ভূমিকা :

ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে আমরা সবাই মুসাফির। কারো গন্তব্য আখেরাতের পানে, আবার কেউবা পার্থিব স্বার্থের পিছে হন্যে হয়ে অহর্নিশ ছুটে চলেছে। যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের হয় জান্নাতের দিকে টেনে নিচ্ছে, নতুবা ঠেলে দিচ্ছে জাহান্নামের অতল গহবরে। জাগতিক মায়াজাল আর মোহনীয় প্রলোভনগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দিতে চায়। স্বচ্ছ-সফেদ হৃদয়কে পাপাচারের কালিমায় কলুষিত করে ফেলে। এই কলুষিত আত্মার প্রশান্তি এবং উদাসীন হৃদয়কে পুনরায় আল্লাহমুখী করার সর্বোত্তম নিরাময় কেন্দ্র হ’ল মসজিদ। এটি মুমিনের রূহের হাসপাতাল, যেখানে গুনাহের ক্ষতগুলো সিজদার পরশে আরোগ্য লাভ করে। এখানে দুনিয়াবী পেরেশানি ছাপিয়ে এক অনাবিল জান্নাতী প্রশান্তি হৃদয়কে সিক্ত করে। পৃথিবীর যাবতীয় কোলাহল ভেদ করে মুয়াওয্যিনের সুমধুর আযানের ধ্বনি মূলত দিগভ্রান্ত বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক পরম আহবান। একজন সফল মুমিনের জীবন মসজিদের সাথেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। কারণ দিনে পাঁচবার তিনি রবের ডাকে সাড়া দিয়ে এই পবিত্র আঙিনায় হাযির হন। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা অন্তরকে মসজিদমুখী করার কার্যকরী কিছু উপায় উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।

অন্তর মসজিদমুখী হওয়া বলতে কী বুঝায়?

অন্তর মসজিদমুখী হওয়া বলতে বোঝায়- মসজিদ ও ছালাতের প্রতি হৃদয়ের এক গভীর টান বা আত্মিক আকর্ষণ। শুধু সশরীরে মসজিদে উপস্থিত হওয়া নয়; বরং মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর পরবর্তী ওয়াক্তের আযানের জন্য মনে মনে এক ধরনের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা অনুভব করা। যেমন পানির মাছ ডাঙায় তুললে অস্থির থাকে, তেমনি একজন মসজিদমুখী মুমিন দুনিয়াবী ব্যস্ততার মাঝে থাকলেও তার মন পড়ে থাকে মসজিদের প্রশান্ত পরিবেশে। সহজ কথায়, মসজিদের সাথে হৃদয়ের এমন এক অদৃশ্য বাঁধন তৈরি হওয়া, যা তাকে বারবার আল্লাহর ঘরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। কিবয়ামতের দিন সাত শ্রেণীর মানুষ আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল সেই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে ঝুলন্ত থাকে।[1]

সুতরাং মসজিদমুখী বান্দা তারাই, যাদের হয়ত বাজারে অনেক কেনাবেচা চলছে, কোটি টাকার মুনাফার সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে কিংবা অফিসের টেবিলে যরূরী ফাইলের স্তূপ, ঠিক এমন মুহূর্তে যখন মসজিদের মিনার থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন তারা সবকিছু ওখানেই থামিয়ে দেন। তাদের কাছে দুনিয়ার বড় বড় কাজ ও ব্যবসার চেয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের মুহূর্তটাই অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। তারা জানেন যে, আজকের এই ব্যস্ততা একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু ক্বিয়ামতের সেই কঠিন দিনে কেবল মসজিদের সাথে থাকা এই সম্পর্কটিই হবে তাদের নাজাতের অসীলা। যাদের হৃদয় এমন অনুভূতিতে সদা সিক্ত থাকে তারাই মূলত মসজিদমুখী বান্দা।

অন্তরকে মসজিদমুখী করার উপায়

মুমিনের হৃদয়ের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু হ’ল মসজিদ। সদিচ্ছা ও কিছু কার্যকরী অভ্যাসের মাধ্যমেই একজন মুমিন তার অন্তরকে মসজিদমুখী করে তুলতে পারেন। নিম্নে অন্তরকে মসজিদমুখী করার কতিপয় উপায় আলোকপাত করা হ’ল।-

১. মসজিদের ফযীলত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা :

মানুষ স্বভাবগতভাবেই লাভের পেছনে ছোটে। কোন কাজের উপকারিতা বা পুরস্কার সম্পর্কে জানলে সেই কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। এজন্য মসজিদমুখী জীবন গঠনের জন্য সর্বপ্রথম মসজিদের ফযীলত ও মর্যাদা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,أَحَبُّ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ مَسَاجِدُهَا، وَأَبْغَضُ الْبِلَادِ إِلَى اللهِ أَسْوَاقُهَا، ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হ’ল মসজিদসমূহ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হ’ল বাজার সমূহ’।[2] অত্র হাদীছের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) বলেন, মসজিদকে আল্লাহর ভালোবাসার অর্থ হ’ল- মসজিদে যাতায়াতকারীদের জন্য তাঁর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও অনুগ্রহের ইচ্ছা। আর বাজারের প্রতি ঘৃণার অর্থ হ’ল- এর বিপরীত (অর্থাৎ বাজারের পরিবেশ ও পাপাচারের কারণে সেখানে রহমত কমে যাওয়া)।[3]

একজন মুমিন যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন তিনি সরাসরি আরশের অধিপতির মেহমান হয়ে যান। আসমানবাসীরা এই বিশেষ মেহমানদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ تَوَضَّأَ فِي بَيْتِهِ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ أَتَى الْمَسْجِدَ، فَهُوَ زَائِرُ اللهِ، وَحَقٌّ عَلَى الْمَزُورِ أَنْ يُكْرِمَ الزَّائِرَ، ‘যে ব্যক্তি নিজের বাড়িতে ভালোভাবে ওযূ করে মসজিদে আসে, সে আল্লাহর মেহমান। আর মেজবানের দায়িত্ব হ’ল তার মেহমানকে সম্মান করা’।[4] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন,مَنْ غَدَا إِلَى المَسْجِدِ وَرَاحَ، أَعَدَّ اللّٰهُ لَهُ نُزُلَهُ مِنَ الجَنَّةِ كُلَّمَا غَدَا أَوْ رَاحَ، ‘যে ব্যক্তি সকালে বা সন্ধ্যায় যতবার মসজিদে যায়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে ততবার মেহমানদারীর ব্যবস্থা করে রাখেন’।[5]

আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন,‌الْمَسَاجِدُ ‌بُيُوتُ ‌اللهِ ‌فِي ‌الْأَرْضِ، تُضِئُ لِأَهْلِ السَّمَاءِ كَمَا تُضِئُ نُجُومُ السَّمَاءِ لِأَهْلِ الْأَرْضِ ‘মসজিদসমূহ যমীনে আল্লাহর ঘর। এগুলো আসমানবাসীদের জন্য তেমনি উজ্জ্বল দেখায়, যেমন আসমানের নক্ষত্ররাজি যমীনবাসীদের জন্য উজ্জ্বল দেখায়’।[6]

তাছাড়া মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থানই নয়, এটি মুসলিমদের সামাজিক কেন্দ্র। এখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। একে অপরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, সালাম বিনিময় হয় এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। সুতরাং মসজিদমুখী হওয়া মানে আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, অফুরন্ত পুরস্কার এবং এক প্রশান্তিময় জীবনের দিকে যাত্রা করা। অতএব যে স্থান আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়, সেখানে উপস্থিত হ’তে পারলে একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে সৌভাগ্যের ব্যাপার আর কি হ’তে পারে?

