ভূমিকা :

রাতের নিকষ কালো অাঁধার পেরিয়ে যখন ফজরের স্নিগ্ধ আলো পৃথিবীর বুকে উঁকি দেয়, তখন সমগ্র প্রকৃতি যেন এলাহী প্রশান্তির আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয় মুয়ায্যিনের সুমধুর আহবান। যারা নিদ্রার কোমলতা, ভোরের নীরবতা, আর দেহের অলসতাকে পদদলিত করে আযানের আহবানে সাড়া দেন এবং ফজরের জামা‘আতে শামিল হয়ে আল্লাহর দরবারে হাযিরা দেন, তারা যেন প্রতিটি প্রভাতে নিজেদের ঈমানকে নবরূপে জাগিয়ে তোলেন। জীবনকে বরকত ও রহমতের ফল্গুধারায় সিক্ত করেন। কিন্তু বড়ই আক্ষেপ ও বেদনার বিষয় হ’ল, আধুনিক সভ্যতার এই যুগে আমাদের অনেকের কাছে এই ফজরের ছালাতই যেন সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে উপেক্ষিত ইবাদতে পরিণত হয়েছে। ফলে আমরা হারাচ্ছি আত্মিক প্রশান্তি, বরকতের প্রাচুর্য, স্বাস্থ্যগত নানাবিধ উপকারিতা এবং পরকালীন সফলতার বহু দরজা। আমরা প্রতিনিয়ত ফজরের ব্যাপারে যে মারাত্মক গাফিলতি ও অলসতা প্রদর্শন করছি, এর মাধ্যমে নিজেদের অজান্তেই ঈমান বিধ্বংসী মুনাফিকী স্বভাব এবং ভয়াবহ শাস্তির দিকে পা বাড়াচ্ছি।

ফজর ছালাফে গাফিলতির পরিণাম ও ভয়াবহতা

১. মুনাফিকের স্বভাব :

ঈমানের দাবী করা খুব সহজ, কিন্তু সেই দাবীর পক্ষে আমল করা বড়ই কঠিন। আর একজন মুসলিমের ঈমানের পারদ মাপার সবচেয়ে বড় থার্মোমিটার হ’ল ফজরের ছালাত। মুনাফিক্বী এমন এক ভয়াবহ আধ্যাতিমক ব্যাধি, যা মানুষের ভেতরটাকে নীরবে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের মধ্যে এই ব্যাধি বাসা বাঁধছে কি-না, তা যদি আমরা যাচাই করতে চাই, তবে দেখতে হবে আমরা নিয়মিত ফজরের জামা‘আতে উপস্থিত হ’তে পারছি কি-না। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,لَيْسَ صَلاَةٌ أَثْقَلَ عَلَى الْمُنَافِقِينَ مِنَ الْفَجْرِ وَالْعِشَاءِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا، ‘মুনাফিকদের উপর ফজর ও এশার ছালাতের চেয়ে অধিক ভারী (কঠিন) ছালাত আর নেই। যদি তারা জানত যে এই দুই ছালাতের মাঝে কি (বিশাল পুরস্কার) রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হ’লেও এতে উপস্থিত হ’ত’।[1] ইমাম ছান‘আনী (১০৯৯-১১৮২ হি./১৬৮৮-১৭৬৮ খ্রি.) বলেন, ‘অত্র হাদীছে ফজর ও এশার জামা‘আতে উপস্থিত হওয়ার প্রতি অত্যন্ত জোরালো উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কারণ একজন মুমিন যখন এ দুই ছালাতের মাহাত্ম্য ও প্রতিদান সম্পর্কে জানতে পারে, তখন যে কোন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সে তা আদায় করতে ছুটে আসে। পক্ষান্তরে মুনাফিকদের ক্ষেত্রে এ দুই ছালাতে অনুপস্থিত থাকার মূল কারণ হ’ল- এগুলোর অশেষ মর্যাদা ও প্রতিদানের প্রতি তাদের অবিশ্বাসী মনোভাব বা ঈমানের দুর্বলতা’।[2]

বর্তমান যুগে আমাদের জীবনযাত্রা অনেকটাই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। সারাদিন অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার চাপ শেষে ঘরে ফিরে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকি, গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকি। ফলে ফজরের সময় ওঠা যেন পাহাড় ঠেলার মতো কঠিন মনে হয়।

মহিলারাও এই ফেৎনা থেকে মুক্ত নন। সারাদিন সংসারের হাযারো কাজ, সন্তান সামলানো এবং পরিবারের সবার যত্ন নিতে নিতে যখন তিনি রাতে বিছানায় যান, তখন শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসে। কিন্তু একজন মুমিনা নারী সেই ক্লান্তি জয় করে শুধু নিজেই ফজর ছালাতে দাঁড়ান না, বরং পরম মমতায় তাঁর স্বামী ও সন্তানদেরও জাগিয়ে তোলেন। কারণ তিনি জানেন, পরিবারের এই ভোরের সংস্কৃতিই তাদের জান্নাতের পথে এগিয়ে নিবে।

সালাফে ছালেহীনের যুগে ফজর ছালাতের প্রতি গুরুত্ব কেমন ছিল তা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ)-এর একটি উক্তি থেকে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আগামীকাল ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলার সাথে একজন প্রকৃত মুসলিম হিসাবে সাক্ষাৎ করে আনন্দিত হ’তে চায়, সে যেন যেখানে আযান দেওয়া হয় (অর্থাৎ মসজিদে) সেখানে গিয়ে এই পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত যথাযথভাবে আদায় করে।... আমরা তো আমাদের যুগে দেখেছি, স্পষ্ট মুনাফিকব ব্যতীত কেউ জামা‘আত থেকে পিছনে থাকত না। এমনকি এমনও দেখা গেছে যে, (অসুস্থতার কারণে) একজন মানুষকে দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে পা টেনে টেনে মসজিদে আনা হ’ত এবং তাকে ছালাতের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হ’ত’।[3]

একটু চোখ বন্ধ করে ছাহাবায়ে কেরামের যুগের সেই দৃশ্যটি কল্পনা করুন! অসুস্থতায় ধুঁকতে থাকা একজন মানুষ, যার নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই, তাকে দু’জন মানুষ দুই দিক থেকে কাঁধে ভর দিয়ে পা টেনে টেনে মসজিদে নিয়ে আসছেন! কেন? কারণ তাঁরা মনে করতেন ফজর বা এশার জামা‘আত থেকে কেবল মুনাফিকরাই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে। আর আজ আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুঠাম দেহের অধিকারী হয়েও ফজরের সুমধুর আযান শুনে পাস ফিরে ঘুমাই! অ্যালার্ম বাজলে তা বন্ধ করে আবার ঘুমের গভীরে হারিয়ে যাই। আমাদের বিবেক একটুও দংশন করে না। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন,كُنَّا إِذَا فَقَدْنَا الْإِنْسَانَ فِي صَلَاةِ الْعِشَاءِ الْآخِرَةِ وَالصُّبْحِ أَسَأْنَا بِهِ الظَّنَّ، ‘আমরা যখন কাউকে এশার ও ফজরের ছালাতে অনুপস্থিত দেখতাম, তখন তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করতাম (অর্থাৎ তাকে মুনাফিকী বা ঈমানের দুর্বলতার আশঙ্কায় দেখতাম)’।[4]

