মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মুখ। যা মহান আল্লাহর যিকর এবং পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রধান মাধ্যম। এই মুখ ও দাঁতকে রোগমুক্ত, সতেজ এবং দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য ইসলামে যে সুন্নাহভিত্তিক আমলটি নির্দেশিত হয়েছে তাহ’ল ‘মিসওয়াক’। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই নয়, বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নবীগণের সুন্নাহর অনুসরণের এক অনন্য মাধ্যম। নিম্নে মিসওয়াকের পরিচয়, এর গুরুত্ব ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরা হ’ল।-

মিসওয়াকের পরিচয় : السواك (সিওয়াক) শব্দটি ساك (সাক) শব্দমূল থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হ’ল- ঘষা, মাজা বা মর্দন করা। এর সবচেয়ে কাছাকাছি বাংলা প্রতিশব্দ হ’ল দাঁতন। পরিভাষায় দাঁত থেকে হলুদ বর্ণ বা ময়লা দূর করার জন্য কোন গাছের ডাল ব্যবহার করাকে মিসওয়াক বলা হয়।[1] তবে মিসওয়াকের মূল উদ্দেশ্য মুখ পরিষ্কার করা।[2]

মিসওয়াকের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

১. মানব প্রকৃতি বা ফিৎরাতের অনুষঙ্গ : মিসওয়াক করা মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব বা ‘ফিৎরাত’। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেছেন, عَشْرٌ مِنَ الفِطْرَةِ: قَصُّ الشّارِبِ، وإعْفاءُ اللِّحْيَةِ، والسِّواكُ، واسْتِنْشاقُ الماءِ، وقَصُّ الأظْفارِ، وغَسْلُ البَراجِمِ، ونَتْفُ الإبِطِ، وحَلْقُ العانَةِ، وانْتِقاصُ الماءِ. قالَ زَكَرِيّا: قالَ مُصْعَبٌ: ونَسِيتُ العاشِرَةَ إلّا أنْ تَكُونَ المَضْمَضَةَ. زادَ قُتَيْبَةُ، قالَ وكِيعٌ: انْتِقاصُ الماءِ: يَعْنِي الاسْتِنْجاءَ. ‘দশটি কাজ প্রকৃতিগত আচরণ (১) গোঁফ ছাটা। (২) দাড়ি ছেড়ে দেওয়া। (৩) মিসওয়াক করা। (৪) নাকে পানি দিয়ে পরিষ্কার করা। (৫) নখ কাটা। (৬) আঙ্গুলের জোড়াসমূহ ধোয়া। (৭) বগলের লোম তুলে ফেলা। (৮) গুপ্তাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা। (৯) পানি দ্বারা ইস্তেঞ্জা (শৌচকর্ম) করা। যাকারিয়া (রহ.) বলেন, মুছ‘আব (রহ.) বলেন, আমি ১০নং আচরণটি ভুলে গেছি, তবে মনে হয় তা কুলি করা হবে’।[3] উল্লেখ্য, আবু আইয়ূব (রাঃ) বর্ণিত হাদীছ, ‘চারটি বিষয় নবীদের সুন্নাত। (১) লজ্জা করা। অন্য বর্ণনায় খাতনা করার কথা রয়েছে (২) সুগন্ধি ব্যবহার করা (৩) মিসওয়াক করা ও (৪) বিবাহ করা[4] মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ।[5]

২. রাসূল (ছাঃ)-এর ব্যক্তিগত জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব : রাসূলে কারীম (ছাঃ)-এর সমগ্র জীবনে মিসওয়াকের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, যত্ন এবং ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। আমির ইবনু রাবী‘আহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ছাঃ)-কে ছিয়াম অবস্থায় অসংখ্য বার মিসওয়াক করতে দেখেছি।[6] এছাড়া কেবল দাঁত নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতার জন্য তিনি জিহবাও পরিষ্কার করতেন। আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,دَخَلتُ عَلَى النَّبيِّ ﷺ وَطَرَفُ السِّوَاكِ عَلَى لِسَانهِ ‘একদা আমি নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট প্রবেশ করলাম, তখন মিসওয়াকের একটি দিক তাঁর জিভের উপর রাখা ছিল’।[7] অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে মিসওয়াককে এক অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ করেছিলেন।

