ভূমিকা :

প্রতিযোগিতা মানব স্বভাবের এক সহজাত বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে আমরা প্রতিনিয়ত কত কিছুর পেছনেই না মরিয়া হয়ে ছুটছি! একজন উদ্যোক্তা চাইছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে টপকে বাজারের শীর্ষস্থান দখল করতে, একজন স্বপ্নবাজ ছাত্র চাইছে সহপাঠীদের পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ ফলাফল নিজের ঝুলিতে পুরতে। একজন পেশাজীবী দিন-রাত এক করে ফেলছেন কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতির আশায়, আবার একজন গৃহিণী হয়তো চাইছেন অন্যের চেয়ে নিজের সংসারটিকে আরেকটু বেশী জাঁকজমকপূর্ণ করে সাজাতে। পার্থিব এই প্রতিযোগিতার যেন কোন শেষ নেই। ক্ষণভঙ্গুর এই দুনিয়ার পেছনে অন্তহীন ছুটে চলার এই দৌড় দিনশেষে একবুক ক্লান্তি আর শূন্যতা ছাড়া আমাদের আর কিছুই দেয় না। অথচ একজন মুমিনের ভাবনার দিগন্ত কেবল এই ক্ষুদ্র দুনিয়াতে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর বুকের গহীনে লুক্কায়িত থাকে অনন্ত আখেরাতের এক বিশাল ক্যানভাস। ইসলাম মানব মনের এই সহজাত প্রতিযোগিতা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে আখেরাতমুখী করতে অনুপ্রাণিত করে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হ’তে উৎসাহিত করে। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা সেই প্রতিযোগিতার স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

১. নেকীর কাজে প্রতিযোগিতা বলতে কি বুঝায় :

নেকীর কাজে প্রতিযোগিতার অর্থ হ’ল সর্বদা নেক আমল সম্পাদনে তৎপর থাকা, ভালো কাজের সুযোগ উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে কালক্ষেপণ না করে লুফে নেওয়া এবং আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অন্যকে প্রতিনিয়ত ছাড়িয়ে যাওয়ার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো। সুতরাং নেকীর কাজে প্রতিযোগিতা কেবল অন্য মানুষের সাথে পাল্লা দেওয়ার নাম নয়; বরং এর সিংহভাগই হ’ল নিজের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি ও অলস নফসের সাথে এক অবিরাম লড়াই। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে নেক আমলে এই প্রতিযোগিতা ও অগ্রগামিতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য মূলত ৫টি পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে- (১) আল-মুনাফাসাহ (الـمُنَافَسَةُ), (২) আল-মুসাবাক্বাহ (الـمُسَابَقَةُ), (৩) আল-মুসারা‘আহ (الـمُسَارَعَةُ), (৪) আল-ইস্তিবাক্ব (الاِسْتِبَاقُ) এবং (৫) আল-মুবাদারাহ (الـمُبَادَرَةُ)। নিম্নে এই পরিভাষাগুলোর পরিচয় বিস্তারিত তুলে ধরা হ’ল।-

১. আল-মুনাফাসা (الـمُنَافَسَةُ) :

‘আল-মুনাফাসাহ’ শব্দটির মূল ব্যুৎপত্তি এমন এক অভ্যন্তরীণ

অনুভূতির দিকে ইঙ্গিত করে, যা মানুষকে অত্যন্ত মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ জিনিস পাওয়ার জন্য ব্যাকুল করে তোলে। ভাষাবিদ ও মুহাদ্দিছ আবূ আব্দুল্লাহ আল-হুমাইদী (মৃ. ৪৮৮ হি./১০৯৫ খ্রি.) বলেন,الْمُنَافَسَةُ: الرَّغْبَةُ فِي الشَّيْءِ وَالْحِرْصُ عَلَيْهِ، ‘আল-মুনাফাসাহ হ’ল- কোন বিষয়ের প্রতি গভীর আগ্রহ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা’।[1] আবূ সুলায়মান আল-খাত্ত্বাবী (৩১৮-৩৮৮ হি./৯৩০-৯৯৮ খ্রি.) বলেন,شِدَّةُ الرَّغْبَة، ‘প্রবল আগ্রহ বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা’।[2]

