[১৮৩১ খৃষ্টাব্দে বালাকোট ময়দানে মুজাহিদ আন্দোলনের সিপাহসালার সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী ও শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-এর শাহাদাতের পর যিনি এই আন্দোলনের হাল শক্ত হাতে ধরেছিলেন, তিনি হ’লেন মর্দে মুজাহিদ মাওলানা বেলায়েত আলী আযীমাবাদী (রহ.)। তিনি জিহাদ আন্দোলনে যেমন একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন, তেমনি ইলমী ও কলমী ময়দানেও তাঁর বিচরণ ছিল অসামান্য ও অতুলনীয়। কুরআন ও সুন্নাহর উপর অগাধ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে হাতে-কলমে হাদীছের উপর আমল প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত তৎপর। ভারতীয় উপমহাদেশে আহলেহাদীছ আন্দোলনকে বেগবান করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অদ্বিতীয়। এই আন্দোলন পরিচালনায় দাওয়াত, তাবলীগ ও জিহাদের কাজে সহায়তার উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি তাঁর এই অমূল্য লেখনী ধারণ করেছিলেন। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরের হ’লেও হাদীছ অনুযায়ী আমল এবং তাক্বলীদ বিষয়ে এটি একটি সারগর্ভ ও অমূল্য রচনা। তদানীন্তন তাকবলীদী সমাজে হাদীছের উপর আমল জাগরুক করতে পুস্তিকাটি দিশারীর ভূমিকা পালন করেছিল। পুস্তিকাটির হৃদয়গ্রাহী আবেদন ও ইলমী মূল্য বিবেচনায় আত-তাহরীক-এর পাঠকবৃন্দের জন্য এর বঙ্গানুবাদ পত্রস্থ করা হ’ল]

ভূমিকা :

সকল প্রশংসা মহান পথপ্রদর্শক আল্লাহর, যাঁর কুরআনের আলো অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয়কে আলোর পথ দেখায়। অসংখ্য দরূদ বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী ও নেতা মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর, যাঁর পবিত্র বাণীসমূহ রোগাক্রান্ত হৃদয়ের রোগ নিরাময়কারী এবং রূহের কষ্ট দূরকারী। তাঁর পরিবারবর্গ ও ছাহাবীগণের উপর শান্তি বর্ষিত হোক যাঁরা সাহসী পদক্ষেপের সাথে আনুগত্যের ময়দানে টিকে থেকে গুমরাহীর অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং মৃত হৃদয় থেকে জীবন ফিরে পেয়েছেন। হামদ-নাতের পর পুস্তিকাটি লেখার প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।

হাদীছের অনুসরণ করব, না ফিক্বহের অনুসরণ করব তা নিয়ে বন্ধু-বান্ধবরা এই অকিঞ্চনকে অধিক হারে প্রশ্ন করে। ফলে সংক্ষিপ্ত আকারে একটি পুস্তিকা লেখার তাকীদ অনুভব করি। সেই তাকীদের বাস্তব রূপ এ পুস্তিকা। আশা করি পুস্তিকাটি যে কোন জিজ্ঞাসু ব্যক্তির মনের খোরাক হবে এবং বার বার জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার কষ্ট থেকে আমাকেও রেহাই দেবে। সাথে সাথে তা বন্ধুদের মাঝে আমার স্মৃতিস্মারক হয়ে থাকবে। পুস্তিকাটিকে আমি তিনটি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করেছি। পুস্তিকাটির নাম রাখা হয়েছে ‘আমল বিল হাদীছ’ বা হাদীছ অনুযায়ী আমল।