৩. ছাহাবায়ে কেরামের জীবনে মিসওয়াকের গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সুন্নাহর অনুসরণে ছাহাবায়ে কেরামও মিসওয়াককে তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। আবূ সালামাহ বলেন,فَرَأَيْتُ زَيْدًا يَجْلِسُ فِي الْمَسْجِدِ وَإِنَّ السِّوَاكَ مِنْ أُذُنِهِ مَوْضِعُ الْقَلَمِ مِنْ أُذُنِ الْكَاتِبِ فَكُلَّمَا قَامَ إِلَى الصَّلَاةِ اسْتَاكَ، ‘আমি যায়িদ (রাঃ)-কে দেখেছি, তিনি মসজিদে বসে থাকতেন, আর মিসওয়াক তার কানের ঐ স্থানে লেগে থাকত, যেখানে লেখকের কলম থাকে। অতঃপর যখনই তিনি ছালাতের জন্য দাঁড়াতেন, মিসওয়াক করে নিতেন’।[8] আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,انَ نَبِيُّ اللهِ صلي الله عليه وسلم يَسْتَاكُ، فَيُعْطِينِي السِّوَاكَ لأَغْسِلَهُ، فَأَبْدَأُ بِهِ فَأَسْتَاكُ، ثُمَّ أَغْسِلُهُ، وَأَدْفَعُهُ إِلَيْهِ ‘আল্লাহর নবী (ছাঃ) মিসওয়াক করে তা ধোয়ার জন্য আমাকে দিতেন। আমি নিজে প্রথমে তা দিয়ে মিসওয়াক করতাম। অতঃপর সেটা ধুয়ে তাঁকে দিতাম।[9] মিসওয়াকের প্রতি ছাহাবীগণের এই গুরুত্বারোপ প্রমাণ করে যে, মিসওয়াক মুমিনের ব্যক্তিত্ব ও ইবাদতের এক মর্যাদাপূর্ণ অলঙ্কার।

৪. মিসওয়াক ফরয হওয়ার আশঙ্কা : ইসলামে যেসকল বিষয়ের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, তন্মধ্যে মিসওয়াক অন্যতম। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা এতই বেশী যে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এটি উম্মতের উপর ফরয বা বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, أُمِرْتُ بِالسِّوَاكِ حَتَّى خَشِيتُ أَنْ أَدْرَدَ، ‘জিবরীল (আঃ) আমাকে (এত বেশী) দাঁতন করতে আদেশ করেছেন যে, তাতে আমি আমার দাঁত ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা করতাম’।[10] অন্য এক বর্ণনায় ওয়াসেলাহ বিন আসকবা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أُمِرْتُ بِالسِّوَاكِ حَتَّى خَشِيتُ أَنْ يُكْتَبَ عَلَيَّ ‘আমাকে (এতবেশী) দাঁতন করতে আদেশ করা হয়েছে যে, এতে আমার ভয় হত যে, না জানি দাঁতন করা আমার উপর ফরয করে দেওয়া হয়’।[11] আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রা.) হ’তে বর্ণিত অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لقد أُمِرتُ بالسِّواكِ، حتى ظنَنتُ أنَّه سيَنزِلُ به عليَّ قُرآنٌ، أو وَحْيٌ ‘আমাকে মিসওয়াকের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমার ধারণা হ’তে লাগল যে, এ সম্পর্কে হয়ত আমার উপর কুরআন নাযিল হবে, অহি নাযিল হবে’।[12] এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে যে, মিসওয়াক কেবল একটি সাধারণ অভ্যাস নয়, বরং এটি শরী‘আতের এক বিশেষ তাকীদপূর্ণ আমল।

