আযান ইসলামের অন্যতম নিদর্শন এবং মহান আল্লাহ্র একত্ব ও বড়ত্বের সুমধুর ঘোষণা। প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা এই সুললিত ধ্বনি মুমিনের হৃদয়ে ঈমানের জোয়ার বয়ে আনে এবং আত্মাকে নির্মোহ আনন্দে সিক্ত করে। এটি মানুষকে শাশ্বত কল্যাণ ও চিরন্তন সফলতার দিকে নিরন্তর আহবান জানায়। আযান ও ইক্বামত মহান আল্লাহ্র কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আর যে ব্যক্তি আযানের জবাব দেয় সেও আল্লাহ্র প্রিয়ভাজন । মুয়ায্যিনের কণ্ঠস্বর যতদূর পৌঁছায়, কিবয়ামতের দিন জিন-ইনসানসহ সব সৃষ্টি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে। মুসলিম সমাজে সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আযানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আলোচ্য প্রবন্ধে আযানের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, ফযীলত ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হ’ল।-
আযানের পরিচয় :
‘আযান’ (الأذان) শব্দটি কুরআন ও ছহীহ হাদীছে ব্যবহৃত একটি আরবী শব্দ। ‘আযান’-এর আভিধানিক অর্থ- ঘোাষণা করা, অবহিত করা, ছালাতের আহবান জানানো’।[1] পারিভাষিক অর্থে শরী‘আত নির্ধারিত আরবী বাক্যসমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচচকণ্ঠে ছালাতের আহবান করাকে আযান বলা হয়’।[2]
মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহ.) আযানের সংজ্ঞায় বলেন,فَهُوَ التَّعَبُّدُ لِلَّهِ بِذِكْرٍ مَخْصُوصٍ، بَعْدَ دُخُولِ وَقْتِ الصَّلَاةِ، لِلْإِعْلَامِ بِهِ، ‘ আযান হচ্ছে- ছালাতের সময় শুরু হওয়ার পর তা জানানোর জন্য নির্দিষ্ট যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ্র ইবাদত করা’।[3]
আযানের সূচনা ও ইতিহাস :
হিজরতের পর মসজিদে নববী নির্মাণের মাধ্যমে প্রথম হিজরীতে আযানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।[4] নাফে‘ (রহ.) হ’তে বর্ণিত, ইবনু ওমর (রা.) বলতেন, মুসলিমানরা যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন তাঁরা ছালাতের সময় অনুমান করে সমবেত হ’তেন। এর জন্য কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না। একদা তাঁরা এ বিষয়ে বৈঠকে বসেন। কয়েকজন ছাহাবী মত দিলেন, নাছারাদের ন্যায় ঘণ্টা বাজানোর ব্যবস্থা করা হোক। আবার কয়েকজন বললেন, ইহুদীদের মতো শিঙা ফুঁকানোর ব্যবস্থা করা হোক।[5]
কিন্তু কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিনের বৈঠক স্থগিত হয়ে যায়। পরদিন সকালে আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ বিন আব্দে রাবিবহী (রা.) এসে রাসূল (ছা.)-কে স্বপ্নে দেখা বর্তমান আযানের শব্দগুলো শোনান। রাসূল (ছাঃ) তা সত্যায়ন করেন এবং উচ্চকণ্ঠের অধিকারী হওয়ার কারণে বেলাল (রা.)-কে আযান দেওয়ার নির্দেশ দেন। আযানের সুমধুর ধ্বনি শুনে ওমর (রা.) চাদর ঘেষতে ঘেষতে দৌড়ে এসে বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছা.)! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, সেই আল্লাহ্র কসম করে বলছি, আমিও একই স্বপ্ন দেখেছি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ্র জন্যই সকল প্রশংসা’।[6] অন্য একটি বর্ণনা মতে, একই রাতে মোট ১১ জন ছাহাবী আযানের এই বাক্যগুলো স্বপ্নে দেখেছিলেন।[7]
আযানের গুরুত্ব ও ফযীলত :
