ভূমিকা :

হজ্জ মুমিনের জন্য পাপমুক্তি ও আখেরাতের পাথেয় সঞ্চয়ের অনন্য মাধ্যম। বর্তমানে হজ্জের সফর আরামদায়ক ও যান্ত্রিক হ’লেও এতে পূর্বসূরী বা সালাফে ছালেহীনদের মতো ইখলাছ ও একনিষ্ঠতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। সালাফগণ ইহরামের শুভ্রতার কাফনে এবং আরাফার ময়দানে কিবয়ামতের ভয়াবহতা অনুভব করতেন। তাদের ‘লাববাইক’ ধ্বনি শুধু কণ্ঠ থেকে নয়; বরং হৃদয়ের গহীন থেকে উৎসারিত হ’ত। লৌকিকতামুক্ত সেই হজ্জ ছিল তাক্বওয়া, ধৈর্য ও বিনয়ের মূর্ত প্রতীক। বর্তমানের বাহ্যিক আড়ম্বর ছেড়ে আমাদের হজ্জকে ‘হজ্জে মাবরূর’ বা কবুল হজ্জে পরিণত করতে সালাফদের সেই তাক্বওয়া ও আত্মিক সফরের আদর্শে ফিরে দেখা আজ একান্ত প্রয়োজন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সেই বিষয়েই আলোকপাত করা হয়েছে।

১. হজ্জের প্রতি সালাফদের প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ :

সালাফে ছালেহীনের কাছে হজ্জ কোন আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না; বরং তা ছিল পরম আগ্রহে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার নিরন্তর কোশেশ। ব্যাকুল হৃদয়ে আল্লাহর পথে ছুটে চলার দুর্নিবার যাত্রা। সম্পদের মোহ, সংসারের মায়া আর শারীরিক ক্লান্তি- সবই হার মানত বায়তুল্লাহ দর্শনের তীব্র তৃষ্ণার কাছে। রবের দরবারে হাযিরা দেওয়ার এই সফরে তাদের ঈমানদীপ্ত আগ্রহ ও অপরিসীম ত্যাগ আমাদের জন্য ইবাদতের এক বিস্ময়কর মানদন্ড হয়ে আছে। হজ্জের এই বিপুল মর্যাদা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে আমীরুল মুমিনীন ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর একটি ঘটনা আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি একবার বের হয়ে একদল আরোহীকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কারা?’ তারা বলল, ‘আমরা হজ্জযাত্রী’। তিনি তিনবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘হজ্জ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য তোমাদের বের করেনি তো?’ তারা বলল, ‘না’। তখন তিনি বললেন,‌لَوْ ‌يَعْلَمُ ‌الرَّكْبُ ‌بِمَنْ ‌أَنَاخُوا ‌لَقَرَّتْ ‌أَعْيُنُهُمْ ‌بِالْفَضْلِ ‌بَعْدَ ‌الْمَغْفِرَةِ ‘এই আরোহীরা যদি জানত তারা কার দরবারে এসে উট নামিয়েছে, তবে ক্ষমা পাওয়ার পর আল্লাহর অনুগ্রহ দেখে তাদের চোখ জুড়িয়ে যেত’। তারপর তিনি বললেন, সেই সত্তবার কসম যার হাতে ওমরের প্রাণ! একটি উট তার পা যখনই উপরে তোলে কিংবা নিচে রাখে, আল্লাহ তার বিনিময়ে আরোহীর একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, একটি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং একটি নেকী লিখে দেন’।[1] জাবের ইবনে যায়েদ (রহঃ) বলেন, ‘আমি নেক আমলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম যে, ছালাত শরীরের শ্রম ঘটায় কিন্তু সম্পদের নয়; ছিয়ামও তদ্রূপ। কিন্তু হজ্জ সম্পদ এবং শরীর উভয়েরই শ্রম ঘটায়। তাই আমার নিকট হজ্জকে এসবের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে হয়’।[2]

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন যে, মহান আল্লাহ বলেছেন,‌إِنََّ ‌عَبْدًا صَحَّحْتُ لَهُ جِسْمَهُ، وَوَسَّعْتُ عَلَيْهِ فِي الْمَعِيشَةِ، تَمْضِي عَلَيْهِ خَمْسَةُ أَعْوَامٍ لَا يَفِدُ إِلَيَّ لَمَحْرُومٌ ‘নিশ্চয়ই আমি আমার যে বান্দাকে শারীরিক সুস্থতা দান করেছি এবং জীবিকায় সচ্ছলতা দিয়েছি, তার ওপর দিয়ে যদি পাঁচটি বছর অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ সে (হজ্জ বা ওমরার উদ্দেশ্যে) আমার দরবারে উপস্থিত হয় না, তবে সে অবশ্যই বঞ্চিত’।[3] এই হাদীছের মর্মকে সালাফগণ গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। প্রখ্যাত তাবেঈ আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ নাখঈ (রহঃ) হজ্জকে এত গুরুত্ব দিতেন যে, যদি শুনতে পেতেন কোন লোকের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে হজ্জ না করে মারা গিয়েছে, তাহ’লে তিনি তার জানাযা ছালাতে অংশগ্রহণ করতেন না।[4] শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) বলেন, ‘মানুষ মাঝে মাঝে তার রবের প্রতি তীব্র আগ্রহ অনুভব করে, সেই আগ্রহ পূরণের ক্ষেত্রে কোন এক মাধ্যমের প্রয়োজন বোধ করে। আর সেটা কেবল হজ্জই পূরণ করতে পারে।[5] ইমাম ইয়াহইয়া ইবন মা‘ঈন (রহঃ) বলেন, ‘দুনিয়া কেবল একটা স্বপেণর মত। আমি চবিবশ বছর বয়সে হজ্জ করেছিলাম। হজ্জের জন্য হেঁটে বাগদাদ থেকে মক্কার উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম। এটা পঞ্চাশ বছর আগের কথা। কিন্তু মনে হচ্ছে যেন গতকালের ঘটনা।[6]

তাবেঈ তাউস ইবনে কায়সান (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, ফরয হজ্জ আদায়ের পর (নফল) হজ্জ করা উত্তম নাকি ছাদাক্বা করা উত্তম? তিনি উত্তরে বললেন, ইহরাম বাঁধা, সফর করা, নির্ঘুম রাত কাটানো, ক্লান্তি সহ্য করা, বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা ও তার পাশে ছালাত আদায় করা, আরাফায় অবস্থান করা, মুযদালিফায় রাত কাটানো এবং জামারায় পাথর নিক্ষেপ করার মত ছাওয়াব আর কোথায় পাওয়া যাবে? অর্থাৎ তিনি হজ্জকেই শ্রেষ্ঠ মনে করতেন’।[7] আর এই শ্রেষ্ঠত্বের স্বাদ সালাফগণ একবার পেয়ে ক্ষান্ত হ’তেন না। বারবার ছুটে যেতেন মক্কার পানে। ইবনে শাওযাব (রহঃ) বলেন, ‘আমি ১০৬ হিজরীতে মক্কায় তাউস (রহ.)-এর জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। আমি লোকজনকে বলতে শুনেছি- হে আবু আবদুর রহমান! আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন। তিনি চল্লিশবার হজ্জ সম্পন্ন করেছিলেন’।[8] কেবল তাউস (রহঃ) নন, তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব, আত্বা ইবনে আবী রাবাহ, আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী, মুহাম্মাদ বিন সূওক্বাহ, হাম্মাদ বিন নাফে‘ (রহঃ)-এর মতো অসংখ্য সালাফ ৪০ বারেরও বেশী হজ্জ ও ওমরাহ সম্পাদন করেছেন। আল্লাহর ঘরের প্রতি তাঁদের নিখাঁদ ভালোবাসা এবং অদম্য আগ্রহের নযীর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইবাদতের এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

সালাফদের এই অভাবনীয় ত্যাগ ও মহববতের আয়নায় যখন নিজের দিকে তাকাই, তখন নিজেকে কত নগন্য মনে হয়। বর্তমানের সফর কতই না সহজ! শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিমান, বিলাসবহুল হোটেল আর আরামদায়ক বাহনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার সফরেই আমরা পৌঁছে যেতে পারি পবিত্র ভূমিতে। কিন্তু আধুনিকতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের সফরের কষ্ট হয়ত কমেছে, তবে এর সাথে সাথে কি আমার অন্তর থেকে সেই ইখলাছ বা একনিষ্ঠতাও হারিয়ে যায়নি? আজ আমরা নিজের অজান্তেই যেন হজ্জ ও ওমরাহকে এক প্রকার আধ্যাত্মিক পর্যটনে পরিণত করে ফেলেছি। ইহরামের কাপড় গায়ে জড়িয়ে রবের ভয়ে অন্তর কাঁপার বদলে আমাদের হাত ব্যস্ত থাকে নিখুঁত একটি সেলফি তোলার চিন্তায়। কা‘বা চত্বরে দাঁড়িয়ে রবের কাছে চোখের পানি ফেলার চেয়ে আমরা অনেক সময় বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়ি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করতে। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন।

