ভূমিকা :
উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য মহান আল্লাহর এক অনন্য ও শ্রেষ্ঠ উপহার ‘লায়লাতুল ক্বদর’। এটি বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ রজনী, যার একটি মুহূর্তের ইবাদত হাযার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এ রাতেই আল্লাহ পবিত্র কুরআন নাযিল করেছেন। এ রাতের কারণেই রামাযান পেয়েছে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মাসের মর্যাদা। মুমিনের সংক্ষিপ্ত জীবনে রামাযান হ’ল ইবাদতের বসন্তকালের মত, আর লায়লাতুল ক্বদর হ’ল পরকালের পাথেয় সংগ্রহের এক মাহেন্দ্রক্ষণ। কোন্ কোন্ উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে এই মহিমান্বিত রাতের ফযীলত লাভ করা যায় এবং এর প্রতিটি মুহূর্তকে কিভাবে আমল ও ইবাদতের মাধ্যমে সার্থক করে তোলা যায়, সেই বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী উপায়গুলো পর্যালোচনার জন্যই বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের অবতারণা।
লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত :
‘ক্বদর’ (القدر) অর্থ الشرف، المنزلة সম্মান, মর্যাদা। لَيْلَةُ الْقَدْرِ অর্থ মর্যাদার রাত্রি। অথবা لَيْلَةٌ ذُوْ قَدْرٍ মহিমান্বিত রজনী। অথবা لَيْلَةُ التَّقْدِيْرِ ‘ভাগ্য নির্ধারণের রাত্রি’।[1] মহান আল্লাহ এই মাসে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করেছেন। আল্লাহ বলেন,إِنَّآ أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ- وَمَآ أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ- لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ- تَنَزَّلُ الْمَلَآئِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ- سَلاَمٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ- ‘আমরা একে (কুরআন) নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে’ । ‘তুমি কি জানো ক্বদরের রাত্রি কি?’। ‘ক্বদরের রাত্রি হাযার মাস অপেক্ষা উত্তম’। ‘এ রাতে অবতরণ করে ফেরেশতাগণ এবং রূহ, তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে বিভিন্ন নির্দেশনা সহকারে’। ‘এ রাতে কেবলই শান্তি বর্ষণ। যা চলতে থাকে ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত’ (ক্বদর ৯৭/১-৫)। শায়খ ইবনে উছায়মীন (রহ.) বলেন, ‘অত্র সূরায় লায়লাতুল ক্বদরের বেশ কিছু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে (১) আল্লাহ এই রাতে কুরআন অবতীর্ণ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে মানবজাতির হেদায়াত ও দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যের উপকরণ, (২)وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ‘তুমি কি জানো ক্বদরের রাত্রি কি’?- এ আয়াতে প্রশ্নবোধক ভঙ্গিটি এই রাতের মহিমা, গাম্ভীর্য ও গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে, (৩) এই রাত এক হাযার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, (৪) এই রাতে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হন; আর তারা কেবল কল্যাণ, বরকত ও রহমত নিয়েই অবতরণ করেন, (৫) এটি প্রশান্তির রাত; ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে এই রাতে আল্লাহর আযাব ও শাস্তি থেকে নিরাপত্তা লাভ করা যায় এবং (৬) আল্লাহ এই রাতের সম্মানে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন, যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে।[2]
আনাস বিন মালেক (রাঃ) বলেন, যখন রামাযান মাস আগমন করল, তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ، وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ، وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ، ‘এই (রামাযান) মাস তোমাদের মাঝে উপস্থিত। এ মাসে এমন এক রাত আছে, যা হাযার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি (এর রাতের কল্যাণ থেকে) বঞ্চিত হ’ল, সে সমস্ত কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হ’ল। কেবল হতভাগ্যরাই তা থেকে বঞ্চিত থাকে’।[3]
ধরুন! একজন সামান্য বেতনের কর্মচারী যদি খবর পায় যে, বছরের একটি বিশেষ রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা ডিউটি করলে তাকে ৮০ বছরেরও বেশী সময়ের অগ্রিম বেতন বোনাসসহ দিয়ে দেওয়া হবে, তবে কি তিনি সেই রাতে ঘুমাতে পারবেন? নিশ্চয়ই না! লায়লাতুল ক্বদর ঠিক তেমনই ইবাদতের এক মেগা অফারের রাত, যে রাতের ইবাদত কবুল হ’লে এক হাযার মাস (প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস)-এর চেয়েও উত্তম হিসাবে পরিগণিত হয়। অর্থাৎ মাত্র এক রাতের ইবাদত একজন মুমিনকে পুরো একটি দীর্ঘ জীবনের ইবাদতের ছওয়াব এনে দিতে পারে। সুতরাং একজন সচেতন মুমিন বান্দা কখনোই এই রাতে ইবাদত থেকে গাফেল থাকতে পারেন না।
লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ قَامَ لَيْلَةَ القَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ، ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় লায়লাতুল ক্বদরের কিবয়াম করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে’।[4] এখানে إِيمَانًا ‘ঈমানের সাথে’ অর্থ আল্লাহর প্রতি এবং এই রাতে ইবাদতকারীদের জন্য আল্লাহ যে পুরস্কার প্রস্ত্তত রেখেছেন তার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখা; আর إِحْتِسَابًا ‘ছওয়াবের আশায়’-এর অর্থ হ’ল কেবল আল্লাহর কাছে ছওয়াবের আশা করা ও তঁার কাছে প্রতিদান অন্বেষণ করা’।[5] অত্র হাদীসেছর ব্যাখ্যায় শায়খ ইবনে বায (রহঃ) বলেন, وَقِيَامُهَا يَكُونُ بِالصَّلَاةِ وَالذِّكْرِ وَالدُّعَاءِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ وَغَيْرِ ذَلِكَ مِنْ وُجُوهِ الْخَيْرِ، ‘আর এই রাতের (লায়লাতুল ক্বদরের) ক্বিয়াম সম্পন্ন হয় ছালাত, যিকির, দো‘আ, কুরআন তেলাওয়াত এবং অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে’।[6] অর্থাৎ শুধু তারাবীহর ছালাত নয়; বরং এর সাথে অন্যান্য নফল ইবাদতের মাধ্যমেও এই রাতের মহান ফযীলত অর্জন করা যায়।
রামাযান মাসের শেষ দশ রাতের মধ্যে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ মোট পঁাচটি বেজোড় রাত বেশী সম্ভাবনাময়। আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَّمَضَانَ- ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে ক্বদরের রাত্রি তালাশ কর’।[7] সুতরাং লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত লাভের জন্য এই পাঁচ বেজোড় রাতকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া কর্তব্য।
লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত লাভের উপায়
লায়লাতুল ক্বদরের ছওয়াব লাভের জন্য কতিপয় করণীয় রয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে একজন বান্দা পরিপূর্ণরূপে সেই ফযীলত অর্জন করতে পারে। নিম্নে সেই উপায়গুলো ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হ’ল।
১. এশা ও ফজর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা :
লায়লাতুল ক্বদরের বরকত পাওয়ার প্রথম ও প্রধান সোপান হ’ল ফরয ছালাতের প্রতি যত্নশীল হওয়া। বিশেষ করে এশা ও ফজরের ছালাত জামা‘আতে আদায় করলে সারা রাত ইবাদতের সমান নেকী অর্জিত হয়। ওছমান ইবনে আফ্ফান (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি,مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ، كَانَ كَقِيَامِ نِصْفِ لَيْلَةٍ، وَمَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ وَالْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ كَانَ كَقِيَامِ لَيْلَةٍ، ‘যে ব্যক্তি এশার ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধ রাত ক্বিয়ামুল লায়ল (রাতের নফল ছালাত/তাহাজ্জুদ) আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এশা ও ফজর উভয় ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করল, সে যেন সারা রাত ছালাত আদায় করল’।[8] শায়খ ইবনে উছায়মীন (রহঃ) বলেন, ‘অত্র হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত যে, কোন ব্যক্তি এশা ও ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করলে সে সারা রাত ছালাত আদায়ের নেকী লাভ করতে পারে। এটি আল্লাহর এক মহান অনুগ্রহ। অর্থাৎ আপনি যখন এশা ও ফজরের ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করবেন, তখন আপনি আপনার বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থাতেও যেন সারা রাত ইবাদতে দন্ডায়মান থাকলেন’।[9] বিখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহঃ) বলেন, مَنْ شَهِدَ الْعَشَاءَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ، فَقَدْ أَخَذَ بِحَظٍّ مِنْهَا، ‘যে ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরের রাতে এশার ছালাতে (জামা‘আতে) উপস্থিত হ’ল, সে এই রাতের কল্যাণ থেকে নিজের অংশ গ্রহণ করে নিল’।[10] সুতরাং আমরা যদি রামাযানের শেষ দশকে এশা ও ফজর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করতে পারি, তবে আমরা নিশ্চিতভাবে লায়লাতুল ক্বদরের প্রত্যাশা করতে পারি। সেজন্য খেয়াল রাখতে হবে, যেন মার্কেটে ঘুরাঘুরি করে, অথবা ঘুম ও গাফলতির কারণে আমাদের এই দুই ছালাতের জামা‘আত ছুটে না যায়। তবে মহিলারা সময় মতো বাড়ীতে ছালাত আদায়ের মাধ্যমে এই নেকী লাভ করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
