ভূমিকা :

পার্থিব জীবনের এই সফরে আমরা সবাই পরকালের যাত্রী। এই পথে শয়তান প্রতিনিয়ত আমাদের পদস্খলনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। ফলে মানুষের সামনে আমাদের আমল-আখলাক্ব অনেকটা ভালো দেখালেও নির্জনে আমাদের প্রকৃত স্বরূপ ফুটে ওঠে। আর লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহর অবাধ্যতা করার নামই হ’ল গোপন পাপ। গোপন পাপ হ’ল ঈমানের এক নীরব ঘাতক, যা উইপোকার মত আমাদের তিল তিল করে গড়ে তোলা নেক আমলগুলোকে ভিতর থেকে কুরে কুরে খেয়ে ধ্বংস করে দেয়। সেজন্য গোপন পাপের করাল গ্রাস থেকে নিজেদের ঈমান ও আমলকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে আমরা গোপন পাপ থেকে পরিত্রাণের কার্যকরী কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

গোপন পাপ থেকে বাঁচার উপায় সমূহ

১. তাক্বওয়ার সাথে একাকীত্ব নিয়ন্ত্রণ করা :

বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে গোপন পাপের সবচেয়ে বড় ও সহজলভ্য হাতিয়ার হ’ল আমাদের হাতের স্মার্টফোন। দিনের আলোতে যে চোখ কুরআন তেলাওয়াত করে, রাতের অন্ধকারে সেই চোখই হয়তো হারাম দৃশ্যে আটকে যায়। একাকীত্বের সুযোগ পেলেই শয়তান আমাদের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। তাই একাকীত্বের মুহূর্তগুলোকে তাক্বওয়ার সাথে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। নির্জনে নিজেকে পাপমুক্ত রাখা কতটা কঠিন, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস আশ-শাফেঈ (১৫০-২০৪হি./৭৬৭-৮২খ্রি.) বলেন,أَشَدُّ الْأَعْمَالِ ثَلَاثَةٌ: الْجُودُ مِنْ قِلَّةٍ، وَالْوَرَعُ فِي خَلْوَةٍ، وَكَلِمَةُ الْحَقِّ عِنْدَ مَنْ يُرْجَى وَيُخَافُ، ‘তিনটি আমল সবচেয়ে কঠিন। ১. অভাবের মধ্যেও দানশীলতা, ২. নির্জনে পরহেযগারিতা অবলম্বন করা এবং ৩. এমন ব্যক্তির সামনে সত্য কথা বলা, যার কাছ থেকে উপকারের আশা করা হয় কিংবা যার ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়’।[1]

নির্জনে আল্লাহর পর্যবেক্ষণের ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখাকে বলা হয় ‘মুরাক্বাবা’। মুরাক্বাবা হ’ল হৃদয় জগতে সবসময় এই গভীর অনুভূতি জাগিয়ে রাখা যে, ‘মহান আল্লাহ আমাকে দেখছেন এবং আমার যাবতীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছেন’। এই মুরাক্বাবা সম্পর্কে প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ (৬৯১-৭৫১ হি./১২৯২-১৩৫০ খ্রি.) বলেন,الْمُرَاقَبَةُ هِيَ التَّعَبُّدُ بِاسْمِهِ الرَّقِيبِ، الْحَفِيظِ، الْعَلِيمِ، السَّمِيعِ، الْبَصِيرِ، فَمَنْ عَقَلَ هَذِهِ الْأَسْمَاءَ، وَتَعَبَّدَ بِمُقْتَضَاهَا: حَصَلَتْ لَهُ الْمُرَاقَبَةُ ‘মুরাক্বাবা হ’ল আল্লাহর কয়েকটি গুণবাচক নামের দাবী অনুযায়ী ইবাদত করা। নামগুলো হ’ল- আর-রাক্বীব (সর্বদা পর্যবেক্ষণকারী), আল-হাফীয (সংরক্ষণকারী), আল-আলীম (সর্বজ্ঞ), আস-সামী‘ (সর্বশ্রোতা) এবং আল-বাছীর (সর্বদ্রষ্টা)। যে ব্যক্তি এসব নামের অর্থ গভীরভাবে অনুধাবন করবে এবং সেগুলোর দাবী অনুযায়ী নিজের ইবাদত ও জীবন পরিচালনা করবে, তার মধ্যেই প্রকৃত ‘মুরাক্বাবা’ অর্জিত হবে’।[2] সুতরাং যে ব্যক্তি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ তাকে সর্বদা দেখছেন, তার ফিসফিসানি শুনছেন, তার প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানেন এবং তার প্রতিটি কর্মকান্ড সংরক্ষণ করছেন, তার অন্তরে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আল্লাহর উপস্থিতি ও সচেতনতা সৃষ্টি হবে। ফলে সে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করবে।

একটু বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করুন। আমরা রাস্তাঘাটে, শপিংমলে বা অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা দেখলে নিজেদের আচরণ কতটা সংযত করি! কেউ যেন আমাদের ভুল ধরতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। ইন্টারনেটে বা স্মার্টফোনে কোন হারাম সাইটে প্রবেশ করার পর মানুষ প্রায়ই তার ডিভাইসের ‘ব্রাউজিং হিস্ট্রি’ ডিলিট করে ফেলে, যাতে পরিবারের কেউ তার এই গোপন বিচরণ সম্পর্কে জানতে না পারে। মানুষ ভাবে, সে হয়তো নিজেকে সবার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলেছে। তার পাপের কথা কেউ জানল না। অথচ আমরা কতই না বোকা! আমরা ভুলে যাই পৃথিবীর বুক থেকে সকল হিস্ট্রি ডিলিট করা হ’লেও মহান আল্লাহর কাছে আমাদের আঙুলের প্রতিটি ক্লিক, চোখের প্রতিটি লোলুপ দৃষ্টি অবিকল সংরক্ষিত থাকছে। সেখান থেকে কিছুই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ، ‘তিনি জানেন তোমাদের চোখের চোরাচাহনি এবং অন্তর সমূহ যা লুকিয়ে রাখে’ (মুমিন ৪০/১৯)। ইমাম শাফেঈ (রহ.) কবিতায় বলেন,

إِذَا مَا خَلَوْتَ الدَّهْرَ يَوْمًا فَلَا تَقُلْ * خَلَوْتُ وَلَكِنْ قُلْ عَلَيَّ رَقِيبُ

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ يَغْفُلُ سَاعَةً * وَلَا أَنَّ مَا تُخْفِي عَلَيْهِ يَغِيبُ

غَفَلْنَا لَعَمْرُ اللهِ حَتَّى تَدَارَكَتْ * عَلَيْنَا ذُنُوبٌ بَعْدَهُنَّ ذُنُوبُ

