ছাত্রজীবন শেখার সময়। এই সংক্ষিপ্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে যে যত বেশী শিখতে পারে সে তার জীবনে তত বেশী এগিয়ে যায়। অনেক সময় আমরা অনেক বেশী পরিশ্রম করি। কিন্তু আমাদের ফলাফল আশানুরূপ হয় না। কারণ আমাদের পদ্ধতিগত কিছু ভুল রয়েছে। যেগুলো আমাদেরকে পিছিয়ে দেয়। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা লেখাপড়ার কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। আশা করি এই দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চললে আমাদের শিক্ষার্থীরা উন্নতির পথে আরো বেশী অগ্রগামী হবে ইনশাআল্লাহ।
বিষয়ের গুরুত্ব বোঝা : একজন শিক্ষার্থীকে জানতে হবে, কারিকুলাম তৈরি হয় সকলের জন্য। তবে এখানে যারা শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের সকলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একরকম হয় না। একই শ্রেণীর একজন ছাত্র হয়ত আলেম হবে। তার পাশেই বসা আরেকজন হবে ডাক্তার। তবে এখন তারা উভয়েই আরবী, ইংরেজী, গণিত সবকিছুই পড়ছে। এ অবস্থায় উভয়েই যদি সবগুলো বিষয় ১০০ নম্বরের বলে সবগুলোকে সমান গুরুত্ব দেয় তবে কেউই কিছু হ’তে পারবে না। এখানে যে আলেম হ’তে চায় তাকে অবশ্যই আরবীকে প্রাধান্য দিতে হবে। সবগুলো বিষয়ে ৪০ করে মার্কস আসলেও আরবীতে যেন ১০০ তে ৯৯ না হয়। এটা তাকে নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে যে ডাক্তার হ’তে চায় তার জন্যও অনুরূপ কথা।
আমাদের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ একটা সময় সবগুলো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে আসে। ফলে অধিকাংশ মেধাবীরা নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রফেশন নির্বাচনেও তারা হীনমন্যতায় ভোগে। এজন্য ছাত্রজীবনেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, কোনটি আমার এবং আমি কার। এক্ষেত্রে যে বিষয় পড়ে মনে হবে, আমার জন্য এই বিষয়টি ঠিক আছে, সেটার পেছনেই সময় দিতে হবে। যেন বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া যায়। অন্যথায় শেখা হবে সবকিছুই, তবে কোনটিই ভালভাবে হবে না। সুতরাং বিষয় নির্বাচন খুব গুরুত্বের সাথেই করতে হবে।
পড়ার জায়গা ও পদ্ধতি : পড়া যদি হয় বুঝ নির্ভর, তবে পড়ার স্থান যত নিরিবিলি হবে ততই ভাল। কারণ আমরা যখন কোন নতুন বিষয় বোঝার চেষ্টা করি তখন আমাদের মস্তিষ্কে তার একটা কাল্পনিক রূপ গঠন হ’তে থাকে। এর মাঝে যদি মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তবে অসমাপ্ত গঠিত রূপটি হারিয়ে যায়। এই বিষয়টি অনেকটা ইন্টারনেট থেকে কোন ফাইল ডাউনলোড করার মত। পরিপূর্ণ ডাউনলোড হওয়ার পূর্বে যদি কানেকশনে সমস্যা হয় তবে ডাউনলোড ফেইলড হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেটা আবার নতুনভাবে ডাউনলোড করতে হয়। এজন্য পড়ার স্থান অবশ্যই মনোযোগ বিনষ্টকারী সকল উপকরণ থেকে মুক্ত হ’তে হবে।
