বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশের আগেই মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের নাম ও মতবাদের সাথে প্রথম পরিচয়। তরুণ মনে তখন এক ধরনের আকর্ষণ ও মুগ্ধতা জন্মেছিল। মনে হ’ত, এই মানুষগুলো তাদের যুগে নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কি তীব্র প্রতিবাদই না করেছিলেন! ‘বুর্জোয়া’ (Bourgeoisie), ‘প্রলেতারিয়েত’ (Proletariat), ‘শ্রেণীসংগ্রাম’, ‘কমরেড’ এসব শব্দে কেমন যেন রক্তে আগুন লাগার অনুভব হ’ত। পৃথিবীকে অন্যায় ও বৈষম্যমুক্ত করার স্বপ্ন, শোষিত শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আহবান এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণের প্রত্যয় স্বাভাবিকভাবেই সমাজসচেতন তরুণদের আন্দোলিত করে। কাজী নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা, বাধনহারা, ব্যথার দান প্রভৃতি বিংশ শতকের সাহিত্য ও উপন্যাসগুলোতে রুশ-বিপ্লব পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক আবহ আর বিপ্লবী মানবতাবাদ ও সাম্যচেতনার যে প্রবল স্রোত দেখা যায়, তা সহসাই তরুণ হৃদয়ে এক প্রতিবাদী চেতনা আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।
পরবর্তীকালে ইসলামের ইতিহাসের পাঠগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কার্ল মার্কস সামাজিক সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন এবং রোগ নির্ণয়ও যথার্থভাবে করেছিলেন বটে; কিন্তু তার দেয়া চিকিৎসা ছিল একদমই ভ্রান্ত ও অবাস্তব। ইতিহাসের কাঠগড়ায় সেটা নিছক আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।
তবুও এটাও সত্য যে, আজও কোন চিন্তাশীল ও চেতনাদৃপ্ত তরুণ যদি মার্কসের সাহিত্য পাঠ করে, তবে তার হৃদয়ের গভীরে মানবতার জন্য করুণার আর্তি জেগে উঠতে পারে। নিপীড়িত মানুষের জন্য সহানুভূতি, ধনী-দরিদ্র বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা আন্দোলিত করতে পারে। এমনকি ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রকৃত শিক্ষা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে সে কখনও মনে করতে পারে যে, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির একমাত্র ভাষা বুঝি মার্কসবাদই। সেজন্য মার্কসবাদের সাথে ইসলামের পার্থক্যের জায়গাগুলো আমাদের তরুণদের সামনে স্পষ্ট থাকা দরকার।
মার্কস আসলে কি ভেবেছিলেন?
মার্কস মূলত একটা সরল মানবিক বোধ থেকেই সমাজের পুঁজিবাদের ভেতরের শোষণটা কাছ থেকে দেখেছিলেন। তিনি মৌলিক যে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তা হ’ল, কেন শ্রমিকের শ্রম-মূল্যের একটা অংশ মালিকরা কেড়ে নেয় আর যাবতীয় সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয় কিছু নির্দিষ্ট হাতে? তার সেই প্রশ্ন আজও যে কোন মানবিক মানুষ খুঁজে বেড়াবে গভীর আফসোস নিয়ে। কেন ২০২৫ সালে যখন যান্ত্রিক সভ্যতার অনবদ্য ঝলকানিতে বিশ্ব বিমুগ্ধ, তখনও বিশ্বে ক্ষুধার যাতনা কমছে না? কেন বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ আগের পাঁচ বছরের গড় হারের তিন গুণ বেগে বেড়ে যখন রেকর্ড ১৮.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, তখন বিশ্বের অর্ধেক মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে? কেন বর্তমান বিশ্বে প্রতি চারজনের একজনই ক্ষুধায় ভোগে? সমাজের এই বৈষম্য অতি বাস্তব, যা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
মার্কসীয় তত্ত্বের মূলকথা :
কার্ল হাইনরিখ মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) মূলত ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ। ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পর তিনি শৈশবেই পরিবারের সাথে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। শিল্পবিপ্লবের যুগে ইউরোপের কলকারখানায় শ্রমিকদের পশুর মত জীবনযাপন, শিশুশ্রম, ১৪-১৬ ঘণ্টার কর্মদিন এবং মালিকশ্রেণীর লাগামহীন মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতা দেখে মার্কসের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জাগে। তিনি ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে যৌথভাবে রচনা করেন কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (১৮৪৮) এবং পরে রচনা করেন তার সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ দাস কাপিটাল (১৮৬৭)। তার এই চিন্তাধারারই ফসল হ’ল আজকের রাশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশ, যা তার মৃত্যুর কিছু কাল পরে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানচিত্র এঁকে দিয়েছিল।[1] তার মতবাদের মূলকথাগুলো নিম্নরূপ :
(১) ঐতিহাসিক বস্ত্তবাদ (Historical Materialism) :
মার্কসের সমগ্র চিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর হ’ল ঐতিহাসিক বস্ত্তবাদ। তার মূল দাবী হ’ল, মানুষ তার সত্তাগতভাবে বা জন্মগতভাবে কোন নির্দিষ্ট চেতনার অধিকারী নয়, বরং সামাজিক অবস্থানই তার চেতনা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাবে, কী বিশ্বাস করে, কোন নৈতিকতা মানে, এসব কিছুই নির্ধারিত হয় সে কোন অর্থনৈতিক শ্রেণীতে জন্মেছে তার উপর। তার ধারণামতে, একজন জমিদারের সন্তান এবং একজন ভূমিহীন চাষীর সন্তান একই ধর্মগ্রন্থ পড়েও ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। কারণ তাদের বস্ত্তগত অস্তিত্ব এক নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন। তিনি পৃথিবীর ইতিহাসকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। যথা : (১) প্রথম পর্যায় : আদিম সাম্যবাদ (Primitive Communism), যেখানে ব্যক্তিগত মালিকানা ছিল না। (২) দ্বিতীয় পর্যায় : দাস সমাজ (Slave Society), যেখানে