২. হজ্জে ইখলাছ ও নিয়তের ব্যাপারে সালাফদের সতর্কতা :

যেকোন ইবাদতের প্রাণ হ’ল ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা। হজ্জের মত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য ইবাদতে নফস বা প্রবৃত্তির ধোঁকা সবচেয়ে বেশী থাকে। তাই সালাফে ছালেহীন হজ্জের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার প্রতি সবচেয়ে বেশী জোর দিতেন। তাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল যেকোন মূল্যে ‘হজ্জে মাবরূর’ বা কবুল হজ্জ অর্জন করা এবং সদ্যভুমিষ্ঠ শিশুর মতো নিষ্পাপ হওয়া। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ حَجَّ للهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ করেছে। যার মধ্যে সে অশ্লীল কথা বলেনি বা অশ্লীল কার্য সম্পাদন করেনি, সে হজ্জ হ’তে ফিরবে সদ্য প্রসবিত সন্তানের ন্যায় (নিষ্পাপ অবস্থায়)’।[9] অন্যত্র তিনি বলেন,وَالْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ ‘কবুল হজ্জের পুরস্কার কিছুই নেই জান্নাত ব্যতীত’।[10] হাসান বাছরী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, হজ্জে মাবরূর (মকবুল হজ্জ) কী? তিনি উত্তরে বললেন, أَنْ ‌تَعُودَ ‌زَاهِدًا: ‌فِي ‌الدُّنْيَا ‌رَاغِبًا ‌فِي ‌الآخِرَةِ ‘হজ্জ থেকে এমন অবস্থায় ফিরে আসা যে, দুনিয়ার প্রতি তোমার অনীহা তৈরি হবে এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে’।[11] ইমাম ইবনে আব্দিল বার্র (রহঃ) কবুল হজ্জের স্বরূপ বর্ণনা করে বলেন, ‘আর মাবরূর হজ্জ হ’ল এমন এক হজ্জ যার মধ্যে কোন লৌকিকতা (রিয়া) এবং যশের আকাঙ্ক্ষা (সুম‘আ) থাকে না; যাতে কোন অশ্লীলতা (রাফাস) ও পাপাচার (ফুসুক) থাকে না এবং যা হালাল অর্থ দ্বারা সম্পাদিত হয়’।[12]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ، ‘আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও ওমরাহ পূর্ণ কর’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/১৯৬)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ক্বারাফী (রহঃ) বলেন, অত্র আয়াতের ‘লিল্লাহ’ শব্দটার নিয়ে ভাবুন। আল্লাহ ছালাত বা অন্য ইবাদতের ব্যাপারে ‘লিল্লাহ’ (আল্লাহর জন্য) বলেননি। কারণ ‘হজ্জ ও ওমরাহতে বেশী পরিমাণে রিয়া হয়ে থাকে। অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টা প্রমাণিত। বহু হাজী আছেন যারা হজ্জের কোন আলোচনা শুনলেই নিজের বা অন্যের হজ্জে কী ঘটেছিল সেটা বলা শুরু করে। হজ্জ ও ওমরাহ যেহেতু রিয়া তথা লৌকিকতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র, সেহেতু এ দু’টির ব্যাপারে ‘লিল্লাহ’ বলা হয়েছে ইখলাছের উপর গুরুত্বারোপ করে’।[13]

আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, ‘নবী কারীম (ছাঃ) একটি জীর্ণ উটের জিন এবং এমন একটি পুরনো চাদর গায়ে দিয়ে হজ্জ করেছিলেন যার মূল্য চার দিরহামও হবে কি-না সন্দেহ। এরপর তিনি (দো‘আ করে) বললেন,اللَّهُمَّ حَجَّةً لَا رِيَاءَ فِيهَا وَلَا سُمْعَةً ‘হে আল্লাহ! এমন একটি হজ্জ নছীব করুন যার মধ্যে লৌকিকতা (রিয়া) নেই এবং খ্যাতির মোহ (সুম‘আ) নেই’।[14]

নবীর এই সুন্নাহকে বুকে ধারণ করে সালাফগণ হজ্জে নিজেদের বিনয়ী করে রাখতেন। একবার ওমর (রাঃ) হজ্জের সফরে মক্কায় ছিলেন। তিনি তার পাশে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা উস্কোখুস্কো চুলে, ধূলিধূসরিত অবস্থায়, ঘাম ও ময়লাযুক্ত দেহে এবং রোদে পুড়ে (হজ্জ করছ); অথচ এর বিনিময়ে তোমরা দুনিয়াবী কোন তুচ্ছ বস্ত্ত আশা করছ না। আমাদের জানামতে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন সফর আর নেই। তিনি আরও বলেন,إِنَّمَا الْحَاجُّ الشَّعِثُ التَّفِلُ ‘প্রকৃত হজ্জকারী তো সেই, যে এলোমেলো চুল ও ঘর্মাক্ত অবস্থায় থাকে’।[15] মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, এক ব্যক্তি ইবনে ওমর (রাঃ)-এর নিকট বলল, ‘হজ্জযাত্রীর সংখ্যা কত বেশী!’ ইবনে ওমর (রাঃ) বললেন, مَا أَقَلَّهُمْ! ‘তাদের সংখ্যা কতই না কম!’ অতঃপর তিনি জীর্ণশীর্ণ ও রশির লাগামযুক্ত এক উষ্ট্রারোহীকে দেখে বললেন, لَعَلَّ هَذَا ‘সম্ভবত এ-ই (প্রকৃত হজ্জকারী)’।[16] কাযী শুরাইহ (রহঃ) বলেন, ‘হজ্জকারী অল্প, কিন্তু আরোহী অনেক। ভালো কাজের ব্যাপারে জ্ঞান রাখেন এমন লোকের সংখ্যা কত বেশী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশীদের সংখ্যা কতই না কম![17]

সালাফদের সেই ধূলিধূসরিত, রিয়ামুক্ত হজ্জের বিপরীতে আজ আমাদের হজ্জের রূপ কতটা বদলে গেছে! আমাদের হজ্জের প্রস্ত্ততি শুরু হয় সবচেয়ে দামী আর বিলাসবহুল প্যাকেজ খোঁজার মধ্য দিয়ে। আমাদের ইহরামের শুভ্র বসনও আজ যেন স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে আমাদের চোখের পানিতে বুক ভাসানোর কথা ছিল, সেখানে আমরা ব্যস্ত থাকি নিজেকে সুন্দরভাবে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করতে। তাওয়াফের চক্করগুলো আজ লাইভ ভিডিওতে পরিণত হয়েছে। হজ্জ থেকে ফিরে এসে মানুষের কাছে নিজের সফরের গল্প শোনানো এবং নামের আগে ‘আলহাজ্জ’ উপাধি শোনার জন্য আমাদের কান উন্মুখ হয়ে থাকে। আল্লাহুল মুস্তা‘আন।

৩. ইহরাম ও তালবিয়া পাঠে সালাফদের অবস্থা :

