আমি জীবনে যতগুলো চির-যৌবনা বস্ত্ত দেখেছি, ‘লেখা’ তার মধ্যে অন্যতম। একটি সুলিখিত বইয়ের যৌবন কখনো শেষ হয় না। কখনো তার লেখক পাঠকের মন থেকে আড়াল হন না। তিনি মৃত্যুর পরেও অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকেন তার কলম-কালির মাঝে। অনেক লেখকের নাম শুনলে মনে হয়, হয়ত তিনি বেঁচেই আছেন। অথবা হয়ত কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি দুনিয়া ছেড়েছেন হাযার বছর আগে। যখন শুনি, তিনি হাযার বছর আগের মানুষ, তখন বেশ আশ্চর্য হই। সত্যি! এভাবে লোক-আলোচনায় জীবিত থাকতে শুধু লেখকরাই পারেন।
আমি কখনো কলম দেখে অবাক হই। এই অতি-সাধারণ একটি ছোট্ট বস্ত্ত দিয়ে কিভাবে সবকিছু বদলে দেয়া যায়! কিভাবে মিথ্যা ও বাতিলের বিরুদ্ধে অভেদ প্রাচীর তৈরি করে দেয়া যায়! কিভাবে যালেম-শাহীর মসনদে ভূমিকম্পের মত কাঁপন ধরানো যায়! কিভাবে অনির্বাণ দাবানলের মত পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা যায় অপসংস্কৃতি আর বেহায়াপনার আগ্রাসন! পরিবেশ ও পরিস্থিতির মোকাবিলায় কিভাবে এই কলম হঠাৎই ধারালো তরবারিতে রূপ নেয়! আমি সত্যিই কলম দেখে অবাক হই।
আমি কলমের কালি দেখে অবাক হই। যে কলমের কালির মাধ্যমে এই ধরণীর বুকে বার বার উত্থান আসে। যুগে যুগে হাযার হাযার বিপ্লবী জীবন দিতে সারিবদ্ধ হয়। আমি বুঝতাম না, লেখকের লেখা কিভাবে বেঁচে থাকে। এরপরে যখন চবিবশের অভ্যুত্থানে রাজপথে কাযী নযরুলের লেখা ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ শুনলাম তখন বুঝতে পারলাম, এটাকে বলে লেখার বেঁচে থাকা। ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ এখনো বেঁচে আছে। যুগে যুগে যখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ জাগবে, তাদের সাথে জেগে উঠবে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট...’ ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু...’ ‘চল চল চল...’। এভাবেই যুগে যুগে নযরুল জেগে উঠবে। এভাবে জেগে উঠতে কেবল লেখকরাই পারে।
এজন্য ভাব প্রকাশের সবগুলো মাধ্যমের মাঝে লেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা স্থায়ী। এটা অমর। আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরাও লেখক হোক। তারা দুনিয়ার বুকে যে পদচিহ্ন রেখে যাবে সেই পদচিহ্ন মানুষ শতাব্দীকাল ধরে আগলে রাখুক। যদিও আজ আমাদের ছাত্ররা দুনিয়াবী স্বাচ্ছন্দ্য, যশ ইত্যাদির পেছনে পড়ে ভিন্ন মাধ্যমে চলে যায়। হয়ত তারা কলমকে সেভাবে কোনদিনও দেখেনি, যেভাবে আমরা দেখেছি। এর মাঝেও অনেকে আসে লেখা শিখতে। কিভাবে লেখা শুরু করলে পুরোদস্ত্তর লেখক হওয়া যাবে সে বিষয়ে পরামর্শ চায়। আমরা তাদেরকে কলমী জিহাদের এই ঊষর প্রান্তরে জানাই আহলান-সাহলান। তোমরা আমাদের ছাদাকবায়ে জারিয়ার খনি। তোমরা আমাদের উত্তরসূরী। তোমাদেরকে কলম ধরা শেখাতেই এই শিক্ষা পরামর্শ।