অর্থাৎ যখন আল্লাহর নৈকট্য অর্জন এবং জান্নাতের মেহমান হওয়ার জন্য বান্দার অন্তরে এক তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হয়, সেটিই হ’ল আল-মুনাফাসা। আল্লাহ বলেন,إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ، عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ، تَعْرِفُ فِي وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ النَّعِيمِ، يُسْقَوْنَ مِنْ رَحِيقٍ مَخْتُومٍ، خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ، ‘নিশ্চয়ই নেককারগণ থাকবে জান্নাতে। উচ্চাসনে বসে তারা অবলোকন করবে। তুমি তাদের চেহারাসমূহে দেখবে স্বাচ্ছন্দ্যের প্রফুল্লতা। তাদেরকে পান করানো হবে মোহরাংকিত বিশুদ্ধ পানীয়। যার মোহর হবে মিশকের। আর এরূপ বিষয়েই প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত’ (মুত্বাফফিফীন-মাক্কী ৮৩/২২-২৬)। অত্র আয়াতের তাফসীরে মুহাম্মাদ জামালুদ্দীন ক্বাসেমী (১২৮৩-১৩৩২ হি./১৮৬৬-১৯১৪ খ্রি.) বলেন,فَلْيَرْغَبِ الرَّاغِبُونَ بِالِاسْتِبَاقِ إِلَى طَاعَةِ اللهِ تَعَالَى، ‘অতএব আগ্রহীদের উচিত মহান আল্লাহর আনুগত্যের পানে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করা’।[3]

এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সৌন্দর্যময় দিক হ’ল পার্থিব প্রতিযোগিতার মতো এতে অন্যের প্রতি কোন হিংসা, ক্ষতিসাধন বা শত্রুতার স্থান নেই। ইমাম রাগেব আল-ইছফাহানী (মৃ. ৫০২ হি./১১০৮ খ্রি.) বলেন,وَالـمُنَافَسَةُ: مُجَاهَدَةُ النَّفْسِ للتشبه بالأفاضلِ، واللُّحُوقِ بهم من غير إِدْخال ضَرَرٍ على غيرِه، ‘আল-মুনাফাসাহ (প্রতিযোগিতা) হ’ল অন্য কারো কোন ক্ষতিসাধন না করে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের সাদৃশ্য অর্জনে এবং তাঁদের সমকক্ষ হওয়ার উদ্দেশ্যে আত্মপ্রচেষ্টা চালানো।[4] 

মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (১৩৪৭-১৪২১ হি./১৯২৯-২০০১ খ্রি.) বলেন,الْمُنَافَسَةُ فِي الْخَيْرِ هِيَ الْمُسَابَقَةُ إِلَى طَاعَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ وَإِلَى مَا يُرْضِي اللَّهَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى، وَالْبُعْدُ عَمَّا يُسْخِطُ اللهَ، ‘কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা (আল-মুনাফাসাহ) হ’ল মহা পরাক্রমশালী ও সুমহান আল্লাহর আনুগত্যের দিকে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সন্তুষ্টির পানে দ্রুত অগ্রগামী হওয়া, আর আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে এমন যাবতীয় বিষয় থেকে দূরে থাকা’।[5]

সমাজ ও চারপাশের চাকচিক্য দেখে অনেক সময়ই আমরা নিজেদের ছোট মনে করি। কোন উদ্যোক্তা বন্ধু যখন ব্যবসায় সফল হয়ে নতুন মডেলের গাড়ি নিয়ে আমাদের কারো পাশ দিয়ে চলে যায়, তখন তার মনে হ’তে পারে- আমি হয়ত পিছিয়ে পড়লাম। কিন্তু না! তখন সেই বান্দার করণীয় হ’ল নেক আমলে তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে আইয়ূব সাখতিয়ানী (৬৮-১৩১হি.) বলেন,‌إِذَا ‌رَأَيْتَ ‌الرَّجُلَ ‌يُنَافِسُ فِي الدُّنْيَا، فَنَافِسْهُ فِي الْآخِرَةِ، ‘যখন তুমি কাউকে দুনিয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে, তখন তুমি তার সাথে আখেরাত নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে’।[6] সুতরাং আপনার সহকর্মী হয়তো অনেক টাকা খরচ করে দামী রেস্টুরেন্টে খাচ্ছে, আপনি তখন মুছাল্লায় দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে একটি জান্নাতের ঘর চেয়ে নিন। আপনার দুনিয়াবী অর্জন হয়তো কম হ’তে পারে, কিন্তু আপনার অন্তরের এই ‘মুনাফাসা’ বা তীব্র ব্যাকুলতাই আপনাকে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় করে তুলতে পারে।

২. আল-মুসাবাক্বা (الـمُسَابَقَةُ) :

