রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গোপন একটি রোগ। এটি মানুষের অন্তরে এমনভাবে প্রবেশ করে যে, অনেক সময় আমলকারী নিজেও তা অনুভব করতে পারে না। এজন্যই সালাফে ছালেহীন রিয়াকে অত্যন্ত ভয় করতেন। শায়খ সুলায়মান বিন আব্দুল্লাহ আলে শায়খ (রহঃ) বলেন, الرِّيَاءُ أَخْوَفُ عَلَى الصَّالِحِينَ مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ ‘দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও রিয়া নেককারদের জন্য অধিক ভীতিকর’।[1] তাঁরা নিজেদের আমলকে নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগতেন না; বরং আমল করার পর তা কবুল হবে কি-না এই আশঙ্কায় নিজেদের অন্তরকে পরীক্ষা করতেন। গোপনে ইবাদত করা, মানুষের প্রশংসা থেকে দূরে থাকা, নিজের নেক আমল গোপন রাখা এবং নিয়তকে বারবার সংশোধন করা ছিল তাঁদের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সালাফে ছালেহীন যেভাবে রিয়া থেকে আত্মরক্ষা করতেন
১. নিয়তের পরিশুদ্ধিতা অর্জন :
সালাফে ছালেহীনের কাছে ইখলাছ ছিল আমলের প্রাণ, আর রিয়া অন্তরের সবচেয়ে ভয়ংকর রোগ। তাঁরা আমলের পরিমাণ বৃদ্ধির চেয়ে নিয়তের পরিশুদ্ধিতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতেন। এজন্যই ইমাম বুখারী (রহঃ) সহ বহু মুহাদ্দিছ তাঁদের সংকলিত হাদীছ গ্রন্থসমূহের শুরুতে إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ‘সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল’[2] হাদীছটি নিয়ে এসেছেন। আব্দুর রহমান বিন মাহদী (রহ.) বলেন,لَوْ صَنَّفْتُ كِتَابًا فِي الْأَبْوَابِ، لَجَعَلْتُ حَدِيثَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي الْأَعْمَالِ بِالنِّيَّاتِ فِي كُلِّ بَابٍ ‘আমি যদি বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত কোন গ্রন্থ রচনা করতাম, তবে প্রত্যেকটি অধ্যায়ের শুরুতেই ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বর্ণিত নিয়তের হাদীছটি উল্লেখ করতাম’।[3] তিনি আরো বলেন,مَنْ أَرَادَ أَنْ يُصَنِّفَ كِتَابًا، فَلْيَبْدَأْ بِحَدِيثِ الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ‘যে ব্যক্তি কোন গ্রন্থ রচনা করতে চায়, তার উচিত নিয়তের হাদীছটি দ্বারা গ্রন্থের সূচনা করা’। এজন্য ইমাম শাফেঈ (রহঃ) প্রমুখ বিদ্বান এই হাদীছটিকে জ্ঞানের এক তৃতীয়াংশ বলে আখ্যায়িত করেছেন।[4] ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন,يَدْخُلُ هٰذَا الْحَدِيثُ فِي سَبْعِينَ بَابًا مِنْ أَبْوَابِ الْفِقْهِ ‘এই হাদীছটি ফিক্বহের সত্তরটি অধ্যায়ে প্রযোজ্য’।[5]
ইয়াহ্ইয়া বিন আবী কাছীর (রহঃ) বলেন,تَعَلَّمُوا النِّيَّةَ، فَإِنَّهَا أَبْلَغُ مِنَ الْعَمَلِ ‘নিয়ত শিক্ষা কর। কারণ বিশুদ্ধ নিয়ত আমলের চেয়েও অধিক ফলপ্রসূ ও তাৎপর্যপূর্ণ’।[6] ইবনু আবী জামরাহ বলেন, ‘আমার প্রবল ইচ্ছা, যদি ফকীহদের মধ্যে এমন কেউ থাকতেন, যার একমাত্র কাজ হতো মানুষকে আমলের উদ্দেশ্যে (নিয়ত ও আন্তরিকতা) শিক্ষা দেওয়া। তিনি শুধু নিয়তের হাদীছটিই পাঠদান করতেন।[7] কারণ, মানুষের অধিকাংশ বিপর্যয় ও বিচ্যুতি ঘটেছে এই বিষয়টির প্রতি অবহেলার কারণেই। যুবাইদ ইবনুল হারেছ আল-ইয়ামী (রহ.) বলেন, ‘আমি আনন্দিত হই- যেন আমরা প্রতিটি কাজেই একটি নেক নিয়ত থাকে; এমনকি খাওয়া ও ঘুমানোর ক্ষেত্রেও’।[8] আব্দুর রহমান ইবনে যুবাইদ (রহ.) বলেন, ‘আমার পিতা বলতেন, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি যে কাজই করতে চাও না কেন, তাতে কল্যাণের নিয়ত কর; এমনকি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বের হওয়ার সময়ও’।[9]
নিয়তের অত্যধিক গুরুত্বের কারণে সালাফে ছালেহীন প্রতিনিয়ত তাদের নিয়তকে নবায়ন করতেন। সুফয়ান ছাওরী (রহ.) বলেন,مَاعَالَجْتُشَيْئًاأَشَدَّعَلَيَّمِنْنِيَّتِي؛لِإِنَّهَاتَتَقَلَّبُعَلَيَّ ‘নিজের নিয়তকে বিশুদ্ধ ও স্থির রাখার মতো সংগ্রাম আর কোন কিছুর সঙ্গে আমাকে করতে হয়নি। কারণ, আমার নিয়ত বারবার রূপ বদলায়’।[10]
ইউসুফ বিন আসবাত (রহঃ) বলেন,تَخْلِيصُ النِّيَّةِ مِنْ فَسَادِهَا أَشَدُّ عَلَى الْعَامِلِينَ مِنْ طُولِ الِاجْتِهَادِ ‘দীর্ঘ সময় ব্যাপী ইবাদত-বন্দেগী করার চেয়েও আমলকারীদের জন্য বেশী কঠিন হল নিজের নিয়তকে সকল প্রকার রিয়া, খ্যাতির লোভ ও নফসের কলুষতা থেকে পবিত্র রাখা’।[11]
একদিন হাসান বাছরী (রহঃ) নছীহত করছিলেন। তখন এক ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে লাগল। হাসান বাছরী বললেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, এই কান্নার মাধ্যমে তুমি কী উদ্দেশ্য করেছিলে’?[12] অর্থাৎ তোমার কান্না কি সত্যিকার আল্লাহভীতি ও আন্তরিকতার কারণে ছিল, নাকি লোক দেখানোর জন্য।
