উদাহরণস্বরূপ, কোন ব্যক্তি যদি তার পিতা, মাতা, বোন ও দাদার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়, তাহ’লে সবার সম্পত্তি থেকে পাওয়া অংশ মিলিয়ে তার মোট সম্পদ অনেক বেশী হয়ে যাবে। যদিও এই সম্পদগুলো সে তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।

অতএব তৎকালীন পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ মুজতাহিদের কাছে সনদের শর্ত পূরণকারী অনেক হাদীছ পৌঁছতে পারেনি। ফলে এহেন পরিস্থিতিতে তাঁরা ইজতিহাদের ময়দানে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মানবীয় স্বভাবের কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁরা ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন এবং সেই সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে হাদীছের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে হাদীছসমূহ ব্যাপকভাবে সংকলিত হওয়ার ফলে মতভেদপূর্ণ জায়গাগুলো স্পষ্ট হয়ে যায়। এমতাবস্থায় (হাদীছ স্পষ্ট হওয়ার পর) ইমামদের সেই বক্তব্য বর্জন করতে দ্বিধা কোথায়? কেউ কেউ মনে করেন, হানাফী হিসাবে পরিচিত হওয়াও দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়। তাই আমরা যদি ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর কোন মতের বিরোধিতা করি তাহ’লে আর হানাফিয়াত অবশিষ্ট থাকবে না। এ ধারণার বিস্তারিত জবাব বোঝা প্রয়োজন।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর দিকে সম্পৃক্ত করে যে মাসআলা-মাসায়েল বর্ণনা করা হয় সেগুলো দুই ধরনের। প্রথমত, ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিজস্ব মতামত-যেগুলো ফিক্বহের কিতাবে عَنْ أَبِيْ حَنِيْفَةَ (আবু হানীফা থেকে বর্ণিত) বলে উল্লেখ করা হয়। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবিত মাসআলা-যা পরবর্তী আলেমগণ ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর বক্তব্য থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে বের করেছেন এবং সেগুলোকে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব হিসাবে প্রসিদ্ধ করেছেন। ফিক্বহের গ্রন্থগুলোতে এগুলোকে عِنْدَ أَبِيْ حَنِيْفَةَ (আবু হানীফার মতে) বলে উল্লেখ করা হয়। এটাকে বলা যায়, ইজতিহাদের মধ্যে আরেক ইজতিহাদ। প্রথম প্রকারের মতগুলো ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নিজস্ব ইজতিহাদ ছিল, যা সরাসরি কুরআন ও হাদীছ থেকে সংগৃহীত। এরপর আবার সেই মতামতগুলো থেকে অন্যান্য মাসআলা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই মাসআলাগুলোতে দুই ধরনের ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা প্রত্যেক ইস্তিম্বাতের মধ্যেই একটি ভুলের সম্ভাবনা থাকে। আর এসব কারণে কিছু কিছু মাসআলায় ইমাম ছাহেবের ছাত্রবৃন্দ ও অন্যান্য আলেমগণ ইমাম ছাহেবের মাযহাব থেকে সরে এসেছেন। এমনকি এই মুকবাল্লিদরাও সেসব ক্ষেত্রে অন্যান্য আলেমদের মত গ্রহণ করেছেন এবং স্বয়ং ইমাম আবু হানীফার তাক্বলীদ ত্যাগ করেছেন। ফলে তারা কোন জায়গায় হানাফী, কোন জায়গায় আবু ইউসুফী, কোন জায়গায় মুহাম্মাদী, কোন জায়গায় যুফারী, আবার কোন জায়গায় আবুল লায়ছী বনে গেছেন। তাহ’লে তাদের হানাফিয়াত আর অবশিষ্ট থাকল কোথায়?