২. তারাবীহর ছালাত জামা‘আতের সাথে আদায় করা :
রামাযানের রাতগুলোতে ইমামের সাথে তারাবীহর ছালাত আদায় করা ক্বদরের ফযীলত অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের ভিতরে ও রামাযানের বাইরে বিতরসহ এগারো রাক‘আত তাহাজ্জুদ বা তারাবীহর ছালাত আদায় করেছেন।[11] জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,صَلَّى بِنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي رَمَضَانَ ثَمَانِ رَكَعَاتٍ وَالْوِتْرَ- ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযান মাসে আমাদেরকে ৮ রাক‘আত তারাবীহ ও বিতর ছালাত পড়ান’।[12] রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,إِنَّ الرَّجُلَ إِذَا صَلَّى مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ، حُسِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَة، ‘কোন ব্যক্তি যদি ইমাম ছালাত শেষ করা পর্যন্ত তার সাথে (তারাবীহর) ছালাত আদায় করে, তাহ’লে তার জন্য পূরো রাত ছালাত আদায় করা হিসাবে গণ্য হবে’।[13] অর্থাৎ ইমামের সাথে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারাবীহর ছালাত আদায় করলে পূর্ণ রাত ইবাদতের ছওয়াব পাওয়া যায়। এটি মূলত উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ, যাতে স্বল্প পরিশ্রমে তারা সারারাত ক্বিয়ামুল লায়লের মর্যাদা লাভ করতে পারে।
৩. রাতে একশ’ আয়াত কুরআন তেলাওয়াত করা :
কুরআন নাযিলের রাতে কুরআন তেলাওয়াত করা শ্রেষ্ঠ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। কোন বান্দা যদি রাতের বেলা পবিত্র কুরআন থেকে ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করে, তবে তিনি সে রাতে তাহাজ্জুদ বা ক্বিয়ামুল লায়ল আদায় করার নেকী অর্জন করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেন, مَنْ قَرَأَ بِمِائَةِ آيَةٍ فِي لَيْلَةٍ، كُتِبَ لَهُ قُنُوتُ لَيْلَةٍ، ‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা একশত আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য পুরো রাতটাই ইবাদত হিসাবে গণ্য হবে’।[14] অপর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, وَمَنْ قَرَأَ فِي لَيْلَةٍ مِائَةَ آيَةٍ كُتِبَ مِنَ الْقَانِتِينَ ‘যে ব্যক্তি রাতে একশত আয়াত পাঠ করবে, তাকে ‘ক্বানিতীন’ বা অনুগত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে লিপিবদ্ধ করা হবে’।[15] সূরা বাক্বারাহর মত বড় সূরাগুলো ছাড়াও কুরআনের শেষ দিকের ছোট ছোট কয়েকটি সূরা মিলালেই ১০০ আয়াত হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি সূরা ওয়াক্বিয়াহ [৯৬ আয়াত বিশিষ্ট] পড়ে এবং সাথে সূরা ইখলাছ [৪ আয়াত বিশিষ্ট] তেলাওয়াত করে, এতে তার ১০০ আয়াত পূর্ণ হয়ে যায়। শুধু রামাযানে নয়; রামাযানের বাইরেও ঘুমানোর আগে মোবাইল স্ক্রিনে সময় নষ্ট না করে মাত্র ১০-১৫ মিনিট সময় ব্যয় আমরা এই ফযীলতপূর্ণ আমলটি সম্পাদন করতে পারি। আর কেউ যদি এর চেয়ে আরো বেশী সময় নিয়ে আরো বেশী তেলাওয়াত করতে পারে, তবে সেটা তো ‘নূরুন ‘আলা নূর’ বা সোনায় সোহাগা।
৪. সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত তেলাওয়াত করা :
পবিত্র কুরআনে বিশেষ বিশেষ কিছু সূরা ও আয়াত আছে, যার স্বতন্ত্র ফযীলত হাদীছে বিধৃত হয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল সূরা বাক্বারাহর শেষ দুই আয়াত। রাতের বেলা এই দুই আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে বান্দা সেই রাতের তাহাজ্জুদের নেকী লাভ করবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ قَرَأَ بِالْآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ، ‘যে ব্যক্তি রাত্রে সূরা বাক্বারাহর শেষ দু্ই আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যাবে’।[16] ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) বলেন, من قرأ خاتمة الْبَقَرَةِ أَجْزَأَتْ عَنْهُ قِيَامَ لَيْلَةٍ، ‘যে ব্যক্তি সূরা বাক্বারার শেষাংশ তেলাওয়াত করবে, তবে এটা তার পক্ষ থেকে ক্বিয়ামুল লায়লের ছওয়াব লাভের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে’।[17] ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) বলেন,أَجْزَأَتَاهُ مِنْ قِيَامِ اللَّيْلِ بِالْقُرْآنِ ‘এ আয়াত দু’টি তার জন্য কুরআন পাঠের মাধ্যমে তাহাজ্জুদ বা ক্বিয়ামুল লায়ল আদায়ের স্থলাভিষিক্ত হবে (অর্থাৎ যথেষ্ট হবে)’।[18] ইমাম নববী (রহঃ) বলেন, ‘অত্র হাদীছের মর্মার্থ হ’ল (সূরা বাকবারাহর শেষ দুই আয়াত রাতে তেলাওয়াত করা) ক্বিয়ামুল লায়লের নেকী লাভের জন্য যথেষ্ট, শয়তান বা কোন অনিষ্টকারিতা থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ট অথবা এটা সবকিছুর জন্যই যথেষ্ট’।[19] মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি ছোট ছোট আমলের জন্য অনেক বড় বড় নেকী বরাদ্দ রেখেছেন। সুতরাং লায়লাতুল ক্বদরের সম্ভাবনাময় রাতগুলো এই ছোট আমলটি সম্পাদন করে আমরা এ রাতের ফযীলত লাভের প্রত্যাশা করতে পারি।
