(আগস্ট’২৫ সংখ্যার পর)
২. আল্লাহর বড়ত্ব ও পরিচয় জানা :
মহান আল্লাহর বড়ত্ব, শক্তিমত্তা, নিরংকুশ ক্ষমতা ও একত্ববাদের জ্ঞান রিয়া থেকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, وَمَنْ عَرَفَ اللهَ لَمْ يُرَاء ‘যে সত্যিকারার্থে আল্লাহকে চিনতে পেরেছে, সে রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য কাজ করে না’।[2] হাসান আল-বাছরী (রহঃ) বলেন, السُّجُودُ يُذْهِبُ بِالْكِبْرِ، وَالتَّوْحِيدُ يُذْهِبُ بِالرِّيَاءِ ‘সিজদা অহংকার দূর করে আর তাওহীদ রিয়া দূর করে’।[3] সুতরাং বান্দা যখন জানতে পারবে, একমাত্র মহান আল্লাহই মানুষের উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখেন, তিনিই বান্দাকে সম্মানিত ও অসম্মানিত করেন, রিযিকের হ্রাস-বৃদ্ধি করেন, তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। বান্দা যখন বিশ্বাস করবে যে,اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ، ‘হে আল্লাহ! আপনি যা দিতে চান, তা রোধ করার কেউ নেই এবং আপনি যা রোধ করেন, তা দেওয়ার কেউ নেই। কোন সম্পদশালী ব্যক্তির সম্পদ কোন উপকার করতে পারে না আপনার রহমত ব্যতীত’।[4] তখন সে তার অন্তর থেকে মানুষের ভয়কে দূরে নিক্ষেপ করবে। অনুরূপভাবে বান্দা যখন জানতে পারবে যে, আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা, তিনি চোখের বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্তরের গোপন খবর জানেন, তখন সে লোক দেখানোর প্রবণতা পরিহার করবে এবং নিজেকে ইহসানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। ইহসান হ’ল-أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ، ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে কর যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও তবে এই বিশ্বাস রেখ যে, নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন’।[5]
কোন বান্দা যখন অবগত হবে এবং জানতে পারবে যে, একমাত্র আল্লাহই ইবাদতের যোগ্য, তখন তার অন্তরে আল্লাহর ভয়, বড়ত্ব ও ইখলাছের বীজ বপিত হবে এবং রিয়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। ইবনু কুদামা মাকবদেসীর ভাষায়-فَإِذَا تَقَرَّرَ هٰذَا فِي نَفْسِهِ، فَتَرَتْ رَغْبَتُهُ فِي الرِّيَاءِ، وَأَقْبَلَ عَلَى اللَّهِ بِقَلْبِهِ، فَإِنَّ الْعَاقِلَ لَا يَرْغَبُ فِيمَا يَضُرُّهُ وَيَقِلُّ نَفْعُهُ، ‘যখন এই ভাবনা তার অন্তরে দৃঢ়ভাবে স্থির হয়ে যায়, তখন লৌকিকতার প্রতি তার আগ্রহ কমে যায়। সে একনিষ্ঠ মনে আল্লাহ তা‘আলার অভিমুখী হয়। কেননা বুদ্ধিমান কখনো ক্ষতিকর এবং তুলনামূলক কম উপকারী বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হয় না’।[6]