আর যদি বলা হয় যে, তারা তো আবু হানীফা (রহ.)-এর শাগরিদ বা ছাত্র ছিলেন; তাহ’লে অন্য কেউ বলবেন যে, কোন কোন ইতিহাসবিদ ইমাম শাফেঈ (রহ.)-কেও তাঁর শাগরিদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আর যদি ধরে নিই যে, তারা তাঁর শাগরিদ ছিলেন, তবে সে কথা মাত্র দু’ব্যক্তির ক্ষেত্রে খাটে। তারা হ’লেন আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ। অন্য সকল আলেমের ক্ষেত্রে তো এই সম্পর্ক ছিল না। এছাড়াও যদি কোন ব্যক্তি আমার কোন বিষয়ে বিরোধিতা করে-চাই সে আমার অনুসারীদের একজনই হোক না কেন, তবুও আমি তাকে বিরোধী ছাড়া অন্য কিছুই বলব না। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে আমার বিরোধীর অনুসরণ করে; তাহ’লে সে ঐ নির্দিষ্ট মাসআলায় আর হানাফী থাকে না, বরং সে ঐ বিরোধীর মাযহাবপন্থী বলে বিবেচিত হবে। এই আলোচনা করার উদ্দেশ্য হ’ল, এ বিষয়টি স্পষ্ট করা যে, মুহাক্কিক আলেমদের উদ্দেশ্য হচ্ছে হকের অনুসরণ করা; কোন মানুষের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করা নয়। আরেকটা কথা এখানে উল্লেখ্য যে, ফিক্বহ শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি সম্পর্কে যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা জানেন ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এমন কোন গ্রন্থ লিখে যাননি, যার উপর ভিত্তি করে মাযহাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রচলিত ফিক্বহের গ্রন্থসমূহ যেমন- কানযুদ দাকায়েক, হেদায়া, আলমগিরী, কাযীখান ইত্যাদিতে যে অগণিত মাসআলা রয়েছে তার সবই ইমাম ছাহেব থেকে বর্ণিত নয়। বরং হাতে গোনা অল্প কিছু মাসআলা ইমাম ছাহেবের সাথে সম্পর্কিত আর সিংহভাগই ছাহেবাইন (আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ) থেকে বর্ণিত। আবার বহু মাসআলা পূর্ববর্তী আলেমদের কথা এবং অসংখ্য মাসআলা পরবর্তী আলেম যেমন হেদায়া, ফাতাওয়া, যাখীরা ইত্যাদি গ্রন্থকারের কথা। যারা তাদের বুঝ অনুসারে মাসআলাগুলোতে يَجُوْزُ وَ لَا يَجُوْزُ তথা ‘জায়েয ও নাজায়েয’ লিখে দিয়েছেন।

এটা স্পষ্ট যে, ইমাম আযম (রহ.)-এর তাক্বওয়ার কথা ক্রমাগত শুনতে শুনতে, তাঁর মাসআলাগুলো অনুধাবন করে এবং অন্তরের গভীর অনুভূতি থেকে তাঁর দ্বীনদারী ও প্রজ্ঞার প্রতি আমাদের মনে যে নিখাদ বিশ্বাস ও আস্থা তৈরী হয়েছে; নিজেদের হানাফী দাবী করা সকল আলেমের প্রতি আমাদের সেই আস্থা নেই। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি প্রসিদ্ধ এসব কিতাবে বর্ণিত কোন মাসআলাকে কুরআন ও হাদীছের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে অথবা অপসন্দনীয় ইস্তিম্বাত মনে হওয়ার কারণে ঐ মাসআলা উপেক্ষা করেন, তাহ’লে প্রকৃতপক্ষে এতে কোন ত্রুটি নেই।

প্রসঙ্গত এখানে আরেকটি আলোচনা এসে যায় যে, ক্বিয়াস থেকে উদ্ভাবিত মাসআলাগুলোর ক্ষেত্রে কি করবে? জেনে রাখা উচিত যে, কুরআন ও হাদীছ নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলনের ফলে কিছু কিছু লোকের মধ্যে ঈমানী আলোর তেয, বিবেকের সুস্থতা ও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা এতখানি তৈরি হয় যে, সেই যোগ্যতাবলে ক্বিবয়াস থেকে উদ্ভাবিত অধিকাংশ মাসআলার কোনটা হক ও কোনটা না-হক তা তাদের সামনে সন্দেহাতীতভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে এমন হয় যে, দলীল-প্রমাণ অনুধাবনের পর সত্য আপনা থেকে তাদের সামনে উন্মোচিত হয়ে যায়। এমন উন্মোচন ঘটলে তারা চোখ বন্ধ করে কারো তাক্বলীদ মেনে নেবে না। কেননা মানুষকে ক্বিয়ামতে তার নিজের আকল সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে; অন্যের আকল সম্পর্কে নয়। সুতরাং জেনে-বুঝে সত্যের বিরোধিতা করলে সেজন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হ’তে হবে। ইমাম ছাহেবের দু’টি মতের দ্বিতীয় মত এ কথাকেই নির্দেশ করে।[1] যদি কেউ এ ধরনের যোগ্যতায় উপনীত হ’তে না পারেন তবে মুজতাহিদদের মধ্যে যাকে বেশী দ্বীনদার বলে অনুমিত হবে সে তার তাক্বলীদ করবে। কারণ ব্যক্তি যখন ইজতিহাদ বা গবেষণার স্তরে পৌঁছতে পারে না তখন তাক্বলীদ ছাড়া তার অন্য উপায় থাকে না।[2] কিন্তু গবেষণা-ইজতিহাদের রাস্তা খুলে গেলে তাকে তাক্বলীদ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করতে হবে। কারণ অন্ধ ব্যক্তি বাধ্য হয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু যার দৃষ্টিশক্তি আছে সে কি ইচ্ছাকৃত চোখ বন্ধ করে প্রতিটি দেয়াল ও দরজায় হোঁচট খাবে?