‘যখন তুমি নির্জনে অবস্থান করবে তখন এ কথা বল না যে, আমি একাকী আছি; বরং বল, আমার উপর একজন পর্যবেক্ষক রয়েছেন। কখনো মনে করো না আল্লাহ এক মুহূর্তের জন্যও উদাসীন হন কিংবা তোমার গোপন কোন বিষয় তাঁর অগোচরে থেকে যায়। আল্লাহর কসম! আমরা গাফেল হয়ে ছিলাম। অবশেষে আমাদের উপর একের পর এক গুনাহ জমা হ’তে লাগল’।[3]

গোপন পাপের সবচেয়ে বড় ভয়াবহতা হ’ল- এটি আমাদের হৃদয় থেকে আল্লাহর প্রতি লজ্জাকে দূর করে দেয়। অথচ নির্জনে আল্লাহকে লজ্জা করাই হ’ল প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহ.) বলেন, وَمَنِ اسْتَحْيَا مِنَ اللهِ عِنْدَ مَعْصِيَتِهِ اسْتَحْيَا اللهُ مِنْ عُقُوبَتِهِ يَوْمَ يَلْقَاهُ، وَمَنْ لَمْ يَسْتَحْيِ مِنْ مَعْصِيَتِهِ لَمْ يَسْتَحْيِ مِنْ عُقُوبَتِهِ، ‘যে ব্যক্তি গুনাহের সময় আল্লাহর প্রতি লজ্জাবোধ করে, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের দিন আল্লাহও তাকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করবেন। আর যে ব্যক্তি গুনাহ করতে লজ্জাবোধ করে না, আল্লাহও তাকে শাস্তি দিতে লজ্জাবোধ করবেন না’।[4]

অনেক সময় আমরা মানুষের সামনে নিজেদেরকে আল্লাহর ওলী বা নেককার বান্দা হিসাবে উপস্থাপন করি, অথচ নির্জনে যখন কেউ থাকে না তখন আমরা আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়ে তাঁর শত্রুতে পরিণত হই। তাইতো তাবেঈ বেলাল ইবনু সা‘দ (মৃত্যু : ১২০ হি./৭৩৮ খ্রি.) বলেন,لَا تَكُنْ وَلِيًّا لِلَّهِ فِي الْعَلَانِيَةِ وَعَدُوَّهُ فِي السَّرِيرَةِ، ‘তুমি এমন হয়ো না যে, প্রকাশ্যে আল্লাহর বন্ধু হওয়ার ভান করছ এবং গোপনে গোপনে তাঁর সাথে শক্রতা করছ’।[5]

অতএব আসুন! আমরা আমাদের একাকীত্বকে তাক্বওয়ার চাদরে আবৃত করি। আল্লাহর ভয়কে হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে গোপন পাপের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেদের পবিত্র রাখি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

২. ফেরেশতাদের উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত করা :

মানুষ যখন ঘরের দরজা বন্ধ করে, জানালার পর্দা টেনে দিয়ে একাকী হয়, তখন প্রায়ই তাদের মন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়। তারা ভাবতে শুরু করে, ‘কেউ তো আমাকে দেখছে না, আমি সম্পূর্ণ একা!’ কিন্তু সত্যিই কি মানুষ তখন একা থাকে? না, কখনোই না। আমাদের একান্ত নির্জনতায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে আমাদের পাশেই সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন একদল সম্মানিত ফেরেশতা। যখনই আমাদের হৃদয়ে তাঁদের উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত হবে, তখনই আমাদের ভেতর থেকে গোপন পাপের স্পৃহা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। মহা মহিম আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা কোন অবস্থাতেই ফেরেশতাদের নযরদারীর বাইরে নই। আল্লাহ বলেন,وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ، كِرَامًا كَاتِبِينَ، يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ، ‘তোমাদের উপরে অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত রয়েছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানেন তোমরা যা কর (ইনফিতার, ৮২/১০-১২)। অত্র আয়াতের তাফসীরে তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি./৬৪২-৭২৮ খ্রি.) বলেন, يَعْلَمُونَ لَا يَخْفَى عَلَيْهِمْ شَيْءٌ مِنْ أَعْمَالِكُمْ، ‘তোমাদের কোন আমলই তাদের (লিপিকার ফেরেশতাগণের) কাছে গোপন থাকে না; তারা সবই জানেন’।[6] অর্থাৎ আল্লাহর সম্মানিত ফেরেশতারা আমাদের প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি স্পন্দন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। রাতের অন্ধকারে বা নিভৃত কক্ষেও আমরা তাঁদের দৃষ্টিসীমার বাইরে যেতে পারি না।

একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো! আমাদের সাথে যদি সমাজের একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি বা আমাদের শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা কিংবা প্রিয় শিক্ষক উপস্থিত থাকেন, তবে কি আমরা তাঁদের সামনে বসে মোবাইলে কোন অশ্লীল দৃশ্য দেখার বা কোন গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার দুঃসাহস করতে পারি? কখনোই না! লজ্জায় আমাদের মাথা নীচু হয়ে যায়। অথচ আমরা কত সহজেই ভুলে যাই মহান আল্লাহর পাঠানো অতি সম্মানিত ফেরেশতাগণ আমাদের কাঁধেই বসে আছেন। আমরা যখন পর্দার আড়ালে বা অন্ধকারে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন তাঁরা আমাদের সেই নির্লজ্জতা নিজেদের চোখে দেখেন এবং অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয় নিয়ে তা আমাদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ করেন।

৩. ছোট-খাটো পাপের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা :

শয়তান প্রথম পর্যায়ে আমাদেরকে একবারে বড় কোন গোনাহের দিকে ডাকে না। বরং সে অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের সামনে ছোট ছোট পাপগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলে। একাকীত্বের সুযোগে আমরা হয়তো নিজেদের মনকে প্রবোধ দিয়ে বলি, একটু ক্ষণই তো দেখছি, ছোট্ট একটা মেসেজই তো দিচ্ছি কিংবা সামান্য একটু হারাম তো, কেউ তো আর জানছে না! কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, একটি বিশাল ও মযবূত জাহায ডোবানোর জন্য তার তলার ছোট্ট একটি ছিদ্রই যথেষ্ট! ঠিক তেমনি, নির্জনে করা আমাদের এই ছোট ছোট অবহেলা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতাই একসময় আমাদেরকে বড় ধরনের গোপন পাপের অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে।