নিয়তগুণে অনেক ছোট আমলও বড় আমলে পরিণত হয়। আবার নিয়তে ইখলাছ না থাকার কারণে অনেক বড় আমলও ছোট ও ক্ষুদ্র আমলে পরিণত হয়। তাই ইবাদত কবুলের জন্য নিয়তের বিশুদ্ধতা অত্যন্ত যরূরী। ইবনু আজলান (রহঃ) বলেন,ثَلَاثَةٌ لَا يَصْلُحُ الْعَمَلُ إِلَّا بِهِنَّ: التَّقْوَى، وَالنِّيَّةُ الْحَسَنَةُ، وَالْإِصَابَةُ ‘তিনটি গুণ ছাড়া কোনো আমল বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হয় না। ১. আল্লাহভীতি ২. বিশুদ্ধ নিয়ত ও ৩. সঠিক পদ্ধতি (সুন্নাহ অনুযায়ী আমল সম্পাদন)’।[13]
ইমাম মাওয়ার্দী (৯৭৫-১০৫৮খ্রি.) তাফসীর, ফিক্বহ, রাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি বিষয়ে অনেকগুলো গ্রন্থ লিখেছেন। তার ‘আল-আহকামুস সুলতানিইয়াহ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অসাধারণ গ্রন্থ। ‘আল-হাবী আল-কাবীর’ শাফেঈ মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফিক্বহ গ্রন্থ। অথচ তিনি জীবদ্দশায় তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো প্রকাশ করেননি। সবগুলো বই নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন, তিনি ছাড়া যা কেউ জানত না। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তার এক বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে বললেন, অমুক স্থানে যে বইগুলো রয়েছে, সেগুলো সবই আমার রচনা। আমি এগুলো প্রকাশ করিনি। কারণ আমার নিয়ত সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য খাঁটি হয়েছে বলে নিশ্চিত হতে পারিনি। যখন তুমি আমাকে মৃত্যুযন্ত্রণায় দেখতে পাবে, তখন আমার হাতে হাত রাখবে। যদি আমি তোমার হাত শক্ত করে চেপে ধরি, তাহলে বুঝবে আমার এসব রচনার কোনটিই আল্লাহ কবুল করেননি। অতএব তুমি বইগুলো নিয়ে রাতের অন্ধকারে দজলা নদীতে ফেলে দিবে। আর আমি যদি আমার হাত প্রসারিত করে দেই এবং তোমার হাত চেপে না ধরি, তাহলে বুঝবে আল্লাহ এগুলো কবুল করেছেন। আমি খালেছ নিয়তের যে কামনা করতাম তা অর্জন করেছি। ঐ ব্যক্তি বলেন, অতঃপর যখন তার মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হল, আমি আমার হাত তার হাতে রাখলাম। তিনি তার হাত প্রসারিত করে দিলেন। আমার হাত চেপে ধরলেন না। তখন আমি বুঝলাম যে, আল্লাহ তার রচনাগুলো কবুল করেছেন। ফলে তার মৃত্যুর পর তার গ্রন্থগুলো আমি প্রকাশ করলাম’।[14]
ইবনু আকীল (রহঃ) বলেন, আমি আমাদের শায়খ আবু ইসহাক আশ-শীরাযীকে দেখেছি, তিনি কোন দরিদ্রকে কিছু দান করার আগে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের নিয়তকে খালেছ করে নিতেন। কোন মাসআলা নিয়ে কথা বলার আগে তিনি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতেন এবং সত্যের সমর্থনে একনিষ্ঠ ও খাঁটি নিয়তের মাধ্যমে উদ্দেশ্যকে বিশুদ্ধ করতেন; মানুষের প্রশংসা বা বাহবা অর্জনের জন্য নয়। আর কোন গ্রন্থ রচনার আগে কয়েক রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিতেন। তাই এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে, তাঁর নাম সর্বত্র প্রসিদ্ধ হয়ে গেল এবং তার রচনাবলী পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এসবই ইখলাছ বা নিয়তের বিশুদ্ধতার বরকত’।[15]
কাযী ইবনুল লাহহাম বলেন, একবার আমাদের শায়খ ইবনু রজব হাম্বলী (রহঃ) আমাদের সামনে একটি মাসআলা আলোচনা করলেন। তিনি বিষয়টি এত বিস্তৃতভাবে এবং নিখুঁত দক্ষতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করলেন যে, আমি অত্যন্ত বিস্মিত হলাম। এরপর একদিন সেই একই মাসআলা বিভিন্ন মাযহাবের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের এক সভায় উপস্থাপিত হলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি সেখানে এ বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। সভা শেষে আমি তাকে বললাম, ‘আপনি তো এ বিষয়ে আগে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। আজ কিছুই বললেন না কেন’? তখন তিনি উত্তরে বললেন, ‘আমি কেবল সেই কথাই বলি, যার ছওয়াব পাওয়ার আশা রাখি। কিন্তু এই সভায় কথা বলতে আমার ভয় হয়েছে’।[16]
এই ঘটনা সালাফদের নিয়তের বিশুদ্ধতার এক উজ্জবল দৃষ্টান্ত। তারা ইলম যাহির, বিতর্কে জয়লাভ বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে কথা বলতেন না; বরং তখনই কথা বলতেন, যখন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হত এবং তাঁরা এর ছওয়াবের আশা করতেন। নীরবতাকে তারা অনেক সময় কথার চেয়েও উত্তম মনে করতেন, যদি কথা বলায় রিয়া, আত্মপ্রদর্শন বা ফিতনার আশংকা থাকত।