লড়াই শুরু হয় দাসমালিক বনাম দাস। (৩) তৃতীয় পর্যায় : সামন্তবাদ (Feudalism), যেখানে লড়াই চলেছিল ভূস্বামী/জমিদার বনাম ভূমিদাস/কৃষক। (৪) চতুর্থ পর্যায় : পুঁজিবাদ (Capitalism), বর্তমান যে লড়াই চলমান তথা বুর্জোয়া (পুঁজিপতি/বিত্তবান) বনাম প্রলেতারিয়েত (শ্রমিক/সর্বহারা)। আর (৫) পঞ্চম পর্যায় : সাম্যবাদ (Communism), যা শ্রেণীহীন সমাজকে বুঝায়, যেখানে মালিক-শ্রমিক বলে কিছু থাকবে না, সবাই সমান। সেখানে কলকারখানায় উৎপাদন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সমষ্টিগত মালিকানার অধীনে এবং সকল মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকারের ভিত্তিতে বসবাস করবে। অবসান হবে সব রকম সংঘর্ষের। আর এটাই তার মতে, মানবসমাজের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিৎ, যা বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।[2]
(২) দ্বান্দ্বিক বস্ত্তবাদ (Dialectical Materialism) :
কার্ল মার্কসের দর্শন ও সমাজতত্ত্বের মূল ভিত্তি হ’ল ‘দ্বান্দ্বিক বস্ত্তবাদ’। এই তত্ত্বটি মূলত জার্মান দার্শনিক জর্জ উইলহেম ফ্রিডরিখ হেগেলের ‘দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি’ (Dialectics) এবং লুডউইগ ফয়ারবাখের ‘বস্ত্তবাদ’ (Materialism)-এর এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তবে মার্কস হেগেলের পদ্ধতি গ্রহণ করলেও তার মূল চেতনাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছেন। মার্কস নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হেগেলের পদ্ধতি থেকে কেবল আলাদাই নয়, বরং ঠিক তার উল্টো। হেগেলের কাছে মানুষের মস্তিস্কের জীবন-প্রক্রিয়া (যাকে তিনি ধারণা বা Idea নামে অভিহিত করেছেন) হ’ল বাস্তব জগতের সৃষ্টিকর্তা। পক্ষান্তরে আমার কাছে, ‘ধারণা’ হ’ল মানুষের মনে প্রতিফলিত এবং চিন্তা রূপে রূপান্তরিত বস্ত্তগত জগৎ ছাড়া আর কিছুই নয়।[3]
হেগেল বিশ্বাস করতেন, এই মহাবিশব এবং মানব ইতিহাসের চালিকাশক্তি হ’ল একটি পরম চেতনা বা ধারণা (Absolute Idea/Geist)। অর্থাৎ মানুষের চিন্তার পরিবর্তন আগে হয়, তারপর সমাজের পরিবর্তন হয়। কিন্তু মার্কস হেগেলের এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইতিহাস কোন আদর্শ বা ধারণা দ্বারা চালিত হয় না; বরং চালিত হয় সম্পূর্ণ বস্ত্তগত ও অর্থনৈতিক শক্তি দ্বারা। তাই কোন ধর্ম, ভাববাদী আদর্শ বা পরম চেতনা নয়, বরং সমাজ ও অর্থনীতিই মানুষের জীবনগতি নির্ধারণ করে। তার মতে, অর্থনীতিই মানবজীবনের সবকিছু। তাই আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হ’লে সমাজের সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটে।[4]
মার্কস ডারউইনের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার তত্ত্বমতে, প্রকৃতির মত সমাজও স্থবির নয়, বরং এটি পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বিবর্তনের তিনটি স্তর রয়েছে। যথা : ১. থিসিস (Thesis- বিদ্যমান ব্যবস্থা) অর্থাৎ সমাজের একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ বা ব্যবস্থা। ২. অ্যান্টিথিসিস (Antithesis- বিরোধী শক্তি) অর্থাৎ থিসিসের গর্ভ থেকেই তার ধ্বংসের উপাদান বা বিরোধী শক্তির জন্ম হয়। এদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ৩. সিনথেসিস (Synthesis- নতুন ব্যবস্থা) অর্থাৎ থিসিস ও অ্যান্টিথিসিসের দ্বন্দ্বের ফলে একটি নতুন ও উন্নত ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। এই সিনথেসিসটি পরবর্তীতে আবার নতুন ‘থিসিস’-এ পরিণত হয় এবং পুনরায় দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
কার্ল মার্কস এই সূত্রটি মানব ইতিহাসের অর্থনৈতিক বিবর্তনে প্রয়োগ করেছেন এভাবে যে,
পুঁজিবাদ (Thesis) : যেখানে পুঁজিপতিরা উৎপাদন যন্ত্রের মালিক এবং তারা শ্রমিকদের শোষণ করে।
শ্রমিক শ্রেণীর বিদ্রোহ (Antithesis) : শোষণের শিকার হয়ে সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণী তৈরী হয় এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব বা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
সাম্যবাদ/সমাজতন্ত্র (Synthesis) : এই দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পরিণতিতে একটি শোষণহীন, শ্রেণীহীন সমাজ বা ‘সাম্যবাদ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কসের দাবী ছিল, সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সমাজে আর কোন নতুন ‘অ্যান্টিথিসিস’ বা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে না। এটাই হবে ইতিহাসের চূড়ান্ত গন্তব্য।[5]
মূলত দ্বান্দ্বিক বস্ত্তবাদ একটি নাস্তিক্যবাদী দর্শন। এটি মনে করে, এই মানব জীবন ও ইতিহাসের পরিবর্তনের পিছনে কোন স্রষ্টা তথা আল্লাহর ভূমিকা নেই এবং মানুষের নৈতিক ইচ্ছাশক্তি বলে কিছু নেই। বরং এই পৃথিবীতে বস্ত্তই সবকিছু। ‘টাকা-পয়সা আর রুটি-রুযী’র দ্বন্দ্বই একমাত্র সত্য।[6]
(৩) বাড়তি মূল্য তত্ত্ব (Theory of Surplus Value) :
এটি মার্কসের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক তত্ত্ব Das Kapital (১৮৬৭)-এর অন্যতম প্রধান ধারণা। তার মতে, একজন শ্রমিক যদি ৮ ঘণ্টা কাজ করে, হয়তো ৪ ঘণ্টাতেই তার মজুরীর সমতুল্য পণ্য তৈরী করে ফেলে। কিন্তু বাকী ৪ ঘণ্টার যে শ্রমের মূল্য তা মালিক কেড়ে নেয়। আর এটাই বাড়তি মূল্য (Surplus Value)। অন্যভাবে পণ্যদ্রব্যের প্রকৃত উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে যে ব্যবধান থাকে, সেটাই হ’ল বাড়তি মূল্য, যা পুঁজিপতিরা মজুরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়। এই বাড়তি মূল্যই শোষণ, যা পুঁজিপতিদের পুঁজি বৃদ্ধির রহস্য। অর্থাৎ মার্কস ধরে নিয়েছিলেন শুধু শ্রমই মূল্য তৈরী করে (Labour can make value)। অথচ মালিক বা উদ্যোক্তারও ঝুঁকি আছে। শ্রমের বাইরে প্রযুক্তি ও মূলধনেরও ভূমিকা আছে, যা তিনি আমলে নেননি। তাই তার ‘শ্রমমূল্য তত্ত্ব’ (Labour Theory of Value) একটি অকার্যকর তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।[7]
