ইসলামী শরী‘আতের উৎসতাত্ত্বিক (Epistemological) আলোচনায় অতীতকাল থেকেই ‘হাদীছ’ ও ‘সুন্নাহ’ শব্দ দু’টি সমার্থক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিই ইসলামের প্রামাণ্য ভিত্তি, যা বর্ণনার মাধ্যমে আমাদের নিকট সংরক্ষিত। যদিও কতিপয় বিদ্বান তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এই শব্দ দু’টির মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্যের রেখা টানার চেষ্টা করেছেন। তবে মৌলিকভাবে দেখা যায় যে, পারিভাষিক অর্থে এ দু’টি মূলত একই বিষয়বস্ত্তর ভিন্ন দু’টি নাম। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাযহাবপন্থী কতিপয় বিদ্বান হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা মূলত ছহীহ হাদীছের প্রামাণ্যতাকে সংকুচিত করে মাযহাবকে অগ্রাধিকার প্রদানেরই একটি প্রবণতা মাত্র।

মূলত সালাফে ছালেহীন ও মুহাদ্দিছগণের নিকট হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য ছিল না। তাঁদের দৃষ্টিতে প্রতিটি ‘ছহীহ হাদীছ’ই ছিল অনুসরণীয় ‘সুন্নাহ’। সুন্নাহ কোন বিমূর্ত ধারণা নয়, বরং হাদীছের মাধ্যমেই তা মূর্ত ও সংজ্ঞায়িত হয়। সুতরাং হাদীছকে বর্ণনামূলক বিষয় এবং সুন্নাহকে কেবল আমলযোগ্য বিষয় হিসাবে পৃথক করার যে প্রচেষ্টা, তা একটি বিভ্রান্তির দ্বার উন্মোচন করে। বিশেষ করে, যখন কোন স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ হাদীছ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ‘এটি কেবল হাদীছ, সুন্নাহ নয়’-এমন যুক্তিতে তাকে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত রায় বা প্রচলিত কোন ফৎওয়াকে সুন্নাহ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা সরাসরি সুন্নাহর মূল উৎসকেই আঘাত করে।

আলোচ্য প্রবন্ধে হাদীছ ও সুন্নাহর পারিভাষিক অভিন্নতা প্রমাণ করা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, সুন্নাহর অস্তিত্ব হাদীছের ওপরই নির্ভরশীল। হাদীছকে পাশ কাটিয়ে বা গুরুত্বহীন করে যারা নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা কিংবা প্রথাগত মাযহাবী আমলকে ‘সুন্নাহ’ হিসাবে চালিয়ে দিতে চান, তাঁদের দাবীর অসারতা দালীলিক ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, রাসূল (ছাঃ) থেকে প্রমাণিত প্রতিটি বিশুদ্ধ বর্ণনাই দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য সুন্নাহ এবং এর বিপরীতে কোন ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা ফতওয়া অগ্রাধিকার যোগ্য নয়।

মুহাদ্দিছগণের পরিভাষায় হাদীছ ও সুন্নাহর ব্যবহার :

অতীতকাল থেকে মুহাদ্দিছগণের পরিভাষায় হাদীছ ও সুন্নাহ পরস্পর সমার্থক হিসাবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্থাৎ উভয়টি দ্বারাই রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও অনুমোদনকে উদ্দেশ্য করা হয়।[1] এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সুনান তিরমিযী, সুনান আবূ দাঊদ, সুনান নাসাঈ, সুনান ইবনু মাজাহ প্রভৃতি হাদীছ গ্রন্থকে ‘সুনান’ নামকরণ করা হয়েছে, যা সুন্নাহ শব্দের বহুবচন।[2] অনুরূপ আরো কিছু উদাহরণ রয়েছে। যেমন-

(১) ইবনু ওয়াহহাব (১৯৭ হি.) তাঁর চাচা থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি একদা জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক ইমাম মালিক (১৭৯হি.)-কে প্রশ্ন করতে শুনলাম ওযূর সময় পায়ের আঙগুল খিলাল করা সম্পর্কে। তিনি বললেন যে, লোকদের জন্য এর প্রয়োজন নেই। আমি এটা ছেড়ে দিয়েছি যাতে মানুষের উপর সহজ হয়। তখন আমি বললাম, عندنا في ذلك سنة ‘কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের নিকটে তো সুন্নাহ রয়েছে’। তিনি বললেন, সেটি কী? আমি তখন এ সম্পর্কিত হাদীছটি উল্লেখ করলাম।[3] তিনি বললেন,إن هذا الحديث حسن، وما سمعت به قط إلا الساعة ‘নিশ্চয়ই হাদীছটি সুন্দর, আমি ইতিপূর্বে কখনই এটি শুনিনি’। পরবর্তীতে আমি তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হ’তে শুনেছি এবং তিনি আঙগুল খিলালের নির্দেশ দিতেন।[4] এখানে লক্ষ্যণীয় যে, রাবী হাদীছের ক্ষেত্রে ‘সুন্নাহ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং প্রত্যুত্তরে ইমাম মালিক তা ‘হাদীছ’ অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ সুন্নাহ ও হাদীছ তাদের নিকট একই ছিল। এর মধ্যে তারা কোন পার্থক্য করেননি।

(২) ইমাম আবূদাউদ (২৭৫হি.) মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর বিখ্যাত পত্রে লেখেন,فإن ذكر لك عن النبي صلى الله عليه وسلم سنة ليس مما خرجته فاعلم أنه حديث واه، ‘রাসূল (ছাঃ)-এর কোন সুন্নাহ যদি তোমার কাছে উল্লেখ করা হয়, যা এই কিতাবে নেই, তবে জেনে রেখ সেটা ভিত্তিহীন হাদীছ’।[5] এখানে ইমাম আবূদাউদ হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে কোন পার্থক্য করেননি।

(৩) আবূবকর আল-হাযিমী (৫৮৪হি.) তাঁর নাসেখ ও মানসূখ সম্পর্কিত গ্রন্থের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,فهذا الكتاب أذكر فيه ما انتهت إلي معرفته من ناسخ حديث رسول الله صلى الله عليه وسلم ومنسوخه، ‘এই কিতাবে আমি রাসূল (ছাঃ)-এর যে সকল হাদীছের নাসেখ ও মানসূখ হওয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছি তা উল্লেখ করব’।[6] কিছু পরে তিনি বর্ণনা করেন, وإنما أوردنا نبذة منها ليعلم شدة اعتناء الصحابة بمعرفة الناسخ والمنسوخ في كتاب الله تعالى، وسنة نبيه صلى الله عليه وسلم إذ شأنهما واحد ‘আমি (এই কিতাবে) আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহর মধ্যে নাসেখ ও মানসূখের জ্ঞান হাছিলে ছাহাবায়ে কেরামের কঠিন গুরুত্বারোপ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উল্লেখ করেছি, যেহেতু উভয়ের বৈশিষ্ট্যগত অবস্থান (আমল ওয়াজিব হওয়ার দিক থেকে) একই’।[7] এখানে তিনি প্রথম বাক্যে ‘হাদীছের নাসেখ ও মানসূখ’ এবং দ্বিতীয় বাক্যে ‘সুন্নাহর নাসেখ ও মানসূখ’ উল্লেখ করেছেন, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি উভয়টি একই অর্থে ব্যবহার করেছেন।