মুখস্থ পড়া আবার কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ পড়া মুখস্থ করার সময় আমাদের মস্তিষ্কে কোন কাল্পনিক রূপ গঠন হয় না। সরাসরি সেই পড়ার প্রতিচ্ছবিই অঙ্কিত হয়। এজন্য পড়া মুখস্থ করার সময় নিরবতা খুব বেশী প্রয়োজনীয় নয় বরং নিজের উচ্চারণ নিজের কানে শুনতে পাওয়ার গুরুত্বটাই বেশী। এজন্য আমরা হিফয বিভাগে দেখি, সবাই অনেক উচ্চ আওয়াযে পড়া মুখস্থ করে। তবে একজন মুখস্থকারীর পাশের জনের আওয়াযে কোন সমস্যা হয় না।
অনেক সময় পড়তে পড়তে আমাদের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। পড়লেও যেন পড়া হয় না। মনে হয়, পড়াগুলো কেমন যেন পিছলে যাচ্ছে। এই অবস্থায় আমরা অনেকেই জোর করে পড়ি। যা ঠিক নয়। এ অবস্থায় একটু বিরতি নিতে হবে। দশ মিনিটের জন্য রেস্ট নিতে হবে বা বাইরে একটু হাঁটাহাটি করতে হবে। আমাদের মনে হয়, গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রতি ঘন্টায় বিরতি নেয়া উত্তম। তাহ’লে তুলনামূলক বেশী লেখাপড়া করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সাবজেক্ট পরিবর্তন করে পড়াও বেশ ফলপ্রসূ। খেয়াল রাখতে হবে, একটানা কোন সাবজেক্ট এত বেশী পড়া যাবে না যেন মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয় বা পড়ায় বিরক্তি চলে আসে।
তাহক্বীকী মেজায : ছাত্রজীবনে তাহক্বীক্বী মেজায থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিটি শব্দ বুঝে পড়ার অভ্যাস যদি না থাকে তবে খুব বেশী ইলমী যোগ্যতা আসে না। হয়ত গলার জোরে অনেক কিছু বলা যায় তবে কোনকিছু নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার শক্তি অর্জিত হয় না। তবে এই মেজায একদিনে তৈরি হবে না। দিনে দিনে নিজের মস্তিষ্ককে তৈরি করতে হবে। তাকে এই ধরণের কাজ দিয়ে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। আমরা এখানে দুয়েকটি পদ্ধতি আলোচনা করব। যে পদ্ধতিগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে কাজে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আমরা যা কিছু পড়ব, যা কিছু নতুন জানব প্রতিটি ইলমকে ‘কেন’ দ্বারা প্রশ্ন করব। এর মাধ্যমে ইলম বৃদ্ধি হবে। যেমন, শিক্ষক বললেন, আরবী শব্দসমূহ তিন ভাগে বিভক্ত। এটি একটি নতুন জ্ঞান। তবে আমি যখন বলব, কেন তিন ভাগ করা হ’ল? চার ভাগ নয় কেন? তখন এর উত্তরে আমার আরেকটি জ্ঞান অর্জিত হবে। এটা হ’ল কোন বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করার প্রথম ধাপ। এক্ষেত্রে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে লজ্জা পায়। তাদের জানতে হবে, প্রশ্ন করা কোন লজ্জার বিষয় নয় বরং যে কোন বিষয়ে শিক্ষককে প্রশ্ন করাই মুহাক্কিক ছাত্রের আলামত। তবে অবশ্যই তা জানার জন্য হ’তে হবে। অন্যথায় শিক্ষকের সাথে বে-আদবী হবে।