আমরা যখন নির্জনে কোন ছোট পাপে লিপ্ত হই, তখন আমরা আসলে কার অবাধ্যতা করছি তা বেমা‘লূম ভুলে যাই। পাপের আকার ছোট হ’তে পারে, কিন্তু যাঁর নাফরমানী করা হচ্ছে তাঁর সত্তা কতই না মহান! এ সম্পর্কে তাবেঈ বেলাল ইবনু সা‘দ (রহঃ) বলেন,لا تنظر إلى صِغَرِ المعصية، ولكن انظر مَنْ عصيت، ‘গুনাহ ছোট কি না তার দিকে দেখো না; বরং লক্ষ্য করো, তুমি কার অবাধ্যতা করছ’।[7]

সত্যি বলতে কি, আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ধোঁকা হ’ল পাপকে ছোট মনে করা। প্রতিটি ছোট ভুলকেও আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে নেওয়া উচিত এবং সাথে সাথে তওবা করা উচিত। কারণ আমরা জানি না আমাদের কোন কাজটি কাল ক্বিয়ামতের ময়দানে আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ প্রসঙ্গে হাফেয ইবনু বাত্তাল (মৃ. ৪৪৯হি.) বলেন, ‘মুমিনের উচিত সামান্য পরিমাণ ভালো কাজের ক্ষেত্রেও উদাসীন না হওয়া। আবার সামান্য পরিমাণ খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকাকেও তুচছজ্ঞান না করা। কারণ মুমিন জানে না কোন নেক কাজের জন্য আল্লাহ তার প্রতি রহম করবেন। সে এটাও জানে না কোন পাপ কাজের কারণে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন’।[8]

আমরা যখন একাকী থাকি তখন আমাদের অধিকাংশের অবস্থা দেখলে মনে হয়, আমরা যেন আখেরাতের হিসাব-নিকাশ ভুলেই গেছি। আমাদের আমল ও আচরণ দেখলে মনে হয় না আমরা সত্যিই জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাস করি। নেককার সালাফগণ যদি আমাদের এই হাল দেখতেন তবে তাঁরা শিউরে উঠতেন। আবূ হামীদ আল-গাযালী (৪৫০-৫০৫ হি./১০৫৮-১১১১ খ্রি.) বলেন, ‘সালাফে ছালেহীন যদি আমাদেরকে দেখতেন তাহ’লে নিশ্চিত বলতেন, এরা হিসাবের দিনেই বিশ্বাস করে না। কারণ আমাদের আমলের অবস্থা জান্নাত-জাহান্নামে বিশ্বাসীদের আমলের মতো নয়। হায়! আমরা যদি সাধারণ মানুষের মতো হ’তাম; আমরা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গুনাহগুলোও যদি মারা যেত!’[9] ইমাম গাযালীর এই কথাটি আজকের যুগে কত নিরেট বাস্তব! ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমাদের গোপন পাপগুলো আমাদের মৃত্যুর পরও জীবিত থাকছে। আমরা হয়তো নির্জনে একটি হারাম ছবি বা ভিডিও শেয়ার করছি, যা আমাদের মৃত্যুর পরও ইন্টারনেটের দুনিয়ায় থেকে যাচ্ছে এবং যুগ যুগ ধরে আমাদের কবরে আযাব বৃদ্ধি করতেই থাকছে।

তাই আমাদের কোন অবস্থাতেই আল্লাহর নাফরমানীকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহর পাকড়াও অত্যন্ত ভয়াবহ। যুন-নূন আল-মিছরী (মৃ.২৪৫ হি./৮৫৯খ্রি.) বলেন, إِنَّ اللهَ تَعَالَى أَخْفَى ثَلَاثًا فِي ثَلَاثٍ: أَخْفَى غَضَبَهُ فِي مَعْصِيَتِهِ، وَأَخْفَى رِضَاهُ فِي طَاعَتِهِ، وَأَخْفَى وَلَايَتَهُ فِي عِبَادِهِ، فَلَا تَحْقِرَنَّ شَيْئًا مِنْ مَعَاصِيهِ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَكُونَ فِيهِ غَضَبُهُ، وَلَا تَحْقِرَنَّ شَيْئًا مِنْ طَاعَتِهِ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَكُونَ فِيهِ رِضَاهُ، وَلَا تَحْقِرَنَّ أَحَدًا مِنْ خَلْقِ اللهِ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَكُونَ وَلِيًّا مِنْ أَوْلِيَائِهِ ‘আল্লাহ তা‘আলা তিনটি বিষয়কে তিনটি বিষয়ের মধ্যে গোপন রেখেছেন। (১) তাঁর ক্রোধকে তাঁর অবাধ্যতার মধ্যে, (২) তাঁর সন্তুষ্টিকে তাঁর আনুগত্যের মধ্যে এবং (৩) তাঁর বেলায়াত (বন্ধুত্ব)-কে তাঁর বান্দাদের মধ্যে। সুতরাং আল্লাহর কোন অবাধ্যতাকে ছোট করে দেখো না। কেননা তাতেই হয়তো তাঁর ক্রোধ নিহিত রয়েছে। তাঁর কোন আনুগত্যকে তুচ্ছ মনে করো না। কেননা তাতেই হয়তো তাঁর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে। আর আল্লাহর কোন সৃষ্টিকে হেয় করো না। কেননা সে হয়তো আল্লাহর ওলীদের একজন হ’তে পারে’।[10]

৪. আত্মসমালোচনা করা :

গোপন পাপের ভয়াল থাবা থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হ’ল আত্মসমালোচনা বা মুহাসাবা। প্রতিদিন রাতের বেলা বিছানায় যাওয়ার পর চারপাশের বাতি নিভিয়ে দিয়ে অন্তত পাঁচটা মিনিট নিজেদের জন্য বরাদ্দ রাখা কর্তব্য। চারদিকের নিস্তব্ধতার মাঝে একটু চোখ বন্ধ করে নির্জনে নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে যে, ‘আজ সারাদিন একাকীত্বের সুযোগ পেয়ে আমি কি আমার রবের নযরদারীর যথাযথ মর্যাদা দিয়েছি? নাকি লোকচক্ষুর অন্তরালে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিজের আমলনামায় গোপন পাপের কালিমা লেপন করেছি?’