‘মুসাবাক্বাহ’ হ’ল ময়দানে ঘোড়দৌড়ের মতো দ্রুত গতিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে সামনের দিকে ধাবিত হওয়া। দুনিয়ার দৌড়ে মানুষ পদক বা ট্রফির দিকে ছোটে, কিন্তু মহান আল্লাহ মুমিনকে এমন এক দৌড়ে ডাক দিয়েছেন যার শেষ সীমানায় রয়েছে জান্নাত। ইবনু আশূর (১২৯৬-১৩৯৩ হি./১৮৭৯-১৯৭৩ খ্রি.) বলেন, الْمُسَابَقَة كِنَايَةٌ عَنِ الْمُنَافَسَةِ ‘আল-মুসাবাক্বাহ হ’ল আল-মুনাফাসাহ-এর একটি রূপক বা ইঙ্গিতবাহী শব্দ’।[7] অর্থাৎ আমাদের অন্তরের নেক আমল করার সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষাটি যখন বাস্তব কাজে বা দৌড়ে রূপ নেয়, সেটাই মুসাবাক্বা।

মহান আল্লাহ বান্দাদের সেই প্রতিযোগিতায় শরীক হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন,سَابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللهِ وَرُسُلِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ، ‘তোমরা প্রতিযোগিতা কর তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে। যার প্রশস্ততা আকাশ ও পৃথিবীর প্রশস্ততার ন্যায়। যা প্রস্ত্তত করা হয়েছে ঐসব লোকদের জন্য, যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে আল্লাহ ও তার রাসূলগণের উপর। যেটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি এটা দান করেন, যাকে তিনি চান। বস্ত্ততঃ আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী (হাদীদ-মাদানী ৫৭/২১)। অত্র আয়াতের তাফসীরে ইমাম শাওকানী (১১৭৩-১২৫০ হি./১৭৫৯-১৮৩৪ খ্রি.) বলেন,سَارِعُوا مُسَارَعَةَ السَّابِقِينَ بِالْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ الَّتِي تُوجِبُ الْمَغْفِرَةَ لَكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ، وَتُوبُوا مِمَّا وَقَعَ مِنْكُمْ مِنَ الْمَعَاصِي، ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা অবধারিতকারী নেক আমলসমূহের মাধ্যমে অগ্রগামীদের ন্যায় দ্রুত ধাবিত হও, আর তোমাদের দ্বারা সংঘটিত যাবতীয় পাপকাজ থেকে তওবা করো’।[8]

একটু ভাবুন তো! অফিসে বসের সাথে কোন কারণে আপনার ভুল বোঝাবুঝি হ’ল। চাকরী বাঁচাতে আপনি কি চুপ করে বসে থাকবেন? নাকি কালক্ষেপণ না করে সাথে সাথে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করবেন? আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কটা কি তার চেয়েও কোটি গুণ বেশী গুরুত্বপূর্ণ নয়?

পবিত্র কুরআনে ঈমানদারদের আমলের ওপর ভিত্তি করে তাদেরকে তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ، ‘অতঃপর আমরা কিতাবের অধিকারী করলাম আমাদের বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যাদেরকে আমরা মনোনীত করেছি। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ হ’ল নিজের উপর অত্যাচারী। কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কেউ আল্লাহর অনুমতিক্রমে কল্যাণ কর্মসমূহে অগ্রগামী। যেটি হ’ল মহা অনুগ্রহ’ (ফাত্বির-মাক্কী ৩৫/৩২)।

আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,السَّابِقُ بِالْخَيْرَاتِ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِغَيْرِ حِسَابٍ، وَالْمُقْتَصِدُ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِرَحْمَةِ اللهِ وَالظالِمُ لِنَفْسِهِ وَأَصْحَابُ الْأَعْرَافِ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ بِشَفَاعَةِ مُحَمَّدٍ، ‘সৎকাজে অগ্রগামী ব্যক্তি বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে; মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী আল্লাহর রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর নিজের ওপর অবিচারকারী (গোনাহগার মুমিন) এবং আ‘রাফবাসী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শাফা‘আতের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[9] মূলত অত্র আয়াতে মহান আল্লাহ ঈমানের তিনটি স্তর উল্লেখ করেছেন।

(ক) সর্বনিম্ন স্তর (ظَالِمٌلِنَفْسِهِ) : যারা ঈমানদার হওয়া সত্ত্বেও অবহেলাবশত কিছু ওয়াজিব ত্যাগ করেন এবং কাবীরা গোনাহে জড়িয়ে পড়েন, তবে কুফরী বা বড় শিরকে লিপ্ত হন না। গোনাহগার হ’লেও ঈমান থাকার কারণে চূড়ান্ত বিচারে তারা আল্লাহর করুণা ও মাগফিরাতের অধিকারী এই স্তরের বান্দাদেরকে ত্রুটিপূর্ণ মুসলিম, ফাসেক্ব ও ফাজের বলা হয়।