২. সার্বিক জীবনে শয়তানের প্রভাব :

বর্তমান যুগে মানসিক অবসাদ, বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন যেন এক মহামারীর রূপ নিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনেকে কারণ ছাড়াই মেজায খিটখিটে করে রাখেন, সারাদিন কাজে কোন এনার্জি পান না, এক ধরনের অলসতা আর ক্লান্তি তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। আধুনিক বিজ্ঞান হয়তো এর নানা জাগতিক কারণ খুঁজবে, কিন্তু চৌদ্দশ বছর আগে আমাদের প্রিয় নবী (ছাঃ) এর আসল আধ্যাত্মিক কারণটি উন্মোচন করে গেছেন। ফজর না পড়া মানুষের দিনটি শুরুই হয় শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বের মধ্য দিয়ে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,يَعْقِدُ الشَّيْطَانُ عَلَى قَافِيَةِ رَأْسِ أَحَدِكُمْ إِذَا هُوَ نَامَ ثَلاَثَ عُقَد، يَضْرِبُ كُلَّ عُقْدَةٍ عَلَيْكَ لَيْلٌ طَوِيلٌ فَارْقُدْ، فَإِنِ اسْتَيْقَظَ فَذَكَرَ اللهَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، فَإِنْ تَوَضَّأَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ فَإِنْ صَلَّى انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ فَأَصْبَحَ نَشِيطًا طَيِّبَ النَّفْسِ، وَإِلاَّ أَصْبَحَ خَبِيثَ النَّفْسِ كَسْلاَنَ، ‘তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন শয়তান তার ঘাড়ের পশ্চাদংশে তিনটি গিঁট দেয়। প্রতি গিঠে সে এই বলে চাপড়ায় যে, তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি ঘুমিয়ে থাক। অতঃপর সে যদি জাগ্রত হয়ে আল্লাহ্কে স্মরণ করে, একটি গিঁট খুলে যায়। পরে ওযূ করলে আর একটি গিঁট খুলে যায়। অতঃপর ছালাত আদায় করলে আরো একটি গিঁট খুলে যায়। তখন তার প্রভাত হয় উৎফুল্ল মনে ও অনাবিল চিত্তে। অন্যথায় সে সকালে উঠে কলূষ কালিমা ও আলস্য সহকারে’।[5]

অধিকাংশ সময় আমরা অ্যালার্ম বেজে ওঠার পর যখন ‘স্নুজ’ (Snooze) বাটনে চাপ দিয়ে ভাবি- ‘আর মাত্র পাঁচটা মিনিট ঘুমাই’, ঠিক তখনই শয়তান আমাদের ঘাড়ে ঐ গিঁটগুলো ধরে টান দেয় আর ফিসফিস করে বলে, ‘এখনও অনেক রাত বাকী, ঘুমাও’। যারা শয়তানের এই ধোঁকায় পড়ে যায়, তাদের পরিণতি ভয়াবহ ও অপমানজনক হয়ে ওঠে। মা-বোনদের জীবনেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এমন অনেক মা-বোন আছেন, যেদিন আপনি ফজর পড়তে পারেন না, সেদিন সকালে উঠেই তিনি এক অজানা অস্থিরতা অনুভব করেন। বাচ্চাদের ওপর অকারণে রাগ ঝাড়েন, সংসারের কাজে একঘেঁয়েমী লাগে। অথচ যেদিন তিনি ফজরের আযানে উঠে পড়েন, ওযূ করে মুছাল্লায় (জায়নামাযে) বসেন, সেদিন পুরো ঘরটা রহমতের ছায়ায় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। প্রশান্ত মনে সারাদিন পরিবারকে তিনি ভালোবাসায় আগলে রাখেন।

রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এমন এক লোকের ব্যাপারে উল্লেখ করা হ’ল, যে সারা রাত এমনকি ভোর পর্যন্ত ঘুমিয়ে ছিল। তখন তিনি বললেন, ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِيْ أُذُنَيْهِ ‘সে এমন লোক যার উভয় শয়তান কানে পেশাব করে দিয়েছে’।[6] গভীরভাবে ভাবনন তো, এটি কত বড় লাঞ্ছনার বিষয়! কোন মানুষ যদি আমাদের গায়ে একটু থুথু বা ময়লা ছিটিয়ে দেয়, আমরা অপমানে-রাগে ফেটে পড়ি। আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টির সেরা জীব বা ‘আশরাফুল মাখলূকাত’ হিসাবে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ফেরেশতারা এক সময় আমাদের পিতা আদম (আ.)-কে সিজদা করে সম্মান জানিয়েছিলেন। আর আজ সামান্য ঘুমের কাছে পরাজিত হয়ে আমরা সেই অভিশপ্ত শয়তানকে আমাদের কানে পেশাব করার সুযোগ করে দিচ্ছি। একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম কখনোই এই জঘন্য অপমান মেনে নিতে পারে না।

৩. আমল ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা : বুরায়দাহ (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ، ‘যে ব্যক্তি আছরের ছালাত ছেড়ে দিল, তার আমল বিনষ্ট হয়ে গেল’।[7] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, الَّذِى تَفُوتُهُ صَلاَةُ الْعَصْرِ كَأَنَّمَا وُتِرَ أَهْلَهُ وَمَالَهُ ‘যদি কোন ব্যক্তির ‘আছরের ছালাত ছুটে যায়, তাহ’লে যেন তার পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ সব কিছুই ধ্বংস হয়ে গেল’।[8]

এই হাদীছের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ইমাম আবূ সুলায়মান আল-খাত্ত্বাবী (৩১৯-৩৮৮ হি.) বলেন, ‘وُتِرَ’ শব্দের অর্থ হ’ল, কোন কিছু কমে যাওয়া বা কেড়ে নেওয়া। অর্থাৎ মানুষ তার পরিবার-পরিজন ও সম্পদ হারিয়ে যেমন একাকী ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তেমনি যে ব্যক্তির আছরের ছালাত ছুটে যায়, সে যেন এমন ক্ষতিরই সম্মুখীন হয়। উদ্দেশ্য হ’ল, একজন মুসলিমের কাছে আছরের ছালাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা তার পরিবার ও সম্পদ হারানোর আশঙ্কার মতোই ভয়াবহ হওয়া উচিত’।[9]

প্রশ্ন জাগতে পারে, ফজর ছালাতের আলোচনায় আছরের কথা কেন বলা হ’ল? এর উত্তর দিয়ে ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র (৩৬৮-৪৬৩ হি.) বলেন, ‘অত্র হাদীছে যদিও আছরের ছালাতের কথা উলেলখ করা হয়েছে, তবে এর উদ্দেশ্য হ’ল সব ছালাত। কেননা সকল ফরয ছালাতের মর্যাদা ও পবিত্রতা সমান’।[10] বরং দিনের শুরু হিসাবে ফজরের ছালাত আছরের চেয়েও অধিকতর ফযীলতপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ। সুতরাং এক ওয়াক্ত আছরের ছালাত পরিত্যাগের পরিণতি যদি এমন সর্বনাশা হয়, তবে দিনের প্রথম ছালাত অর্থাৎ ফজরের ছালাত, যা স্বয়ং ফেরেশতাদের সাক্ষ্যপ্রাপ্তত তা পরিত্যাগের পরিণতি আরও কত ভয়াবহ হ’তে পারে!