আধুনিক মুফাস্সির মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানকীতী (রহঃ) বাল্যকালে আরবদের নসবনামা সর্ম্পকে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর তা মাটিতে পুঁতে ফেলেন। কারণ সমবয়সীদের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব যাহির করার জন্য তিনি সেই কবিতাটি রচনা করেছিলেন। তার শিক্ষকরা তাকে এব্যাপারে ভৎর্সনা করে বলেছিলেন, তুমি তোমার নিয়তকে পরিবর্তন করে নিতে পারতে।[17] কিন্তু শানকীতীর এই খাঁটি নিয়তের দরুন পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁর দরস ও রচনায় দারুণ বরকত দান করেছিলেন। তাঁর তাফসীর ‘আযওয়াউল বায়ান’ ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
২. আমল কবুল হওয়ার ভয় :
সালাফে ছালেহীন নিজেদের আমল নিয়ে কখনো গর্ব-অহংকার করতেন না। বরং আল্লাহর নিকট তাদের আমল কবুল হয়েছে কি-না সেই চিন্তায় বিভোর থাকতেন। মহান আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ ‘এবং তাদেরকে যা (রিযিক) দেওয়া হয়েছে তা থেকে যারা (আল্লাহর পথে) দান করে ভীত-কম্পিত হৃদয়ে এজন্য যে, তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাবে’ (মুমিনূন ২৩/৬০)।
আয়েশা (রাঃ) এই আয়াতটি সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করে বলেছিলেন,أَهُمُ الَّذِينَ يَشْرَبُونَ الْخَمْرَ وَيَسْرِقُونَ؟ قَالَ: لَا يَا بِنْتَ الصِّدِّيقِ، وَلَكِنَّهُمُ الَّذِينَ يَصُومُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَتَصَدَّقُونَ، وَهُمْ يَخَافُونَ أَنْ لَا تُقْبَلَ مِنْهُمْ، أُولَٰئِكَ يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَهُمْ لَهَا سَابِقُونَ ‘তবে তারা কি সেই সকল লোক, যারা মদ পান করে এবং চুরি করে’? তিনি বললেন, ‘না, হে ছিদ্দীকের কন্যা! বরং তারা হল এমন লোক, যারা ছিয়াম পালন করে, ছালাত আদায় করে এবং ছাদাকবা করে; তবুও তারা ভয় করে যে, তাদের আমল হয়তো কবুল হবে না। তারাই কল্যাণকর কাজগুলো সম্পাদনে দ্রুত অগ্রসর হয় এবং তারাই এসব সৎকর্মে অগ্রগামী’।[18]
ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) আল্লাহর ঘর কা‘বা নির্মাণের মতো মহৎ কাজ করার পরেও আত্মতুষ্টিতে ভোগেননি। বরং বিনীত কণ্ঠে বলেছিলেন,رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ ২/১২৭)।
সালাফদের অন্তরে এই সুদৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর সাহায্য বা তাওফীক ছাড়া কোনো আমলই সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ ‘আর আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত’ (হূদ ১১/৮৮)।
সালাফে ছালেহীন সবসময় ভয় ও আশা নিয়ে চলতেন। আবু আলী আর-রুযবারী বলেন, ‘ভয় ও আশা হলো পাখির দু’টি ডানার মতো। যখন উভয়টিই সমান ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, তখন পাখি সোজা ও পরিপূর্ণভাবে উড়তে পারে। আর যখন কোনো একটি ডানা দুর্বল হয়ে যায়, তখন তার উড্ডয়নে ত্রুটি দেখা দেয়। আর যখন উভয় ডানাই নষ্ট হয়ে যায়, তখন পাখিটি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়’।[19] এজন্যই বলা হয়, ‘যদি কোনো মুমিনের ভয় ও আশা ওযন করা হয়, তাহলে উভয়টির ওযন সমান হবে’।[20]
একটি সামান্য আমলও যদি আল্লাহ কবুল করেন, তারা সেটিকে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদের চেয়েও মূল্যবান মনে করতেন। তারা সৎকর্ম সম্পাদন করতেন, আবার সেই আমল কবুল না হওয়ার ভয়ও করতেন। মালেক বিন দীনার (রহঃ) বলেন, الْخَوْفُ عَلَى الْعَمَلِ أَلَّا يُتَقَبَّلَ أَشَدُّ مِنَ الْعَمَلِ ‘আমল করার চেয়ে আমল কবুল হবে কি-না এই আশংকা ও ভয়ই অধিক গুরুত্বপূর্ণ’।[21]
আবুল লায়েছ সামারকান্দী বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো সৎকর্ম করে তার চারটি বিষয়ে ভয় থাকা প্রয়োজন। প্রথমত: আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে ভয়। কারণ, আল্লাহ বলেছেন ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তবাকীদের থেকেই (আমল) কবুল করেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)। দ্বিতীয়ত: রিয়ার ব্যাপারে ভয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে তারা খালেছ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে...’ (বাইয়েনাহ ৯/৮৫)। তৃতীয়ত: আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছানো ও সংরক্ষিত থাকার ব্যাপারে ভয়। কারণ মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি সৎকর্ম করবে (নিয়ে আসবে), সে তার দশগুণ নেকী পাবে’ (আন‘আম ৬/১৬০)। এখানে নেক আমল নিয়ে আসাকে শর্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আমলটি সম্পাদন করার পর তা আখিরাত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াও যরূরী। চতুর্থত: আনুগত্যের ক্ষেত্রে আল্লাহর তৌফিক থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়। কারণ কেউ জানেনা আগামীতে সে সৎ কাজ করার তৌফিক পাবে কিনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার কোনই ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত । আমি তাঁর উপরেই ভরসা করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (হূদ ১১/৮৮)।[22]