(খ) মধ্যম স্তর (الْمُقْتَصِدُ) : যারা ফরয ইবাদতের অতিরিক্ত নফল-সুন্নাতে তেমন যত্নবান নন বা ছোটখাটো মাকরূহ এড়িয়ে চলেন না, তবে ইসলামের মৌলিক ফরয-ওয়াজিব বিধানগুলো রক্ষা করেন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকেন। এই স্তরের বান্দাদের মুমিন বা মুসলিম বলা হয়।

(গ) সর্বোচ্চ স্তর (سَابِقٌبِالْخَيْرَاتِ) : যারা ফরয-ওয়াজিবের পাশাপাশি নফল-মুস্তাহাবও পুরোপুরি পালন করেন এবং হারামসহ সব ধরনের মাকরূহ ও সন্দেহজনক বিষয় কঠোরভাবে এড়িয়ে চলেন। এই স্তরের বান্দাদের মুহসিন বলা হয়। এটা নবী-রাসূল, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ছাহাবায়ে কেরাম, ছিদ্দীক্ব ও শহীদদের স্তর। যেমন আল্লাহ বলেন, وَالسَّابِقُونَ السَّابِقُونَ، أُولَئِكَ الْمُقَرَّبُونَ، فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ، ‘আর অগ্রভাগের লোকেরা। তারা তো অগ্রবর্তীই। তারাই হ’ল নৈকট্যশীল। তারা থাকবে নে‘মতপূর্ণ জান্নাত সমূহে’ (ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/১০-১২)।

ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফদের জীবনে এই অগ্রগামী হওয়ার প্রতিযোগিতার বহু নযীর রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ হ’ল ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদেরকে দান-ছাদাক্বাহ করার নির্দেশ দিলেন। তখন কাকতালীয়ভাবে আমার নিকট কিছু ধন-সম্পদ ছিল। আমি (মনে মনে) বললাম, الْيَوْمَ أَسْبِقُ أَبَا بَكْرٍ إِنْ سَبَقْتُهُ يَوْمًا، ‘আবূবকরকে যদি কোন দিন অতিক্রম করতে পারি, তবে আজই আমি তাকে অতিক্রম করব’। তিনি বলেন, ফলে আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে আসলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? আমি বললাম, অনুরূপ (অর্ধেক) সম্পদ। আর আবুবকর তাঁর নিকট যা ছিল তার সমুদয় সম্পদ নিয়ে আসলেন। রাসূল (ছাঃ) বললেন, ‘হে আবূবকর! তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ?’ তিনি বললেন,أَبْقَيْتُ لَهُمُ اللهَ وَرَسُولَهُ، ‘তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি’। তখন আমি (মনে মনে) বললাম, لَا أَسْبِقُهُ إِلَى شَيْءٍ أَبَدًا ‘আমি কখনোই কোন বিষয়ে তাঁর চেয়ে অগ্রগামী হ’তে পারব না’।[10]

অন্য বর্ণনায় ওমর (রাঃ) বলেন,وَلَا وَاللهِ مَا سَابَقْتُهُ إِلَى خَيْرٍ قَطُّ إِلَّا سَبَقَنِي، ‘আল্লাহর কসম! আমি কখনোই কোন কল্যাণকর কাজে তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইনি, যাতে তিনি আমার চেয়ে অগ্রগামী হননি’।[11] ছাহাবায়ে কেরাম কিভাবে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেক। এই একটা ঘটনাই তা বোঝার জন্য যথেষ্ট। দুনিয়ার কোন সম্পদ জমানোর প্রতিযোগিতা তাদের ছিল না। ছিল কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য প্রতিযোগিতা। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন,وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ، ‘প্রথম দিকের মুহাজির ও আনছারগণ এবং পরে যারা তাদের অনুসারী হয়েছে নিষ্ঠার সাথে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য প্রস্ত্তত রেখেছেন জান্নাত, যার তলদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর এটাই হ’ল মহা সফলতা’ (তওবা ৯/১০০)।

৩. আল-মুসারা‘আহ (الـمُسَارَعَةُ)

‘মুসারা‘আহ’ শব্দের মূল অর্থ হ’ল জড়তা ঝেড়ে ফেলে ক্ষিপ্রতার সাথে কোন লক্ষ্য পানে ধাবিত হওয়া। প্রখ্যাত ভাষাবিদ মুরতাযা আয-যুবাইদীর (১১৩২-১২০৫ হি./১৭২০-১৭৯১ খ্রি.) বলেন,الـمُسارَعة: الـمُبادَرَةُ إِلَى الشيءِ، ‘আল-মুসারা‘আহ অর্থ হ’ল কোন বিষয়ের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া’।[12] অর্থাৎ নেক আমল ও কল্যাণের পথে কালক্ষেপণ না করে ক্ষিপ্রগতিতে অগ্রগামী হওয়াই হ’ল মুসারা‘আহ।