২. জামা‘আতে ছালাত আদায়ের পুরস্কার নিয়ে চিন্তা করা :

জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায়ের নেকী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মসজিদে যাওয়ার আগ্রহ বাড়ে। কারণ একাকী ছালাত আদায়ের চেয়ে জামা‘আতে ছালাত আদায় করলে সাতাশ গুণ বেশী ছওয়াব লাভ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, صَلَاةُ الْجَمَاعَةِ أَفْضَلُ مِنْ صَلَاةِ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً، ‘জামা‘আতে ছালাত আদায় করা একাকী ছালাত আদায়ের চেয়ে সাতাশ গুণ বেশী মর্যাদাপূর্ণ’।[7] আমরা মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় ব্যয় করে মসজিদে গিয়ে জামা‘আতে শামিল হ’তে পারি। এতে প্রতিদিন পাঁচবার আমরা আমাদের অজান্তেই অঢেল ছওয়াব ও মর্যাদা লাভ করতে পারি।

৩.ছোট পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করা এবং সেটা বাস্তবায়ন করা :

শয়তান মানুষের চিরশত্রু। সে কখনোই চায় না কোন বান্দা আল্লাহর ঘরের চৌকাঠে পা রাখুক। তাই সে ইবাদতকে আমাদের সামনে পাহাড়সম কঠিন করে উপস্থাপন করে, যাতে আমরা শুরু করার আগেই হাল ছেড়ে দেই। কিন্তু আল্লাহর কাছে অল্প পরিমাণে হ’লেও নিয়মিত আমল পসন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى ‌اللهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল সেটাই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়’।[8] তাই পুরো দিনের পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত একবারে কঠিন মনে হ’লে, আপনার সফরের শুরুটা হোক ফজর ও এশা দিয়ে। এই দুই ওয়াক্ত হ’ল মুমিনের দিন ও রাতের দুই শক্তিশালী খুঁটি। কেননা এই দু’টি ছালাত মুনাফিক্বের জন্য সবচেয়ে ভারী হয়ে থাকে।[9] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এশার ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত তাহাজ্জুদ ছালাত আদায় করল। আর যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারা রাত জেগে তাহাজ্জুদ আদায় করল’।[10]

ফজর ও এশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতে মসজিদমুখী হওয়ার লক্ষ্য স্থির করুন। এভাবে দুই দিন প্রতি ওয়াক্ত জামা‘আতে আদায়ের সংকল্প করুন। এরপর এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহ। এভাবে চল্লিশ দিনের এক অনন্য মাইলফলকের সংকল্প করুন। কারণ এখানে জাহান্নাম ও মুনাফেক্বী থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ صَلَّى لِلَّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا فِي جَمَاعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبِيرَةَ الأُولَى كُتِبَ لَهُ بَرَاءَتَانِ: بَرَاءَةٌ مِنَ النَّارِ، وَبَرَاءَةٌ مِنَ النِّفَاقِ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চল্লিশ দিন পর্যন্ত জামা‘আতের সাথে প্রথম তাকবীর সহকারে ছালাত আদায় করবে, তার জন্য দুটি মুক্তি পরোয়ানা লিখে দেওয়া হয়: এক- জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং দুই- মুনাফেক্বী থেকে মুক্তি’।[11]

এই হাদীছের প্রতি আমল করে আপনি যখন চল্লিশ দিনের চ্যালেঞ্জ পূর্ণ করবেন, তখন দেখবেন মসজিদের মিনার থেকে আসা আযানের সুর আপনার কানে নয়, সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করছে। তখন হাট-বাজার, অফিস বা সফর- যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার মন পড়ে থাকবে মসজিদের কন্দরে।

৪. মসজিদের পরিবেশকে অন্তর দিয়ে অনুভব করা :

মসজিদ কেবল ইট-পাথরের কোন স্থাপনা নয়; বরং এটি মুমিনের আত্মিক প্রশান্তির উদ্যান। যখন কোন বান্দা নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন, তখন মসজিদের দেয়াল, মেহরাব আর মুছল্লীদের সাথে তার এক অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্ক তৈরী হয়। এই অনুভূতি তাকে বারবার টেনে আনে আল্লাহর ঘরে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَا تَوَطَّنَ رَجُلٌ مُسْلِمٌ الْمَسَاجِدَ لِلصَّلَاةِ وَالذِّكْرِ، إِلَّا تَبَشْبَشَ اللهُ لَهُ، كَمَا يَتَبَشْبَشُ أَهْلُ الْغَائِبِ بِغَائِبِهِمْ إِذَا قَدِمَ عَلَيْهِمْ، ‘কোন মুসলিম ব্যক্তি যখন ছালাত ও যিকিরের জন্য মসজিদে অবস্থান করে, তখন আল্লাহ তার প্রতি এতটাই আনন্দিত হন, যেমন প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে আনন্দিত হয়’।[12] এখানে মসজিদে অবস্থান করা (تَوَطَّنَ)-এর অর্থ হ’ল মসজিদকে স্বদেশের মত এমনভাবে ঠিকানা বানিয়ে নেওয়া, যার প্রতি বান্দা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন এবং এখানে অবস্থান করলে তিনি প্রশান্তি লাভ করেন’।[13] আর ‘তাবাশবাশা’ (تَبَشْبَشَ) শব্দটির অর্থ হ’ল অত্যন্ত হাসিমুখে ও পরম মমতায় কাউকে বরণ করে নেওয়া।

সন্তান বা প্রিয় কোন আত্মীয় পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে আজ ঘরে ফিরছে। দরজায় পা রাখতেই মা-বাবা কি তাকে সোফায় বসিয়ে রেখে অন্য ঘরে চলে যান? কক্ষনো না! তারা বরং পরম আদরে তাকে জড়িয়ে ধরেন, সেরা আসনটি দেন, খুশিতে চোখের পানি ফেলেন। সুবহানাল্লাহ! আপনি-আমি যখন ওযূ করে মসজিদের দিকে পা বাড়াই, তখন আসমানের মালিক আপনাকে-আমাকে ঠিক সেভাবেই স্বাগত জানান। তখন আমরা আল্লাহর ঘরের সাধারণ কোন আগন্তুক থাকি না, বরং হয়ে যাই আরশের মালিকের রাজকীয় মেহমান।