এ থেকে স্পষ্ট হ’ল যে, প্রত্যেক সত্যসন্ধানী ব্যক্তির জন্য কুরআন ও হাদীছ শিক্ষা করা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষ এটিকে অত্যন্ত কঠিন মনে করে এবং বলে যে, কুরআন ও হাদীছের জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত কঠিন কাজ, যা অর্জন করার যোগ্যতা কেবল পূর্ববর্তী মনীষীদেরই ছিল। এজন্যই তৃতীয় অধ্যায়টি এই পথকে সহজ করার উদ্দেশ্যে রচনা করা প্রয়োজন মনে করলাম, যাতে এই মহা নে‘মত অর্জনে মুমিনদের আগ্রহ ও মনোবল বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ : কুরআন ও হাদীছের জ্ঞান অর্জন সহজীকরণ

কুরআন মাজীদ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর উপর তাঁর ছাহাবীদের সামনে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা সবাই ছিলেন নিরক্ষর। এই নিরক্ষর লোকেরাই ছিলেন আল-কুরআনের প্রত্যক্ষ সম্বোধিত ব্যক্তিবর্গ। পরবর্তী অন্য সকল মানুষ তাঁদের অনুগামী ও পরোক্ষ শ্রোতা। কুরআনে ব্যবহৃত উপমা, দৃষ্টান্ত ও কথোপকথন-সবই আরব জাতির প্রচলিত রীতি-নীতি ও আচার-ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরআনের সাথে কোন তাফসীর নাযিল হয়নি। যদি নিরক্ষর লোকদের বোধশক্তি কুরআনের অর্থ বুঝায় যথেষ্ট না হ’ত তাহ’লে ছাহাবায়ে কেরাম কিভাবে কুরআন বুঝতেন এবং তার আদেশ-নিষেধ পালন করতেন? আল্লাহ তা‘আলা সূরা ক্বামারের বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন,وَلَقَدْ يَسَّرْنَا ٱلْقُرْءَانَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ، ‘আমরা কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। উপদেশ গ্রহণের জন্য কেউ আছে কি? (ক্বামার ৫৪/১৭, ২২, ৩২, ৪০)। সুতরাং কুরআন বুঝা মুশকিল বললে এ আয়াতকে অস্বীকার করা হবে। মহান আল্লাহ পূর্বযুগের কুরআন পাঠকদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, তারা কুরআন মাজীদে হরকত যোগ করে আমাদের জন্য শব্দতত্ত্ব (عِلْمُ الصَّرْفِ) ও বাক্যতত্ত্ব (عِلْمُ النَّحْوِ) শেখার প্রয়োজনীয়তা দূর করে দিয়েছেন। মানুষ কুরআন শরীফে যে আলিফ-লাম ও এই জাতীয় বিষয়ের সূক্ষ্ম গবেষণা করে থাকে, তার মূল কারণ হ’ল কিছু মানুষের কাছে কুরআন পাঠের উদ্দেশ্য কেবল আহকাম (বিধানাবলী) পালন করা। ফলে তাদের দৃষ্টি এসব অপ্রয়োজনীয় সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দিকে ধাবিত হয় না। পক্ষান্তরে কিছু মানুষের উদ্দেশ্য থাকে কুরআন চর্চার মাধ্যমে নিজেদেরকে গবেষক আলেমদের সারিতে শামিল করা। তাই স্বভাবতই তাদের মন-মানসিকতা এসব চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্ম অনুসন্ধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