পার্থিব জীবনে আমাদের ঘর-বাড়ীতে হঠাৎ আগুন লেগে গেলে আমরা যেমন জীবন বাঁচাতে তৎক্ষণাৎ ক্ষিপ্রতার সাথে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটে যাব। ঠিক তেমনি গোনাহের আগুন থেকে বাঁচতে এবং জান্নাতের পথে অগ্রসর হ’তে মহান আল্লাহ এই ক্ষিপ্রতার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ، ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও। যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীন পরিব্যপ্ত। যা প্রস্ত্তত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য’ (আলে ইমরান ৩/১৩৩)। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনু জুবাইর (৪৬-৯৫হি.) এই আয়াতের তাফসীরে বলতেন, سَارِعُوا بِالْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ، ‘তোমরা নেক আমল সমূহের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে দ্রুত ধাবিত হও’।[13]

আলী (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে, এই আয়াতে ক্ষমার দিকে ধাবিত হওয়া বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘ফরয ইবাদত সম্পাদনে এবং তাকবীরে তাহরীমার সাথে ফরয ছালাত আদায়ের ব্যাপারে দ্রুত ধাবিত হওয়া’।[14] যে ব্যবসায়ী আযান শোনার সাথে সাথে মসজিদের দিকে ছুটে যান, কোন পাপ হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা-ইস্তিগফার করে নিজেকে শুধরে নেন, কোন নেক আমলের সুযোগ লাভের সাথে সাথে সেটা করে ফেলেন, যে গৃহিনী আযানের ডাক শোনা মাত্র সংসারের যাবতীয় কাজ ফেলে রেখে মুছাল্লাতে দাঁড়িয়ে যেতে পারেন, তারাই হ’লেন সেই সৌভাগ্যবান বান্দা, যারা ‘মুসারা‘আহ’-এর ডাকে সাড়া দেন।

শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, পারিবারিক জীবনেও মুসারা‘আহ-এর চর্চা থাকা চাই। যেমনটি ছিল নবী যাকারিয়া (আঃ)-এর পরিবারে। আল্লাহ বলেন,وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ، فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَى وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ، ‘আর (স্মরণ কর) যাকারিয়ার কথা। যখন সে তার প্রতিপালককে আহবান করে বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে একাকী (নিঃসন্তান) ছেড়ে দিয়ো না। আর তুমিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী। অতঃপর আমরা তার দো‘আ কবুল করলাম এবং তাকে দান করলাম ইয়াহইয়াকে। আর গর্ভধারণের জন্য তার স্ত্রীকে সক্ষম করে দিলাম। তারা সর্বদা সৎকর্মে অগ্রণী থাকত। তারা আকাংঙ্ক্ষা ও ভীতির সাথে আমাদের আহবান করত। আর তারা ছিল আমাদের প্রতি বিনীত (আম্বিয়া-মাক্কী ২১/৮৯-৯০)। একটু লক্ষ্য করুন, সন্তান না হওয়ার মতো এত বড় একটা মানসিক কষ্টের মাঝে থেকেও তাঁরা স্বামী-স্ত্রী নেক আমলে বিন্দুমাত্র পিছিয়ে যাননি, বরং সৎকর্মে তাঁরা ছিলেন অগ্রণী! আজ আমাদের পরিবারগুলোতে একটু অভাব বা বিপদ এলেই আমরা হতাশ হয়ে ইবাদত কমিয়ে দিই। অথচ আমাদের উচিত ছিল স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে

একে অপরকে দ্বীনের পথে এগিয়ে নেওয়া।

৪. আল-ইস্তিবাক্ব (الاِسْتِبَاقُ) :

‘আল-ইস্তিবাক্ব’ পরিভাষাটি মুমিনদের এক যৌথ উদ্দীপনাকে নির্দেশ করে, যেখানে প্রত্যেকেই তার অবস্থান থেকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যে একে অন্যকে ছাড়িয়ে সেরা হওয়ার সাধনায় রত থাকেন। আল্লাহ বলেন,وَلِكُلٍّ وِجْهَةٌ هُوَ مُوَلِّيهَا فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ أَيْنَ مَا تَكُونُوا يَأْتِ بِكُمُ اللَّهُ جَمِيعًا إِنَّ اللهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، ‘আর প্রত্যেকের জন্য রয়েছে ক্বিবলা, যেদিকে সে ইবাদতকালে মুখ ফিরায়। কাজেই তোমরা সৎকর্ম সমূহে প্রতিযোগিতা কর। যেখানেই তোমরা থাক না কেন, আল্লাহ তোমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান’ (বাক্বারাহ ২/১৪৮)।