৫. দান-ছাদাক্বা করা :
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একটি বড় মাধ্যম হ’ল দান-ছাদাক্বা। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযান মাসে প্রবাহিত বায়ুর চেয়েও অধিক দান-ছাদাক্বা করতেন।[20] বিশেষ করে গরীব-মিসকীন ও বিধবাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমরা একই সাথে জিহাদ, ছিয়াম ও ক্বিয়ামের নেকী লাভ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,السَّاعِي عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ كَالمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ كَالَّذِي يَصُومُ النَّهَارَ وَيَقُومُ اللَّيْلَ، ‘বিধবা ও মিসকীনদের ভরণ-পোষণের জন্য চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ অথবা সারাদিন ছিয়াম পালনকারী ও সারারাত (তাহাজ্জুদ) ছালাত আদায়কারীর সমান ছওয়াবের অধিকারী’।[21]
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে এই হাদীছটির ওপর আমল করা আমাদের জন্য অনেকটা সহজ। যেমন- রামাযান মাসে আমাদের মসজিদগুলোতে অনেক অসহায় মানুষ বা সাহায্যপ্রার্থী সমবেত হয়। আমরা সরাসরি তঁাদের হাতে কিছু দান তুলে দিয়ে লায়লাতুল ক্বদরের ছওয়াব অর্জন করতে পারি। এছাড়া আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা বিকাশ বা নগদের মতো অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই গ্রামের বাড়ীর কোন গরীব আত্মীয় বা পরিচিত অভাবী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। আরও চমৎকার একটি পদ্ধতি হ’তে পারে- বিকাশ বা নগদে ‘অটো সেন্ড মানি’ (Auto Send Money) অপশনটি চালু করে দেওয়া। আমরা যদি কোন বিশ্বস্ত দুস্থ কল্যাণ ফান্ড বা পরিচিত গরীব মানুষের নম্বরে প্রতি রাতের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ (যেমন ৫০ বা ১০০ টাকা) অটো-সেন্ড সেট করে রাখি, তবে মাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকার মাধ্যমেই পুরো দশ রাত দান করার নেকী নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে সুবিধা হ’ল, আমরা যদি কোন কারণে বা ইবাদতে ব্যস্ত থাকার ফলে দানের কথা ভুলেও যাই, তবুও ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে আমাদের পক্ষ থেকে সেই দানটি ঠিকই পৌঁছে যাবে। এভাবে সামান্য বুদ্ধিমত্তা আর সদিচ্ছা কাজে লাগিয়ে আমরা অবলীলায় এক হাযার মাস দান-ছাদাক্বাহ করার এক বিশাল নেকীর পাহাড় গড়ে তুলতে পারি।
৬. যিকির ও বিশেষ দো‘আ পাঠ করা :
যিকির হ’ল অন্তরের খাদ্য। যিকিরের মাধ্যমে বান্দা ক্বিয়ামুল লায়লের নেকী ও ক্বদরের মর্যাদা লাভ করতে পারে। যিনি যত বেশী আল্লাহকে স্মরণ করেন, তার অন্তর তত প্রশান্ত থাকে। আল্লাহ বলেন, أَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ‘জেনে রাখ! যিকিরের মাধ্যমে হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে’ (রা‘দ ১৩/২৮)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ فَاتَهُ اللَّيْلُ أَنْ يُكَابِدَهُ، وَبَخِلَ بِمَالِهِ أَنْ يُنْفِقَهُ، وَجَبُنَ عَنِ الْعَدُوِّ أَنْ يُقَاتِلَهُ، فَلْيُكْثِرْ مِنْ سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، فَإِنَّهُمَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ جَبَلِ ذَهَبٍ وَفِضَّةٍ أَنْفَقَهُ فِي سَبِيلِ اللهِ، ‘যার কাছ থেকে ইবাদতের কষ্টে কাটানো রাত হাতছাড়া হয়ে যায়, যে সম্পদ দান করতে কার্পণ্য করে এবং যে ব্যক্তি শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে হীনবল হয়ে যায়, সে যেন বেশী বেশী ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পাঠ করে। কেননা এই দু’টি বাক্যের মাধ্যমে যিকির করা আল্লাহর নিকটে তার পথে পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য দান করার চেয়েও প্রিয়তর’।[22] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দিনে একশত বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী’ পাঠ করবে, তার পাপরাশি ক্ষমা করা হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনা সমপরিমাণ হয়’।[23] অতএব যারা অসুস্থতা, বিপদাপদ বা অন্য কোন কারণে রাত্রিকালীন ইবাদতের কষ্টে বা তাহাজ্জুদে নিজেদের নিয়োজিত করতে অপারগ হয়ে যায়, তারা বেশী বেশী যিকিরের মাধ্যমেও সেই আমলের নেকী ও মর্যাদা পেয়ে যাবে। অথবা সুস্থ বান্দাগণও ছালাত ও তেলাওয়াতের ফাঁকে ফঁাকে যিকিরের মাধ্যমে তাদের সময়গুলোকে আরো ভালভাবে অতিবাহিত করতে পারেন।