যখন আপনি মসজিদের বারান্দায় পা রাখবেন, তখন এই অনুভূতি জাগিয়ে তুলুন যে, আমি আল্লাহর মেহমান হিসাবে আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করছি। এরপর মসজিদের পরিবেশকে অন্তর দিয়ে অনুভব করুন। দেখবেন, মসজিদের ফ্যানের শীতল বাতাস বাড়ির ফ্যানের বাতাসের চেয়েও প্রশান্তিময় লাগছে। মনটাকে এমন হালকা ও প্রশান্ত অনুভব করবেন, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। যদি আপনি অনুভূতির শক্তি দিয়ে মসজিদকে এভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, তবে একটি জীর্ণ কুঁড়েঘরের মসজিদও আপনার কাছে রাজপ্রাসাদের চেয়েও বেশী মোহনীয় মনে হবে। এই অনুভূতির চূড়ায় পৌঁছেছিলেন আমাদের পূর্বসূরিরা। প্রখ্যাত তাবেঈ রবী‘ ইবনে খুছাইম (১০-৬৫হি.) বলেন,والله إني لآنس ‌بصوت ‌عصفور ‌المسجد أشد من أنسي بزوجتي، ‌‘আল্লাহর কসম! আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গের চেয়ে মসজিদের চড়ুই পাখির ডাকের মাধ্যমে অধিক প্রশান্তি অনুভব করি’।[14] প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (১৫-৯৪হি.) বলেন,مَا ‌فَاتَتْنِي ‌الصَّلَاةُ ‌فِي ‌جَمَاعَةٍ مُنْذُ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً،..مَا أَذَّنَ المُؤَذِّنُ مُنْذُ ثَلَاثِيْنَ سَنَةً، إِلَاّ وَأَنَا فِي المَسْجِدِ، ‘চল্লিশ বছর যাবত আমার জামা‘আতের ছালাত মিস হয়নি। আর ত্রিশ বছর যাবত মুওয়াযযিন যখন আযান দিয়েছে, তখন আমি ছালাতের জন্য মসজিদে উপস্থিত থেকেছি’।[15] সুতরাং আমরা যখন অন্তরের চোখ দিয়ে মসজিদের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হব এবং অনুভব করতে পারব যে, আমরা আল্লাহর ঘরের একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং আল্লাহ আমাদের আগমনে আনন্দিত হচ্ছেন, তখন দুনিয়ার কোন কাজই আমাদেরকে মসজিদের চৌকাঠ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।

৫. হেঁটে হেঁটে ধীরে-সুস্থে মসজিদে গমন করা :

মসজিদের দিকে হেঁটে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ হীরা-জহরত অপেক্ষা চেয়েও দামী। কারণ প্রতিটি কদম অতিক্রম করার মাধ্যমে বান্দার আমলনামা নেকী দ্বারা পূর্ণ হয় এবং পাপাচারের কালিমা মুছে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِذَا تَوَضَّأَ أَحَدُكُمْ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الصَّلَاةِ لَمْ يَرْفَعْ قَدَمَهُ الْيُمْنَى إِلَّا كَتَبَ اللّٰهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُ حَسَنَةً، وَلَمْ يَضَعْ قَدَمَهُ الْيُسْرَى إِلَّا حَطَّ اللّٰهُ عَزَّ وَجَلَّ عَنْهُ سَيِّئَةً، ‘যখন তোমাদের কেউ সুন্দরভাবে ওযূ করে ছালাতের উদ্দেশ্যে বের হয়, তখন সে ডান পা ফেলার সাথে সাথে আল্লাহ তার জন্য একটি নেকী লেখেন এবং বাম পা ফেলার সাথে সাথে তার একটি গুনাহ মাফ করে দেন’।[16]

৬. মসজিদে যাওয়ার জন্য উত্তম প্রস্ত্ততি নেওয়া :

আমরা যখন কোন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা, মন্ত্রী কিংবা সমাজের কোন বিশেষ ব্যক্তির সাথে দেখা করতে যাই, তখন আমরা নিজেকে পরিপাটি করি। সেরা পোষাকটি বেছে নেই, দামী সুগন্ধি ব্যবহার করি। অথচ যিনি আমাদের মালিক, যাঁর হাতে আমাদের জীবন-মৃত্যু এবং পরকালের চিরস্থায়ী জান্নাত-জাহান্নাম, সেই আল্লাহর দরবারে যাওয়ার প্রস্ত্ততি তো আরও কয়েক গুণ বেশী সুন্দর হওয়া বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন, يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ ‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক ছালাতের সময় সুন্দর পোষাক পরিধান কর’ (আ‘রাফ ৭/৩১)। আল্লামা কাসেমী (রহঃ) বলেন, অত্র আয়াতে ছালাতের সময় উত্তম পোষাকের মাধ্যমে সাজসজ্জা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কারণ আল্লাহর ইবাদতের সময়ই হ’ল নিজেকে সুশোভিত করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়’।[17] হাফেয ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন, ‘ছালাতের সময় নিজেকে সুশোভিত করা মুস্তাহাব। বিশেষত জুম‘আর দিন এবং ঈদের দিন। অনুরূপভাবে সুগন্ধি ব্যবহার করাও উত্তম। কারণ তা সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত এবং মেসওয়াক করাও সমীচীন। কারণ তা সেŠন্দর্যের পূর্ণতা দান করে। আর পোষাকের মধ্যে সাদা পোশাকই সবচেয়ে উৎকৃষ্ট’।[18]

সালাফগণ ছালাতের সময় হলে এমনভাবে প্রস্ত্ততি নিতেন, যেন তাঁরা কোন বাদশাহর দরবারে যাচ্ছেন। তাঁরা সুন্দরভাবে ওযূ করতেন, সর্বোত্তম পোশাক পরতেন এবং অত্যন্ত বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে মসজিদের দিকে রওনা হ’তেন। প্রখ্যাত তাবেঈ নাফে‘ (রহঃ) বলেন, ইবনে ওমর (রাঃ) আমাকে এক পোষাকে ছালাত আদায় করতে দেখে বললেন, أَلَمْ أَكْسِكَ ثَوْبَيْنِ؟ ‘আমি কি তোমাকে দুই জোড়া কাপড় দেইনি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, أَرَأَيْتَ لَوْ أَرْسَلْتُكَ إِلَى فُلَانٍ أَكُنْتَ ذَاهِبًا فِي هَذَا الثَّوْبِ؟ ‘আচ্ছা বল তো, আমি যদি তোমাকে বিশেষ কোন ব্যক্তির কাছে পাঠাতাম, তবে কি তুমি এই এক পোষাকে যেতে?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘না’। তখন তিনি বললেন, ‌اللّٰهُ ‌أَحَقُّ ‌مَنْ ‌تَزَيَّنُ ‌لَهُ ‘আল্লাহই এর বেশী হকদার যে, তুমি তাঁর (ইবাদতের) জন্য নিজেকে সুশোভিত করবে’।[19]

মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ের মাধ্যমে আমরা দৈনিক পাঁচবার হজ্জ করার নেকী লাভ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ مُتَطَهِّرًا إِلَى صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْحَاجِّ الْمُحْرِمِ، وَمَنْ خَرَجَ إِلَى تَسْبِيحِ الضُّحَى لَا يَنْصِبُهُ إِلَّا إِيَّاهُ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْمُعْتَمِرِ، وَصَلَاةٌ عَلَى أَثَرِ صَلَاةٍ لَا لَغْوَ بَيْنَهُمَا كِتَابٌ فِي عِلِّيِّينَ، ‘যে ব্যক্তি বাড়ী থেকে ওযূ করে ফরয ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করবে, তার প্রতিদান ইহরাম পরিহিত একজন হজ্জ পালনকারীর সমান। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র চাশতের ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যেই মসজিদে গমন করে, তার প্রতিদান একজন ওমরাহ পালনকারীর সমান। আর এক ছালাতের পর অপর ছালাতের মধ্যবর্তী সময়ে কোন অহেতুক কথা-কর্ম ত্যাগ করলে, তার আমলনামা ইল্লিয়্যিনে রাখা হয়’।[20] মহান আল্লাহ ধনী-গরিব সবার জন্যই প্রতিদিন পাঁচবার হজ্জের ছওয়াব অর্জনের এক চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছেন। সুতরাং মসজিদে জামা‘আতে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ের মাধ্যেমে হজ্জের নেকী লাভের এই অফার হাতছাড়া করা যাবে না।