আব্দুল আযীয বিন আবু রাওয়াদ বলেন, ‘আমি সালাফে ছালেহীনকে এমন অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা নেক আমল করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন। অতঃপর যখন তারা কোন সৎকর্ম সম্পাদন করতেন, তখন তাদের মনে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ ভর করতো- তাদের আমল কবুল হবে কি-না’?[23]
সালাফে ছালেহীন আল্লাহর কবুলিয়াতকে নিজের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি বলে মনে করতেন। আলী (রাঃ) বলেন,كُونُوا لِقَبُولِ الْعَمَلِ أَشَدَّ هَمًّا مِنْكُمْ بِالْعَمَلِ، أَلَمْ تَسْمَعُوا اللَّهَ يَقُولُ: إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ ‘তোমরা আমল করার চেয়ে আমল কবুল হওয়ার ব্যাপারে অধিক চিন্তান্বিত হও। তোমরা কি আল্লাহর এই বাণী শোননি, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকেই (আমল) কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[24]
আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বলেন, ‘আমি যদি জানতে পারতাম যে, আল্লাহ আমার দু’রাক‘আত ছালাত কবুল করেছেন, তাহলে আমি বলতাম নিশ্চয়ই আমি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত’। অতঃপর তিনি আল্লাহর এই বাণীটি তিলাওয়াত করলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকেই (আমল) কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[25]
আবুদ্দারদা (রাঃ) বলেন, ‘আমি যদি নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে, আল্লাহ আমার একটি মাত্র ছালাত কবুল করেছেন, তাহলে তা আমার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয়’। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকেই (আমল) কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[26]
ফাযালাহ বিন ওবায়েদ বলেন,لَأَنْ أَكُونَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ قَدْ تَقَبَّلَ مِنِّي مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا؛ لِأَنَّ اللَّهَ يَقُولُ: إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ ‘আমি যদি জানতে পারি যে, আল্লাহ আমার একটি সরিষার দানা পরিমাণ আমলও কবুল করেছেন, তাহলে তা আমার কাছে দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে- সবকিছুর চেয়েও অধিক প্রিয়। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকেই (আমল) কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[27]
আমের বিন আব্দুল্লাহ আল-আম্বরী মৃত্যুর সময় কাঁদছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘আপনি কাঁদছেন কেন’? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কিতাবের একটি আয়াতের কারণে’। জিজ্ঞেস করা হল, ‘কোন আয়াত? তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কেবল মুত্তাক্বীদের পক্ষ থেকেই আমল কবুল করে থাকেন’ (মায়েদাহ ৫/২৭)।[28]
হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিন সৎকর্ম ও ভয়ের সমন্বয় ঘটায়; আর মুনাফিক পাপাচার ও নিরাপদবোধ উভয়কে একত্র করে’।[29] অর্থাৎ মুমিন যত বেশি নেক আমল করে, তত বেশি আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে ভীত-বিনয়ী থাকে। পক্ষান্তরে মুনাফিক পাপ ও ত্রুটিতে লিপ্ত থেকেও নিজেকে নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে করে।
মোটকথা, সালাফে ছালেহীন বেশী আমল করেও আত্মতুষ্টিতে ভুগতেন না। তাদের ভয় ছিল- আমলের মধ্যে রিয়া, অহংকার বা অন্য কোন ত্রুটি নিজেদের অজান্তেই ঢুকে গেছে কি-না এবং আল্লাহ তা কবুল করবেন কি-না। মু‘আল্লা ইবনুল ফযল বলেন, ‘তারা আল্লাহ তা‘আলার কাছে ছয় মাস ধরে দো‘আ করতেন-যেন তিনি তাদেরকে রামাযান মাসের নাগাল পাইয়ে দেন। এরপর আরো ছয় মাস দো‘আ করতেন, যেন তিনি তাদের রামাযান মাসে কৃত আমলগুলো কবুল করে নেন’।[30]
৩. গোপন আমলের মাধ্যমে ইখলাছের প্রশিক্ষণ গ্রহণ :
সালাফে ছালেহীন তাদের আমলকে যথাসম্ভব গোপন রাখতেন। কারণ তারা রিয়াকে সৎ আমলের নীরব ঘাতক মনে করতেন। তাদের কাছে আমল ছিল আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একান্ত সম্পর্ক, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার বিষয় না। বিশেষ করে নফল ছালাত, তাহাজ্জুদ, দান-ছাদাকবাহ, ছিয়াম, কান্না ও দো‘আর মতো আমল তারা যথাসম্ভব মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়াল রাখতেন।
