শিক্ষাঙ্গন বিভাগ থেকে আমরা শিক্ষা বিষয়ক পরামর্শ দিয়ে থাকি। আমরা সেই বিষয়গুলো আলোচনা করি যেগুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন। এই বিভাগে কখনো আমরা শিক্ষার বিভিন্ন সংস্কার নিয়েও আলোচনা করেছি। এর মানেই আমরা শিক্ষাবীদ নই। আমরা মনে করি, আমরা যতুকুই জানি তা আমাদের মাঝে চর্চিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের লেখালেখি শেখানোও সেই প্রয়াস থেকেই। কিভাবে লেখতে হয়, এই বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার মানেই যে আমরা অনেক বড় লেখক, এমন নয়। আমরা চাই, আমাদের যে শিক্ষার্থীরা লেখতে চায় তারা যেন প্রাথমিক পরামর্শের অভাবে না ভোগে। মোটামুটি একটা দিক নির্দেশনা যেন তারা এখান থেকে পায়। গত সংখ্যায় আমরা রোজনামচা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা এই সংখ্যায় প্রবন্ধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
লেখার জগতে যে কোন বিষয়কে পূর্ণরূপে উপস্থাপন করার সবচেয়ে সুন্দর মাধ্যম হ’ল প্রবন্ধ। কলমী সৈনিক হ’তে চাইলে প্রবন্ধ চর্চার কোন বিকল্প নেই। প্রবন্ধ লেখার মাধ্যমে একজন লেখকের যতটুকু চিন্তার বিকাশ ঘটে তা গল্প বা কবিতা ইত্যাদি লিখার মাধ্যমে ঘটে না। আবার প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে পাঠকের জ্ঞান যতটা সমৃদ্ধ হয়, অন্য কোন বিষয় পাঠে তা হয় না। এজন্য আমরা শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ লেখার জন্য উৎসাহিত করি। প্রবন্ধ লেখা তেমন কঠিন বিষয়ও নয়। একটু যত্নের সাথে মূল বিষয়গুলো খেয়াল করলেই একজন রোজনামচার লেখক প্রবন্ধ লেখায় দক্ষ হয়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ।
প্রবন্ধ পরিচিতি : প্রবন্ধ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হ’ল ‘প্রকৃষ্ট বন্ধন’ বা ‘শ্রেষ্ঠ বাঁধন’। অর্থাৎ কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর তথ্য ও যুক্তিনির্ভর সুবিন্যস্ত গদ্য রচনাই হ’ল প্রবন্ধ। যদি আরো সহজ করে বলি তবে, একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে নিজস্ব চিন্তা, মতামত ও বিভিন্ন তথ্য বিস্তারিতভাবে গুছিয়ে লেখাকে প্রবন্ধ বলে। আশাকরি, প্রবন্ধ কাকে বলে তা স্পষ্ট হয়েছে। এই প্রবন্ধের আবার অনেকগুলো প্রকার রয়েছে। আমরা প্রথম ধাপেই সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব না। আমরা এখানে প্রাথমিকভাবে সাধারণ মানের প্রবন্ধ লেখা শিখব।
প্রবন্ধের গঠন : প্রবন্ধ লেখতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে, প্রবন্ধ গঠন করে কিভাবে, কি কি লেখতে হয় ইত্যাদি। একটি সার্থক প্রবন্ধের মূলত তিনটি অংশ থাকে। শিরোনামের পরেই যে কথাগুলো বলা হয় তাকে আমরা ‘ভূমিকা’ বলি। এখন প্রশ্ন আসে, ভূমিকায় কি লিখা হবে। এখানে সাধারণত মূল বিষয়ের সাথে পাঠকের পরিচয় করানো হয়। সামনে যে আলোচনা হ’তে যাচ্ছে তার প্রাথমিক ধারণা দেয়া হয়। আবার প্রবন্ধের বিষয় যদি প্রশ্নবিদ্ধ বা বিতর্কিত হয় তবে কখনো কখনো লেখক এখানে উদ্দিষ্ট বিষয়ে কলম ধরার কারণও