ইসলামে আযান একটি ফযীলতপূর্ণ আমল, যার মাধ্যমে আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করা যায়। এর মাধ্যমে দৈনিক পাঁচবার যেমন ছালাতের জন্য আহবান করা হয়, তেমনি তাওহীদ ও রিসালাতের ঘোষণাও দেওয়া হয়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা আযানের অনেক গুরুত্ব ও ফযীলত প্রমাণিত। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হ’ল।-
১. আযান মুসলিম উম্মাহ্র স্বতন্ত্র নিদর্শন :
অন্য উম্মতের ওপর ছালাতের বিধান থাকলেও আযানের বিধান ছিল কি-না তা জানা যায় না। বরং আল্লাহ তা‘আলা এই উম্মতকে ছালাত ফরয করার সাথে সাথে ছালাতের সময় জানানোর জন্য আযানের বিধান প্রবর্তন করেছেন। আযান প্রবর্তনের পর মদীনাতে যখন ছালাতের আযান দেওয়া হ’ত, তখন সেখানকার অবিশ্বাসী ও মুনাফিকদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذَا نَادَيْتُمْ إِلَى الصَّلاَةِ اتَّخَذُوهَا هُزُؤًا وَلَعِبًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لاَ يَعْقِلُونَ، ‘আর যখন তোমরা ছালাতের জন্য (আযানের মাধ্যমে) আহবান কর, তখন তারা একে উপহাস ও খেলাচ্ছলে গ্রহণ করে। কারণ ওরা একেবারেই নির্বোধ সম্প্রদায়’ (মায়েদা ৫/৫৮)। বিদ্বানগণ বলেন, হিজরতের আগে মক্কায় আযান ছিল না; বরং তারা ছালাতের জন্য ‘আছ-ছালাতু জামে‘আহ’ বলে আহবান করত। হিজরতের পর এবং কা‘বার দিকে ক্বিবলা পরিবর্তনের পর আযানের বিধান চালু হয়।[8]
২. ছালাতের জন্য সুমধুর আহবান :
আযান মানুষকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ও ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে শাশ্বত সাফল্যের দিকে ডাকে। এটি মূলত ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের জন্য মুমিনকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যম। মুয়ায্যিনের সুমধুর কণ্ঠের আযানের ধ্বনি মুসলমানদেরকে তাদের উপর অর্পিত ফরয ছালাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং স্বীয় রবের দরবারে হাযির হ’তে উদ্বুদ্ধ করে। মহান আল্লাহ ছালাতের দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ، ‘হে মুমিনগণ! যখন জুমু‘আর দিন ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা অনুধাবন করো’ (জুমু‘আ ৬২/৯)।
আযানের এই সুমধুর সুর ও এর গভীর আবেদন মুমিনের অন্তরে এক বিশেষ শিহরণ জাগিয়ে তোলে। কবি কায়কোবাদ তাঁর ‘আযান’ কবিতায় এই সুরের আবেদনকে অপূর্বভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এভাবে-
‘কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি
মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ নাচিল ধমনী
কে ঐ শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি।’
৩. আযান সবচেয়ে উত্তম কথা :
পৃথিবীতে মানুষ যত ভালো কথা বলে থাকে তার মধ্যে আযান অন্যতম। এতে রয়েছে আল্লাহ্র বড়ত্ব, তাওহীদ ও রিসালাতের ঘোষণা এবং সর্বোপরি ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইবাদত ছালাতের দিকে আল্লাহ্র বান্দাদেরকে ডাকা। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ، ‘ঐ ব্যক্তির চাইতে কথায় উত্তম আর কে আছে, যে (মানুষকে) আল্লাহ্র দিকে ডাকে ও নিজে সৎকর্ম করে এবং বলে, নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৩)।
উল্লেখ্য, ছালাতের আহবানের জন্য শুধু আযানই যথেষ্ট। আযান ব্যতীত মুওয়ায্যিন আযানের আগে ‘আঊযুবিল্লাহ’, ‘বিসমিল্লাহ’, কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, ইসলামী জাগরণী, বিভিন্ন দো‘আ অথবা ‘আছ-ছালাতু খায়রুম মিনান্নাঊম’ বলা সুন্নাহ বিরোধী কাজ। এছাড়াও রামাযান মাসে সাহারীর সময় আযান না দিয়ে সাইরেন বাজানো, ডাকাডাকি করা, ঢাক-ঢোল পেটানো, দলবদ্ধভাবে চিৎকার করা ইত্যাদি জাহেলী রীতি।[9]
