ভূমিকা :

পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে বহু শক্তিশালী সভ্যতা ও শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে কেবল একটি মাত্র বিষয়ের অভাবে, আর তা হ’ল ‘জবাবদিহিতা’। প্রাচীনকালের গোত্রভিত্তিক শাসন কাঠামো থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পর্যন্ত পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে, যখনই শাসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনই সেখানে দুর্নীতি, অধিকার হরণ ও সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একটি সুন্দর ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূলভিত্তি কেবল কঠোর আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বহুলাংশে নির্ভর করে প্রতিটি ব্যক্তির ভেতরের নৈতিকতার ওপর।

ইসলাম এই জবাবদিহিতাকে কেবল জাগতিক বা আইনী কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রাখেনি, বরং একে আত্মিক ও পরকালীন বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রের কোন নযরদারী নেই, যেখানে দুর্নীতির সুযোগ শতভাগ, সেখানেও একজন মানুষ কেন স্বেচ্ছায় অন্যায় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করার চেতনায়। আলোচ্য জবাবদিহিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হ’ল।

জবাবদিহিতার পরিচয় :

‘জবাবদিহিতা’ একটি বাংলা শব্দ, যার ইংরেজী প্রতিশব্দ হ’ল Accountability বা Responsibility। আরবী ভাষায় এর সমার্থক শব্দ হচ্ছে المسؤولية (আল-মাসউলিয়্যাহ), যা سأل (সাআলা) ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ প্রশ্ন করা, জিজ্ঞাসা করা, কৈফিয়ত চাওয়া বা কোন কাজের জন্য দায়ী করা। সুতরাং শাব্দিক অর্থে জবাবদিহিতা বলতে এমন এক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তি তার কাজ, সিদ্ধান্ত ও আচরণের জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকে।

পরিভাষায় দায়বদ্ধতা হ’ল এমন এক অবস্থা, যার কারণে মানুষ তার সম্পাদিত কাজ বা কার্যকলাপ সম্পর্কে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য হয় এবং এর ভালো-মন্দ পরিণতির দায়ভার তার ওপরই বর্তায়।[1]

সারকথা হ’ল নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমানতদারিতার সাথে পালন করা এবং এর ফলাফলের জন্য আল্লাহর নিকট ও সমাজের কাছে জবাব দেওয়ার মানসিক প্রস্ত্ততি রাখাই হ’ল জবাবদিহিতা।

নযরদারী ও জবাবদিহিতা :

ইসলামে জবাবদিহিতার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ভিত্তি হ’ল এই বিশ্বাস যে, মানুষের প্রতিটি কাজ, কথা এবং আচরণ সার্বক্ষণিকভাবে ও নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে কোন অপরাধ করা সম্ভব হ’লেও আল্লাহর নযরদারী এড়ানো কোনভাবেই সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ-كِرَامًا كَاتِبِينَ-يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ، ‘অথচ তোমাদের উপরে অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত রয়েছে। সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানেন যা তোমরা কর’ (ইনফিতার ৮২/১০-১২)। তিনি আরো বলেন,وَكُلَّ إِنْسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِيْ عُنُقِهِ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا-اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا، ‘প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্মকে আমরা তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। আর ক্বিয়ামতের দিন আমরা তাকে বের করে দেখাব একটি আমলনামা, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। (সেদিন আমরা বলব,) তুমি তোমার আমলনামা পাঠ কর। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাবের জন্য যথেষ্ট’ (ইসরা ১৭/১৩-১৪)। এই নযরদারী ও জবাবদিহিতার অনুভূতি একজন মানুষকে গোপনে ও প্রকাশ্যে যেকোন অবস্থায় অন্যায়, দুর্নীতি বা অন্যের অধিকার হরণ থেকে বিরত রাখে।

ইসলামে জবাবদিহিতার গুরুত্ব ও স্বরূপ

প্রতিটি মানুষকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। মহান আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর দেওয়া বিধান পালনই হ’ল মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য। দুনিয়ার বুকে মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কিবয়ামতের দিন সেই সংরক্ষিত আমলনামা উন্মুক্ত করে প্রতিটি মানুষকে তার নিজ নিজ কাজের চূড়ান্ত হিসাব দিতে বলা হবে। পরকালীন এই জবাবদিহিতার শাশ্বত ভিত্তি মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে পরিব্যাপ্ত। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র কোথায় কিভাবে মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে, তার প্রধান ক্ষেত্রগুলো নিম্নে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হ’ল।

