এডুকেশন বিজনেসের প্রচলিত ধারা : একবার এক কাছের লোক বললেন, এই যে বিভিন্ন অনলাইন কোচিং সেন্টার, এদের ইনকাম সম্পর্কে কোন ধারণা আছে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, এদের সারা বছর সর্বনিম্ন এতটি ব্যাচ চালু থাকে। প্রতিটি ব্যাচে এতজন শিক্ষার্থী থাকে। প্রতিজন শিক্ষার্থীদের কাছে এরা এতটাকা করে নেয়। এবার হিসাব কর। ক্যালকুলেটর ভেঙ্গে যাবে। শিক্ষক থাকে সর্বোচ্চ দশজন। স্টাফদের খরচাপাতি দিয়েও কত টাকা থাকে, হিসাব করতে পার? মাথায় ধরবে না যে, একটা কোচিং সেন্টার থেকে এতটাকা ইনকাম হ’তে পারে।
তার এই কথার সাথে আমিও পূর্ণ একমত। এডুকেশন বিজনেসের চেয়ে বড় বিজনেস হ’তে পারে না। কারণ এখানে এমন পণ্যের বিনিময়ে টাকা আসে, যা কখনো ফুরাবে না। এজন্যই এই ব্যবসা দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। কোনরকমে সিজন পার করলেই টাকা। এজন্য অনেকেই অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার প্রতি খুব আগ্রহী। আপনারাও হয়ত খেয়াল করেছেন, বড় বড় কোম্পানীগুলো তাদের মোটা বিনিয়োগ দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলছে। সর্বাধিক উন্নত করার চেষ্টা করছে। কারণ প্রতিষ্ঠান যত উন্নত, শিক্ষার মান যত ভাল, ইনকাম তত বেশী।
দুনিয়ার বুকে একাডেমিক শিক্ষার শুরু ব্যবসার উদ্দেশ্যে হয়নি। কিন্তু মানুষ যখন দেখল, এটাও একটা সুন্দর ব্যবসাক্ষেত্র হ’তে পারে, তখন তারা সেই সুযোগকে কাজে লাগানো শুরু করল। সেখান থেকেই শিক্ষা-সেবা; শিক্ষা-বাণিজ্যতে বদলে গেল। সেই ধারাতে আজ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সবাই চাচ্ছে, বছর শেষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আমাদের বড় একটা আর্থিক লাভ থাকুক। এই আর্থিক লাভ-লোকসানের যাঁতাকলে প্রতিনিয়তই পিষ্ট হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। যার প্রামাণ্যচিত্র আমাদের চোখের সামনে।
এই সিস্টেমে অভিভাবকগণ এসে শিক্ষকদের বলতে পারেন, এই সময় ক্লাস নিলেন কেন? এটা এভাবে পড়ালেন কেন? এত বেশী পড়া দেন কেন? প্রতিদিন লিখতে দেন কেন? দেরী করলে শাসন করেন কেন? ক্লাসে বেত নিয়ে যান কেন? কারণ তারা মনে করেন, আমরা টাকা দিয়ে পড়াচ্ছি। শিক্ষকদের পরিবার চলে আমাদের টাকায়। তারা আমাদের কথা শুনবে না মানে! তারা আমার সন্তানকে বকা দেবে, এটা তো হ’তেই পারে না। অনেকে তো সরাসরি মুখ খুলে এসব বলেও ফেলেন। বললেই আর কি! এই জিনিসগুলো যেন সবারই ‘গা-সওয়া’ হয়ে গেছে।