(৪) শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্ব (Theory of Class Struggle) :
কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (১৮৪৮)-এর প্রথম বাক্য হ’ল, ‘এ পর্যন্ত বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হ’ল শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস’। তার মতে, সমাজ দুই ভাবে বিভক্ত হয়েছে। (১) সম্পদশালী (The Haves)। (২) সর্বহারা (The Have Nots)। বৈষম্যের কারণে এই বুর্জোয়া শ্রেণী (মালিক) বনাম প্রলেতারিয়েত (শ্রমিক শ্রেণী)-এর মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে এবং এই দ্বন্দ্ব অনিবার্যভাবে বিপ্লবে রূপ নেবে। মজার ব্যাপার হ’ল মার্কসের সেই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব জার্মানী বা ইংল্যান্ডের মত শিল্পপ্রধান দেশে নয়, বরং ঘটেছিল কৃষিনির্ভর রাশিয়া (১৯১৭) ও চীনে (১৯৪৯), যা মার্কসের নিজের ভবিষ্যদ্বাণীর বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।
(৫) বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব (Theory of Alienation) :
মার্কসের সবচেয়ে মানবিক তত্ত্বের নাম Economic and Philosophical Manuscripts (১৮৪৪)। এতে তিনি দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিক চার স্তরে বিচ্ছিন্ন হয়। যথা : (১) প্রথম স্তর : উৎপাদিত পণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, অর্থাৎ শ্রমিক জুতা তৈরি করে কিন্তু জুতার মালিক হয় না। (২) দ্বিতীয় স্তর : উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, অর্থাৎ কাজটি আনন্দের নয়, যন্ত্রণার। (৩) তৃতীয় স্তর : মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে মানুষ তার সৃজনশীলতা হারায়, যন্ত্রে পরিণত হয়। (৪) চতুর্থ স্তর : অন্য মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা পুঁজিবাদ মানুষকে প্রতিযোগী বানায়, সহযোগী নয়। মার্কসের এই বিচ্ছিন্নতা তত্ত্ব যথারীতি কেবলই অর্থনৈতিক। মানুষের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অন্য কারণগুলো এখানে অনুপস্থিত।[8]
(৬) ধর্মবিরোধিতা :
মার্কসের বিখ্যাত উক্তি হ’ল, ‘ধর্ম এক নিপীড়িত সত্তার দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয় এবং আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা। ধর্ম হ’ল জনগণের আফিম’ (Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people)।[9] ধর্মের বিরুদ্ধে মার্কসের যুক্তি তিনটি। যথা :
প্রথমতঃ ধর্ম মানুষকে ইহ জীবনের কষ্ট সহ্য করতে শেখায় পরকালের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ফলে বিদ্যমান শোষণ টিকে থাকে।
দ্বিতীয়তঃ ধর্ম শাসকশ্রেণী তৈরী করে ও রক্ষা করে। রাজা আল্লাহর প্রতিনিধি এই ধারণা শাসনকে বৈধতা দেয়।
তৃতীয়তঃ অর্থনৈতিক মুক্তি এলে ধর্মের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে।[10]
মজার ব্যাপার হ’ল মার্কসের নিজের তত্ত্বটাই একটি নতুন ধর্মের রূপ নিয়েছে। যেমন সমাজবিজ্ঞানী রেমন্ড অ্যারোন মার্কসবাদকে secular religion বা ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম বলেছেন। তার মতে, মার্ক্সবাদেও আছে পবিত্র গ্রন্থ (দাস কাপিটাল), নবী (মার্কস), বিশ্বাসযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী (শ্রেণীহীন সমাজ), কাফের (বুর্জোয়া) এবং মুমিন (প্রলেতারিয়েত)।[11]
যেখানে মার্কসের তত্ত্ব টিকতে পারল না :
মার্কসের সমস্যা হ’ল যে, তিনি রোগ-নির্ণয়ে যতটা পান্ডিত্য প্রদর্শন করেছেন, প্রতিকারে ততটাই অন্ধত্ব দেখিয়েছেন। কারণ তিনি যে বিশ্বদৃষ্টিতে সমস্যার গোড়া দেখেছিলেন, তা সত্য হ’লেও সমাধানের পথকে তিনি দেখেছেন নিরেট সেক্যুলার দৃষ্টিতে। তাওহীদের বিশ্বদৃষ্টিতে সত্যের সন্ধান করতে না পারায় তার তত্ত্ব ইতিহাসের পরীক্ষায় যথারীতি চূড়ান্ত ব্যর্থতা দেখিয়েছে। যার কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ :
১. তার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়েছে : মার্কস বলেছিলেন, বিপ্লব প্রথমেই ঘটবে কোন শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশে। সেটা হ’তে পারে জার্মানী বা ব্রিটেন। কেননা সেখানে বৈষম্য বেশী। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিপ্লব ঘটল তৎকালীন কৃষিনির্ভর আর অনুন্নত রাশিয়া ও চীনে। অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী দেশের শোষিত শ্রেণীর মানুষগুলোই সংঘর্ষে নামল না, কোন বিপ্লবের পথে হাঁটল না। ফলে তার তত্ত্বের মূল বাস্তবতা নাকচ হয়ে গেছে।
২. রাষ্ট্র বিলীন হয়নি, বরং দানব হয়ে উঠেছে : মার্কসের প্রতিশ্রুতি ছিল, বিপ্লবের পর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে একটি সার্বজনীন শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটছিল উল্টোটা। সোভিয়েত রাশিয়া আর মাও-চীনে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। ব্যক্তি-স্বাধীনতা বিলুপ্ত হ’ল, কিন্তু বৈষম্য বিলুপ্ত হ’ল না। কেবল নতুন শ্রেণী তৈরী হ’ল। যারা হ’ল দল-আমলা শ্রেণী। ব্যক্তি মালিকানা বিলুপ্ত হ’লেও এর বিপরীতে রাষ্ট্র নিজেই হয়ে উঠল নির্মম মালিক।