৫. উম্মতের প্রতি দয়া ও মিসওয়াকের আবশ্যকতা : প্রত্যেক ওযূ ছালাতের সময় মিসওয়াক করাকে যরূরী করতে রাসূল (ছাঃ)-এর আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু মুসলিমদের কষ্টের কথা চিন্তা করে তিনি তা করেননি। আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي أَوْ عَلَى النَّاسِ لأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ مَعَ كُلِّ صَلاَةٍ، ‘যদি আমি আমার উম্মতের উপর বা লোকেদের উপর কঠিন মনে না করতাম, তাহ’লে প্রতিটি ছালাতের সাথে মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম’।[13] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِى لَفَرَضْتُ عَلَيْهِمُ السِّوَاكَ مَعَ الْوُضُوءِ وَلأَخَّرْتُ صَلاَةَ الْعِشَاءِ إِلَى نِصْفِ اللَّيْلِ، ‘আমি আমার উম্মতের পক্ষে কষ্টকর মনে না করলে (প্রত্যেক) ওযূর সাথে মিসওয়াক করা ফরয করে দিতাম এবং এশার ছালাত অর্ধেক রাত পর্যন্ত দেরী করে পড়তাম।[14]

৬. মিসওয়াকের প্রতি রাসূল (ছাঃ)-এর বিশেষ তাকীদ : মিসওয়াক করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর উম্মতকে বারবার তাকীদ দিয়েছেন। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, أَكْثَرْتُ عَلَيْكُمْ فِي السِّوَاكِ ‘তোমাদেরকে মিসওয়াক করার জন্য বেশী তাকীদ করেছি’।[15] কেবল সাধারণ সময়েই নয়, বরং সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুম‘আর পবিত্রতা অর্জনেও মিসওয়াককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,الْغُسْلُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُحْتَلِمٍ، وَأَنْ يَسْتَنَّ وَأَنْ يَمَسَّ طِيبًا إِنْ وَجَدَ، ‘জুম‘আর দিন প্রত্যেক বালিগের জন্য গোসল করা কর্তব্য। আর তারা মিসওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে’। আমর (ইবনু সুলায়ম) (রহ.) বলেন, গোসল সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তা ওয়াজিব। কিন্তু মিসওয়াক ও সুগন্ধি ওয়াজিব কি-না তা আল্লাহই ভাল জানেন। তবে হাদীছে এ রকমই এসেছে।[16]

৭. ফেরেশতাদের নৈকট্য লাভ : মিসওয়াককারীর জন্য পরকালীন পুরস্কারের পাশাপাশি ইবাদতের মুহূর্তে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি যদি দিনে বা রাতে ছালাতে দাঁড়াতে চায়, ফলে সে সুন্দর করে ওযূ করে ও মিসওয়াক করে অতঃপর ছালাত আদায় করে, তাহ’লে একজন ফেরেশতা তার কাছে আসে এবং তার নিকটবর্তী হয়; এমনকি তার মুখের সাথে মুখ লাগিয়ে দেয়। সুতরাং সে যা তেলাওয়াত করে তা ফেরেশতার মুখের মধ্যে যায়। আর যদি মিসওয়াক না করে, তাহ’লে ফেরেশতা তার কাছে আসে কিন্তু তার মুখের সাথে মুখ লাগায় না’।[17] তাই কুরআনের ধারক হিসাবে আমাদের মুখকে মিসওয়াকের মাধ্যমে পবিত্র রাখা কর্তব্য।

উল্লেখ্য যে, ‘যে ছালাত মিসওয়াক করে আদায় করা হয়, সেই ছালাতে মিসওয়াক করা বিহীন ছালাতের চেয়ে ৭০ গুণ বেশী নেকী হয়’,[18] ‘উত্তম মিসওয়াক হ’ল বরকতপূর্ণ যায়তুন গাছ, যা মুখকে পবিত্র করে ও দাঁতের আবরণ দূর করে’ এবং ‘এটা আমার মিসওয়াক ও আমার পূর্বের নবীগণের মিসওয়াক’ মর্মে বর্ণনাগুলো জাল।[19]