৪. দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার আলামত :

ফজর ছালাতে নিয়মিত অবহেলা নিছক কোন অলসতা বা বদভ্যাস নয়, বরং এটি হ’ল আখেরাতের অনন্ত জীবনের ওপর এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়ার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। আমরা মুখে যতই বলি না কেন পরকালই আমাদের আসল ঠিকানা, আমাদের সকালবেলার এই আচরণ প্রমাণ করে যে, আমরা মূলত দুনিয়াকেই বেশী ভালোবাসছি। মহান আল্লাহ বলেছেন,بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى، ‘বস্ত্ততঃ তোমরা পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাক। অথচ আখেরাত হ’ল উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়ী’ (আল-আ‘লা ৮৭/১৬-১৭)। ইমাম আবুস সঊদ আল-ইমাদী (৮৯৬-৯৮২ হি.) বলেন, ‘পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়া বলতে বুঝানো হয়েছে যে, দুনিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা ও তাতেই প্রশান্তি খুঁজে নেওয়া। আর আখেরাত থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া’।[11]

আমরা সারাদিনের অফিস, ব্যবসা কিংবা লেখাপড়ার ব্যস্ততা শেষে রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় আশ্রয় নেই। অতঃপর ভোরের নীরবতা ভেঙে যখন ফজরের আযান হয়, তখন আমরা ভাবি- ‘আরেকটু ঘুমাই, নইলে সকালে অফিসে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে’ কিংবা ‘ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারব না’। এই যে দুনিয়াবী কাজের ক্ষতি হওয়ার ভয়ে আমরা আল্লাহর আহবানকে উপেক্ষা করলাম, এটাই কি আখেরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া নয়?

মহান আল্লাহ বলেন, فَأَمَّا مَنْ طَغَى، وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى، ‘আর যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জাহান্নাম তার ঠিকানা হবে’ (নাযি‘আত ৭৯/৩৭-৩৯)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহঃ) (৭০১-৭৭৪ হি.) বলেন, قَدَّمَهَا عَلَى أَمْرِ دِينِهِ وَأُخْرَاهُ، ‘সে তার দ্বীন ও আখেরাতের বিষয়গুলোর ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে’।[12] জামালুদ্দীন কাসেমী (১২৮৩-১৩৩২ হি.) বলেন, ‘পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার অর্থ হ’ল, সে আখেরাতের সম্মান, মর্যাদা এবং সেখানে নেককারদের জন্য প্রস্ত্ততকৃত অফুরন্ত নে‘মতের পরিবর্তে দুনিয়ার ভোগ-সামগ্রী ও প্রবৃত্তির কামনাকেই অগ্রাধিকার দিল’।[13]

ধরুন, আপনার অফিসের বস বা কোম্পানির মালিক আপনাকে ফোন করে বললেন, ‘আগামীকাল ভোর ৫টায় অফিসে একটি বিশেষ মিটিং আছে। উপস্থিত থাকতে পারলে আপনার বেতন দ্বিগুণ করে দেওয়া হবে’। বলুন তো, আপনি কি সেদিন অ্যালার্ম বাজার পর তা বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকবেন? কখনোই না! আপনি সারা রাত উত্তেজনায় ঠিকমতো ঘুমাতেই পারবেন না। ব্যাপারটা যদি এমনই হয়, তবে কি এটা প্রমাণিত হচ্ছে না- আমাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে দুনিয়ার বসের মূল্য বেশী? জান্নাতের চিরস্থায়ী নে‘মতের চেয়ে দুনিয়ার কাগজের নোটের মূল্য বেশী? পরিবারের মা-বোনদের ক্ষেত্রেও একই কথা। সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে বা স্বামীর অফিসের জন্য নাস্তা বানাতে হবে- এই চিন্তায় একজন মা বা স্ত্রী ঠিকই ভোরে উঠে পড়েন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হ’ল, সেই একই মহিলা যখন ফজরের আযান শোনেন, তখন তিনি বিছানা ছাড়তে পারেন না। এর অর্থ কি এই নয় যে, আমাদের কাছে জান্নাতের চিরস্থায়ী আরামের চেয়ে দুনিয়াবী স্বার্থের মূল্য অনেক বেশী হয়ে গেছে?

৫. কবরে ভয়ঙ্কর আযাব :

যারা ফজর ছালাত ত্যাগ করে ঘুমিয়ে থাকে, কবরের জীবনে তাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। ছাহাবী সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রাঃ) বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর স্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘গত রাতে আমার কাছে দু’জন আগন্তুক আসল। তারা আমাকে উঠাল এবং বলল, চলুন! আমি তাদের সঙ্গে চলতে থাকলাম। তিনি বলেন,وَإِنَّا أَتَيْنَا عَلَى رَجُلٍ مُضْطَجِعٍ، وَإِذَا آخَرُ قَائِمٌ عَلَيْهِ بِصَخْرَةٍ، وَإِذَا هُوَ يَهْوِي بِالصَّخْرَةِ لِرَأْسِهِ فَيَثْلَغُ رَأْسَهُ، فَيَتَدَهْدَهُ الحَجَرُ هَا هُنَا، فَيَتْبَعُ الحَجَرَ فَيَأْخُذُهُ، فَلاَ يَرْجِعُ إِلَيْهِ حَتَّى يَصِحَّ رَأْسُهُ كَمَا كَانَ، ثُمَّ يَعُودُ عَلَيْهِ فَيَفْعَلُ بِهِ مِثْلَ مَا فَعَلَ المَرَّةَ الأُولَى، ‘আমরা চিত হয়ে শুয়ে থাকা এক লোকের কাছে আসলাম। দেখলাম, অন্য এক লোক তার নিকট পাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার মাথায় পাথর নিক্ষেপ করছে। ফলে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আর পাথর নীচে গড়িয়ে পড়ছে। এরপর আবার সে পাথরটি নিয়ে আসছে। ফিরে আসতে না আসতেই লোকটির মাথা আগের মত ভাল হয়ে যায়। ফিরে এসে আবার তেমনি আচরণ করে, যেরূপ প্রথমবার করেছিল’। তিনি বলেন, আমি তাদের (সাথীদ্বয়কে) বললাম, সুবহান্নাল্লাহ্! এরা কারা?... তারা বলল, فَإِنَّهُ الرَّجُلُ يَأْخُذُ القُرْآنَ فَيَرْفُضُهُ وَيَنَامُ عَنِ الصَّلاَةِ المَكْتُوبَةِ، ‘সে এমন ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে তা পরিত্যাগ করে এবং ফরজ ছালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে’।[14]

প্রতিদিন সকালে মুয়ায্যিনের সুমধুর আযান কিংবা অ্যালার্ম বাজার পরও আমরা যারা তা বন্ধ করে আবার আরামের ঘুমে আচ্ছন্ন হই, তারা যেন মূলত নিজেদের মাথাকে কবরের ঐ ভয়ংকর পাথরের আঘাতের জন্য স্বেচ্ছায় প্রস্ত্তত করছি। আল্লাহুল মুস্তা‘আন! আমাদের কি একবারও ভয় হয় না যে, কাল সকালে আমাদের ঘুম ভাঙার আগেই যদি মৃত্যুর ফেরেশতা এসে হাযির হয়, তবে ঐ অন্ধকার কবরে আমাদের অবস্থা কেমন হবে?