১. আল্লাহ প্রদত্ত নে‘মত সম্পর্কে জবাবদিহিতা :

আল্লাহ অগণিত নে‘মত ও তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আমরা শেষ করতে পারবো না। কিন্তু তাঁর দেওয়া প্রতিটি নে‘মত সম্পর্কে কিবয়ামতের দিন মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَةَ اللهِ لَا تُحْصُوهَا، ‘যদি তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ সমূহ গণনা কর, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না’ (নাহল ১৬/১৮)। তিনি আরো বলেন,وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِنْ شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِنْ بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللهِ إِنَّ اللهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ، ‘পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং একটি সমুদ্রের সাথে সাতটি সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর নে‘মতসমূহ লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহা পরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (লোকমান ৩১/২৭)।

মূলত আমাদের পুরো জীবনটাই আল্লাহর দেওয়া পবিত্র নে‘মত। যেমন রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তুমি পাঁচটি বস্ত্তর পূর্বে পাঁচটি বস্ত্তকে গণীমত (সম্পদ) মনে কর। ১. বার্ধক্য আসার পূর্বে যৌবনকে ২. পীড়িত হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে ৩. দরিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে ৪. ব্যস্ততার পূর্বে অবসর সময়কে এবং ৫. মৃত্যুর পূর্বে তোমার জীবনকে’।[2]

সুস্থ শরীর, মহামূল্যবান সময়, মেধা ও জ্ঞান, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ক্ষমতা এর কোনটিই আমাদের একান্ত নিজস্ব অর্জন নয়। এগুলো মহান রবের দেওয়া এক পবিত্র আমানত। কিবয়ামতের দিন এই আমানতের সদ্ব্যবহার সম্পর্কে চূড়ান্ত জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ ‘অতঃপর সেদিন তোমাদেরকে অবশ্যই (প্রত্যেক) নে‘মত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’ (তাকাছুর ১০২/৮)।

প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে :

দায়িত্ব পালন ও আমানত রক্ষার বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ যথাযথভাবে তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়বিচারের সাথে বিচার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে কতই না উত্তম উপদেশ দিচ্ছেন! নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (নিসা ৪/৫৮)নিজ নিজ দায়িত্বের জবাবদিহিতা সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ... ‘সাবধান তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাকে পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সংসার এবং সন্তানের উপর দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তাকে এ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এমনকি দাস-দাসীও তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সেইদিন তাকেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অতএব মনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই ক্বিয়ামতের দিন নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’।[3]

উপরোক্ত আয়াত ও হাদীছ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে প্রতিটি দায়িত্বই একটি আমানত এবং প্রতিটি আমানতের সঙ্গেই জবাবদিহিতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে পরিবারের কর্তা, স্ত্রী, শিক্ষক, কর্মচারী কিংবা সমাজের যেকোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সকলকেই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহর নিকট জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে।

জাহান্নামে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জবাবদিহিতা :

ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীরা জাহান্নামীদের কাছে তাদের এই চরম পরিণতির কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে। সেদিন জাহান্নামীরা নিজেদের মুখেই দুনিয়ায় তাদের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা ও আল্লাহর বিধান অমান্য করার কথা স্বীকার করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ- إِلَّا أَصْحَابَ الْيَمِينِ- فِي جَنَّاتٍ يَتَسَاءَلُونَ- عَنِ الْمُجْرِمِينَ- مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ- قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ- وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ- وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ- وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ- حَتَّىٰ أَتَانَا الْيَقِينُ، ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের নিকট দায়বদ্ধ। তবে ডানদিকের লোকেরা ছাড়া। তারা জান্নাতে অবস্থান করে অপরাধীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, ‘কিসে তোমাদেরকে সাক্বারে (জাহান্নামে) প্রবেশ করাল? তারা (জাহান্নামীরা) বলবে, আমরা ছাালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। আমরা অভাবগ্রস্তকে খাদ্য দিতাম না। আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনায় লিপ্ত থাকতাম। আমরা বিচার দিবসকে মিথ্যা বলতাম। অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু এসে উপস্থিত হ’ল’ (মুদ্দাছছির ৭৮/৩৮-৪৭)।

অতএব একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য হ’ল ইবাদত, মানবসেবা এবং আখেরাতের বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে জীবনযাপন করা, যাতে ক্বিয়ামতের দিন সে সফলভাবে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করে মুক্তি লাভ করতে পারে।