বর্ণনা করেন। আলোচনা যেটাই হোক, ভূমিকা এমন হ’তে হবে যেন পাঠক ভূমিকা পড়ে পুরো লেখাটি পড়তে আগ্রহী হয়। এটা তোমাকে নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিকার পরে আসে প্রবন্ধের মূল অংশ বা মূল আলোচনা। ভূমিকা লেখার পরে লক্ষ্য হবে, পাঠকের সামনে মূল আলোচনা উপস্থাপন করা। বিষয়বস্ত্তকে পাঠকের কাছে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে যতগুলো পয়েন্ট দরকার সেই পয়েন্টগুলোতে আলাদা আলাদা অনুচ্ছেদ তৈরি করে এখানে আলোচনা করতে হয়। এজন্য শিরোনাম নির্বাচনের পরেই লেখা শুরু না করে যদি পয়েন্টগুলো আগে নোট করে নেওয়া হ’লে ভাল হবে। সবগুলো পয়েন্ট সামনে রেখে একটি একটি করে পয়েন্ট ধরে লেখা শুরু করতে হবে। যেমন একটি পয়েন্ট হ’ল, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপট’। সেখানে আলোচ্য বিষয়টি বর্তমান সমাজে কেমন মূল্যায়িত হচ্ছে তা তুলে ধরলে। এরপর একটি পয়েনট হ’ল, ‘আমাদের করণীয়’। এখানে লেখকের নিজস্ব চিন্তা থেকে বিভিন্ন সমাধানগুলো প্রস্তাব করলে। উল্লেখিত পয়েন্টদু’টি যে কোন বিষয়বস্ত্তর সাথেই থাকতে পারে। যখন আলোচনা শেষ হবে তখন প্রবন্ধের উপসংহার লিখবে।
‘উপসংহার’ বা ‘শেষ কথা’ থাকবে মূল আলোচনা শেষে। এটা হ’ল পুরো আলোচনার একটি সারসংক্ষেপ বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। খেয়াল রাখতে হবে, এখানে নতুন কোন বিষয়ের অবতারণা না করে, সুন্দর ও পরিমার্জিত ভাষায় যেন ইতি টানা হয়। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, যদি কোন নতুন বিষয় না লেখি তবে কি লেখব! সাধারণত এখানে প্রবন্ধের ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা হবে। অতিরিক্ত কোন নছীহত থাকলে সেটা উল্লেখ করা যায়। লেখার ক্ষেত্রে ভুল-ভ্রান্তি থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা যায়। পরিশেষে সকলের জন্য দো‘আর মাধ্যমে লেখা শেষ করা যায়।
লেখার উৎস : এবার আসি প্রাথমিকদের মূল সমস্যা সমাধানে। প্রাথমিকদের সমস্যা হয় লেখার উৎস পেতে। তারা প্রশ্ন করে, লেখা কোথায় পাব? লেখা তো আসে না। লেখার বেশ কিছু উৎস আছে। তবে মৌলিক উৎস হ’ল, মস্তিষ্ক। একটি প্রবন্ধের খসড়া প্রথমত ‘চিন্তা’য় আসে। তারপর লেখক সেটা লেখার পরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করে নিজের প্রবন্ধটি শক্তিশালী করেন। একটি পরিপূর্ণ চিন্তাকে যখন কুরআন-হাদীছ, ক্বওলুস সালাফ, যুক্তি-ইতিহাস ইত্যাদি দিয়ে সজ্জিত করা যায় তখনই সেটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ হয়।
এখন কোন প্রবন্ধের আইডিয়া আসতেই যদি মনে হয়, ‘একটানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লিখব। তথ্য-উপাত্ত যুক্ত করে লেখা চালিয়ে যাবো’। তবে লেখা সুন্দর হবে না। কারণ একটি পূর্ণাঙ্গ চিন্তা নিয়ে লিখতে বসে যখন দু’লাইন লিখে কুরআনের আয়াত খুঁজতে গেলে, চার লাইন লেখার পরে হাদীছ খুঁজতে গেলে চিন্তা আর সমন্তরাল অবস্থায় থাকবে না। বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। ফলে লেখার পরে দেখবে, তথ্য তো অনেক জমা