তার প্রস্তাবিত শ্রেণী সগ্রামের পথ ধরে পরবর্তীকালে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রেণীশত্রু উৎখাত ও নির্মূলের নামে কত লক্ষ বনু আদমকে যে বন্দুকের নলের শিকার বানিয়েছিল, কত লক্ষ লোক যে ভিটেমাটি হ’তে উৎখাত হয়ে সুদূর সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হয়েছিল, তার হদিস মিলবে না কোন দিনই। সমাজতন্ত্র যখন একটা সংগঠিত শক্তির রূপ নেওয়া শুরু করে তখন তার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায় ব্যক্তি মালিকানা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার হরণ, সর্বহারার একনায়কত্বের (Dictatorship of the Proletariat) নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মালিকানার নামে উৎপাদনের উপায়-উপকরণে রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, যা ছিল পুরোটাই এক মহা যুলুমের রাজত্ব।[12] স্বয়ং লেলিনের মতে যে কোন কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে দু’টো জিনিস অপরিহার্য, যুদ্ধ আর স্বৈরতন্ত্র। মূলত যুদ্ধ আর একনায়কতন্ত্র বা প্রবল স্বৈরতন্ত্র ছাড়া কোন কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র একদন্ড কায়েমই থাকতে পারে না।[13]
৩. সম্পদের যৌথ মালিকানা প্রণোদনা ধ্বংস করেছে : ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফার প্রণোদনা কেড়ে নেওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। সোভিয়েত কৃষি-যৌথীকরণ এবং চীনের মহাঅগ্রগমন (Great Leap Forward) নীতি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষগুলোর জন্ম দিয়েছিল যেখানে প্রায় ৩৮ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল এমন এক ব্যবস্থায়, যা মানবিক সমাজ ও শোষণমুক্ত সমাজের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[14]
৪. ঈশ্বরহীন রাষ্ট্রই হয়ে উঠল নতুন ঈশ্বর : ধর্মকে ‘আফিম’ বলে বিদায় করার পর জবাবদিহিতার শূন্যস্থান পূরণ করল রাষ্ট্র ও নেতা নিজেই। স্তালিন-মাওয়ের প্রতি ব্যক্তিপূজা প্রমাণ করে যে, মানুষ তাওহীদ থেকে মুখ ফেরালে নিশ্চিতভাবে অন্য কোন বস্ত্ত, ব্যক্তি বা ক্ষমতাকেই দেবত্বের আসনে বসিয়ে দেয়। মার্কস ধর্মকে নিপীড়নের হাতিয়ার বলেছিলেন, কিন্তু তারই অনুসারীরা সেই নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিল।
ফলে ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রের দেশ সোভিয়েত রাশিয়া, মাও চীন, উত্তর কোরিয়া ইত্যাদি দেশগুলোতে শোষণ কমেনি বরং নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। ধর্মহীন সোভিয়েত রাশিয়াই কেবল হত্যা করেছিল ৭ কোটিরও বেশী মানুষ। মুসলিম অধ্যুষিত দাগেস্তানে তারা পায়কারী হারে হত্যা করেছিল ১০ লক্ষ মুসলমানকে।[15]
৫. মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক প্রাণী বলার ভুল : মার্কসবাদী ঐতিহাসিক বস্ত্তবাদ মানুষের জীবন, সমাজ, নৈতিকতা, আইন, সংস্কৃতি ও চিন্তাকে প্রধানত অর্থনীতির আলোকে ব্যাখ্যা করে। ফলে মানুষের বিবেক, আত্মত্যাগ, প্রেম, মমতা ও নৈতিক মূল্যবোধকেও বস্ত্তগত ও সামাজিক অবস্থার ফল হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তব জীবনে এমন বহু মানবিক আচরণ রয়েছে, যা কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন মা নিজের ক্ষুধা সহ্য করে সন্তানের মুখে কেন আহার তুলে দেন? একজন সৈনিক জাতির স্বার্থে নিজের জীবন কেন বিসর্জন দেন? মানুষ নিঃস্বার্থভাবে কেন অন্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন? এর কোন ব্যাখ্যা বস্ত্তবাদ দিতে পারে না। মূলত এসব আচরণের পেছনে অর্থনৈতিক হিসাব নয়; বরং কাজ করে নৈতিক দায়বদ্ধতা, বিবেক, ভালোবাসা ও আতিমক প্রেরণা। ইসলাম মানুষের এই পূর্ণাঙ্গ পরিচয় তুলে ধরে। মানুষের দেহ মাটি থেকে সৃষ্টি হলেও তার মধ্যে আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে রূহ দান করেছেন। তাই মানুষ কেবল অর্থনৈতিক বা জৈবিক সত্তা নয়, সে এক রূহানী নৈতিক সত্তা, যার জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
মার্কসবাদের চূড়ান্ত পরিণতি :
শ্রেণীশত্রু উৎখাতের নামে বিংশ শতাব্দী জুড়ে মধ্যএশিয়া, পূর্বএশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোতে যা ঘটেছিল তার চিত্র অতীব ভয়াবহ। সোভিয়েত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ১৯১৭ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে শুধু নিজের নাগরিকদের মধ্যেই প্রায় ৬১.৯ মিলিয়ন মানুষ হত্যা করেছে। এরা বিদেশী কোন শত্রু ছিল না। বরং এরা ছিল সেই ‘সর্বহারা’ জনগণ, যাদের মুক্তির নামেই বিপ্লব হয়েছিল।[16] হাতুড়ি-শাবল-কাস্তে নিয়ে যারা ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান দিয়েছিল, তারাই হয়েছিল সবচেয়ে বেশী অত্যাচারিত।
সোভিয়েত শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ উপহার ছিল ‘গুলাগ’ তথা বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির ব্যবস্থা। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৯১৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ১৮ মিলিয়ন মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করে জোরপূর্বক সুদূর সাইবেরিয়া, কোলিমা বা উত্তর মেরু অঞ্চলের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয় এবং এর মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষই ক্ষুধা, শীত আর নির্যাতনে মারা যায়। যাদের পাঠানো হ’ত তাদের অধিকাংশ ছিলেন কৃষক, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী। ‘শ্রেণীশত্রু’ তকমা দিয়ে তাদের সেখানে পাঠানো হয়।[17] ১৯০৭ সালে রাশিয়ায় ছিল ৭০০০ মসজিদ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৮০০টি। ১৯০৮ সালে এগুলোর কোন অস্তিত্ব ছিল না। গ্রন্থাগারগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়। এই নৃশংসতা স্বয়ং তাতার, মোঙ্গলদের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছিল।[18]