এই কথাটির সত্যতা পার্থিব নানা দৃষ্টান্ত থেকেও উপলব্ধি করা যায়। যেমন-রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসকদের পক্ষ থেকে যখন কোন সরকারী পরোয়ানা জারি হয়, তখন তার প্রতিটি বাক্যে হাযারো সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার সুযোগ ও গবেষণামূলক আলোচনার অবকাশ থাকা সত্ত্বেও; সাধারণ প্রজা চাই শিক্ষিত হোক কিংবা অশিক্ষিত, আদেশ-নিষেধ অনুধাবন করা ছাড়া অন্য কোন দিকে নজর দেয় না। কারণ সেই পরোয়ানা পাঠের পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য থাকে আদেশের আলোকে কোন নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করা। কিন্তু কবিতা বা গযলের বিষয় তেমন নয়। কারণ তা পাঠের উদ্দেশ্য কোন আদেশ বাস্তবায়ন করা নয়। ফলে প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন পাঠক এর সূক্ষ্ম বাক্যশৈলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং একটি শব্দ থেকেই শত শত অর্থ বের করে নেয়। অনুরূপভাবে হাদীছ শাস্ত্রেরও দু’টি শাখা রয়েছে। একটি হ’ল ইলমুল মাতন (علم المتن) অর্থাৎ হাদীছের শব্দাবলী থেকে দ্বীনী মূল উদ্দেশ্য অনুধাবন করা; আর অপরটিকে বলা হয় ফান্নে আসানীদ (فن اسانيد) অর্থাৎ হাদীছের বর্ণনাক্রম বা সনদ বিশ্লেষণ করে এর গ্রহণযোগ্যতা ও দুর্বলতার স্তর নির্ধারণ করা। এসব বিদ্যা অর্জন মানুষের ঈমানী শক্তির উপর নির্ভর করে। যার ঈমান যত তেজোদ্দীপ্ত হবে সে ততই কুরআন-হাদীছ থেকে শারঈ আহকাম উদ্ভাবন করতে পারবে এবং কুরআন-হাদীছের শব্দের চমৎকারিত্বে মুগ্ধ হবে। ঈমান দুর্বল হ’লেও অনুসরণের নিয়তে যে এই বরকতময় গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করবে সেও তা অনুধাবন করা থেকে বঞ্চিত হবে না। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হাদীছসমূহ ছিল আরবদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত সহজ, প্রাঞ্জল ও বোধগম্য ভাষায়, যা সাধারণ মরুবাসী বেদুঈনদেরও বুঝতে সমস্যা হ’ত না।

কুরআন-হাদীছের অনুবাদও অধিকাংশ ভাষায় পাওয়া যায়। ফলে অনারবদেরও তা বুঝতে মোটেও অসুবিধা পোহাতে হয় না। অন্যান্য বই যেমন কাফিয়াহ, শাফিয়াহ, মুতাওয়াল, কিফায়াহ, হেদায়াহ, কামূস, কাশশাফ ইত্যাদির অবস্থা একটু ভাবুন! গ্রন্থগুলোর পাঠ (Text) বা মূল লেখা এতই সূক্ষ্ম ও ইঙ্গিতপূর্ণ যে, কেবল একটি গ্রন্থের মর্ম পুরোপুরি উদ্ধার করতে একজন মানুষের পুরো জীবন কেটে যেতে পারে। বিষয়টি আলেমদের কাছে অজানা নয়। ক্বিয়ামতের দিন কিন্তু এই কুরআন ও হাদীছ সম্পর্কে মানুষকে জিজ্ঞাসা করা হবে, অন্য কোন গ্রন্থ সম্পর্কে নয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, অন্যান্য গ্রন্থ পড়া হয় নিষেধ অথবা উপকারশূন্য। মূল কথা হ’ল, প্রয়োজনীয় বিষয়কে অপ্রয়োজনীয় বিষয় থেকে এবং উত্তম বিষয়কে নিম্নতর বিষয় থেকে পৃথক করতে হবে। যে বিষয় অধিক প্রয়োজনীয় ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ, প্রথমে সেটিই গ্রহণ করতে হবে। এরপর সময়-সুযোগ অবশিষ্ট থাকলে যে গ্রন্থের প্রতি স্বভাবত আগ্রহ রয়েছে সে গ্রন্থ অধ্যয়নে মনোনিবেশ করা যেতে পারে। কবি বলেন,

عمر قلیل آمد و علمت کثیر + آنچه ضروریست همان پیش گیر

‘জীবন যে হায় সংক্ষিপ্ত অতি, জ্ঞান যে অগাধ সিন্ধু,

যা কিছু পাও আবশ্যিক, তা-ই তুলে নাও বিন্দু বিন্দু’।

ইলমুল আসানীদ বা সনদবিজ্ঞান হ’ল, হাদীছ বর্ণনাকারী রাবীদের পুরো অবস্থা যথাযথভাবে জানা এবং তাঁদের সংখ্যা কম না বেশী তা জানার বিদ্যা। কারণ হাদীছের শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা নির্ভর করে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা, তাঁদের দুর্বলতা ও যোগ্যতার ওপর। আর সনদ হ’ল এমন কোন নির্ভরযোগ্য উস্তাদের কাছ থেকে হাদীছ শ্রবণ করা, যার সনদের ধারাবাহিকতা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পর্যন্ত সুদৃঢ়ভাবে সংযুক্ত রয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, প্রাথমিক যুগে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছাকাছি সময়ে এ ধরনের সনদ অর্জন আমাদের যুগের তুলনায় অনেক সহজ ছিল। হেদায়াতের সেই প্রাথমিক যুগ আমাদের থেকে বহু দূরে চলে গেছে। আবার পূর্বযুগের আলেমগণ যেমন কুতুবে সিত্তাহ প্রভৃতি গ্রন্থের সংকলকদের ফাক্বাহাত বা জ্ঞানগরিমা দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল। তারা প্রতিটি হাদীছ সনদসহ তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। অতঃপর এখন মুতাওয়াতিরভাবে তাদের গ্রন্থ থেকে মানুষ হাদীছ বর্ণনা করে চলেছেন। ফলে বর্তমানে এসব গ্রন্থ পরিবর্তন বা বিকৃত করা অসম্ভব। তারা হাদীছ বর্ণনাকারী রাবীদের অবস্থা আসমাউর রিজাল শাস্ত্রে সংকলন করে গেছেন। এ ধরনের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সংকলিত ও সংরক্ষিত হওয়ার পর পৃথকভাবে সনদ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে দূর হয়ে গেছে।مَنْ جَرَّبَ الْمُجَرَّبَ حَلَّتْ بِهِ النَّدَامَةُ ‘পরীক্ষিত জিনিস যে পরীক্ষা করে পরিণামে সে অনুশোচনা ভোগ করে’।