(৪) ইবনু হাজার আসক্বালানী (৮৫২হি.) হাদীছ ও খবরের মাঝে পার্থক্য করতে গিয়ে বলেন, قيل لمن يشتغل بالتواريخ وما شاكلها: "الإخباري"، ولمن يشتغل بالسنة النبوية: "المحدث" وقيل: بينهما عموم وخصوص مطلق فكل حديث خبر، من غير عكس، ‘বলা হয়, যিনি (রাবীদের) ইতিহাস বা অনুরূপ বিষয় চর্চা করেন তিনি হ’লেন সংবাদদাতা এবং যিনি সুন্নাতে নববী নিয়ে কাজ করেন তিনি ‘মুহাদ্দিছ’। আরও বলা হয়ে থাকে যে, উভয়ের মাঝে উমূম ও খুছূছ মুত্বলাকের সম্পর্ক অর্থাৎ সকল হাদীছই খবর কিন্তু কিন্তু সকল খবর হাদীছ নয়।[8] এখানে তিনি প্রথম স্থানে সুন্নাহ এবং দ্বিতীয় স্থানে হাদীছ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা প্রমাণ করে তিনি উভয়কে সমার্থক মনে করতেন।

সুতরাং প্রথম যুগ থেকে ধারাবাহিকভাবে হাদীছ এবং সুন্নাহ সাধারণত একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদিও কতিপয় মুহাদ্দিছ উভয়ের মাঝে পার্থক্য দেখাতে চেয়েছেন। যেমন আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী (১৯৮হি.) বলেন, ‘সুফিয়ান ছাওরী হাদীছের ইমাম, আওযাঈ সুন্নাহর ইমাম এবং মালিক হাদীছ ও সুন্নাহ উভয়ের ইমাম’।[9] অনুরূপভাবে ইবনু নাদীম তাঁর ‘আল-ফিহরিস্ত’ কিতাবে একটি গ্রন্থের শিরোনাম উল্লেখ করেছেন, كتاب السنن بشواهد الحديث ‘হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত সুন্নাহসমূহের সংকলন[10] তাঁদের এমন মন্তব্যসমূহ হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে ব্যবহারিক (Technical) কিছু পার্থক্য নির্দেশ করে।[11] যেমন -

  1. হাদীছ হ’ল তত্ত্বীয় জ্ঞান (علم نظري) এবং সুন্নাহ হ’ল ব্যবহারিক বিষয় (أمر عملى)।[12] হাদীছ যখন কর্মে রূপান্তরিত হয় তখন তা সুন্নাহ হিসাবে গণ্য হয়।
  2. হাদীছ হ’ল আম এবং সুন্নাহ হ’ল খাছ। হাদীছ রাসূল (ছাঃ)-এর কথা ও কর্ম সবকিছুর সমষ্টি আর সুন্নাহ হ’ল বিশেষত রাসূল (ছাঃ)-এর কর্মের নাম। এই অর্থে হাদীছ হ’ল মতন ও সনদের সমষ্টির নাম এবং সুন্নাহ হ’ল উক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত কোন শারঈ মাসআলার নাম।
  3. কেবল ছহীহ ও হাসান হাদীছ দ্বারাই সুন্নাহ সাব্যস্ত হয়, কোন যঈফ বা জাল হাদীছ দ্বারা নয়। সেই কারণে হাদীছকে যঈফ বা মওযূ বলা গেলেও সুন্নাহকে তা বলা যায় না।
  4. সংখ্যাগত দিক থেকে এই পার্থক্য আরও সুস্পষ্ট হয়। যেমন إنما الأعمال بالنيات হাদীছটি প্রায় ৭০০টি সূত্র থেকে বর্ণিত হয়েছে। অথচ তা থেকে একটি সুন্নাহ সাব্যস্ত হয়। অনুরূপভাবে একই হাদীছ থেকে বহু সংখ্যক সুন্নাহও সাব্যস্ত হয়।[13]

সুতরাং উপরোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে হাদীছ ও সুন্নাহ উভয়ের মাঝে পরিভাষাগত কিছু পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। তবে বিষয়বস্ত্তর দিক থেকে উভয়টি একই। কেননা উভয়টিই রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও অনুমোদনকে নির্দেশ করে।

সমকালীন যুগে হাদীছ ও সুন্নাহর ব্যবহার :

আধুনিক যুগের কতিপয় বিদ্বান হাদীছ ও সুন্নাহকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথক করে দেখিয়েছেন এবং সুন্নাহর নতুন অর্থ উদ্ভাবন করেছেন। এ সকল বিদ্বান মনে করেন যে, ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিকোণ থেকে হাদীছ ও সুন্নাহ এক নয়। তাদের মতে, সকল হাদীছ সুন্নাহ নয়, কিন্তু সকল সুন্নাহ হাদীছ। এর ব্যাখ্যায় তারা বলেন, হাদীছ হ’ল যা রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম, অনুমোদন এবং গুণাবলীর বর্ণনায় এসেছে। আর সুন্নাহ হ’ল যা শারঈ হুকুম আকারে রাসূল (ছাঃ)-এর যুগ থেকে ছাহাবায়ে কেরামের যুগের শেষ পর্যন্ত অব্যাহতভাবে ছিল। যেমন তারা বলে থাকেন যে, হাদীছে অমুক বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে, তবে সুন্নাহ এর বিপরীত কিংবা রাসূল (ছাঃ)-এর যুগ থেকে ছাহাবায়ে কেরামের যুগের শেষভাগ পর্যন্ত অমুক আমলটি চালু ছিল, কিন্তু হাদীছ এর বিপরীত। নিম্নে তাদের মতামত উল্লেখ করা হ’ল।

  • সাইয়িদ সুলায়মান নাদভী (১৮৮৪-১৯৫৩খ্রি.) বলেন, آج کل لوگ عام طور سے حدیث و سنت میں فرق نہیں کرتے اور اس کی وجہ سے بڑا مغالطہ پیش آتا ہے۔ ‘আজকাল লোকেরা সাধারণত হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে কোন পার্থক্য করে না। এই কারণে একটি মস্ত বড় ভুল লক্ষ্য করা যায়’। তিনি বলেন, হাদীছ তো প্রত্যেক ঐ বর্ণনা যা খোদ রাসূল (ছাঃ)-এর থেকে বর্ণিত। হোক সেটি একবারেরই ঘটনা বা একজন ব্যক্তিরই বর্ণনা। কিন্তু সুন্নাহ হ’ল আমল মুতাওয়াতির বা অধিক প্রচলনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আমলের নাম। অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) নিজে তার ওপর আমল করেছিলেন। তাঁর পরে ছাহাবী এবং তাবেঈগণও করেছিলেন। যদিও তা মৌখিক বর্ণনায় বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে, যে জন্য তা মুতাওয়াতির হয়নি। কিন্তু আমলগত অবস্থার প্রেক্ষিতে তা মুতাওয়াতির। আর একেই সুন্নাহ বলা হয়। এটি এমন আমল যা বুখারী অথবা মুসলিম দুনিয়াতে না আসলেও তার ওপর আমল করা সাব্যস্ত হ’ত। যদি দুনিয়াতে হাদীছের একটি পৃষ্ঠাও লিখিত না থাকত তবুও তার ওপর আমল জারী থাকত। হাদীছ সংকলন কেবল সেই আমলকে অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সবশেষে তিনি বলেন, سنت اور حدیث میں عظیم الشان فرق ہے۔ حدیث محض روایت کی حیثیت کا اور سنت اس کے عملی تواتر کا نام ہے ‘সুন্নাহ এবং হাদীছের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। হাদীছ কেবল বর্ণনার নাম এবং সুন্নাহ হ’ল চলমান আমলের নাম’।[14]
  • আবুল ‘আলা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯খ্রি.) সাইয়িদ সুলায়মান নাদভীর মতই ধারণা পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাদীছ হ’ল রাসূল (ছাঃ)-এর কথা ও কর্ম সম্বলিত বর্ণনা, যা সনদসহকারে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। আর সুন্নাহ হ’ল ঐ পথ যা রাসূল (ছাঃ)-এর কথা ও কর্ম নিঃসৃত শিক্ষা হিসাবে মুসলমানদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে চালু হয়েছে, যার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পরবর্তী প্রজন্মসমূহ বিশ্বস্ত বর্ণনাসূত্রের মাধ্যমে পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে সংগ্রহ করেছেন এবং পূর্ববতী প্রজন্মকে তার উপর আমল