৪. আযানের শব্দ শুনলে শয়তান ছুটে পালিয়ে যায় :
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শক্র (বাক্বারাহ ২/১৬৮, ২০৮)। সে সর্বদা মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যেতে চায়। এমনকি মানুষের রক্তের মধ্যে মিশেও মানুষের শরীরে চলাফেরা করে।[10] আর যখনই মুওয়ায্যিন আযান শুরু করে তখনই সে ছুটে পালাতে শুরু করে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا نُودِيَ لِلصَّلاَةِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لاَ يَسْمَعَ التَّأْذِينَ، فَإِذَا قَضَى النِّدَاءَ أَقْبَلَ، حَتَّى إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلاَةِ أَدْبَرَ، حَتَّى إِذَا قَضَى التَّثْوِيبَ أَقْبَلَ، ‘যখন ছালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পলায়ন করে, যাতে সে আযানের শব্দ না শোনে। যখন আযান শেষ হয়ে যায়, তখন সে আবার ফিরে আসে। আবার যখন ছালাতের জন্য ইক্বামত বলা হয়, তখন আবার দূরে সরে যায়।[11] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ الشَّيْطَانَ إِذَا سَمِعَ النِّدَاءَ بِالصَّلاَةِ ذَهَبَ حَتَّى يَكُونَ مَكَانَ الرَّوْحَاءِ، ‘শয়তান যখন ছালাতের আহবান (আযান) শুনে, তখন ‘রাওহা’ নামক স্থান পর্যন্ত পলায়ন করে’। বর্ণনাকারী (জাবের রাঃ) বলেন, ‘রাওহা’ হ’ল মদীনা হ’তে ৩৬ মাইল দূরে একটি স্থানের নাম’।[12]
৫. আকাশের দরজা উন্মুক্ত হওয়া ও দো‘আ কবুল :
প্রত্যেক আকাশের দরজা রয়েছে এবং বিভিন্ন কারণে ও বিভিন্ন সময়ে আকাশের দরজাসমূহ খোলা হয়। আর প্রতিদিন আযানের সময় আকাশের দরজা খোলা হয়। আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,إذا نُودِيَ بالصَّلاةِ فُتِحَت أبوابُ السَّماءِ، واستُجيبَ الدُّعاءُ، ‘আযানের সময় আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং দো‘আ কবুল হয়’।[13]
৬. আযানের বরকতে ফেরেশতাদের সাথে ছালাত :
রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِذَا كَانَ الرَّجُلُ بِأَرْضٍ قِيٍّ، فَحَانَتِ الصَّلَاةُ، فَلْيَتَوَضَّأْ، فَإِنْ لَمْ يَجِدْ مَاءً فَلْيَتَيَمَّمْ، فَإِنْ أَقَامَ صَلَّى مَعَهُ مَلَكَاهُ، وَإِنْ أَذَّنَ وَأَقَامَ صَلَّى خَلْفَهُ مِنْ جُنُودِ اللَّهِ مَا لَا يُرَى طَرَفَاهُ، ‘যখন কোন ব্যক্তি নির্জন স্থানে থাকে এবং ছালাতের সময় নিকটবর্তী হয়, তাহ’লে সে ওযূ করবে; আর যদি পানি না পায়, তাহ’লে তায়াম্মুম করবে। যদি সে ইক্বামত দেয়, তাহ’লে তার সাথে থাকা দু’জন ফেরেশতা তার সাথে ছালাত আদায় করে। আর যদি সে আযান ও ইক্বামত উভয়টিই দেয়, তাহ’লে তার পিছনে আল্লাহ্র বিশাল বাহিনী (ফেরেশতামন্ডলী) ছালাত আদায় করে, যাদেরকে সে দেখতে পায় না’।[14]
৭. ক্বিয়ামতের দিন সাক্ষ্য প্রদান :
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্দুর রহমান আনছারী মাযিনী (রহ.) হ’তে বর্ণিত, তাকে তার পিতা সংবাদ দিয়েছেন যে, আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) তাঁকে বললেন, ‘আমি দেখছি তুমি বকরী চরানো এবং বন-জঙ্গলকে ভালোবাস। তাই তুমি যখন বকরী নিয়ে থাক বা বন-জঙ্গলে থাক এবং ছালাতের জন্য আযান দাও, তখন উচ্চকন্ঠে আযান দাও। কেননাفَإِنَّهُ لاَ يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَلاَ إِنْسٌ وَلاَ شَىْءٌ إِلاَّ شَهِدَ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ‘জিন, ইনসানসহ যেকোন বস্ত্তই যতদূর পর্যন্ত মুওয়ায্যিনের আওয়ায শুনবে, সে কিবয়ামতের দিন তার পক্ষে সাক্ষ্য দিবে’।[15] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَسْمَعُ صَوْتَهُ شَجَرٌ، وَلَا مَدَرٌ، وَلَا حَجَرٌ، وَلَا جِنٌّ، وَلَا إِنْسٌ، إِلَّا شَهِدَ لَهُ، ‘মুওয়ায্যিনের আযানের আওয়াজ গাছপালা, বন-জঙ্গল, জনপদ, পাহাড়, জিন এবং মানুষ যে শুনবে সে ক্বিয়ামতের দিন মুওয়ায্যিনের পক্ষে সাক্ষ্য দিবে’।[16]