ইহরাম বাঁধা হজ্জ ও ওমরাহর অন্যতম রুকন। মীক্বাত থেকে ইহরামের শুভ্র কাপড় গায়ে জড়িয়ে যখন একজন মুমিন ‘লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন, তখন তিনি মূলত আকাশ-জমিনের একচ্ছত্র মালিকের দরবারে একজন সমর্পিত দাস হিসাবে নিজের উপস্থিতির জানান দেন। সালাফে ছালেহীনের কাছে ইহরাম ও তালবিয়া ছিল গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির এক অনন্য মুহূর্ত। জুরাইরী (রহঃ) বলেন, একবার আমরা প্রখ্যাত ছাহাবী আনাস বিন মালিক (রাঃ)-এর সাথে হজ্জের সফরে ছিলাম। তিনি ‘যাতু ইরাক্ব’ থেকে ইহরাম বাঁধলেন। আমরা তাঁকে ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার আগ পর্যন্ত আল্লাহর যিকির ছাড়া অন্য কোন কথা বলতে শুনিনি’। অতঃপর তিনি (আনাস (রাঃ) বললেন, يَا ابْنَ أَخِي ‌هَكَذَا ‌الإِحْرَامُ ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র! ইহরাম এভাবেই হ’তে হয়’।[18] হুমাম বিন ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন, আমাকে এমন এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যিনি আনাস ইবনে মালেক (রাঃ)-এর সঙ্গী ছিলেন। তিনি বলেন,فَلَمَّا ‌أَحْرَمَ لَمْ أَقْدِرْ أُكَلِّمُهُ حَتَّى حَلَّ، مِنْ شِدَّةِ اتِّقَاهُ عَلَى إِحْرَامِهِ ‘তিনি (আনাস রা.) যখন ইহরাম বাঁধলেন, তখন থেকে হালাল হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁর সাথে কথা বলার সুযোগই পাইনি। ইহরামের পবিত্রতা ও বিধান রক্ষার প্রতি তাঁর তীব্র সতর্কতা ও তাক্বওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছিল’।[19] খোলাফায়ে রাশেদার প্রখ্যাত বিচারক কাযী শুরাইহ (রহঃ) যখন ইহরাম বাঁধতেন, তখন (গভীর ধ্যানমগ্নতা ও নীরবতার কারণে) তাঁকে যেন একটি বধির সাপ মনে হতো (‌كَأَنَّهُ ‌حَيَّةٌ ‌صَمَّاءُ)’।[20]

তালবিয়া পাঠে ছাহাবায়ে কেরামের আবেগ ও তীব্রতা কেমন ছিল সে ব্যাপারে প্রখ্যাত তাবেঈ আবূ হাযেম আল-আশজা‘ঈ (রহঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণ যখন ইহরাম বাঁধতেন, তখন (তালবিয়া পাঠ করতে করতে) রাওহা নামক স্থানে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের কণ্ঠস্বর ভেঙে যেত’।[21] বকর বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, ‘আমি ইবনে ওমর (রাঃ)-কে তালবিয়া পাঠে উচ্চস্বর করতে শুনেছি। এমনকি আমি পাহাড় থেকে তাঁর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শুনতে পেতাম’।[22] আইয়ুব (রহঃ) বলেন, ‘আমি সাঈদ বিন জুবায়ের (রহ.)-কে মসজিদে হজ্জযাত্রীদের (তালবিয়া পাঠের জন্য) জাগ্রত করতে দেখেছি’।[23] তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ফুটে ওঠে আলী ইবনুল হুসাইন (রাঃ)-এর বর্ণনায়। সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনা (রহঃ) থেকে বর্ণিত, আলী ইবনুল হুসাইন (রহঃ) হজ্জ করতে বের হ’লেন। যখন তিনি ইহরাম বাঁধলেন এবং তাঁর সওয়ারী তাঁকে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন ভয়ে তাঁর চেহারা হলুদ হয়ে গেল, শরীর কাঁপতে শুরু করল এবং তাঁর উপর এক কম্পন দশা সৃষ্টি হ’ল। তিনি ‘লাববাইক’ পাঠ করতে পারছিলেন না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ’ল, আপনি কেন লাববাইক পড়ছেন না? তিনি বললেন, আমি এই ভয়ে ভীত যে, আমাকে না জানি বলা হয়- ‘লা লাববাইকা ওয়া লা সা‘দাইকা’ (তোমার হাযিরা কবুল নয় এবং তোমার জন্য কোন কল্যাণও নেই)। এরপর যখন তিনি লাববাইক পড়লেন, তখনই মূর্ছা গেলেন এবং সওয়ারী থেকে পড়ে গেলেন। হজ্জের পুরোটা সময় তাঁর এই অবস্থা বারবার হ’তে লাগল।[24] সুবহানাল্লাহ!

৪. কা‘বা দর্শন ও তাওয়াফে সালাফদের অবস্থা :

রবের ঘরের প্রতি সালাফদের তীব্র ব্যাকুলতার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত দেখা যায়। একবার খোরাসান থেকে একদল মুসলিম হজ্জের উদ্দেশে মক্কায় রওনা হ’লেন। তাদের সাথে ছিলেন একজন মহিলা। মসজিদুল হারামে ঢোকার পর মহিলাটি বলতে লাগলেন, ‌أَيْنَ بَيْتُ رَبِّي؟ ‌أَيْنَ بَيْتُ رَبِّي؟ ‘আমার রবের ঘরটা কোথায়? আমার রবের ঘরটা কোথায়?’ তাকে বলা হল, ‘এখনই আপনি আপনার রবের ঘরের কাছে পৌঁছে যাবেন’। হারাম চত্ত্বরে ঢোকার পর তিনি কা‘বা ঘর দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। অতঃপর তাকে কা‘বা ঘর দেখিয়ে বলা হল, ‘এটাই আপনার রবের ঘর’। মহিলাটি কা‘বায় হেলান দিয়ে গালটা কা‘বার সাথে মিশিয়ে দিলেন। পরম আবেগে অনবরত কেঁদেই চললেন। আর সেই কাঁন্নারত অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করলেন’।[25] এই ঘরকে ভালোবেসে বারবার ছুটে এলেও সালাফদের অন্তরে সবসময় এক ধরনের ভয় কাজ করত। আলী ইবনুল মুওয়াফফাক (রহঃ) বলেন, আমি ষাটবার হজ্জ করেছি। এরপর একদিন আমি হাতীমে (কা‘বার দেয়ালঘেরা অংশ) বসে নিজের অবস্থা এবং বারবার এই পবিত্র স্থানে আসা নিয়ে ভাবছিলাম। আমি জানি না, আমার হজ্জ কি কবুল হয়েছে নাকি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে! এরপর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম এবং স্বপ্নে একজনকে বলতে শুনলাম, ‘তুমি কি তোমার ঘরে এমন কাউকে দাওয়াত দাও, যাকে তুমি ভালবাসো না? তিনি বলেন, এরপর আমি জাগ্রত হ’লাম এবং আমার সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল’।[26]

কা‘বা চত্বরে তাওয়াফরত অবস্থায় সালাফগণ মানুষের প্রতি, বিশেষ করে পিতা-মাতার প্রতি খেদমতের কি অনন্য নযীর স্থাপন করেছেন, তা আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)-এর একটি ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) তাওয়াফ করছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি দেখলেন, এক ইয়ামনী ব্যক্তি নিজের মাকে পিঠে বহন করে কা‘বা ঘর তাওয়াফ করছে এবং (কবিতার ছন্দে) বলছে,إِنِّي لَهَا بَعِيرُهَا الْمُذَلَّلُ + إِنْ أُذْعِرَتْ رِكَابُهَا لَمْ أُذْعَرِ ‘আমি আমার মায়ের এক অনুগত উট (বাহন); তাঁর অন্য বাহনগুলো যদি ভয় পেয়ে পালিয়েও যায়, আমি কখনো (তাঁকে ছেড়ে) ভয় পাব না বা পালাব না’। অতঃপর তাওয়াফ শেষে সে ইবনে ওমর (রাঃ)-এর কাছে এসে বলল, ‘হে ইবনে ওমর! আমি কি আমার মায়ের প্রতিদান দিতে পেরেছি?’ ইবনে ওমর (রাঃ) উত্তর দিলেন,لَا، وَلَا بِزَفْرَةٍ وَاحِدَةٍ ‘না, এমনকি তাঁর প্রসব-বেদনার একটি দীর্ঘশ্বাসের প্রতিদানও তুমি দিতে পারোনি’।[27] আব্দুল্লাহ ইবনে আবূ নাজীহ বলেন, ‘আমি তাউস ইবনে কায়সান (রহঃ)-কে তাওয়াফ করতে দেখেছি, তাঁর চেয়ে সুন্দরভাবে কাউকে তাওয়াফ করতে দেখিনি। তিনি ডানে-বামে তাকাতেন না। এত শান্তশিষ্টভাবে তাওয়াফ করতেন, মনে হত যেন তাঁর মাথার ওপর পাখি বসে আছে।[28]

৫. যমযমের পানি পানে সালাফদের মহতী উচ্চাকাঙ্ক্ষা :