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা, আরবী, ইংরেজীর সাথে উর্দূও পড়ানো হয়। আমরা যখন প্রাথমিক লেভেল পার করেছি, মোটামুটি নাহু পড়া হয়েছে সে সময় থেকেই যে কোন নাম শুনলে বলে দিতে পারতাম এটা কোন ভাষার শব্দ। নামের মাঝে যে মুরাক্কাব হয়েছে এটা কোন প্রকারের মুরাক্কাব। যে কোন প্রতিষ্ঠানের নাম শোনা মাত্রই মাথায় খট করে উঠত যে, মুরাক্কাব ছহীহ হয়েছে কি-না! এটা তাহক্বীক্বের আরেকটি ধাপ। কোন শিক্ষার্থী যদি আজ থেকেই মনস্থ করে, সে তার শ্রেণীর সকল ছাত্রের নাম, তার দেখা সকল প্রতিষ্ঠানের নাম, সংস্থার নাম ইত্যাদি তাহক্বীক্ব করবে এবং সে এটা নিয়ে চর্চা শুরু করে। তবে আশা করা যায় সে ধীরে ধীরে তাহক্বীক্বী মেজায লাভ করতে পারবে।
এর পরের ধাপ হ’ল, আমরা যখন ক্লাসে পাঠ্যপুস্তক বা বাইরের কোন বই পড়তাম তখন আমাদের মস্তিষ্ককে এভাবে সেটাপ দিতাম যে, আমি যে পড়াটা আজকে পড়ছি এখানে লেখক একটি বড় ধরণের ভুল করেছেন। এটা আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। কিছুক্ষণের জন্য লেখককে আমার প্রতিপক্ষ বানিয়ে নিতাম। ফলে আমরা প্রতিটি শব্দ খুঁটে খুঁটে পড়তাম। খুব খেয়াল রাখতাম, লেখকের কোন কথা তার আগের কোন কথার সাথে কোনভাবে সাংঘর্ষিক হ’ল কি না। একই বক্তব্য যখন দ্বিতীয়বার আসত তখন সর্বদা আগের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখতাম। কখনো দেখা যেত আমাদের শিক্ষকদেরই আলোচনা দু’রকম হয়ে যেত। তখন আমরা এই বিষয়গুলোতে প্রশ্ন করতাম। অনেক শিক্ষক এমন প্রশ্নতে বিরক্ত হ’তেন। তবে জ্ঞান অর্জনের স্বার্থে তাদের বিরক্তিকে আমরা তেমন কিছু মনে করতাম না।
নোট পদ্ধতি : পড়তে বসে আমরা অনেক পড়ি। তবে যে সমস্যাটা হয় তা হ’ল, এক পৃষ্ঠা পড়ার পরে যখন পরের পৃষ্ঠায় যাই তখন আগের পৃষ্ঠায় কী পড়েছি তা আর মাথায় থাকে না। এজন্য আমার একজন শিক্ষক বলতেন, ক্লাসে হাযিরা না নিলে যেমন ছাত্ররা ফাঁকি দেয় তেমনই পড়তে বসে পড়ার হাযিরা না নিলে পড়াও ফাঁকি দেয়। আমি যখন তৃতীয় পৃষ্ঠা পড়ছি তখন আমাকে দেখতে হবে, প্রথম দুই পৃষ্ঠাতে আমি যা পড়েছি সে পড়াগুলো আছে নাকি হারিয়ে গেছে। যদি সেগুলো হারিয়ে যায় তবে সামনে পড়ে তেমন লাভ নেই। পড়া সর্বদা শক্তভাবে ধরে রাখতে হবে। এজন্য সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হ’ল প্রতিটি আলোচনা পড়ার পরে সেখান থেকে নোট রাখা। অর্থাৎ আমি এই পাঠ পড়ে কি বুঝলাম, সেটা দু’এক লাইনে লিখে ফেলা। এই পদ্ধতি বেশ ফলপ্রসূ।
আমরা শুরুর দিকে সব বিষয়ের জন্য আলাদা নোটখাতা রাখতাম। তবে নোটখাতা মাঝে মাঝে হারিয়ে যেত। তখন খুব কষ্ট লাগত। তাই নোট যেন না হারায় তাই আমরা কিতাবের মাঝেই নোট করতাম। বছরের শুরুতে পাঠ্যবইগুলো কিনে প্রতিটি বইয়ের শেষে অতিরিক্ত পনের থেকে বিশ পৃষ্ঠা যুক্ত করে বাইন্ডিং করে নিতাম। সেখানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় নোট করে রাখতাম। এই পদ্ধতিতে পড়ার কারণে পরীক্ষার আগে আমাদেরকে অতিরিক্ত পড়ার চাপ নিতে হ’ত না। বই সংযুক্ত নোটের সাহায্যে খুব অল্প সময়েই কিতাব আয়ত্ব হয়ে যেত।