এই গভীর আত্মসমালোচনায় যদি আমাদের বিবেক সাক্ষ্য দেয় যে, আজ গোপনে আমাদের দ্বারা কোন গুনাহ হয়ে গেছে, তবে কালক্ষেপণ না করে তৎক্ষণাৎ মহান আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ফেলে তওবা ও ইস্তেগফার করা যরূরী। আর যদি দেখি হাযারো প্রলোভনের মাঝেও মহান আল্লাহ আমাদেরকে আজ গোপন পাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক্ব দিয়েছেন, তবে হৃদয় নিংড়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা কর্তব্য।

প্রখ্যাত তাবেঈ সা‘ঈদ ইবনু জুবাইর (৪৬-৯৫ হি./৬৬৫-৭১৪ খ্রি.)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুযার কে? তিনি বললেন,رجلٌ اقترف ذنبًا، فكلما ذكر ذنبه احتقر عمله، ‘সেই ব্যক্তি, যে (অতীতে) কোন একটি পাপ করেছিল। অতঃপর যখনই তার সেই পাপের কথা স্মরণ করে তখনই তার (নেক) আমলকে তুচ্ছ মনে করে’।[11] সুবহানাল্লাহ! বাস্তবতার আলোকে একটু চিন্তা করে দেখুন তো! আমরা যখন ধবধবে সাদা সুন্দর একটি পোষাক পরি, আর তাতে যদি ছোট্ট একটি কালো দাগ লেগে যায়, তখন আমাদের কেমন লাগে? আমাদের হাযারো সুন্দর সাজগোজের মাঝেও সারাক্ষণ মনটা ঐ কালো দাগটির দিকেই পড়ে থাকে। কেউ যেন দাগটি দেখে না ফেলে সেই লজ্জায় আমরা গুটিয়ে থাকি। আমাদের হাযারো প্রকাশ্য নেক আমলের ভিড়ে গোপন পাপগুলোও ঠিক সেই কালো দাগের মতো। মুমিন যখন তার ঐ গোপন পাপের কথা স্মরণ করে তখন লজ্জায় আল্লাহর সামনে তার মাথা নত হয়ে আসে। সে মনে মনে কাঁদতে থাকে আর ভাবে, ‘হায়! আমার চারপাশের মানুষ আমাকে কতই না নেককার ও পরহেযগার মনে করে! তারা তো আমার প্রকাশ্য ভালো রূপটাই শুধু দেখেছে। অথচ আমার রব তো জানেন, আমি নির্জনে কত বড় অপরাধী!’ এই তীব্র অনুশোচনাই তাকে অহংকার থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এই লজ্জাবোধই তাকে রবের দরবারে সবচেয়ে প্রিয় ইবাদতগুযারে পরিণত করে।

৫. পাপের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করা :

আমাদের দুর্বল নফস যখনই কোন পাপের দিকে ধাবিত হ’তে চায় তখন যদি আমরা সেই পাপের ভয়াবহ পরিণামের কথা একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, তবে শয়তানের প্ররোচনাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া সম্ভব। কারণ প্রথম পর্যায়ে গুনাহকে আমাদের কাছে খুব সাময়িক ও আকর্ষণীয় মনে হয়। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কতটা ভয়াবহ তা আমরা ভুলে যাই। জনৈক সালাফকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ভালো কাজ কেন এত ভারী মনে হয়? আর পাপের কাজ কেন এত হালকা লাগে? তিনি অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদয়স্পর্শী উত্তর দিয়ে বলেছিলেন,لِأَنَّ الْحَسَنَةَ حَضَرَتْ مَرَارَتُهَا وَغَابَتْ حَلَاوَتُهَا فَثَقُلَتْ، فَلَا يَحْمِلَنَّكَ ثِقَلُهَا عَلَى تَرْكِهَا، وَالسَّيِّئَةُ حَضَرَتْ حَلَاوَتُهَا وَغَابَتْ مَرَارَتُهَا فَلِذَلِكَ خَفَّتْ، فَلَا يَحْمِلَنَّكَ خِفَّتُهَا عَلَى ارْتِكَابِهَا، ‘এর কারণ হ’ল, ভালো কাজের তিক্ততা আমাদের সামনে উপস্থিত থাকে, আর তার মিষ্টতা অনুপস্থিত থাকে; তাই তা ভারী মনে হয়। তবে ভারী হওয়া তা ছেড়ে দিতে তোমাকে যেন প্ররোচিত না করে। আর খারাপ কাজের মিষ্টতা উপস্থিত থাকে, কিন্তু তার তিক্ততা অনুপস্থিত থাকে; তাই তা হালকা মনে হয়। তবে হালকা হওয়া যেন তোমাকে তাতে লিপ্ত হ’তে প্ররোচিত না করে’।[12]

বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই হালকা মনে হওয়া পাপগুলোর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমরা হয়তো ভাবি ফেইক আইডি খুলেছি, পর্দার আড়ালে আছি, কেউ তো আমাকে চিনতে পারছে না! এই মিথ্যে নিরাপত্তার ধোঁকায় পড়ে আমরা অবলীলায় ফেইসবুক, টিক্টক্ বা ইনস্টাগ্রামে কোন গান, অশ্লীল ভিডিও, গীবত-তোহমত বা নোংরা কথার পসরা সাজিয়ে বসি। আমরা সাময়িক একটু বিনোদন নেই বা সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে পড়ি। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী পরিণাম কতটা বীভৎস হ’তে পারে তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি?

আমরা জানি যে, মানুষ মারা গেলে তার সাধারণ আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যদি সমাজে বা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এমন কোন গুনাহের কাজ, মন্দ প্রথা, অশ্লীলতা, গুজব বা ভ্রান্ত মতবাদ ছড়িয়ে দেই যা আমাদের মৃত্যুর পরও অন্যরা দেখবে বা অনুসরণ করবে, তবে ঐ গুনাহের একটি বিশাল অংশ আমাদের আমলনামায় অবিরত ধারায় যুক্ত হ’তে থাকবে। ইসলামী পরিভাষায় একে বলা হয় ‘গুনাহে জারিয়া’ বা প্রবহমান পাপ। এই ব্যাপারে ইমাম শাতেবী (মৃ. ৭৯০ হি./১৩৮৮ খ্রি.) বলেন, طُوبَى لِمَنْ مَاتَ وَمَاتَتْ مَعَهُ ذُنُوبُهُ، وَالْوَيْلُ الطَّوِيلُ لِمَنْ يَمُوتُ وَتَبْقَى ذُنُوبُهُ مِائَةَ سَنَةٍ وَمِائَتَيْ سَنَةٍ، يُعَذَّبُ بِهَا فِي قَبْرِهِ، وَيُسْأَلُ عَنْهَا إِلَى انْقِرَاضِهَا، ‘কতই না সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে মারা যায় এবং তার সাথে তার পাপগুলোও নিঃশেষ হয়ে যায়! আর দীর্ঘ দুর্ভোগ সেই ব্যক্তির জন্য, যে মারা যায় অথচ তার পাপগুলো একশ’-দুইশ’ বছর পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। এগুলোর কারণে সে তার কবরে শাস্তি ভোগ করতে থাকে এবং সেগুলো নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়’।[13]