৮. আযানের জবাবে জান্নাত লাভ :
ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রা.) হ‘তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
إِذَا قَالَ الْمُؤَذِّنُ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، فَقَالَ أَحَدُكُمْ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، ثُمَّ قَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، قَالَ: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، ثُمَّ قَالَ: أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، قَالَ: أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ، قَالَ: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، قَالَ: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ، ثُمَّ قَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، قَالَ: اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، ثُمَّ قَالَ: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ، قَالَ: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ مِنْ قَلْبِهِ، دَخَلَ الْجَنَّةَ،
‘তোমাদের কেউ যদি মুয়ায্যিনের ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’-এর জওয়াবে ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এবং ‘আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর জওয়াবে ‘আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে এবং ‘আশহাদু আন্না মুাহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’-এর জওয়াবে ‘আশহাদু আন্না মুাহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলে। অতঃপর ‘হাইয়্যা আলাছ-ছালাহ’-এর জওয়াবে যদি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলে। তারপর ‘হাইয়্যা ’আলাল-ফালাহ’-এর জওয়াবে যদি ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলে। তারপর যদি ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ জওয়াবে ‘আল্লাহু আকবার’ ‘আল্লাহু আকবার’ এবং ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর জওয়াবে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে তাহ’লে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[17]
৯. সালাফদের আযান প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ :
ওমর ইবনু খাত্ত্বাব (রা.) বলতেন,لو كنتُ أُطيقُ الأذانَ مع الخِلِّيفا لأذَّنتُ، ‘যদি আমি খলীফার সাথে আযান দিতে পারতাম, তাহ’লে অবশ্যই তা করতাম’।[18]
রাসূল (ছাঃ) ও খোলাফায়ে রাশেদীন নিজেরা আযান না দেওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, ইমাম যিম্মাদার আর মুওয়াযযিন আমানতদার।[19] তাই রাসূল (ছাঃ) নিয়মিতভাবে আমানত আদায়ে সক্ষম এরূপ ব্যক্তির নিকটে আযান দেওয়ার আমানত অর্পণ করেছিলেন। আযানের মূল উদ্দেশ্য লোকদের কাছে ছালাতের আহবান পেঁŠছানো। এজন্য রাসূল (ছাঃ) বড় বড় ছাহাবীদের বাদ দিয়ে এমনকি যিনি আযানের শব্দগুলো স্বপ্নে দেখেছিলেন তাকেও বাদ দিয়ে উঁচু কণ্ঠস্বরের অধিকারী বেলাল (রাঃ)-কে আযানের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।[20] উল্লেখ্য, রাসূল (ছাঃ)-এর আযান দেওয়ার ব্যাপারে কোন ছহীহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। একবার সফরে তিনি আযান দিয়েছিলেন মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ।[21]