৮. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ : মিসওয়াকের মাধ্যমে যেমন মুখ ও দাঁত পরিচ্ছন্ন হয় তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টিও লাভ সম্ভব হয়। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ للرَّبِّ، ‘মিসওয়াক হ’ল মুখ পরিস্কারকারী ও প্রতিপালকের সন্তুষ্টি লাভের উপায়’।[20] মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘এ হাদীছে মিসওয়াকের দু’টি মহান উপকারিতা বর্ণিত হয়েছে। একটি দুনিয়াতে মুখ পরিস্কার হওয়া। অপরটি আখেরাতে প্রতিপালকের সন্তুষ্টি।[21]

৯. মিসওয়াকের সামাজিক তাৎপর্য : ইসলামে সমাজবদ্ধ জীবনের শিষ্টাচার ও পারস্পরিক অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মেলামেশা, বিশেষ করে জামায়াতে ছালাত আদায় বা যেকোন জনসমাবেশে মুখের দুর্গন্ধ অন্যের কষ্টের কারণ হ’তে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্বের পরিবেশে ব্যাঘাত ঘটায়। নিয়মিত মিসওয়াক ব্যবহারের মাধ্যমে মুখ দুর্গন্ধমুক্ত ও সতেজ থাকে, যা অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সামাজিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে জুম‘আর মতো বড় সমাবেশে নবী করীম (ছাঃ)-এর মিসওয়াক করার বিশেষ নির্দেশ এটাই প্রমাণ করে যে, একজন মুমিন যখন মানুষের মাঝে যাবে, তখন তার উপস্থিতি হ’তে হবে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দদায়ক। এভাবে মিসওয়াক মুমিনের ব্যক্তিত্বকে মার্জিত ও আকর্ষণীয় করার মাধ্যমে সামাজিক বন্ধনকেও সুদৃঢ় করে।

১০. মিসওয়াক করার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা : আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও দন্ত বিশেষজ্ঞরা মিসওয়াকের বহুমুখী উপকারিতা ও স্বাস্থ্যগত সুফল গুরুত্বের সাথে স্বীকার করেছেন। নিয়মিত মিসওয়াক করা দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় ঢাল হিসাবে কাজ করে। এটি দাঁতের এনামেল রক্ষা করে ক্ষয়রোধ নিশ্চিত করে এবং মাড়িকে মযবূত ও শক্তিশালী করে তোলে। মিসওয়াক মুখের অভ্যন্তরে জমে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দুর্গন্ধ দূর করে এবং দীর্ঘক্ষণ মুখকে সতেজ রাখে। যেহেতু মুখের পরিচ্ছন্নতা সরাসরি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত, তাই নিয়মিত মিসওয়াক করলে ক্ষতিকর জীবাণু পেটে প্রবেশ করতে পারে না। যা হজমপ্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটায় এবং পাকস্থলীকে সুস্থ রাখতে বিশেষ সহায়তা করে। এছাড়াও অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, মিসওয়াকের ফলে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো সচল থাকে, যা স্মৃতিশক্তি প্রখর করতে এবং দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে পরোক্ষভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

রাসূল (ছাঃ)-এর মিসওয়াকের সময়

ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে : নবী করীম (ছাঃ) ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে মিসওয়াক করতেন। হুযায়ফা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,كَانَ رَسُولُ اللهِ إِذَا قَامَ مِن النَّومِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ঘুম থেকে উঠতেন, তখন তিনি মিসওয়াক দ্বারা তাঁর মুখ পরিস্কার করে নিতেন’।[22] আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন রাতে জাগ্রত হ’তেন মিসওয়াক করতেন এবং ওযূ করে ছালাত পড়তেন’।[23] আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ঘুমানোর সময় মিসওয়াক পাশে রাখতেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রথমেই তিনি মিসওয়াক করতেন’।[24]

ঘরে প্রবেশের পর : ঘরে প্রবেশ করে তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা (রা.) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন,أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: كَانَ إِذَا دَخَلَ بَيْتَهُ بَدَأَ بِالسِّوَاكِ، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ঘরে প্রবেশ করতেন প্রথমে মিসওয়াক করতেন’।[25] শুরায়হ ইবনু হানী (রহঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, বলুনতো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে কোন কাজটি করতেন? তিনি বললেন, মিসওয়াক’।[26]