আল্লাহর কাছে সর্বদা বেশী বেশী প্রার্থনা করা মুস্তাহাব। রামাযান মাসে আরও বেশী এবং রামাযানের শেষ দশকে আরও বেশী। তন্মধ্যে শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলিতে সবচাইতে বেশী। বিশেষভাবে যে দো‘আটি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আয়েশা (রাঃ)-কে এ রাত্রিতে পড়ার জন্য শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা হ’লاَللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّىْ- ‘হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল! তুমি ক্ষমা করতে ভালবাসো। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর’।[24] ক্বদরের রাতে এই দো‘আটি সবচেয়ে বেশী পড়ার চেষ্টা করা উচিত। কারণ এই দো‘আটি বিশেষভাবে এই রাতে পাঠ করার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় স্ত্রীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাছাড়া ‘সুবহানাল্লাহ’, আল-হামদুলিল্লাহ’, লা-ইলা-হা ইল্লালল্লা-হ’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা-বিল্লা-হ’ প্রভৃতি যিকিরের মাধ্যমেও আমরা লায়লাতুল ক্বদরের সময়গুলো বরকতমন্ডিত করতে পারি।
৭. রাতে তাহাজ্জুদের নিয়তে ঘুমিয়ে পড়া :
বান্দা যখন কোন নেক আমলের জন্য একনিষ্ঠভাবে নিয়ত করেন, তখন সেই আমলটি সম্পাদন করতে না পারলেও শুধু নিয়তের কারণে আল্লাহ তাকে ছওয়াব দান করেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেন,مَنْ أَتَى فِرَاشَهُ وَهُوَ يَنْوِي أَنْ يَقُومَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ، فَغَلَبَتْهُ عَيْنَاهُ حَتَّى أَصْبَحَ كُتِبَ لَهُ مَا نَوَى، وَكَانَ نَوْمُهُ صَدَقَةً عَلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ، ‘যে ব্যক্তি বিছানায় শয়নকালে এই নিয়ত করবে যে, সে ঘুম থেকে জেগে রাতের ছালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করবে, অতঃপর ঘুমের আধিক্যের কারণে যদি সকাল হয়ে যায়, তবুও সে যার নিয়ত করেছে, তার নেকী পেয়ে যাবে। আর আল্লাহর কাছে তার সেই ঘুমটা ছাদাক্বাহ হিসাবে গৃহীত হবে’।[25] অতএব লায়লাতুল ক্বদরের রাতে কেউ যদি অসুস্থতা বা চরম ক্লান্তির কারণে পূর্ণ ইখলাছের সাথে তাহাজ্জুদ পড়ার সুদৃঢ় নিয়ত নিয়ে বিছানায় যায় এবং ঘটনাক্রমে তার ঘুম না ভাঙে, তবে দয়াময় আল্লাহ তার নিয়তের বরকতে তাকে ক্বদর রাতের ক্বিয়ামের ছওয়াব দিতে পারেন। তবে এটা একটি বিশেষ অবস্থার জন্য প্রযোজ্য। সুতরাং গাফলতি করে ঘুমিয়ে এই ছওয়াব লাভের প্রত্যাশা করা অনুচিত।
৮. ই‘তিকাফ করা :
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সকল দুনিয়াবী ব্যস্ততা ত্যাগ করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করাকে ই‘তিকাফ বলে। ই‘তিকাফ করা সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) লায়লাতুল ক্বদর লাভের জন্য প্রতি রামাযানের শেষ দশকে নিয়মিত ই‘তিকাফ করতেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন,كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْتَكِفُ فِى كُلِّ رَمَضَانَ عَشْرَةَ أَيَّامٍ، فَلَمَّا كَانَ الْعَامُ الَّذِى قُبِضَ فِيهِ اعْتَكَفَ عِشْرِينَ يَوْمًا- ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রতি রামাযানে দশদিন ই‘তিকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি মারা যান, সে বছর বিশ দিন ই‘তিকাফ করেন’।[26] সুতরাং যারা লায়লাতুল ক্বদরের নেকী লাভের প্রত্যাশী, তাদের ই‘তিকাফে বসা কর্তব্য। কারণ ই‘তিকাফের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা দুনিয়ার সব ব্যস্ততা ছিন্ন করে আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে যান, যা লায়লাতুল ক্বদর পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
৯. রাত্রি জাগরণ করা :