করতেও দেখেছেন’।[15]

  • আমীন আহসান ইছলাহী (১৯০৪-১৯৯৭খ্রি.) বলেন, حدیث اور سنّت کو لوگ عام طور پر بالکل ہم معنی سمجھتے ہیں۔ یہ خیال صحیح نہیں ہے۔ حدیث اور سنت میں آسمان و زمین کا فرق ہے اور دین میں دونوں کا مرتبہ و مقام الگ الگ ہے، ‘হাদীছ ও সুন্নাহকে সাধারণভাবে মানুষ একই জিনিস বুঝে থাকে। এটি সঠিক ধারণা নয়। হাদীছ ও সুন্নাহের মাঝে আসমান ও যমীনের পার্থক্য রয়েছে এবং দ্বীনের মধ্যে দু’টির মর্যাদা ও অবস্থান আলাদা আলাদা’। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, দু’টি একই অর্থে গ্রহণের ফলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। হাদীছ বোঝার জন্য উভয়ের মাঝে পার্থক্যটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যরূরী।... হাদীছ রাসূল (ছাঃ)-এর কিছু কথা বা কাজ অথবা তাঁর অনুমোদনের বর্ণনাকে বোঝায়। হাদীছটি ছহীহ সাব্যস্ত হোক বা না হোক।...আর সুন্নাহ হ’ল ঐ পথ, যা রাসূল (ছাঃ) শরী‘আতের জ্ঞান শিক্ষাদানকারী এবং (দ্বীনের) পূর্ণাঙ্গ নমুনা হিসাবে আহকামসমূহ পালন করা এবং জীবনকে আল্লাহর পসন্দনীয় ছাঁচে ঢেলে সাজানোর জন্য কথা এবং কর্মের মাধ্যমে মানুষকে জানিয়েছেন ও শিখিয়েছেন।’[16]
  • দেওবন্দ মাদ্রাসার মুহাদ্দিছ সাঈদ আহমাদ পালানপুরী (জন্ম : ১৯৪২খ্রি.) মনে করেন প্রতিটি সুন্নাহ হাদীছ হ’তে পারে, কিন্তু প্রতিটি হাদীছ সুন্নাহ নয়। তিনি এর ব্যাখ্যায় বলেন, مسائل میں ہر حدیث حجت نہیں،وہی حدیث حجت ہے جو سنت (معمول بہ) ہے ‘মাসায়েলের ক্ষেত্রে প্রতিটি হাদীছ দলীল নয়, বরং ঐ হাদীছই দলীল যা সুন্নাহ (যার ওপর আমল করা হয়)।’[17] তিনি আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, حجت سنت ہے، حدیث حجت نہیں ‘দলীল হ’ল সুন্নাহ, হাদীছ কোন দলীল নয়।’[18] অন্যত্র তিনি বলেন, جو قران کے ساتھ حدیث کو بھی حجت مانتے ہیں، انھوں نے جو فقہ تیار کی ہے وہ بھی برحق نہیں ہے، کیونکہ ان کے اصول صحیح نیہں ‘যারা কুরআনের সাথে হাদীছকেও দলীল মনে করে, তারা যে ফিকবহ তৈরী করেছে, তাও সঠিক নয়। কেননা তাদের উছূল সঠিক নয়’।[19] সুন্নাহর পারিভাষিক অর্থ তাঁর নিকট- الطريقة المسلوكة في الدين। আর এর অর্থ তিনি নিজেই করেছেন, یعنی دینی راہ، وہ راستہ جس پر مسمانوں کو چلنا ہیے ‘দ্বীনের পথ, যার ওপর মুসলমানদের চলতে হয়’।[20]
  • আধুনিক যুগের মুনকিরে হাদীছ তথা হাদীছ অস্বীকারকারী জাভেদ আহমাদ গামেদী (জন্ম : ১৯৫২খ্রি.) সুন্নাহর সম্পূর্ণ ভিন্ন সংজ্ঞা উপস্থাপন করেছেন, যা ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোন বিদ্বানই বলেননি। তিনি বলেন, سنت سے ہماری مراد دین ابراہیمی کی وہ روایت ہے جسے نبی صلی اللہ علیہ وسلم نے اُس کی تجدید واصلاح کے بعد اور اُس میں بعض اضافوں کے ساتھ اپنے ماننے والوں میں دین کی حیثیت سے جاری فرمایا ہے۔ قرآن میں آپ کو ملت ابراہیمی کی اتباع کا حکم دیا گیا ہے۔ یہ روایت بھی اُسی کا حصہ ہے ‘সুন্নাহ থেকে আমাদের উদ্দেশ্য হ’ল ইবরাহীম (আ.) থেকে বর্ণিত সেই সকল বিষয়সমূহ যা রাসূল (ছাঃ) কিছু সংস্কার ও নবায়ন এবং কিছু সংযোজনের পর নিজের অনুসারীদের দ্বীন হিসাবে জারী করেছিলেন। কুরআনে রাসূল (ছাঃ)-কে হুকুম দেয়া হয়েছে ইবরাহীম (আ.)-এর মিল্লাতকে অনুসরণের জন্য। সুতরাং সুন্নাহের বর্ণনাগুলি হ’ল ইবরাহীমী উত্তরাধিকারেরই অংশ’।[21] এতে তিনি মাত্র ২৬টি বিষয়কে সুন্নাহ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন এবং এর মধ্যেই ইসলামী শরী‘আতকে সীমাবদ্ধ দাবী করেছেন। তিনি বলেন, হাদীছ রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও অনুমোদনকে বুঝায়। কিন্তু তা নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান না করায় তার দ্বারা কোন আক্বীদা ও আমল সাব্যস্ত হয় না। রাসূল (ছাঃ) তা সংরক্ষণের জন্য কোন গুরুত্বারোপও করেননি। হাদীছ স্রেফ দ্বীন বোঝার ক্ষেত্রে সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে পারে কিংবা রাসূল (ছাঃ)-এর ‘উসওয়া হাসানা’ বা উত্তম নিদর্শন পেশ করতে পারে। হাদীছের গন্ডি এতটুকুই’।[22]

এছাড়া বাংলাদেশের বিশিষ্ট হানাফী আলেম মাওলানা আব্দুল মালেক (জন্ম : ১৯৬৯ খ্রি.) সহ বেশ কিছু বিদ্বানের মতে সুন্নাহ হ’ল সে সকল আমল যা যুগে যুগে স্থানে স্থানে উলামাদের মধ্যে পালিত হয়ে আসছে। যাকে তারা العمل المتوارث বা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা আমল কিংবা سنت معمول بہ বা এমন সুন্নাহ যার উপর আমল করা হয় প্রভৃতি বলে থাকেন।[23] এমনকি সে আমলটির সপক্ষে যদি কোন ছহীহ হাদীছ নাও থাকে, তবুও তা আমলযোগ্য মনে করেন। তারা মনে করেন যে, সকল হাদীছ সুন্নাহ নয়; বরং সেই হাদীছগুলোই সুন্নাহ বা আমলযোগ্য হিসাবে গৃহীত হবে, যার উপর যুগে যুগে আমল করা হয়েছে। এভাবে তারা হাদীছ ও সুন্নাহকে পরস্পর থেকে পৃথক করেছেন।

পর্যালোচনা :

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলি থেকে বোঝা যায় যে, এসকল বিদ্বান হাদীছকে শারঈ দলীল হিসাবে স্বীকৃত হওয়ার জন্য পরবর্তী যুগের আমলকে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন। আমরা মনে করি, হাদীছ ও সুন্নাহকে পৃথকীকরণের এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। কয়েকটি দিক থেকে আমরা এর জবাব উপস্থাপন করতে পারি।