সালাফগণ যখন যমযমের পেয়ালা হাতে তুলে নিতেন তখন কেবল তৃষ্ণা মেটানোর সাধারণ আবেগ কাজ করত না; বরং তাঁদের হৃদয়ে জেগে উঠত পাহাড়সম কোন আশা বা আধ্যাত্মিক লক্ষ্য। তাঁদের কাছে যমযম ছিল রবের দরবারে মনোবাঞ্ছা পূরণের এক সোনালী মাধ্যম, যা পার্থিব জগতের তুচ্ছ চাহিদার ঊর্ধ্বে উঠে জান্নাত ও ইলমের পথে পা বাড়াতে সাহায্য করত। হাসান ইবনে ঈসা বলেন, আমি ইবনুল মুবারককে দেখলাম, তিনি জমজমের কূপে এসে এক বালতি পানি তুললেন। এরপর কা‘বার দিকে মুখ করে বললেন, হে আল্লাহ! নবী কারীম (ছাঃ) তো বলেছেন,مَاءُ زَمْزَمَ، لِمَا شُرِبَ لَهُ ‘জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয় তা পূরণ হয়’ (ইবনু মাজাহ হা/৩০৬২; সনদ ছহীহ)। ‘হে আল্লাহ! আমি কিবয়ামত দিবসের তৃষ্ণা মেটানোর উদ্দেশ্যে এটি পান করছি’। এরপর তিনি তা পান করলেন।[29]

একবার ইমাম ইবনে খুযাইমা (রহঃ)-কে প্রশ্ন করা হ’ল যে, তিনি এই অগাধ ইলম কোথা থেকে পেলেন? তখন তিনি বললেন, ‘আমি যখনই জমজমের পানি পান করেছি, আল্লাহর কাছে উপকারী ইলম প্রার্থনা করেছি’।[30] ইমাম শাফেঈ (রহঃ) সম্পর্কে প্রসিদ্ধ আছে যে, তিনি নির্ভুল লক্ষ্যভেদী (তীরন্দাজ) হওয়ার নিয়তে জমজমের পানি পান করেছিলেন। ফলে তিনি ১০টি তীরের মধ্যে ৯টিই লক্ষ্যস্থলে লাগাতে পারতেন।[31] হাফেয ইবনে হাজার (রহঃ) নিজে বলেন, আমি যখন হাদীছ শিক্ষার শুরুতে ছিলাম, তখন একবার জমজমের পানি পান করেছিলাম এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যেন তিনি আমাকে হাদীছ মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে ইমাম যাহাবী (রহ.)-এর স্তরের হিফয দান করেন। এর বিশ বছর পর আমি যখন পুনরায় হজ্জে গেলাম, তখন নিজের মাঝে সেই স্তরের চেয়েও উচ্চতর মর্যাদা লাভের আকাঙ্ক্ষা অনুভব করলাম এবং আল্লাহর কাছে আরও বড় মর্তবা প্রার্থনা করলাম। আশা করি আল্লাহ তা কবুল করবেন।[32]

ইবনুল কবাইয়িম আল-জাওজিইয়াহ (রহঃ) বলেন, ‘যখন আমি মক্কায় অবস্থান করতাম, তখন মাঝেমধ্যে এমন তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা অনুভব করতাম যে আমার চলাফেরা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হ’ত- বিশেষ করে তাওয়াফের সময়। তখন আমি দ্রুত সূরা ফাতিহা পাঠ করে ব্যথার স্থানে মাসাহ করতাম। সাথে সাথে মনে হ’ত যেন কোন পাথর পড়ে গেল (অর্থাৎ ব্যথা উধাও হয়ে যেত)। আমি এটি বহুবার পরীক্ষা করেছি। আমি এক পেয়ালা যমযম পানি নিতাম এবং তাতে বারবার সূরা ফাতিহা পড়ে পান করতাম। এর ফলে আমি এমন উপকার ও শক্তি অনুভব করতাম যা সাধারণ ওষুধে কখনো পাইনি।[33] ইবনুল কবাইয়িম (রহঃ) আরো বলেছেন, ‘আমি ও অন্যান্যরা যমযমের পানি দ্বারা চিকিৎসার আশ্চর্যজনক কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। আমি এ পানি দিয়ে বিভিন্ন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছি এবং আল্লাহর অনুমতিতে আমি সুস্থ হয়েছি। আমি এমন ব্যক্তিকেও দেখেছি, যিনি প্রায় অর্ধ মাস বা তারও বেশী সময় ধরে শুধু যমযমের পানি পান করে জীবনযাপন করেছেন। কিন্তু তিনি ক্ষুধা অনুভব করেননি এবং তিনি মানুষের সাথে তাওয়াফ করতেন যেমন অন্যরা করে। তিনি আমাকে বলেছেন যে, কখনও কখনও তিনি চল্লিশ দিন পর্যন্ত এভাবে কাটিয়েছেন এবং তার মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় রাখার শক্তি ছিল, তিনি ছিয়াম রাখতেন এবং বারবার তাওয়াফ করতেন’।[34]

৬. ছাফা-মারওয়া সাঈতে সালাফদের অবস্থা :

ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গায় সাঈ করা হজ্জ ও ওমরাহর অন্যতম রুকন। হাজেরা (আ.)-এর সেই নির্জন মরুপ্রান্তরে পানির জন্য তৃষ্ণার্ত দৌড়াদৌড়িকে আল্লাহ কিবয়ামত পর্যন্ত হাজীদের জন্য ইবাদত বানিয়ে দিয়েছেন। সালাফদের কাছে সাঈ ছিল আল্লাহর রহমতের সন্ধানে এক ভিখারীর অস্থিরতার মতোই। আয়েশা (রাঃ) অসুস্থতার কারণে দুই বছর ওমরাহ করা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি ছাফা ও মারওয়ার মাঝে সওয়ারীতে চড়ে সাঈ করা অপসন্দ করি’।[35] যদিও অসুস্থ অবস্থায় বাহনে চড়ে সাঈ করার অনুমতি শরী‘আতে রয়েছে, কিন্তু সালাফগণ আল্লাহর দরবারে বিনয় প্রকাশের জন্য নিজের পায়ে হেঁটে কষ্ট করাকেই বেশী ভালোবাসতেন। প্রখ্যাত ছাহাবী যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রাঃ) অতি বৃদ্ধ বয়সে যখন শরীরে শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন, তখন লাঠিতে ভর দিয়ে ছাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করতেন।[36] তাবেঈ তাউস ইবনে কায়সান (রহঃ) ছাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের উপর কা‘বার দিকে মুখ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং দো‘আ করতেন।[37]

৭. হজ্জে সালাফদের ধৈর্য ও সহনশীলতা :

হজ্জ হ’ল ধৈর্যের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। সালাফদের কাছে হজ্জের ভিড় ছিল কিবয়ামতের ময়দানের মহড়া, আর উত্তপ্ত মরুভূমি ছিল জাহান্নামের অগ্নি-উত্তাপের এক মৃদু স্মরণিকা। যেখানে সাধারণ মানুষ ভিড় আর গরমে মেজায হারিয়ে ফেলে, সেখানে সালাফগণ খুঁজে পেতেন আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) ছিলেন খলীফার পুত্র এবং উম্মতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকবীহ। কিন্তু হজ্জের সফরে তিনি নিজেকে একজন সাধারণ গোলামের চেয়েও অধম মনে করতেন। তিনি হজ্জের সময় কখনো চাইতেন না যে, মানুষ তাঁর জন্য রাস্তা ছেড়ে দিক বা তাঁকে বিশেষ কোন মর্যাদা দান করুক। তিনি প্রায়ই পায়ে হেঁটে হজ্জ করতেন এবং সাধারণ মানুষের মত ভিড়ের মাঝে মিশে গিয়ে তওয়াফ ও সাঈ করতেন। সূর্যের প্রচন্ড তাপ ও ভিড়ের চাপকে তিনি সানন্দে বরণ করে নিতেন। তিনি বলতেন, ‘হজ্জ তো হ’ল উস্কোখুস্কো চুল আর ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহের ইবাদত’।[38]

বায়তুল্লাহতে সালাফদের ধৈর্যের দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। একবার মসজিদুল হারামে একজন লোক হজ্জ করতে এসে মসজিদেই ঘুমিয়ে পড়ল। বাতাসে তার পেটের উপর থেকে কাপড় সরে গেল। পেটের যে জায়গায় সে বেল্ট বেঁধে রেখেছিল, সেটা উন্মোচিত হয়ে গেল। ভেতরে থাকা মুদ্রাগুলো প্রকাশিত হ’ল। তার বন্ধুরা পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখতে পেয়ে সেটা চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করল। তাই তারা সেটা খুলে নিজেদের কাছে রেখে দিল। ঘুম থেকে ওঠার পর লোকটা দেখতে পেল বেল্টের জায়গাটা খালি। সে ডানে-বামে তাকিয়ে কাউকে পেল না। শুধু আত্বা ইবন আবী রাবাহ (রহঃ)-কে ছালাত আদায় করতে দেখল। ছালাত শেষ হ’লে সে তাঁর জামার কলার ধরে টেনে বলল, ‘ওহে আল্লাহর শত্রু! যা করার তা করে এখন ছালাতে দাঁড়িয়ে গেছিস!’ আত্বা (রহঃ) বললেন, কী হয়েছে আপনার?’ সে বলল, আমার বেল্ট খুলে এর থেকে সব মুদ্রা নিয়ে গেছিস! তিনি জানতে চাইলেন সেখানে কত মুদ্রা ছিল। লোকটি বলল- দুইশ দীনার। তিনি বললেন, আপনি ছাড়া এটা আর কেউ জানে? সে না সূচক উত্তর দিল। তখন আত্বা (রহঃ) লোকটাকে আড়ালে নিয়ে গেলেন এবং তার হাতে দুইশত দিনার দিয়ে দিলেন।