এই বাণিজ্যিক সিস্টেমে প্রতিটি অভিভাবকই একেকজন শিক্ষাবীদ। শিক্ষার্থীদের কোন বিষয় কিভাবে পড়াতে হবে, এটা তারা শিক্ষকদের চাইতে অনেক ভাল জানেন। অথচ এই অভিভাবকই যখন সন্তানের চিকিৎসা করাতে মেডিকেলে যান তখন বলতে পারেন না যে, এই টেস্ট লিখলেন কেন? এই ঔষধ লিখলেন কেন? তখন তাদের যদি বলা হয়, দুই ঘণ্টা বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তবে তারা হঠাৎই চরম আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠেন। ডাক্তার যখন ধমক দিয়ে বলেন, ডাক্তার কি আমি নাকি আপনি? তখন তারা চুপসে যান। কারণ তারা জানেন, রোগ না সারলে বাচ্চা মারা যাবে। কিন্তু এই বাচ্চাই যখন অনেক বছরের লেখাপড়া শেষে যখন মূর্খের মতই থেকে যায়, তখন তারা আতশ কাঁচ দিয়েও এর কারণ খুঁজে পান না।
এই সিস্টেমে শিক্ষকগণ কিন্তু ডাক্তারদের মত ধমক দিতে পারেন না। কারণ অভিভাবকদের মনে কষ্ট দিলে তারা বাচ্চা নিয়ে চলে যাবে। অনেক টাকা লোকসান হয়ে যাবে। তবে আমার মনে হয়, মৌমাছির পায়ে তেল মালিশ করা ফুলের কাজ নয়। ফুলের কাজ নিজের মাঝে মধু সঞ্চয় করা। যদি মধু থাকে তবে এবেলা নাহয় ওবেলা মৌমাছি আসবেই। আর মৌমাছিতে বাগান ভরলে বাণিজ্য এমনিই হবে। তবে প্রচলিত যে বাণিজ্যের চিত্র দেখানো হ’ল আমরা এই বাণিজ্য চাই না। আমরাও চাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা হোক। তবে সেই ব্যবসার ধরন ভিন্ন। সেটা বুঝতে আমরা একটু গোড়া থেকে শুরু করি। ক্যালকুলেটর ভাঙ্গা হিসাব আমরাও আপনাকে দেখাতে চাই।
নতুন মুদ্রা চিনি : দুনিয়ার বুকে আমরা সবাই ব্যবসায়ী। কেউ দুনিয়ার ব্যবসা করে, কেউ করে আখেরাতের ব্যবসা। ব্যবসার বাইরে কিছুই নেই। কেউ কাপড় তৈরী করে। কেউ খাবার তৈরী করে। কেউ তৈরী করে ভিন্ন কিছু। কেউ আবার এই কারখানাগুলোর বিভিন্ন পদে চাকুরী করে মনে করে, আমি ব্যবসা করি না। অথচ তারাও ব্যবসারই একেকটি অংশ। এখন এই কাপড়, খাবার ইত্যাদি জিনিসগুলো যাদের জন্য তৈরী করা হয় সেই মানুষ তৈরীও তো একধরনের ব্যবসা। বরং আরো বড় ব্যবসা। সেই ব্যবসা নিয়েও আমাদের মাঝে কিছু আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
ব্যবসা শব্দটি কানে আসার সাথে সাথেই আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে ‘টাকা’। হ্যাঁ, টাকা হ’ল দুনিয়াবী জীবনের মুদ্রা। আর আমাদের মাথায় সর্বদা দুনিয়া ঘুরপাক খাওয়ার কারণে টাকাই কল্পনায় আসে। অন্যদিকে ছওয়াবও এক ধরনের মুদ্রা। এটা আখেরাতে চলবে। দুনিয়াতে ছওয়াব চলবে না, আবার আখেরাতে টাকা চলবে না। তবে টাকাকে ছওয়াবে বা ছওয়াবকে টাকায় পাল্টানো যায়। যেমন, আমি একজন অসহায়কে কিছু টাকা দিলাম। বিনিময়ে আমি সমপরিমাণ ছওয়াব পেলাম। আবার যে ইবাদত ছওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হয়, তা আমি শুধু টাকার উদ্দেশ্যেই করলাম। বিনিময়ে অল্প কিছু টাকা পেলাম।