সন্তান হত্যা ও সন্তান সম্পর্কে জবাবদিহিতা :

সন্তান আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান আমানত। পিতা-মাতার ওপর সন্তানের জীবন, লালন-পালন, শিক্ষা-দীক্ষা ও নৈতিক চরিত্র গঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এ দায়িত্বে অবহেলা করলে আল্লাহ তা‘আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। জাহেলী যুগে দারিদ্রে্যর ভয়ে কিংবা সামাজিক কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম এই বর্বরোচিত প্রথাকে নিষিদ্ধ করেছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করে পরকালে এ বিষয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَإِذَاالْمَوْءُودَةُسُئِلَتْ- بِأَيِّذَنْبٍقُتِلَتْ، ‘আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাশিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল’ (তাকভীর ৮১/৮-৯)। এখানে নিরপরাধ মযলূম মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করার অর্থ হ’ল যালেম পিতামাতাকে তার সামনে ধিক্কার দেওয়া। অথবা হত্যাকারীকে মেয়েটির সামনে ডেকে এনে ধমক দিয়ে বলা হবে, তুমি বল, কেন মেয়েটি নিহত হ’ল? (ক্বাসেমী)। অনেকেই আছেন দরিদ্রতার ভয়ে ভ্রূণ হত্যা করেন। কন্যা সন্তান মানুষ করা ও তাকে বড় করে বিয়ে দেওয়াকে বোঝা মনে করেও একাজ করে থাকেন। মহান আল্লাহ তা‘আলা পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানের রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন,وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئًا كَبِيرًا، ‘দারিদ্রে্যর ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে এবং তোমাদেরকে রিযিক দান করি। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা এক মহাপাপ’ (বনী ইসরাঈল ১৭/৩১)।

উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সন্তানের শুধু শারীরিক নিরাপত্তাই নয়; বরং তাদের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের সাথে সুন্দর ও গঠনমূলক আচরণের মাধ্যমে বড় করে তোলা পিতা-মাতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

ব্যক্তিগত জবাবদিহিতা :

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক মানুষ তার নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী। কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না এবং অন্যের অপরাধের কারণে শাস্তিও ভোগ করবে না। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের আমল সম্পর্কেই আল্লাহ তা‘আলার নিকট জবাবদিহি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى، ‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী। একের বোঝা অন্যে বহন করবে না’ (আন‘আম ৬/১৬৪)। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তি কেবল তার নিজের কর্মের জন্যই জিজ্ঞাসিত হবে। মানুষের জীবন, যৌবন, ধন-সম্পদ, জ্ঞান ও কর্ম এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। ক্বিয়ামতের দিন এসব আমানতের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলার সামনে জবাবদিহি করতে হবে। মহান আল্লাহ হাশরের ময়দানে আদম সন্তানকে তার পুরো জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রশ্ন করবেন। এ প্রসঙ্গে নবী করীম (ছাঃ) বলেন,لاَ تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاَهُ وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ، ‘ক্বিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসিত না হওয়া পর্যন্ত আদম সন্তানের পা তার রবের নিকট হ’তে নড়বে না। তার জীবনকাল সম্পর্কে, সে তা কিভাবে কাটিয়েছে। তার যৌবনকাল সম্পর্কে, তা কিভাবে শেষ করেছে। তার সম্পদ সর্ম্পকে, সে তা কোথা হ’তে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে। আর সে যে জ্ঞান অর্জন করেছে, সে অনুযায়ী আমল করেছে কি-না’।[4]

একজন মুমিনের জীবনের কোন মুহূর্তই হিসাবের বাইরে নয়। বিশেষ করে যৌবনের শক্তি, উপার্জনের হালাল-হারাম মাপকাঠি এবং অর্জিত জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগের বিষয়ে আল্লাহর দরবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। তাই ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার এই ভয়কে অন্তরে ধারণ করে প্রতিটি মানুষের উচিত তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অতিবাহিত করা।

রাষ্ট্রপ্রধান ও নেতৃত্বের জবাবদিহিতা :