লোকটা বন্ধুদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানালে তারা বলল, ‘আল্লাহর কসম! তুমি লোকটার উপর যুলুম করেছ। মূল ঘটনা হ’ল বাতাসে কাপড় উড়ে যাচ্ছিল দেখে আমরা তোমার পেট থেকে খুলে নিয়েছিলাম। এই নাও তোমার বেল্ট’। এবার লোকটা বন্ধুদের নিয়ে আত্বার কাছে গেলেন। তার ব্যাপারে মক্কাবাসীকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানালো, ‘তিনি হ’লেন প্রখ্যাত তাবেঈ আত্বা ইবন আবী রাবাহ, মক্কাবাসীদের ফক্বীহ ও সর্দার’। তারা তার কাছে গিয়ে মাফ চাইলো। দীনারগুলো ফেরত দিতে চাইল। তিনি বললেন, ‘নাহ! এগুলো আমার কাছে ফিরবে না। চলে যান, আপনাকে আমি মাফ করে দিলাম আর এগুলো দিয়ে দিলাম’।[39] একবার ভাবুন তো! আত্বা (রহঃ)-এর মতো আমাদের কাউকে যদি চুরির অপবাদ দিত, তবে কি আমরা মেজাজ ধরে রাখতে পারতম? এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, হজ্জের সফর কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন নয়; বরং ধৈর্য, সহনশীলতা ও মহানুভবতার এক বাস্তব প্রশিক্ষণ। যেখানে অন্যায় অপবাদ ও কষ্টের মুখেও নিজেকে সংযত রাখা একজন প্রকৃত হাজীর বৈশিষ্ট্য। তিনি অকারণে অপমানিত হয়েও রাগ বা প্রতিশোধ না নিয়ে শান্তভাবে সহ্য করেছেন, নিজের সম্পদ দিয়ে অপবাদকারীকে সাহায্য করেছেন এবং ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং হজ্জের সময় ভীড়, ক্লান্তি বা ভুল বোঝাবুঝির মুহূর্তে রাগান্বিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া এবং ক্ষমার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে সুন্দরভাবে সমাধান করাই হ’ল প্রকৃত তাকওয়ার পরিচয়। কেননা এই গুণগুলোর মাধ্যমেই হজ্জ শুধু বাহ্যিক ইবাদত না থেকে অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথে পরিণত হয়।

হিশাম বিন উরওয়াহ (রহঃ) যখন অতি বৃদ্ধ অবস্থায় হজ্জ করতেন, তখনও তিনি জামারাতে পাথর নিক্ষেপের সময় প্রচন্ড ভিড়ের মধ্য দিয়েই তা সম্পাদন করতেন। তাঁর এই কষ্ট দেখে যখন বলা হ’ল, ‘হে আবূ মুনযির! আপনি যদি একটু দেরী করতেন এবং ভীড় কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন (তবে কি ভালো হ’ত না?) উত্তরে তিনি বললেন, ‘বান্দাকে (এই ভীড় ও সংকটের মাধ্যমে) পরীক্ষায় ফেলা হয়, যাতে আল্লাহ দেখতে পারেন যে, এমন ভীড়ের স্থানেও বান্দা কতটা ধৈর্যের পরিচয় দেয়’।[40] সুবহানাল্লাহ! তিনি বৃদ্ধ বয়সেও ভীড়ের কষ্টকে আল্লাহর পরীক্ষা মনে করে হাসিমুখে বরণ করেছেন। আর আমরা এসি বাসে একটু গরম লাগলে, হোটেলের লিফট আসতে দেরী হলে কিংবা খাবারের লাইনে একটু ভীড় দেখলেই আয়োজকদের, মুয়াল্লিমকে এবং পুরো ব্যবস্থাকে গালমন্দ করতে শুরু করি। এমনকি সঊদী সরকারকেও গালি দিতে কুণ্ঠাবোধ করি না। এভাবে আমাদের হজ্জের সফরের অর্ধেক সময় কাটে মানুষের সাথে ঝগড়া করে আর বাকী অর্ধেক কাটে অভিযোগ করে।

৮. মিনা প্রান্তরে সালাফদের অবস্থা :

মিনার প্রান্তর হ’ল ক্ষণস্থায়ী জীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। চারদিকে কেবল তাঁবুর সারি, যা মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই দুনিয়াও এক অস্থায়ী তাঁবুর মত, যেখানে আমরা কেবল গুটিকয়েক দিনের মুসাফির। এটি এমন এক স্থান যেখানে আমীর-ফকীর, রাজা-প্রজা সবাই একই তাঁবুর নিচে, একই ধুলাময় পরিবেশে আল্লাহর সামনে মাথা নত করে। মিনার এই দিনগুলোতে সালাফগণ দুনিয়ার সমস্ত জাঁকজমক ও বিলাসিতা থেকে নিজেদের মুক্ত করে এক অনাড়ম্বর ও সমর্পিত জীবনে অভ্যস্ত হ’তেন। পাশাপাশি এই পবিত্র ভূমির প্রতিটি ধূলিকণা ও তরুলতার প্রতিও তাঁরা অপরিসীম শিষ্টাচার ও সতর্কতা প্রদর্শন করতেন। মিনায় অবস্থানকালে আমীরুল মুমিনীন ওমর (রাঃ) কেবল হাজীদের শৃঙ্খলা নয়; বরং মক্কার পবিত্র ঘাস ও গাছের সুরক্ষায়ও ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। ওবায়েদ বিন উমায়ের আল-লাইসী (রহঃ) বর্ণনা করেন, ওমর (রাঃ) মিনায় খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন এক ব্যক্তি পাহাড়ের উপর গাছ কাটছে। তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, ‘তুমি কি জানো না যে, মক্কার গাছ কাটা বা ঘাস উপড়ানো নিষেধ?’ লোকটি উত্তর দিল, ‘জ্বি জানি, কিন্তু আমার উটটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিল (তাই নিরুপায় হয়ে করছিলাম)’। ওমর (রাঃ) তাকে অন্য একটি উটের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং সতর্ক করে দিয়ে বললেন, ‘আর কখনো এমন করো না।[41]

মিনার প্রান্তরে দুনিয়াবী বিলাসিতার বিরুদ্ধে সালাফদের অবস্থান কতটা আপোষহীন ছিল, তা সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে ফুটে ওঠে। সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ) বলেন, মিনায় অবস্থানকালে আমাকে খলীফা আল-মাহদীর নিকট নিয়ে যাওয়া হ’ল। আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহকে ভয় করুন! আপনি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছেন এবং এই মর্যাদা লাভ করেছেন, তা কেবল মুহাজির ও আনছারদের তলোয়ারের বদৌলতে। অথচ আজ তাঁদের সন্তানরাই ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করছে। (স্মরণ করুন!) ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) যখন হজ্জ করেছিলেন, তখন তিনি মাত্র পনেরো দিনার ব্যয় করেছিলেন এবং গাছের ছায়ায় অবস্থান করতেন। খলীফা আল-মাহদী আমাকে বললেন, ‘আপনি কি চান আমি আপনার মত হয়ে যাই? আমি উত্তরে বললাম, ‘না, আপনাকে আমার মত হ’তে হবে না। তবে আপনি বর্তমানে যে বিলাসিতার মধ্যে আছেন তা থেকে কিছুটা নিচে নামুন, আর আমি যে অবস্থায় আছি তা থেকে কিছুটা উপরে উঠুন (অর্থাৎ, মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন)। তখন খলীফা আমাকে বললেন, এখান থেকে বেরিয়ে যান![42]

