্পদ বৃদ্ধির উপায় - মুহাম্মাদ আবু তাহের, পরিচালক, কিউসেট ইনস্টিটিউট, সিলেট।
বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু পদচিহ্ন (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব (২য় কিস্তি) - ড. এ এস এম আযীযুল্লাহ
মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
টাখনুর নীচে কাপড় পরিধানের শাস্তি - আব্দুল মালেক বিন ইদরীস
মানব জাতির সাফল্য লাভের উপায় (৮ম কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
যাকাত সম্পর্কিত বিবিধ মাসায়েল (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম মাদানী
আরও
আরও
.