ইসলামে নেতৃত্ব একটি মহান আমানত। রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক, প্রশাসক কিংবা যে কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি তার অধীনস্থ জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ। আল্লাহ বলেন,إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করার নির্দেশ দেন। আর অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর’ (নাহল ১৬/৯০)। রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَا مِنْ وَالٍ يَلِي رَعِيَّةً مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَيَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لَهُمْ إِلَّا حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ، ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোন দায়িত্ব লাভ করল, অতঃপর সে তাদের সঙ্গে প্রতারণা ও বিশবাসঘাতকতা করল এবং এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন’।[5]

সরকারী সম্পদ ও আমানতের জবাবদিহিতা :

ইসলামে সরকারী সম্পদ, বায়তুলমালের অর্থ এবং জনগণের আমানত অত্যন্ত পবিত্র। কোন ব্যক্তি যদি সরকারী দায়িত্ব পালনের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করে বা উপঢৌকনের নামে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করে, তবে তা খিয়ানত হিসাবে গণ্য হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللهَ وَالرَّسُوْلَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ، ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খিয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতেরও খিয়ানত করো না (আনফাল ৮/২৭)। অন্যত্র তিনি খিয়ানতকারীদের পরিণাম সম্পর্কে বলেন,وَمَا كَانَ لِنَبِيٍّ أَنْ يَغُلَّ وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، ‘কোন নবীর পক্ষে খিয়ানত করা সম্ভব নয়। আর যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, ক্বিয়ামতের দিন সে যা খিয়ানত করেছে তা বহন করে উপস্থিত হবে (আলে-ইমরান ৩/১৬১)।

সরকারী দায়িত্বে থেকে উপহার বা উপঢেŠকন নেওয়ার বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। আবু হুমাইদ সাঈদী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) আযদ গোত্রের ইবনু লুতবিয়্যাহ নামক এক ব্যক্তিকে ছাদাক্বাহ (যাকাত) সংগ্রহের কাজে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বললেন, এগুলো আপনাদের আর এগুলো আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘সে তার পিতা কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকল না? তখন সে দেখতে পেত, তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কি না? যার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম! ছাদাক্বার মাল হ’তে স্বল্প পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে, সে তা কাঁধে করে ক্বিয়ামত দিবসে উপস্থিত হবে। সেটা উট হ’লে তার আওয়াজ করবে, গাভী হ’লে হাম্বা হাম্বা রব করবে আর বকরি হ’লে ভ্যাঁ ভ্যঁা করতে থাকবে। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাঁর দু’হাত এমনভাবে উঠালেন যে, আমরা তাঁর দুই বগলের শুভ্রতা দেখতে পেলাম। তিনি তিনবার বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি? হে আল্লাহ! আমি কি পৌঁছে দিয়েছি’?[6]

সরকারী সম্পদ, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জনগণের আমানতের প্রতি খিয়ানত ইসলামে গুরুতর অপরাধ। ক্ষমতার ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ, ঘুষ, আত্মসাৎ কিংবা উপহারের নামে ব্যক্তিগত লাভ অর্জন এসবই খিয়ানত। তাই একজন দায়িত্বশীল মুসলিমের কর্তব্য হ’ল সরকারী ও জনসাধারণের সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গণ্য করা এবং সর্বোচ্চ সততা ও স্বচ্ছতার সাথে তা পরিচালনা করা। যাতে কিবয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সফলভাবে জবাবদিহি করা যায়।

বান্দার হক লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা :

ইসলামে মহান আল্লাহর হকের (হাক্কুল্লাহ) পাশাপাশি বান্দার হক বা মানবাধিকার (হাক্কুল ইবাদ) সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ বা যাকাতের মতো মেŠলিক ইবাদত পালনের পরও যদি কোন ব্যক্তি মানুষের ওপর যুলুম করে, তাদের অধিকার হরণ করে কিংবা কারও সম্মান ও সম্পদের ক্ষতিসাধন করে তবে তাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হ’তে হবে। বান্দার হক নষ্টকারীকে কেবল তার নফল বা ফরয ইবাদত জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا وَلَٰكِنَّ النَّاسَ أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ، ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি যুলুম করে’ (ইউনুস ১০/৪৪)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ، ‘যালিমরা যা করে, তুমি কখনো মনে করো না যে আল্লাহ সে সম্পর্কে উদাসীন’ (ইবরাহীম ১৪/৪২)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব (মুফলিস) কে? ছাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব সে-ই, যার কোন অর্থ-সম্পদ নেই। তিনি বললেন, আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব হ’ল সেই ব্যক্তি, যে ক্বিয়ামতের দিন ছাালাত, ছিয়াম ও যাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে দুনিয়াতে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও ওপর অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং কাউকে প্রহার করেছে (তারাও উপস্থিত হবে)। ফলে তার নেক আমলগুলো মযলূমদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। যদি পাওনাদারদের হক আদায়ের পূর্বেই তার নেক আমল শেষ হয়ে যায়, তবে তাদের গুনাহ থেকে যুলম পরিমাণ গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দওয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।[7]