রোজনামচা : যখন তুমি কলম ধরা শিখতে যাবে তখন প্রথম সমস্যা হবে, ‘লিখতে চাই, তবে কি লিখব সেটা বুঝতে পারছি না’। এজন্য আমরা শুরুর ধাপে রোজনামচা লেখার পরামর্শ দেই। রোজনামচা হ’ল, প্রতিদিন একটি খাতায় তুমি কিছু লিখবে। সেটা তোমার সারাদিনের কাজ হ’তে পারে। সারাদিনের মধ্যে কোন একটি কাজ হ’তে পারে। তোমার দেখা বা তোমার সাথে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা হ’তে পারে। তোমার বন্ধুর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা হ’তে পারে, যা তুমি দেখনি, তবে শুনেছ। আবার ঘটেনি, তবে তুমি মনে মনে ভেবেছ এমন কোন ঘটনা বা চিন্তাও হ’তে পারে।
মোটকথা, তুমি প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় ডায়েরি বা নোটবুক নিয়ে লিখতে বসবে। আমি এখানে অনেকগুলো লেখার বিষয় খুঁজে দিয়েছি। তারপরও এমন হ’তে পারে, কোন লেখাই আসছে না। সেদিন তুমি গুছিয়ে এটাই লিখবে যে, ‘আজকে আমার লেখা আসছে না’। লেখা না আসার অনুভুতিগুলো লিখবে। এটাই রোজনামচা। প্রতিদিনের রোজনামচা লেখার পরে তারিখ, বার, সময়, স্থান লিখে রাখবে। কারণ তুমি যখন রোজনামচা লেখায় পাকা হয়ে উঠবে তখন তোমার রোজনামচার নোটবুক হবে সেই জায়গার ইতিহাস।
পরামর্শদাতা নির্ধারণ : লেখা শেখার যাত্রা অনেক লম্বা। দু’এক মাসে লেখক হওয়া যায় না। লেখালেখির এই লম্বা যাত্রায় যেন তুমি পথ হারিয়ে না ফেল এজন্য একজন পরামর্শদাতার সাথে পরামর্শ করে পথ চলবে। খেয়াল রাখবে, পরামর্শদাতা যেন বিশুদ্ধ আক্বীদা ধারণকারী লেখক হন। কারণ বাংলা সাহিত্যের হরফে হরফে যৌনতার বিষ রয়েছে। রয়েছে হিন্দুয়ানীর জয়-জয়কার। এজন্য অনেকেই সাহিত্যের পথে চলতে গিয়ে আদর্শ থেকে ছিটকে পড়ে। ভ্রান্ত পথে চলে যায়। তুমি যেন তেমন না হও। তুমি যেন সাহিত্য চর্চা করেও সেই বিষ থেকে মুক্ত থাকতে পার। আবার আমার এই লেখা পড়েই পরামর্শদাতা খুঁজতে বেরিয়ে যেও না। আগে একমাস রোজনামচা লেখ। যদি ধারাবাহিক একমাস রোজনামচা লেখা চালিয়ে যেতে পার তবে তোমার এই পথের যাত্রা যুক্তিযুক্ত। অন্যথায় পরামর্শদাতার সময় নষ্ট করো না।
পরামর্শদাতার সাথে প্রতিদিন যোগাযোগের প্রয়োজন নেই। প্রতি সপ্তাহে একবার সাক্ষাৎ করলেই হবে। তিনি তোমার এক সপ্তাহের লেখায় নযর বুলিয়ে একটি সার্বিক মন্তব্য লিখে দিবেন। কোন বিষয়গুলো ভুল হয়েছে, কোন জিনিসগুলো সামনে খেয়াল রাখতে হবে, আগামী এক সপ্তাহে কোন বইগুলো পড়তে হবে এগুলো বিষয়ে পরামর্শ দিবেন। সেই দিকনির্দেশনাগুলো মেনে এক সপ্তাহ পড়া-লেখার পরে তুমি আবারো সাক্ষাৎ করবে। আবার আগামীর জন্য দিক-নির্দেশনা আসবে। এভাবেই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