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,وَمَنْ عَرَفَ اللهَ أَخْلَصَ لَهُ أَعْمَالَهُ وَأَقْوَالَهُ، وَعَطَاءَهُ وَمَنْعَهُ، وَحُبَّهُ وَبُغْضَهُ. وَلَا يُعَامِلُ أَحَدًا مِنَ الْخَلْقِ دُونَ اللهَ إِلَّا لِجَهْلِهِ بِاللهِ وَجَهْلِهِ بِالْخَلْقِ، وَإِلَّا فَإِذَا عَرَفَ اللهَ وَعَرَفَ النَّاسَ آثَرَ مُعَامَلَةَ اللهَ عَلَى مُعَامَلَتِهِمْ، ‘যে আল্লাহর সত্যিকার পরিচয় লাভ করেছে, সে তার কথা, কাজ, দান, বিরত থাকা, ভালোবাসা ও ঘৃণা সবকিছুই আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠভাবে সম্পাদন করে। স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই মানুষ স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির সাথে লেনদেন করে। নচেৎ যদি সে আল্লাহ ও মানুষকে সঠিকভাবে চিনত, তবে সে মানুষের সাথে লেনদেনের চেয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ককেই অগ্রাধিকার দিত’।[7]
৩. গোপন আমল :
লৌকিকতা দূর করার মহৌষধ হচ্ছে নিজের আমলকে গোপন করা। ইবনু কুদামা মাকবদেসী যথার্থই বলেছেন,وَمِنَ الدَّوَاءِ النَّافِعِ أَنْ يُعَوِّدَ نَفْسَهُ إِخْفَاءَ الْعِبَادَاتِ، وَإِغْلَاقَ الْأَبْوَابِ دُونَهَا، كَمَا تُغْلَقُ الْأَبْوَابُ دُونَ الْفَوَاحِشِ، فَإِنَّهُ لَا دَوَاءَ لِلرِّيَاءِ مِثْلَ إِخْفَاءِ الْعَمَلِ، ‘ইবাদত গোপন করার ব্যাপারে নিজের নফসকে অভ্যস্ত করা এবং সেগুলোর উপর দরজা বন্ধ রাখা রিয়া দূর করার একটি উপকারী ঔষধ। যেমনভাবে সকল অশ্লীলতার দরজা বন্ধ রাখা হয়। কারণ লৌকিকতার চিকিৎসায় আমল গোপন করার মতো কার্যকর কোন ঔষধ নেই’।[8]
গোপনে ও লোকচক্ষুর অন্তরালে অধিক পরিমাণে নেকীর কাজ এবং ইবাদত করা রিয়া থেকে বাঁচতে সহায়তা করে। যেমন- তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করা, গোপনে দান-ছাদাক্বা করা, নিভৃতে-নির্জনে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা, নফল ছালাত বাড়ীতে আদায় করা, অনুপস্থিত মুসলিম ভাইয়ের জন্য দো‘আ করা ইত্যাদি। রাসূল (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আল্লাহভীরু, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও নীরবে-নিভৃতে বসবাসকারী বান্দাকে ভালোবাসেন’।[9] গোপনে দান করা সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنْ تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ وَإِنْ تُخْفُوْهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ، ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান কর, তবে তা কতই না উত্তম! আর যদি তা গোপনে কর ও অভাবীদের প্রদান কর, তবে তোমাদের জন্য সেটাই উত্তম’ (বাক্বারাহ ২/২৭১)।
এখানে প্রকাশ্যে দানের উপর গোপনে দানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রকাশ্যে দান করলে অনেক সময় দানশীল ভাবার ব্যাধি দাতার অন্তরকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। কিন্তু গোপনে দান করলে রিয়ার ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকা যায়। তাছাড়া ‘গোপন দান আল্লাহর ক্রোধকে প্রশমিত করে’।[10] গোপনে দানকারী ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় লাভ করবে।[11] এমনকি গোপনে নির্জনে নফল ছালাত আদায় প্রকাশ্যে মানুষের সামনে আদায়ের চেয়ে পঁচিশবার আদায়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ।[12]
৪. মুখলিছ ও মুত্তাক্বী বান্দাদের সাহচর্য লাভ :