চীনে ১৯৬৬-৭৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেন মাও সেতুং। ‘রেড গার্ড আন্দোলনে’র নামে শুরু করা হয় ‘শুদ্ধি অভিযান’। এই অভিযানে বৈষম্য দূর করার নামে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের জনসমক্ষে অপমান করা হয়। তাদের ‘মেথরের কাজ’ করতে বাধ্য করা হয়। লক্ষ লক্ষ বইপুস্তক পোড়ানো হয়, উপসনালয়-মসজিদ ভাঙা হয়। প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ এই অভিযানে সরাসরি হত্যার শিকার হয়। আরও লক্ষাধিক মারা যায় নির্যাতনে ও অনাহারে। ঝিনঝিয়াং-এ মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের পাইকারি হারে হত্যা ও বন্দী করা হয়েছিল। উইঘুর ও হুই মুসলিমদের নাম-নিশানা মুছে ফেলার সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হয়। মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়, কুরআন পোড়ানো হয়, আরবী শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি আজও সেই ধারাবাহিকতা চলছে। এখনও ৭-১০ লক্ষাধিক উইঘুরকে ‘পুনঃশিক্ষা শিবিরে আটক রাখা হয়েছে’ বলে তদন্তে উঠে এসেছে।[19]
কম্বোডিয়ায় ১৯৭৫-৭৯ সালে খেমাররুজ রেজিমের নেতৃত্বে পলপটের ‘কৃষি সমাজবাদ’ চার বছরে ১৫-২০ লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে, যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫%। পরিস্থিতি এমন ছিল যে চশমা পরা মানুষকেও ‘বুদ্ধিজীবী’
বলে হত্যা করা হয়েছিল, শ্রেণীশত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে।[20]
মার্কসবাদী এই রাষ্ট্রগুলো এত সহজে ও নির্মমভাবে নিজ দেশের মানুষকে হত্যা করতে পেরেছিল এই কারণে যে, তাদের কাছে মানুষের জীবন ছিল শ্রেণীস্বার্থের হাতিয়ার মাত্র। তাই যে কেউ শ্রেণীস্বার্থের বিরোধী হবে, সে-ই হ’ত নিধনযোগ্য। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কসবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার শিকার হয়ে বিশ্বজুড়ে নিহত হয়েছে ৯৪-৯৭ মিলিয়ন তথা প্রায় ১০ কোটি বনু আদম।[21]
অবশেষে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী দেশগুলো একে একে তাদের আদর্শ বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৭৮ সালে চীন দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে বাজার অর্থনীতির দিকে ফিরে। আজ চীন নামে কমিউনিস্ট, কিন্তু কাজে পুঁজিবাদী। অনুরূপভাবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গর্বাচেভের গ্লাসনোস্ত ও পেরেস্ত্রোইকার (উন্মুক্ততা ও পুনর্গঠন) মাধ্যমে ভেঙে পড়ল। লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইরাক প্রভৃতি যে সব মুসলিম রাষ্ট্র সমাজতন্ত্রের ধোঁকায় পড়েছিল, তারাও শেষ পর্যন্ত পতন ঠেকাতে পারেনি। এই ছিল মানবতার নামে প্রচারিত মার্কসীয় তত্ত্বের চূড়ান্ত পরিণতি।
শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে ইসলাম ও শাশ্বত ন্যায়বিচার নীতি :
মার্কস যে শোষণের নিগূঢ় ভাঙতে চেয়েছিলেন বিপ্লব দিয়ে, ইসলাম তা প্রতিরোধ করে চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক বিধান দিয়ে। এতে কোন রক্তপাত হয় না। আবার মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করতে হয় না। যেমন :
ক. সম্পদের সুষম বণ্টন :
সম্পদের ব্যাপারে ইসলামের সার্বজনীন নীতি হ’ল, সম্পদ কারো কাছে পুঞ্জীভূত থাকতে পারবে না। অবশ্যই তা উপৎপাদনশীল হ’তে হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ، ‘যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যে কেবল ধনীদের হাতেই আবর্তিত না হয়’ (হাশর ৭)।
ইসলামের যাকাত ব্যবস্থাপনা (২.৫%) সম্পদকে স্থির থাকতে দেয় না, বরং তা সমাজে ছড়িয়ে দেয়। ইসলামের উত্তরাধিকার বিধান (নিসা ৪/১১-১২) প্রতিটি প্রজন্মের সম্পদ বহু হাতে ভাগ করে দেয়। সূদ বা রিবা নিষেধের মাধ্যমে অলস পুঁজির অন্যায্য বৃদ্ধি বন্ধ করে দেয়। আর ওয়াক্ফ সম্পদকে স্থায়ীভাবে জনকল্যাণে রূপান্তর করে। এভাবে ইসলাম সম্পদকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পন্থায় চালিত করেছে, যা ব্যক্তির হাতে পুঁজিকে আটকে থাকতে দেয় না, আবার ব্যক্তির হাত থেকে নিয়ন্ত্রণও তুলে নেয় না। এই মধ্যপন্থার মাধ্যমে ইসলাম শাশ্বত কল্যাণের পথ দেখিয়েছে।
অন্যদিকে ইসলাম সবার জন্য সমান অর্থনৈতিক অবস্থানও চাপিয়ে দেয় না। কারণ সকল মানুষের শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা সমান নয়। সুতরাং প্রত্যেকে তার প্রচেষ্টা অনুযায়ী ফল পাবে এটাই স্বাভাবিক এবং সুষম বণ্টননীতি।[22]
মূলত মার্কসের লক্ষ্য (শোষণমুক্তি) আর ইসলামের লক্ষ্য একই। কিন্তু ইসলামের দেখানো পথটি চিরন্তন ও মানবিক, কারণ এটিই মানুষের মানবীয় বৈশিষ্ট্য (ফিতরাত), যা মালিকানার অধিকারকে অস্বীকার না করে সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।
খ. শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা :
রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,أَعْطُوا الأَجِيرَ أَجْرَهُ قَبْلَ أَنْ يَجِفَّ عَرَقُهُ، ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরী পরিশোধ কর’।[23] এই হাদীছটি কেবল একটি নির্দেশ নয়, বরং এমন চিরন্তন এক শ্রমনীতি, যা ক্বিয়ামত অবধি প্রাসঙ্গিক। বিলম্বে মজুরী পরিশোধকে ইসলাম শুধু অন্যায় নয়, সরাসরি যুলুম হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। রাসূল (ছাঃ) হাদীছে কুদসীতে আরও বলেছেন,قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: ثَلَاثَةٌ أَنَا خَصْمُهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ... وَرَجُلٌ اسْتَأْجَرَ أَجِيرًا فَاسْتَوْفَى مِنْهُ وَلَمْ يُعْطِهِ أَجْرَهُ، ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ক্বিয়ামতের দিন আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব... তার মধ্যে একজন হ’ল সেই ব্যক্তি যে শ্রমিক থেকে পূর্ণ কাজ নিয়েছে কিন্তু তার মজুরী দেয়নি’।[24]