ছওয়াবের বিনিময়ে টাকা সর্বদা অল্পই পাওয়া যায়। কারণ দুনিয়ায় ছওয়াবকে সবাই মূল্যহীন ভাবে। আবার আখেরাতে টাকা আরো বেশী মূল্যহীন হবে। দুনিয়ায় তো ছওয়াবের বিনিময়ে কিছু টাকা পাওয়া যায়, তবে আখেরাতে হাযার কোটি টাকার বিনিময়ে একটি ছওয়াবও পাওয়া যাবে না। তাহ’লে আমরা দুই ধরনের মুদ্রা পেলাম। একটা দুনিয়াবী, অপরটি উখরাভী বা পরকালীন। আর এই দুই ধরনের মুদ্রা উপার্জন করার একটিই স্থান। তা হ’ল দুনিয়া। আখেরাত কেবল ফল ভোগের জায়গা। সেখানে কোন উপার্জন চলবে না।
মুনাফার ধরন : এবার আমরা জানব, কোন মুদ্রায় কিভাবে মুনাফা আসে। টাকার হিসাব সর্বদা সীমিত। কারণ টাকার হিসাবে যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ হয়। আর ছওয়াবের হিসাবে শুধু গুণ হয়, বাকী তিনটা হয় না। দুনিয়ায় যদি আপনি দশ টাকার কাজ করেন তবে দশ টাকাই পাবেন। আবার দশ টাকা যদি দুই ভাগে ভাগ করেন, তবে সেটা কমে পাঁচ টাকা হয়ে যাবে। তবে ছওয়াবের হিসাব এমন নয়। আপনি যদি একটি ছওয়াবের কাজ করেন তবে বিনিময়ে আপনি দশ থেকে সাতশত ছওয়াব পেতে পারেন। আপনি যদি এককেজি গম টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেন তবে আপনি এককেজির দামই পাবেন। তবে যদি আপনি ছওয়াবের বিনিময়ে বিক্রি করেন তবে আপনি প্রতিটি গমের দানার বিনিময়ে একেকটি গাছ পাবেন। প্রতিটি গাছে থাকবে সাতটি করে শীষ। প্রতিটি শীষে একশটি দানা। ক্ষেত্র বিশেষে এর চেয়েও বেশী পেতে পারেন।
এরপরে মনে করুন, তিনশো টাকা পারিশ্রমিকের একটি কাজ আমরা তিনজন মিলে করেছি। টাকার হিসাবে আমরা প্রত্যেকে একশ’ টাকা হারে পাব। যদি ছয়জন মিলে করি তবে সেটা কমে পঞ্চাশে নেমে আসবে। পক্ষান্তরে ছওয়াবের হিসাব ভিন্ন। জানাযার ছালাতে এক ওহোদ পাহাড় সমান ছওয়াব পাওয়া যায়। এখন আপনি একটি জানাযায় যাওয়ার সময় আরো তিনজনকে ডেকে নিয়ে গেলেন। এখন কি এক ওহোদ পাহাড় চারভাগে ভাগ হবে? না! সকলের জন্যই আলাদা আলাদা ওহোদ পাহাড় সমান ছওয়াব রয়েছে। আর আপনি জানাযা ছালাতের জন্য ডেকেছেন, এজন্য আপনার অতিরিক্ত আরো তিন ওহোদ পাহাড় সমান ছওয়াব! টোটাল চার ওহোদ পাহাড়!
এখন আপনি যে তিনজনকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই আবার পথিমধ্যে আরো তিনজন করে ডেকে নিল। এখন আপনি যাদের ডেকেছিলেন তাদের হ’ল চার ওহোদ পাহাড় ছওয়াব। আর আপনার? আপনার হ’ল মোট ১৩ ওহোদ পাহাড় সমান ছওয়াব। কোনরকম কষ্ট-ক্লেশ ছাড়াই! তাহ’লে আমরা বুঝতে পারলাম, টাকা ভাগ করলে কমে যায়, পক্ষান্তরে ছওয়াব ভাগ করলে বাড়ে। এক হাযার টাকা দুই ভাগ করলে পাঁচশো হয়। আর এক হাযার ছওয়াব দুইভাগ করলে দুই হাযার হয়। আশা করি, দুই ধরনের মুদ্রার হিসাব বুঝতে কারো বাকী নেই। এবার আমরা আমাদের মূল আলোচনায় যাব। অর্থাৎ শিক্ষা বাণিজ্য শিখব।