ইক্বামতের গুরুত্ব ও ফযীলত :
‘ইক্বামত’ (الإقامة)অর্থ দাঁড় করানো। উপস্থিত মুছল্লীদেরকে ছালাতে দাঁড়িয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারী শুনানোর জন্য ‘ইক্বামত’ দিতে হয়। জামা‘আতে হউক বা একাকী হউক সকল অবস্থায় ফরয ছালাতে আযান ও এক্বামত দেওয়া সুন্নাত।[22]
ইসলামী শরী‘আতে আযানের ন্যায় ইক্বামত প্রদান করাও অত্যন্ত ছওয়াব ও মর্যাদাপূর্ণ একটি আমল।[23] আযানের মাধ্যমে দূরবর্তী মুছল্লীদের মসজিদে আহবান করা হয়, আর আযানের পর মূল জামা‘আত শুরুর ঠিক প্রাক্কালে মসজিদে উপস্থিত মুছল্লীদের কাতারবদ্ধ হওয়া ও ছালাতের চূড়ান্ত প্রস্ত্ততির ঘোষণা হিসাবে ইক্বামত দেওয়া হয়। হাদীছে ইক্বামতের অনেক ফযীলত রয়েছে। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হ’ল।-
১. ইক্বামতের সময় আকাশের দরজাসমূহ খোলা হয় :
আযানের সময় যেমন আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং দো‘আ কবুল হয় তেমনি যখন ছালাতের জন্য ইক্বামত দেওয়া হয় এবং ইমাম ও মুছল্লীগণ ছালাতের জন্য কাতারবনিদ হন তখন আল্লাহ আকাশের দরজা খুলে দেন। সাথে সাথে জান্নাতের দরজাগুলোও খুলে দেওয়া হয় এবং জান্নাতের হুরগণও মুছল্লীদের জন্য দো‘আ করেন ও ক্ষমা প্রর্থনা করেন। জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا صَفَّ النَّاسُ لِلصَّلَاةِ، وَصَفُّوا لِلْقِتَالِ، فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَأَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَزُيِّنَ الْحُورُ الْعِينُ وَاطَّلَعْنَ، فَإِذَا أَقْبَلَ الرَّجُلُ قُلْنَ: اللَّهُمَّ انْصُرْهُ، وَإِذَا أَدْبَرَ احْتَجَبْنَ مِنْهُ، وَقُلْنَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، ‘যখন মানুষ ছালাতের জন্য কাতারবদ্ধ হয় এবং জিহাদের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাড়াঁয়, তখন আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর আনতনয়না হূরদেরকে সাজিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা আত্মপ্রকাশ করে। যখন ব্যক্তিটি (ছালাতে বা জিহাদে) উকি মারে, তখন হূরেরা তার জন্য দো‘আ করে বলে, হে আল্লাহ! তাকে সাহায্য কর। আর যখন সে পশ্চাদপসরণ করে, তখন তারা আত্মগোপন করে এবং বলতে থাকে, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা কর’।[24]
২. দো‘আ কবুলের সময় :
ইক্বামতের সময় যেমন আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় তেমনি বান্দার দো‘আও কবুল হয়। নবী করীম (ছাঃ) বলেন,إذا ثوِّبَ بالصَّلاةِ، فُتِحَت أبوابُ السَّماءِ، واستُجيبَ الدُّعاءُ ‘যখন ছালাতের জন্য ইক্বামত দেওয়া হয়, তখন আসমানের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং দো’আ কবুল করা হয়’।[25]
৩. মহিলারাও ইক্বামত দিবে :
আযান ইক্বামত এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, মহিলারাও মহিলাদের মাঝে আযান ও ইক্বামত দিতে পারবে। তবে তা নিম্নস্বরে দিতে হবে।[26] আয়েশা (রাঃ) আযান ও ইক্বামত দিয়ে মহিলাদের জামা‘আতে ইমামতি করেছেন।[27]