প্রথম পরিচ্ছেদ : ফিক্বহের ক্ষেত্রে ইস্তিহসান[1] প্রসঙ্গ

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,فَلَوْلاَ نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَآئِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِي الدِّين- ‘তাদের প্রত্যেক বড় দল থেকে একটি ছোট দল দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য কেন বের হয় না’ (তওবা ৯/১২২)। অর্থাৎ মুসলিমদের প্রত্যেকটি দলের মধ্য থেকে একটি গোষ্ঠীর দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে ‘ফাক্বাহাত’ অর্জন করা যরূরী। এ আয়াত ‘ফাক্বাহাত’ বা গভীর জ্ঞান অর্জন ফরয (আবশ্যিক) হওয়ার সুস্পষ্ট দলীল। ফাকবাহাত সম্পর্কে এ ধরনের আয়াত ও হাদীছের সংখ্যা আরো অনেক আছে। কুরআন ও হাদীছে শরী‘আতের যেসব আহকাম বা বিধান সরাসরি উল্লেখ নেই সেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সংগতি রেখে সঠিক শারঈ বিধান উদঘাটন ও অনুধাবন করাকে ‘ফাক্বাহাত’ বলে।

যেমন-একজন অনুগত দাস তার মনিবের সান্নিধ্যে থেকে, মনিবের নির্দেশাবলী শুনে এবং দীর্ঘদিন সেবা করার সুবাদে তার মন-মানসিকতা ও পসন্দ-অপসন্দ গভীরভাবে বুঝে ফেলে। ফলে তার যোগ্যতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মনিব যদি তাকে নিজের কাছ থেকে আলাদা করে দেয় এবং তার অনুপস্থিতিতে এমন কোন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যার সমাধান সে সরাসরি মনিবের মুখে শোনেনি; তবুও মনিবের মেজাজ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকার কারণে সে কাজটি মনিবের সন্তুষ্টি অনুসারেই আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়। এটাকেই ‘ফাক্বাহাত’ বলে। এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ এবং দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। মনিবের মন বুঝতে পারা তথা ‘ফাক্বাহাত’ অর্জনকারী ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছেও মর্যাদা, সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কুরআন-সুন্নাহর আদেশ-নিষেধের বিভিন্ন স্তর যেমন: ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল, মুস্তাহাব, মুবাহ, হারাম, মাকরূহ ইত্যাদির বিধান বুঝতে পারা ফাক্বাহাতের অন্তর্ভুক্ত। আহকামের এই স্তরসমূহ ঠিকমতো বুঝতে না পারলে কোন কোন ব্যক্তির কাছ থেকে মহামহিম আল্লাহর আনুগত্যের বন্ধন সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা সব ধরনের আদেশ ও নিষেধ একসাথে পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই অবশ্যই অপরিহার্য বিষয়গুলোকে অনাবশ্যক বিষয় থেকে পৃথক করে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অপরিহার্য বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে।

দ্বীনে ফিক্বহের অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ’ল, শারঈ বিধানাবলীর অন্তর্নিহিত প্রকৃত তত্ত্ব ও রহস্য অনধাবন করা। তবে এ ধরনের জ্ঞান চর্চাকারীদের কেবল ‘ফকীহ’ বলা হয় না; বরং এই সত্য ও রহস্যের জ্ঞানের উচ্চ মর্যাদার কারণে একে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসাবে বিন্যন্ত করা হয়েছে। একইভাবে ফিক্বহের অন্যতম অংশ হ’ল আরবী ভাষার নানাবিধ প্রয়োগ ও অলঙ্কার নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করা। যেমন-শব্দ কখন তার প্রকৃত অর্থে (حقيقة) আর কখন রূপক অর্থে (مجاز) ব্যবহৃত হয়েছে, কিংবা কোথায় নির্দেশের কঠোরতা (تشديد) রয়েছে, কোথায় অধিক গুরুত্বারোপ (تغليظ) করা হয়েছে আবার কোথায় উৎসাহ (ترغيب) প্রদান বোঝানো হয়েছে। এমন আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। দ্বীনের এই গভীর প্রজ্ঞা ও ফিক্বহের প্রকৃত প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখা যায় ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ ও ইমাম মালেক (রহঃ) সহ তাঁদের অধিকাংশ অনুসারীদের মধ্যে। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন!