আসুন ব্যবসা শিখি : এডুকেশন বিজনেস করতে চাইলে শুরুতেই এর ইনভেস্ট সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ এই ব্যবসায় অনেক দীর্ঘ ইনভেস্টের প্রয়োজন হয়। শুরুতেই বিনিয়োগ করতে হবে শৈশবের হেসে-খেলে বেড়ানো দিনগুলো। বিনিয়োগ করতে হবে শেষ রাতের ঘুমগুলো। অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা লাগতে পারে পিতা মাতার আদর-যত্ন। বিনিয়োগ করা লাগতে পারে ইচ্ছামত তরকারী দিয়ে ভাত খাওয়ার স্বাধীনতা। মোটকথা, অনেক আবদার-চাওয়া-পাওয়া বিনিয়োগ করে একমাত্র হারানো-কেই আপন করে নেয়া লাগতে পারে।
এই দীর্ঘ বিনিয়োগের পরে আমার কাছে যে পণ্য জমা হবে তা হ’ল ‘ইলম’। এটাই হ’ল আমার মূলধন। এখন আমাকে জানতে হবে, আমার অর্জিত অনেক ইলমের মধ্যে কোন ইলমটি বিক্রি করতে হবে এবং কার কাছে করতে হবে। তবেই আমি এই ব্যবসাতে কোটিপতি হ’তে পারব। অন্যথা বিনিয়োগ অনুযায়ী মুনাফা আসবে না। মনে করুন, আমি যদি একটি কারখানা তৈরী করি, তবে সেখানে কোন জিনিস তৈরী করতে বেশী আগ্রহী হব? যেটা মানুষের প্রতিবেলা কাজে লাগে সেটা, নাকি যা মাসে দু’বার প্রয়োজন হয় সেটা? আমি অবশ্যই প্রতিবেলা প্রয়োজন এমন জিনিসেরই কারখানা দেব। কারণ এখানে বিক্রি
বেশী, লাভও বেশী।
ঠিক তেমনই ইলমের মধ্যে ঐ ইলমের কেনাবেচা বেশী করতে হবে, যা মানুষের প্রতিবেলা কাজে লাগে। আর মানুষের সবচেয়ে বেশী কাজে লাগে কুরআন তিলাওয়াত। একজন মুসলমান না চাইলেও তাকে দিনে কমপক্ষে পাঁচবার কুরআন পড়তেই হয়। এজন্যই তো হাদীছে এসেছে, ঐ ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে নিজে কুরআন শিখে এবং অপরকে শিখায়। এবার বুঝতে পেরেছেন তো, ব্যবসা কোথায় বেশী? শুধু শাইখুল হাদীছ সেজে সপ্তাহে তিনটা লেকচারের মাঝে কোন মহত্ব নেই। ছওয়াবের ব্যবসায় যদি কোটিপতি হ’তে চান, তবে মক্তবে আসুন। ইলমের ব্যবসা এখানেই জমজমাট।
দুঃখের বিষয় হ’ল, আমাদের শিক্ষকগণ এমনই এডুকেশন বিজনেস করেন যে, তারা শিক্ষার্থীদের সূরা ফাতিহার শিক্ষক হ’তে চান না। ছালাত শেখাতে চান না। তারা এমন কিছু শেখাতে আগ্রহী যা শিক্ষার্থীদের খুব কমই আমলে আসবে। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। আমরা শিক্ষকতার মর্যাদাকে তার পদের সাথে বেঁধে দিয়েছি। তিনি কোন কিতাব পড়ান? তিনি কোন পদে আছেন? সে অনুযায়ী তার বেতন, তার সম্মান, তার গ্রহণযোগ্যতা। এজন্য একটু বেশী বেতনের আশায় আমাদের ‘ওপরের পদ’ খুঁজতে হয়। আগ্রহ না থাকলেও বিভিন্ন কাজ করতে হয়। কারণ এগুলো প্যাকেজ আকারে তৈরী করা হয়েছে। যে পদ নিবেন, সেখানকার দায়িত্ব, বেতন, সম্মান সবই নিতে পারবেন।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, শিক্ষকতার মাঝে আবার হরেক পদ থাকবে কেন? শিক্ষকতার একটিই পদ হবে। শুধুমাত্র ‘শিক্ষক’। বেতন-ভাতা নাহয় তাদের পরিশ্রম-দায়িতব ইত্যাদির ওপরে কম-বেশী হ’ল। যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্বগুলো বণ্টিত হ’ল। আমার তো খুব মন চায়, আমি শিক্ষার্থীদের সূরা ফাতিহার শিক্ষক হব। তারা আমার কাছে ছালাত শিখবে। তারা আমার কাছে মাসনূন দো‘আ শিখবে। তারা আমার কাছে শিখবে, কিভাবে সুন্নাতী পদ্ধতিতে খেতে হয়, ঘুমাতে হয়। আর এগুলোর ওপর তারা নিজেরা সারাজীবন আমল করবে আবার পরিবার-পরিজনকে শিখাবে। আর এই সকল ছওয়াব আমি পাব।