হাসান বাছরী (রহঃ) বলেন, ‘তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করে ফেলতেন, অথচ মানুষ তা জানতে পারত না। এমন ব্যক্তিও ছিলেন, যিনি প্রচুর ফিক্বহের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন, কিন্তু মানুষ তার জ্ঞান সম্পর্কে অবগত ছিল না। আবার এমন ব্যক্তিও ছিলেন যিনি নিজের ঘরে দীর্ঘক্ষণ ছালাত আদায় করতেন, অথচ তার বাড়ীতে অবস্থানরত মেহমান পর্যন্ত তা টের পেত না’। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু মানুষকে পেয়েছি, যারা পৃথিবীতে গোপনে যে নেক আমল করতে সক্ষম ছিলেন, তা কখনোই প্রকাশ্যে করতেন না’। তিনি আরো বলেন, ‘মুসলমানরা দো‘আ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতেন; কিন্তু তাদের কোন আওয়ায শোনা যেত না। তাদের দো‘আ ছিল কেবল নিজেদের ও তাদের প্রতিপালকের মধ্যকার মৃদু ফিসফিসানি। এর কারণ হল, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাক বিনীতভাবে ও চুপে চুপে’ (আ‘রাফ ৭/৫৫)। আল্লাহ এক নেক বান্দার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার এই গোপন আমলকে পছন্দ করেছেন। তিনি বলেন,إِذْ نَادَى رَبَّهُ نِدَاءً خَفِيًّا ‘যখন সে [যাকারিয়া (আঃ)] তাঁর প্রতিপালককে আহবান করেছিল চুপে চুপে’ (মারইয়াম ১৯/৩)।[31]
ছাহাবায়ে কেরাম তাঁদের আমলকে রিয়া ও লোকদেখানো প্রবণতা থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে কেমন সচেতন ছিলেন, তার দৃষ্টান্ত হল নিম্নোক্ত ঘটনাটি-
মাদায়েন বিজয়ের পর যখন গণীমতের সম্পদ একত্রিত করা হল, তখন এক ব্যক্তি একটি মূল্যবান পাত্র নিয়ে উপস্থিত হয়ে তা গণীমতের মাল গ্রহণকারীর কাছে বুঝিয়ে দিলেন। সবাই তা দেখে বিস্মিত হয়ে বলল, এরকম মহামূল্যবান সম্পদ তো আমরা কখনো দেখিনি। আমাদের কাছে যা কিছু আছে, তার মূল্যও এর সমান নয়, এমনকি এর কাছাকাছিও নয়। তারা ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করল, এর থেকে কিছু কি তুমি নিজের জন্য নিয়েছ? লোকটি বলল, যদি আল্লাহর ভয় না থাকত তাহলে আমি কস্মিনকালেও এ সম্পদ নিয়ে তোমাদের কাছে আসতাম না। উপস্থিত লোকরা বুঝতে পারল, এই লোকটি ভিন্ন চরিত্রের। তারা জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে? তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদেরকে আমার পরিচয় বলব না- যাতে তোমরা আমার প্রশংসা করো। আর অন্যদের কাছেও আমার পরিচয় প্রকাশ করব না- যাতে তারা আমার উচ্ছবসিত প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে। বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তাঁর পুরস্কারেই সন্তুষ্ট থাকি’। অতঃপর লোকেরা তার পরিচয় জানার জন্য একজন ব্যক্তিকে তার পিছু নিতে বলল। সেই ব্যক্তি তার অনুসরণ করতে করতে অবশেষে তার সাথীদের কাছে পৌঁছে গেল। সেখানে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারল, তিনি ছিলেন আমির ইবনু আবদে কায়েস (রাঃ)।[32]
এই ঘটনাটি সালাফে ছালেহীনের ইখলাছ ও আমল গোপন রাখার এক অতুজ্জবল দৃষ্টান্ত। এতো মূল্যবান সম্পদ আল্লাহর পথে সম্পূর্ণরূপে দিয়ে দেওয়ার পরও তিনি চাননি মানুষ তার নাম জানুক বা তাঁর প্রশংসা করুক। তাঁর কাছে মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও পুরস্কারই ছিল যথেষ্ট। তাঁর কথাটি যেন ইখলাছের একটি জীবন্ত সংজ্ঞা ‘বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করি এবং তার পুরস্কারেই সন্তুষ্ট থাকি’।
ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহঃ) বলেন,خَيْرُ الْعَمَلِ أَخْفَاهُ، أَمْنَعُهُ مِنَ الشَّيْطَانِ، وَأَبْعَدُهُ مِنَ الرِّيَاءِ ‘সর্বোত্তম আমল হলো গোপন আমল। তা শয়তানের হস্তক্ষেপ থেকে অধিক সুরক্ষিত এবং রিয়া থেকে অধিক দূরে’।[33] এজন্য সালাফে ছালেহীন তাদের ক্রন্দন ও আল্লাহভীতিকে পর্যন্ত গোপন রাখতেন। যাতে রিয়ার বিষাক্ত ছোবলে তা কলুষিত না হয়। আছেম (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু ওয়াইল (রহঃ) যখন নির্জনে থাকতেন, তখন কাঁদতেন। একবার তাকে আমি সিজদায় বলতে শুনলাম, তিনি বলছেন, ‘হে আমার বর! তুমি আমার প্রতি দয়া কর! হে আমার বর! তুমি আমাকে ক্ষমা কর! হে আমার বর! তুমি যদি আমাকে ক্ষমা কর, তবে তোমার পক্ষ থেকে অফুরন্ত অনুগ্রহেই আমাকে ক্ষমা করবে। আর যদি আমাকে শাস্তি দাও, তবে কোন যুলুম না করেই শাস্তি দেবে। আর তোমার শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পূর্ব-অধিকারও আমার নেই’। এরপর তিনি এমনভাবে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন, যেন শোকাহত কোনো মা তার সন্তান হারিয়ে আকুল হয়ে কাঁদছে। আছেম (রহঃ) বলেন,وَلَوْجُعِلَتْلَهُالدُّنْيَاعَلَىأَنْيَبْكِيَوَأَحَدٌيَرَاهُ،لَمْيَفْعَلْ ‘তাঁকে যদি সমগ্র পৃথিবীর সম্পদও দেওয়া হতো, শুধু এই শর্তে যে- কেউ তাকে কাঁদতে দেখবে, তবুও তিনি তা গ্রহণ করতেন না’।[34]
এক ব্যক্তি হাসান বাছরী (রহঃ)-এর পাশে কাঁদছিল। তখন তিনি তাকে বললেন, আগের যুগে কোনো ব্যক্তি তার সঙ্গীর পাশে কাঁদত, অথচ তাঁর সঙ্গীও জানতে পারত না যে, সে কাঁদছে।[35]
মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি‘ (রহঃ) বলেন, ‘আমি এমন কিছু মানুষকে পেয়েছি, যাদের যুগে স্বামী-স্ত্রী একই বালিশে মাথা রেখে ঘুমাতেন; অথচ তার গাল বেয়ে এত অশ্রু ঝরত যে, বালিশের নিচের অংশ অশ্রুতে ভিজে যেত-কিন্তু তার স্ত্রী বিন্দুমাত্র টের পেত না। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি এমন লোকদের পেয়েছি, তাদের কেউ ছালাতের কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকতেন; তাঁর অশ্রু গড়িয়ে গালে পড়ত, অথচ তাঁর পাশের মুছল্লীটিও তা টের পেত না’।[36] মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি‘ আরো বলেন, ‘কোন ব্যক্তি এমনও ছিলেন যিনি বিশ বছর ধরে কাঁদতেন, অথচ তার জীবনসঙ্গীনী স্ত্রী পর্যন্ত তার কান্নার বিষয়টি টের পেত না’।[37]
মুহাম্মাদ বিন যিয়াদ বলেন, আমি আবু উমামা বাহেলী (রাঃ)-কে দেখেছি, তিনি মসজিদে এমন এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে সিজদারত অবস্থায় কাঁদছিল এবং দো‘আ করছিল। তখন তিনি তাকে বললেন, أَنْتَأَنْتَ! لَوْكَانَهَذَافِيبَيْتِكَ ‘তুমি তো তুমি-ই (অর্থাৎ তোমার এই কান্নার মধ্যে লোক দেখানোর আশংকা রয়েছে)। যদি তুমি এভাবে তোমার ঘরের ভেতরে নিভৃতে কাঁদতে, তাহলে কতই না ভালো হত’![38]
ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, وَلِخَوْفِ الرِّيَاءِ سَتَرَ الصَّالِحُونَ أَعْمَالَهُمْ حَذَرًا عَلَيْهَا، وَبَهْرَجُوهَا بِضِدِّهَا ‘রিয়ার আশংকায় সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিরা তাদের আমল গোপন করতেন। আমলকে মানুষের দৃষ্টি থেকে আড়াল করার জন্য কখনো তার বিপরীত আচরণও তারা প্রকাশ করতেন’। ইবনু সীরীন দিনে হাসতেন, রাতে কাঁদতেন। ইরবাহীম ইবনু আদহাম অসুস্থ হলে তার কাছে এমন খাবার রেখে দেওয়া হতো যা সুস্থ ব্যক্তিরা খেতেন।[39]
আইয়ুব আস-সাখতিয়ানীর যুগে নিজেকে ইবাদতগুযার ও পরহেযগার হিসাবে যাহির করার জন্য অনেকে জামা গুটিয়ে পরতেন। তাই তিনি লোকদেখানো ধার্মিকতার আশংকায় জামা গুটিয়ে না নিয়ে কিছুটা লম্বা রাখতেন। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন,الشُّهْرَةُ الْيَوْمَ فِي التَّشْمِيرِ ‘আজকাল খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জনের নিদর্শন হল জামা গুটিয়ে পরা’।[40] তিনি এক মজলিসে বসেছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে অশ্রু এসে গেল। তখন তিনি নাক ঝাড়তে লাগলেন এবং বলতে লাগলেন, مَا أَشَدَّ الزُّكَامَ ‘সর্দি কতই না তীব্র’![41] আইয়ুব আস-সাখতিয়ানী সারারাত তাহাজ্জুদ ছালাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং তা গোপন রাখতেন। ভোর হলে তিনি তাঁর কন্ঠস্বর এমনভাবে উঁচু করতেন, যেন তিনি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠে ছালাত শুরু করেছেন।[42] যাতে মানুষ তার রাত জাগা ও ইবাদত সম্পর্কে জানতে না পারে।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) বলেন, আবুস সালীল যখন কোন হাদীছ বর্ণনা করতেন অথবা কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন তাঁর কান্না এসে যেত। কিন্তু তিনি সেই কান্নাকে হাসিতে পরিণত করে দিতেন, যাতে তাঁর কান্না প্রকাশ না পায়।[43]
আব্দুর রহমান ইবনু আবী লায়লা (রহঃ) ছালাত আদায় করতেন। কেউ তার কাছে প্রবেশ করলে তিনি নিজের বিছানায় শুয়ে পড়তেন।[44]
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ) তুরসুস নগরীতে প্রায়ই যাতায়াত করতেন। তিনি রাক্কা শহরে একটি মুসাফিরখানায় অবস্থান করতেন। সেখানে এক যুবক নিয়মিত তাঁর কাছে আসত, তাঁর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজ করে দিত এবং তাঁর কাছ থেকে হাদীছ শুনত। একবার তিনি রাক্কায় এসে দেখলেন, সেই যুবকটি নেই। ইবনুল মুবারক (রহঃ) শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন। অভিযান শেষে ফিরে এসে তিনি যুবকটির খোঁজ নিলেন। তাঁকে বলা হল, সে দশ হাযার দিরহাম ঋণের কারণে কারাগারে বন্দী রয়েছে। তখন ইবনুল মুবারক সেই ঋণদাতার সন্ধান করে দশ হাযার দিরহাম পরিশোধ করে দিলেন এবং তাকে শপথ করিয়ে বললেন, ‘আমি যতদিন জীবিত থাকি, এ কথা তুমি কাউকে জানাবে না’। এরপর যুবকটিকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়া হলো। ইবনুল মুবারক সেখান থেকে রওনা হয়ে গেলেন। রাক্কা থেকে দুই দিনের পথ অতিক্রম করার পর সেই যুবক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করল। ইবনুল মুবারক তাকে বললেন, হে যুবক! তুমি এতদিন কোথায় ছিলে? আমি তো তোমাকে দেখতে পাইনি। যুবক বলল, হে আবু আব্দুর রহমান! আমি ঋণের কারণে কারাগারে বন্দী ছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে মুক্ত হলে? যুবক বলল, একজন লোক এসে আমার ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছেন; কিন্তু আমি তার পরিচয় জানি না। ইবনুল মুবারক বললেন, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। সেই যুবক ইবনুল মুবারকের মৃত্যুর পরেই জানতে পেরেছিল যে, তিনিই গোপনে তার ঋণ পরিশোধ করে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছিলেন।[45]