অতএব কোন ব্যক্তি যদি উদাহরণস্বরূপ ছহীহ বুখারী দেখেন, তাহ’লে মনে হবে যেন তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারী (রহ.)-এর কাছ থেকেই সনদ গ্রহণ করছেন। কারণ তিনি তাঁর গ্রন্থে নিজের সনদের ধারাবাহিকতা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। সুতরাং কেউ যখন ছহীহ বুখারীতে কোন হাদীছ খুঁজে পেল, তখন যেন তিনি তা সরাসরি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মুখ থেকেই শুনল। অনুরূপভাবে মিশকাতুল মাছাবীহ-এর সংকলকও তাঁর ভূমিকার মধ্যে এ কথাই জানিয়েছেন যে, আমরা যখন আমাদের হাদীছসমূহকে নির্ভরযোগ্য ছহীহ গ্রন্থগুলোতে দেখতে পেয়েছি, তখন মনে হয়েছে যেন আমরা সেগুলো রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছ থেকেই সনদের মাধ্যমে গ্রহণ করেছি। কারণ এসব গ্রন্থের সংকলকগণ আমাদের পৃথকভাবে সনদ গ্রহণের প্রয়োজন থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে আরও বহু মুহাদ্দিছ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যে, বর্তমান যুগে সনদ মূলত একটি প্রচলিত রীতি হিসাবেই অবশিষ্ট রয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী মুহাদ্দিছগণকে তার রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন! তাঁরা জাল ও নির্ভেজাল হাদীছকে পৃথক করেছেন, ছহীহ ও দুর্বল হাদীছকে আলাদা করেছেন এবং হাদীছের বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদা অনুযায়ী সেগুলো তাঁদের গ্রন্থসমূহে সংকলন করেছেন। তাঁরা প্রতিটি বিষয়কে আলাদা আলাদা অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করেছেন। হাদীছের গ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, হাদীছসমূহের মধ্যে খবরিয়াত (خبريات) বা সংবাদমূলক (আক্বীদাহ, ইতিহাস অথবা পরকালীন সংবাদ সংক্রান্ত) মাসআলাও অগণিত রয়েছে। বর্তমানে হাদীছশাস্ত্র অধ্যয়ন করাও ফিক্বহের গ্রন্থসমূহের মত অনেক সহজবোধ্য হয়ে গেছে। কোন একটি মাসআলা সামনে এলে, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে তা অনুসন্ধান করলেই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নির্দেশনা পাওয়া যাবে। বরং কোন কোন দিক থেকে ফিক্বহের চেয়েও হাদীছ বুঝা সহজ। কারণ ফিক্বহের কিতাব অগণিত এবং আলেমগণ সেগুলোতে পরস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন। যদি এক গ্রন্থে কোন মাসআলা জায়েয লেখা থাকে তবে প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে যে, অন্য গ্রন্থে তা নাজায়েয লেখা থাকবে। আবার কোন মত অনুযায়ী আমল করা হবে সেটাও লেখা নেই।

কোথা থেকেই বা এতসব গ্রন্থ এক জায়গায় করা যাবে? আর সেসব গ্রন্থে খুঁজে খুঁজে আল্লাহর বিধান বের করার এত সময়ই বা কোথায়? শ্রুত ও গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হাদীছ অসংখ্য হ’লেও বহুলাংশে তা জাল বা মওযূ। মুহাদ্দিছগণ তাদের মুসনাদ গ্রন্থাবলীতে যেসব হাদীছ সংকলন করেছেন তার সংখ্যা সীমিত ও গণনাকৃত। তারা তাদের গ্রন্থে ছহীহ হাদীছ সংগ্রহ ও সংকলন করে তার সংখ্যা বলে দিয়েছেন। এ বিষয়টি জ্ঞানীদের নিকট অজানা নয়। হাদীছের গ্রন্থগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসূখ (রহিত) হাদীছ এক পরিচ্ছেদে বর্ণনা করা হয়েছে, ফলে অনুসন্ধানকারীদের তা নিয়ে পেরেশান হ’তে হয় না।