ধৈর্যের সবক গ্রহণ : একজন লেখককে সর্বপ্রথম ধৈর্যশীল হ’তে হবে। যদি ধৈর্য না থাকে তবে লেখা শেখা যায় না। কারণ লেখালেখি আর ১০টা কাজের মত নয়। কখনো এমন হ’তে পারে, খাতা-কলম নিয়ে বসে আছ, ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে, তবে কোন লেখা আসছে না। টানা তিন-চারদিন ধরে লেখা আসছে না। আবার লেখা হচ্ছে, তবে তা নিজেকেই পড়তে ভাল লাগছে না। পরামর্শদাতার কাছে গেলে তিনি সময় দিচ্ছেন না। ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন বা ভিন্ন কোন সময়ে আসতে বলছেন। পরিবার বলছে, লেখক হ’তে হবে না, বক্তা হও; বক্তব্য শিখ। তুমি দেখছ, এতদিন ধরে লিখে কেউ কোনদিন মূল্যায়ন করল না। অথচ টুকটাক বক্তব্য শিখে জুম‘আর খুৎবা দিলেই পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।
এই পরিস্থিতিগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী কলম ছেড়ে দেয়। এজন্য তুমি খেয়াল করে দেখবে, জনপ্রিয় লেখকের সংখ্যা বেশী নয়। টুকটাক লেখালেখি করে এমন অনেকেই আছে। তবে দোয়াত-কলমেই জীবন উৎসর্গ করেছেন এমন লেখকের সংখ্যা হাতের আঙগুলের মাঝে সীমাবদ্ধ। সুতরাং তুমি যদি সত্যিকারের লেখক হ’তে চাও তবে তোমাকে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চাকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকতে হবে। তারপরে দেখবে হঠাৎই একদিন তোমার কলমের বুক চিরে আলো বিচ্ছুরিত হ’তে শুরু করেছে। সেই আলোয় অনেক দিনের জমে থাকা কষ্টগুলো বরফের মত গলতে শুরু করেছে। তবে তার আগে তোমাকে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।
একই লেখা বার বার আসা : রোজ নামচা লিখতে গিয়ে আমরা যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হই তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল, ‘একই লেখা বার বার আসে। নতুন লেখা খুঁজে পাই না’। শুরুর দিকে এই সমস্যা খুবই স্বাভাবিক। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের মনের সাথে কলম সংযুক্ত থাকে না। মনের সাথে মুখ সংযুক্ত থাকে। তাই মনের কথাগুলো মুখে অনায়াসে আসলেও কলমে আসতে চায় না। খেয়াল করলে দেখবে, আমরা যখন বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্প করি তখন একই গল্প বার বার করি না। বরং আমাদের কাছে এত গল্প থাকে যে একবার করে বললেও সারাদিনে যেন গল্পই ফুরাতে