প্রারম্ভিক যুগে যখন হাদীছ সংকলন হয়নি তখন এসব বুযুর্গ মনীষী সকল জায়গা থেকে হাদীছ যাচাই করে তা থেকে মাসআলা নির্ণয় করতেন এবং হাদীছ ও তার সনদ সংগ্রহে যারপরনাই চেষ্টা করতেন। এর মাধ্যমে তাঁরা মহান আল্লাহর দরবারে মর্যাদা ও উচ্চ আসন লাভ করেছেন। তাই তাঁদের প্রতি অন্তরে ভক্তি ও ভালবাসা পোষণ করা অপরিহার্য এবং তাঁদের অনুসারীদেরও আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি বলে গণ্য করা উচিত। কিছু লোক এমন আছে যাদের চিন্তাশক্তি মরে গেছে। তারা বাহ্যিক রূপ দেখে প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করতে পারেনি। নিজেদের মূল্যবান সময়কে দুনিয়া হাছিলের পিছনে বরবাদ করেছে। চিন্তা-গবেষণার ময়দানে সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে তারা চোরের মতো চেনা-অচেনা প্রত্যেকের অর্জিত সম্পদের দিকে নজর দেয় এবং অন্ধের মতো প্রত্যেক বুদ্ধিমান ও নির্বোধের কাঁধে হাত রাখে। তারা কুরআন-হাদীছ পাঠ করা এবং তা নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করা সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করেছে। বইয়ে যা কিছু লেখা পায় চাই তা কুরআন-হাদীছ অনুযায়ী হোক কিংবা বিরোধী হোক কোন বাছ-বিচার ছাড়াই গ্রহণ করে নেয়। তাদের মধ্যে কিছু লোক তো কুরআন-হাদীছের একটা পাতা উল্টিয়েও দেখে না। কেউ যদি দেখেও তবে তার মর্মার্থ নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করে না। আর যারা মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা করে তারা শুধু ক্বিয়ামত, বারযাখ, দুনিয়াত্যাগ ইত্যাদি বিষয়ক বিষয়াদি জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

শারঈ আহকাম বা বিধি-বিধান নিয়ে চিন্তা-গবেষণায় তারা আদৌ মন দেয় না। এ বিষয়ে তাদের বদ্ধমূল ধারণা যে, আগেকার মুজতাহিদ ফক্বীহগণ আহকাম নির্ণয়ের কাজ শেষ করে গেছেন, এখন আর তার কোন আবশ্যকতা নেই। বরং যদি কখনো তারা কুরআন ও হাদীছে তাদের বিশ্বাসযোগ্য বইগুলোর বিপরীত কোন বিধান দেখতে পায়, তবে কেউ কেউ কুরআন ও হাদীছের এমন ব্যাখ্যা (تَأوِيل) করে যেন তা তাদের বইয়ের অনুকূলে চলে আসে। তারা এতটুকুও বুঝতে চায় না যে, কুরআন-হাদীছের অনুসরণই জীবনের আসল উদ্দেশ্য, কোন কিতাব কিংবা মাযহাবের আনুগত্য করা নয়। আবার কেউ কেউ সেই স্থান থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া কিংবা এড়িয়ে চলার পথও অবলম্বন করে। এমন ফক্বীহদের সম্পর্কে সত্যবাদী ও সত্য সংবাদদাতা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,  رُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ غَيْرِ فَقِيهٍ‘অনেক ফিক্বহের (জ্ঞানের) বাহক এমন আছেন, যারা নিজেরা ফক্বীহ (জ্ঞানী) নন’।[2] আল্লাহ পাক আমাদেরকে এদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন! অতএব, দ্বিতীয় অধ্যায়ে কোথায় তাক্বলীদ করা জায়েয এবং কোথায় জায়েয নয় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : জায়েয ও নাজায়েযের নিরিখে তাক্বলীদ