সুতরাং শুধুমাত্র ইবাদত-বন্দেগী একজন মুমিনের মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার মৌলিক দায়িত্ব। তাই প্রত্যেক মুসলিমের একান্ত কর্তব্য হ’ল আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হক যথাযথভাবে আদায় করা এবং সব ধরনের যুলুম ও অবিচার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।

রিসালাত পেঁŠছে দেওয়ার দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা :

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,يَاأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ، ‘হে রাসূল! তোমার প্রতি তোমার প্রভুর পক্ষ হ’তে যা নাযিল হয়েছে (অর্থাৎ কুরআন), তা মানুষের কাছে পৌঁছে দাও। যদি না দাও, তাহ’লে তুমি তাঁর রিসালাত পৌঁছে দিলে না। আল্লাহ তোমাকে মানুষের হাত থেকে রক্ষা করবেন’ (মায়েদা ৫/৬৭)। উক্ত আয়াতটি ইসলামী দৃষ্টিতে জবাবদিহিতার একটি মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে। এতে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয়েছে যে, রিসালাত বা আল্লাহর বার্তা মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া একটি অপরিহার্য দায়িত্ব, যার ব্যত্যয় ঘটলে দায়িত্ব পালন হয় না। এমনকি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপরও এই দায়িত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্বসহ আরোপ করা হয়েছে।

উক্ত নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন পাওয়া যায় বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে। সেখানে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বারবার ছাহাবীদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, ‘আমি কি তোমাদের নিকট পেঁŠছে দিয়েছি? ছাহাবীরা স্বীকৃতি দিলে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন’।[8] এভাবে তিনি দায়িত্ব পালনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, প্রত্যেক দায়িত্বশীল তার দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করবে।

ইসলামের ইতিহাসে জবাবদিহিতার বাস্তব দৃষ্টান্ত

আবুবকর ছিদ্দীক (রাঃ)-এর জবাবদিহিতা :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলীফা হিসাবে আবুবকর (রাঃ) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন তা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও নেতৃত্বের এক অনন্য দলীল। তিনি ক্ষমতাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত এক মহান আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি শুরুতেই জনগণের সামনে নিজেকে জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন,أما بعد أيها الناس، فإني قد وُلِّيتُ عليكم ولستُ بخيركم، فإن أحسنتُ فأعينوني، وإن أسأتُ فقوموني، الصدق أمانة، والكذب خيانة،... ‘হে লোকসকল! আমি তোমাদের শাসক নিযুক্ত হয়েছি, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। আমি যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করি তবে তোমরা আমাকে সহযোগিতা করবে। আর যদি আমি ভুল করি তবে তোমরা আমাকে সংশোধন করে দিবে। সত্যবাদিতা হ’ল আমানত, আর মিথ্যা হ’ল খিয়ানত...।’ তিনি আরও বলেন,أطيعوني ما أطعت الله ورسوله، فإذا عصيت الله ورسوله فلا طاعة لي عليكم ‘আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করব, ততক্ষণ তোমরা আমার আনুগত্য করবে। কিন্তু যদি আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হই, তাহ’লে আমার আনুগত্য করা তোমাদের জন্য অপরিহার্য নয়’।[9]

উপরোক্ত ভাষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হ’ল জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। আবুবকর (রাঃ) নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেননি; বরং জনগণকে তাঁর ভুল সংশোধনের আহবান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শাসকের আনুগত্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর আনুগত্যের অধীন। এ নীতিই ইসলামে জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছে। বর্তমান সময়েও রাষ্ট্রপরিচালনা, প্রশাসন ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এ নীতি অনুসরণ করা হ’লে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

ওমর ফারূক (রাঃ)-এর শাসনামলে জবাবদিহিতার চেতনা :