৭. আগে-ভাগে মসজিদে যাওয়া ও দেরীতে বের হওয়া :

মসজিদমুখী হওয়ার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হ’ল ছালাতের কিছুটা সময় আগে আল্লাহর ঘরে হাযির হওয়া। এই যে কয়েক মিনিট আগে যাওয়া, অশান্ত মনকে শান্ত করার এক মহৌষধ হিসাবে কাজ করবে। একটু আগে গিয়ে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করে যখন আপনি চুপচাপ বসে তাসবীহ পড়বেন বা কুরআন তেলাওয়াত করবেন, তখন দুনিয়ার সব ব্যস্ততা ও অস্থিরতা আপনার অন্তর থেকে কর্পূরের মত উবে যাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَا يَزَالُ أَحَدُكُمْ فِي صَلَاةٍ مَا دَامَ يَنْتَظِرُهَا، وَلَا تَزَالُ المَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي الـمَسْجِدِ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ، مَا لَمْ يُحْدِثْ، ‘তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত ছালাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে যেন ছালাতের মধ্যেই থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কেউ মসজিদে অবস্থান করে, আল্লাহর ফেরেশতারা তার জন্য এই বলে দো‘আ করতে থাকে- হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন এবং তার উপর রহম করুন। বান্দার ওযূ ছুটে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের এই দো‘আ অব্যাহত থাকে’।[21] শুধু ছালাতের আগে নয়; বরং ছালাত আদায়ের পরেও যদি মুছাল্লাতে বসে তাসবীহ-তাহলীল করতে থাকে, ফেরেশতান্ডলী তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ওযূ ছুটে যাওয়ার পূর্বে তোমাদের কেউ যতক্ষণ পর্যন্ত তার ছালাত আদায়ের জায়গায় অবস্থান করে, ফেরেশতাগণ তার জন্য এই বলে দো‘আ করতে থাকেন যে, اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ ‘হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন এবং তার উপর রহমত বর্ষণ করুন’।[22]

ইবনু বাত্তাল বলেন, ‘যার অনেক পাপ আছে, সে যদি কোন পরিশ্রম ছাড়াই তার সেই পাপগুলো ক্ষমা করে নিতে চায়, সে যেন তার ছালাত আদায়ের জায়গায় অবস্থান করার এই সুযোগটা গ্রহণ করে। কেননা এতে করে ফেরেশতারা তার জন্য দো‘আ করবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর ফেরেশতাদের প্রার্থনা কবুল হওয়ার নিশ্চিত আশা করা যায়। কেননা আল্লাহ বলেন,وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى ‘তারা কেবল তাদের জন্যই সুপারিশ করে, যার উপর তিনি (আল্লাহ) সন্তুষ্ট’ (অvাম্বয়া ২১/২৮)[23] সুতরাং ফরয ছালাত পড়েই দ্রুত বেরিয়ে আসার অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। কেননা এতে মসজিদের সাথে অন্তরের দূরত্ব তৈরী হয়। ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র (রহঃ) বলেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি ছালাতের জন্য আগেভাগে মসজিদে গিয়ে অপেক্ষা করে, সে যদি প্রথম কাতারে ছালাত আদায় নাও করে তবুও ঐ ব্যক্তি থেকে সে উত্তম, যে দেরীতে গিয়ে প্রথম কাতারে ছালাত আদায় করে। এ বিষয়ে আলেমদের কোন মতভেদ জানা নেই’।[24]

আযান হওয়ার পর অন্য সব কাজকে গৌণ মনে করার মানসিকতা তৈরি করা উচিত। আযান হয়েছে মানে আল্লাহ তাঁর ঘরে আমাদের ডাকছেন- এই চিন্তাটা মাথায় রাখলে কাজ ফেলে মসজিদে যাওয়ার তাকীদ অনুভূত হবে ইনশাআল্লাহ। তাবেঈ ইয়াহইয়া ইবনে মায়মূন আল-মারওয়াযী (মৃ. ১৩১হি.) ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফক্বীহ ও ছিক্বাহ মুহাদ্দিছ। তিনি পেশায় একজন স্বর্ণকার ছিলেন। সোনা-রূপা দিয়ে অলংকার তৈরী করতেন। তার সম্পর্কে ইয়াহইয়া ইবনে মা‘ঈন (১৫৮-২৩৩হি.) বলেন, ‘তিনি কাজ করার সময় যখন হাতুড়ি উঠাতেন, আর সেই সময় যদি আযান শুনতে পেতেন তবে সেই হাতুড়ি উঠানো থেকে ঐভাবেই রেখে দিতেন। আর আঘাত করতেন না’।[25]

স্মর্তব্য যে, ছালাত শুরুর আগ মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদে প্রবেশের সময় ফোনটি কেবল সাইলেন্ট নয়; বরং ভাইব্রেশনও বন্ধ রাখা যরূরী। কারণ ছালাতরত অবস্থায় পকেটে ভাইব্রেশন হ’লেও তা মনোযোগ নষ্ট করে। ছালাত হ’ল মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি কথোপকথন। তাই এখানে যেন কোন দুনিয়াবী কল বা মেসেজ অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। কারণ ফোনের রিংটোনের ফলে যদি অন্য কোন মুছল্লীর ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে, তবে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দায়ভার মোবাইল মালিককে বহন করতে হবে।

৮. অলসতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া :

মসজিদের সাথে একজন মুমিনের সম্পর্ক তার ঈমানের সুস্পষ্ট পরিচায়ক। অলসতা যেন আমাদের পথে প্রতিবন্ধতা তৈরী করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। আল্লাহ মসজিদ আবাদকারীদের ঈমানের উচ্চ মর্যাদার ঘোষণা দিয়ে বলেন,إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ فَعَسَى أُولَئِكَ أَنْ يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ، ‘আল্লাহর মসজিদ সমূহ কেবল তারাই আবাদ করে, যারা আল্ল­াহ ও বিচার দিবসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। যারা ছালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে এবং আল্ল­াহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করে না। নিশ্চয়ই তারা সুপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (তওবা ৯/১৮)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনে কাছীর (রহঃ) বলেন, ‘মসজিদ আবাদ করার অর্থ কেবল এর বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়ানো বা জাঁকজমকপূর্ণ কাঠামো দাঁড় করানো নয়; বরং মসজিদ আবাদ করার প্রকৃত অর্থ হ’ল সেখানে আল্লাহর যিকির করা, তাঁর বিধানসমূহ কায়েম করা এবং একে যাবতীয় অপবিত্রতা ও শিরক থেকে মুক্ত রাখা’।[26] শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন,عمار ‌المساجد ‌أبعد ‌عن ‌الأحوال ‌الشيطانية، ‘মসজিদ আবাদকারী ব্যক্তিরা শয়তানী অবস্থা বা প্রভাব থেকে অধিক দূরে থাকে’।[27]