সৎ সঙ্গ মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদীছে সৎ সঙ্গীকে সুগন্ধি বিক্রেতার সাথে তুলনা করা হয়েছে।[13] সেজন্য আমাদের কর্তব্য হ’ল, সর্বদা সাধ্যানুযায়ী মুখলিছ ও মুত্তাকবী তথা একনিষ্ঠ ও আল্লাহভীরু বান্দাদের সাহচর্যে থাকা। কারণ মুখলিছ সঙ্গী আপনার কোন কল্যাণকে নির্মূল করবে না; বরং আপনি তার থেকে উত্তম আদর্শ গ্রহণ করতে পারবেন। আর রিয়াকার ব্যক্তি কামারের হাঁপরে ফুঁকদানকারীর মতো আপনাকে ধ্বংস তথা জাহান্নামের পথে নিয়ে যাবে, যদি আপনি তার কোন আদর্শ বা আমল গ্রহণ করেন। অথবা আপনি তার মধ্যে রিয়ার দুর্গন্ধ পাবেন, যা সঙ্গদোষে রিয়ার প্রতি আপনার আসক্তিই শুধু বৃদ্ধি করবে।
৫. রিয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা :
রিয়া দুনিয়াবী জীবনে মানুষের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনে না। বরং রিয়াকারের প্রতি মানুষের ঘৃণা ও ক্রোধ জন্ম নেয়। ইবরাহীম নাখঈ (রহঃ) বলেন,إِنَّ الرَّجُلَ لَيَعْمَلُ الْعَمَلَ الْحَسَنَ فِىْ أَعْيُنِ النَّاسِ، أَوِ الْعَمَلَ لَا يُرِيدُ بِهِ وَجْهَ اللهِ، فَيَقَعُ لَهُ الْمَقْتُ وَالْعَيْبُ عِنْدَ النَّاسِ حَتَّى يَكُونَ عَيْبًا، وَإِنَّهُ لَيَعْمَلُ الْعَمَلَ أَوِ الْأَمْرَ يَكْرَهُهُ النَّاسُ يُرِيدُ بِهِ وَجْهَ اللهِ، فَيَقَعُ لَهُ الْمِقَةُ (أَى الْمَحَبَّةُ) وَالْحُسْنُ عِنْدَ النَّاسِ. ‘কখনো কোন ব্যক্তি মানুষের চোখে ভালো কাজ করে অথবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য ব্যতীত কোন কাজ করে, তখন মানুষের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা এবং দোষারোপ সৃষ্টি হয়। এমনকি সেটি তার জন্য দোষ হয়ে দাঁড়ায়। আবার কখনো সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার নিমিত্তে এমন কোন কাজ করে যা মানুষ অপসন্দ করে, তখন তার প্রতি মানুষের অন্তরে ভালোবাসা এবং সুধারণা সৃষ্টি হয়’।[14] আসমাঈ বর্ণনা করেছেন, এক বেদুঈন দীর্ঘ করে ছালাত আদায় করল। তার পাশে একদল লোক ছিল। তারা তার ছালাতের প্রশংসা করে বলল, مَا أَحْسَنَ صَلَاتَكَ ‘তোমার ছালাত কতই না সুন্দর’। তখন বেদুঈনটি প্রশংসায় গদগদ হয়ে ছালাত ছেড়ে দিয়ে বলল, আমি ছিয়ামও রেখেছি। তখন অন্য এক বেদুঈন তার এ কথা শুনে বলল,
صَلَّى فَأَعْجَبَنِي وَصَامَ فَرَابَنِي
نَحَّ الْقُلُوصَ عَنِ الْمُصَلِّي الصَّائِمِ
‘তার ছালাত পড়া দেখে আমি মুগ্ধ হ’লাম; কিন্তু তার ছিয়াম আমাকে সন্দিহান করে তুলল।
সরিয়ে নাও তোমার ঐ উটনীকে এই মুছল্লী ও ছায়েমের কাছ থেকে’।
মাওয়ার্দী বলেন,فَانْظُرْ إِلَى هٰذَا الرِّيَاءِ مَا أَقْبَحَهُ وَمَا أَدَلَّهُ عَلَى سَخَافَةِ عَقْلِ صَاحِبِهِ، ‘তাকিয়ে দেখো এই লোকদেখানো আচরণের (রিয়া) দিকে-তা কতই না জঘণ্য! আর তা রিয়াকারের নির্বুদ্ধিতার কতই না বড় প্রমাণ’![15] আর পরকালে আল্লাহ রিয়াকারের গোমর ফাঁস করে দিবেন এবং জনসম্মুখে তাকে লাঞ্ছিত করবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ سَمَّعَ سَمَّعَ اللهُ بِهِ، وَمَنْ يُرَائِى يُرَائِى اللهُ بِهِ ‘যে ব্যক্তি (নিজের ইবাদত ও নেক আমল) মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়ায়, আল্লাহ তা‘আলাও তার (গোপন উদ্দেশ্য ও ত্রুটি) মানুষের কাছে প্রচার করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তাকেও জনসমক্ষে লাঞ্ছিত করবেন (তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করে দেবেন)’।[16] অনুরূপভাবে জাহান্নামের আগুন প্রথম তিন শ্রেণীর ব্যক্তি তথা রিয়াকার মুজাহিদ, রিয়াকার আলেম/ক্বারী এবং রিয়াকার দানকারীর দ্বারা প্রজ্বলিত করা হবে।[17] সুতরাং রিয়া থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রিয়ার ভয়াবহ পরিণাম নিয়ে ভাবতে হবে।