ইসলামের ইতিহাসে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর খেলাফতকাল ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা এবং জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার জন্য তিনি সর্বদা নিজেকে প্রস্ত্তত রাখতেন এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। ওমর (রাঃ) বলতেন, إذا نمتُ بالليل ضيَّعتُ نفسي، وإذا، نمتُ بالنهار ضيَّعتُ رعيتي ‘আমি যদি রাতে ঘুমাই, তাহ’লে নিজের (ইবাদতের) ক্ষতি করি; আর যদি দিনে ঘুমাই, তাহ’লে আমার প্রজাদের অধিকার নষ্ট করি।[10] এ উক্তি তাঁর দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার গভীর চেতনার পরিচায়ক।

একদিন তিনি প্রচন্ড রোদে ছাদাক্বার উটের পরিচর্যা করছিলেন। তখন আহনাফ বিন কায়েসকে ডেকে এ কাজে সহযোগিতা করতে বলেন। উপস্থিত একজন ব্যক্তি বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! এ কাজ তো কোন গোলামকেও দেওয়া যেত। তখন ওমর (রাঃ) জবাবে বলেন, ‘আমার ও আহনাফের চেয়ে বড় গোলাম আর কে আছে? যে ব্যক্তি মুসলমানদের কোন দায়িত্ব গ্রহণ করে, সে তাদের সেবকস্বরূপ’।[11]

তাঁর জবাবদিহিতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হ’ল কাপড় বণ্টনের ঘটনা। ইয়ামান থেকে আগত কাপড় জনগণের মধ্যে একটি করে বণ্টন করা হয়। পরে তিনি দু’টি কাপড় জোড়া দিয়ে তৈরি একটি পোষাক পরে খুৎবা দিতে দাঁড়ালে সালমান ফারসী (রাঃ) প্রশ্ন করেন, আপনি একটি করে কাপড় বণ্টন করেছেন, অথচ আপনার পোষাক দু’টি কাপড়ের। তখন ওমর (রাঃ) তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)-কে দাঁড় করান। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) দাড়িয়ে বললেন, আমি নিজের অংশের কাপড় আমার পিতাকে দিয়েছি। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর সালমান ফারসী (রাঃ) বলেন, এখন আমরা আপনার কথা শুনব ও আনুগত্য করব।[12]

জবাবদিহিতার ব্যাপারে ওমর (রাঃ) কতটা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতেন সেটি তার উক্তি থেকে উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেন,لو ماتت شاة على شط الفرات ضائعة؛ لظننت أن الله سائلي عنها يوم القيامة، ‘যদি ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদীর তীরে একটি ভেড়াও হারানো অবস্থায় মারা যায়, তবে আমার ধারণা, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা সে সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন’।[13]

উপরোক্ত ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ওমর (রাঃ)-এর শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার। তিনি কখনো নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেননি; বরং জনগণের প্রশ্নের জবাব দেওয়াকে নিজের কর্তব্য হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শাসনামল বর্তমান বিশ্বের শাসক, প্রশাসক ও নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের জন্য উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

ওমর ইবনুলআব্দুল আযীয (রহ.)-এর জবাবদিহিতার চেতনা :

উমাইয়া খিলাফতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক ওমর ইবনুল আব্দুল আযীয (রহ.) ছিলেন ন্যায়পরায়ণতা, তাক্বওয়া, আমানতদারিতা এবং জবাবদিহিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ জনগণের আমানত এবং এর প্রতিটি ব্যবহার সম্পর্কে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে। এ কারণে তিনি ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় কাজের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতেন।

এক রাতে তিনি রাষ্ট্রীয় কাজে নিয়োজিত অবস্থায় বায়তুলমালের অর্থে কেনা একটি বড় মোমবাতির আলোয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনগণের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় একজন ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে ওমর ইবনুল আব্দুল আযীয (রহ.) সরকারী মোমবাতিটি নিভিয়ে দেন এবং নিজের ব্যক্তিগত অর্থে কেনা একটি ছোট মোমবাতি জ্বালিয়ে বলেন, এখন আপনি আমার ব্যক্তিগত বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন। পরে কারণ জিজ্ঞাসা করা হ’লে তিনি বলেন, সরকারী মোমবাতিটি মুসলমানদের সম্পদ থেকে কেনা হয়েছিল। তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা আমার জন্য বৈধ নয়।[14]

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসাবে সংরক্ষণ করেছেন এবং সামান্যতম অপব্যবহার থেকেও নিজেকে বিরত রেখেছেন। তাঁর এই সততা ও আল্লাহভীতি জবাবদিহিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আববাসীয় খলীফা মুক্তাদী বি আমরিল্লাহ-এর জবাবদিহিতা :