আল্লামা কুরতুবী (রহঃ) বলেন, فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ-এর অর্থ হ’ল- سَارِعُوا إِلَى الطََّاعَاتِ، ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্যমূলক সৎকাজে দ্রুত ধাবিত হও’।[15] হাফেয ইবনু কাছীর (১৩০১-১৩৭৩ খ্রি.) বলেন, এর অর্থ হ’ল- الْمُسَارَعَة إِلَى الْخَيْرَاتِ وَالْمُبَادِرَة إِلَيْهَا، ‘কল্যাণকরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া এবং সেগুলোর প্রতি অবিলম্বে অগ্রণী হওয়া’।[16] ইমাম জালালুদ্দীন মাহাল্লী (মৃ. ১৪৫৯ খ্রি.) এর তাফসীরে বলেন, بَادِرُوا إلَى الطَّاعَاتِ ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের পানে দ্রুত ধাবিত হও’।[17]

একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে। ধরুন! একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তার ক্যাম্পাসে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে আছে, হঠাৎ যোহরের আযান হ’ল । সে আড্ডা ছেড়ে সবার আগে মসজিদের দিকে পা বাড়াল। অন্যদিকে একজন মা, যিনি হয়তো তখন রান্নাঘরে তীব্র গরমের মাঝে পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করছেন এবং মুখে অবিরাম ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ যিকির চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দু’জন ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে থেকেও নিজ নিজ জায়গা থেকে ‘আল-ইস্তিবাক্ব’ বা জান্নাতের প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছেন।

আমাদের জীবনের পরীক্ষাগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন ব্যবসায়ীকে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার সম্পদের হালাল-হারাম দিয়ে, আর একজন চাকরিজীবীকে পরীক্ষা করা হচ্ছে তার দায়িত্ববোধ ও সততা দিয়ে। আল্লাহ চাইলে সবাইকে এক রকম বানাতে পারতেন, কিন্তু তিনি বৈচিত্র‍¨ দিয়েছেন কেবল আমাদের পরীক্ষা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا وَلَوْ شَاءَ اللهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَكِنْ لِيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ إِلَى اللهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ، ‘আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে তিনি এক দলভুক্ত করে দিতেন। কিন্তু তিনি চান তোমাদেরকে যে বিধানসমূহ দিয়েছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা নিতে। অতএব তোমরা আল্লাহর আনুগত্যের কর্মসমূহে প্রতিযোগিতা কর। (মনে রেখ) আল্লাহর নিকটেই তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন স্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন যেসব বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে’ (মায়েদা-মাদানী ৫/৪৮)। এই আয়াতের মর্মার্থ হ’ল- আপনি আপনার ময়দানে সেরাটা দিন। একজন উদ্যোক্তা তার ব্যবসার মাধ্যমে হালাল রিযিক উপার্জনের পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থান করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবেন। একজন নারী তার পর্দা, শালীনতা ও মমতা দিয়ে পরিবারকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হবেন। প্রত্যেকেই তার নিজস্ব ট্র‍¨vকে দৌড়াবে, কিন্তু সবার গন্তব্য হবে একটাই। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত।

৫. আল-মুবাদারাহ (الـمُبَادَرَةُ)

‘মুবাদারাহ’ পরিভাষাটির মূল অর্থ হ’ল এমন ক্ষিপ্রতা, যেখানে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পূর্বেই মানুষ বিদ্যুৎবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আল্লামা শারফুদ্দীন ত্বীবী (মৃ. ৭৪৩ হি./১৩৪৩ খ্রি.) বলেন,الْمُبَادَرَةُ الْمُسَارَعَةُ بِإِدْرَاكِ الشَّيْءِ قَبْلَ فَوَاتِهِ، ‘আল-মুবাদারাহ হ’ল- কোন কিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা অর্জনে দ্রুত ধাবিত হওয়া’।[18] 

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই একেকটি সুযোগ। একজন গবেষক বা শিক্ষক যখন কুরআন ও সুন্নাহ থেকে নতুন কোন ইলম বা জ্ঞান অর্জন করেন, তখন তা ডায়রীতে লিখে রাখার পাশাপাশি সাথে সাথে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করাটাই হ’ল মুবাদারাহ। যৌবনের শক্তি, সুস্থতা কিংবা অবসর- এগুলো যেকোন সময় ফুরিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময় আসবে, যখন ঈমান ধরে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে। সেই ভয়ংকর সময়ের সতর্কবার্তা দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,بَادِرُوا بِالأعْمَال فتنًا كقطَعِ اللَّيْلِ المُظْلِمِ، يُصْبحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا، وَيُمْسِي مُؤمِنًا ويُصْبِحُ كَافِرًا، يَبيعُ دِينَهُ بعَرَضٍ مِنَ الدُّنيا، ‘অন্ধকার রাতের টুকরো সমূহের মত (যা একটার পর একটা আসতে থাকে এমন) ফিৎনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন হ’লে বিকালে কাফের হয়ে যাবে। বিকালে মুমিন হ’লে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে বসবে’।[19]