হাদীছটি রহিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন আশঙ্কায় কোন হাদীছের উপর আমল পরিত্যাগ ঠিক হবে না। কেননা রহিত হওয়ার এ সম্ভাবনা তো সকল হাদীছের বেলায় প্রযোজ্য। কারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জীবনের সকল কথা সংগৃহীত হয়নি। বরং অনেক কথাই হাতছাড়া হয়ে গেছে। আর এমন হ’লে তো কোন মুজতাহিদের জন্যই একটা হাদীছের উপরও আমল সমীচীন হবে না।

(৯ম পৃষ্ঠার পর)

এক্ষেত্রে প্রকৃত সত্য এই যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নাসেখ হাদীছ কারো কাছে না পৌঁছে ততক্ষণ পর্যন্ত মানসূখ হাদীছ তার ক্ষেত্রে মানসূখ গণ্য হবে না যদিও বাস্তবে তা মানসূখ। যখন নাসেখ হাদীছ পৌঁছাবে তখন মানসূখ হাদীছের উপর আমল আদৌ জায়েয হবে না। রাবী‘আ (বাহরাইন) গোত্রের জন্য حَنْتَمٌ (হানতাম বা সবুজ কলস) ও دُبَّاءٌ (দুববাউ বা লাউয়ের খোলের পাত্র) ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা ততদিন পর্যন্ত মানসূখ হয়নি যতদিন পর্যন্ত না নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার নাসেখ হাদীছ তাদের হাতে পৌঁছেছে। অতএব সুন্নাতের অনুগামীর কর্তব্য হবে জীবনভর যদি তার হাতে একটি হাদীছও হস্তগত হয় এবং আর কোন হাদীছের দেখা না মেলে তবুও সে সেই একটি হাদীছকে মহামূল্যবান মনে করে অাঁকড়ে ধরে রাখবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, بَلِّغُوْا عَنِّي وَ لَوْ أَيَة (‘একটা আয়াত হ’লেও আমার পক্ষ থেকে তা পৌঁছে দাও’)-এর মর্ম এটাই। কিতাবসমূহ অনুসন্ধান করলে জানা যায় যে, পূর্ববর্তী আলেমগণও নাসেখ হাদীছ হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত মানসূখ হাদীছের উপর আমল করছেন।

পরস্পর বিরোধার্থক হাদীছ সমূহও (أَحَادِيْثُ مُتَعَارِضَة) হাদীছ গ্রন্থে এক জায়গায় লেখা হয়ে থাকে, যাতে একটু চিন্তা-ভাবনা করলেই বিরোধ দূর হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কথার মধ্যে দৃশ্যত কোন বিরোধ থাকার কথা নয়। কিন্তু স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের চোখে তা বিরোধপূর্ণ মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি হাদীছের অর্থ ও প্রয়োগের ক্ষেত্র ভিন্ন হয়ে থাকে। হাদীছের প্রকারভেদ সম্পর্কে একটি কথা বাকী রয়ে গেছে। তা এই যে, ‘উছূলে হাদীছ’ বা হাদীছের মূলনীতি শাস্ত্রের আলেমগণ হাদীছের অনেক প্রকার বর্ণনা করেছেন। যেমন ছহীহ, হাসান, আহসান, গরীব, মুরসাল, মারফূ, মওকূফ, মাকতূ ইত্যাদি। হাদীছের এত সব মাত্রা বা স্তর প্রত্যেকের মস্তিষ্ক দ্রুত আয়ত্ত করতে পারে না। ফলে হাদীছের উপর আমল থমকে যেতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে যে, হাদীছের প্রকারভেদগুলোর এই আধিক্য মূলত বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ ও শর্তের পার্থক্যের কারণে হয়ে থাকে। যত বেশী শর্ত ও দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করা হবে, প্রকারের সংখ্যা তত বাড়তেই থাকবে; আর যত শর্ত কমানো হবে, প্রকারের সংখ্যাও তত কমে আসবে। যেমন মানুষ দুই প্রকার হ’তে পারে, যথা: শ্বেতকায় ও কৃষ্ণকায়। আবার হাযার প্রকারও হ’তে পারে। যথা: সাদা, কালো, লাল, বাদামী, পিঙ্গল, লম্বা গলা, খাটো গলা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু হাদীছের ক্ষেত্রে প্রকারভেদ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ আমলকারীদের মধ্যে প্রচুর দ্বিধাবোধ বা সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