অবসরে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো! অন্ধকার কবরে আমরা একাকী শুয়ে আছি। পৃথিবীর মানুষ আমাদের কথা ভুলে গেছে। আমাদের দেহ মাটিতে মিশে যাচ্ছে। অথচ আমাদের নিজের হাতে আপলোড করা সেই গানটি, টিকটকের সেই ভিডিওটি বা ফেইসবুকে ছড়ানো সেই মিথ্যা গুজবটি ইন্টারনেটে হাযার হাযার মানুষ দেখছে, আর অন্ধকার কবরে প্রতিনিয়ত আমাদের আযাবের মাত্রা বেড়েই চলেছে! আমরা চাইলেও আর ফিরে এসে সেই পোষ্ট বা ভিডিও ডিলিট করতে পারছি না। এর চেয়ে বড় আফসোস আর দুর্ভাগ্যের বিষয় একজন মুসলিমের জীবনে আর কী হ’তে পারে? তাই আসুন! আজই আমরা আমাদের এই ‘ডিজিটাল পদচিহ্নগুলো’ মুছে ফেলি। গোপনে বা প্রকাশ্যে এমন কোন পাপের সূচনা আমরা না করি যা আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের জন্য জাহান্নামের ইন্ধন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যেন এমন সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হ’তে পারি যাদের মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের পাপগুলোও চিরতরে মুছে যায়। মহান আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন!

৬. চোখের পাপের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা :

অন্তরের সবচেয়ে বড় ও প্রধান প্রবেশদ্বার হ’ল আমাদের এই দু’টি চোখ। চোখ যা দেখে অন্তর তার ছবি এঁকে নেয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে একাকীত্বের সুযোগে চোখের হেফাযত করা আমাদের জন্য এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা হয়তো অনেকে রাস্তাঘাটে বা হাট-বাজারে চলার পথে বেগানা নারীদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাই না। কিন্তু নির্জনে যখন আমরা ইন্টারনেট ব্রাউজ করি তখন স্ক্রিনে ভেসে ওঠা পর্দাহীন নারীদের দিকে আমরা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। এমনকি নিছক খবর শোনার অজুহাতে আমরা সুন্দরী সংবাদ পাঠিকার দিকে তাকিয়ে সংবাদ শুনি, মিউজিক-মিশ্রিত নাশীদ বা নাটক-সিনেমা দেখে নিজেদের মূল্যবান সময় ও ঈমান দু’টোই নষ্ট করি। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আমরা হয়তো মনকে প্রবোধ দিয়ে বলি, ‘আমি তো আর বাস্তবে কোন পাপ করছি না, কেবল চোখ দিয়ে দেখছি মাত্র!’ কিন্তু আমরা বেমা‘লূম ভুলে যাই যে, চোখের এই নীরব ও গোপন পাপই আমাদের হৃদয়কে সবচেয়ে দ্রুত কলুষিত করে দেয়।

অধিক মাত্রায় হারাম দৃশ্য দেখার কারণে আমাদের অন্তরে কী ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসে, সে সম্পর্কে বিশিষ্ট মুহাদ্দিছ ইবনুন্ নাহহাস দিমাশকী (মৃ. ৮১৪ হি./১৪১১ খ্রি.) বলেন, ‘অধিক মাত্রায় পাপাচার বা অন্যায় কাজ প্রত্যক্ষ করা কখনো কখনো তাতে লিপ্ত হওয়ার সমতুল্য হয়ে যায়। যা অন্তর থেকে ভালো-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় এবং অন্যায়কে ঘৃণা করার আলো ছিনিয়ে নেয়। কারণ অন্তরে যখন বারবার অন্যায়ের আনাগোনা হয় এবং চোখ যখন বারবার তা প্রত্যক্ষ করে, তখন হৃদয় থেকে ক্রমশঃ সেগুলোর ভয়াবহতা মুছে যায়। এক পর্যায়ে মানুষ সেগুলো দেখতে থাকে অথচ তার মনে একবারও উদয় হয় না এগুলো গর্হিত কাজ এবং তার চিন্তাশক্তি এগুলোকে পাপ বলেও শনাক্ত করতে পারে না। কারণ বারবার দেখতে দেখতে অন্তর সেগুলোর সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়’।[14] যেমন আমরা যখন কোন ডাস্টবিন বা ময়লার স্তূপের পাশ দিয়ে হাঁটি তখন তীব্র দুর্গন্ধে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে। আমরা নাকে কাপড় দিই। কিন্তু যে লোকটি সেই ময়লার স্তূপের পাশেই দিনের পর দিন বসবাস করে, দুর্গন্ধ তার নাকে আর আসেই না! কারণ সে এর সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি সমাজে প্রচলিত পাপাচার ও ইন্টারনেটে ছড়ানো অশ্লীলতা যখন আমরা নির্জনে বারবার দেখতে থাকি, তখন আমাদের অন্তর ধীরে ধীরে সেগুলোর প্রতি অভ্যস্ত হয়ে যায়। পাপের প্রতি আমাদের স্বভাবজাত ঘৃণা ও ঈমানী প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। একপর্যায়ে আমাদের মনেই হয় না আমরা কোন গুনাহ করছি। এই নীরব আত্মিক মৃত্যুই হ’ল গোপন পাপের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি!

অনেক সময় নফসের তাড়নায় আমরা নিজেদেরকে ধোঁকা দিয়ে বোঝাই, ‘আমি তো কোন খারাপ উদ্দেশ্যে দেখছি না বরং কেবল কৌতূহলবশত দেখছি’। কিন্তু আমাদের অন্তর তো অত্যন্ত দুর্বল! এই দুর্বল অন্তরের দিকে লক্ষ্য রেখেই প্রখ্যাত তাবেঈ আত্বা ইবনু আবী রাবাহ (২৭-১১৪ হি./৬৪৭-৭৩২ খ্রি.) বলেন,كُلُّ نَظْرَةٍ يَهْوَاهَا الْقَلْبُ فَلَا خَيْرَ فِيهَا، ‘যে দৃষ্টির প্রতি অন্তর আসক্তি ও কামনা পোষণ করে তাতে কোন কল্যাণ নেই’।[15] অর্থাৎ যখন কোন হারাম দৃশ্যের দিকে তাকালে আমাদের অন্তরে সামান্যতম কামনা বা লালসা জাগ্রত হয়, তখন সেই দৃষ্টি আর কেবল দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পাপে লিপ্ত হওয়ার প্রাথমিক ধাপে পরিণত হয়। একটি ছোট দিয়াশালাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি যেমন মুহূর্তের মধ্যে বিশাল বনভূমি পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে, তেমনি নির্জনে স্ক্রিনের দিকে তাকানো একটি লোলুপ দৃষ্টি আমাদের বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা তাহাজ্জুদ, ছিয়াম, ছাদাক্বা ও তেলাওয়াতের ছওয়াবকে জ্বালিয়ে ভষ্ম করে দিতে পারে। এই বিষাক্ত দৃষ্টি অন্তরে এমন এক ক্ষতের সৃষ্টি করে যা সহজে শুকাতে চায় না।