ছালাতের আগে : ছালাতের আগে তিনি মিসওয়াক করতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন,كُنَّا نُعِدُّ لَهُ سِوَاكَهُ وَطَهُورَهُ فَيَبْعَثُهُ اللَّهُ مَا شَاءَ أَنْ يَبْعَثَهُ مِنَ اللَّيْلِ فَيَتَسَوَّكُ وَيَتَوَضَّأُ، ‘(রাতের বিতর ছালাতের জন্যে) আমি পূর্বে থেকেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এর মিসওয়াক ও ওযূর পানির ব্যবস্থা করে রাখতাম। আল্লাহ তা‘আলা যখন তাঁকে ঘুম হ’তে সজাগ করতে চাইতেন, উঠাতেন। তিনি প্রথমে মিসওয়াক করতেন, তারপর ওযূ করতেন।[27] ইবনে শিহাব (রহ.) বলেন,وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يقوم إلى الصلاة حتى يستن، ‘আর রাসূল (ছাঃ) মিসওয়াক না করে কখনও ছালাতে দাঁড়াতেন না’।[28]

তিনি ছালাতের ফাঁকে মিসওয়াক করতেন। ইবনু আববাস (রা.) বলেন, كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلي من الليل ركعتين ثم ينصرف فيستاك، ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাতে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন, অতঃপর (ছালাত থেকে) অবসর হয়ে মিসওয়াক করতেন’।[29]

মৃত্যুর আগে : ‘আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) আমার ঘরে আমার পালার দিনে এবং আমার গন্ড ও সীনার মধ্যস্থলে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নবী করীম (ছাঃ) অসুস্থ হ’লে আমাদের মধ্যকার কেউ দো‘আ পড়ে তাঁকে ঝাড়-ফুঁক করতেন। আমি নবী (ছাঃ)-কে ঝাড়-ফুঁক করার জন্য তাঁর কাছে গেলাম। তখন তিনি তাঁর মাথা আকাশের দিকে উঠিয়ে বললেন, উচ্চে সমাসীন বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হ’তে চাই), উচ্চে সমাসীন মহান বন্ধুর সঙ্গে (মিলিত হ’তে চাই)। এ সময় আব্দুর রহমান ইবনু আবূ বকর (রাঃ) আগমন করলেন। তাঁর হাতে মিসওয়াকের একটি তাজা ডাল ছিল। নবী করীম (ছাঃ) তখন সেদিকে তাকালেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবী করীম (ছাঃ)-এর মিসওয়াকের প্রয়োজন। তখন আমি সেটি নিয়ে চিবালাম, ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করলাম এবং নবী (ছাঃ)-কে তা দিলাম। তখন তিনি এর দ্বারা এত সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার করলেন যে, এর আগে কখনও এরূপ করেননি। তারপর তা আমাকে দিলেন। এরপর তাঁর হাত ঢলে পড়ল অথবা রাবী বলেন, তাঁর হাত থেকে ঢলে পড়ল। আল্লাহ তা‘আলা আমার থুথুকে নবী (ছাঃ)-এর থুথুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন। তার এ দুনিয়ার শেষ দিনে এবং আখিরাতের প্রথম দিনে।[30]

পরিশেষে বলা যায়, মিসওয়াক আমাদের আত্মিক ও শারীরিক সুস্থতার এক অপূর্ব সমন্বয়। নিয়মিত মিসওয়াক করার অভ্যাস একদিকে যেমন আমাদের আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসাবে গড়ে তোলে, অন্যদিকে সমাজ ও পরিবারে আমাদের ব্যক্তিত্বকে সতেজ ও আকর্ষণীয় করে তোলে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জীবনকে সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করার এবং এর মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফীক দান করুন- আমীন!

-মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ* 


[1]. https://bn.wikipedia.org/wiki/মেসওয়াক

[2]. বুখারী হা/২৭; মিশকাত হা/৩৮১।

[3]. মুসলিম হা/২৬১; তিরমিযী হা/২৭৫৭; ছহীহুল জামে‘ হা/৪০০৯।

[4]. তিরমিযী হা/১০৮০; মিশকাত হা/৩৮২।

[5]. আলবানী, ইরওয়াউল গালীল হা/৭৫, ১/১১৭।

[6]. বুখারী হা/১৯৩৪।

[7]. বুখারী হা/২৪৪; মুসলিম হা/৬১৫।

[8]. আবু দাউদ হা/৪৭; তিরমিয়ী হা/২৩।

[9]. আবু দাউদ হা/৫২; বায়হাক্বী হা/১৭২।

[10]. বাযযার হা/৬৯৫২; সিলসিলা ছহীহাহ হা/১৫৫৬।

[11]. আহমাদ হা/১৬০০৭; ছহীহুল জামে হা/১৩৭৬।

[12]. আহমাদ হা/৩১২২; আবু ই‘য়ালা হা/২৩৩০।

[13]. বুখারী হা/৮৮৭; মুসলিম হা/৬১২।

[14]. হাকেম হা/৫১৬; বায়হাক্বী হা/১৪৬; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৩১৯।

[15]. বুখারী হা/৮৮৮; নাসাঈ হা/৬; ছহীহুল জামে‘ হা/১২০০।

[16]. বুখারী হা/৮৮০; মুসলিম হা/৮৪৬।

[17]. ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ হা/১২০৫; ছহীহুল জামে‘ হা/৭২৩।

[18]. হাকেম হা/৫১৫; ইবনু খুযায়মাহ হা/১৩৭; মিশকাত হা/৩৮৯; আলবানী, মিশকাত হা/৩৮৯-এর টীকা দ্রঃ, ১/১২৪।

[19]. সিলসিলা যঈফাহ হা/৫৩৬০ ও ৫৫৭০।

[20]. আহমাদ হা/২৪২০৩; নাসাঈ হা/৫; ছহীহুত তারগীব হা/২০২।

[21]. শরহুল মুমতে‘ ‘আলা যাতিল মুসকাক্বনি ১/১৪৭।

[22]. বুখারী হা/২৪৫, ১১৩৬; মুসলিম হা/৬১৬-৬১৮।

[23]. মুসলিম হা/১৭৭৩।

[24]. আহমাদ হা/৫৯৭৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২১১১।

[25]. মুসলিম হা/২৫৩; আহমাদ হা/২৫৫৫৩; আবু দাউদ হা/৫১।

[26]. মসলিম হা/২৫৩; মিশকাত হা/৩৭৭।

[27]. মুসলিম হা/৭৪৬; মিশকাত হা/১২৫৭।

[28]. আলবানী, ছহীহুল জামে‘ হা/৭২৩।

[29]. আহমাদ হা/১৮৮১; নাসাঈ হা/৭০৫।

[30]. বুখারী হা/৪৪৫১।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
জান্নাতের পথ (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. নূরুল ইসলাম
আল-কুরআনে বিজ্ঞানের নিদর্শন (২য় কিস্তি) - ইঞ্জিনিয়ার আসিফুল ইসলাম চৌধুরী
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (২য় কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
কুরআনের বঙ্গানুবাদ, মুদ্রণ প্রযুক্তি ও ঊনিশ শতকের মুসলিম সমাজে এর প্রভাব - আসাদুল্লাহ আল-গালিব (শিক্ষার্থী, ইংরেজী বিভাগ, ২য় বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
সমাজ সংস্কারে ফরায়েযী আন্দোলনের ভূমিকা - এডভোকেট জারজিস আহমাদ
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
লাইলাতুল মি‘রাজ : করণীয় ও বর্জনীয় - শেখ আব্দুছ ছামাদ
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আহলেহাদীছ একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম (৮ম কিস্তি) - আহমাদুল্লাহ - সৈয়দপুর, নীলফামারী
সফরের আদব - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
আমাদের পরিচয় কি শুধুই মুসলিম? - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা (৭ম কিস্তি) - মীযানুর রহমান মাদানী
আরও
আরও
.