  • ইসলামী আইন তথা শরী‘আতের উৎস হিসাবে সুন্নাহ ও হাদীছের মধ্যে পার্থক্য করা সালাফে ছালেহীন থেকে প্রমাণিত নয়। পূর্ববর্তী ওলামায়ে কেরামও এমন বক্তব্য প্রদান করেননি। বরং মুহাদ্দিছ, উছূলবিদ এবং সকল মাযহাবের ফক্বীহগণ হাদীছ ও সুন্নাহকে সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করেছেন।[24]

ড. ওমর ফালাতা (জন্ম ১৯৪৫খ্রি.) চমৎকারভাবে বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কিছু বিষয় ছিল যার ওপর ছাহাবীগণ এবং তাঁদের পরবর্তীগণ ঐক্যমত পোষণ করেছিলেন। আর তাদের এই ঐক্যমত বিষয়গুলিকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে উন্নীত করেছে। কিন্তু কিছু বিষয়ে তারা মতভেদও করেছেন। এ সকল মতভেদপূর্ণ বিষয় মুতাওয়াতির হওয়ার সুযোগ নেই। আর এই মতৈক্যপূর্ণ এবং মতভেদপূর্ণ বিষয় সবই হাদীছের গ্রন্থগুলিতে সংকলিত হয়েছে। সুতরাং সুন্নাহ দ্বারা যদি মতভেদপূর্ণ বিষয়গুলো পরিহার করে কেবল মতৈক্যপূর্ণ বিষয়গুলিই উদ্দেশ্য করা হয় তবে এটি একটি নতুন পরিভাষা, যা ইতিপূর্বে ছিল না। বরং ছাহাবীদেরকে দেখা যায় যে,

(ক) কখনও তাঁরা একটি বিষয়ে দু’টি ভিন্ন হুকুমের ক্ষেত্রেও সুন্নাহ শব্দটি ব্যবহার করছেন। যেমন আল-ওয়ালীদ ইবনু উক্ববাকে মদ্যপানের দায়ে ৪০টি দোর্রা মারার পর আলী (রা.) বললেন, থাম, এটিই যথেষ্ট। অতঃপর তিনি বললেন, جلد النبي صلى الله عليه وسلم أربعين، وجلد أبو بكر أربعين، وعمر ثمانين، وكل سنة، وهذا أحب إلي ‘রাসূল (ছাঃ) ৪০টি দোর্রা মেরেছেন, আবূবকরও ৪০টি দোর্রা মেরেছেন এবং ওমর (রা.) ৮০টি দোর্রা মেরেছেন। প্রতিটিই সুন্নাহ। তবে এটি-ই (৪০টি) আমার নিকট অধিক উত্তম’।[25]

(খ) অধিকাংশ সময়ে তাঁরা যে হুকুমটিকে প্রাধান্য দিতেন তার জন্য সুন্নাহ শব্দ ব্যবহার করতেন। যেমন আতা ইবনু রাবাহ হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা জুম‘আর দিন প্রথম প্রহরে আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রা.) আমাদের সাথে ঈদের ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমরা জুম‘আ আদায়ের জন্য বের হ’লাম। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রা.) এলেন না। ফলে আমরা একাকীই ছালাত আদায় করলাম। এসময় আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রা.) তায়েফে ছিলেন। তিনি মদীনায় ফিরলে আমরা তাঁকে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, أصاب السنة ‘তিনি সুন্নাহ মোতাবেক করেছেন।’[26]

(গ) কখনও হাদীছে এমন বিষয়কেও সুন্নাহ বলা হয়েছে যা সাময়িকভাবে ঘটেছে, যার ওপর কোন মুতাওয়াতির বা পরম্পরাভিত্তিক আমল নেই। যেমন আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) হ’তে বর্ণিত, একদা দু’জন ব্যক্তি সফরে ছিলেন। এমতাবস্থায় ছালাতের সময় হ’ল, কিন্তু তাদের সাথে পানি ছিল না। ফলে তারা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করলেন এবং ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর তারা ছালাতের সময়ের মধ্যেই পানি পেয়ে গেলেন। তখন তাদের মধ্যে একজন ওযূ করে পুনরায় ছালাত আদায় করলেন, অপরজন করলেন না। অতঃপর তারা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট পৌঁছে বিষয়টি উল্লেখ করলেন। তখন রাসূল (ছাঃ) যিনি ছালাত পুনরায় পড়েননি তাকে বললেন, أصبت السنة وأجزأتك صلاتك ‘তুমি সুন্নাহ মোতাবেকই আমল করেছ এবং তোমার ছালাত যথেষ্ট হয়ে গেছে’। আর অপরজনকে বললেন,لك الأجر مرتين ‘তোমার জন্য দ্বিগুণ পুরষ্কার’।[27]

এ সকল হাদীছ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সুন্নাহকে ‘তাওয়াতুর’ বা পরম্পরাভিত্তিক আমলের সাথে খাছ করে নেয়া একটি স্বতন্ত্র পরিভাষা, আর পরিভাষায় কোন বিতর্ক নেই। কিন্তু যেটা অর্থ করা হয়েছে যে, এটাই বিদ্বানদের নিকট গৃহীত সুন্নাহর চিরন্তন অর্থ, তা গ্রহণযোগ্য নয়।[28]

