শিক্ষার্থীর রামাযান

রামাযান হ’ল শিক্ষাজীবনের বসন্ত। বিশেষ করে যারা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে তারা রামাযানে লম্বা একটি ছুটি কাটায়। এমন ছুটিকে কাজে লাগিয়ে অনেক কিছুই করা যায়। তবে অধিকাংশ সময় আমরা পরামর্শের অভাবে পুরো ছুটি নষ্ট করে ফেলি। সময় আমাদের হাত ফসকে চলে যায়। আমাদের কিছুই অর্জন হয় না। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা ছুটিকে কাজে লাগানোর কিছু ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করব। যে ক্ষেত্রগুলোতে সময় দিলে আমাদের সময়গুলো বিফলে যাবে না ইনশাআল্লাহ।

কুরআন তিলাওয়াত : রামাযানে করণীয় হিসাবে প্রথমেই বলব কুরআনের কথা। আমরা অনেকেই আছি যারা কুরআন শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারি না। রামাযানে আমাদেরকে টার্গেট গ্রহণ করতে হবে যে, এই রামাযানে যেভাবেই হোক আমি কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শিখব। আর তালিবুল ইলম হয়ে কুরআন শুদ্ধভাবে পড়তে না পারাও বেশ হতাশাজনক। আবার অনেকেই আছি যারা কুরআন শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে পারি। তবে মুখস্থের পরিধি খুবই কম। যখন ইমামতির জন্য দাঁড়াই তখন ঘুরে ফিরে একই স্থান থেকে তিলাওয়াত করতে হয়। আমরা এই রামাযানে আমাদের কুরআন মুখস্থের পরিধি বাড়াতে পারি। যেসব স্থান থেকে ছালাতে তিলাওয়াত করা যায় সেসব আয়াত ও সূরাগুলো মুখস্থ করতে পারি।

আমাদের মাঝে অনেক হাফেযে কুরআনও রয়েছে। হাফেযদের সারা বছরে বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে খুব বেশী তিলাওয়াত করা হয়ে ওঠে না। নিয়মিত তিলাওয়াত না হওয়ার কারণে আমরা যে ইয়াদ নিয়ে হিফয বিভাগ থেকে বের হয়েছি সেই ইয়াদে ভাটা পড়ে গেছে অনেক আগেই। অনেক পারা ভুলে যেতে বসেছি। তাই হাফেযগণকে রামাযানে অধিক কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে। আমাদের টার্গেট থাকবে প্রতিদিন ১০ পারা তিলাওয়াত করা। একজন হাফেয যদি বছরে ১২ খতম তিলাওয়াত না করে তবে তার ইয়াদ নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের অনেকেরই তো সারা বছরে টেনেটুনে দুই খতম তিলাওয়াত হয় না। তাই রামাযানে হাফেযদের কমপক্ষে ১০ খতম কুরআন তিলাওয়াত করা চাই।

মুতূন মুখস্থ করণ : আমাদের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর মাঝে একটি দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। তা হ’ল, মুতূন মুখস্থে স্বল্পতা। তারা বিভিন্ন নিয়ম বলতে পারে, তবে কিতাবের ইবারত উল্লেখ করে কথাটা শক্ত করতে পারে না। তারা বলতে পারে যে, হাদীছে রাসূল (ছাঃ) এমন এমন বলেছেন। তবে হাদীছের মূল ইবারত বলতে পারে না। এটা এক ধরনের দুর্বলতা। যা নিজেদের থেকে দূর করা প্রয়োজন। এজন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের আমরা পরামর্শ দেব, তারা যেন রামাযানে অধিকহারে মুতূন মুখস্থ করে। এটা তাকে কর্মজীবনে এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছাতে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।