৭. গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া :

শয়তান আমাদেরকে যেই ময়দানে পরাজিত করে ঠিক সেই ময়দানেই তাকে পর্যুদস্ত করতে হয়। যখন আমরা একাকী থাকি, চারপাশের দরজা-জানালা বন্ধ থাকে, কেউ আমাদের দেখে না, তখন নফসের তাড়নায় হারাম কিছু দেখার বা করার বদলে যদি আমরা দুই রাক‘আত নফল ছালাতে দাঁড়িয়ে যাই কিংবা গোপনে চোখের দু’ফোঁটা পানি ফেলে রবের কাছে ক্ষমা চাই, তখন এই গোপন নেক আমলগুলোই আমাদের অন্তর থেকে গোপন পাপের বিষাক্ত স্পৃহাকে সমূলে বিনাশ করে দেয়। আমাদের প্রকাশ্য জীবনের চেয়ে গোপন জীবনটি মহান আল্লাহর কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের সামনে আমাদের আমলের মধ্যে রিয়া বা লোকদেখানো ভাব থাকতে পারে, কিন্তু নির্জনতার ইবাদত খুলূছিয়াতপূর্ণ হয়ে থাকে। নির্জনে আমরা কেমন, তার উপরই আমাদের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি বা খাতেমা নির্ভর করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ الجَنَّةِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ النَّارِ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ عَمَلَ أَهْلِ النَّارِ، فِيمَا يَبْدُو لِلنَّاسِ، وَهُوَ مِنْ أَهْلِ الجَنَّةِ، ‘নিশ্চয়ই কোন ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতবাসীদের মত আমল করে অথচ সে আসলে জাহান্নামী। আবার কোন ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জাহান্নামীদের মত আমল করে অথচ সে আসলে জান্নাতী’।[16] এই হাদীছের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু রজব হাম্বলী (৭৩৬-৭৯৫ হি./১৩৩৫-১৩৯৩ খ্রি.) বলেন, ‘কখনো কোন ব্যক্তি জাহান্নামীদের ন্যায় আমল করতে থাকে, অথচ তার অন্তরে কল্যাণকর কোন গোপন বৈশিষ্ট্য (গোপন নেক আমল) বিদ্যমান থাকে। অতঃপর জীবনের শেষ সময়ে সেই গুণটি তার উপর প্রাধান্য লাভ করে এবং তার জন্য উত্তম পরিণতি বা ভালো মৃত্যু অবধারিত করে দেয়’।[17]

আব্দুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ (মৃত্যু : ১৫৯ হি./৭৭৬ খ্রি.) বলেন, ‘আমি মৃত্যুপথযাত্রী এক ব্যক্তির নিকট উপস্থিত ছিলাম। তাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তালকীন করা হচ্ছিল। কিন্তু সে শেষ কথায় বলল, ‘তোমরা যা বলছ, আমি তা অস্বীকার করি’। অতঃপর সে এই অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করল। পরে আমি তার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে, সে গোপনে গোপনে মদের নেশায় আসক্ত ছিল। তখন আব্দুল আযীয বলতেন, اتَّقُوا الذُّنُوبَ، فَإِنَّهَا هِيَ الَّتِي أَوْقَعَتْهُ ‘তোমরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো; কেননা পাপই তাকে এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে’।[18] আল-ইয়াযু বিল্লাহ। একবার নিজেকে ঐ মৃত্যুপথযাত্রী লোকটির জায়গায় দাঁড় করিয়ে ভাবুন তো! আমরা যারা আজ গোপনে ইন্টারনেটে হারাম দৃশ্য দেখছি, অশ্লীল গান শুনছি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেইক আইডি দিয়ে হারাম সম্পর্কে লিপ্ত আছি, মৃত্যুর ঐ কঠিন মুহূর্তে আমাদের মুখেও যদি ‘লা ইলা-হা ইল্লা-ল্লাহ’-এর বদলে ঐসব হারাম কথা বা গানের কলি বেরিয়ে আসে, তবে আমাদের অনন্তকালের পরিণতি কি হবে? আল্লাহুল মুস্তা‘আন।

এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচার একটাই উপায়, আর তা হ’ল গোপন পাপাচার ছেড়ে গোপন ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া। জনৈক সালাফ বলেন,ذُنُوبُ الْخَلَوَاتِ تُؤَدِّي إِلَى الِانْتِكَاسَاتِ، وَطَاعَةُ الْخَلَوَاتِ طَرِيقٌ لِلثَّبَاتِ حَتَّى الْمَمَاتِ بِإِذْنِ اللهِ، ‘নির্জনে সংঘটিত গুনাহ পতন ও বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে নির্জনের ইবাদত ও আনুগত্য আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যু পর্যন্ত অবিচল থাকার পথ সুগম করে’।[19]

বিষের প্রতিশেধক যেমন বিষ দিয়েই তৈরি হয় তেমনি নির্জনের পাপ থেকে বাঁচতে চাইলে নির্জনেই আমাদের রবের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়তে হবে। আর আমরা যখন একাকীত্বে আমাদের রবের সাথে সম্পর্ক সুন্দর করব, মহান আল্লাহ তখন মানুষের মাঝে আমাদের সম্মান ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করে দিবেন। ইমাম ইবনুল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি./১১১৬-১২০১ খ্রি.) বলেন, ‘আললাহর কসম! আমি এমন লোক দেখেছি যারা অধিক পরিমাণে ছালাত, ছিয়াম ও নীরবতা অবলম্বন করত এবং নিজেদের আচরণ ও পোষাকে বিনয়-নম্রতা প্রদর্শন করত। কিন্তু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি আকৃষ্ট হ’ত না এবং মানুষের মনে তাদের তেমন মর্যাদাও ছিল না। আবার আমি এমন লোকও দেখেছি যারা দামী পোষাক পরিধান করত, তাদের নফল ইবাদতও খুব বেশী ছিল না, বাহ্যিক খুশূ-খুযূও ছিল না; অথচ মানুষের অন্তর তাদের ভালোবাসায় ঝুঁকে পড়ত। আমি এর কারণ নিয়ে চিন্তা করে দেখলাম, এর মূল কারণ হ’ল অন্তরের গোপন অবস্থা (বিশুদ্ধ নিয়ত ও গোপন নেক আমল)। যেমন আনাস ইবনু মালেক (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তার অধিক পরিমাণ ছালাত বা ছিয়াম ছিল না; বরং তার একটি বিশেষ গোপন নেক আমল ছিল’।[20] অতএব মুমিনের কর্তব্য হ’ল গোপন আমলের মাধ্যমে গোপন পাপের প্রতিরোধ করা। কেননা আল্লাহর সাথে আমাদের গোপন সম্পর্ক যেমন হবে, সৃষ্টির সাথে আমাদের প্রকাশ্য সম্পর্কও ঠিক তেমনই হবে।