  • যে বিষয়টি রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও অনুমোদন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে সেটি সর্বদাই মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘হুজ্জাত’ বা দলীল। সেটির নাম হাদীছ হোক বা সুন্নাহ হোক। কোন ছহীহ হাদীছ দলীল হিসাবে গৃহীত হওয়ার জন্য অন্য কারো আমলের মুখাপেক্ষী নয়। কেননা ইলম ব্যতীত কোন আমল হয় না। হাদীছ হ’ল ইলম এবং তার ভিত্তিতেই আমল প্রযোজ্য। সুতরাং ইলমের চেয়ে আমল কখনও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হ’তে পারে না।
  • হাদীছের উপর আমলকে পরবর্তী প্রজন্মের আমলের সাথে শর্তযুক্ত করার মাধ্যমে হাদীছের ভূমিকাকে সংকীর্ণ করা হয়েছে। কেননা এর মাধ্যমে সুন্নাহের গন্ডি স্বল্প সংখ্যক কিছু আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়, যা রাসূল (ছাঃ) হ’তে মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত। যেমন ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ প্রভৃতি ইবাদত পালনের কিছু নিয়মাবলী ইত্যাদি। অতএব নিঃসন্দেহে সুন্নাহ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ‘তাওয়াতুর আমালী’-এর শর্তটি একদমই নতুন, যা হাদীছের বিশাল ভান্ডারকে অকার্যকর করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। 
  • সুন্নাহকে ‘তাওয়াতুর আমালী’-এর সাথে সংযুক্ত করার এই প্রক্রিয়া বিভ্রান্তিকরও বটে। কেননা প্রথমত ছাহাবীদের যুগেই কূফা কিংবা বছরায় কোন কোন আমল চালু ছিল, যা হাদীছের বিপরীত। আবার মদীনায় এমন আমল চালু ছিল যা কূফা এবং বছরার আমলের বিপরীত। এমতাবস্থায় কোনটিকে প্রকৃত সুন্নাহ হিসাবে গ্রহণ করা হবে? কূফার আমল, না বছরার আমল, না-কি মদীনার আমল? অন্যদিকে আঞ্চলিক রেওয়াজ কিংবা হাদীছ অবগতিতে না থাকার ভিত্তিতে প্রচলিত কোন আমল কিংবা কারও ব্যক্তিগত আমলও কি সুনণাহর মর্যাদা পাবে? আমরা মনে করি এটি নীতিগতভাবে অসিদ্ধ এবং হাদীছের মর্যাদা ও অবস্থান ক্ষুণ্ণকারী। সুতরাং ইসলামী শরী‘আতের উৎস হিসাবে হাদীছই চূড়ান্ত সূত্র। যেখানেই তা পাওয়া যাক না কেন, তা অকপটে গ্রহণ করাই কর্তব্য। হাদীছকে আঞ্চলিক রেওয়াজ বা প্রথা বা কারও ব্যক্তিগত আমল দ্বারা বিচার করা নয়, বরং রেওয়াজ, প্রথা কিংবা ব্যক্তিগত আমলকেই হাদীছের নিক্তিতে বিচার করতে হবে।[29] এটাই সালাফে ছালেহীনের মানহাজ এবং মুজতাহিদ ইমামগণের চিরন্তন নীতি।
  • আমলগত সুন্নাহ কি রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ দ্বারাই প্রমাণিত হয় না? হাদীছ ও সুন্নাহের বিষয়বস্ত্ত কি পরস্পর পৃথক? দু’টি শব্দই কি একক বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত নয়? এর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে শব্দ দু’টির উৎস ও ব্যবহার যা-ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা একক অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করে।[30] রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে সুন্নাহ এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। নতুবা তিনি কেন বললেন, যে تركت فيكم أمرين، لن تضلوا ما تمسكتم بهما: كتاب الله وسنة نبيه، ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টো জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না, যতক্ষণ সে দু’টিকে অাঁকড়ে ধরে থাকবে; আর তা হ’ল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী (ছাঃ)-এর সুন্নাহ?’[31] সুতরাং হাদীছ ও সুন্নাহর মাঝে পার্থক্যের দাবী তোলা অবাস্তব ও বিস্ময়কর।
  • ইসলামের ইতিহাসে এমন কোন অধঃপতন কাল এসেছিল, যখন শরী‘আতে কোন আমল চালু ছিল, অথচ তার সপক্ষে ছহীহ হাদীছ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল? আর ছহীহ হাদীছে যে আমলের অস্তিত্ব নেই তা কি কখনও সুন্নাহ হিসাবে সাব্যস্ত হ’তে পারে?
  • মুজতাহিদ ইমামগণের প্রণীত শারঈ মাসআলা-মাসায়েল অধিকাংশই ছিল খবরে ওয়াহিদ বা স্বল্প সংখ্যক রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীছ ভিত্তিক। ফিকবহের কিতাবসমূহে এর ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। তারা এসব মাসাআলায় ‘তাওয়াতুর আমালী’ বা পরম্পরাভিত্তিক আমল শর্ত করেননি। বরং সরাসরি খবরে ওয়াহিদ হাদীছকেই দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন।
  • যদি হাদীছ ব্যতীত ‘পরম্পরাভিত্তিক আমল’-এর মাধ্যমে সুন্নাহ সাব্যস্ত হয়ে থাকে, তাহ’লে ফিকবহী মাযহাবসমূহের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হ’ল কিভাবে? কেন পরস্পর বিরোধপূর্ণ মাসআলাসমূহে যে কোন একটিকে অগ্রাধিকার প্রদানের চর্চা সৃষ্টি হ’ল? আর মুসলিম সমাজে আমলের ক্ষেত্রে এত বিভক্তিই বা কেন? সমাজে পূর্ব থেকে যে আমল ও রেওয়াজ চালু রয়েছে, সেটিই যদি মানদন্ড হ’ত, তাহ’লে কোন মতবিরোধ থাকার কথা ছিল না। অন্ততঃপক্ষে একই মাযহাবভুক্ত ফকবীহগণের মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ হ’ত না। তবুও কেন ইমাম আবূ হানীফার এক বা দুই-তৃতীয়াংশ ফৎওয়ার বিরোধিতা করেছেন তাঁর দুই একান্ত শিষ্য ইমাম মুহাম্মাদ ও আবূ ইউসূফ?[32] আর যদি সুন্নাহের ভিত্তি হাদীছ না হয়ে ‘পরম্পরাভিত্তিক আমল’ই হ’ত, তবে এত বিস্তৃত আকারে হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলনের যৌক্তিকতা কি ছিল? মুহাদ্দিছগণের শত শত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের কী অর্থ ছিল? সর্বোপরি পূর্ববর্তী কোন মুজতাহিদ ইমাম কি সুন্নাহর ভিত্তি বোঝাতে العمل المتوارث বা ‘পরম্পরাভিত্তিক আমল’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন? আর যদি করে থাকেন তবে এর স্বরূপ ও বাস্তবতা কী? এ সকল প্রশ্ন থেকে একটি উত্তরই বের হয়ে আসে। আর তা হ’ল, সুন্নাহ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য ‘পরম্পরাভিত্তিক আমল’ মানদন্ড নয়; বরং রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছই হ’ল মানদন্ড।
  • হাদীছ ও সুন্নাহকে পৃথকীকরণের এই দৃষ্টিভঙ্গি যেমন প্রাচ্যবিদদের ধারণার সাথে মিলে যায়, তেমনি একশ্রেণীর আধুনিকতাবাদী মুসলমানের চিন্তাধারার সাথে একবিন্দুতে মিলিত হয়, যারা সুন্নাহকে ইসলামী শরী‘আতের দলীল হিসাবে অস্বীকার করেন না বটে; কিন্তু তার অবস্থানকে যতদূর সম্ভব সংকীর্ণ করতে চান এবং যুগের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ব্যাখ্যার দাবী রাখে মনে করেন। এ লক্ষ্যেই তারা হাদীছের ভূমিকাকে ছোট করে দেখেন এবং হাদীছ ও সুন্নাহর মাঝে পার্থক্য করেন।
  • সাঈদ আহমাদ পালানপুরী-এর মন্তব্যের জবাবে বলা যায় যে,

১. সুন্নাহর যে সংজ্ঞা তিনি দিয়েছেন, তা না কোন উছূলবিদ বর্ণনা করেছেন, আর না কোন মুহাদ্দিছ বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া এই সংজ্ঞা অস্পষ্ট। কেননা ‘দ্বীনের মধ্যে চলার পথ’ স্বয়ং কি রাসূল (ছাঃ)-এর কথা, কর্ম ও অনুমোদনের মুখাপেক্ষী নয়? যদি মুখাপেক্ষী হয়, তবে এই নতুন সংজ্ঞার অর্থ কি? দ্বিতীয়ত, তিনি যদি বুঝিয়ে থাকেন যে সুন্নাহ কেবল রাসূল (ছাঃ)-এর আমলের নাম যা ‘তাওয়াতুর আমালী’ বা মুসলিম পরম্পরাভিত্তিক আমলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত, তবে তাঁর বক্তব্য এবং হাদীছ অস্বীকারকারী ও প্রাচ্যবিদদের বক্তব্যের মাঝে কোন তফাৎ থাকে না। কেননা তারাও রাসূল (ছাঃ)-এর কোন কওলী বা কথ্য হাদীছের সত্যতা স্বীকার করে না।

২. তিনি বলেছেন যে, সকল হাদীছ শরী‘আতের দলীল নয়, কেবল সেসকল হাদীছই দলীল যা সুন্নাহ হিসাবে স্বীকৃত। অর্থাৎ তাঁর সংজ্ঞা অনুযায়ী কোন হাদীছ দলীল হওয়ার জন্য এটা আবশ্যক যে, রাসূল (ছাঃ) তাঁর ওপর নিয়মিত আমল করেছেন এবং খুব কমই তা পরিত্যাগ করেছেন! অথচ আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নিকট কোন হাদীছ দলীল বা আমলযোগ্য হওয়ার জন্য নিয়মিত আমলের কোন শর্ত নেই। কেননা অনেক আমল তিনি করেছেন জীবনে একবারই, অথচ তা সুন্নাহ। সুতরাং তাঁর এই মন্তব্য সম্পূর্ণ নতুন, যার কোন ভিত্তি নেই।

৩. তিনি তাঁর বক্তব্যের সপক্ষে কিছু উদাহরণ নিয়ে এসেছেন যেমন :

(ক) যে সকল হাদীছ মানসূখ হয়েছে সেগুলি সুন্নাহ নয়।[33] এটি সঠিক উদাহরণ নয়। কেননা নসখ তো কোন হুকুমের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। আর যদি তাঁর কথামতে হাদীছ দ্বারা হুকুম সাব্যস্তই না হয়, তবে তা মানসূখ হবে কীভাবে?