মার্কস শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রেণীসংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম সেই একই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বেছে নিয়েছে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার ভয়কে। পার্থক্য হ’ল মার্কসের পথে রয়েছে শুধু ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সংঘাত। আর ইসলামের দেখানো পথে রয়েছে সততা, ধৈর্য ও নৈতিক দায়িত্ববোধ।
গ. ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতি :
মার্কস ব্যক্তিমালিকানাকে সমস্ত শোষণের মূল বলেছেন এবং তা সম্পূর্ণ বিলোপের দাবী করেছেন। এ ছিল এক হঠকারিতামূলক চরমপন্থা। মাওলানা আব্দুর রহীম এর বাস্তবতা উল্লেখ করে বলেছেন যে, ধনতন্ত্রে (পুঁজিবাদ) ব্যক্তিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে সমাজকে উপেক্ষা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সমাজতন্ত্রে সমষ্টির স্বার্থকে বড় করে দেখা হয়, যা করতে গিয়ে ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে নির্মমভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে। ব্যক্তির কোন মূল্যই সেখানে স্বীকৃত নয়।[25] ইসলাম এই উভয় চরমপন্থার পরিবর্তে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছে। একদিকে ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকার করেছে, অপরদিকে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর সামাজিক দায়বদ্ধতার শৃঙ্খলও পরিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيَامًا ‘নির্বোধদের হাতে তোমাদের সম্পদ তুলে দিও না, যা আল্লাহ তোমাদের জীবনধারণের উপকরণ করেছেন’ (নিসা ৪/৫)।
এই আয়াতে আল্লাহ ‘তোমাদের সম্পদ’ বলে ব্যক্তিমালিকানাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আবার বলেছেন, ‘আল্লাহ সম্পদকে তোমাদের জীবনধারণের উপকরণ করেছেন’। অর্থাৎ সম্পদের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ। আর মানুষ আমানতদার মাত্র।
এই দ্বৈত সত্যই ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের মর্মকথা। এভাবে ইসলামী অর্থব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ উভয় চরম থেকেই মুক্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ।[26]
ঘ. রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব :
মার্কস চেয়েছিলেন রাষ্ট্র হবে সম্পদের একচেটিয়া মালিক। কিন্তু ইসলাম বলে রাষ্ট্র সম্পদের মালিক নয়; বরং রক্ষক ও সুষম বণ্টনকারী। এই পার্থক্যটি মৌলিক। ইসলামী শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হ’ল পরকালের ভয় বা আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি। যেমন খলীফা ওমর (রাঃ) বলেছিলেন,لَوْ مَاتَتْ شَاةٌ عَلَى شَطِّ الْفُرَاتِ ضَائِعَةً لَخَشِيتُ أَنْ يَسْأَلَنِي اللهُ عَنْهَا، ‘যদি ফুরাত নদীর তীরে একটি বকরিও অযত্নে মারা যায়, তাহ’লে আমি ভয় পাই আল্লাহ আমাকে তার জন্য জিজ্ঞাসা করবেন’।[27] এই উক্তি কোন মার্কসবাদী শাসকের মুখ থেকে আসেনি। এসেছে সেই শাসকের কাছ থেকে যিনি জানতেন, কিবয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষের কর্মের ব্যাপারে আল্লাহর সামনে জবাব দিতে হবে। ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাস নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সামাজিক নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামী রাষ্ট্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, যা কোন অর্থনৈতিক বিপ্লবের ফসল নয়, বরং তাওহীদভিত্তিক জবাবদিহিতার প্রায়োগিক রূপ।
ঙ. মানুষের সার্বজনীন মানবিক মর্যাদা সুরক্ষা :
মার্কসের সবচেয়ে বড় দার্শনিক ভুল ছিল, মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক প্রাণী হিসাবে দেখা। তার তত্ত্বে মানুষ মূলত homo economicus, যা উৎপাদন করে, ভোগ করে আর শ্রেণীস্বার্থে লড়াই করে। তার নৈতিকতা, ধর্মবোধ, ভালোবাসা, আত্মত্যাগ এ সবকিছুই অর্থনৈতিক সম্পর্কের ছায়া মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ইসলামবিরোধী নয়, বিজ্ঞানসম্মতও নয়।
আব্রাহাম মাসলো তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মানুষের চাহিদা পাঁচটি স্তরে বিন্যস্ত। এর মধ্যে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান সবচেয়ে নিম্নস্তর মাত্র। উপরের স্তরে রয়েছে নিরাপত্তা, সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা এবং সর্বোচ্চে রয়েছে self-actualization তথা নিজের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা উপলব্ধির চাহিদা। মার্কস কেবল প্রথম স্তরকে সব মনে করেছেন, মাসলো দেখিয়েছেন এটি শুরুমাত্র।[28] অন্যদিকে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দী মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্র¨vঙ্কল তাঁর Man's Search for Meaning (১৯৪৬) গ্রন্থে লিখেছেন যে, যে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পায়, সে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিও সহ্য করতে পারে। জীবনের অর্থহীনতা মানুষকে শারীরিক কষ্টের চেয়ে বেশী ভেঙে দেয়।[29]
মানুষ কেবল অন্যান্য পশুর মত বস্ত্তগত চাহিদার দাস নয়, বরং সে এক ভাবাবেগসম্পন্ন বুদ্ধিমান প্রাণী, যে পৃথিবীর অন্য সকল সৃষ্টি থেকে আলাদা। ইসলাম এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে চৌদ্দশত বছর আগেই। ইসলামী আদর্শে অর্থনৈতিক বিষয়ের পরিবর্তে নৈতিক মূল্যবোধকেই জীবনের মৌলিক বিষয় মনে করা হয়।[30]