বর্তমান সমাজে একটি ভয়ংকর প্রবণতা দেখা যায়। সেটা হ’ল- অনেকেই মনে করেন, ‘সকালে উঠতে পারিনি তো কী হয়েছে! অফিসে যাওয়ার আগে ৮টা বা ৯টায় উঠে ছালাত পড়ে নেব’। এভাবে তারা প্রায় নিয়মিত সূর্য ওঠার পরে ফজর ছালাত আদায় করেন। নির্ধারিত সময় পার করে এভাবে ছালাত আদায় করা যে কত বড় অপরাধ, এ ব্যাপারে আল্লামা মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (১৩৪৭-১৪২১ হি.) বলেন, ‘কোন মুসলিমের জন্য ছালাতের একটি অংশও সময়ের আগে আদায় করা বৈধ নয়; আবার সময় অতিক্রম হওয়ার পর এর কোন অংশ বিলম্বিত করাও বৈধ নয়। সেই সব লোকের অবস্থা কতই না ভয়াবহ, যারা অলসতা, অবহেলা এবং আখেরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে পুরো ছালাতই সময়ের পরে আদায় করে! তারা নিজেদের বিছানায় ঘুমের আরামে, খেল-তামাশায় ও উপার্জনে এমনভাবে মগ্ন থাকে, যেন তাদেরকে কেবল দুনিয়ার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। মনে হয় তারা কুরআন পড়ে না; পড়লেও আল্লাহর এই বাণী তাদের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে না,فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ، الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ، ‘অতঃপর দুর্ভোগ ঐসব মুছল্লীর জন্য, যারা তাদের ছালাত থেকে উদাসীন’ (মা‘ঊন ১০৭/৪-৫)[15] মুফাসসিরগণ বলেন, ‘ছালাত সম্পর্কে উদাসীনতা (السهو عن الصلاة) বলতে কি বোঝায়-এ বিষয়ে আলেমদের একাধিক মত রয়েছে। তার একটি হ’ল, এর অর্থ ছালাতকে নির্ধারিত সময় থেকে বিলম্বিত করা। অর্থাৎ ব্যক্তি এ বিষয়ে কোন গুরুত্বই দেয় না যে, সে ছালাত আদায় করল কি-না, সময় হ’ল কি-না। সুযোগ হ’লে সময়মতো পড়ে, আর না হ’লে সময় চলে যাওয়ার পর পড়ে। এটাই হ’ল ছালাত সম্পর্কে উদাসীনতা। যেমন কোন কোন সালাফ বলেছেন, তারা ছালাত একেবারে পরিত্যাগ করেনি; বরং সময় পার করে বিলম্বে আদায় করত। তাই আল্লাহ তাদেরকে ‘ওয়াইল’ (ভয়াবহ শান্তি)-এর হুমকি দিয়েছেন’।[16]

৬. ফজর ছেড়ে ঘুমিয়ে থাকা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ :

ফজরের ছালাত আদায়কারীর জন্য যেমন রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ ও আল্লাহর দীদার লাভের অফুরন্ত নে‘মত, তেমনি এই ছালাত তরককারীর জন্যও রয়েছে জাহান্নামের ভয়াবহ আযাবের কঠোর হুঁশিয়ারি। শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যারা আরামের ঘুমকে মহান আল্লাহর নির্দেশের চেয়ে বেশী প্রাধান্য দেয়, তাদের আখেরাতের পরিণতি বড়ই ভয়ংকর। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছিলেন উম্মতের প্রতি সবচেয়ে বেশী দয়াশীল ও স্নেহপরায়ণ। অথচ ফজর ও এশার জামা‘আতে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত থাকত, তাদের চরম অবহেলার কারণে তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তাদের ঘরবাড়ি পর্যন্ত আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠিন ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, মুনাফিকের নিকট সবচেয়ে ভারী ছালাত হ’ল ফজর ও এশার ছালাত। অতঃপর তিনি বলেন,لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ المُؤَذِّنَ، فَيُقِيمَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا يَؤُمُّ النَّاسَ، ثُمَّ آخُذَ شُعَلًا مِنْ نَارٍ، فَأُحَرِّقَ عَلَى مَنْ لاَ يَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ بَعْدُ، ‘আমার ইচ্ছা হয় যে, মুয়ায্যিনকে ইকামত দিতে বলি এবং কাউকে লোকদের ইমামতি করতে বলি। আর আমি নিজে একটি আগুনের মশাল নেই। অতঃপর যারা ছালাতে আসেনি, তাদের উপর আগুন ধরিয়ে দেই।[17]

একটি হারানো ফজরের বেদনা :

ইতিহাসের পাতায় এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের পাষাণ হৃদয়কে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। জলীলুল ক্বদর ছাহাবী আনাস বিন মালেক (রাঃ) যখনই পারস্যের ‘তুসতার’ নগরী বিজয়ের কথা স্মরণ করতেন, তখনই তাঁর দু’চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরত। তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের অত্যন্ত সুরক্ষিত এক দুর্ভেদ্য নগরী ছিল এই তুসতার। দীর্ঘ অবরোধের পর মুসলিম বাহিনী এই নগরীর পতন ঘটাতে সক্ষম হন এবং মুসলমানদের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। তুসতার অভিযান ছিল সে যুগের অন্যতম কঠিন ও ভয়ংকর অভিযান। স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি অভাবনীয় বিজয় মুসলমানদের জন্য সীমাহীন আনন্দ ও গৌরবের বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হ’ল- এমন একটি মহাবিজয়ের কথা মনে পড়লেই আনাস (রাঃ) কাঁদতেন। কিন্তু কেন? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফজরের ছালাতের নির্ধারিত সময়ের সামান্য পূর্বে তুসতার দুর্গ-দ্বার মুসলমানদের করতলগত হয়। মুসলিম বাহিনী স্রোতের ন্যায় দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করে। এরপর পারসিক বিশাল বাহিনীর সঙ্গে শুরু হয় এক তুমুল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কিন্তু মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহে শেষ পর্যন্ত আবূ মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর অনুকূলেই বিজয়ের ইতিহাস রচিত হয়।