ছাহাবায়ে কেরাম জামা‘আতে ছালাত আদায় করাকে ঈমানের পরিচায়ক মনে করতেন। প্রখ্যাত ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন,لَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنِ الصَّلَاةِ إِلَّا مُنَافِقٌ قَدْ عُلِمَ نِفَاقُهُ، أَوْ مَرِيضٌ، إِنْ كَانَ الْمَرِيضُ لَيَمْشِي بَيْنَ رَجُلَيْنِ حَتَّى يَأْتِيَ الصَّلَاةِ، وَقَالَ: إِنْ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَّمَنَا سُنَنَ الْهُدَى، وَإِنَّ مِنْ سُنَنَ الْهُدَى الصَّلَاةَ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي يُؤَذَّنُ فِيهِ، ‘আমরা বিশ^াস করতাম যে, প্রকাশ্য মুনাফিক্ব অথবা অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া কেউ ছালাতের জামা‘আতে অনুপস্থিত থাকে না। (রাসূলের যুগে) অসুস্থ ব্যক্তি দু’জনের কাঁধে ভর করে হ’লেও ছালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হ’ত। তিনি আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে হেদায়াতের নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছেন। আর সেই সব হেদায়াতের নীতিমালার অন্যতম হ’ল- যে মসজিদে আযান দেওয়া হয়, সেখানে (জামা‘আতে) ছালাত আদায় করা’।[28] তিনি অন্ধ ব্যক্তিকেও জামা‘আতে ছালাত ত্যাগ করার অনুমতি দেননি।[29] জামা‘আতে ছালাত আদায় করা কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি হেদায়াতের ওপর টিকে থাকার অন্যতম প্রধান উপায়।

ইব্রাহীম নখয়ী (রহঃ) বলেন,كفى علماً عَلَى النفاق أن يكون الرَّجُلُ جار المسجد، لا يرى فِيهِ، ‘একজন ব্যক্তির নিফাকের জন্য এই আলামতই যথেষ্ট যে, সে মসজিদের প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও তাকে মসজিদে দেখা যায় না’।[30] আবু হাইয়ান তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, প্রখ্যাত তাবেঈ রবী‘ ইবনে খুছাইম (১০-৬৫হি.) পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ছিলেন। তবুও তাঁকে ধরে ধরে ছালাতের জামা‘আতে নিয়ে যাওয়া হ’ত। লোকেরা তাঁকে বলত, ‘হে আবূ ইয়াযীদ! আপনি তো অসুস্থ, জামা‘আতে না যাওয়ার জন্য আপনার ছাড় আছে। তবুও এতো কষ্ট করছেন কেন? তখন তিনি জবাবে বলতেন, আমি যখন ‘হাইয়্যা ‘আলাছ ছালাহ, হাইয়্যা ‘আলালা ফালাহ’ (ছালাতে দিকে এসো, সফলতার দিকে এসো) ডাক শুনি তখন আর কিভাবে বসে থাকতে পারি? সুতরাং তোমরা যদি পার, এমনকি হামাগুড়ি দিয়েও জামা‘আতের ছালাতে চলে এসো’।[31]

৯. মসজিদের কার্যক্রম ও সেবায় অংশগ্রহণ :

মসজিদ কেবল ছালাতের স্থান নয়। এটি জ্ঞান অর্জন ও মুসলমানদের সামাজিক কেনদ্র। মসজিদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিলে ঈমান বাড়ে এবং মসজিদের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। মসজিদে যে সকল তা‘লীমী বৈঠক, দ্বীনি আলোচনা বা দরস অনুষ্ঠিত হয়, এতে হাযির হ’লে পরিপূর্ণ হজ্জের ছওয়াব লাভ করা যায়। ছাহাবী আবূ উমামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يَعْلَمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٍّ تَامًّا حِجَّتُهُ، ‘যে ব্যক্তি কল্যাণময় (দ্বীনি) জ্ঞান অর্জন অথবা ঐ জ্ঞান বিতরণের জন্যই শুধু মসজিদে গমনাগমন করে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজ্জের নেকী রয়েছে’।[32] অনেকে নানা অজুহাতে মসজিদের এই সকল দ্বীনি বৈঠকে উপস্থিত থাকতে চায় না। আবার অনেকে মনে করে ফেইসবুক লাইভে অথবা ইউটিউবে আলোচনাটা শুনে নেবে। কিন্তু এতে তারা বিশাল ছওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে, যা ঐ বৈঠকে হাযির হওয়া ব্যতীত লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ ফেরেশতামন্ডলী এই মজলিসগুলো ঘিরে রাখেন এবং সেখানে আল্লাহর রহমত ও প্রশান্তি নাযিল হয়।[33] আর মজলিসে অবস্থানকারীরা সেখান থেকে উঠার সাথে সাথে তাদের পাপগুলো ছওয়াবে পরিণত হয়।[34] আর উপস্থিত হওয়ার প্রতিদান হিসাবে হজ্জের নেকী তো আছেই।

যেকোন জিনিসের প্রতি মানুষের টান তখনই বাড়ে, যখন সেটির পেছনে তার টাকা, শ্রম ও ঘাম ব্যয় হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ بَنَى مَسْجِدًا لِلَّهِ كَمَفْحَصِ قَطَاةٍ، أَوْ أَصْغَرَ، بَنَى اللَّهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ، ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কবুতরের ডিম পাড়ার জায়গা পরিমাণ অথবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন’।[35] কোন মসজিদ নির্মাণে বা সংস্কারে সহযোগিতা করলে অথবা মসজিদের ছোটখাটো খেদমতে অংশ নিলে অজান্তেই সেই মসজিদের প্রতি হৃদয়ে এক গভীর মমতা জন্মাবে।

১০. মসজিদকে শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচার দূর্গ মনে করা :

একাকী ছালাত আদায় করা মানেই হ’ল শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হওয়া। আর মসজিদে জামা‘আতে ছালাত আদায়ের মাধ্যমে মুমিন বান্দা এমন একটি সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় পায়, যা তাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَا مِنْ ثَلَاثَةٍ فِي قَرْيَةٍ وَلَا بَدْوٍ لَا تُقَامُ فِيهِمُ الصَّلَاةُ إِلَّا قَدِ اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ، فَعَلَيْكَ بِالْجَمَاعَةِ فَإِنَّمَا يَأْكُلُ الذِّئْبُ الْقَاصِيَةَ، ‘কোন জনপদে বা বন-জঙ্গলে তিনজন লোক একত্রে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তারা জামা‘আতে ছালাত আদায় না করে, তবে তাদের উপর শয়তান আধিপত্য বিস্তার করে। অতএব তোমরা জামা‘আতকে আকঁড়ে ধর। কারণ নেকড়ে (বাঘ) দলচ্যুত বকরীকেই খেয়ে থাকে’।[36]