৮. পাপ সম্পাদনের পরপরেই নেক আমল করা :

আমরা ফেরেশতা নই যে, আমাদের দ্বারা কোন গুনাহ হবে না। কখনো কখনো শত চেষ্টা সত্ত্বেও নির্জনে শয়তানের প্ররোচনা এবং নিজেদের নফসের তাড়নায় আমরা পরাস্ত হয়ে পড়ি। পা পিছলে গোপন পাপের অন্ধকূপে পড়ে যাই। যদি কখনো এমনটি ঘটে তবে আমাদের তাৎক্ষণিক কর্তব্য হ’ল- সাথে সাথে একটি নেক আমল করে সেই পাপের কালিমা ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা। কারণ আল্লাহ বলেন, ‌إِنَّ ‌الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ‘নিশ্চয়ই সৎকর্মসমূহ মন্দ কর্মসমূহকে বিদূরিত করে’ (হূদ ১১/১১৪)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,اتَّقِ اللهِ حَيْثُمَا كُنْتَ، وَأَتْبِعِ السَّيِّئَةَ الحَسَنَةَ تَمْحُهَا، وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ، ‘তুমি যেখানেই থাক না কেন, আল্লাহকে ভয় করো। কোন মন্দ কাজ করে ফেললে তার পরপরই একটি সৎকাজ কর, তাহ’লে এটা সেই মন্দ কাজটিকে মিটিয়ে দেবে। আর মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ কর’।[21]

সুতরাং যদি ঘরের নির্জনতায় আমাদের চোখ কোন হারাম দৃশ্য দেখে ফেলে তবে এর প্রতিশেধক হিসাবে আমরা তৎক্ষণাৎ সেই চোখ দিয়ে কুরআনের কয়েকটি পৃষ্ঠা তেলাওয়াত করে নিতে পারি। যদি আমাদের হাত দ্বারা ইন্টারনেটে কোন পাপের কাজ হয়ে যায় তবে সাথে সাথেই আমরা অনলাইনে কোন সৎকাজে কিছু ছাদাক্বা করতে পারি। অথবা দু’রাক‘আত নফল ছালাতে দাঁড়িয়ে যেতে পারি। আমরা যদি এমনটি করতে পারি তবে আমাদের এই তাৎক্ষণিক নেক আমলের প্রদীপ্ত আলো গোপন পাপের সেই অন্ধকারকে চিরতরে মুছে দিবে ইনশাআল্লাহ।

তবে কারো মনে সংশয় জাগতে পারে, ‘আমি তো গোপনে অনেক বড় একটা গুনাহ করে ফেলেছি, ছোট্ট একটা নেক আমল কি সেই পাহাড়সম গুনাহকে মুছে দিতে পারবে’? এর উত্তর দিয়েছেন শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হি./১২৬৩-১৩২৮ খ্রি.)। তিনি বলেন,الْحَسَنَةُ الْوَاحِدَةُ قَدْ يَقْتَرِنُ بِهَا مِنَ الصِّدْقِ وَالْيَقِينِ مَا يَجْعَلُهَا تُكَفِّرُ الْكَبَائِرَ، ‘কখনো একটি মাত্র নেক আমলের সঙ্গে এমন একনিষ্ঠতা ও দৃঢ় ঈমান যুক্ত থাকে, যা তাকে কবীরা গুনাহসমূহের কাফফারা (মোচনের মাধ্যম) বানিয়ে দেয়’।[22] আমরা জানি, কাঁচের বিশাল একটি পাহাড়ের চেয়ে ছোট এক টুকরো আসল হীরার মূল্য অনেক বেশী। ঠিক তেমনি আমরা যখন কোন গোপন পাপ করার পর চরম অনুতপ্ত হই, লজ্জায় আমাদের হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, আর সেই পোড়া অন্তর নিয়ে রবের ভয়ে আমরা একটি ছোট নেক আমল করি তখন সেই আমলের ভেতরের ‘ইখলাছ’ বা একনিষ্ঠতা আল্লাহর কাছে হীরার চেয়েও দামী হয়ে যায়। আমাদের সেই আন্তরিক অনুশোচনা ও দৃঢ় বিশ্বাসের ভারে আল্লাহর রহমতের পাল্লা এত ভারী হয়ে যায় যে, তা আমাদের বড় বড় গোপন পাপের পাহাড়কেও গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

অতএব আমরা যেন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হই। পাপ হয়ে গেলে হতাশায় ডুবে না থেকে আমরা যেন সাথে সাথেই তওবা করি এবং নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করি। মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

উপসংহার :

আমাদের নফস স্বভাবতই আরাম, কুপ্রবৃত্তি ও পাপাচার ভালোবাসে। আর শয়তান নফসকে কুমন্ত্রণা দিয়ে অবাধ্য করতে চায়। সেজন্য ছিরাতে মুস্তাক্বীমের উপর অটল থাকার জন্য বান্দাকে সর্বদা নফসের কামনার বিরুদ্ধে জিহাদ অব্যাহত রাখতে হয়। আর এই জিহাদে চূড়ান্ত বিজয়ী হওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হ’ল আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করা এবং তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত দো‘আ করা ও ক্ষমাপ্রার্থনা করা। একবার তাবেঈ মুজাহিদ (২১-১০৪ হি.)-এর কাছে একজন এসে জানাল সে প্রায়ই গুনাহ করে ফেলে। তার করণীয় কি হ’তে পারে? তিনি উত্তরে বললেন, أَيْنَ أَنْتَ مِنَ الْمِمْحَاةِ؟ يَعْنِي مِنَ الِاسْتِغْفَارِ، ‘তোমার কাছে কি মুছনী (ইরেজার) নেই? এর মাধ্যমে তিনি ইস্তিগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনাকে বুঝিয়েছেন।[23]

তাই গোপন পাপের কারণে নিরাশ হয়ে শয়তানকে বিজয়ী হ’তে দেওয়া যাবে না; বরং গুনাহ হওয়া মাত্রই দ্রুত ইস্তিগফার করতে হবে এবং অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে যাবতীয় প্রকাশ্য ও গোপন পাপের পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র রাখেন। নির্জনতায় শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমাদের হেফাযত করেন এবং নফসের বিরুদ্ধে এই পার্থিব জীবনে আমাদেরকে বিজয়ী হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন!