আমার একজন শিক্ষক ছিলেন তার কাছে আমি নাহু পড়েছি। তার নাহবেমীর, হেদায়াতুন্নাহু, শরহু মিআতে আমেলসহ বেশ কিছু নাহুর কিতাবের পূর্ণ ইবারত মুখস্থ ছিল। তিনি ক্লাসে কখনো কিতাব নিয়ে আসতেন না। তার এই বিশেষত্ব তাকে গ্রহণযোগ্যতার এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। সেটা এভাবে যে, আমাদের আরো যে সকল মুহাদ্দিছ, মুফতী শিক্ষক ছিলেন তারাও তো নাহু বুঝতেন। কিন্তু নাহুর কোন বিষয়ে যদি তিনি কোন মন্তব্য করে দিতেন তবে সেটাই চূড়ান্ত হিসাবে ধরে নেয়া হ’ত। তার মন্তব্যের ওপরে আর কেউ কথা বলতেন না।

এখন আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিকতাই হয়ে গেছে, যেটা বুঝতে পারব সেটা মুখস্থ করব না। এটা ঠিক নয়। যদি সময়-সুযোগ থাকে তবে মুখস্থ করব না কেন? অবশ্যই মুখস্থ করব। আরবী গল্প-কবিতা, হাদীছের ইবারত, নাহু-ছরফের মূলনীতিগুলো কিতাবে যেভাবে আছে সেভাবেই মুখস্থ করব। বক্তব্য-আলোচনায়, তাকরার বা দারসে এগুলো উল্লেখ করব। এতে আমাদের বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনার মান বৃদ্ধি পাবে ইনশাআল্লাহ। 

আরবী ব্যাকরণের দুর্বলতা কাটানো : আমাদের ক্লাসে অনেক এমন শিক্ষার্থী দেখা যায়, যারা সব বিষয়ে ভাল হ’লেও আরবী ব্যাকরণে বেশ দুর্বল। ভাষা ভাল বোঝে তবে শাব্দিক তাহক্বীকব করতে পারে না। ইবারত পড়ার সময় ই‘রাব ঠিকই পড়ে তবে বাক্যের তারকীব করতে পারে না। কারণ তারা শুধু ব্যাকরণের জন্য আলাদাভাবে কখনো সময় দেয়নি। আর এসব বিষয়ে দক্ষ হওয়ার জন্য আলাদাভাবে ব্যাকরণে সময় দেয়া যরূরী। আমরা তাদেরকে এই দুর্বলতা নিজের মাঝে পুষে না রাখার পরামর্শ দেব। তাদের জন্য রামাযান হ’তে পারে নাহু-ছরফের দুর্বলতা কাটানোর মোক্ষম সুযোগ। রামাযান কেন্দ্রিক কোন কোর্স বা কোন শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী একমাসে এই দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।

বিষয়ভিত্তিক নোট তৈরি : আমরা রামাযানে বিষয়ভিত্তিক নোট তৈরি করতে পারি। অর্থাৎ ক্লাসে যে বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলোর আলাদা আলাদা নোট খাতা তৈরি করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে পারি। এক্ষেত্রে বইয়ের পড়াগুলা হৃদয়ঙ্গম করে সংক্ষেপে নিজের ভাষায় লিখতে হবে। রামাযান পর্যন্ত যদি খুবই কম পড়া হয়ে থাকে তবে কিতাবগুলো নিজে নিজে বা কারো সাহায্য নিয়ে পড়ে এগিয়ে রাখতে হবে। এগুলোর নোট এবং পড়া পরীক্ষার সময় এবং ভবিষ্যতে বিভিন্ন সময় কাজে দেবে ইনশাআল্লাহ।

বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন : আমাদের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে যারা শুধু কারিকুলামের মাঝেই সীমাবদ্ধ। সিলেবাসের বাইরে তাদের পদচারণা নেই বললেই চলে। তাদের জন্য রামাযান হ’তে পারে দক্ষ হয়ে ওঠার সোপান। রামাযানের ছুটিতে পড়াশোনা করে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলোর ওপরেও দক্ষতা অর্জন করা যায়। যেমন, আরবী ও ইংরেজী বলায় দক্ষ হওয়া, গণিতে দক্ষ হওয়া ইত্যাদি। আবার রামাযানে চাইলে কারিকুলামের বাইরের বিষয়গুলোও চর্চা করা যায়। যেমন, লেখালেখি শেখা, বক্তব্য শেখা, ক্যালিওগ্রাফি শেখা ইত্যাদি। মোটকথা, রামাযানকে যদি আমরা স্কিল বাড়ানোর জন্য কাজে লাগাই তবে প্রতি রামাযানে একটি করে স্কিল বাড়ানো সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ। 