(খ) যে সকল হাদীছ রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য খাছ সেগুলি সুন্নাহ নয়।[34] এটি সত্য যে, অনেক হাদীছ রয়েছে যা রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য খাছ। কিন্তু তা যে রাসূল (ছাঃ)-এর জন্যই খাছ, সেটি মানুষ অবগত হবে কিভাবে? এর মাধ্যমও তো হ’ল এই হাদীছগুলিই। কেননা হাদীছের মাধ্যমেই আমরা জেনেছি যে, বিষয়গুলি রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য খাছ, অন্যদের জন্য নয়। যদি এই হাদীছগুলি না থাকত তবে সুন্নাহ অনুসরণের দাবী মোতাবেক রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য খাছ বিষয়গুলিও মানুষের জন্য পালন করা সুন্নাহ হয়ে যেত। সুতরাং এই হাদীছগুলি অকার্যকর তো নয়ই; বরং শরী‘আতের মৌলিক দলীল।

(গ) রাসূল (ছাঃ) কোন বিশেষ কল্যাণের উদ্দেশ্যে যদি কোন আমল করেন, তা হাদীছ কিন্তু সুন্নাহ নয়।[35] এর পাঁচটি উদাহরণ তিনি দিয়েছেন, যেগুলি সবই অযৌক্তিক। যেমন : রাসূল (ছাঃ) জীবনে একবার কোন এক গোত্রের আবর্জনাস্থলে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেছিলেন। এটি তাঁর মতে হাদীছ, কিন্তু সুন্নাহ নয়। কেননা রাসূল (ছাঃ) সর্বদা বসেই প্রস্রাব করতেন।[36] এই হাদীছ সম্পর্কে হানাফী বিদ্বান বদরুদ্দীন আল-আইনী বর্ণনা করেন যে, ছাহাবী ও তাবেঈদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ ছিল। কেউ এর অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশই প্রয়োজন ছাড়া এই কর্মকে অপসন্দ করেছেন।[37] আবার হাম্বলী মাযহাবে এটি জায়েয যদি শরীরে প্রস্রাবের ছিটা না লাগে এবং মানুষের সামনে লজ্জাস্থান প্রকাশ না পায়।[38] সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, ছাহাবী ও তাবেঈদের অনেকেই উপরোক্ত হাদীছকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে এই কর্মকে জায়েয মনে করতেন। অর্থাৎ এই হাদীছটি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা জায়েয প্রমাণ করে। অর্থাৎ এটি প্রয়োজনীয় সময়ে পালনযোগ্য একটি সুন্নাহ। অতএব এই হাদীছ সুন্নাহ নয় বা আমলযোগ্য নয় ধারণা করা অগ্রহণযোগ্য।[39]

সর্বোপরি প্রমাণিত হ’ল যে, লেখকের প্রদত্ত সুন্নাহর সংজ্ঞা দলীলভিত্তিক নয় এবং বিগত সমস্ত বিদ্বানদের নীতিবিরোধী। হাদীছ ও সুন্নাহর পার্থক্য প্রমাণে তাঁর প্রদত্ত উদাহরণগুলি সবই অতিশয় দুর্বল ও স্ববিরোধী।

সারকথা :

সাইয়িদ সুলায়মান নাদভী, আবুল ‘আলা আল-মাওদূদী এবং আমীন আহসান ইসলাহী সুন্নাহ সম্পর্কে মোটামুটি একই ধারণা উদ্ভাবন করেছেন যে, তা রাসূল (ছাঃ) থেকে নিয়মিত প্রচলিত আমল দ্বারা মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত হ’তে হবে এবং এই তত্ত্বের ভিত্তিতে তারা হাদীছ ও সুন্নাহকে পৃথক করেছেন। পরবর্তীতে সাঈদ আহমাদ পালানপুরী প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র মুহাদ্দিছ যিনি এই ধারণাকে অকপটে সমর্থন করেছেন। এমনকি এ দাবী পর্যন্ত করেছেন যে, ‘হাদীছ শরী‘আতের কোন দলীল নয়, বরং সুন্নাহ দলীল এবং হাদীছ সুন্নাহর ভিত্তি নয়!’ আর জাভেদ আহমাদ গামেদীর এই নতুন সুন্নাহ তত্ত্ব এতটাই নতুন যে, তাকে সরাসরি হাদীছ অস্বীকাকারীই বলা হয়।

মূলতঃ আমরা মনে করি যে, হাদীছ ও সুন্নাহ পৃথকীকরণের পিছনে এ সকল বিদ্বানের চিন্তাধারা প্রাচ্যবিদদের হাদীছবিরোধী সন্দেহবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। কেননা তাদের এই মতবাদ জ্ঞানগত এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ নতুন, যা কোন পূর্ববর্তী বিদ্বান উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায় না। বরং এটা স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রমাণিত যে, শারঈ আহকাম সাব্যস্ত করার জন্য সুনণাহ ও হাদীছ সমার্থবোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দলীল হিসাবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য তা কারও আমলের মুখাপেক্ষী নয়। কেননা দু’টি একই সত্তা তথা রাসূল (ছাঃ) হ’তে প্রকাশিত। আর কোন অঞ্চলের জনগোষ্ঠী বা কোন একটি মাযহাবের গৃহীত العمل المتوارث ‘পরম্পরাভিত্তিক আমল’ শরী‘আতের কোন দলীল নয়। কেননা হাদীছের বিপরীতে কোন ইজমা‘, ক্বিয়াস বা কারও ব্যক্তিগত মন্তব্য স্থানই পেতে পারে না। সেটা কোন অঞ্চলের ‘পরম্পরা ভিত্তিক আমল’ বা সামাজিক প্রচলন হোক, কিংবা মদীনাবাসীর আমল হোক অথবা কোন ইমামের ব্যক্তিগত রায়।

ইবনু ক্ববাইয়িম (৭২৮হি.) ‘মদীনাবাসীদের আমল’ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, ‘মদীনাবাসীদের আমল অন্যান্য শহরবাসীদের আমলের মতই। ইরাক, শাম ও হেজাযের আমলের সাথে তাদের আমলের মর্যাদাগত কোন পার্থক্য নেই। বরং যাদের আমলই সুন্নাহ বা হাদীছসম্মত হবে, তাদের আমলই অনুসরণযোগ্য। যদি মুসলিম বিদ্বানদের মধ্যে কোন বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তবে এক স্থানের আমল অপর স্থানের আমলের উপর দলীলযোগ্য হবে না। কেননা দলীল হ’ল একমাত্র রাসূল (ছাঃ)-এর সুন্নাহের অনুসরণ করা। কোন সুন্নাহকে ত্যাগ করার সুযোগ নেই এজন্য যে, কিছু মুসলমানের আমল তার বিপরীত অথবা তারা ছাড়া অন্যরা সে আমলটি করেন। যদি উম্মতের কিছু লোকের বিপরীত আমলের কারণে কোন সুন্নাহ পরিত্যাগ করার সুযোগ থাকত, তাহ’লে অনেক সুন্নাহই পরিত্যক্ত হয়ে যেত এবং সুন্নাহ পরনির্ভর হয়ে পড়ত। অর্থাৎ যদি কেউ তার উপর আমল করত, তবে তা সুন্নাহ সাব্যস্ত হ’ত; আর না করলে পরিত্যক্ত হ’ত। অথচ সুন্নাহই হ’ল আমলের উপর (শুদ্ধতা নির্ণয়ের) মানদন্ড, আমল সুন্নাহের উপর (বিশুদ্ধতা নিরূপণের) মানদন্ড নয় (والسنة هي العيار على العمل، وليس العمل عيارا على السنة)।[40] তিনি আরও মন্তব্য করেন,أن العمل لا يقابل النص، بل يقابل العمل بالعمل، ويسلم النص عن المعارض، ‘আমল কখনও নছ (কুরআন ও সুন্নাহ)-এর মোকাবিলায় আসতে পারে না, বরং আমল কেবল অন্য একটি আমলের মোকাবিলায় আসতে পারে। নছ হ’ল প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে মুক্ত।’[41]

ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (১০১হি.) বলেন, لا عذر لأحد بعد السنة في ضلالة ركبها يحسب أنها هدى، ‘সুন্নাহ প্রমাণিত হওয়ার পর কারও জন্য আর কোন ওযর থাকে না। যদি কেউ ওযর পেশ করে তবে সে ভ্রষ্ট পথে রয়েছে, যদিও সে ধারণা করে যে, সেটা সত্য পথ’।[42]

অনুরূপভাবে ইমাম শাফেঈ (২০৪হি.) বলেন,أن حديث رسول الله يثبت بنفسه لا بعمل غيره بعده، ولم يقل المسلمون قد عمل فينا عمر بخلاف هذا بين المهاجرين والأنصار، ولم تذكروا أنتم أن عندكم خلافه ولا غيركم، بل صاروا إلى ما وجب عليهم، من قبول الخبر عن رسول الله، وترك كل عمل خالفه،. ‘রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ নিজেই সাব্যস্ত হয়, পরবর্তী কারও আমল দ্বারা নয়। মুসলমানদের মধ্যে কেউ এমন কথা বলেনি যে, ওমর (রা.) আমাদের মধ্যে মুহাজির ও আনছারদের বিপরীতে এভাবে আমল করে গেছেন। তোমরা বা অন্য কেউও কখনও এমনটি বলনি যে, তোমাদের মধ্যে এমন কোন আমল চালু রয়েছে যা হাদীছের বিপরীত। বরং তারা প্রত্যেকেই তাদের উপর যা আবশ্যকীয় ছিল অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছকে অকপটে গ্রহণ করেছেন এবং তার বিপরীত সকল আমলকে ত্যাগ করেছেন’।[43]

সুতরাং সুন্নাহ হ’ল তা-ই যা ছহীহ হাদীছ দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে; তার উপর কেউ আমল করুক বা না করুক, তা ‘তাওয়াতুর আমলী’ বা পরম্পরাভিত্তিক আমল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হোক বা না হোক।[44] কোন আমল যদি ছহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উম্মাহর মধ্যে প্রচলিত থাকে, তবে তা শক্তিশালী। কিন্তু সুন্নাহর বিপরীতে যদি কোন আমল প্রচলিত থাকে, তবে শুধু প্রচলিত হওয়ার কারণে তা শরী‘আতের দলীল হ’তে পারে না। অতএব হাদীছ ও সুন্নাহর মধ্যে নীতিগতভাবে পার্থক্য করার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই।


[1]. ইবনু মানযূর (৭১১হি.) বলেন, يقال في أدلة الشرع: الكتاب والسنة أي القرآن والحديث‘শরী‘আতের দলীলের ক্ষেত্রে বলা হয় : কিতাব ও সুন্নাহ অর্থাৎ কুরআন ও হাদীছ’ (ইবনু মানযূর, লিসানুল আরাব, পৃ. ১৩/২২৫)।

[2]. মুহাম্মাদ ইবনু জা‘ফর আল-কাত্তানী ‘সুনান’ গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, ‘হাদীছের গ্রন্থসমূহের মধ্যে কিছু গ্রন্থ রয়েছে যা ‘সুনান’ হিসাবে পরিচিত, যেগুলো তাদের পরিভাষায় ফিক্বহী বাবসমূহ তথা ঈমান, পবিত্রতা, যাকাত এই ধারাবাহিকতায় সজ্জিত। তাতে কোন ‘মাওকূফ হাদীছ থাকে না, কেননা ‘মওকূফ’ তাদের পরিভাষায় সুন্নাহ নয়, বরং হাদীছ’ (আর-রিসালাহ আল-মুসতাতরিফাহ (বৈরূত : দারুল বাশায়ের আল ইসলামিয়াহ), পৃ. ৩২)।

[3]. আবূদাঊদ, হা/১৪৮; তিরমিযী, হা/৪০; ইবনু মাজাহ, হা/৪৪৬)।

[4]. ইবনু আবী হাতেম আর-রাযী, আল-জারহু ওয়াত তা‘দী (বৈরূত : দারু ইহয়াইত তুরাছ আল-আরাবী), পৃ. ১/৩২।

[5]. ইমাম আবূদাঊদ, রিসালাতু আবী দাঊদ ইলা আহলে মাক্কাহ (বৈরূত : দারুল আরাবিয়া), পৃ. ২৭।

[6]. আবূবকর আল-হাযিমী, আল-ই‘তিবার ফিন নাসিখ ওয়াল মানসূখ মিনাল আছার (হায়দারাবাদ দেক্কান : দায়েরাতুল মা‘আরিফ আল-উছমানিয়া), পৃ. ২।

[7]. তদেব, পৃ. ৫।

[8]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, নুযহাতুন নাযার ফী তাওযীহে নুখবাতিল ফিকার (রিয়াদ : মাতবা‘আতু ছাফীর), পৃ. ৩৫-৩৬।

[9]. ইবনু আবী হাতেম আর-রাযী, আল জারহু ওয়াত তা‘দীল, ১/১১৮; মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল বাকী আয-যুরক্বানী, শারহুয যুরকানী আলাল মুওয়াত্ত্বা (কায়রো : মাকতাবাতুছ ছাকাফাহ আদ দ্বীনিয়াহ), ১/৫৪। ড. রিফ‘আত ফাওযী বলেন, সম্ভবত তাদের এরূপ পার্থক্য করার কারণ ছিল এই যে, তাদের কেউ কেউ সুন্নাহকে কেবল রাসূল (ছা.)-এর কথা, কর্ম ও স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি, বরং ছাহাবী এবং তাবিঈদের কথা ও কর্মও এর মধ্যে শামিল করতেন (রিফ‘আত ফাওযী, তাওছীকুস সুন্নাহ ফিল কারনিছ ছানী আল-হিজরী : উসুসুহু ওয়া ইত্তিজাহাতুহু (কায়রো : মাকতাবাতুল খানজী), পৃ. ২০)।

[10]. ইবনু নাদীম, আল-ফিহরিস্ত (বৈরূত : দারুল মা‘রিফাহ), পৃ. ২৮১।

[11]. কতিপয় উছূলবিদ বলেন, সুন্নাহ হ’ল রাসূল (ছা.)-এর কথা ও কর্ম; আর হাদীছ হ’ল রাসূল (ছা.)-এর কথা (আব্দুল হাই লাক্ষেণŠভী, যাফরুল আমানী (বৈরূত : মাকতাবুল মাতবুআত আল-ইসলামিয়াহ), পৃ. ২৪-২৫); আলাউদ্দীন আল-বুখারী (৭৩০হি.) প্রখ্যাত হানাফী ফক্বীহ ইমাম বাযদূভী (৪৯৩হি.) রচিত كنز الوصول -এর একটি বাক্য تمسکاً بالسنة والحدیث-এর ব্যাখ্যায় লিখেছেন সুন্নাহ আমভাবে রাসূল (ছা.)-এর বক্তব্য ও কর্ম উভয়কে শামিল করে, আর হাদীছ দ্বারা কেবল তাঁর বক্তব্যকে বুঝানো হয় (আলাউদ্দীন আল-বুখারী, কাশফুল আসরার শারহু উছূলিল বাযদূভী (কায়রো : দারুল কিতাব আল-ইসলামী), ১/১৭)।