চায় না। অথচ সেই আমি যখন কলম নিয়ে বসছি তখন আমার কলমে আর কোন কথা আসছে না। এজন্য মনের সাথে কলমকে সংযুক্ত করতে হবে। এর পদ্ধতি হ’ল, রোজনামচা। অর্থাৎ মনের সব কথা শুধু মুখেই না বলে প্রতিদিন কিছু কথা কলম দিয়েও বলতে হবে। যদি এভাবে নিয়মিত মনের কথাগুলো কলমে আসতে থাকে তবেই মনের সাথে কলম সংযুক্ত হবে। ধীরে ধীরে দেখা যাবে, মন কলমের মর্যাদা বুঝবে। সারাদিনের সুন্দর সুন্দর কথাগুলো জমিয়ে রাখবে কলমের মাধ্যমে বলার জন্য। এই পরিস্থিতি লিখতে লিখতেই একসময় তৈরি হয়ে যাবে।
নিজের লেখা নিজের কাছে মনঃপুত হয় না : কয়েকদিন রোজনামচা লেখার পরে যে সমস্যা প্রকাশ্যে আসে তা হ’ল, ‘অন্যান্য লেখকদের লেখা কত সুন্দর! অথচ আমার লেখা নিজের কাছেই ভাল লাগে না’। এটা মূলত একই লেখা বার বার আসার কারণে হয়। আবার লেখার বিষয়বস্ত্ত সুন্দর না হওয়ার কারণেও হ’তে পারে। তবে এখানে ঘাবড়ানোর কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তুমি নিজের যে লেখা পড়ে হতাশ হচ্ছ সেটা সম্পাদনা করা হয়নি। আর অসম্পাদিত লেখা হ’ল শুধু ইটের তৈরি দেয়ালের মত। যা দেখতে খুব একটা সুন্দর নয়, এবড়ো থেবড়ো। যখন এই দেয়াল প্লাস্টার করা হবে, তারপরে রং করা হবে তখন সেটা দেখতে কতই না সুন্দর হবে। তাই না?
তুমি যে লেখাগুলো পড়ে মন্ত্রমুগ্ধ হও সে লেখাগুলো বহুবার সম্পাদিত। তাছাড়া সব লেখা শুরুর অবস্থায় এমনই থাকে। সেটা যখন ঘষে-মেজে পলিশ করে রং করা হয় তখন সেটার চেহারা বদলে যায়। সুতরাং শুরুর দিকে যেমন হচ্ছে তেমনই হোক। ধাপে ধাপে তুমিও সম্পাদনা শিখবে। তুমিও একটি লেখা কাটা-ছেঁড়া করে তার চেহারা বদলে দিতে পারবে। সে পর্যন্ত নিজের কাজ চলমান রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, তুমি নতুন। যিনি এই পথে দশ বছর অতিবাহিত করেছেন তার লেখা, আর তোমার লেখা মানের দিক থেকে কখনোই এক হবে না। সুতরাং হতাশ হয়ো না।
লিখতে বসলে অলসতা কাজ করে : এটা দুয়েক সপ্তাহ লেখার পরে তুমি অনুভব করবে। লিখতে বসতে মন চাইবে না। এর কারণ হ’ল অনুপ্রেরণার অভাব। তোমার মন তোমাকে বলবে, ‘আমার কলমে কোন সুন্দর লেখা আসে না। আমার লেখা পড়ে কেউ প্রশংসা করে না। আমার লেখা কোন পত্রিকায় ছাপা হয় না। এভাবে শুধু লিখে কি লাভ’! দেখ! কারো লেখাই শুরুতে পত্রিকায় ছাপা হয় না। মানুষ প্রশংসা করে না। এটা অনেক দূরের যাত্রা। তবে সেখানে পৌঁছানো অসম্ভব নয়। এর জন্য মেহনত প্রয়োজন আছে, দো‘আর প্রয়োজন আছে। যা তোমার মাধ্যমে খুব সম্ভব।