এজন্য ইসলাম বলেছে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর খলীফা। আল্লাহ বলেন, وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً، ‘স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি’ (বাক্বারাহ ২/৩০)।
এই একটি আয়াত মার্কসের মানব-দর্শনকে সম্পূর্ণরূপে চ্যালেঞ্জ করে। মার্কসের মতে, মানুষ হ’ল স্রেফ উৎপাদন-সম্পর্কের ফলাফল এবং ইতিহাসের বস্ত্তগত পণ্য। আর ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি এবং পৃথিবীতে তাঁর আমানতের বাহক। এই একটি দর্শনের মধ্যে রয়েছে মানুষের মর্যাদা, দায়িত্ব এবং স্বাধীনতা, তিনটি একসাথে।
মার্কস মানুষকে শ্রেণীর প্রতিনিধি বানিয়েছেন আর ইসলাম মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি বানিয়েছে। এই দুই বিশ্বদৃষ্টির পার্থক্যই নির্ধারণ করে দেয় যে, কোথায় গিয়ে শেষ হবে দু’টো ব্যবস্থার গতিপথ।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا ‘আমি বনী আদমকে সম্মানিত করেছি, তাদের স্থলে ও জলে বহন করেছি, তাদের উত্তম জীবিকা দিয়েছি এবং আমার অনেক সৃষ্টির উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৭০)।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ মানুষকে ‘বনু আদম’ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে সমগ্র মানবজাতিই আল্লাহর কাছে মর্যাদাসম্পন্ন। এটি মানব-মর্যাদার সবচেয়ে সার্বজনীন ঘোষণা যা ইতিহাস দেখেছে। অন্যদিকে মার্কসের দর্শনে মানুষের মর্যাদা শ্রেণীনির্ভর। অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণী মর্যাদা পাবে, তবে বিপ্লবের পর। অথচ ইসলামে মানুষের মর্যাদা সৃষ্টিগতই। জন্মের সাথেই প্রতিটি মানুষ মর্যাদাসম্পন্ন। তার জন্য কোন বিপ্লব বা রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের দরকার হয় না।
আল্লাহ মানুষের সৃষ্টির উৎস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ، ‘অতঃপর যখন আমি তাকে পূর্ণরূপ দেব এবং তাতে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার সামনে সিজদায় পড়ে যেও’ (হিজর ১৫/২৯)। এখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমার রূহ থেকে’। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে এমন কিছু আছে যা গভীরভাবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। এই রূহই মানুষকে পশুর চেয়ে আলাদা করে। মার্কস মানুষকে এমন এক উন্নত পশু বানিয়েছেন, যে হ’ল আর্থিক চাহিদার দাস। আর ইসলাম বলছে, মানুষের মধ্যে এমন একটি সত্তা আছে, যা কেবল আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়েই পূর্ণতা পায়। এই কারণেই আল্লাহ বলেছেন, أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্ত হয়’ (রাদ ১৩/২৮)।
মার্কস মনে করেছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তিই মানুষের চূড়ান্ত মুক্তি। কিন্তু সোভিয়েত সমাজে অর্থনৈতিক ‘সাম্য’ আনার পরেও মানুষ মদ্যপান, বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যায় বিশ্বের শীর্ষে চলে গেল। কারণ সব চাহিদা পূরণ হ’লেও তার রূহের তৃষ্ণা পূরণ হয়নি।
রাসূল (ছা.) বলেছেন, كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ ‘প্রতিটি শিশু ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে’।[31] এই ফিতরাত হ’ল মানুষের স্বাভাবিক সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য, যেখানে সত্যের প্রতি আকর্ষণ, ন্যায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং আল্লাহকে জানার স্বাভাবিক তাড়না রয়েছে। মার্কস বলেছেন, মানুষের নৈতিকতা, সে যে শ্রেণীর তা-ই নির্ধারণ করে। আর ইসলাম বলছে মানুষের নৈতিকতা শ্রেণীর আগে থেকেই বিদ্যমান। এই নৈতিক বৈশিষ্ট্যই তাকে সত্য ও ন্যায়ের দিকে টানে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ ডোনাল্ড ব্রাউন Human Universals (১৯৯১) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, পৃথিবীর সকল সংস্কৃতিতে কিছু নৈতিক সার্বজনীনতা (moral universals) বিদ্যমান। যেমন ন্যায়বিচারের ধারণা, পারিবারিক বন্ধন, সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা ইত্যাদি।[32] এগুলো কোন অর্থনৈতিক সম্পর্কের ফল নয়; বরং এর নামই ফিতরাত।
মার্কস বলেছিলেন, পুঁজিবাদ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিনণতার নিরাময় তিনি খুঁজেছিলেন শ্রেণীহীন সমাজে। অপরদিকে ইসলাম এই একই বিচিছন্নতার গভীরতর কারণ চিহ্নিত করেছে, আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্নতা। যখন মানুষ জানে তার একজন স্রষ্টা রয়েছে এবং প্রতিটি মানুষই বনু আদম হিসাবে সম্মানিত, তখন সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে না, সে তখন অন্যকে শ্রেণীর শত্রু নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্টি হিসাবে দেখে। ফলে মানুষে মানুষে বিরোধ কমে যায় এবং বিচ্ছিন্নতা দূরীভূত হয়।
চ. তাওহীদই হ’ল ন্যায়বিচারের চূড়ান্তু ভিত্তি :
মার্কসের তত্ত্বে ন্যায়বিচারের কোন পরম ভিত্তি নেই। দিন শেষে যে কোন ব্যাপারে ন্যায় ও অন্যায় নির্ধারিত হয় শ্রেণীস্বার্থ দিয়ে। তাহ’লে প্রশ্ন ওঠে, কোন মানদন্ডে বলা যাবে যে, অর্থনৈতিক শোষণ ‘অন্যায়’? মার্কসের নিজের বস্ত্তবাদী নিয়মেই এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
ইসলাম এই শূন্যতা পূরণ করে তাওহীদ দিয়ে। আল্লাহ বলেন, إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়দের দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন’। এখানে ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) ও ‘ইহসান’ (সদাচার) নীতি দু’টির সমন্বয়ে ইসলামের সামাজিক আদর্শ গঠিত হয়। তাছাড়া মার্কসের ন্যায়বিচার শ্রেণীনির্ভর, তাই পরিবর্তনশীল। কিন্তু ইসলামের ন্যায়বিচার আল্লাহ-নির্ধারিত, তাই শাশ্বত। এর কোন পরিবর্তন নেই। সর্বযুগেই এটি বাস্তব। এটাই দু’টো ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য।