নোট করার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তা হ’ল পড়াকে বিভিন্ন কৌশলে সংক্ষিপ্তকরণের ওপর দক্ষতা থাকা। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলে হয়ত বোঝা যাবে। যেমন, ইলমুছ ছীগায় মু‘তালের অনেকগুলো মূলনীতি রয়েছে। এই সবগুলো মূলনীতি সর্বদা মুখস্থ রাখা কঠিন বিষয়। পরীক্ষাতে লেখার ক্ষেত্রেও দেখা যায় দুয়েকটা ছাড়া পড়ে যায়। আবার একই মূলনীতি ক্লাসে মুখস্থ করতে হয়, আরেকদফা পরীক্ষার আগে মুখস্থ করতে হয়। এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য আমরা সবগুলো মূলনীতির উদাহরণের শব্দগুলো দিয়ে একটি বাক্য বানিয়ে ফেলতাম। সেটা মুখস্থ করে নিতাম। আমাদের জানা থাকত, এই বাক্যের প্রতিটি শব্দে একটি করে মূলনীতি রয়েছে। তখন আর এগুলো মুখস্থ রাখা কঠিন মনে হ’ত না।
আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে, একই পরিশ্রম যেন আমাকে বার বার করতে না হয়। চর্বিত চর্বণ আমি যতক্ষণ করব ততক্ষণে আমি আরেকটি বিষয় শিখতে পারব। আর এজন্য প্রতিটি বিষয়ের নিজস্ব নোট থাকা খুব দরকার। অবশ্য নোটে খুব ছোট হরফে লিখতে হবে, যেন অল্প জায়গায় অনেক বেশী তথ্য রাখা যায়। তাহ’লে একটি কিতাব আয়ত্ব করতে যেখানে চার থেকে পাঁচদিন সময় লেগে যায় সেখানে নোট থেকে একটি কিতাব মাত্র কয়েকঘন্টায় আয়ত্ব করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ! এজন্য আমরা যদি ভাল শিক্ষার্থী হ’তে চাই তবে এমন একটি নোট আমাদের জন্য অপরিহার্য, যেখানে খুব কম কথায় পুরো কিতাবের মাফহূম লেখা থাকবে।
তাকরারের গুরুত্ব : ছাত্রজীবনে তাকরারের গুরুত্ব অনেক বেশী। তাকরারের অর্থ হ’ল, ক্লাসে প্রতিদিন যতটুকু পড়া হবে ততটুকু পড়া গ্রুপ স্টাডির মত করে আবার ছাত্রদের মাঝে পর্যালোচনা করা। এখানে একজন শিক্ষার্থী তাকরার পরিচালনা করবে। যে শিক্ষকের মত করেই ছাত্রদেরকে পড়াগুলো বোঝাবে। আমাদের অনেক মেধাবী ছাত্র তাকরার থেকে অনিহা প্রকাশ করে। তারা মনে করে, আমার তো পড়া হয়ে গেছে। আমি কেন অন্যদের পেছনে সময় নষ্ট করব! তারা হয়ত জানে না যে, তাকরার এমন একটি ব্যবসা, যেখানে উভয় পক্ষ লাভবান হয়। বেশী লাভবান হয় যে তাকরার পরিচালনা করে।
যে তাকরার করায় তাকে কখনো পরীক্ষার প্রস্ত্ততি নিতে হয় না। কারণ তার মস্তিষ্কে পড়াগুলো খুব গভীরভাবে গেঁথে যায়। একটি কিতাবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার আয়ত্বে থাকে। সে কখনোই এই পড়াগুলো ভুলে যায় না। আরো বড় প্রাপ্য হ’ল, যে কোন কঠিন বিষয় খুব সহজ করে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর যোগ্যতা অর্জিত হয়। আমাদের অনেকেই পড়ালেখা শেষে শিক্ষক প্রশিক্ষণে যায়। কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণে কখনোই সেই বিষয়গুলো শিখতে পারে না, যা তাকরারের মাধ্যমে শেখা সম্ভব। কারণ প্রশিক্ষণে কেবল কিছু মূলনীতি শেখা যায়। যে মূলনীতিগুলো কোথাও কার্যকর, কোথাও অচল। তবে দক্ষ শিক্ষক সত্ত্বা তাকরার থেকে গড়ে ওঠার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