[1]. ইবনুল জাওযী (৫১০-৫৯৭ হি.), ছিফাতুছ ছাফওয়া, (কায়রো: দারুল হাদীছ, ১৪২১ হি./২০০০ খ্রি.), ১/৪৩৫।

[2]. ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, মাদারিজুস সালেকীন (রিয়াদ : দারু ‘আত্বায়াতিল ‘ইলম, ২য় সংস্করণ, ১৪৪১ হি./২০১৯ খ্রি.), ২/৩০৭।

[3]. আবূ বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল-বায়হাক্বী (৩৮৪-৪৫৮ হি.), মানাকিবুশ শাফেঈ, তাহক্বীক্ব : সাইয়েদ আহমাদ ছাক্বার (কায়রো : মাকতাবাতু দারিত তুরাছ, ১ম সংস্করণ, ১৩৯০ হি./১৯৭০ খ্রি.), ২/১০৮; ইবনু আব্দিল বার্র, বাহজাতুল মাজালিস, পৃ. ২১৪।

[4]. ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, আদ্দা-উ ওয়াদ-দাওয়া, তাহকীক্ব : মুহাম্মাদ আজমাল আল-ইছলাহী; তাখরীজ : যায়েদ ইবনে আহমাদ আন-নুশাইরী (রিয়াদ : দারু ‘ইত্বাআতিল ইলম, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪৪০ হি./২০১৯ খ্রি.), পৃ. ১৭০।

[5]. আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবিদ্দুনইয়া (২০৮-২৮১ হি.), আল-ইখলাছ ওয়ান-নিয়্যাহ, তাহকীক্ব : ইয়াদ খালিদ আত-তাববা‘ (বৈরূত : দারুল বাশাইর, ১ম সংস্করণ, ১৪১৩ হি.), পৃ. ৫৪।

[6]. তাফসীরে কুরতুবী, ১৯/২৪৮।

[7]. খতীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ (বৈরূত : দারুল গারবিল ইসলামী, ১ম প্রকাশ, ১৪২২হি./২০০২খ্রি.), ৪/৪৫১; আবুল হুসাইন ইবনে আবী ইয়া‘লা, ত্বাবাকাতুল হানাবিলাহ (বৈরূত : দারুল মা‘রিফা, তা.বি), ১/৩২১।

[8]. শারহু ছহীহিল বুখারী, ১০/১৯৮।

[9]. আবূ হামিদ গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ৪/৪৩৩।

[10]. বায়হাক্বী, আয-যুহদুল কাবীর, পৃ. ২৯০; ইমাম বায়হাক্বী, আয-যুহদুল কাবীর, তাহক্বীক্ব: আমির আহমাদ হায়দার (বৈরূত : মুআসসাসাতুল কুতুবিছ-ছাক্বাফিইয়াহ, ৩য় সংস্করণ, ১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২৯০।

[11]. হাফেয ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হি./১৩০১-১৩৭৩ খ্রি.), আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, তাহক্বীক্ব : শায়খ আব্দুল ক্বাদের আল-আরনাউত্ব ও ড. বাশশার আওয়াদ মা‘রূফ (দামেশক ও বৈরূত : দারু ইবনে কাছীর, ৩য় সংস্করণ, ১৪৩৪ হি./২০১৩ খ্রি.), ৯/২৭২।

[12]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী, ১৩/৫৪১; আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহ্ওয়াযী, ৯/৩০৬।

[13]. আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইবনু মূসা আশ-শাতেবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, তাহক্বীক্ব : আবূ উবায়দাহ মাশহূর ইবনু হাসান আলে সালমান (দারু ইবনু আফ্ফান, ১ম সংস্করণ, ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খ্রি.), ১/৩৬১।

[14]. আবুল লায়ছ সামারকান্দী (মৃত্যু : ৩৭৩ হি./৯৮৩ খ্রি.), তাম্বীহুল গাফেলীন, তাহকীক্ব : ইউসুফ আলী বাদিউয়ী (বৈরূত, লেবানন : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৭ হি./১৯৮৭ খ্রি.), পৃ. ১০৫।

[15]. ইমাম ওয়াকী‘ ইবনুল জাররাহ, কিতাবুয যুহদ, (মদীনা মুনাওয়ারা : মাকতাবাতুদ দার, ১ম সংস্করণ, ১৪০৪ হি./১৯৮৪ খ্রি.), পৃ. ৭৯৪।

[16]. বুখারী হা/২৮৯৮; মুসলিম হা/১১২; মিশকাত হা/৮৩।

[17]. আব্দুর রহমান ইবনু রজব আল-হাম্বলী, জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল-হিকাম, তাহকীক্ব : শু‘আইব আরনাউত ও ইবরাহীম বাজিস (বৈরুত : মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ৭ম সংস্করণ, ১৪১৭হি./১৯৯৭ খ্রি.), ১/১৭৩।

[18]. জামে‘উল ‘উলূম ওয়াল-হিকাম, ১/১৭৩।

[19]. খালেদ আল-হুসাইনান, দুরূস তারবাবিয়্যাহ মিনাল আহাদীছিন নাবাবিয়্যাহ (মিসর : মারকাযুল ফাজর লিল-ই‘লাম, ১৪৩১ হি./২০১০ খ্রি.), পৃ. ১৯।

[20]. আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী, ছায়দুল খাত্বির (দামেশক : দারুল কলম, ১ম সংস্করণ, ১৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.), পৃ. ২২০।

[21]. তিরমিযী হা/১৯৮৭; মিশকাত হা/৫০৮৩; সনদ হাসান।

[22]. আহমাদ ইবনে আব্দুল হালীম ইবনে তায়মিয়াহ, আল-মুস্তাদরাক ‘আলা মাজমূ‘ইল ফাতাওয়া; সংকলন : মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রহমান ইবনে কাসেম, ১ম সংস্করণ, ১৪১৮ হি.), ৩/৯৬।

[23]. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, কিতাবু যযুহদ, পৃ. ৩০৭।






বিষয়সমূহ: পাপ
বিদায়ের আগে রেখে যাও কিছু পদচিহ্ন (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণ সমূহ (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
নফল ছিয়াম সমূহ - -আত-তাহরীক ডেস্ক
কুরবানীর মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য শিখন ফলাফলের গুরুত্ব (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - প্রফেসর ড. শহীদ নকীব ভূঁইয়া
লাইলাতুল মি‘রাজ : করণীয় ও বর্জনীয় - শেখ আব্দুছ ছামাদ
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান (৩য় কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
সীমালংঘন ও দুনিয়াপূজা : জাহান্নামীদের দুই প্রধান বৈশিষ্ট্য (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
ক্বিয়ামতের আলামত সমূহ (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
প্রাক-মাদ্রাসা যুগে ইসলামী শিক্ষা - আসাদুল্লাহ আল-গালিব (শিক্ষার্থী, ইংরেজী বিভাগ, ২য় বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
ইভটিজিং : কারণ ও প্রতিকার - হারূনুর রশীদ
আরও
আরও
.