অত্র হাদীছের ব্যাখ্যায় ইমাম ছান‘আনী (১০৯৯-১১৮২ হি./১৬৮৭-১৭৬৯ খ্রি.) বলেন, سَابِقُوا بِالْأَعْمَالِ الصَّالِحَاتِ هَذِهِ الْفِتَنَ فَإِنَّهَا إِذَا وَقَعَتْ كَانَ فِيهَا شُغْلٌ شَاغِلٌ عَنِ الْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ، ‘তোমরা নেক আমল সম্পাদনের মাধ্যমে এই ফিৎনাসমূহের ওপর অগ্রগামী হও; কেননা সেগুলো যখন আবির্ভূত হবে, তখন নেক আমল থেকে গাফেলকারী এমন প্রচন্ড ব্যস্ততা নেমে আসবে (যা আমল করতে বাধা দেবে)’।[20] ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি./১২৩৩-১২৭৭ খ্রি.) বলেন, ‘হাদীছটির মর্মার্থ হ’ল নেক আমল অসম্ভব হয়ে পড়ার পূর্বে এবং চাঁদবিহীন ঘোর অন্ধকার রাতের পুঞ্জীভূত অন্ধকারের ন্যায় একের পর এক উপচে পড়া ও ব্যস্ততায় ফেলে দেওয়া ফিৎনাসমূহে জড়িয়ে পড়ার আগেই সৎকাজে দ্রুত অগ্রণী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা’।[21]

অতএব নেকীর কাজে প্রতিযোগিতার অর্থ হ’ল আল্লাহর আনুগত্যে আগ্রগামী থাকা, নেক আমলের সুযোগ লাভের সাথে সাথে তা সম্পাদন করা, পাপের পর দ্রুত তওবা করা, কোন জ্ঞান অর্জিত হ’লে সাথে সাথে সেটার প্রতি আমল করা, আযান শোনা মাত্রই ছালাতের প্রস্ত্ততি নেওয়া, সময়মত আউয়াল ওয়াক্তে ছালাত আদায় করা, জামা‘আতের প্রথম কাতারে ছালাত আদায়ের চেষ্টা করা, সব সময় নেক আমলের সুযোগ খোঁজা, আগেভাগে সালাম দেওয়া, মুসলিম ভাইয়ের সাথে মনোমালিন্য হ’লে আগে নিজেই সংশোধন করে নেওয়া, মানুষের খেদমত এবং তাদের সেবায় সবার আগে অগ্রণী হওয়া ইত্যাদি। [ক্রমশ:]

*শিক্ষক, আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী।


[1]. মুহাম্মাদ ইবনু ফুতূহ আল-হুমাইদী আল-আযদী, তাফসীরু গারীবি মা ফিছ ছহীহাইন আল-বুখারী ওয়া মুসলিম, তাহক্বীক্ব: ড. যুবাইদাহ মুহাম্মাদ সাঈদ আব্দুল আযীয (কায়রো: মাকতাবাতুস সুন্নাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১৫ হি./১৯৯৫ খ্রি.), পৃ. ১৮৯।

[2]. আবূ সুলায়মান হামাদ আল-খাত্ত্বাবী আল-বুস্তী, গারীবুল হাদীছ, তাহক্বীক্ব: আব্দুল কারীম ইবরাহীম আল-গারবাওয়ী ও অন্যান্য (বৈরূত: দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৪০২ হি./১৯৮২ খ্রি.), ২/৩১।

[3]. মুহাম্মাদ জামালুদ্দীন ক্বাসিমী, মাহাসিনুত তা’বীল (তাফসীরুল ক্বাসিমী), তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ বাসিল উয়ূন আস-সূদ (বৈরূত: দারুল কুতুবিল-ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১৮ হি.), ৯/৪৩৪।

[4]. রাগেব আল-ইছফাহানী, আল-মুফরাদাতু ফী গারীবিল কুরআন, তাহক্বীক্ব: ছাফওয়ান আদনান আদ-দাঊদী (দামেস্ক ও বৈরূত: দারুল ক্বলম ও আদ-দারুশ শামিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৪১২ হি.), পৃ. ৮১৮।