মুমিনের জীবনে সবচেয়ে দামী প্রহর হ’ল রামাযানের শেষ দশকের রাতগুলো, যা অবহেলায় হারিয়ে ফেলা মানে আজীবনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই শেষ দশকে সকল দুনিয়াবী ব্যস্ততা ঝেড়ে ফেলে ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধে নিতেন। নিজে রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও জাগিয়ে দিতেন, যেন রহমতের এই বারিধারা থেকে কেউ বঞ্চিত না হয়। আয়েশা (রাঃ) বলেন,إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ- ‘রামাযানের শেষ দশক উপস্থিত হ’লে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোমর বেঁধে নিতেন। নিজে রাত্রি জাগরণ করতেন ও স্বীয় পরিবারকে জাগাতেন’।[27] তিনি বলেন, يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ- ‘শেষ দশকে রাসূল (ছাঃ) যত কষ্ট করতেন, অন্য সময় তত করতেন না’।[28] শায়খ ইবনে বায (রহঃ) বলেন,فَمَنْ قَامَ لَيَالِيَ الْعَشْرِ كُلَّهَا إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا أَدْرَكَ هَذِهِ اللَّيْلَةَ بِلَا شَكٍّ، وَفَازَ بِمَا وَعَدَ اللهُ أَهْلَهَ، وَقَدْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخُصُّ هَذِهِ اللَّيَالِيَ بِمَزِيدِ اجْتِهَادٍ لَا يَفْعَلُهُ فِي الْعِشْرِينَ الْأُوَلِ، ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ছওয়াবের প্রত্যাশায় (রামাযানের) শেষ দশকের প্রতি রাতে ইবাদত করবে, সে নিঃসন্দেহে এই রাতটি (লায়লাতুল ক্বদর) লাভ করবে এবং আল্লাহ এই রাতের ইবাদতকারীদের জন্য যে পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন তা অর্জনে সফল হবে। নবী কারীম (ছাঃ) এই রাতগুলোতে ইবাদতে এমন বেশী সচেষ্ট হ’তেন, যা তিনি রামাযানের প্রথম বিশ দিনে করতেন না’।[29] অতএব লায়লাতুল ক্বদর অন্বেষণের জন্য ইবাদতের মাধ্যমে নিজে রাত্রি জাগরণ করা এবং পরিবারকে জাগানো কর্তব্য। সুতরাং এই শেষ দশকের মূল্যবান মুহূর্তগুলো যেন মার্কেটিং, কেনাকাটা, বিলাসিতা, আনন্দ-উল্লাস, খাওয়া-দাওয়ার আধিক্য ও গাফলতিতে অপচয় না হয়, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখা উচিত।
১০. রাতের ইবাদত ছুটে গেলে পরদিন সকালে আদায় করা :
মুমিনের আমলী যিন্দেগীতে অনেক সময় অসুস্থতা বা অনিচ্ছাকৃত ঘুমের কারণে রাতের নিয়মিত ওযীফা বা ইবাদত ছুটে যেতে পারে। মহান আল্লাহ তঁার বান্দার জন্য এতটাই দয়ালু যে, রাতে কোন ইবাদত করতে না পারলেও পরের দিন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা আদায় করে নিলে তিনি রাতের সেই পূর্ণ ছওয়াবই দান করেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ نَامَ عَنْ حِزْبِهِ، أَوْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ، فَقَرَأَهُ فِيمَا بَيْنَ صَلَاةِ الْفَجْرِ، وَصَلَاةِ الظُّهْرِ، كُتِبَ لَهُ كَأَنَّمَا قَرَأَهُ مِنَ اللَّيْلِ، ‘কেউ রাতের কোন করণীয় কাজ বা নেক আমল আদায় না করে ঘুমিয়ে পড়লে, সে যদি ফজর ও যোহর ছালাতের মধ্যবর্তী কোন সময়ে তা আদায় করে নেয়, তাহ’লে তার আমলের নেকী এমনভাবে লেখা হয়, যেন সে রাতের বেলাই সেটা পাঠ করেছে’।[30] ইমাম ইবনু তায়মিয়াহ (৬৬১-৭২৮হি.) বলেন,مَنْ كَانَ يَنَامُ عَنْ قِيَامِ اللَّيْلِ فَصَلَاةُ الضُّحَى بَدَلٌ عَنْ قِيَامِ اللَّيْلِ، ‘যে ব্যক্তি ক্বিয়ামুল লায়ল আদায় না করে ঘুমায়, সে ক্বিয়ামুল লায়লের বদলে চাশতের ছালাত আদায় করে নিবে’।[31] শায়খ ইবনে উছায়মীন (রহঃ) বলেন, যদি কোন ব্যক্তির রাতে ছালাত (তাহাজ্জুদ) আদায়ের অভ্যাস থাকে, কিন্তু সে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে এর পুরোটা বা কিয়দাংশ পড়তে না পারে; অতঃপর সে যদি তা ফজর ও যোহরের ছালাতের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করে নেয়; তবে সে যেন তা তার নির্ধারিত রাতেই আদায় করল। কিন্তু কাযা করার সময় বিতর ছালাত বেজোড় রাক‘আত আদায় করবে না; বরং জোড় করে পড়বে। অর্থাৎ সে যদি নিয়মিত এক রাক‘আত বিতর পড়তে অভ্যস্ত হয়, তবে দিনের বেলা কাযা আদায় করার সময় দুই রাক‘আত পড়বে, তিন রাক‘আত বিতরে অভ্যস্ত হ’লে কাযা করার সময় চার রাক‘আত আদায় করবে।[32]
সুতরাং লায়লাতুল ক্বদরের কোন এক রাতে অসুস্থতা, সফর বা অত্যধিক ক্লান্তির কারণে কোন বান্দার যদি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত বা তাহাজ্জুদ ছুটে যায়; আর তিনি যদি হতাশ না হয়ে পরের দিন ফজর থেকে যোহরের মধ্যবর্তী সময়ে সেই তেলাওয়াত বা ছালাতটুকু আদায় করে নেন, তবে সেটা ক্বদরের রাতের আমল হিসাবেই গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ। এটি মূলত একনিষ্ঠ মুমিনদের জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ উপহার, যাতে ওযরবশত কোন পরিস্থিতির কারণে কেউ ছওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়।
১১. অপরকে লায়লাতুল ক্বদরের আমল শিক্ষা দেওয়া :