ইবনু ওমর (রাঃ)-কে একদা জিজ্ঞেস করা হ’ল যে, ‘মহিলাদের উপর আযান আছে কি? তিনি রেগে গিয়ে বললেন, আমি আল্লাহ্র যিকর করতে নিষেধ করব কি? হাফছাহ (রাঃ) যখন ছালাত আদায় করতেন, তখন ইক্বামত দিতেন’।[28]
উপসংহার : আযান ইসলামের অন্যতম ইবাদত ও অনন্য নিদর্শন। এতে তাওহীদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদানের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ ইবাদত ছালাত এবং চূড়ান্ত সাফল্যের দিকে আহবান করা হয়েছে। আযান শোনামাত্রই দুনিয়াবী সকল ব্যস্ততা ত্যাগ করে রবের স্মরণে ছুটে যাওয়ার মাঝেই নিহিত আছে মুমিনের প্রকৃত কল্যাণ। তাই আমাদের একান্ত কর্তব্য হ’ল- আযানের আদব রক্ষা করা, এর যথাযথ জবাব দেওয়া এবং আযানের আহবানে সাড়া দিয়ে নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে আযানের মর্যাদা অনুধাবন করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
[1]. ড. মুহাম্মাদ ফজলুর রহমান, মু‘জামুল ওয়াফী, পৃ. ৬২।
[2]. মির‘আত ২/৩৪৪-৩৪৫, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘আযান’ অনুচ্ছেদ-৪। মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ছালাতুর রাসূল (ছাঃ) ৪র্থ সংস্করণ ২০১১ ইং, পৃ.৭০।
[3]. শারহুল মুমতে ‘আলা যাদিল মুসতাক্বনি (সঊদী আরব : দার ইবনে জাওযী, ১ম প্রকাশ ১৪২২ হি.) ২/৪০।
[4]. মির‘আত ২/৩৪৪-৩৪৫, ‘ছালাত’ অধ্যায়-৪, ‘আযান’ অনুচ্ছেদ-৪।
[5]. বুখারী হা/৬০৪; মুসলিম হা/৩৭৭; আহমাদ ৬৩৬৫।
[6]. আবূদাঊদ হা/৪৯৯, সনদ হাসান ছহীহ; মিশকাত হা/৬৫০।
[7]. মিরক্বাত শরহ মিশকাত ‘আযান’ অনুচ্ছেদ ২/১৪৯ পৃঃ। গৃহীত : সীরাতুর রাসুল (ছাঃ) ১ম প্রকাশ, ২য় সংস্করণ নভেম্বর ২০১৫; ২৬১-২৬২ পৃ.।
[8]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরুল কুরআন, সূরা মায়েদাহ, ৫৮ নং আয়াতে তাফসীর দ্র.; পৃষ্ঠা ৪৩১।
[9]. ফাৎহুল বারী, হা/৬২১-এর আলোচনা দ্রঃ।
[10]. বুখারী হা/৩২৮১।
[11]. বুখারী হা/৬০৮; মুসলিম হা/৩৮৯; আহমাদ হা/৯৯৩৮।
[12]. মুসলিম ৩৮৭; আত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৪১।
[13]. আহমাদ হা/১৪৭৩০; ছহীহাহ হা/৫৩১, ১৪১৩।
[14]. মুছান্নাফে আবদুর রাযাযাক হা/১৯৫৫; ছহীহ আতগীব হা/২৪৯।
[15]. বুখারী হা/৬০৯; মুসলিম হা/৩৮৯; তিরমিযী হা/৩৯৭।
[16]. ইবনে খুযায়মাহ হা/৩৯; ইবনে মাজাহ হা/৭২৩; ছহীহুত তারগীব হা/২৩২।
[17].মুসলিম হা/৩৮৫।
[18]. আবদুর রাজ্জাক হা/১৮৬৯; ইবনে আবু শায়বা হা/২৩৬০; বায়হাক্বী হা/২০৬৬।
[19]. আবুদাউদ হা/৫১৭; মিশকাত হা/৬৬৩।
[20]. আবুদাউদ হা/৪৯৯; ইবনু মাজাহ হা/৭০৬; মিশকাত হা/৬৫০। মাসিক আত-তাহরীক, মার্চ ২০১৬, প্রশ্ন নং ১৩/২১৩।
[21]. তিরমিযী হা/৪১১; আহমাদ হা/১৭৬০৯; যঈফাহ হা/৬৪৩৪।
[22]. নাসাঈ হা/৬৬৭-৬৮; আবুদাঊদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৬৬৫।
[23]. উল্লেখ্য, আযান ও ইক্বামত দু’টিকেই হাদীছে ‘আযান’ বলা হয়েছে (মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৬৬২)। মাসিক আত-তাহরীক, ফেব্রুয়ারী ২০২১৭, প্রশ্ন নং- ৩/১৬৩।
[24]. হাকেম হা/৬০৮৭; ছহীহ আত-তারগীব হা/১৩৭৭।
[25]. আহমাদ হা/১৪৭৩০; আত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৬০।
[26]. ভূপালী : আর-রওযাতুন নাদিইয়াহ ১/৩২২; গৃহীত : মাসিক আত-তাহরীক, ফেব্রুয়ারী ২০১৩; প্রশ্ন নং- ৮/১৬৮।
[27]. বায়হাক্বী কুবরা হা/১৭৮১. তামামুল মিন্নাহ পৃঃ ১৫৩, সনদ ছহীহ; গৃহীত : মাসিক আত-তাহরীক নভেম্বর ২০২১; প্রশ্ন নং- ৩৪/৭৪।
[28]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হা/২৩৩৮।