সালাফগণ হজ্জের সফরকে মাবরূর ও অধিক ছওয়াবপূর্ণ করার জন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও পায়ে হেঁটে মিনা-আরাফার পথ পাড়ি দেওয়াকে পসন্দ করতেন। ইসমাঈল বিন আব্দুল মালেক (রহঃ) বলেন, ‘আমি সাঈদ ইবনে জুবায়ের (রহ.)-কে ইয়াওমুত তারবিয়াহ (৮ই জিলহজ্জ) দিনে দেখলাম তিনি মসজিদুল হারামে দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করলেন, তারপর মক্কা থেকে পায়ে হেঁটে মিনার উদ্দেশ্যে বের হ’লেন। তিনি মিনা পর্যন্ত হেঁটেই গেলেন এবং সেখানে গিয়ে যোহর, আছর, মাগরিব, এশা ও (পরদিন ৯ই জিলহজ্জের) ফজর ছালাত আদায় করলেন’।[43] ইবনে আববাস (রাঃ) তাঁর সন্তানদের বলতেন, ‘হে আমার সন্তানেরা! তোমরা যখন হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে বের হবে, তখন পায়ে হেঁটে হজ্জ পালন করবে’।[44] মিনায় অবস্থানকালে আমাদের উচিত সালাফদের মতো সাদাসিধে থাকা। অতি উন্নত খাবার বা ভিআইপি সুবিধার পেছনে না ছুটে সাধারণ হাজীদের মতো ইবাদতে মগ্ন হওয়া। ওমর (রাঃ) যেভাবে মিনার ঘাস ও গাছের প্রতি যত্নশীল ছিলেন, আমাদেরও উচিত মক্কার পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, প্লাস্টিকের বোতল ছুড়ে ফেলা, নিজের সামান্য সুবিধার জন্য হারাম এলাকার পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকাই হ’ল প্রকৃত হজ্জের আদব।

৯. আরাফার ময়দানে সালাফদের অবস্থা

আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজ্জের অপরিহার্য রুকন। আরাফার মহান দিনে আল্লাহর রহমতের আশায় সালাফদের ত্যাগের চিত্রগুলো আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে দেয়। হাকিম বিন হিযাম (রাঃ) আরাফার ময়দানে একশ’টি কুরবানীর পশু এবং একশ জন দাস নিয়ে উপস্থিত হন। এরপর তিনি তাঁর সকল দাসকে (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) মুক্ত করে দেন।[45] একইভাবে আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রাঃ)-এর ঘটনা আরও হৃদয়স্পর্শী। তিনি হজ্জ পালন করতে এসেছিলেন এবং তাঁর সাথে ত্রিশটি সওয়ারী উট ছিল। অথচ তিনি নিজে পায়ে হেঁটে চলছিলেন যতক্ষণ না আরাফায় অবস্থান নিলেন। সেখানে তিনি ত্রিশজন দাসকে মুক্ত করে দিলেন, তাদের ঐ ত্রিশটি সওয়ারীর উপর আরোহণ করালেন এবং তাদের ত্রিশ হাযার দিরহাম প্রদান করলেন। এরপর বললেন, ‘আমি তাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মুক্ত করে দিলাম, যেন এর অসীলায় তিনি আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন’।[46]

ইবাদতে মগ্ন থাকার পাশাপাশি সালাফদের অন্তরে সবসময় নিজেদের পাপের ভয় প্রবলভাবে জাগ্রত থাকত। মুতাররিফ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে শিখখীর এবং বকর আল-মুযানী (রহঃ) আরাফায় অবস্থানকালে তাঁদের একজন বললেন, اللَّهُمَّ لَا تَرُدَّ أَهْلَ الْمَوْقِفِ مِنْ أَجْلِي ‘হে আল্লাহ! আমার (পাপের) কারণে আজকের এই আরাফাবাসীদের ফিরিয়ে দেবেন না (অর্থাৎ আমার কারণে যেন তাদের দো‘আ কবুল হওয়া আটকে না যায়)’।[47] অর্থাৎ তাঁর ভয় ছিল, নিজের গুনাহের কারণে হয়তো পুরো ময়দানের মানুষের দো‘আই আটকে যেতে পারে!

আরাফার বিকেলের প্রতিটি ক্ষণ তাঁরা শুধু যিকির ও রোনাজারিতে কাটিয়ে দিতেন। দাঊদ ইবনে আবূ আছেম (রহঃ) বলেন, ‘আমি আরাফার মাঠে সালেম বিন আব্দুল্লাহ (রহঃ)-এর সাথে অবস্থান করলাম তাঁর আমল দেখার জন্য। তিনি অনবরত যিকির ও দো‘আয় মগ্ন থাকলেন, যতক্ষণ না মানুষ সেখান থেকে ফিরতে শুরু করল (অর্থাৎ সূর্যাস্ত পর্যন্ত)’।[48] এই মহামূল্যবান সময়ে মানুষের কোলাহল থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিয়ে আত্বা ইবনে আবী রাবাহ (রহঃ) বলেছেন, ‘যদি আরাফাতের দিন বিকেলে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নির্জনে (ইবাদতে) মগ্ন থাকা সম্ভব হয় তবে তাই কর’।[49] আর আল্লাহর কাছে চাওয়ার এই শ্রেষ্ঠতম দিনে অন্য কারো কাছে কিছু চাওয়াকে তাঁরা চরম বোকামি মনে করতেন। সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) এক ব্যক্তিকে আরাফার ময়দানে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘হে অক্ষম ব্যক্তি! আজকের এই দিনেও তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে হাত পাতছো?[50]

আরাফায় সালাফদের কান্নার তীব্রতা কেমন ছিল, তা ফুযাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এর ঘটনা থেকে বোঝা যায়। তিনি আরাফায় দাঁড়িয়ে সন্তানহারা শোকাতুর মায়ের মতো এমনভাবে ডুকরে কাঁদছিলেন যে, কান্নার তীব্রতায় তিনি দো‘আই করতে পারছিলেন না। সূর্য যখন প্রায় ডুবুডুবু, তখন তিনি আকাশের দিকে মাথা তুলে এক বুকফাটা আর্তনাদ করে বললেন, ‘হায় আফসোস! আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিলেও আপনার সামনে দাঁড়াতে আমার বড় লজ্জা হচ্ছে’।[51] সুবহানাল্লাহ! আরাফার ময়দানে আল্লাহর ক্ষমার প্রতি তাঁদের কত সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তা সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহঃ) বলেন, ‘আরাফার দিন বিকেলে আমি সুফিয়ান ছাওরী (রহ.)-এর নিকট গেলাম। তিনি তখন দুই হাঁটু গেড়ে বসা ছিলেন এবং তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। তা দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি হয়েছে? আমি বললাম, আজকের এই সমাবেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় কে আছে? তিনি বললেন,الَّذِي يَظُنُّ أَنَّ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَا يُغْفَرَ لَهُمْ ‘যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে ক্ষমা করবেন না’।[52]

১০. মুযদালিফাতে সালাফদের অবস্থা :

আরাফার ময়দানে দিনভর রোনাজারি আর অশ্রুজলে বুক ভাসানোর পর মুযদালিফার রাত হ’ল এক অন্যরকম প্রশান্তির রাত। খোলা আকাশের নিচে, কোন তাঁবু বা আচ্ছাদন ছাড়া ধুলোমাখা এক চিলতে মাটিতে শুয়ে রবের সান্নিধ্য অনুভবের এক অপূর্ব মুহূর্ত এটি। মুযদালিফায় রবের প্রতি সালাফদের কি এক অদ্ভূত লাজুকতা আর সমর্পণের অনুভূতি ছিল তা প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনা (রহঃ)-এর জীবনের শেষ হজ্জের ঘটনা থেকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। তাঁর ভাতিজা হাসান ইবনে ইমরান বর্ণনা করেন, ‘আমি আমার চাচা সুফিয়ানের সাথে তাঁর জীবনের শেষ হজ্জে (১৯৭ হিজরী) ছিলাম। যখন আমরা মুযদালিফায় পৌঁছালাম এবং তিনি মাগরিব ও এশার ছালাত শেষে বিছানায় (মাটিতে) হেলান দিলেন, তখন এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘আমি টানা ৭০ বছর ধরে এই স্থানে আসছি এবং প্রতি বছরই বলি, ‘হে আল্লাহ! এই স্থানটিতে এটাই যেন আমার শেষ আসা না হয়। কিন্তু এবার বারবার এই দো‘আ করতে আমার আল্লাহর প্রতি লজ্জা বোধ হচ্ছে’। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি মক্কা থেকে ফিরে যান এবং পরবর্তী বছরেই (১৯৮ হিজরী) পহেলা রজব শনিবার ৯১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় দাফন করা হয়।[53]

১১. হজ্জের সফরে সালাফদের অবস্থা ও ইবাদত :