কোন আমলের দ্বিগুণ নেকী পাওয়ার অন্যতম উপায় হ’ল, অপরকে সেই আমল শিক্ষা দানের মাধ্যমে তাকে অনুপ্রাণিত করা। কোন ব্যক্তির অনুপ্রেরণায় ও দাওয়াতের মাধ্যমে যদি অপর কোন ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত লাভের উপায়গুলো অবলম্বন করে, তবে দাওয়াত প্রদানকারীর আমলনামায় সেই আমলকারীর সমান নেকী লিখে দেওয়া হবে। রাসূলূল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ، ‘যে ব্যক্তি অন্য কোন মানুষকে কোন নেক কাজের পথ দেখায় (উৎসাহিত করে), সে ঐ নেক কাজ সম্পাদনকারীর সমান ছওয়াব পাবে’।[33] যেমন- আপনি কাউকে লায়লাতুল ক্বদরের বিশেষ দো‘আটি শিখিয়ে দিলেন অথবা রাতে ইবাদত করার ফযীলত মনে করিয়ে দিয়ে কাউকে উৎসাহিত করলেন; তবে আপনার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি সারা রাত যে ইবাদত করবেন, নিজ ঘরে বসে আপনিও ঠিক সমপরিমাণ ছওয়াব লাভ করবেন।
বিশেষ সতর্কতা
মনে রাখা যরূরী যে, আমল যতই বেশী হোক না কেন, অন্তরে কারো প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ পুষে রাখলে এই রাতের বিশেষ ক্ষমা ও বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার চরম ঝুঁকি থাকে। উবাদা ইবনুছ ছামেত (রাঃ) বলেন, একদা নবী (ছাঃ) আমাদেরকে লায়লাতুল ক্বদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দু’জন মুসলিম ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন, خَرَجْتُ لِأُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ القَدْرِ، فَتَلاَحَى فُلاَنٌ وَفُلاَنٌ، فَرُفِعَتْ وَعَسَى أَنْ يَكُونَ خَيْرًا لَكُمْ، فَالْتَمِسُوهَا فِي التَّاسِعَةِ، وَالسَّابِعَةِ، وَالخَامِسَةِ ‘আমি তোমাদেরকে ক্বদরের রাত্রি সম্পর্কে খবর দেবার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু অমুক অমুক দু’জন মুসলিম ঝগড়ায় লিপ্ত হ’ল। ফলে সেটি আমার থেকে উঠিয়ে নেওয়া হ’ল (অর্থাৎ তারিখ ও সময়টি আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হ’ল)। সম্ভবতঃ এটা তোমাদের জন্য ভাল হ’ল। অতএব তোমরা এটা অনুসন্ধান কর ২৯, ২৭ ও ২৫শের রাতে’।[34] শায়খ ইবনে উছায়মীন (রহ.) বলেন, أَنَّ الشَّحْنَاءَ تَمْنَعُ بَرَكَةَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَأَنَّهُ لَا يُغْفَرُ لِاثْنَيْنِ بَيْنَهُمَا شَحْنَاءُ وَعَدَاوَةٌ فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ الْعَظِيمَةِ ‘পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা লায়লাতুল ক্বদরের বরকতকে বাধাগ্রস্ত করে। এই মহান রাতেও এমন দুই ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না যাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ বিদ্যমান’।[35]
উপসংহার :
‘লায়লাতুল ক্বদর’ হ’ল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য এক অনন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। জীবনের দীর্ঘ পথ চলায় আমরা জেনে-না জেনে অসংখ্য পাপ করেছি, অলসতায় হারিয়েছি মহামূল্যবান সময়। সেই ভুল ও পাপরাশি থেকে নিজেকে পবিত্র করার এক মাহেন্দ্রক্ষণ হ’ল লায়লাতুল ক্বদর। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী (রহঃ) বলেন, يَا مَنْ ضَاعَ عُمُرُهُ لَا شَيْءَ اسْتَدْرِكْ مَا فَاتَكَ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ فَإِنَّهَا تُحْسَبُ بِالْعُمْرِ ‘হে ঐ ব্যক্তি যার জীবন অনর্থক কাজে নষ্ট হয়ে গেছে! লায়লাতুল ক্বদরের ইবাদতের মাধ্যমে যা হারিয়েছ তা পুষিয়ে নেও; কেননা এই একটি রাতের ইবাদত প্রায় পুরো জীবনের (হিসাব) সমান’।[36]
হাযার মাসের নেকী লাভের এই মহাসুযোগ কেবল সুস্থ বা সামর্থ্যবানদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের মাঝে যারা
অসুস্থতা, সফর বা বিশেষ শারীরিক ওযরের কারণে এই রাতের ইবাদত করতে পারছেন না, তাদের জন্য আল্লাহর রহমতের দুয়ার খোলা থাকে। ইমাম দাহহাক (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে- ঋতুবতী নারী, মুসাফির বা ঘুমন্ত (অসুস্থ) ব্যক্তির কি লায়লাতুল ক্বদরে কোন অংশ আছে? তিনি উত্তরে বলেন,نَعَمْ، كُلُّ مَنْ تَقَبَّلَ اللَّهُ عَمَلَهُ سَيُعْطِيهِ نَصِيبَهُ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ لَا يُخَيِّبُهُ أَبَدًا، ‘হ্যঁা, আল্লাহ যার আমল কবুল করবেন, তাকে অবশ্যই লায়লাতুল ক্বদরের অংশ দান করবেন। তিনি কখনোই কাউকেই নিরাশ করেন না’।[37] সুতরাং যাদের ওযর আছে, তারা স্বল্প আমলের মাধ্যমেও লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত লাভ করতে পারেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রামাযানের পবিত্রতা অনুধাবনের তাওফীক্ব দান করুন। রামাযানে শেষ দশকে ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ দান করুন। যাবতীয় নেক আমলের মাধ্যমে ছিয়াম, ক্বিয়াম ও লায়লাতুল ক্বদরের ফযীলত পরিপূর্ণভাবে হাছিল করার তাওফীক্ব দিন- আমীন! ইয়া রাববাল আলামীন!
আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।
[1]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরুল কুরআন (৩০তম পারা) (রাজশাহী: হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, মে ২০২৩ খৃ.), পৃ. ৪২৫।
[2]. ইবনু উছায়মীন, মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল, ২০/৩৪৫।
[3]. ইবনু মাজাহ হা/১৬৪৪; ছহীহুত তারগীব হা/১০০০; মিশকাত হা/১৯৬৪, সনদ হাসান।
[4]. বুখারী হা/১৯০১; মুসলিম হা/৭৬০।
[5]. ইবনু উছায়মীন, মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েল, ২০/৩৪৫।
[6]. ইবনে বায, মাজালিসু রামাযান, পৃ. ৪৩।
[7]. বুখারী হা/২০১৭; মুসলিম হা/১১৬৯; মিশকাত হা/২০৮৩।
[8]. মুসলিম হা/৬৫৬; আবূদাঊদ হা/৫৫৫; তিরমিযী হা/২২১; মিশকাত হা/৬৩০।
[9]. ইবনু উছায়মীন, শারহু রিয়াযিস ছালেহীন, ৫/৮২।
[10]. ইমাম বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ, ৬/৩৯০।
[11]. বুখারী হা/১১৪৭; মুসলিম হা/৭৩৮; তিরমিযী হা/৪৩৯; আবুদাঊদ হা/১৩৪১।
[12]. ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১০৭০, সনদ হাসান ২/১৩৮ পৃ.; মির‘আত ৪/৩২০ পৃ.।
[13]. আবূদাঊদ হা/১৩৭৫; তিরমিযী হা/৮০৬; মিশকাত হা/১২৯৮, সনদ ছহীহ।
[14]. ছহীহাহ হা/৬৪৪; ছহীহুল জামে‘ হ/৬৪৬৮, সনদ ছহীহ্।
[15]. বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/ ২০০২; মুস্তাদরাকে হাকেম হা/১১৬০; ছহীহাহ হা/৬৫৭, সনদ ছহীহ।
[16]. বুখারী হা/৫০০৯; মুসলিম হা/৮০৭।
[17]. ফাৎহুল বারী ৯/৫৬, ১০০৯ নং হাদীছ দ্রষ্টব্য।
[18]. ইমাম সুয়ূতী, আত-তাওশীহ শারহুল জামি‘ইছ ছহীহ ৭/৩১৭৯।
[19]. শরহে নববী ‘আলা মুসলিম ৬/৯১-৯২
[20]. বুখারী হা/৬; মুসলিম হা/২৩০৮।
[21]. তিরমিযী হা/১৯৬৯; নাসাঈ হা/২৫৭৭; ইবনু মাজাহ হা/২১৪০, সনদ ছহীহ।
[22]. তাবারাণী কাবীর হা/৭৮৭৭; ছহীহুত তারগীব হা/১৪৯৬, সনদ ছহীহ।
[23]. বুখারী হা/ ৬৪০৫; মিশকাত হা/২২৯৬
[24]. তিরমিযী হা/৩৫১৩; আহমাদ হা/২৫৪২৩; ইবনু মাজাহ হা/৩৮৫০; মিশকাত হা/২০৯১।
[25]. নাসাঈ হা/১৭৪৭; ইবনু মাজাহ হা/১৩৪৪; ছহীহুল জামে‘ হা/৫৯৪১, সনদ হাসান।
[26]. বুখারী হা/২০৪৪; মিশকাত হা/২০৯৯।
[27]. বুখারী হা/২০২৪; মুসলিম হা/১১৭৪; মিশকাত হা/২০৯০।
[28]. মুসলিম হা/১১৭৫; মিশকাত হা/২০৮৯, রাবী আয়েশা (রাঃ)।
[29]. ইবনে বায, মাজমূউ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাত মুতানাওওয়িআহ, ১৫/৪২৭।
[30]. মুসলিম হা/৭৪৭; আবূদাঊদ হা/১৩১৩; তিরমিযী হা/৫৮১; মিশকাত হা/১২৪৭।
[31]. ইবনু তায়মিয়া, মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২২/২৮৪।
[32]. ইবনু উছাইমীন, শারহু রিয়াযিছ ছালেহীন, ২/২৪৩।
[33]. মুসলিম হা/১৮৯৩; আবূদাঊদ হা/৫১২৯; মিশকাত হা/২০৯।
[34]. বুখারী হা/২০২৩; মিশকাত হা/২০৯৫।
[35]. ইবনে উছাইমীন, লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ, ১৮/২৯।
[36]. ইবনে রজব, লাতায়েফুল মা‘আরেফ, পৃ. ১৯১।
[37]. ইবনে তাইমিয়াহ, শারহু উমদাতিল ফিক্বহ, ৩/৫৭৪।