জেনে রাখা উচিত যে, যদি সাধারণ মানুষ বিভিন্ন কর্মব্যস্ততার কারণে লেখালেখি ও পড়ালেখা থেকে দূরে থাকে, কেবল আলেমদের থেকে জেনে নেওয়ার ওপর নির্ভর করে, তবে তার জন্য উপযুক্ত হ’ল এমন মুহাদ্দিছ ও দ্বীনদার আলেমদের নিকট জিজ্ঞাসা করা; যারা তাদের দ্বীনদারী, আল্লাহভীতি এবং কুরআন-হাদীছের জ্ঞানের জন্য প্রসিদ্ধ। তার নিকট এভাবে প্রশ্ন করবে যে, আমাদেরকে এই মাসআলায় সুন্নতে মুহাম্মাদী শিক্ষা দিন। আর যদি সে ব্যক্তি শিক্ষার্থী (طالب علم) হয় এবং তার অন্তরে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ থাকে, তবে উপযুক্ত হ’ল প্রথমে সে কুরআন ও হাদীছ অধ্যয়ন করবে; অতঃপর অন্যান্য কিতাবগুলোর দিকে মনোনিবেশ করবে। যাতে তার কাছে আয়নার মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোন বুযুর্গের রায় কোন স্থানে সঠিক হয়েছে এবং কোথায় ভুল রয়েছে।

সুতরাং যে মাসআলা কুরআন ও হাদীছে সাফ সাফ পাবে তাতে কোন মুজতাহিদের তাক্বলীদ করবে না। কেননা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত মাসআলায় ইজতিহাদের কোন অবকাশ নেই। সকল সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীছে রয়েছে, তিনি হযরত মু‘আয বিন জাবাল (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, আমার অনুপস্থিতিতে তোমার সামনে যখন কোন মোকদ্দমা আসবে তখন তুমি কিভাবে বিচার করবে? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিচার করব। তিনি বললেন, যদি আল্লাহর কিতাবে না পাও? উত্তরে বললেন, আল্লাহর রাসূলের সুন্নাত অনুসারে করব। তিনি বললেন, যদি আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতেও না পাও? তিনি বললেন, নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে ইজতিহাদ (চিন্তা-গবেষণা) করব, কোন ত্রুটি করব না। তাঁর কথায় রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আনন্দিত হয়ে প্রশংসা করলেন।[3]

এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআন ও হাদীছে কোন বিধান পরিষ্কার পাওয়া যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত ইজতিহাদের অবকাশ নেই। আর যদি মুজতাহিদদের গ্রন্থে কুরআন-হাদীছের খেলাফ কোন কথা পাওয়া যায় তবে তা উপেক্ষা করে দৃঢ়ভাবে কুরআন-হাদীছ অাঁকড়ে ধরা অপরিহার্য। অন্যথায় মুজতাহিদগণের বক্তব্যের কারণে কুরআন ও হাদীছের বিধান রহিত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেবে।

ইমাম আবূ হানীফা (রহ.) ছিলেন ইজতিহাদের পথের পথিকদের পথপ্রদর্শক। তাঁর থেকে দু’টি উক্তি বর্ণিত আছে। উক্তি দু’টি যেন দ্বীনরূপী গৃহের দুটি বৃহৎ স্তম্ভ। প্রথম উক্তি: ‘যদি আমার কোন কথা হাদীছের বিরোধী পাও তবে তা দেয়ালে ছুঁড়ে মেরো’।[4] এতে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, হাদীছের বিপরীতে ইমামের কথা মানলে ইমাম ছাহেবের কথামতই ঐ তাক্বলীদকারী নিজ ইমামের তাক্বলীদের গন্ডী থেকে বেরিয়ে যাবে। এমন আমলকারী তখন আর হানাফী থাকবে না। দ্বিতীয় উক্তি: ‘আমার কথা অনুযায়ী আমল করা কারো জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত জায়েয হবে না, যতক্ষণ না সে জানবে যে, এ কথা আমি কোত্থেকে বলেছি’।[5]

এত্থেকে বোঝা যায় যে, কোন দলীল না জেনে অন্ধভাবে ইমামের মত অাঁকড়ে ধরা এবং তাঁর বক্তব্যের পক্ষে দলীল ও ক্বিয়াসের বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা কখনোই সেই ইমামের পসন্দনীয় নয়। আর সেই ইমাম দুনিয়ায় এই দু’টি কথা বলার কারণে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর পাকড়াও থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন। মহান আল্লাহ বলেন,إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ ‘আমি এরূপ বলে থাকলে আপনি অবশ্যই তা জানবেন। আমার অন্তরে যা গোপন আছে আপনি তা জানেন, কিন্তু আপনার গুপ্ত বিষয় আমি জানি না। নিশ্চয়ই যাবতীয় গুপ্ত বিষয়ে আপনি সম্যক জ্ঞাত’ (মায়েদাহ ৫/১১৬)