হয়েছে কিন্তু লেখা পড়তেই ভাল লাগছে না। সুতরাং আগে চিন্তা অনুযায়ী প্রবন্ধটি লিখে নিতে হবে। এরপর তোমাকে উল্লেখিত বিষয়ের ওপর কুরআনের আয়াত, হাদীছ, ক্বওলুস সালাফ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেগুলোকে স্থানভেদে সুন্দরভাবে এঁটে দিতে হবে। তাহ’লে দেখবে, প্রবন্ধের ভাষা সমান্তরাল গতিতে এগুচ্ছে। তথ্য-উপাত্তগুলোও সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এবার আসি বিষয়বস্ত্ত নির্ধারণে। অনেকেরই সমস্যা হ’ল, বিষয়বস্ত্ত নির্ধারণ করে দিলে লেখতে পারে। তবে নিজে বিষয়বস্ত্ত নির্ধারণ করতে পারে না। আমরা মনে করি, একজন লেখক মাত্রই তার পকেটে সর্বদা ছোট্ট নোটপ্যাড এবং কলম থাকতে হবে। আর মস্তিষ্কে একটি চিন্তা সর্বদা গেঁথে রাখতে হবে, ‘কোন বিষয়ে লেখা যায়’! তখন হাঠাৎই কোন কিছু দেখে মনে হবে, এই বিষয়ে একটি মানসম্মত প্রবন্ধ হ’তে পারে। সেই বিষয়টি সাথে সাথেই নোটে ছোট্ট করে লিখে নিতে হবে। আবার হঠাৎই কখনো কোন বিষয়ে সুন্দর একটি চিন্তা আসতে পারে। সেটাও সংক্ষেপে লিখে রাখতে হবে। কারণ পরবর্তীতে এগুলো আর মনে থাকবে না। এভাবে ধীরে ধীরে চর্চা শুরু করলে পরের রাস্তা নবীন নিজেই খুঁজে পাবে ইনশাআল্লাহ।
প্রবন্ধ লেখায় যত সমস্যা : প্রবন্ধ লেখার শুরুর দিকে কয়েকটি সমস্যা খুব বেশী হয়, তন্মধ্যে অন্যতম হ’ল, মানসম্মত বিষয়বস্ত্ত খুঁজে না পাওয়া। বিষয়বস্ত্ত পেলেও সেই বিষয়ে লেখার মত কথা না আসা। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে এবং একজন ভাল লেখক হ’তে হ’লে আগে ভাল পাঠক হ’তে হবে। পড়ার পরিধি বাড়াতে হবে। প্রতিযশা লেখকদের প্রবন্ধ সংকলন সংগ্রহ করে খুঁটে খুঁটে দেখতে হবে, তারা কিভাবে প্রবন্ধের শিরোনাম নির্বাচন করেন। তারা কিভাবে পয়েন্ট গঠন করেন। সেভাবে নিজের লেখাতেও শিরোনাম ও পয়েন্ট তৈরি করতে হবে। একাধিক মাসিক পত্রিকা সংগ্রহে রাখতে হবে। সেখানে প্রতিমাসে কি ধরনের প্রবন্ধ আসছে সেগুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। যদি একা কেনা সম্ভব না হয় তবে গ্রুপ করে বা সাংগঠনিক উদ্যোগেও কেনা যেতে পারে।
আরেকটি সমস্যা হ’ল, একটি বিষয়বস্ত্ত নির্ধারণ করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে লিখতে বসলেও সেই বিষয়ে কথা আসছে না। কথা আসছে ভিন্ন কোন বিষয়ে। এঅবস্থায় করণীয় হ’ল, নতুন পাতা নিয়ে যে বিষয়ে কথা আসছে সেটাই লেখা শুরু করা। কিছুদূর লেখার পরে হয়তো এই বিষয়ে আর আসছে না। আরেকটি নতুন বিষয়ে আসছে। তখন নতুন আরেকটি পাতা নিয়ে সেটা লেখা শুরু কর। কারণ, পরবর্তীতে এমন হবে যে, লেখতে মন চাইবে, তবে বিষয় পাওয়া যাবে না। তখন এই অসম্পন্ন লেখাগুলো শেষ করবে।
এরপরের সমস্যা হ’ল, কিছুদূর লেখার পরে হীনমন্যতায় ভোগা, লেখা হয়ত ভাল হচ্ছে না! এই ওয়াসওয়াসা ভেতরে আসতে দেয়া যাবে না। সব সময় মনে রাখতে হবে, কোন লেখাই ভাল হয় না। সব লেখাকেই পরবর্তীতে ঘঁষে মেজে ভাল বানানো হয়। সুতরাং হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলে কলম চালিয়ে যেতে হবে। প্রাথমিকভাবে দুইটা খাতা রাখা যেতে পারে। একটি রাফ খাতা, অপরটি পাকা খাতা। রাফ খাতায় যা মন চায় লিখে যেতে হবে। অতঃপর সেখান থেকে যতটুকু যেভাবে ভাললাগে, পাকা খাতায় তুলে সম্পাদনা করতে হবে। আশা করা যায়, বিষয়-বিড়ম্বনার সমস্যা থাকবে না।