বিখ্যাত তাবেঈ দাউদ ইবনে আবী হিন্দ (রহঃ) একটানা ৪০ বছর নফল ছিয়াম রেখেছেন, কিন্তু তার পরিবারের সদস্যরাও তা জানতে পারেনি। তিনি পেশায় ছিলেন একজন মুচি। সকালে স্ত্রীর কাছ থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে দোকানে যেতেন এবং রাস্তায় তা গরীবদের দান করে দিতেন। ফলে স্ত্রী ভাবতেন তিনি দোকানে খেয়েছেন, আর বাজারের লোকেরা ভাবত তিনি বাড়ীতে খেয়ে এসেছেন।[46]
সালাফগণ বিশ্বাস করতেন, ইবাদতের মিষ্টতা মানুষের দৃষ্টির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে। বিখ্যাত বুযুর্গ বিশর আল-হাফী (রহঃ) বলতেন, لَا تَجِدُ حَلَاوَةَ الْعِبَادَةِ حَتَّى تَجْعَلَ بَيْنَكَ وَبَيْنَ النَّاسِ سَدًّا ‘তুমি ইবাদতের আসল স্বাদ বা মিষ্টতা ততক্ষণ পর্যন্ত পাবে না, যতক্ষণ না তুমি তোমার এবং মানুষের দৃষ্টির মাঝে একটি দেয়াল (আড়াল) তৈরি করবে’। রাবী‘ ইবনে খুছাইম যখন ঘরে নিভৃতে কুরআন তিলাওয়াত করতেন, তখন হঠাৎ কেউ ঘরে প্রবেশ করলে তিনি নিজের কাপড় দিয়ে মুছহাফ ঢেকে দিতেন।[47]
আ‘মাশ বলেন, আমি ইবরাহীম নাখঈর কাছে ছিলাম। তখন তিনি মুছহাফ দেখে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। এমন সময় একজন লোক তার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইল। তিনি মুছহাফটি ঢেকে রাখলেন এবং বললেন, ‘সে যেন এমনটি মনে না করে যে, আমি প্রতি মূহূর্তেই কুরআন পড়ি’।[48]
মুহাম্মাদ বিন আসলাম আত-তূসী একটি ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিতেন এবং সঙ্গে একটি পানির পাত্র নিয়ে যেতেন। তিনি ভেতরে কী করতেন, তা আমি জানতাম না। একদিন তাঁর ছোট একটি ছেলেকে তাঁর কান্নার কথা বলতে শুনলাম। তার মা তাকে নিষেধ করলেন। আমি তাঁর মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই কান্নার ব্যাপারটি কী’? তিনি বললেন, আবুল হাসান এই ঘরে প্রবেশ করেন, তারপর কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং কাঁদেন। ছেলেটি তাঁর কান্নার শব্দ শুনে সেটার অনুকরণ করে। তিনি যখন ঘর থেকে বের হতে চাইতেন, তখন মুখ ধুয়ে নিতেন এবং চোখে সুরমা লাগাতেন, ফলে তাঁর চেহারায় কান্নার কোনো চিহ্ন দেখা যেত না। তিনি কিছু লোকের প্রতি নিয়মিত সহায়তা ও অনুগ্রহ করতেন; তাদের অর্থ দিতেন এবং পোশাকও দিতেন। তারপর তাদের কাছে কোনো লোক পাঠিয়ে তাকে বলতেন, ‘খেয়াল রেখো, তারা যেন জানতে না পারে কে তাদের কাছে এসব পাঠিয়েছে। আর কখনো তিনি নিজেই রাতে তাদের কাছে সাহায্য নিয়ে যেতেন। কিন্তু নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। কখনো এমনও হতো যে, তাদের পোশাক পুরোনো হয়ে যেত এবং ঘরে থাকা সামগ্রীও শেষ হয়ে যেত; তখন তিনি গোপনে আবার তাদের সাহায্য করতেন।[49]
সালাফে ছালেহীনের জীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তাঁরা রিয়াকে শুধু একটি গুনাহ হিসাবে দেখতেন না; বরং এটিকে আমল ধ্বংসকারী এক মারাত্মক হৃদব্যাধি হিসাবে বিবেচনা করতেন। তাই তাঁরা আমলের আগে নিয়ত সংশোধন করতেন, আমলের মধ্যে অন্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেন এবং আমলের পরও কবুলিয়াতের ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতেন। মানুষের প্রশংসা তাঁদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল না; বরং মানুষের অগোচরে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তাঁদের কাছে অধিক প্রিয়। তাঁদের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, ইখলাছ মানে মানুষের দৃষ্টি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়; বরং মানুষের দৃষ্টি ও প্রশংসার ঊর্ধ্বে উঠে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য বানানো। নেক আমল গোপন রাখা, নিজের প্রশংসা অপছন্দ করা, প্রশংসা শুনলে আত্মতুষ্ট না হওয়া, নিয়ত বারবার যাচাই করা এবং আল্লাহর কাছে ইখলাছের জন্য দো‘আ করা এসবই তাঁদের কাছে রিয়া থেকে বাঁচার উপায় ছিল।
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে নেক আমলও কখনো কখনো প্রদর্শনের উপকরণে পরিণত হতে পারে। ফলে সালাফে ছালেহীনের ইখলাছ ও আত্মসচেতনতা আমাদের জন্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেকে প্রশ্ন করা, ‘আমি এই আমলটি কার জন্য করছি। আল্লাহর জন্য, না-কি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য’? কারণ মানুষের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টিই মুমিনের প্রকৃত অর্জন। তাই আমাদের জীবনের প্রতিটি নেক আমলের ক্ষেত্রে সালাফে ছালেহীনের মতোই নিজেদের অন্তরকে পাহারা দিতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন!!