বিজয় অর্জিত হয় সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর। হঠাৎ করেই মুসলিম অভিযাত্রীগণ আবিষ্কার করলেন যে, এই ভয়াবহ যুদ্ধের ডামাডোলে তাদের সেদিনের ফজরের ছালাতের নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। লড়াইয়ের চরম সঙ্গিন মুহূর্তে উন্মুক্ত তরবারির নীচে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যুদ্ধ করার কারণে মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ সেদিনের ফজরের ছালাত সময়মতো আদায় করতে পারেননি; বরং সূর্য উদিত হওয়ার পর আদায় করেছিলেন।

শরী‘আতের দৃষ্টিতে সেদিন তাঁরা সম্পূর্ণ অপারগ ও ক্ষমাযোগ্য ছিলেন। তাঁরা কোন দুনিয়াবী স্বার্থে বা ঘুমের ঘোরে ছালাত ছাড়েননি; বরং তাঁরা আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য ‘জিহাদ’-এ নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু যা ছুটে গেছে, তা যে অনেক মহান এক ইবাদত! আনাস (রাঃ) যখনই সেই দিনের কথা স্মরণ করতেন, একটি ফজর কাযা হওয়ার যন্ত্রণায় তাঁর বুক ফেটে কান্না আসত। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন,شَهِدْتُ مُنَاهَضَةَ حِصْنِ تُسْتَرَ عِنْدَ إِضَاءَةِ الفَجْرِ... وَمَا يَسُرُّنِي بِتِلْكَ الصَّلاَةِ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا، ‘ভোরের আলো ফোটার সময় আমি তুসতার দুর্গ বিজয়ের ঐ কঠিন মুহূর্তে উপস্থিত ছিলাম... (ঐ ছুটে যাওয়া ফজর) ছালাতটি যথাসময়ে পড়ার বিনিময়ে আমাকে যদি গোটা দুনিয়া এবং এর মধ্যকার সবকিছুও দিয়ে দেওয়া হয়, তবুও তা আমাকে আনন্দিত করবে না’।[18] আল্লাহু আকবার।

একবার নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখুন। আনাস (রাঃ) শারঈ ওযর থাকা সত্ত্বেও, জিহাদের ময়দানে থাকা অবস্থায় একটি মাত্র ফজর হারানোর বেদনায় আজীবন কেঁদেছেন। আর আমরা সামান্য ঘুমের মোহে, অলসতা করে বছরের পর বছর ফজর হারাচ্ছি, অথচ আমাদের চোখে এক ফোঁটা পানি নেই, হৃদয়ে সামান্যতম আক্ষেপ নেই! আমাদের ঈমানের পারদ আজ কোথায় নেমে গেছে, তা কি আমরা একটুও অনুভব করতে পারি না?

বিজ্ঞানের আলোকে ফজরে জাগার উপকারিতা

(১) সারকাডিয়ান রিদম এবং নোবেল বিজয়ীদের আবিষ্কার : আমাদের শরীরের ভেতরে একটি নিজস্ব ঘড়ি আছে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সারকাডিয়ান রিদম’ (Circadian Rhythm) বা দেহঘড়ি বলা হয়। ২০১৭ সালে জেফরি হল, মাইকেল রোসব্যাশ এবং মাইকেল ইয়াং চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পান এই ‘সারকাডিয়ান রিদম’-এর মেকানিজম আবিষ্কার করার জন্য। তাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবেই সূর্যোদয়ের আগে জেগে ওঠে এবং সূর্যাস্তের পর ঘুমিয়ে পড়ার জন্য প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে। যারা এই প্রাকৃতিক ঘড়ির সাথে তাল মিলিয়ে ভোরে জাগ্রত হয়, তাদের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বহুগুণ কমে যায়।[19]

(২) ভোরের বিশুদ্ধ অক্সিজেন :

ভোরবেলা বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা সবচেয়ে বেশী থাকে এবং এই সময় বায়ুমন্ডলে সামান্য পরিমাণ ওজোন (O3) গ্যাসের উপস্থিতি থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ভোরের এই নির্মল হাওয়া যখন আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে, তখন তা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সতেজ করে তোলে, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং শরীরের কোষগুলোতে এক নতুন প্রাণশক্তির সঞ্চার করে। ফজর ছালাতে হেঁটে যাওয়ার সময় যে বিশুদ্ধ বায়ু আমরা গ্রহণ করি, তা সারাদিনের জন্য আমাদের সতেজ রাখার সেরা টনিক হিসাবে কাজ করে।

(৩) কর্টিসল ও মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য :

কর্টিসল (Cortisol) এবং মেলাটোনিন (Melatonin) এ দু’টি মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। প্রথমটি জাগ্রত হওয়া, শক্তি ও চাপ মোকাবিলা নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যটি ঘুম ও দেহঘড়ি (biological clock) নিয়ন্ত্রণ করে। জার্মানের একদল বিজ্ঞানীর গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার ঠিক সাথে সাথে (প্রথম ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে) মানবদেহে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা চরমভাবে বৃদ্ধি পায় (প্রায় ৫০% থেকে ১৬০% পর্যন্ত)। এই প্রক্রিয়াটিকেই বিজ্ঞানের ভাষায় ‘Cortisol Awakening Response’ (CAR) বলা হয়। এটি মূলত মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরকে সারাদিনের কর্মব্যস্ততার জন্য ‘সুইচ অন’ বা প্রস্ত্তত করে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে যারা দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে বা যাদের ঘুমের রুটিন এলোমেলো, তাদের এই CAR সাইকেল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তাদের শরীরে সারাদিন এনার্জির ঘাটতি, অবসাদ, দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপের পরিমাণ বেশী থাকে।[20]

(৪) বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি :

আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (AMA) বিখ্যাত জার্নাল ‘জামা সাইকিয়াট্রি’-তে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার এবং হার্ভার্ডের গবেষকদের প্রায় ৮ লক্ষ ৪০ হাযার মানুষের ওপর করা এক বিশাল গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাতে আগে ঘুমান এবং ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন, তাদের মাঝে মেজর ডিপ্রেশন বা চরম বিষণ্ণতার ঝুঁকি দেরিতে ঘুমানো মানুষদের তুলনায় ২৩% থেকে ৪০% পর্যন্ত কম থাকে। এছাড়া অন্যান্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় এ কথাও প্রমাণিত যে, ভোরে জাগা মানুষদের মাঝে উদ্বেগ (Anxiety) এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক ব্যাধির ঝুঁকিও অনেক কম থাকে।[21]

(৫) যিকির ও ব্রেইন ওয়েভ (Brain Waves) :

ফজরের ছালাতের পর যখন বান্দা শান্ত পরিবেশে মসজিদে বা মুছাল্লায় (জায়নামাযে) বসে আল্লাহর যিকির করেন, কুরআন তেলাওয়াত করেন, তখন তার মস্তিষ্কে ‘আলফা ব্রেইন ওয়েভ’ উৎপন্ন হয়। সাইকোলজিস্টদের মতে, এই আলফা ওয়েভ মানুষকে চরম মানসিক প্রশান্তি দেয়, স্ট্রেস হরমোন কমায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (Cognitive Function) বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেয়।