উছূলে হাদীছ শাস্ত্রের আলেমগণ হাদীছের প্রকার নির্ণয়ে চমৎকার ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। হাদীছের ওপর আমলকারীরাও যদি নিজেদের সামনে একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি রাখেন, তাহ’লে তাতে অনেক উপকার হবে। সেই সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিটি হ’ল, মওযূ‘ (জাল) নয় এমন সব হাদীছ মূলত দুই প্রকার: শক্তিশালী (قوی) ও দুর্বল (ضعيف)। শক্তিশালী সেই হাদীছকে বলে যার বর্ণনাকারীগণ অজ্ঞাত নন এবং তাদের নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণিত। আর দুর্বল সেই হাদীছকে বলে যার বর্ণনাকারীদের সনদ অজ্ঞাত নয়; কিন্তু সেই বর্ণনাকারীদের বিশ্বস্ততা (ثقات) এবং অন্যান্য অবস্থা যথাযথভাবে প্রমাণিত নয়। সবল হাদীছকে তারা আবার দুই প্রকার বলে থাকেন। কোন হাদীছ বা তার বিষয়বস্ত্ত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে একাধিক ব্যক্তি বর্ণনা করলে সেটি মুতাওয়াতির। আর যদি এমন না হয় তাহ’লে সেটি গায়রে মুতাওয়াতির। অন্যান্য কিতাবে ওলামায়ে কেরাম মুতাওয়াতির হাদীছের বর্ণনাকারীর নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করেননি। এর কারণ হ’ল, রাবীদের অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কারণে তাওয়াতুরের জন্য নির্দিষ্ট কোন সংখ্যা নির্ধারিত নেই। যখন কোন বর্ণনা সামগ্রিকভাবে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করিয়ে দেয়, তখনই সেটি মুতাওয়াতির হিসাবে গণ্য হয়। তবে এ কথা অস্পষ্ট নয় যে, যখন রাবীগণ বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ ও সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হন, তখন তাঁদের তিনজনের বর্ণনাও নিশ্চিত জ্ঞান প্রদান করে। এ কারণে এখানে তা তিনজন রাবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

মুতাওয়াতির হাদীছ অকাট্য দলীল (نَصّ قطعی)। অমুতাওয়াতির হাদীছ প্রবল ধারণার ভিত্তিতে সত্য বলে বিবেচিত (مظنون الصدق بظن غالب)। আর দুর্বল হাদীছ সত্য ও মিথ্যা উভয়েরই সম্ভাবনাযুক্ত। দুর্বল হাদীছ ক্বিয়ামত, বারযাখ, জাহান্নাম, জান্নাত, ভয় প্রদর্শন, উৎসাহ প্রদান এবং এ ধরনের বিষয়সমূহে গ্রহণ করা হবে। আদেশ-নিষেধের ক্ষেত্রেও হদ, ক্বিছাছ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়া, যদি এর বিপরীতে কোন শক্তিশালী হাদীছ না থাকে; তাহ’লে তার ওপর আমল করা হবে। আর যদি শক্তিশালী হাদীছ এর বিরোধী হয়, তাহ’লে তা (যঈফ হাদীছ) পরিত্যাগ করতে হবে। এছাড়াও যদি পরবর্তীতে একই বিষয়বস্ত্তর তিনটি দুর্বল হাদীছ পাওয়া যায়, তাহ’লে সেগুলো শক্তিশালী হাদীছের বিধান লাভ করবে।[3] মুতাওয়াতির হাদীছ দ্বারা অমুতাওয়াতির হাদীছকে রহিত করা জায়েয। শক্তিশালী অমুতাওয়াতির হাদীছের মাধ্যমে প্রমাণিত কোন বিধানের উপর আমল করা ফরয এবং তা অস্বীকারকারী কাফের। হাদীছের এই পরিমাণ প্রকারভেদ ও বিধান প্রত্যেক আমলকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী জানা যরূরী এবং যথেষ্ট।

-মূল (ফার্সী): মাওলানা বেলায়েত আলী আযীমাবাদী

অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

[1]. যখন কোন মাসআলায় তিনি প্রথম একটি মত দিয়েছিলেন তখন দলীলসহই সে মত দিয়েছিলেন। অধিকতর যাচাইয়ে যখন তার সামনে ভিন্ন মতের দলীল অধিক সঠিক মনে হয়েছে তখন প্রথম মত পরিহার করে তিনি দ্বিতীয় মত দিয়েছেন। সুতরাং অধিকতর যাচাইয়ে আজও ইমাম ছাহেবের মতের বিপরীতে কুরআন-হাদীছের দলীল পাওয়া গেলে সেটা গ্রহণ করতে হবে। -অনুবাদক