[12]. ড. আব্দুল মাজীদ মাহমূদ আব্দুল মাজীদ, আল-ইত্তিজাহাতুল ফিক্বহিইয়াহ (কায়রো : দারুল উলূম), পৃ. ১৫।

[13]. আব্দুর রহমান কীলানী, আয়েনায়ে পারভিজিয়াত (লাহোর : মাকতাবাতুস সালাম), পৃ. ৫৫৪-৫৫৫।

[14]. সাইয়িদ মানযূরুল হাসান, ‘হাদীছ ওয়া সুন্নাহ কী ইছত্বিলাহাত’ (লাহোর : মাসিক ইশরাক্ব, ৩০/১ সংখ্যা : জানুয়ারী ২০১৮খ্রি.), পৃ. ৭।

[15]. আবুল আলা মওদূদী, তাফহীমুল কুরআন (লাহোর : ইদারা তারজুমানুল কুরআন, তাবি), পৃ. ৬/১৭০-১৭১।

[16]. আমীন আহসান ইছলাহী, মাবাদী তাদাববুরে হাদীছ (লাহোর : ফারান ফাউন্ডেশন), পৃ. ১৯, ২৪।

[17]. সাঈদ আহমাদ পালানপুরী, ইলমী খুত্ববাত (দেওবন্দ : মাকতাবাতু হিজায), পৃ. ৬২।

[18]. তদেব, পৃ. ৯৫।

[19]. তদেব, পৃ. ১২৬।

[20]. তদেব, পৃ. ৬৮।

[21]. জাভেদ আহমাদ গামেদী, মীযান (লাহোর : আল-মাওরিদ, ৫ম প্রকাশ : ২০০৯খ্রি.), পৃ. ১৪।

[22]. তদেব, পৃ. ১৫।

[23]. দ্র. মুহাম্মাদ ইদরীস যুবায়ের, হাদীছে রাসূল (ছা.) : হাকীকাত, ই‘তিরাযাত আওর তাজযিয়াহ (ইসলামাবাদ : আল-হূদা পাবলিকেশন্স), পৃ. ৮৫।

[24]. দ্র. ড. ওমর ফালাতাহ, আল-ওয়াযঊ ফীল হাদীছ (বৈরূত : মাকতাবাতুল গায্যালী, ১৯৮১খ্রি.), পৃ. ১/৫০-৫১; গাযী উযাইর, ইনকারে হাদীছ কা নায়া রূপ (লাহোর : মাকতাবা কুদ্দুসিয়াহ, ২০০৯খ্রি.), পৃ. ১/১৪৮-১৪৯; ড. আব্দুর রঊফ যাফর, উলূমুল হাদীছ, ফান্নী, ফিকরী আওর তারিখী মুত্বালাআ‘হ (লাহোর : নাশরিয়াত, ২০১২খ্রি.), পৃ. ৭৮৪-৭৮৫।

[25]. মুসলিম, হা/১৭০৭।

[26]. আবী দাঊদ, হা/১০৭১, সনদ ছহীহ।

[27]. আবী দাঊদ, হা/৩৩৮; নাসাঈ, হা/৪৩৩, সনদ ছহীহ।

[28]. ড. উমার ফালাতাহ, আল-ওয়াযঊ ফীল হাদীছ, ১/৫০-৫২।

[29]. মুহাম্মাদ ইদরীস যুবায়ের, হাদীছে রাসূল (ছা.) : হাকীকাত, ই‘তিরাযাত আওর তাজযিয়াহ, পৃ. ৭৪।

[30]. ছুবহী ছালিহ, উলূমুল হাদীছ ওয়া মুসতালাহুহু, পৃ. ১০।

[31]. মালিক ইবনু আনাস, মুওয়াত্ত্বা মালিক (আবুধাবী, মু‘আস্সাসাতু যায়েদ আলে নাহিয়ান, ২০০৪খ্রি.), হা/৬৭৮।

[32].(فحصل المخالفة من الصاحبين في نحو ثلث المذهب) ইবনু আবেদীন, আর-রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুর্রিল মুখতার, ১/৬৭।

[33]. সাঈদ আহমাদ পালানপুরী, ইলমী খুত্ববাত, পৃ. ৭৩।

[34]. তদেব, পৃ. ৭৫।

[35]. তদেব, পৃ. ৮১।

[36]. তদেব, পৃ. ৮১-৮২।

[37]. বদরুদ্দীন আল-আইনী, উমদাতুল ক্বারী (বৈরূত : দারু ইহয়াইত তুরাছ আল-আরাবী), পৃ. ৩/১৩৫।

[38]. আব্দুল কাদির আশ-শায়বানী, নায়লুল মাআ’রিব (কুয়েত : মাকতাবাতুল ফালাহ, ১৯৮৩খ্রি.), পৃ. ১/৫৩।

[39]. দেওবন্দ মাদরাসার অপর মুহাদ্দিছ হানাফী বিদ্বান হাবীবুর রহমান আ‘যামী তাঁর সহকর্মী সাঈদ আহমান পালানপুরীর এই মতবাদের প্রতিবাদে ৮৬ পৃষ্ঠার একটি সুখপাঠ্য পুস্তিকা রচনা করেছেন, যেখানে তিনি পালানপুরী ছাহেবের সকল দলীল অত্যন্ত কার্যকরভাবে খন্ডন করেছেন (হাবীবুর রহমান আ‘যামী, হুজ্জিয়াতে হাদীছ আওর হাদীছ পর আমাল কী ছূরাতেঁ (দেওবন্দ : মারকায দাওয়াহ ওয়া তাহক্বীক), পৃ. ৫৪-৮৬।

[40].ইবনুল কাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন, ২/২৭৪।

[41].তদেব, পৃ. ২/২৭৫; তাকীউদ্দীন আস-সুবকী (৭৫৬হি.) মা‘না কওলিল ইমাম আল-মুত্তালিবী ইযা ছাহহাল হাদীছু ফা হুয়া মাযহাবী (কায়রো : মুআস্সাসাতুল কুরতুবা) পৃ. ৬৭)।

[42].মুহাম্মাদ ইবনু নাছর আল-মারওয়াযী, আস-সুন্নাহ (বৈরূত : মুআস্সাসাতুল কুতুব আছ-ছাকাফিয়াহ), পৃ. ৩১, হা/৯৫)।

[43].শাফেঈ, আর-রিসালাহ, পৃ. ৪২০।

[44].জামালুদ্দীন কাসিমী, কাওয়াঈদুত তাহদীছ, পৃ. ২৭৩-২৮০, ৩০২-৩০৩।






বিষয়সমূহ: বিধি-বিধান
পিতা-মাতার সাথে আদব সমূহ - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
১৬ মাসের মর্মান্তিক কারা স্মৃতি (৬ষ্ঠ কিস্তি) - মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
ইবাদতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা (৪র্থ কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
আত-তাহরীকের সাহিত্যিক মান - প্রফেসর মুহাম্মাদ নযরুল ইসলাম
তাহরীকে জিহাদ : আহলেহাদীছ ও আহনাফ (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আল-কুরআনে আক্বীদার পাঠ - ড. আব্দুল্লাহিল কাফী মাদানী
কিভাবে নিজেকে আলোকিত করবেন? - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
বিবাহ সম্পর্কিত কতিপয় রীতি-নীতি (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে ভালবাসা - ইহসান ইলাহী যহীর
জান্নাত লাভের কতিপয় উপায় (প্রথম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
তাহাজ্জুদের ন্যায় ফযীলতপূর্ণ কতিপয় আমল - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
১৬ মাসের মর্মান্তিক কারা স্মৃতি (৫ম কিস্তি) - মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
আরও
আরও
.