উপসংহার :
মার্কস মানুষে মানুষে শ্রেণীবৈষম্যের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ জাগিয়েছিলেন, তা অন্যায্য ছিল না। কিন্তু সমস্যার সমাধানে তার ধর্মহীন রাষ্ট্র, ব্যক্তি-মালিকানার বিলোপ কিংবা শ্রেণীসংগ্রামের দর্শন বাস্তবে আগমন করেছে এক নয়া স্বৈরতন্ত্রের রূপ নিয়ে। ইসলাম একই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, কিন্তু মানুষের ফিতরাত তথা স্বাভাবিক সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য ও চাহিদা এবং তার স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে। ইসলাম এনেছে যাকাত, উত্তরাধিকার, ওয়াকফের মত শাশ্বত বিধান। সেই সাথে সূদের মত যুলুমকে প্রতিরোধ করে শ্রমিকের পূর্ণ অধিকার রক্ষার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ইসলামের এই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হ’ল তাওহীদ, যে বিশ্বাস মানুষকে কোন রাষ্ট্র, দল বা শ্রেণীর কাছে মাথা নত করায় না। বরং সে মাথা নত করে সরাসরি মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে। তাঁর প্রেরিত বিধানের অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে চির মুক্তি ও সফলতার সনদ। সুতরাং এটাই ধ্রুব সত্য যে, মার্কস পুজিবাদের যে সমস্যাটি ধারণ করেছেন, সেই সমস্যার সমাধানে বস্ত্তবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র নয়, ইসলামই একমাত্র স্থায়ী ও মানবিক ব্যবস্থা। মানবজাতির প্রকৃত মুক্তির জন্য যে মধ্যমপন্থা ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান প্রয়োজন, তা একমাত্র ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই বিদ্যমান।
[1]. ড. আমীনুল ইসলাম, সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন (ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স, ৪র্থ প্রকাশ : ২০০১), পৃ. ৮৫-৮৭।
[2]. Karl Marx, Das Kapital (Moore, 1906), pdf/31.
[3]. M. Umar Chapra, Islam and the Economic Challenge (Leicester: The Islamic Foundation, 1992), pp. 202-215.
[4]. মুহাম্মাদ কুতুব, ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম (ঢাকা : বুক ফোরাম; ১ম প্রকাশ : ১৯৭৫) পৃ. ১৮৭।
[5]. সমকালীন পাশ্চাত্য দর্শন, পৃ. ৮৮-৯১।
[6]. ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম, পৃ. ১৮৪।
[7]. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, ইসলামের অর্থনীতি (ঢাকা : খায়রুন প্রকাশনী; ৫ম প্রকাশ : ১৯৯৪) পৃ. ১৩৩-১৩৪।
[8]. Karl Marx, Economic and Philosophic Manuscripts of 1844(Moscow : Marx-Engels Institute, 1932).
[9]. Karl Marx, A Contribution to the Critique of Hegel’s Philosophy of Right (Introduction) (Marx-Engels Collected Works (MECW), p. 3/175-76.
[10]. Karl Marx & F Engels, Manifesto of the Communist Party (1969 : In Selected works), p. 1/98–137).
[11]. R. Aron, The opium of the intellectuals. Secker & Warburg (Original work published 1955).
[12]. হাবীবুর রহমান, ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ (রাজশাহী : দি রাজশাহী স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন; ৪র্থ প্রকাশ : ২০০৫) পৃ. ৩১২।
[13]. R. Aron, The opium of the intellectuals. Secker & Warburg (Original work published 1955).
[14]. Jung Chang & Jon Halliday, Mao: The Unknown Story (London: Jonathan Cape, 2005), p. 456-460.
[15]. সালাহউদ্দীন, মৌলিক মানবাধিকার (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন; ২য় প্রকাশ : ২০০৭) পৃ. ৩০-৩৩।
[16]. R.J. Rummel, Death by Government: Genocide and Mass Murder Since 1900 (New Brunswick, NJ: Transaction Publishers, 1994), p. 4.
[17]. Anne Applebaum, Gulag: A History (New York: Doubleday, 2003), p. 578-580.
[18]. হাবীবুর রহমান, ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ, পৃ. ৩০০-৩০১।
[19]. Andrew Walder & Yang Su, The Cultural Revolution in the Countryside: Scope, Timing and Human Impact (The China Quarterly, No. 173; March 2003), p. 74-99.
[20]. Ben Kiernan, The Pol Pot Regime: Race, Power, and Genocide in Cambodia under the Khmer Rouge, 1975-1979 (New Haven: Yale University Press, 2008), p. 456-460.
[21]. Stéphane Courtois et al., The Black Book of Communism: Crimes, Terror, Repression (Cambridge, MA: Harvard University Press, 1999), p. 4.
[22]. মাওলানা হিফজুর রহমান, ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন; ২য় প্রকাশ : ১৯৯৮) পৃ. ৩৪০-৪৪।
[23]. ইবনু মাজাহ হা/২৪৪৩, সনদ ছহীহ।
[24]. বুখারী হা/২২২৭।
[25]. মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম, ইসলামের অর্থনীতি, পৃ. ১৫।
[26]. M. Umar Chapra, Islam and the Economic Challenge (Leicester: The Islamic Foundation, 1992), pp. 202-215.
[27]. হিলইয়াতুল আওলিয়া, পৃ. ১/৫৩।
[28]. Abraham Maslow, A Theory of Human Motivation (Psychological Review, 1943 : Vol. 50, No. 4), p. 370-396.
[29].Boston: Beacon Press, 1959; p. 104-105.
[30]. ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম, পৃ. ১৮৯-৯০।
[31]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ; মিশকাত হা/৯০।
[32]. Donald E. Brown, Human Universals (Philadelphia: Temple University Press, 1991), p. 130-141.