[1]. তায়সীরুল আযীযিল হামীদ, পৃ. ৪৬১।
[2]. বুখারী হা/১; মিশকাত হা/১।
[3]. ইবনু রজব, জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৬১।
[4]. বায়হাক্বী, মা‘রিফাতুস সুনান, ১/২৬৩; আস-সুনানুছ ছুগরা ১/৮।
[5]. খতীব বাগদাদী, আল-জামে লিআখলাকির রাবী ২/২৯০।
[6]. আবূ নু‘আইম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৩/৭০।
[7]. ইবনুল হাজ্জ, আল-মাদখাল, ১/৬ ।
[8]. আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয-যুহদ ওয়ার রাক্বায়েক্ব, পৃ. ৬৪।
[9]. ইবনু কুতায়বা দীনাওয়ারী, আল-মুজালাসাহ, পৃ. ৮/২৬৬।
[10]. আল-জামে লিআখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে, ১/৩১৭।
[11]. আল-মুজালাসাহ ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম, ৫/২৬৮।
[12]. ইবনু আবিদ দুনয়া, আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ২৫।
[13]. জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম ১/৭১।
[14]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১৮/৬৬; ইবনু খাল্লিকান, অফায়াতুল আ‘য়ান, ৩/২৮২।
[15]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া, ২/২৭৪; ইবনুল কবাইয়িম, বাদাইউল ফাওয়ায়েদ, ৩/১৭৫।
[16]. জামেউল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/৩৭।
[17]. রাশেদ বিন ওছমান বিন আহমাদ আয-যাহরানী, ইতহাফুন নুবালা বিসিয়ারিল উলামা (রিয়াদ : দারুছ ছুমায়ঈ, ২য় সংস্করণ, ১৯৯৭ খ্রি.), ১ম খন্ড, পৃ. ১৪৩।
[18]. তিরমিযী হা/৩১৭৫; ইবনু মাজাহ হা/৪১৯৮, হাদীছ ছহীহ।
[19]. ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, আ‘মালুল কুলূব, পৃ. ২২০।
[20]. মুখতাছার মিনহাজুল কাছেদীন, পৃ. ৩০৬।
[21]. ইবনু রজব, লাতাইফুল মা‘আরিফ (কায়রো: দারুল হাদীছ, ২০০৫ খ্রি.), পৃ. ২৮৫।
[22]. তাম্বীহুল গাফিলীন, পৃ. ৩৯৩।
[23]. লাতাইফুল মা‘আরিফ পৃ. ২৮৫।
[24]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ১৫; লাতাইফুল মা‘আরিফ, পৃ. ২৮৫।
[25]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ১৩, টীকা-২।
[26]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৩/১০৪, মায়েদাহ ২৭ আয়াতের ব্যাখ্যা দ্র.।
[27]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ২০; লাতাইফুল মা‘আরিফ, পৃ. ২৮৫।
[28]. তাফসীরে তাবারী, ১০/২১২; আদ-দুররুল মানছূর, ৩/৫৭।
[29]. তাফসীরে তাবারী, ১৯/৪৫।
[30]. লাতাইফুল মা‘আরিফ, পৃ. ২০৪, ২৮৫।
[31]. তাফসীর ইবনে কাছীর ৩/৪৭১; আ‘রাফ ৫৫ আয়াতের তাফসীর দ্র.।
[32]. তারীখে তাবারী, ৪/১৯।
[33]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ২৫।
[34]. ঐ, পৃ. ২৬; তালবীসু ইবলীস, পৃ. ১২৮।
[35]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ২৭।
[36]. ঐ, পৃ. ২৮।
[37]. ঐ, পৃ. ৩১; ইবনু আবিদ দুনয়া, আর-রিক্কাতু ওয়াল বুকা, পৃ. ১৩৬।
[38]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৩/৩৬১; তালবীসু ইবলীস, পৃ. ২৫৯।
[39]. তালবীসু ইবলীস, পৃ. ১৩৮।
[40]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৬/২২।
[41]. ঐ, ৬/২০।
[42]. ঐ, ৬/১৭; তাহযীবুল কামাল, ১/৪৩৪।
[43]. আল-ইখলাছ ওয়ান নিয়্যাহ, পৃ. ২৯।
[44]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/২৬৪; আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ২৯৪।
[45]. ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক ৩২/৪৫৫; খত্বীব বাগদাদী, তারীখু বাগদাদ ১০/১৫৮; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৮/৩৮৭।
[46]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৬/৩৭৮।
[47]. ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/৩৫; তালবীসু ইবলীস, পৃ. ৩৭৪; আল-মুন্তাযাম, ৬/৯।
[48]. আহমাদ ইবনু হাম্বল, আয-যুহদ, পৃ. ২৯৫; ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/২৪৯।
[49]. ছিফাতুছ ছাফওয়া ২/৩১৭; হিলয়াতুল আওলিয়া ৯/২৪৩।