হজ্জের প্রতিটি রোকন, চাই তা তওয়াফ হোক, সাঈ হোক কিংবা জামারাতে পাথর নিক্ষেপ-সবকিছুরই মূল উদ্দেশ্য হ’ল আল্লাহর স্মরণ কায়েম করা। সালাফে ছালেহীন হজ্জের সফরে কেবল শারীরিক পরিশ্রমকেই যথেষ্ট মনে করতেন না, বরং তাঁরা প্রতিটি কদমে তাসবীহ, তাহলীল এবং তিলাওয়াতে মশগূল থাকতেন। হজ্জে সবাই একই কাজ করেন, একই পোশাক পরেন এবং একই স্থানে অবস্থান করেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য তৈরি হয় তাঁদের অন্তরের উপস্থিতি এবং জিহবায় আল্লাহর যিকিরের আধিক্য দিয়ে। এ বিষয়ে ইমাম ইবনুল কবাইয়িম (রহঃ) বলেন, ‘হজ্জ পালনকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হ’লেন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ তা‘আলার যিকির বা স্মরণে সবচেয়ে বেশী মগ্ন থাকেন’।[54]

সফরের ক্লান্তিতেও সালাফদের রাতের ইবাদত থেমে থাকত না। আব্দুস সামাদ ইবনে সুলায়মান (রহঃ) বর্ণনা করেন, আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর কাছে রাত্রী যাপন করলাম। তিনি আমার (ওযূর) জন্য একটি পাত্রে পানি রেখে দিলেন। যখন সকাল হ’ল তিনি দেখলেন যে আমি পানি ব্যবহার করিনি (অর্থাৎ রাতে ইবাদতের জন্য উঠিনি)। তখন তিনি বললেন, ‘একজন হাদীছ অন্বেষী (তালেবে ইলম) রাত কাটাবে, অথচ রাতে তাঁর কোন আমল বা অযীফা থাকবে না (এটা হ’তে পারে না)’। আমি বললাম, ‘আমি তো মুসাফির’। তিনি বললেন, ‘মুসাফির হ’লেও কি (আমল ছাড়তে হবে)? মাসরূক (রহঃ) হজ্জ করেছেন অথচ তিনি (সফরের রাতগুলোতেও) সিজদারত অবস্থা ছাড়া ঘুমাননি’।[55]

যিকির ও ইবাদতের পাশাপাশি হজ্জের সফরে সালাফদের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সহযাত্রীদের খেদমত করা এবং নিজেদের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দেওয়া। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, صَحِبْتُ ابْنَ عُمَرَ فِي السَّفَرِ لِأَخْدُمَهُ، فَكَانَ يَخْدِمُنِي ‘আমি সফরে ইবনু ওমর (রাঃ)-এর সঙ্গী হয়েছিলাম তাঁর খেদমত করার জন্য, কিন্তু (উল্টো) তিনি নিজেই আমার খিদমত করতেন’।[56] সহযাত্রীদের প্রতি ভালোবাসা ও ত্যাগের সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)। হজ্জের সময় ঘনিয়ে এলে মার্ভের অধিবাসীরা তাঁর সাথে হজ্জে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করত। তিনি তাদের সবার হজ্জের খরচের টাকা নিজের কাছে জমা নিয়ে একটি বাক্সে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। এরপর মার্ভ থেকে বাগদাদ হয়ে মক্কা পর্যন্ত পুরো সফরে তাদের যাতায়াত, সর্বোত্তম খাদ্য ও মিষ্টান্নের যাবতীয় ব্যয় তিনি নিজের পকেট থেকে বহন করতেন। শুধু তাই নয়, মদীনা ও মক্কা থেকে তাদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপহার তিনি নিজের টাকায় কিনে দিতেন। হজ্জ শেষে এলাকায় ফিরে সবার বাড়ী-ঘর মোজাইক করে দিতেন এবং তিনদিন পর বিশাল ভোজের আয়োজন করতেন। পরিশেষে সেই তালাবদ্ধ বাক্সটি খুলে সবার মূল জমানো টাকার থলেগুলো, যার উপর তাদের নাম লেখা ছিল, তা অবিকল ফেরত দিতেন! [57]

হজ্জের সফরে সালাফগণ কাউকে কষ্ট দেওয়ার ব্যাপারে খুবই সজাগ থাকতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) একবার হজ্জ করতে গিয়ে রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের কাছে খুব ভীর দেখতে পেলেন। তখন তিনি বলেলেন,إِذَا وَجَدْتَ عَلَى الرُّكْنِ زِحَامًا فَلَا تُؤْذِ وَلَا تُؤْذَ، وَامْضِ ‘যখন তুমি রুকন-এর (হাজরে আসওয়াদ বা রুকনে ইয়ামানী) কাছে ভিড় দেখবে, তখন কাউকে কষ্ট দিও না এবং নিজেও কষ্ট পেও না; বরং তুমি (সেখান থেকে ভিড় না করে তওয়াফ চালিয়ে) সামনে এগিয়ে যাও’।[58] মূলত হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বা রুকন ইয়ামনী স্পর্শ করা সুন্নাত, কিন্তু অন্যকে ধাক্কা দিয়ে কষ্ট দেওয়া বা নিজে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া হারামের পর্যায়ে পড়তে পারে। সেজন্য ইবনে আববাস (রাঃ) এখানে মূল ইবাদতের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইবনে জুরাইজ বলেন, ‘আত্বা (রহঃ) ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত তাওয়াফে মগ্ন থাকতেন এবং কারও সাথে কোন কথা বলতেন না।[59] ইব্রাহীম নাখঈ (রহঃ) বলেন,كَانَ يُعْجِبُهُمْ إِذَا قَدِمُوا مَكَّةَ أَنْ ‌لَا ‌يَخْرُجُوا ‌مِنْهَا ‌حَتَّى ‌يَخْتِمُوا ‌الْقُرْآنَ ‘সালাফগণ যখন মক্কায় আসতেন, তখন কুরআন খতম না করে সেখান থেকে বের হওয়াকে তাঁরা অপসন্দ করতেন (অর্থাৎ মক্কায় অবস্থানকালে অন্তত একবার কুরআন খতম করাকে তাঁরা অত্যন্ত পসন্দনীয় মনে করতেন)’।[60] আমরাও কিন্তু এই সুবর্ণ সুযোগটি গ্রহণ করতে পারি। বাংলাদেশ থেকে হাজীগণ সাধারণত হজ্জের সফরে এক থেকে দেড় মাস অবস্থান করেন। একটু সচেতন হ’লেই এই সময়ের মধ্যে কয়েকবার কুরআন খতম করা সম্ভব, ইনশাআল্লাহ। কারণ সেখানে ইবাদত, ঘুম ও খাওয়া-দাওয়া ছাড়া অন্য কোন জাগতিক ব্যস্ততা নেই। নেই সংসার, চাকরী কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের ঝামেলার দুশ্চিন্তা। তাই জামা‘আতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়, সকাল-সন্ধ্যার তাসবীহ-তাহলীল ও রাতের তাহাজ্জুদসহ যাবতীয় নেক আমলে নিমগ্ন হওয়া উচিত। আর নিয়ত থাকতে হবে এবং আল্লাহর কাছে দো‘আ করতে হবে যে, আল্লাহ যেন আমাদেরকে আজীবনের জন্য নিয়মিত উক্ত ইবাদত-বন্দেগী অভ্যস্ত করেন।

উপসংহার :

সালাফদের হজ্জের পবিত্র সফর কেবল মক্কা-মদীনার ভৌগলিক সীমানায় ঘুরে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল তাদের জন্য জীবনকে নবরূপে গড়ে তোলার সফর। আজ আমরা যখন আধুনিক যানবাহনে চড়ে বিলাসিতার চাদর মুড়ি দিয়ে হজ্জ শেষ করি, তখন আমাদের ফিরে তাকানো উচিত সেই ধূলিধূসরিত কাফেলার দিকে। যাঁদের ইহরামের কাপড়ে লেগে থাকত আল্লাহভীরুতার ঘ্রাণ, যাঁদের তালবিয়াতে কেঁপে উঠত মরুভূমির আকাশ-বাতাস। তাঁদের সেই অশ্রুসিক্ত আরাফা, বিনম্র মিনা আর যমযমের পানি পানের সেই গভীর প্রত্যয় আজও আমাদের প্রেরণার উৎস। তাঁরা হজ্জ থেকে ফিরে আসতেন এমনভাবে যেন তাঁরা নতুন করে পৃথিবীর বুকে জন্ম নিয়েছেন। সুতরাং আমরা যখন মক্কার সেই পবিত্র মাটি ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে আসবো, তখন নিজের হৃদয়ের কাছে বারবার প্রশ্ন করবো যে, আমি কি সালাফদের সেই হজ্জের ছিটেফোঁটা স্বাদ পেয়েছি? আমার ভেতরকার অহংকার, ক্রোধ ও দুনিয়াপ্রীতি কি আরাফার ময়দানে বিসর্জন দিয়ে আসতে পেরেছি? যদি আমাদের হজ্জ আমাদের জীবনকে বদলে না দেয়, আমাদের চোখকে আল্লাহর ভয়ে অশ্রুসিক্ত করতে না শেখায়, তবে বুঝতে হবে আমরা কেবল মরুভূমির উত্তাপ গায়ে মেখে এসেছি, রহমতের পরশ পাইনি। আসুন! আমরা হজ্জের সেই রুহানিয়াতকে সজীব করি। আমাদের প্রতিটি ‘লাববাইক’ যেন কেবল ঠোঁটের উচ্চারণ না হয়ে হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ থেকে উচ্চারিত হয়। আল্লাহ আমাদের রিয়ামুক্ত হজ্জে মাবরূর নছীব করুন- আমীন!

আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।


[1]. আব্দুর রাযযাক ছান‘আনী, মুছান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ৫/২৩২।

[2]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুস ছাফওয়া, ২/১৪০; হিলয়াতুল আওলিয়া ৩/৮৭।

[3]. মুসনাদে আবী ইয়া‘লা মাওছীলী, হা/১০৩১; ছহীহাহ হা/১৬৬২; ছহীহুল জামে‘, হা/১৯০৯; সনদ ছহীহ।

[4]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/১৯৪।

[5]. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ১/৪২।

[6]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশকব ৬৭/২৪৩।

[7]. আব্দুর রাযযাক ছান‘আনী, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ৫/২৩৬।

[8]. আহমাদ ইবনে হাম্বল, আল-ইলাল ওয়া মা‘রিফাতুর রিজাল, ২/৪৬৩।

[9]. বুখারী হা/১৫২১; মুসলিম হা/১৩৫০; মিশকাত হা/২৫০৭।

[10]. বুখারী হা/১৭৭৩; মুসলিম হা/১৩৪৯; মিশকাত হা/২৫০৮।

[11]. ইবনু জাওযী, আত-তাবছিরাহ, ২/২৬৩।

[12]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ, ১৩/৫৭৪।

[13]. আবুল আববাস আল-ক্বারাফী, আয-যাখীরাহ, ৩/১৭৪।

[14]. ইবনু মাজাহ, হা/২৮৯০; ছহীহুত তারগীব হা/১১২২; সনদ ছহীহ।

[15]. ইবনে রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৩৭।

[16]. আব্দুর রায্যাক ছান‘আনী, মুছান্নাফে আব্দুর রায্যাক, ৫/২৪১।

[17]. ইবনে রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৩৬।

[18]. ইবনে সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৭/২২; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, ৯/৩৬৬।

[19]. ইবনে সা‘দ, আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, ৫/৩৩৬।

[20]. শামসুদ্দীন যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৪/১০৪; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, ৫/১১৩।

[21]. ইবনু তাইমিয়াহ, শারহু উমদাতিল ফিক্বহ, ৪/৪২২। আলবানী, মানাসিকুল হাজ্জি ওয়াল ওমরাহ, পৃ. ১৭।

[22]. ইবনে তাইমিয়াহ, শারহু উমদাতিল ফিক্বহ, ৪/৪২২।

[23]. ইবনে তায়মিয়াহ, শারহু উমদাতিল ফিক্বহ, ৪/৪২২।

[24]. আবূ হামিদ গাযালী, ইহয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৬৮।

[25]. মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক্ব আল-ফাক্বেহী (মৃ. ২৭২হি.), আখবারু মাক্কাহ ( বৈরূত : দারু খিযর, ২য় মুদ্রণ, ১৪১৪হি./১৯৯৪খ্রি.), ১/১৬৭

[26]. ইবনু রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ৬৬।

[27]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১; আলবানী, সনদ ছহীহ।

[28]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/১০৬।

[29]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক্ব, ৩২/৪৩৬; হাফেয যাহাবী, তাহযীবু তাহযীবুল কামাল ৫/২৮০।

[30]. শামসুদ্দীন যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফ্ফায, ২/২০৮।

[31]. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী, শারহু সুনানে ইবনে মাজাহ, পৃ. ২২০।

[32]. আল-হাত্তাব, মাওয়াহিবুল জলীল ফী শারহি মুখতাসারিল খালীল, ৩/১১৬; মুহাম্মাদ সালেম মাজলিসী, লাওয়ামি‘উদ দুরার, ৪/৫৩৩।

[33]. ইবনুল ক্বাইয়িম জাওযিইয়াহ, মাদারিজুস সালেকীন, ১/৮০।

[34]. ইবনুল ক্বাইয়িম, যাদুল মা‘আদ, ৪/৫৮৪।

[35]. ফাকিহী, আখবারু মাক্কা, ২/২৩৬।

[36]. ফাকিহী, আখবারু মাক্কা, ২/২৩৬।

[37]. ফাকিহী, আখবারু মাক্কা, ২/২২৮।

[38]. ইবনু আব্দিল বার্র, আল-ইস্তিযকার, ৪/৩৫৫।

[39]. আবুল আরব আত-তামীমী, আল-মিহান, পৃ. ৩৪৪।

[40]. ইবনু আব্দিল বার্র, আল-ইস্তিযকার ৪/৩৫৫।

[41]. ইবনে আবী আরূবাহ, আল-মানাসিক, পৃ. ৭৩।

[42]. ইবনু আবী হাতেম, আল-জারহু ওয়াত তা‘দীল, ১/১০৬; আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৭/৪৩।

[43]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, ৮/৩৬১।

[44]. তাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/১২৫২২।

[45]. লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৮৪।

[46]. আয-যামাখশারী, রবীউল আবরার ওয়া নুসুসুল আখইয়ার, ২/৩০৬; শিহাবুদ্দীন আবশীহী, আল-মুস্তাত্বরাফ, পৃ. ১৯।

[47]. ইবনে রজব হাম্বলী, লাতায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৮৫।

[48]. মুছান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, ৮/৫১৫।

[49]. আহমাদ ইবনে হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ৩০৫; ইবনু কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/৩৩৬।

[50]. নববী, আল-ইযাহ ফী মানাসিকিল হাজ্জি ওয়াল উমরাহ, পৃ. ২৮৮।

[51]. ইবনু রজব, লাত্বায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ২৮৫।

[52]. ইবনে আবিদ্দুনয়া, হুসনুয যান্নি বিল্লাহ, পৃ. ৯২।

[53]. ইবনু জারীর তাবারী, তারীখুর রুসূল ওয়াল মুলূক, ১১/৬৬১।

[54]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আল-ওয়াবিলুছ ছাইয়িব, পৃ. ৭৫।

[55]. বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান, ৩/১৬৬।

[56]. ইবনে রজব হাম্বলী, জামে‘উল উলূম ওয়াল হিকাম, ২/২৯৫।

[57]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৭/৩৬৮-৩৬৯; তারীখু বাগদাদ ১০/১৫৭-১৫৮।

[58]. ইমাম ফাকিহী, আখবারু মাক্কা, ১/১০৩।

[59]. আখবারু মাক্কাহ, ১/২৪৩।

[60]. আল-আযরাক্বী, আখবারু মাক্কাহ, ২/১৩২।






বিষয়সমূহ: হজ্জ ও ওমরাহ
ভুল সংশোধনে নববী পদ্ধতি (৭ম কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
ছিয়ামের ফাযায়েল ও মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
ছালাতের আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মহামনীষীদের পিছনে মায়েদের ভূমিকা - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
বিশ্ব ভালবাসা দিবস - আত-তাহরীক ডেস্ক
অহীভিত্তিক তাওহীদী চেতনা - আব্দুল মান্নান-এম.এম. এম.এ, মান্দা, নওগাঁ।
মুসলিম জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - মুহাম্মাদ রাফাত আনাম
ধন-সম্পদ : মানব জীবনে প্রয়োজন, সীমালংঘনে দহন (শেষ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ সাখাওয়াত হোসাইন
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
১৬ মাসের মর্মান্তিক কারা স্মৃতি (৫ম কিস্তি) - মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
নিয়মের রাজত্ব (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
পেরেনিয়ালিজম এবং ইসলাম - প্রফেসর ড. শহীদ নকীব ভূঁইয়া
আরও
আরও
.