বই নির্বাচন পদ্ধতি : কারো কাছে গিয়ে বলা যে, আমার জন্য একটি ভাল বই নির্বাচন করুন। এটা কখনোই বই নির্বাচনের আদর্শ পদ্ধতি হ’তে পারে না। কারণ আমার কোন বই পড়া প্রয়োজন এটা আমিই ভাল জানি। আমার দুর্বলতা সক্ষমতা আমিই জানি। এক্ষেত্রে আমি যে বিষয়গুলো জানিনা সে বিষয়গুলোর একটি লিস্ট আমার কাছে থাকতে হবে। আমার একটি খাতায় আমি ক্রমিক নম্বর দিয়ে লিখে রাখব, আমি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, নারীবাদ, পুঁজিবাদ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর যথেষ্ট জ্ঞান রাখি না। এখন এই বিষয়গুলোর ওপরে আমাকে বই পড়তে হবে। আমি একটি একটি করে অজ্ঞতা দূর করব।
বই পড়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই নোট নিতে হবে। বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো মার্ক করতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী বইয়ে দাগ দিতে চায় না। তারা এটাকে কিতাবের আদব মনে করে। তবে এটা ঠিক নয়। কারণ বই ছাপানোই হয়েছে এখান থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য। নতুন রাখা বা সাজিয়ে রাখার জন্য নয়। এখন জ্ঞান আহরণ করার স্বার্থে সেখানে যদি কিছু নোট করতে হয় বা দাগ দিতে হয় তবে সেটা কোন বে-আদবী হবে না ইনশাআল্লাহ। বরং এটা কিতাবের যথাযথ ব্যবহার বলেই গণ্য হবে।
ছাত্রজীবনে আমি কোন কিতাবের নোট কিনিনি। যে কিতাবগুলো দুর্বোধ্য মনে হ’ত সেগুলোর মূল কিতাব আমি দুই কপি কিনতাম। একটি নিয়ে আমি দারসে বসতাম। সেটা ফ্রেশ থাকত। আরেকটি থাকত যেটা আমি নোট হিসাবে ব্যবহার করতাম। শিক্ষক যখন পড়াতেন তখন সেখানে হারাকাত দিয়ে নিতাম। শব্দের অর্থ লিখে নিতাম। বিভিন্ন নোট আমি পৃষ্ঠার মধ্যেই করতাম। আলহামদুলিল্লাহ এই পদ্ধতিতেও আমি বেশ উপকৃত হয়েছি। সুতরাং আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে, কোন পদ্ধতি অবলম্বন করলে আমি আরেকটু বেশী উপকৃত হব। এটা কোন দোষের বিষয় নয়।
পরীক্ষার প্রস্ত্ততি : আমাদের লক্ষ্য কখনোই পরীক্ষায় শুধু ভাল নম্বর পাওয়া নয়। আমরা জ্ঞানী হ’তে চাই। আর জ্ঞানী হ’তে হ’লে প্রতিটি বইয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে। কারণ এখানে কোনকিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। হয়ত সেটা পরীক্ষায় আসবে না, তবে জীবনে কখনো তো সেটা অবশ্যই প্রয়োজন হবে। সে লক্ষ্যেই আমাদেরকে শিখতে হবে। আমাকে চিন্তা করতে হবে, আমি ভবিষ্যতে এই সকল বিষয়ে কিতাব সংকলন করব ইনশাআল্লাহ। তখন যেন আমার যে কোন মন্তব্যে ইলমী ভ্রষ্টতা সৃষ্টি না হয়।