এর পরের সমস্যা হ’ল, লেখার পরে সম্পাদনা করার মত ইচ্ছা, সময় ও রুচি কোনটাই হচ্ছে না। এটা স্বাভাবিক বিষয়। যে কোন বিষয় শিখতে গেলে অলসতা জেঁকে ধরবেই। তাই নিজের প্রতিদিনের রুটিনে ‘সাহিত্য চর্চা’ নামে কমপক্ষে দেড় ঘণ্টা সময় রাখতে হবে। প্রতিদিন লেখা হবে এমন নয়। কোনদিন লেখা হবে। কোনদিন আগের লেখা সম্পাদনা হবে। কোনদিন সাহিত্য পাঠ হবে। যে সকল মনীষির লেখার প্রতি আকর্ষণ ছিল বা লেখার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন অথবা যাদের কলম বাতিলের মেরুদন্ডে কাঁপন ধরিয়ে দিত এমন ব্যক্তিদের জীবনী ও লেখা অধ্যয়ন করতে হবে। এই অধ্যয়নের মাধ্যমে লেখার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। এই ভালোবাসাই অসময়ে হাল ধরে রাখার শক্তি যোগাবে ইনশাআল্লাহ।
প্রবন্ধের মান যাচাই : প্রবন্ধ লেখা শেষ করার পরে আসে মান যাচাইয়ের বিষয়। একজন লেখককে লেখার মান যাচাইয়ের কাজটি খুব ভালভাবে করতে হয়। এবিষয়ে তাকে খুব কঠোরতার পরিচয় দিতে হয়। যেমন, লেখার সমালোচনা গ্রহণ করতে হয়। সমালোচনা গ্রহণ করা যে কারো পক্ষেই খুব কঠিন কাজ। আবার কখনো লিখতে গিয়ে দেখা যাবে, একটি লেখা অনেক কষ্ট করে লেখার পরে সেখানে অর্ধেকই অপ্রাসঙ্গিক কথা চলে এসেছে। তখন সেই অপা্রসঙ্গিক লেখাগুলো একটানে কেটে ফেলতে হয়। এখন যদি লেখার ওপরে মায়া দেখানো হয় তাহ’লে লেখা মানসম্মত হ’ল না।
প্রাথমিক লেখকরা মনে করে, লেখার মাঝে কঠিন ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করলেই প্রবন্ধ ভাল হয়। সাহিত্যের মান বাড়ে। এমন চিন্তা আদৌ ঠিক নয়। বরং সহজ, সাবলীল ও প্রমিত ভাষায় পাঠকের কাছে বক্তব্য পৌঁছাতে পারাই মুখ্য। ‘কোন শব্দে বলা হচ্ছে’ এর চেয়ে ‘কি বলা হচ্ছে’ সেটাই পাঠকের কাছে আগ্রহের বিষয়। লেখার মান বাড়াতে হ’লে সহজ ভাষায় এমন কিছু উপস্থাপন করতে হবে যা আর দশজন লেখকের চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ একটি পরিচিত বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেভাবে আর দশজন করে না। এটাই তোমাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করবে। শব্দের দুর্বোধ্যতার মাঝে কখনো লেখার মান খুঁজতে যাওয়া উচিত নয়।
প্রাথমিক লেখকরা আরেকটি ভুল করে থাকে। তা হ’ল, তারা মনে করে, লেখা যত বড়, ততই মানসম্মত। এটা সঠিক নয়। বরং উত্তম কথা সেটাই যা কম হয় এবং সরাসরি মূলভাবকে স্পষ্ট করে। এখানে আমাদের একজন শিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি পরীক্ষার পূর্বে আমাদেরকে বলে দিতেন, ‘যে প্রশ্নে যতটুকু চাওয়া হয়েছে, উত্তর ঠিক ততটুকুই হবে। অপ্রয়োজনীয় কথা যত বেশী হবে ততই নম্বর কমানো হবে। সাহিত্য চর্চার জন্য ক্ষেত্র রয়েছে। পরীক্ষার খাতা সাহিত্য চর্চার স্থান নয়’। তখন মনে হ’ত, বেশী লেখব, বেশী নম্বর দিবে। বেশী লেখায় নম্বর কমবে কেন! এখন বুঝি, তিন লাইনের একটি ভাব পাঁচ লাইনে প্রকাশ করা কোন মহান বিষয় নয়। তিন লাইনের ভাব দেড় লাইনে প্রকাশ করতে পারাই যোগ্যতা। সুতরাং প্রবন্ধে বিষয়বস্ত্তর বাইরের কথা যেন না আসে। প্রয়োজনে প্রবন্ধ ছোট হোক। যে ভাব অল্প কথাতেই প্রকাশ করা যেত সেটা যেন দীর্ঘ কথার ফিরিস্তি হয়ে না যায়। এতে লেখার মান নষ্ট হয়।