সালাফগণ জামা‘আতে ছালাত আদায়ের ব্যাপারে খুবই তৎপর ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবুল মুবারক (রহঃ) বলেন,رَأَيْتُ سَعِيدَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ إِذَا فَاتَتْهُ الصَّلَاةُ - يَعْنِي فِي الْجَمَاعَةِ - أَخَذَ بِلِحْيَتِهِ وَبَكَى، ‘আমি সাঈদ ইবনে আব্দুল আযীযকে দেখিছি যদি তার জামা‘আতের ছালাত মিস হ’ত, তিনি তার দাঁড়ি ধরে কান্নাকাটি করতেন’।[37] মুহাম্মাদ ইবনে সামা‘আহ (১৩০-২৩৩হি.) বলেন, ‌مكثت ‌أربعين ‌سنة ‌لم ‌تفتني ‌التكبيرة ‌الأولى إلّا يوما واحدا ماتت فيه أمي ففاتتني صلاة واحدة في جماعة، ‘চাল্লিশ বছরে আমার একদিনও তাকবীরে উলা ছুটেনি, তবে একদিন ছুটেছে, যেদিন আমার মা মারা গিয়েছিল, সেদিন আমার জামা‘আতও ছুটে গিয়েছিল’।[38] শামের কাযী সুলায়মান ইবনে হামযাহ আল-মাক্বদেসী (রহঃ) বলেন,لم ‌أصلّ ‌الفريضة ‌قطّ ‌منفردا ‌إلّا ‌مرتين، وكأني لم أصلهما، ‘আমি কখনোই ফরয ছালাত একাকী আদায় করিনি; শুধু দুই বার ছাড়া। কিন্তু মনে হয়েছে এই দুই ওয়াক্ত ছালাত আদায়ই করিনি’।[39] অথচ তখন তার বয়স ছিল প্রায় নববই বছর। আল্লাহ আমাদেরকে সালাফে ছালেহীনের পদাঙ্ক অনুসরণের তাওফীক্ব দান করুন! আমীন!

১১. মসজিদমুখী ভালো সঙ্গী নির্বাচন করা :

মসজিদমুখী হওয়ার পথে একটি বড় শক্তি হ’তে পারে একজন মসজিদমুখী বন্ধু। মানুষের স্বভাব হ’ল সে তার বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। বন্ধু যদি দ্বীনদার হয়, তবে প্রতিটি আলাপন হবে জান্নাত আর রবের সন্তুষ্টি নিয়ে। দ্বীনদার মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُم بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ ‘আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সাথে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর চেহারা কামনায় আহবান করে’ (কাহফ ১৮/২৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ভালো ও মন্দ বন্ধুর উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সৎসঙ্গী এবং অসৎসঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা এবং কামারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতা হয় তোমাকে আতর উপহার দেবে, অথবা তুমি তার থেকে আতর কিনবে, নতুবা অন্তত তার থেকে সুগন্ধি পাবে। আর কামারের হাপর হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নতুবা তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে’।[40]

জীবনে আমরা যেমন ব্যবসার লাভের জন্য বিশ্বস্ত বিজনেস পার্টনার খুঁজি, তেমনি জান্নাতের মুনাফা গুছিয়ে নিতে মসজিদের জন্য একজন ভালো বন্ধু প্রয়োজন। আপনার পাশের বাড়ির কোন দ্বীনদার ভাই বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে একটি ছোট চুক্তি করুন যে, আযান হওয়ার সাথে সাথে আমরা একে অপরকে মনে করিয়ে দেব। এই ছোট্ট একটি উদ্যোগ আপনার জীবনে কতটা জাদুকরী পরিবর্তন আনতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারবেন না। সারাদিনের ক্লান্তির পর এশার আযানের সময় আপনার মনে হচ্ছে- ‘আজ শরীরটা ভালো লাগছে না, ছালাতটা না হয় বাড়িতেই পড়ে নেই’। ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার মোবাইলে বন্ধুর কল বেজে উঠল অথবা দরজায় কড়া নেড়ে বন্ধু ডাক দিল- ‘ভাই! আযান হয়ে গেছে, আমি তো মসজিদের পথে, আপনি তৈরি তো?’ বন্ধুর এই একটি ডাক বা ফোন কল মুহূর্তেই আপনার মনের সব অলসতা আর শয়তানি তন্দ্রাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। একা একা নফসের সাথে যুদ্ধ করে মসজিদে যাওয়া যতটা কঠিন, বন্ধুর হাত ধরে যাওয়া তার চেয়ে হাযার গুণ সহজ। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গড়ে ওঠা এই নির্মল বন্ধুত্বই হ’তে পারে ক্বিয়ামতের দিন আরশের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম।

১২. মসজিদমুখী প্রজন্ম গড়ে তোলা :

আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনে উম্মাতের কান্ডারী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হ’ল বর্তমান প্রজন্ম ক্রমশ মসজিদবিমুখ হয়ে পড়ছে। মসজিদের মিনার থেকে বিমুখ হয়ে স্ক্রিনের মায়াজালে বন্দি হয়ে পড়ছে। অথচ এই প্রজন্মই ছিল ইসলামের প্রাণশক্তি। জুম‘আর খুতবায় যে উপচে পড়া ভিড় আমরা দেখি, সেই তারুণ্যের জোয়ার যদি ফজরের জামা‘আতেও নিয়মিত পাওয়া যেত, তবে আমাদের সমাজের চেহারাটাই পাল্টে যেত। সর্বত্র শান্তি, ন্যায় আর ইনছাফ প্রতিষ্ঠিত হ’ত। সালাফে ছালেহীন মসজিদ কেন্দ্রিক মানুষ গড়ে তোলার ব্যাপারে তৎপর ছিলেন। হাতেম আল-আ‘ছম (মৃ.২৩৭হি.) বলেন, একবার আমি জামা‘আতের ছালাত মিস করেছিলাম। তখন শুধুমাত্র আবূ ইসহাক আল-বুখারী (রহ.) আমাকে সমবেদনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু যদি আমার কোন সন্তান মারা যেত, তাহ’লে অন্তত দশ হাযার মানুষ এসে আমাকে সমবেদনা জানাত। কারণ তারা দুনিয়ার ক্ষতির চেয়ে দ্বীনের ক্ষতিকে হালকা করে দেখে’। বর্ণনাকারী বলেন, وَكَانَ السَّلَفُ ‌يُعَزُّونَ ‌أَنْفُسَهُمْ ‌ثَلَاثَةَ ‌أَيَّامٍ ‌إذَا ‌فَاتَتْهُمْ ‌التَّكْبِيرَةُ الْأُولَى، وَسَبْعَةً إذَا فَاتَتْهُمْ الْجَمَاعَةُ ‘আর সালাফগণ নিজেদেরকে তিন দিন ধরে সমবেদনা জানাতেন, যদি তাদের তাকবীরে উলা (প্রথম তাকবীর) মিস হয়ে যেত। যদি পুরো জামা‘আত মিস করতেন, তবে সাতদিন পর্যন্ত নিজেকে সমাবেদনা জানাতেন’।[41]

প্রজন্মকে মসজিদমুখী করতে হ’লে আমাদের কঠোর নয়, বরং মমতাময়ী হওয়া প্রয়োজন। কুফার মুওয়াযযিন যুবাইদ আল-ইয়ামী (রহ.) ছিলেন এক অনন্য কারিগর। তিনি কিশোরদের ডেকে বলতেন, ‘তোমরা এসো! ছালাত আদায় কর! আমি তোমাদেরকে বাদাম দিব’। ছালাত শেষে বাচ্চারা তাকে ঘিরে বসত। তাকে এ ব্যাপারে কেউ কেউ কথা শোনালে তিনি উত্তর দিলেন, ‘তাদের জন্য পাঁচ দিরহাম দিয়ে বাদাম কিনে দিতে আমার কিইবা সমস্যা হবে, এর বিনিময়ে যদি তারা ছালাত আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে যায়![42] আমরাও আমাদের সন্তান-সন্ততি, নাতি-পুতি ও তরুণদেরকে এভাবে মসজিদমুখী করার চেষ্টা করতে পারি। তবে এর আগে নিজেদের মসজিদমুখী বান্দা হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। তাহ’লে ছোটরাও আমাদের অনুসরণ করে আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার দীক্ষা পাবে ইনশাআল্লাহ ।