৬. নিয়ত নবায়ন :
রিয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য নিয়ত নবায়ন করা অত্যন্ত যরূরী। কারণ রিয়া প্রতিনিয়ত নিয়তের পরিশুদ্ধিতাকে তার বিষাক্ত ছোবলে নীল করতে চায়। ইখলাছের স্বচ্ছতাকে কালিমালিপ্ত করতে সে সদা তৎপর। এজন্য মুমিন ব্যক্তি সবসময় নিজেকে প্রশ্ন করবে, আমি এই আমলটি কেন করছি? কাকে সন্তুষ্ট করার জন্য করছি? আমি যদি নির্জনে একাকী থাকতাম, তা’হলে কি আমি এই কাজটি করতাম? ইবনু কুদামা মাকদেসী বলেন,وَلَا تَحْتَقِرْ شَيْئًا مِنْ حَرَكَاتِكَ وَكَلِمَاتِكَ، وَحَاسِبْ نَفْسَكَ قَبْلَ أَنْ تُحَاسَبَ، وَصَحِّحْ قَبْلَ أَنْ تَفْعَلَ مَا تَفْعَلُهُ، وَانْظُرْ فِي نِيَّتِكَ فِيمَا تَتْرُكُهُ أَيْضًا، ‘তোমার কোন কথা বা কাজকে তুচ্ছ মনে করো না। তোমার হিসাব নেওয়ার পূর্বেই তুমি নিজের হিসাব নাও তথা আত্মসমালোচনা কর এবং কোন কাজ সম্পাদন করার পূর্বে নিয়তকে বিশুদ্ধ কর। তুমি কোন নিয়তে কাজটি পরিত্যাগ করছ তাও গভীরভাবে ভেবে দেখো’।[18] যদি নিয়তের মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় তাহ’লে একটু ভাবুন! নিয়তকে ভালোভাবে একনিষ্ঠ করে নিন। তারপর নতুন করে আমল শুরু করুন। কারণفَالْعَمَلُ بِغَيْرِ نِيَّةٍ عَنَاءٌ، وَالنِّيَّةُ بِغَيْرِ إِخْلَاصٍ رِيَاءٌ، وَالإِخْلَاصُ مِنْ غَيْرِ تَحْقِيقٍ هَبَاءٌ، ‘নিয়তবিহীন আমল পন্ডশ্রম আর ইখলাছ (নিষ্ঠা) ছাড়া নিয়ত হ’ল লৌকিকতা; আর বাস্তবায়ন ছাড়া ইখলাছ হ’ল নিরর্থক’।[19] মহান আল্লাহ বলেন,وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا، ‘আর আমরা সেদিন তাদের কৃতকর্ম সমূহের দিকে মনোনিবেশ করব। অতঃপর সেগুলিকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করব’ (ফুরক্বান ২৫/২৩)। হাবীব বিন আবু ছাবিত বলেন,طَلَبْنَا هٰذَا الْعِلْمَ، وَمَا لَنَا فِيهِ نِيَّةٌ، ثُمَّ جَاءَتِ النِّيَّةُ وَالْعَمَلُ بَعْدُ ‘আমরা যখন ইলম অর্জন করেছি, তখন আমাদের নিয়তের বিশুদ্ধতা ছিল না। তারপর নিয়তকে বিশুদ্ধ করে নিলাম এবং এরপরেই আমল করতে শুরু করলাম’।[20] এক্ষেত্রে তাঊস (রহঃ)-এর উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। একবার তাঁকে বলা হ’ল,أُدْعُ لَنَا ‘আমাদের জন্য দো‘আ করুন!’ তখন তিনি বললেন, حَتَّى أَجِدَ لَهُ نِيَّةً ‘দো‘আর জন্য আমার মনকে একনিষ্ঠ করে নেই, তারপর দো‘আ করব’।[21]
৭. মৃত্যুকে স্মরণ :
মৃত্যু ও মৃত্যুযন্ত্রণা, কবর ও তার বিভীষিকা, শেষ বিচারের দিন ও তার ঐ সকল ভয়াবহতার কথা স্মরণ করা, যা দেখে সেদিন শিশুরা বৃদ্ধ হয়ে যাবে (মুয্যাম্মিল ৭৩/১৭)। মহান আল্লাহ বলেন,كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ، ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই-ই হবে সফলকাম। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন ধোঁকার উপকরণ ছাড়া কিছুই নয়’ (আলে ইমরান ৩/১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ يَعْنِي الْمَوْتَ ‘তোমরা স্বাদ বিনষ্টকারীকে অর্থাৎ মৃত্যুকে বেশী বেশী স্মরণ কর’।[22]