আববাসীয় খলীফা মুক্তাদী বি আমরিল্লাহ (৪৬৭-৪৮৭ হি.)-এর মন্ত্রী আবু শুজা-এর নিকটে জনৈক ব্যক্তি এসে বলল, আমাদের প্রতিবেশী একজন বিধবা আছেন, যার চারটি সন্তান রয়েছে। যারা নগ্ন দেহ ও ক্ষুধার্ত। কথাটি শোনার সাথে সাথে মন্ত্রী একজন লোক দিয়ে খাদ্য, বস্ত্র ও কিছু নগদ অর্থ পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি প্রচন্ড শীতে নিজের দেহের পোষাক খুলে রেখে দিলেন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি এই পোষাক পরবো না, যতক্ষণ না এই ব্যক্তি আমার নিকট তাদের খবর নিয়ে আসে। লোকটি ছুটে চলে গেল এবং দায়িত্ব পালন করে ফিরে এসে বলল যে, তারা খুবই

খুশী হয়েছে এবং মন্ত্রীর জন্য দো‘আ করেছে। একথা শোনার পর মন্ত্রী পোষাক পরিধান করলেন।[15] শুধু আল্লাহর নিকটে জবাবদিহিতা নয় বরং জনগণের নিকটে তাদের অধিকার সম্পর্কে জবাবদিহিতার ব্যাপারে খলীফা কত ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতেন এ ঘটনা তার বাস্তব প্রমাণ। [ক্রমশ:]

 

মামূন বিন হাশমত

 লাউবাড়িয়া, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া।

 

[1]. আল-মুনজিদ ফিল লুগাহ ওয়াল-আ‘লাম (দারুল মাশরিক, বৈরূত) পৃ. ৩১৬।

[2]. হাকেম হা/৭৮৪৬; ছহীহাহ হা/১১৫৭; মিশকাত হা/৫১৭৪।

[3]. বুখারী হা/৭১৩৮; মিশকাত হা/৩৫।

[4]. তিরমিযী হা/২৪১৬; মিশকাত হা/৫১৯৭; ছহীহাহ হা/৯৪৬।

[5]. মুসলিম হা/১৪২।

[6]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/১৭৭৯।

[7]. মুসলিম হা/২৫৮১।

[8]. মুসলিম হা/১২১৮।

[9]. মুছান্নাফ আবদুর রাযযাক, হা/২০৭০২; দারাকুৎনী, আল-মু‘তালাফ ওয়াল মুখতালাফ, ১/৯২।

[10]. ইমাম আহমাদ, কিতাবুয যুহদ হা/৬৪৬, মাক্বরীযী, আল-খুত্বাত্ব ১/৩০৮।

[11]. ইবনুল জাওযী, তারীখু ওমর, ৮৯ পৃ.।

[12]. ইবনুল ক্বাইয়িম, ই‘লামুল মুওয়াক্কেঈন ২/১২৩; ছিফাতুছ ছাফওয়াহ ১/২০৩।

[13]. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া ১/৫৩।

[14]. সীরাতে ওমর বিন আব্দুল আযীয ১৩৭-৩৮ পৃ.।

[15]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১২/১৫০-৫১।






ছিয়ামের ফাযায়েল ও মাসায়েল
নেতৃত্বের মোহ (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
পরকীয়া : কারণ ও প্রতিকার (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৪র্থ কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
হজ্জ সফর (২য় কিস্তি) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
হজ্জ : গুরুত্ব ও ফযীলত - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
হারাম দৃষ্টিপাতের ভয়াবহতা - সুরাইয়া বিনতে মামূনুর রশীদ
আদর্শ সমাজ গঠনে সালামের ভূমিকা - মুহাম্মাদ মাইনুল ইসলাম
পুলছিরাত : আখেরাতের এক ভীতিকর মনযিল - আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ
ইসলামে পোশাক-পরিচ্ছদ : গুরুত্ব ও তাৎপর্য - মুহাম্মাদ আবু তাহের, পরিচালক, কিউসেট ইনস্টিটিউট, সিলেট।
ইসলামে ভ্রাতৃত্ব (২য় কিস্তি) - ড. এ এস এম আযীযুল্লাহ
তালাক সংঘটিত হওয়ার কারণ ও প্রতিকারের উপায় (ফেব্রুয়ারী’২২ সংখ্যার পর) - মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম
আরও
আরও
.