আমার এক শিক্ষক ছিলেন। হিফয বিভাগে। তার কাছে যত ছাত্র হিফয শেষ করেছে তাদের সবার নাম ঠিকানা তিনি একটি সুন্দর ডায়েরীতে লিখে রাখতেন। আমি যেদিন তার কাছে সবক শেষ করেছিলাম সেদিন তিনি তার ডায়েরীতে আমার নামও লিখলেন। আমি বললাম, উস্তাদজী! এভাবে নাম লিখে রাখার কারণ কি? তিনি বললেন, এগুলো হ’ল আমার সঞ্চয়। মানুষ নিজের ব্যাংক এ্যাকাউন্ট লিখে রাখে না? এগুলো হ’ল আমার ব্যাংক এ্যাকাউন্ট। তখন আমি এতকিছু বুঝতাম না। তবে এখন ঐ ব্যবসা আমি বুঝি। এখন আমারও মনে হয়, আমার অনেক অনেক এ্যাকাউন্ট দরকার।
এডুকেশন বিজনেস মূলত ছওয়াবের বিজনেস। এই ব্যবসা এভাবেই হয়। আমি আপনাকে ক্যালকুলেটর ভাঙ্গা হিসাব দেখাতে চেয়েছিলাম। সেটা এখন দেখাব। মনে করুন, আমি জীবনে ১০০০ ছাত্র তৈরী করেছি। তাদের আকাঈদ ও ইবাদাত শিখিয়েছি। সুতরাং এই এক হাযার জন যা ইবাদত করেছে তার সবগুলো আমার। তন্মধ্যে ৪০০ ছাত্র আবার ইলমের খিদমতে যুক্ত হয়েছে। তারা প্রত্যেকে সারা জীবনে কেউ ৩০০ কেউ ৪০০ ছাত্র তৈরী করেছে। সেগুলোও আমার। তাদের প্রত্যেকের যে তিন-চারশো করে ছাত্র তৈরী হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ আবার ইলমের খিদমতে যুক্ত হয়েছে এবং প্রত্যেকেই আরো দুই-তিনশো করে ছাত্র তৈরী করেছে। সেগুলোও আমার।
এই ধারাবাহিকতা চলবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত। এরা সবাই আমার একেকটি সঞ্চয়। আমার একটি ব্যাংক এ্যাকাউন্ট। এবার আপনি আমার ছওয়াব নয় বরং এ্যাকাউন্টের সংখ্যা হিসাব করুন। একজন মুসলিম শুধু পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাতে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে ১৭ বার। আল্লাহ প্রতি হরফে দশটি ছওয়াব দিবেন, আপনি সেই ছওয়াবের হিসাব নয় বরং আমার ফাতিহা তিলাওয়াতের সংখ্যা হিসাব করুন। ক্যালকুলেটর কি ভাংবে না? এবার আপনিই বলুন, এই লোভনীয় হিছছা ছাড়া যায়? শিক্ষক তো হয়েছিই এজন্য।
আমরা শিক্ষার্থীদের শাসন করার জন্য কতজন আমাদের ওপর মন খারাপ করেন। আমরা সেগুলো মেনে নিই। আমরা চাই, আমাদের প্রোডাক্টগুলো কোয়ালিটিফুল হোক। বর্তমান যুগে কর্মীর তুলনায় কর্মক্ষেত্র কম। সুতরাং আমি যদি চাই, আমার প্রতিটি প্রোডাক্ট মার্কেটে স্থান পাক, তবে আমাকে কোয়ালিটিফুল প্রোডাক্ট তৈরী করতে হবে। এছাড়া ব্যবসায় লস হবে। বিশ্বাস করুন, একমাত্র এই উদ্দেশ্য ছাড়া আমরা কখনোই কোন শিক্ষার্থীদের জোর করে পড়াতাম না। শাসন করতাম না। শাসন করি, বকা দেই তার উদ্দেশ্যই হ’ল, তাকে তুলনামূলক যোগ্য করে গড়ে তোলা। কারণ এটা আমার শিক্ষা-বাণিজ্যের অংশ।