জীবনী পাঠ : আমরা অনেকেই লেখাপড়ায় বেশ ভাল হয়েও আমাদের পূর্বসূরীদের চিনি না। আমি বিশ জন ছাহাবীর নাম বলতে পারি না। আমি দশজন ইমামের নাম বলতে পারি না। সারাদিন খেলাফত নিয়ে কথা বললেও ইসলামের প্রভাবশালী দশজন খলীফার নাম বলতে পারি না। কারণ আমাদের ইতিহাস অধ্যয়ন খুবই কম হয়। আমরা তাদের জীবনীগুলো কখনো পড়ি না। ইতিহাস পড়ার সুফল হ’ল চিন্তাধারা শাণিত হওয়া। ইতিহাসে প্রাজ্ঞ ব্যক্তির চিন্তাধারা খুব মযবূত হয়। বর্তমানে আমাদের চিন্তাধারা কচুপাতার পানির মত হওয়ার অন্যতম কারণ হ’ল আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের চিনি না। তাদের কুরবানীর ইতিহাস জানি না।

আমরা কলেজ ভার্সিটির বেদ্বীনী পরিবেশে অনেক এমন ছাত্র-শিক্ষক দেখতে পাই যারা মাথা থেকে কখনো পাগড়ি খোলে না। যাদের পোষাকের গড়ন দেখলে মনে হয় এরা কোন মাদ্রাসার হুযুর। তাদের জুববার বুক পকেটে সর্বদা মিসওয়াক থাকে। খেঁাজ নিলে দেখা যায় তারা অধিকাংশই তাবলীগ জামা‘আতের সাথে সম্পৃক্ত। আর তারা নিজেদের পথ ও পদ্ধতির ওপরে সর্বদা অটল। এর কারণ হ’ল, তাদের মাঝে তাযকেরাতুল আকাবির (বড়দের আলোচনা) অনেক বেশী। যদি কেউ তিন দিনের একটি জামা‘আতে যায় তবে সে কমপক্ষে ১০ জন আকাবিরের কারগুযারী (ঘটনাবলী) শুনতে পায়। কমপক্ষে তিনজন আকাবিরের কথা তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। এটাই হ’ল তাদের পুঁজী। সুতরাং আমরা যদি জীবনী পাঠের মাধ্যমে আমাদের পূর্বসূরীদের সাথে পরিচিত হই, তাদের পথ-পদ্ধতি ও চিন্তাধারা নিজেদের মাঝে ধারণ করতে পারি তবে সেটা হবে অনেক বড় অর্জন। যা আমরা রামাযানের ছুটিকে কাজে লাগিয়ে করতে পারি।

সামাজিক ও পারিবারিক খেদমত : ইলম অর্জনের জন্য আমরা অনেকেই বাড়ী থেকে দূরে থাকি। সারা বছর বাইরে থাকার কারণে বাবা-মায়ের সেবা আমাদের মাধ্যমে হয়ে ওঠে না। আমাদের গ্রামের মানুষ আমাদের ইলম থেকে উপকৃত হ’তে পারে না। আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আমাদের তেমন একটা যোগাযোগ হয় না। এই ঘাটতিগুলো পূরণের জন্য রামাযান হ’তে পারে আমাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। পূর্ণ এক মাস আমরা বাড়িতে বাবা-মায়ের সেবায় থাকব। সাধ্যমত আত্মীয়দের বাড়ীতে যাব। তাদের খেঁাজ-খবর নিব। এলাকায় দ্বীনী দাওয়াতের কাজ করব। মসজিদে নিয়মিত তা‘লীমী বৈঠকের ব্যবস্থা করব। আমার এই একমাস বাড়িতে অবস্থান করার রেশ যেন পরের রামাযান পর্যন্ত না কাটে। এভাবেও আমরা রামাযানের ছুটিকে কাজে লাগাতে পারি।