কালী প্রসন্ন ঘোষ লিখেছেন, ‘জলে না নামিলে কেহ শেখে না সাঁতার, হাঁটিতে শেখে না কেহ না খেয়ে আছাড়, সাঁতার শিখিতে হ’লে আগে তব নাম জলে, আছাড়কে করে হেলা হাঁট বারে বার, পারিব বলিয়া সুখে হও অগ্রসর’। তোমাকেও এতটুকু অনুপ্রেরণা বুকে নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে, যেন অনুপ্রেরণা তো দূরের কথা; মানুষ যদি তোমাকে সকাল-বিকেল হতাশার কথা শোনায় তবুও তুমি তোমার কাজে অটল থাকতে পার। এরপরে একটি সময় আসবে, যখন সকলেই তোমাকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম, দো‘আ ও দক্ষতা সৃষ্টির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি তোমাকেই তৈরি করতে হবে। লেখালেখির মাঠে চলে এসেছ মানেই তুমি এখন যোদ্ধা। আর অলসতা, অনাগ্রহ, অনুপ্রেরণার অভাববোধ হ’ল সাধারণ মানুষের বিষয়। এগুলো কোন যোদ্ধার জন্য সাজে না।
রোজনামচায় নতুনত্ব : রোজনামচা লেখার জন্য বেশ কিছু উপাদান ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে। তারপরও যদি একঘেঁয়েমি চলে আসে তবে সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু পরামর্শ থাকবে। প্রথমত তোমাকে মনে রাখতে হবে, লেখকরা সর্বদা বাস্তবমুখী হন না। তারা বাস্তবতাকে ব্যবহার করেন। বাস্তবতার সাহায্য নেন। কারণ বাস্তব জীবনে যে ঘটনাগুলো ঘটে সেগুলো মুখরোচক বা চটকদার হয় না। লেখকরা দেখেন, কোন বিষয়টি অস্বাভাবিক করে প্রকাশ করলে পুরো ঘটনাকে মুখরোচক করে তোলা যায়। তারা বাস্তবতার সেই অংশকে পরিবর্তন করেন। চরিত্রের নাম, জায়গার নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। বাস্তবতাকে রূপ দেন কল্পনার এক জগতে। এভাবে ছদ্মনাম ব্যবহার করে তুমিও অনেক কিছুই লিখতে পার। শুরুর দিকে এই পদ্ধতি তোমাকে লেখার অনেক উপাদান পেতে সাহায্য করবে।
রম্য লেখার চর্চা করতে পার। রম্য লেখা হ’ল, যা বাস্তব নয় তবে বাস্তবতা সম্পর্কে তথ্য দেয়। যেমন তোমরা আরবী সাহিত্যের ‘কালীলা ওয়া দিমনাহ’ পড়েছ। তোমরা সিংহ ও ইঁদুরের গল্প পড়েছ। তোমরা শেয়াল ও বকের গল্প পড়েছ। যে গল্পগুলো বাস্তব নয়। তবে মানুষের জীবন ঘনিষ্ট অনেক বিষয়ের শিক্ষা বর্ণনা করে। তুমি যদি মনে কর, কোন বিষয়ে সরাসরি বর্ণনা দিলে তা সমস্যা সৃষ্টি করবে, তবে তুমিও এভাবে রূপক অর্থে গল্প লিখতে পার। এতে করে তোমার উদ্দেশ্যও সাধন হবে, আবার সমস্যাও হবে না।
আরেক ধরনের রম্য লেখা হয়, যেখানে মানুষকেই চরিত্রে রাখা হয়। তবে পাঠক বুঝতে পারে, এখানে যে গল্প বলা হচ্ছে সেটা উদ্দেশ্য নয় বরং লেখক এখানে ভিন্ন কোন তথ্য দিচ্ছেন। এমন লেখার একটি উদাহরণ হ’ল, ‘সেদিন এক ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া! পরীক্ষার জন্য কী ‘পরতে’ হবে?’ প্রশ্ন শুনে আমি একইসাথে অবাক ও বিরক্তবোধ করলাম। বললাম, ‘তোমার যে পোশাক ভাল লাগে সেটাই পরতে পারো’। সে কোন পোষাক পরবে সেটাও কি আমাকে বলে দিতে হবে? আজব দুনিয়া! সে বলল, ভাইয়া! এইসব কি বলছেন? জানতে চাচ্ছিলাম, কি বই ‘পরতে’ হবে? ওহ! এতক্ষণে বুঝলাম, সে আসলে জানতে চেয়েছে, কী বই ‘পড়তে’ হবে। ‘পরা’ আর ‘পড়া’ দু’টো এক নয়। ‘পরা’ মানে পরিধান করা। আর ‘পড়া’ মানে পড়াশোনা করা, ক্ষেত্র বিশেষে তা ‘পড়ে যাওয়া’ বুঝায়।
রোজনামচা ঘষা-মাজা : আশা করছি, তুমি লেখার অনেকগুলো উপাদান পেয়ে গেছ। আল্লাহ তোমাকে আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে কাজে লেগে থাকার তাওফীক দান করুন- আমীন। টানা কয়েক সপ্তাহ রোজনামচা লেখার পরে সময় আসবে সেগুলোকে আরো বেশী সুন্দর করার। রোজনামচা সুন্দর করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত রোজনামচার গ্রুপ তৈরি করতে হবে। যারা রোজনামচা লেখে তারা কয়েকদিন পর পর একসাথে বসে একে অপরের রোজনামচা পড়বে এবং প্রশংসা বা সমালোচনা করবে। যদি গ্রুপ তৈরি করা সম্ভব না হয় তবে অন্তত একজন পাঠক বা সাথী যোগাড় করতে হবে। যে প্রতিনিয়ত রোজনামচাগুলো পড়বে এবং মন্তব্য লিখে দিবে।
লেখার সমালোচনা শিখতে হবে। বানানগুলো ঠিক আছে কি না, প্রকাশভঙ্গি ঠিক আছে কি-না ইত্যাদি বিষয় মন্তব্য করতে হবে। মনে রাখবে, যতদিন এই সমালোচনা চালু থাকবে ততদিন লেখা উন্নত হবে। যখন সমালোচনা বন্ধ হয়ে যাবে তখন লেখার উন্নতিও বন্ধ হয়ে যাবে। ঝরঝরে বাংলা পড়তে পারে এমন একজন পাঠক থাকা ভাল। সে স্বাভাবিক স্বরে রোজনামচা পড়ে শোনাবে। এতে সহজেই বোঝা যাবে, কোন বাক্য পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন। কারণ লেখার মাঝে উঁচু-নীচু-অসমতল তখনই বোঝা যায়, যখন তা উচ্চস্বরে পাঠ করা হয়।
যদি এতটুকু ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয় তবে আমরা একটি রোজনামচার প্রাথমিক সম্পাদনার বিষয়ে ধারণা দেব। একটি রোজনামচা প্রাথমিকভাবে সম্পাদনা করার জন্য প্রথমে দেখতে হবে, কথাগুলো ধারাবাহিক হয়েছে কি-না। যদি ঘটনা বর্ণনায় আগ-পিছ হয়ে যায় তবে তা ঠিক করতে হবে। এরপরে দেখতে হবে, দু’টি বাক্যের মাঝে কোন ফাঁকা বা অস্পষ্টতা থেকে গেছে কি-না। কোন সমস্যা থাকলে সেখানে নতুন বাক্য যোগ করে বাক্যের সমতা রক্ষা করতে হবে। এরপরে দেখতে হবে, প্যারাগুলো ঠিক স্থানে শেষ হয়েছে কি-না। প্যারা হ’ল পাঠকের থামার জায়গা। প্রথমদিকে এটা বোঝা যায় না, পাঠককে কোথায় রেস্ট দিতে হবে। দেখা যায়, বক্তব্যের মাঝে প্যারা হয়ে যায়। আবার অনেকে তো ইয়া লম্বা লম্বা প্যারা করে। ফলে পাঠক পড়তে গিয়ে অস্বস্থিতে ভোগে।