আর মুক্বাল্লিদরা আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিস্তার পাবে না। তোমরা কি দেখ না, ইমামদের শিষ্যগণ যেসব মাসআলায় ইমামদের দলীলে আশ্বস্ত হ’তে পারেননি সেসব মাসআলায় তারা ইমামদের মত পরিহার করে ভিন্ন মত গ্রহণ করেছেন। ইমাম মুহাম্মাদ তো ইমাম আবু হানীফার বিপরীতে এত পরিমাণ মাসআলা বলেছেন যে, তাকে একটি স্বতন্ত্র মাযহাব আখ্যা দিলেও অত্যুক্তি হবে না। আর পরবর্তী যুগের আলেমগণ পূর্ববর্তী আলেমদের অনেক বক্তব্য বাতিল করে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হ’ল, যে বক্তব্য কুরআন ও হাদীছ বিরোধী তা পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে কোন দ্বিধা বা সংকোচ করা উচিত নয়। বহু আলেম সুস্পষ্ট ও জোরালো ভাষায় এ বিষয়ে বলেছেন। জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় তাদের কথা উল্লেখ করা সম্ভব হ’ল না। তাছাড়া হাদীছসমূহ সনদবিশিষ্ট, অথচ মুজতাহিদদের বাণীসমূহ সনদহীন। তাহক্বীক্ব বা গবেষণা করার অন্যতম শর্তই হ’ল, সনদে উল্লেখিত রাবীদের (বর্ণনাকারীদের) অবস্থা, তাঁদের বিশ্বস্ততা ও খ্যাতি বর্ণনা করা। কিন্তু মুজতাহিদদের কথার কোন সনদ নেই এবং তাদের মতামত তুলে ধরার সময় কোন সনদ উল্লেখ করাও হয় না। ইমামদের কার কাছ থেকে তা শোনা হয়েছে, তাঁর থেকে কে বর্ণনা করছেন, আর সেই বর্ণনাকারীদের অবস্থা-ই বা কী?

অতএব, যে পর্যন্ত কোন উক্তির সনদ উল্লেখিত শর্তাবলী অনুযায়ী প্রমাণিত না হয়, সে পর্যন্ত সেই উক্তির কীইবা মূল্য থাকতে পারে? কে জানে এটা ইমাম ছাহেবের উক্তি নাকি অন্য কেউ মনগড়াভাবে তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে? যেমন অনেক নাদান এই বিশ্বাসে ইমাম আবু হানীফার নামে অনেক কাল্পনিক ও নির্জলা মিথ্যা কথা চালিয়ে দিয়েছে যে, লোকেরা তাকে কামেল মুত্তাকী মনে করবে। কিছু বুযুর্গ এ ধরনের অন্ধ মুক্বাল্লিদদের অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন-