[5]. মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন, তাফসীরু জুযই আম্মা, (রিয়াদ: দারুছ ছুরাইয়া লিন-নাশরি ওয়াত তাওযী‘, ২য় সংস্করণ, ১৪২৩ হি./২০০২ খ্রি.), পৃ. ১০৫।

[6]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, ৭/১৮৮।

[7]. মুহাম্মাদ ত্বাহির ইবনু আশূর, আত-তাহরীর ওয়াত তানবীর (তিউনিসিয়া: আদ-দারুত তিউনিসিয়্যাহ লিন-নাশর, ১৯৮৪ খ্রি.), ২৭/৪০৭।

[8]. মুহাম্মাদ ইবনু আলী আশ-শওকানী আল-ইয়ামানী, ফাতহুল কাদীর (দামেস্ক ও বৈরূত: দারু ইবনিল কাছীর ও দারুল কালিমিত ত্বইয়েব, ১ম প্রকাশ, ১৪১৪ হি.), ৫/২১০।

[9]. ত্বাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর হা/১১৬৬২; তাফসীরে ইবনে কাছীর ৬/৫৪৭।

[10]. আবূ দাঊদ হা/১৬৭৮; তিরমিযী হা/৩৬৭৫; মিশকাত হা/৬০২১, সনদ হাসান।

[11]. আহমাদ হা/১৭৫; ছহীহ ইবনে খুযাইমাহ হা/১১৫৬, সনদ ছহীহ।

[12]. মুরতাযা আয-যাবীদীর, তাজুল আরূস মিন জাওয়াহিরিল কামূস, (কুয়েত: দারুল হিদায়া, তা.বি), ২১/১৯২।

[13]. জালালুদ্দীন সুয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খ্রি.), আদ-দুর্রুল মানসূর ফী তাফসীরিল মা’ছুর (বৈরূত: দারুল ফিকর, তা.বি), ২/৩১৪।

[14]. তাফসীরে কুরতুবী ৪/২০৩।

[15]. তাফসীরে কুরতুবী ৬/২১১।

[16]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/১৩০।

[17]. জালালুদ্দীন সুয়ূত্বী ও জালালুদ্দীন মাহাল্লী, তাফসীরুল জালালাইন (কায়রো: দারুল হাদীছ, ১ম প্রকাশ), পৃ. ৩০।

[18]. শারফুদ্দীন আত-ত্বীবী, আল-কাশিফু ‘আন হাক্বাইক্বিস সুনান, তাহক্বীক্ব: ড. আব্দুল হামীদ হিন্দাবী (রিয়াদ: মাকতাবাতু নিযার মুছত্বফা আল-বায, ১ম প্রকাশ, ১৪১৮ হি./১৯৯৭ খ্রি.), ১১/৩৪০৬।

[19]. মুসলিম হা/১১৮; তিরমিযী হা/১৯৫।

[20]. মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আছ-ছান‘আনী (১০৯৯-১১৮২ হি./১৬৮৭-১৭৬৯ খ্রি.), আত-তানবীর শারহুল জামি‘ইছ ছগীর, (রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ১ম প্রকাশ, ১৪৩২ হি./২০১১ খ্রি.), ৪/৫২৬।

[21]. মুহিউদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নববী, আল-মিনহাজ শারহু ছহীহ মুসলিম বিন আল-হাজ্জাজ (বৈরূত: দারু ইহইয়ায়িত তুরাছিল আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯২ হি.), ২/১৩৩।






আমানত (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
আহলেহাদীছ জামা‘আতের বিরুদ্ধে কতিপয় মিথ্যা অপবাদ পর্যালোচনা (৪র্থ কিস্তি) - তানযীলুর রহমান - শিক্ষক, বাউটিয়া দাখিল মাদ্রাসা, রাজশাহী
নেতৃত্বের মোহ (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈমান (২য় কিস্তি) - হাফেয আব্দুল মতীন - পিএইচ.ডি গবেষক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ : আত্মশুদ্ধির সোপান ও প্রশান্তির চাবিকাঠি - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত (৬ষ্ঠ কিস্তি) - মুযাফফর বিন মুহসিন
মাদ্রাসার পাঠ্যবই সমূহের অন্তরালে (৮ম কিস্তি) - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
রামাযান মাসের গুরুত্ব, ফযীলত ও প্রয়োজনীয় মাসায়েল - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
মুসলিম নারীর পর্দা ও চেহারা ঢাকার অপরিহার্যতা (শেষ কিস্তি) - আত-তাহরীক ডেস্ক
মুমিন কিভাবে দিন অতিবাহিত করবে (২য় কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মুসলিম সমাজে মসজিদের গুরুত্ব (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
আরও
আরও
.