একটি সন্তানকে মসজিদমুখী করার পেছনে মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী (রহ.)-এর জীবন আমাদের এক অনন্য শিক্ষা দেয়। তিনি যখন ইয়াতীম শিশু, তখন তাঁর মহীয়সী মা কনকনে শীতের রাতেও তাঁকে কোলে নিয়ে ফজরের জামা‘আতে যেতেন। সন্তানকে মসজিদের ভেতরে জামা‘আতে শামিল করিয়ে মা বাইরে অপেক্ষা করতেন। ছালাত শেষে আবার সেই শিশুকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। মায়ের সেই কষ্টের ফসল বৃথা যায়নি। সেই শিশুটিই পরবর্তীতে উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার এবং ইলমী জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হয়েছিলেন।

তাই আমরাও আমাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তুলি যাতে তারা কেবল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়; বরং আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হবে, আল্লাহর ঘরের নিয়মিত মুছল্লী হিসাবে বরিত হবে। মসজিদমুখী প্রজন্ম গড়ে তোলার মাধ্যমেই মূলত এ জাতির দুর্দশা দূর করা সম্ভব। যে প্রজন্ম মসজিদের সাথে সম্পর্ক রাখবে, পৃথিবীর কোন শক্তি তাদের পরাজিত করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ।

মা-বোনদের অন্তর কিভাবে মসজিদমুখী হবে?

শারঈ বিধান অনুযায়ী মহিলারাও মসজিদে ছালাত আদায় করতে পারে, তবে তাদের জন্য ঘরে ছালাত আদায় করাই উত্তম।[43] এর অর্থ এই নয় যে, মসজিদের সাথে তাদের কোন আত্মিক সম্পর্ক থাকবে না। তারাও বিভিন্ন উপায়ে তাদের অন্তরকে মসজিদের সাথে সংযুক্ত রাখতে পারেন এবং মহা পুরস্কারের অংশীদার হ’তে পারেন। যেমন-

১. পুরুষদের উৎসাহিত করা : একজন নারী তার স্বামী, পিতা, ভাই ও সন্তানদের মসজিদের প্রতি উৎসাহিত করার মাধ্যমে একজন দাঈর ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাদের মসজিদে যাওয়ার জন্য প্রস্ত্তত করে দেওয়া, সময়মতো স্মরণ করিয়ে দেওয়া- এইসব কাজে তিনি তাদের সমান ছওয়াবের অংশীদার হবেন ইনশাআল্লাহ।

২. বাড়িতে ছালাতের স্থান নির্ধারণ করা : ঘরে একটি নির্দিষ্ট, পবিত্র ও শান্ত জায়গা ছালাতের জন্য নির্ধারণ করবেন। এই স্থানটি হবে তার ব্যক্তিগত মসজিদের মত। যখনই মসজিদে আযান হবে, তিনি সংসারের সব কাজ ছেড়ে দিয়ে সেই স্থানে ছালাতে দাঁড়িয়ে যাবেন। এতে তার অন্তরও মসজিদের জামা‘আতের সাথে সংযুক্ত থাকবে। আর তিনি একাকী ছালাত আদায় করলেও জামা‘আতের নেকী পাবেন ইনশাআল্লাহ।

৩. মসজিদে আর্থিক সহযোগিতা : মসজিদ নির্মাণ, সংস্কার বা পরিচালনায় আর্থিকভাবে অংশগ্রহণ করা নারীদের জন্য ছাদাক্বায়ে জারিয়ার এক বিশাল সুযোগ। অল্প কিছু অর্থ দিয়েও তিনি আল্লাহর ঘর নির্মাণে অংশ নিয়ে জান্নাতে নিজের জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে নিতে পারেন।

৪. দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণ : যখন শারঈ পর্দা ও নিরাপত্তার সাথে মসজিদে মহিলাদের জন্য দ্বীনী তা‘লীমের ব্যবস্থা থাকে, তখন সেখানে অংশগ্রহণ করা তাদের ঈমানকে সতেজ করার একটি উৎকৃষ্ঠ উপায় হ’তে পারে। তাছাড়া নিয়মিত জুম‘আর ছালাতে অংশ গ্রহণের মাধ্যমেও তিনি সরাসরি আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য হাছিল করতে পারেন।

৫. দো‘আ ও ভালোবাসা : মসজিদের প্রতি অন্তরে ভালোবাসা পোষণ করবেন। তিনি দো‘আ করবেন যে, ‘হে আল্লাহ! আপনার ঘরকে আবাদ রাখুন। যারা মসজিদের খেদমত করে, তাদের উত্তম প্রতিদান দিন। যারা ছালাত বিমুখ তাদেরকে মসজিদমুখী করে দিন’! এইভাবে তার নিজের মত করে দো‘আ করবেন। তার এই আন্তরিক ও ভালোবাসাপূর্ণ দো‘আই তার হৃদয়ে সর্বদা মসজিদমুখী করে রাখবে ইনশাআল্লাহ ।

আল্লাহ্ ঘরের প্রতি নারীদের আত্মার বন্ধন থাকতে পারে এবং সেই আবেগ কত গভীর হ’তে পারে- সালাফদের যুগ থেকে তার একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা যেতে পারে। একবার খোরাসান থেকে একটা কাফেলা হজ্জের উদ্দেশে মক্কায় রওনা হ’লেন। তাদের সাথে ছিলেন একজন মহিলা। মসজিদুল হারামে ঢোকার পর মহিলাটি বলতে লাগলেন, ‌أَيْنَ بَيْتُ رَبِّي؟ ‌أَيْنَ بَيْتُ رَبِّي؟ ‘আমার রবের ঘরটা কোথায়? আমার রবের ঘরটা কোথায়?’ তাকে বলা হ’ল, ‘এখনই আপনি আপনার রবের ঘরের কাছে পৌঁছে যাবেন’। হারাম চত্তরে ঢোকার পর তিনি কা‘বা ঘর দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। অতঃপর তাকে কা‘বা ঘর দেখিয়ে বলা হ’ল, ‘এটাই আপনার রবের ঘর’। মহিলাটি কাবায় হেলান দিয়ে গালটা কা‘বার সাথে মিশিয়ে দিলেন। পরম আবেগে অনবরত কেঁদেই চললেন। আর সেই কাঁন্নারত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করলেন’।[44]

উপসংহার :

পরিশেষে বলব, মসজিদ হ’ল আমাদের ঐক্যের প্রতীক এবং আমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের নির্ধারিত স্থান। মসজিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা মানে স্বয়ং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। সেকারণ দুনিয়ার ব্যস্ততা আমাদের যতই গ্রাস করুক না কেন, আযানের সুমধুর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে আমাদের অন্তর যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কোন ব্যস্ততা, অলসতা ও পার্থিব কাজ যেন আমাদেরকে আল্লাহর ঘর থেকে বিমুখ করতে না পারে। আসুন! আমরা আমাদের অন্তরকে মসজিদের সাথেই ঝুলিয়ে রাখি, যাতে ক্বিয়ামতের সেই ভয়াল দিনে আমরা আল্লাহর আরশের ছায়ায় আশ্রয় লাভ করতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ‘মসজিদমুখী’ বান্দা হিসাবে কবুল করুন। আমাদের অন্তরকে মসজিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিন- আমীন! ইয়া রাববাল আলামীন!

আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

. শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।


[1]. বুখারী হা/৬৬০; মুসলিম হা/১০৩১; তিরমিযী হা/২৩৯১; শব্দাবলী তিরমিযীর।

[2]. মুসলিম হা/৬৭১; মিশকাত হা/৬৯৬।

[3]. মোল্লা আলী ক্বারী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ, ২/৫৯১।

[4]. তাবারানী কাবীর হা/৬১৩৯; ছহীহুত তারগীব হা/৩২২, সনদ ছহীহ।

[5]. বুখারী হা/৬৬২; মিশকাত হা/৬৯৮।

[6]. তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, ১০/২৬২, হা/১০৬০৮।

[7]. বুখারী হা/৬৪৫; মুসলিম হা/৬৫০; মিশকাত হা/১০৫২।

[8]. বুখারী হা/৬৪৬৪; মুসলিম হা/৭৮৩।

[9]. বুখারী হা/৬৫৭; মিশকাত হা/৬২৯।

[10]. মুসলিম হা/৬৫৬; আবূদাঊদ হা/৫৫৫; মিশকাত হা/৬৩০।

[11]. তিরমিযী হা/২৪১; ছহীহুত তারগীব হা/৪০৯; সনদ হাসান।

[12]. ইবনে মাজাহ হা/৮০০; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৬০৪; সনদ ছহীহ।

[13]. ছান‘আনী, আত-তানবীর শারহুল জামি‘ইছ ছাগীর, ৯/৩৭৯।

[14]. দুরুশ শায়েখ হুসাইন আল-আফ্ফানী, ৯/১৫; মাওসুআতুল আখলাক, ১/১৩৩।

[15]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/২২১।

[16]. আবূ দাঊদ ৫৬৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৪৪০; সনদ ছহীহ।

[17]. আল্লমা কাসেমী, মাহাসিনুত তাবীল (তাফসীরে কাসেমী), ৫/৩৭।

[18]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/৪০৬।

[19]. আব্দুর রায্যাক্ব সান‘আনী, মুছান্নাফ আব্দুর রায্যাক, ১/৩৫৮।

[20]. আবূদাঊদ হা/৫৫৮; মিশকাত/৭২৮; সনদ হাসান।

[21]. তিরমিযী হা/৩৩০; ইবনু মাজাহ হা/৭৯৯, সনদ ছহীহ।

[22]. বুখারী হা/৪৪৫; মুসলিম হা/৬৪৯।

[23]. যারকাশী, ই‘লামুস সাজিদ বিআহকামিল মাসাজিদ, (মিসর: দারুল আওক্বাফ, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪০৩ হি.) পৃ. ৩০২।

[24]. ইবনু আব্দিল বার্র, আল-ইস্তিযকার, ১/৩৭৯।

[25]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব (হায়দারাবাদ : মাত্ববা‘আতুল মা‘আরেফ আন-নিযামিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৩২৫-১৩২৭হি.), ১/১৭৩।

[26]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ১/৩৮৮।

[27]. ইবনে তায়মিয়াহ, মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ১১/২৯০।

[28]. মুসলিম হা/৬৫৪; মিশকাত হা/১০৭২।

[29]. মুসলিম হা/৬৫৩; মিশকাত হা/১০৫৪

[30]. ইবনু রজব হাম্বলী, ফাতহুল বারী ৫/৪৫৮।

[31]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাক্বাতুল কুবরা (কায়রো : মাকতাবাতুল খানজী, ১ম মুদ্রণ, ১৪২১হি./২০০১খৃ.), ৮/৩০৯।

[32]. তাবারাণী, মু‘জামুল কাবীর হা/৭৪৭৩; মুস্তাদরাক হাকেম হা/;সনদ হাসান ছহীহ।

[33]. মুসলিম হা/২৬৯৯; মিশকাত হা/২০৪।

[34]. আহমাদ হা/১২৪৫৩; তাবারাণী, মু‘জামুল আওসাত্ব হা/১৫৫৬; ছহীহাহ হা/২২১০, সনদ ছহীহ।

[35]. ইবনু মাজাহ হা/৭৩৮; ছহীহুল জামে‘ হা/৬১২৮; ছহীহুত তারগীব হা/২৭১, সনদ ছহীহ।

[36]. আবূ দাঊদ হা/৫৪৭; মিশকাত হা/১০৬৭, সনদ হাসান।

[37]. আবূ নু‘আইম ইছফাহানী, হিলয়াতুল আওলিয়া ৬/১২৬।

[38]. খত্বীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ ২/৪০৪।

[39]. ইবনুল ইমাদ হাম্বলী, শাযারাতুয যাহাব, তাহক্বীক্ব : মাহমূদ আরনাঊত্ব (দামেশক্ব : দারু ইবনে কাছীর, ১ম মুদ্রণ, ১৪০৬হি./১৯৮৬খৃ.), ৮/৬৭।

[40]. বুখারী হা/২১০১; মুসলিম হা/২৬২৮।

[41]. শিহাবুদ্দীন আবশীহী, আল-মুস্তাফরাফ ফী ফান্নিল মুসতাযরিফ ( বৈরূত : আলামুল কুতুব, ১ম মুদ্রণ, ১৪১৯হি.), পৃ. ১৪।

[42]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৫/২৯৭।

[43]. আবূ দাঊদ হা/৫৬৭; মিশকাত হা/১০৬২, সনদ ছহীহ।

[44]. মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক্ব আল-ফাক্বেহী (মৃ. ২৭২হি.), আখবারু মাক্কাহ (বৈরূত : দারু খিযর, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৪হি./১৯৯৪খ্রি.), ১/১৬৭






বিষয়সমূহ: মসজিদ
কুরআন সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের সংশয় ও তার জবাব (২য় কিস্তি) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
জুম‘আর পূর্বে সুন্নাতে রাতেবা : একটি পর্যালোচনা - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
হতাশার দোলাচলে ঘেরা জীবন : মুক্তির পথ - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
বিজ্ঞানের আলোকে ছিয়াম - আ.স.ম. ওয়ালীউল্লাহ
ভাগ্য গণনা
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ : একটি পর্যালোচনা - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
ইসলামী বিচার ব্যবস্থার কল্যাণকামিতা - শেখ মুহাম্মাদ রফীকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, পাইকগাছা সরকারী কলেজ, খুলনা
বৈঠকের আদব বা শিষ্টাচার - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
নফসের উপর যুলুম - ইহসান ইলাহী যহীর
ছিয়ামের ফাযায়েল ও মাসায়েল
সমাজে অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে কুরআনে বর্ণিত শাস্তিবিধানের অপরিহার্যতা (২য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
জীবনের খেলা ঘরে - মাওলানা মুহিউদ্দীন খান - প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মাসিক মদীনা
আরও
আরও
.