تقلید دو سه مقلد بيمعنی + بد نام کند نام جوان مردان را

‘দুই-তিনজন নির্বোধ মুক্বাল্লিদের অন্ধ তাক্বলীদ

বীরপুরুষদের সুনামকেও কলঙ্কিত করে দেয়’।

আর সনদ যদি যরূরীই না হ’ত তবে হাদীছের সনদ যাচাই নিয়ে অহেতুক কষ্ট করার দরকার কি ছিল? তাছাড়াও সকল আলেম এককথায় একমত যে, মুজতাহিদের রায় কখনো ভুল হয় আবার কখনো শুদ্ধ হয়। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, হাদীছ যা সনদযুক্ত ও নিষ্পাপ রাসূলের বাণী, তার বিপরীতে যে উক্তি সনদহীন এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। কিছু হাদীছ ও মুজতাহিদদের উক্তির মধ্যে কেন অমিল দেখা যায়, তার কারণ মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত। এই ছোট্ট পরিসরে সংক্ষেপে বর্ণনা করছি।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর তাঁর হাদীছসমূহ নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের স্মৃতিতে ও মুখে মুখে সংরক্ষিত ছিল। মনীষীগণ ভুলে যাওয়া, জাল হাদীছ রচনা ও হাদীছ বদলে দেওয়ার ভয়ে কিতাবে তা সংকলনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রত্যেক মুজতাহিদ ইমাম তাঁর সামর্থ্য ও তাওফীক অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিভিনণ হাদীছ যাচাই করে সেগুলো তাঁদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে সংকলন করেছেন। পরিশেষে সেই যুগ আসল, যখন ছিহাহ (বিশুদ্ধ হাদীছগ্রন্থসমূহ) ও অন্যান্য কিতাব রচিত হ’ল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নববী ইলমের পূর্ণ সংকলন আত্মপ্রকাশ লাভ করল এবং নতুন করে হাদীছ তাখরীজের কাজ স্থগিত হয়ে গেল। সকল হাদীছের প্রামাণ্যতা নির্ণীত বলে গণ্য হওয়ার পর এবং গোনাগুনি শেষে الْفَضْلُ لِمَنْ تَقَدَّمَ তথা ‘পূর্বে আগমন কারীদেরই শ্রেষ্ঠত্ব’ এই নিয়মানুযায়ী তা পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিছদের হাতে এসে পড়ল। যদিও এই ক্ষেত্রে সনদ অনুসন্ধান ও হাদীছ সংকলনের প্রচেষ্টার ছওয়াব পূর্ববর্তী আলেমদের জন্য সর্বাধিক; কিন্তু হাদীছের জ্ঞান অধিক পরিমাণে অর্জনের ফযীলত পরবর্তী যুগের মুহাদ্দিছগণ লাভ করেছেন। (ক্রমশ:)

 -মূল (ফার্সী): মাওলানা বেলায়েত আলী আযীমাবাদী

অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক



[1]. ইস্তিহসান (استحسان) : সার্বিক কোন দলীলের বিপরীতে কোন বিশেষ আংশিক কল্যাণকর বিষয়কে (মাছলাহাত) গ্রহণ করাকে ইস্তিহসান বলে।

[2]. আবুদাউদ হা/৩৬৬০; তিরমিযী হা/২৬৫৬; ইবনু মাজাহ হা/৩০৫৬।

[3]. আবুদাউদ হা/৩৫৯২; তিরমিযী হা/১৩২৭ আল্লামা আলবানী প্রমুখ হাদীছটির সনদ যঈফ বলেছেন। কিয়াসের বৈধতার দলীলে কিন্তু আহমাদ মোল্লা জীউনসহ আরো অনেকে এ হাদীছ উল্লেখ করেছেন। (নূরুল আনওয়ার ‘কিয়াস’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য)।

[4]. ছালেহ বিন মুহাম্মাদ ফুল্লানী, ঈক্বাযু হিমাম, পৃ. ৫০।

[5]. হাশিয়াহ ইবনে আবেদীন, ৬/২৯৩ পৃ.।






বিষয়সমূহ: আমল
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসে শিথিলতা : আমাদের করণীয় (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আক্বীদা ও আহকামে হাদীছের প্রামাণ্যতা (২য় কিস্তি) - মীযানুর রহমান মাদানী
বাংলা বানান রীতি ও আমাদের প্রস্তাবনা - প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত পরিচিতি - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
সমাজে অপরাধপ্রবণতা হ্রাসে কুরআনে বর্ণিত শাস্তিবিধানের অপরিহার্যতা (শেষ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
আধুনিক বিজ্ঞানে ইসলামের ভূমিকা - ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ওশর : দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার - ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম
ইসলামের দৃষ্টিতে সফলতার স্বরূপ - মুহাম্মাদ ওয়ারেছ মিয়াঁ
মৃত ব্যক্তির নিকট কুরআন তেলাওয়াতের বিধান - মুহাম্মাদ আব্দুর রহীম
অতি ধনীর সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে কেন? - আলী রিয়ায, প্রফেসর, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
মাসায়েলে কুরবানী - আত-তাহরীক ডেস্ক
আলেমগণের মধ্যে মতভেদের কারণ (শেষ কিস্তি) - আব্দুল আলীম বিন কাওছার
আরও
আরও
.