প্রাথমিকদের আরেকটি সমস্যা হ’ল, ছোট লেখা খুব সুন্দর লেখে। তবে প্রবন্ধ লেখতে গেলেই কথার ধারাবাহিকতা হারিয়ে যায়। উপস্থাপনা এবড়ো থেবড়ো হয়ে যায়। এদিকে অগোছাল লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক আগ-পিছ মেলাতে পারে না। ফলে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এজন্য লেখার সুশৃঙ্খল বিন্যাস খুব যরূরী। এক অনুচ্ছেদের সাথে পরের অনুচ্ছেদের যেন যৌক্তিক ধারাবাহিকতা থাকে, এটা খেয়াল রাখতে হবে। খাপছাড়া বা অগোছালো উপস্থাপনা সর্বদা এড়িয়ে চলতে হবে। এজন্য লেখার পরে নিজেই কয়েকবার পাঠকের ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজেই পড়ে দেখতে হবে, কথাগুলো ধারাবাহিক হয়েছে কি-না। বাক্য, প্যারা ইত্যাদি আগ-পিছ করে যথাযথ সম্পাদনার মাধ্যমে নিজেকেই আগে লেখা সুন্দর করতে হবে। লেখাটি যখন লেখককে পড়তে ভাল লাগবে, তখনই পাঠকেরও ভাল লাগবে।
যদি লেখাটি গবেষণাভিত্তিক হয় তবে তথ্যের যথার্থতা ও প্রামাণিকতা থাকতে হবে। রেফারেন্স বা তথ্য যেন নির্ভুল হয়, এটা খেয়াল রাখতে হবে। অনুমাননির্ভর কথা পরিহার করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল, গবেষণামূলক বা তথ্যবহুল লেখায় অতিরিক্ত আবেগ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ নেই। গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধকে সর্বদা তথ্য, যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে দাঁড় করাতে হয়। সাধারণ প্রবন্ধেও যদি লেখার মাঝে কোন বিতর্কিত কথা চলে আসে তবে রেফারেন্স ও বাস্তবতার নিরিখে তার যথার্থতা সাব্যস্ত করতে হবে। এসব স্থানে কখনোই আবেগ বা রাগ-ক্ষোভের আশ্রয় নেওয়া সমীচীন নয়। সর্বশেষে প্রবন্ধের বানান ও বাক্যগঠন ভালভাবে দেখতে হবে। ব্যাকরণগত ভুল এবং অস্পষ্ট বাক্যগঠন প্রবন্ধের মান কমিয়ে দেয়। সেদিকে কড়া নযর রাখতে হবে। এভাবে লেখা শুরু করলে কয়েকটি প্রবন্ধ লেখার পরে প্রবন্ধই লেখককে শিখিয়ে দিবে যে, কিভাবে প্রবন্ধ লিখতে হয়।
শেষ কথা : প্রবন্ধ কেবল শব্দের গাঁথুনি নয়, এটি সমাজ ও মানুষের কাছে সত্য ও সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার এক বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। নিয়ম মেনে চর্চা করলে যে কেউই এই শিল্পে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আমরা চাই, নবীনদের কলম থেকেও এমন সব প্রবন্ধ আসুক, যেগুলো জাতির উপকারে আসবে। যে প্রবন্ধগুলো লেখকের অর্জিত ইলমকে ইলমে নাফে‘-তে রূপান্তর করবে। লেখকের কলমের কালির মাধ্যমে এমন আলো বিচ্ছুরিত হবে, যার মাধ্যমে আমরা দেখব নতুন নতুন কল্যাণের পথ। নবীনরা হবে আমাদের ছাদাক্বায়ে জারিয়ার মাধ্যম। এতটুকুই কাম্য।