আমি বিশেষজ্ঞ হব। আমার আয়ত্বাধীন বিষয়ে আমি যদি কোন মন্তব্য করি তবে আমার মন্তব্যে যেন সূঁচ প্রবেশ করানোর কোন সুযোগ না থাকে। সে বিষয়ে কেউ যদি ১০০ কিতাব অধ্যয়ন করে আমার মন্তব্যে কলম ধরতে আসে তবুও যেন সে ব্যর্থ হয়। আর এই পরিস্থিতি তখনই সৃষ্টি হবে যখন আমিও মন্তব্য করার পূর্বে সে বিষয়ে বহু কিতাব অধ্যয়ন করেই মন্তব্য করব। তাই পরীক্ষার সিলেবাস কখনো মুখ্য নয়, বিষয়ভিত্তিক পূর্ণ জ্ঞানার্জনই মুখ্য। নির্দিষ্ট বিষয়ে পান্ডিত্ব অর্জন করাই হবে আমার পরীক্ষার প্রস্ত্ততি।
পরীক্ষার জন্য বিশেষ তাকরার : প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের ছাত্রদের জন্য এই পদ্ধতি নয়। এটা উচ্চ-মাধমিক বা তার ওপরে যারা পড়াশোনা করে তাদের জন্য। অনেক সময় আমাদের পড়া এতটাই বেশী হয়ে যায় যে, আমরা সব পড়া কভার করে উঠতে পারি না। যখন দেখা যায়, আমি একদিনে ত্রিশ পৃষ্ঠা পড়ার সক্ষমতা রাখি তবে আমাকে প্রতিদিন একশ পৃষ্ঠা পড়তে হবে। তখন আমরা চারজন করে স্টাডি গ্রুপ তৈরি করতাম। প্রতিদিন সবাই ২৫ পৃষ্ঠা কর ভাগ করে নিতাম। সারাদিন পড়ার পরে রাতে চারজন তাকরারে বসতাম। সবাই নিজ ২৫ পৃষ্ঠায় কী কী পড়েছে, কোনগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, কী কী নোট করেছে সেগুলো উপস্থাপন করত। আমরা প্রয়োজনভেদে এগুলো নোট করে নিতাম। এভাবেই আমরা বিশেষ তাকরারের মাধ্যমে একে অপরের কাছে উপকৃত হ’তাম।
শেষ কথা : আমি একজন ছাত্রকে দেখেছি, যে অপ্রসিদ্ধ একটি মাদ্রাসা থেকে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। তাকে বলা হয়েছিল, বোর্ড পরীক্ষায় তো অমুক অমুক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা রাজত্ব করে। তারাই মেধা তালিকা দখলে রাখে। তখন সে একটি চিরকুটে লিখেছিল, আগামী পরীক্ষার জন্য তোমরা তোমাদের প্রতিযোগীদের প্রস্ত্তত কর, আমি আমার শেষ রাতের রোনাজারী নিয়ে প্রস্ত্তত হচ্ছি। এই চিরকুট সে তার পড়ার টেবিলে আঠা দিয়ে আটকে রেখেছিল। তারপর থেকে সে দিন-রাত সমানভাবে পরিশ্রম করেছে। আমি তাকে সেই পরীক্ষায় বোর্ড স্ট্যান্ড করতে দেখেছি।
সুতরাং আমরা এখানে সে বিষয়গুলো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি যেগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরিশ্রম অনুযায়ী ফলাফল প্রাপ্ত হবে ইনশাআল্লাহ। এগুলো কোন ইসমে আযম নয় বা কোন ঝাড়ফুঁক নয় যে, বিনা পরিশ্রমেই ফল পাওয়া যাবে। এই সবকিছু নিয়ম মেনে পরিশ্রম করার পরেও হয়ত ফলাফল পাওয়া যাবে না, যদি আল্লাহ না চান। আবার কোন পরিশ্রম না করেও অনেককিছু পাওয়া যাবে, যদি আল্লাহ চান। এগুলো শুধু অসীলা মাত্র! তাই একজন তালিবুল ইলমকে বিশ্বাস রাখতে হবে, আসমান থেকেই সবকিছু নির্ধারিত হয়। তাকে সবকিছু সেখানেই চাইতে হবে। একজন তালিবুল ইলমকে জানতে হবে, আল্লাহ সবাইকে একরকম মেধা দান করেননি। যতই কৌশল অবলম্বন করা হোক, সবাই যে পড়ালেখায় ভাল করবে এমনও নয়। তবে শেষ পর্যন্ত তারাই জীবনযুদ্ধে এগিয়ে থাকবে যাদের শেষ রাতে ছালাতে দাঁড়ানোর অভ্যাস আছে। জীবনের সকল সমস্যা আল্লাহর দরবারে সোপর্দ করার মানসিকতা আছে। পৃথিবীর কোন প্রতিকূল পরিবেশ তাদেরকে পেছনে ফেলতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।