(৬) ক্যারিয়ার, ব্যবসা ও কর্মজীবনে ফজরের প্রভাব :

বিশ্ববিখ্যাত লিডারশিপ এক্সপার্ট রবিন শর্মা তার বেস্টসেলার বই The 5 AM Club-এ দেখিয়েছেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল ব্যক্তিরা, সেরা ব্যবসায়ীরা এবং সৃষ্টিশীল মানুষেরা ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠেন। কেন? কারণ ভোরের এই সময়টিতে মানুষের মন সবচেয়ে বেশী ফোকাসড বা তীক্ষ্ম মনোযোগী থাকে। কম্পিউটার সায়েন্সের প্রফেসর ও বিখ্যাত গবেষক ক্যাল নিউপোর্ট তার বিশ্ব নন্দিত ‘ডিপ ওয়ার্ক’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা সময়ের অভাব নয়; বরং মনোযোগের অভাব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নোটিফিকেশন, ই-মেইল, ফোনকল ও অনবরত ব্যস্ততা মানুষের গভীর চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছে। তাই তিনি এমন একটি কাজের পদ্ধতির কথা বলেন, যেখানে মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে একটিমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়। তিনি এটিকেই Deep Work নাম দিয়েছেন। আর এই ‘ডিপ ওয়ার্ক’-এর সবচেয়ে উপযোগী সময় হ’ল ফজরের সময়।

আধুনিক টাইম ম্যানেজমেন্টের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বেস্টসেলার বই হ’ল Hal Elrod-এর লেখা The Miracle Morning। এই গ্রন্থে লেখক দেখিয়েছেন যে, প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস (যাকে তিনি S.A.V.E.R.S : Silence, Affirmations, Visualization, Exercise, Reading, Scribing বলেছেন) পালনের মাধ্যমে মানুষের প্রোডাক্টিভিটি, মানসিক ফোকাস এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট জাদুকরীভাবে বৃদ্ধি পায়। যারা দিনের প্রথম ভাগকে সচেতনভাবে কাজে লাগায়, তারা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকে।

Hal Elrod হয়ত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বইটি লেখেননি, তবে তিনি ভোরের যে জাদুকরী ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন, তার শেকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলামী জীবনব্যবস্থার গভীরে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে ইসলাম শুধু ভোরের প্রোডাক্টিভিটির কথাই বলেনি, বরং এর সঙ্গে যুক্ত করেছে ‘বরকত’ বা ইলাহী প্রাচুর্যের এক সুমহান প্রতিশ্রুতি। ছাখর আল-গামেদী (রাঃ) বলেন, নবী কারীম (ছাঃ) বলেন, اللَّهُمَّ بَارِكْ لِأُمَّتِي فِي بُكُورِهَا ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতকে ভোরের বরকত দান করুন’। রাবী বলেন, وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً أَوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ مِنْ أَوَّلِ النَّهَار، ‘তিনি কোন ক্ষুদ্র বা বিশাল বাহিনীকে কোথাও প্রেরণ করলে দিনের ভোরেই পাঠাতেন’। বর্ণনাকারী ছাখর (রাঃ) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি তার পণ্যদ্রব্য দিনের প্রথমভাগে (ভোরে) পাঠাতেন, ফলে তিনি সম্পদশালী হয়েছিলেন এবং এভাবে তিনি অনেক সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন’।[22] অত্র হাদীছের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের তিনটি চমৎকার মিল খুঁজে পাওয়া যায় :

(ক) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দো‘আ ও বরকতের নিশ্চয়তা:

আধুনিক বিজ্ঞান ভোরের যে Peak Productivity বা সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতার কথা বলে, ইসলাম তাকে সংজ্ঞায়িত করেছে ‘বরকত’ দিয়ে। বরকত মানে কেবল সংখ্যায় বৃদ্ধি নয়; বরকত হ’ল অল্প সময়ে বেশী কাজ হওয়া, উপার্জনে তৃপ্তি থাকা এবং চেষ্টার তুলনায় বেশী ফলাফল লাভ করা। একজন মুসলিম যখন ফজর পড়ে দিনের কাজ শুরু করেন, তখন তিনি শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়েই কাজ করেন না, বরং তার সাথে যুক্ত হয় স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর বরকতের দো‘আ।

(খ) ক্যারিয়ার ও ব্যবসায় অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি:

উপরোক্ত হাদীছে ছাখর (রাঃ)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রমাণ। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর দো‘আর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রেখে তিনি তার ব্যবসার চালান বা পণ্য ভোর বেলা পাঠাতেন। এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তার ব্যবসায় এত বরকত দিয়েছিলেন যে, তিনি বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়া আজ বিলিয়নিয়ারদের 5 AM Club নিয়ে গবেষণা করছে, অথচ আমাদের সালাফগণ ভোরের বরকত কাজে লাগিয়ে সেই সফলতার চূড়ায় আরোহণ করেছিলেন বহু শতাব্দী আগে।

(গ) সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ফজরের প্রভাব :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) কোন সামরিক বাহিনী বা কোন প্রতিনিধি দল পাঠালে ভোরে পাঠাতেন। কারণ সকালে মানসিক স্বচ্ছতা ও শারীরিক শক্তি থাকে তুঙ্গে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান যাকে ডিসিশন ফ্যাটিগ বা দিন বাড়ার সাথে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি বলে, ভোরের এই সময়টিতে তা থাকে শূন্যের কোঠায়। ফলে যে কোন জটিল ও কৌশলগত কাজে ভোরের সময়টা সর্বাধিক কার্যকর।

এখানে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, উপরে বর্ণিত গবেষণাগুলো ফজরের ছালাত বা যিকিরকে সরাসরি পরীক্ষা করেনি। এটি মূলত দেখিয়েছে যে, ভোরে জাগার অভ্যাস মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। একজন মুসলিমের জন্য ফজরে জাগার সর্বপ্রথম ও প্রধান কারণ হ’ল আল্লাহর আদেশ পালন এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো কেবল এ ইবাদতের কিছু জাগতিক উপকারিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরে; এগুলো ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং ফজরের ছালাত, সকালবেলার যিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে একজন মুমিন একদিকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করেন, অন্যদিকে এমন একটি জীবনধারা অনুসরণ করেন, যা আধুনিক গবেষণার আলোকে মানসিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতার জন্যও সহায়ক হ’তে পারে।

ফজরের গাফিলতি থেকে বাঁচার উপায়

ফজরের ছালাত নিয়মিত আদায় করতে পারাটা আল্লাহর এক বিশেষ তাওফীক্ব। তবে এই তাওফীক্ব লাভের জন্য বান্দার পক্ষ থেকে কিছু সদিচ্ছা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত যরূরী। নিম্নে ফজরের গাফিলতি থেকে বাঁচার কার্যকর উপায়গুলো সংক্ষেপে পেশ করা হ’ল-

১. রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এশার ছালাতের পূর্বে ঘুমানো এবং এশার পরে দুনিয়াবী কথাবার্তা বা গল্পগুজব করাকে অপসন্দ করতেন।[23] তিনি এশার পরপরই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার তাকীদ দিয়েছেন, যাতে শেষ রাতে বা ভোরে ওঠা সহজ হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের শরীরের Circadian Rhythm বা দেহঘড়ি অনুযায়ী রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত ঘুম সবচেয়ে বেশী গভীর ও উপকারী। এ সময় মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোনের নিঃসরণ সর্বোচ্চ থাকে। দেরিতে ঘুমালে এই সাইকেল নষ্ট হয়, ফলে সকালে শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত ও দুর্বল লাগে।

২. ঘুমানোর আদব বা সুন্নাতগুলো রক্ষা করা:

ঘুম একটি ইবাদত হ’তে পারে যদি তা সুন্নাতী পদ্ধতিতে হয়। ওযূ করে ঘুমাতে যাওয়া, ডান কাতে শোয়া,[24] আয়াতুল কুরসী পড়া,[25] তিন কুল (সূরা ইখলাছ, ফালাক্ব ও নাস) পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীর মাসাহ করা (৩ বার) এবং ঘুমের দো‘আ পড়ার মাধ্যমে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।[26] যখন বান্দা পবিত্র হয়ে ঘুমাতে যায়, একজন ফেরেশতা সারারাত তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং দো‘আ করতে থাকেন।[27] ফলে তিনি খুব সহজেই ফজরে উঠতে পারেন। আধুনিক সাইকোলজি একে ‘সিলপ হাইজিন’ (Sleep Hygiene) বলে। ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট কিছু ইতিবাচক কাজ মস্কিষ্ককে সংকেত দেয় যে, এখন বিশ্রামের সময়। এটি দ্রুত ঘুম আনতে এবং ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করে।

৩. রাতে হালকা খাবার খাওয়া :

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ইসলামী আদব উভয়ের মতেই রাতের খাবার হালকা হওয়া বাঞ্ছনীয়। পেট ভরে ভারী খাবার খেলে শরীরে অলসতা ও তন্দ্রা চেপে বসে, যার ফলে ঘুম অত্যন্ত গাঢ় হয় এবং ফজরের সময় জেগে ওঠা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই রাতে পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কেননা রাতে ভারী বা অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খেলে পাকস্থলী তা হজম করতে শরীরের প্রচুর এনার্জি খরচ করে। ফলে ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিশ্রাম পায় না। সকালে ঘুম ভাঙলেও এক ধরনের আড়ষ্টতা কাজ করে। আর রাতে হালকা খাবার খেলে ভোরে শরীর অনেক সতেজ, ও ফুরফুরে থাকে।

৪. পাপাচার থেকে দূরে থাকা :

দিনের বেলার পাপাচার রাতের ইবাদত থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে। তাওফীক্ব লাভের পথে প্রতিবন্ধতা তৈরী করে। এক ব্যক্তি প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.)-কে জিজ্ঞেস করল, হে আবু সাঈদ! আমি সুস্থ অবস্থায় ঘুমাতে যাই, ফজর ও তাহাজ্জুদের জন্য পানিও প্রস্ত্তত রাখি, তবুও আমি ছালাতের জন্য সময়মতো উঠতে পারি না কেন? তিনি বললেন, قَيَّدَتْكَ ذُنُوبُكَ ‘তোমার পাপসমূহ তোমাকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে (যার কারণে তুমি উঠতে পারো না)’।[28] অর্থাৎ দিনের বেলা আমরা চোখ, কান ও জিহবা দিয়ে যেসব গোনাহ করি, সেগুলোই মূলত আমাদের রবের সামনে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করে। মনোবিজ্ঞান বলে, অপরাধবোধ ও নেতিবাচক কাজ মানুষের অবচেতন মনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে। এই চাপ মানুষের ইচ্ছাশক্তি (Willpower) কমিয়ে দেয়, ফলে ভালো কাজের প্রতি তার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়।

৫. ঘুমানোর আগে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকা :

বর্তমান সময়ে ফজর ছুটে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হ’ল স্মার্টফোন। ঘুমানোর আগে দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি থেকে মেলাটোনিন নামক ঘুমের হরমোন নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হয়। মস্তিষ্ক ভাবে এখনো দিন রয়ে গেছে। ফলে গভীর ঘুম আসে না এবং সকালে শরীর মারাত্মক ক্লান্ত থাকে। তাই ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করতে হবে।

৬. একাধিক এলার্ম দিয়ে রাখা :

আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি ফজরের সময় জাগার জন্য এলার্ম দিয়ে রাখা যায়। সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হ’ল, ফোন বা এলার্ম ঘড়িটি বিছানা থেকে একটু দূরে রাখা। যাতে এলার্ম বন্ধ করার জন্য বিছানা থেকে উঠে কয়েক পা হাঁটতে হয়। কারণ ঘুমের পর একটু হাঁটাহাঁটি করলেই মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায় এবং ঘুমের ঘোর কেটে যায়। আর একবার বিছানা ছেড়ে উঠে গেলে অলসতার ভাবও দূরীভুত হয়।

৭. পরিবারের একে অপরকে সহযোগিতা করা :

ফজরের জাগরণকে পারিবারিক একটি অভ্যাসে পরিণত করা বাঞ্ছনীয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাগিয়ে তুলবেন। যারা এ কাজ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রহমতের দো‘আ করেছেন।[29] পিতা-মাতা সন্তানদের ফজর পড়ার তাকীদ দেবেন। পরিবারের সবাই মিলে একে অপরের জান্নাতের সহযোগী হয়ে এই বরকতময় আমলটি ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। সাইকোলজির পরিভাষায় একে ‘সোশ্যাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি’ বা সামাজিক দায়বদ্ধতা বলা হয়। একা কোন ভালো অভ্যাস গড়ার চেয়ে পরিবারের বা রুমমেটদের সাথে মিলে একটি ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ তৈরি করলে সফলতার হার বহুগুণ বেড়ে যায়।

৮. ফজরের ছালাতের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া :

সবকিছুর মূলে রয়েছে মযবূত ঈমানী সংকল্প ও তাওয়াক্কুল। রাতে ঘুমানোর সময় আল্লাহর উপর ভরসা করে মনকে এই নির্দেশ দিয়ে ঘুমাতে হবে যে, ‘আমি অবশ্যই সময়মত বা জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করব ইনশাআল্লাহ’। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কগনিটিভ প্রাইমিং’। ঘুমানোর আগে ব্রেনকে যদি কোন একটি বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে অবচেতন মন (Subconscious mind) ঐ নির্দিষ্ট সময়ে মস্তিষ্ককে ঠিকই জাগিয়ে তোলে। সুতরাং মনের ভেতর যদি একনিষ্ঠ সংকল্প ও আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার তীব্রতা থাকে, তবে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সঠিক সময়ে জাগিয়ে দেবেন ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার :

ফজর ছালাত হ’ল আমাদের ঈমানের সবচেয়ে বড় থার্মোমিটার। প্রতিদিন শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয় লাভের প্রথম হাতিয়ার। সুতরাং ফজরের ছালাতের সময় একজন প্রকৃত মুসলিম কখনোই ঘুমে বিভোর থাকতে পারে না। আমরা যদি সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থে, অফিসে বসের ডাকে, পরীক্ষার জন্য কিংবা বিমানের ফ্লাইট ধরার জন্য রাতের ঘুম অনায়াসে বিসর্জন দিতে পারি, তবে মহামহিম আল্লাহর ডাকে কেন আমরা সাড়া দিতে পারব না? তাই আসুন! অতীতের সমস্ত ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ মনে তওবা করি এবং আজই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হই। সব ধরনের অলসতা, রাতের অনর্থক জাগরণ ও শয়তানের ধোঁকাকে পদদলিত করে জীবনের রুটিনকে নতুন করে সাজাই। ফজরের পবিত্র বাতাসে বিশুদ্ধ শ্বাস নিয়ে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হয়ে দিনটি শুরু করি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রতিদিন জামা‘আতের সাথে ফজর ছালাত আদায়ের মাধ্যমে তাঁর যিম্মাদারী, দুনিয়াবী বরকত ও আখেরাতের চিরস্থায়ী জান্নাত লাভের তাওফীক্ব দান করুন এবং গাফলতির ভয়াবহ পরিণাম থেকে হেফাযত করুন- আমীন!


[1]. বুখারী হা/৬৫৭; মুসলিম হা/৬৫১।

[2]. মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আমীর ছান‘আনী, সুবুলুস সালাম, ১/৩৬০।

[3]. আবূদাঊদ হা/৫৫০; নাসাঈ হা/৮৪৯; মিশকাত হা/১০৭২; সনদ ছহীহ।

[4]. ইবনু খুযায়মাহ হা/১৪৮৫; ছহীহুত হা/৪১৭, হাদীছ ছহীহ ।

[5]. বুখারী হা/১১৪২; মুসলিম হা/৭৭৬; মিশকাত হা/১২১৯।

[6]. বুখারী হা/৩২৭০; মুসলিম হা/৭৭৪।

[7]. বুখারী হা/৫৫৩; মিশকাত হা/৫৯৫।

[8]. বুখারী হা/৫৫২; মুসলিম হা/৬২৬।

[9]. খাত্তাবী, মা‘আলিমুস সুনান, ১/১৩১।

[10]. ইবনু আব্দিল বার্র, আত-তামহীদ, তাহকীক: বাশশার আওয়াদ মা‘রূফ ও অন্যান্য (লন্ডন : মাকতাবাতুল ফুরক্বান, ১ম সংস্করণ, ১৪৩৯ হি./২০১৭ খ্রি.), ৯/২৯।

[11]. তাফসীরে আবিস সু‘ঊদ (ইরশাদুল ‘আকলিস সালীম(, ৯/১৪৬।

[12]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৮/৩১৭।

[13]. তাফসীরে কাসেমী, মাহাসিনুত তা’বীল, ৯/৪০২।

[14]. ছহীহুল বুখারী হা/৭০৪৭।

[15]. মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন, আয-যিয়াউল লামি‘ মিনাল খুতাবিল জাওয়ামি‘ (রিয়াদ: আর-রিয়াসাহ আল-‘আম্মাহ লি ইদারাতিল বুহূছিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা’ ওয়াদ-দা‘ওয়াহ ওয়াল ইরশাদ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৮ হি./১৯৮৮ খ্রি.), ২/৩৯৮।

[16]. মুস্তফা আল-‘আদাওয়ী, সিলসিলাতুত তাফসীর, ১০৪/৪।

[17]. বুখারী হা/ ৬৫৭; মুসলিম হা/ ৬৫১; আবুদাঊদ হা/৫৪৮।

[18]. ছহীহুল বুখারী, ৯৪৫নং হাদীছের তালীক্ব দ্রষ্টব্য; কিতাবুল খাউফ, অধ্যায়-১২, অনুচ্ছেদ-৪; ৪/৮৩। তাফসীর ইবনে কাছীর, ১/৪৯৮।

[19].www.nobelprize.org/prizes/medicine/2017/press-release

[20]. Eva Fries, Lucia Dettenborn, and Clemens Kirschbaum, “The Cortisol Awakening Response (CAR): Facts and Future Directions,” International Journal of Psychophysiology 72, no. 1 (2009): 67–73,  https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/18854200.

[21]. Iyad F. Daghlas, Jacqueline M. Lane, Richa Saxena, and Celine Vetter, "Genetically Proxied Diurnal Preference, Sleep Timing, and Risk of Major Depressive Disorder," JAMA Psychiatry 78, no. 8 (2021): 903–10.https://jamanetwork .com/journals/jamapsychiatry/fullarticle/2780428

[22]. আবুদাঊদ হা/২৬০৬; তিরমিযী হা/১২১২; মিশকাত হা/৩৯০৮; হাদীছ ছহীহ।

[23]. বুখারী হা/৫৪৭; আবূদাঊদ হা/৩৯৮; মিশকাত হা/৫৮৭।

[24]. বুখারী হা/২৪৭; মুসলিম হা/২৭১০।

[25]. বুখারী হা/২৩১১; মিশকাত হা/২১২৩।

[26]. বুখারী হা/৫০১৭; মিশকাত হা/২১৩২।

[27]. ছহীহ ইবনু খুযাইমাহ হা/১০৫১; ছহীহাহ হা/২৫৩৯; ছহীহুত তারগীব হা/৫৯৭; সনদ হাসান লিগায়রিহী।

[28]. ইবনু আব্দি রবিবহী আল-আন্দালুসী, আল-ইক্বদুল ফারীদ (মৃ.৩২৮হি.) (বৈরূত : দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়াহ, ১ম মুদ্রণ, ১৪০৪হি.), ৩/১৩৫।

[29]. আবূদাঊদ হা/১৪১৫; ইবনু মাজাহ হা/১৩৩৬; সনদ হাসান।

 

 

 






বিষয়সমূহ: ছালাত
খেয়াল-খুশির অনুসরণ (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
শাওয়াল মাসের করণীয় - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
ঈদায়নের কতিপয় মাসায়েল - আত-তাহরীক ডেস্ক
ক্ষমা ও সহিষ্ণুতার কতিপয় ক্ষেত্র - ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম
আযান ও ইক্বামতের গুরুত্ব ও ফযীলত - মুহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদূদ
ইসলামের আলোকে জ্ঞান চর্চা (প্রথম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ আজিবার রহমান
ইভটিজিং : কারণ ও প্রতিকার - হারূনুর রশীদ
ইয়ারমূক যুদ্ধ - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
ইসলামে দাড়ি রাখার বিধান - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
হকের পথে বাধা : মুমিনের করণীয় (পূর্ব প্রকাশিতের পর) - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
মানব সৃষ্টির ইতিহাস - রফীক আহমাদ - বিরামপুর, দিনাজপুর
হাদীছের অনুবাদ ও ভাষ্য প্রণয়নে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা - ড. নূরুল ইসলাম
আরও
আরও
.