[2]. ইজতিহাদের যোগ্যতাহীন সাধারণ মানুষ বিজ্ঞ ও পরহেযগার আলেমের থেকে জেনে আমল করবে (নাহল ১৬/৪৩; আম্বিয়া ২১/৭)। তবে উছূলের পরিভাষায় একে অন্ধ ‘তাক্বলীদ’ না ব’লে ‘ইত্তিবা’ বা ফৎওয়া অনুসরণ বলা উচিৎ। কারণ সাধারণ মানুষের জন্য কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অন্ধ আনুগত্য (তাক্বলীদে শাখছী) ওয়াজিব নয় (ইবনু হাযম, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৬/১১৯; আল-আমাদী, আল-ইহকাম ফী উছূলিল আহকাম, ৪/২৮৩)। বরং তাদের মূল কাজ হ’ল, সমকালের সবচেয়ে দ্বীনদার, সুন্নাতের অনুসারী ও বিজ্ঞ আলেম বা মুফতীর নিকট থেকে শরী‘আতের বিধান জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী আমল করা; যার পরিভাষাগত অবস্থান মাযহাবী তাক্বলীদের ঊর্ধ্বে (ইবনুল ক্বাইয়্যিম, ই‘লামুল মুওয়াক্কি‘ঈন, ৪/২৬১; শাতিবী, আল-মুওয়াফাক্বাত, ৪/২৯২; শাওকানী, ইরশাদুল ফুহূল, ২/১০৩২)। -অনুবাদক

[3]. মাননীয় লেখকের এই বক্তব্যটি সঠিক নয়। কয়েকটি যঈফ হাদীছ একত্র হ’লেই তা ছহীহ হাদীছে পরিণত হয় না। উছূলে হাদীছ অনুযায়ী হাদীছের ছহীহ বা যঈফ হওয়া সনদ ও মতনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে, যা কোন সংখ্যাগত বিষয় নয় (ইবনু হাজার, নুযহাতুন নাযার, পৃ. ৮০-৮৫; ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দিমাহ ইবনুছ ছালাহ, পৃ. ৩৪-৩৬)। তবে সামান্য দুর্বলতাসম্পন্ন হাদীছ একাধিক স্বতন্ত্র সনদে বর্ণিত হ’লে তা ‘হাসান লিগায়রিহী’ (حسن لغيره) পর্যায়ে উন্নীত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ‘কয়েকটি যঈফ হাদীছ মিলে একটি ছহীহ হাদীছ হয়ে গেল’। বরং এটি হাসান লিগাইরিহী, যা পরিভাষাগতভাবে ছহীহ লিযাতিহির সমান নয় (ঐ)। পক্ষান্তরে বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী বা অতি দুর্বল হ’লে একাধিক সনদ থাকলেও তা শক্তিশালী হয় না (সাখাবী, ফাতহুল মুগীছ, ১/৬৮-৭০)। অতএব আক্বীদা ও হালাল-হারামসহ শরী‘আতের কোন বিধানেই যঈফ হাদীছ একক দলীল হ’তে পারে না; বরং মূল বিধান কুরআন বা ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত থাকলে একে কেবল সহায়ক প্রমাণ (শাহিদ ও মুতাবা‘আত) হিসাবে উল্লেখ করা যায় (ইমাম মুসলিম, মুকাদ্দামাহ ছহীহ মুসলিম, ১/৭; ইবনু তায়মিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ১/২৫০; শাতিবী, আল-ই‘তিছাম, ১/২৪০) -অনুবাদক।






বিষয়সমূহ: আমল
রামাযান ও ছিয়াম সম্পর্কে কতিপয় যঈফ ও জাল বর্ণনা - ড. মুহাম্মাদ কাবীরুল ইসলাম
জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিরিখে যেলাসমূহের মাঝে সময়ের পার্থক্যের কারণ - তাহসীন আল-মাহী
হাদীছ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পরিক্রমা (৬ষ্ঠ কিস্তি) (জুলাই ২০২৩-এর পর) - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
ইখলাছ মুক্তির পাথেয় (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছ আলেমগণের অগ্রণী ভূমিকা - ড. নূরুল ইসলাম
মাসায়েলে কুরবানী - আত-তাহরীক ডেস্ক
বিদ‘আতে হাসানার উদাহরণ : একটি পর্যালোচনা - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
হিজামা : নবী (ছাঃ)-এর চিকিৎসা - মুহাম্মাদ আবু তাহের, পরিচালক, কিউসেট ইনস্টিটিউট, সিলেট।
১৬ মাসের মর্মান্তিক কারা স্মৃতি (৭ম কিস্তি) - মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
নববী চিকিৎসা পদ্ধতি - কামারুযযামান বিন আব্দুল বারী
জীবনের খেলা ঘরে - মাওলানা মুহিউদ্দীন খান - প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মাসিক মদীনা
আশূরায়ে মুহাররম - আত-তাহরীক ডেস্ক
আরও
আরও
.