শেষ কথা : আমি দুনিয়ায় অনেক সফল মানুষ দেখেছি। যাদেরকে আল্লাহ মুসলিম করেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ের তাওফীক দিচ্ছেন। পয়সা-কড়িও দিয়েছেন। এতটুকুর মাঝেই তারা নিজেদের সফলতা খুঁজে নিয়েছে। তবে তাদের শুধু একটি বিষয়ে আমার আফসোস হয় যে, তারা জীবনে যা গুনাহের কাজ করেছে এই সমস্ত গুনাহের পাল্লাকে মোকাবিলা করার জন্য শুধু তাদের নিজেদের ছওয়াব রয়েছে। এত এত গুনাহ শুধু একটি আমলনামার ছওয়াব দিয়ে কিভাবে ওপরে উঠবে! আমার শুধু এই ভয় কাজ করে। যদি এক আমলনামা গুনাহের বিপরীতে দশটি ছওয়াবে পূর্ণ আমলনামা থাকত, তবে কিছুটা ভরসা পাওয়া যেত। শুধু একটি আমলনামা নিয়ে মীযানের পাল্লায় পার হওয়া সত্যিই খুব মুশকিল হয়ে পড়বে।
আমার মনে হয়, দুনিয়ার বুকে যাদের শিক্ষা-বাণিজ্য করার সুযোগ হচ্ছে না, তাদের অন্তত আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষা-ব্যবসার শেয়ার হোল্ডার হওয়া প্রয়োজন। যে প্রতিষ্ঠান অর্থের অভাবে চলতে পারছে না সেখানে আর্থিক সহযোগিতা করলে সেখানে যত ইলমের খিদমত হবে তার সমান অংশ সহযোগিতাকারী ব্যক্তি পাবেন। আমার এক শিক্ষক বলতেন, ‘যদি তুমি কোন কিছুর দখল চাও তবে নিজের মালিকানাধীন জিনিস তার মধ্যে প্রবেশ করাও। সুতরাং শুধু প্রয়োজন হ’লেই শেয়ার হোল্ডার হওয়া যাবে এমনও নয়।
কোন দারুল হাদীছে গিয়ে বলতে পারেন, এই বছরে শিক্ষার্থীদের যাবতীয় হাদীছের কিতাব আমি কিনে দেব। আরেক মক্তবে গিয়ে বলতে পারেন, এখানে কুরআন শিখানো হয়, এখানে আমি একটি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দেব। শিক্ষার্থীদের কুরআন পড়তে গিয়ে যদি পিপাসা পায় তবে তারা যেন সেখান থেকে পানি পান করেত পারে। চাইলে এভাবেও শিক্ষা বাণিজ্যে শেয়ার নেয়া যায়। আমার এক বন্ধু ছিল, তার পিতার ১৬টি ব্যাংক একাউন্ট। এর মাঝে শুধু একটিতে টাকা জমাও হয় আবার খরচও হয়। বাকীগুলো থেকে কোন খরচ হয় না। শুধু জমা হয়। জমি কেনা ব্যতীত তিনি বাকী পনেরটি একাউন্টে হাত দিতেন না। তিনি হয়ত অর্থনীতি বেশ ভাল বোঝেন। এজন্যই এমনটা করেছেন। তবে একজন মুসলিমের অর্থনীতি বোঝার আগে ছওয়াবনীতি বুঝতে হবে।
এজন্য আমি বুলি, আমি একজন গর্বিত শিক্ষা-ব্যবসায়ী। শিক্ষা-বাণিজ্য আমার শিরা-উপশিরায় বহমান। আমি হাশরের ময়দানে লক্ষাধিক আমলনামা নিয়ে উপস্থিত হব ইনশাআল্লাহ। যার একটিতে থাকবে ছওয়াব ও গুনাহের মিশ্রণ। বাকীগুলোতে থাকবে শুধু ছওয়াব আর ছওয়াব। সেই ছওয়াব দিয়ে আমি কিনে ফেলব এমন একশটি দুনিয়া। সেদিন আমার শাহী বালাখানার বিশাল সিংহাসনে বসে পায়ের ওপর পা তুলে বলব, যে ব্যক্তি দুনিয়া চায়, সে যেন ইলম অর্জন করে। যে আখেরাত চায়, সেও যেন ইলম অর্জন করে। আর যে উভয়ই চায়, সেও যেন ইলম অর্জন করে।