মানুষ সর্বদা মৃত্যুর চিন্তায় বিভোর থাকবে এবং নিজের অন্তরকে মৃত্যুকে স্মরণের জন্য এমনভাবে অন্য সকল চিন্তা থেকে মুক্ত রাখবে, যেমন কোন ব্যক্তি বিপদসংকুল কোন প্রান্তরে বা সমুদ্রে ভ্রমণের জন্য সদা সেই সফর নিয়েই ভাবতে থাকে। ইবনু কুদামা মাক্বদেসী বলেন,وَأَنْفَعُ طَرِيقٍ فِي ذَلِكَ ذِكْرُ أَشْكَالِهِ وَأَقْرَانِهِ الَّذِينَ مَضَوْا قَبْلَهُ، فَيَذْكُرُ مَوْتَهُمْ وَمَصَارِعَهُمْ تَحْتَ الثَّرَى، ‘মৃত্যুকে স্মরণের সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় হ’ল, তার মতো এবং তার সমসাময়িক যারা পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের কথা স্মরণ করা। সে তাদের মৃত্যুর কথা এবং মাটির নিচে তাদের শায়িত হওয়ার পরিণতির কথা স্মরণ করবে’।[23] ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, السَّعِيدُ مَنْ وُعِظَ بِغَيْرِهِ ‘সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি, যে অন্যের মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ করে’।[24] আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন,إِذَا ذُكِرَ الْمَوْتَى، فَعُدَّ نَفْسَكَ كَأَحَدِهِمْ، ‘যখন মৃতদের কথা স্মরণ করা হয় , তখন তুমি নিজেকে তাদের একজন হিসাবে গণ্য করো’।[25] মৃত্যুকে স্মরণ করার জন্য বেশী বেশী কবর যিয়ারত করতে হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা কবর যিয়ারত কর। কারণ তা তোমাদেরকে পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়’।[26] (ক্রমশঃ)
[2]. ইবনুল জাওযী, তালবীসু ইবলীস, পৃ. ১১৬।
[3]. ইবনু আবিদ দুনিয়া, আত-তাওয়াযু‘, পৃ. ২৭৩; ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ, পৃ. ৪২।
[4]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯৬২।
[5]. বুখারী হা/৫০।
[6]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ২২২।
[7]. মাদারিজুস সালিকীন ১/৭৩।
[8]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছিদীন, পৃ. ২২৩।
[9]. মুসলিম হা/২৯৬৫।
[10]. ছহীহুল জামে‘ হা/৩৭৬০।
[11]. বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১; মিশকাত হা/৭০১।
[12]. ছহীহুল জামে‘ হা/৩৮২১।
[13]. বুখারী হা/২১০১।
[14]. ইবনু আবিদ দুনিয়া, আল-ইখলাছু ওয়ান নিয়্যাতু, পুনর্বিন্যাস : ড. ছালেহ আল-উছায়মীনি, পৃ. ১৬।
[15]. ইবনু আবিদ দুনিয়া, আদাবুদ দ্বীন ওয়াদ দুনয়া, পৃ. ৯৫।
[16]. বুখারী হা/৬৪৯৯।
[17]. তিরমিযী হা/২৩৮২; নাসাঈ হা/৩১৩৭।
[18]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩৬৩।
[19]. তদেব, পৃ. ৩৬০।
[20]. ড. খালিদ আবু শাদী, দা’ ওয়া দাওয়া, পৃ. ৭৬।
[21]. তদেব, পৃ. ৭৫।
[22]. তিরমিযী হা/২৩০৭; ইবনু মাজাহ হা/৪২৫৮।
[23]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩৮৪।
[24]. মায়দানী, মাজমাউল আমছাল ১/৩৪৩।
[25]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩৮৪।
[26]. ইবনু মাজাহ হা/১৫৬৯।