এরপরে বাক্যের সৌন্দর্য বর্ধনে শব্দ বা বাক্যাংশ যোগ করতে হবে এবং বাক্যগুলো ঘষামাজা করে চকচকে করতে হবে। আমি একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি। মনে কর, আমি দু’টি বাক্য লিখেছি এমন, ‘ঘরে খু্ব গরম। পূর্বদিকের জানালা খুলে দিতেই গায়ে বাতাস লাগল’। এই বাক্য দু’টিকে এভাবে পরিবর্তন করা যায়, ‘ঘরজুড়ে ভ্যাপসা গরম। পুবের জানালা খুলতেই স্নিগ্ধ শীতল সমীরণ যেন অন্তর ছুঁয়ে গেল’। আবার আরো দু’টি বাক্য যেমন, ‘দুপুর বেলা মরুর বুকে হেঁটে চলেছি। ঘামে ভেজা জামায় মাঝে মাঝে বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে’। এই বাক্যটাকে এভাবেও বলা যায় যে, কাঠফাটা রোদের দুপুরে রসহীন মরুর বুকে অবিরাম পথ চলছি। ঘামে ভেজা স্যঁাতসেঁতে জামায় মাঝে মাঝে বাতাসের শীতল পরশ অনুভব করছি’।
আমি এখানে তেমন কিছুই করিনি। শুধু শব্দ বিশেষণ যুক্ত করেছি। গরম থেকে ভ্যাপসা গরম, দুপুর থেকে কাঠফাটা রোদের দুপুর, মরু থেকে রসহীন মরু। এতেই কিন্তু বাক্যের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সুতরাং তোমাকে ভাল লেখক হ’তে হ’লে শব্দ বিশেষণ জানতে হবে। একটি নোটবুকে আলাদা করে বাতাসের নাম, রঙের নাম, অনুভূতির নাম, স্বাদের নাম ইত্যাদি লিখে লিখে মুখস্থ করতে হবে। যেগুলো শব্দ লেখা সম্পাদনার সময় তোমার কাজে আসবে। এভাবে খুব সহজেই তুমি একটি লেখার চেহারা পরিবর্তন করতে পারবে ইনশাআল্লাহ। প্রাথমিক সম্পাদনার শেষ ধাপ হবে, প্রতিটি বানান আলাদাভাবে যাচাই করা। তারপরে তুমি নিজেই নিজের লেখার পরিবর্তন দেখে আশ্চর্য হবে।
শেষ কথা : আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা তোমাদেরক রোজনামচার সাথে পরিচিত করিয়েছি। প্রধম ধাপে কিভাবে লিখতে হয়, কি লিখতে হয় এই সম্পর্কে ধারণা দিয়েছি। শিক্ষার্থী হিসাবে কলম তোমাদের হাতে সর্বদাই থাকে। আমরা চাই, তোমরা আবার নতুনভাবে কলম ধর। শিক্ষার্থী হিসাবে নয়, লেখক হিসাবে। মেহনত ও দো‘আর ইহতেমামের মাধ্যমে নিজের কলমকে ক্ষুরের চেয়েও ধারালো বানাও। মনে রাখবে, এটা অনেক যত্নের বিষয়। একটি ক্ষুর হয়ত একবেলায় ধারালো করা যায়। তবে কলমে ধার দিতে বছরের পরে বছর সময় লাগে। তবে কলমে যদি একবার ধার দিতে পার তখন দেখবে কলম দিয়ে সবই কাটা যায়।
আমরা চাই, তোমরা কলমী যোদ্ধা হও। যোদ্ধা হওয়ার যে পদক্ষেপ তা আজ থেকেই শুরু কর। আজ থেকেই রোজনামচা লেখা শুরু কর। বন্ধুদের সাথে আলোচনা কর। তারাও যেন তোমার সাথী হয়। শিক্ষকদের সাথে আলোচনা কর। তারা যেন তোমাদের সহযোগী হন। তোমাদের জন্য দো‘আ করেন। আপাতত রোজনামচার দিকনির্দেশনাগুলো মেনে লেখা শুরু কর। আগামী সংখ্যায় আবারো দেখা হবে লেখালেখির ভিন্ন কিছু পরামর্শ নিয়ে।