রুটিন অনুযায়ী চলতে অভ্যস্ত হওয়া : আদর্শ শিক্ষার্থী রুটিন অনুযায়ী চলতে অভ্যস্ত হয়। তবে শুরুর দিকে এটা বেশ কঠিন। আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আমাদের কাছে পরামর্শ চায় যে, আমরা রুটিন তৈরি করি তবে সে অনুযায়ী চলা সম্ভব হয় না। আমরা বলি, এটা অভ্যাসের বিষয়। এই অভ্যাস নিজের মাঝে নিয়ে আসার জন্য রামাযান হ’তে পারে একটি উত্তম সময়। কারণ রামাযানে খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, ছালাত ইত্যাদি আমলগুলো প্রতিদিন একই সময়ে হয়ে থাকে। এজন্য রামাযানে রুটিন অনুযায়ী চলা বেশ সহজ। রামাযানে আমার একটি রুটিন থাকবে যে অনুযায়ী আমি একমাস চলব। এতে করে আমার রুটিন মাফিক চলার অভ্যাস তৈরি হবে। যা পরবর্তীতে আমাকে নির্দিষ্ট নিয়মে চলতে সাহায্য করবে ইনশাআল্লাহ।

বড় আলেমগণের ছোহবতে সময় কাটানো : ছোহবত বা সান্নিধ্য ইলম, আমল ও চিন্তাধারা গঠনে একটি খুবই ফলপ্রসূ বিষয়। অল্পদিনের ছোহবতে কখনো কখনো এমন কিছু শেখা যায়, যা বছর বছর লেখাপড়ায়ও অর্জন করা যায় না। এজন্য আমরা রামাযানে তাদের ছোহবতে সময় দিতে পারি যারা ইলম, আমল ও চিন্তাধারায় অনুসরণীয়। কিছুদিন সময় নিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠানে গেলাম। খাদেম হয়েই থাকলাম। অবসর সময় তাদের কাছে গিয়ে এমনিতেই বসে থাকলাম। তাদের দৈনন্দিন কাজগুলো দেখলাম। কথা-বার্তাগুলো শুনলাম। এটাও কিন্তু শিক্ষার ফলপ্রসূ পদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন থেকে শুরু করে যুগশ্রেষ্ঠ ইমামগণ।

ছুটি পরামর্শদাতা শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী কাটানো : আমি যদি আদর্শ শিক্ষার্থী হই তবে আমার একজন পরামর্শদাতা অবশ্যই থাকতে হবে। যিনি জীবনের প্রতিটি ধাপে আমাকে পরামর্শ দিবেন। ছুটিও কাটবে সেই পরামর্শদাতার পরামর্শেই। আমার প্রতিটি দিন যেন তার সামনে আয়নার মত ঝকঝকে হয়। আমি কখন কি করি এটা তার নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। এভাবে ছুটি কাটালে আশা করা যায় আমাদের সময়ে বারাকাহ হবে। অল্প সময়ে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারব। সঠিক পথে চলতে পারব ইনশাআল্লাহ।

শেষকথা : আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই তবে দেখব, আমাদের বয়সের অনেকে অনেক কিছু করে ফেলেছে। সফলতার দিকে তারা ছুটছে প্রতিক্ষণে। সেখানে আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমাদের ঝুলিতে কোন সফলতা আসেনি। তারপরও আমরা মোবাইলের স্ক্রিণেই পড়ে আছি। তারপরও আমরা হাসছি, ফুর্তি করছি। কিন্তু আমাদের হৃদয়ে তো ব্যথা অনুভূত হওয়া দরকার। রক্তক্ষরণ হওয়া দরকার। শিক্ষার্থী হিসাবে এই ব্যথা আমাদের অন্তরে থাকতে হবে। এই রামাযান হবে সেই ব্যথা দূরীকরণের সুযোগ। সময়কে কাজে লাগিয়ে আমরা আরো যোগ্য হব। আর কাউকে না পারি, নিজে নিজেকে ছাড়িয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।






বিষয়সমূহ: ছিয়াম-রামাযান
আরও
আরও
.