হে শ্রদ্ধেয় পিতা, হে স্নেহময়ী মাতা! আললাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার দেওয়া সবচেয়ে সুনদর আমানতটি আজ আপনার ঘরে হাসছে, খেলছে। সেই কোমল শিশুটি, যার প্রতিটি নিঃশবাসে আপনার হৃদয় দুলে ওঠে। সে কেবল আপনার সন্তান নয়, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে গচ্ছিত এক পবিত্র আমানত। আললাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (আত-তাহরীম ৬৬/৬)

এই আয়াতে আললাহ কেবল নিজেকে রক্ষার কথা বলেননি, বলেছেন পরিবারকেও রক্ষার কথা। কিন্তু প্রশণ হ’ল, আমরা কি সেই আমানত রক্ষার দায়িতব যথাযথভাবে পালন করছি? রাসূলুললাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িতবশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িতব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হ’তে হবে। পুরুষ তার পরিবারের উপর দায়িতবশীল এবং সে তার পরিবারের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।[1]

আপনি কি কখনো নিঝুম রাতে আপনার সেই নিষ্পাপ সন্তানটির ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ভেবেছেন, সে কোন পথে হাঁটছে? আপনি কি তার কোমল হাত দু’টি ধরে জানণাতের পথে এগিয়ে নিচ্ছেন, নাকি অজান্তেই ঠেলে দিচ্ছেন অন্ধকারের অতল গহবরে? আজ আমরা বড় আক্ষেপ করে বলি, আমাদের সন্তানরা দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে! কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আমরা যা বলি, আমাদের দৈননিদন জীবনে তার প্রতিফলন আছে কি-না? জনৈক সালাফী বিদ্বান বলেছিলেন, ‘তোমাদের সন্তানরা তোমাদের কথার চেয়ে তোমাদের ছায়াকে বেশী অনুসরণ করে’। আজকের আলোচনায় আমরা পাঁচটি অন্ধকার দরজার কথা বলব, যেগুলো দিয়ে প্রতিদিন আমাদের সন্তানদের ঈমান ও আখলাক নিভে যাচ্ছে। অথচ দরজাগুলো খুলে রাখছি আমরা নিজেরাই।

প্রথম দরজা : মুছহাফের ধুলোবালি ও আমাদের অবহেলা

আপনি চান আপনার সন্তান আল-কুরআনের আলোয় আলোকিত হোক, তার বুক জুড়ে থাকুক আললাহ তা‘আলার কালাম। কিন্তু হে সম্মানিত পিতা-মাতা! সেই সন্তান যখনই আপনার কক্ষের দিকে তাকায়, সে কী দেখে? সে দেখে তার পিতার চোখ দু’টি আটকে আছে একটি কৃত্রিম স্ক্রিনে, আঙুলগুলো অবিরাম স্ক্রল করে চলেছে দুনিয়ার অর্থহীন সব দৃশ্য। অথচ ঘরের এক কোণে, আলমারির উপর অবহেলায় পড়ে আছে আল্লাহর কিতাব, তাতে জমে আছে ধুলোর আস্তরণ।

কুরআনের সাথে মুমিনের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, তা আললাহ নিজেই বলেছেন, ‘মুমিন তো তারাই, যাদের হৃদয় আললাহর নাম শুনলে ভয়ে কম্পিত হয় এবং যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়’ (আনফাল ৮/২)। রাসূলুললাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়’।[2]

আপনি যদি পিতা হিসাবে চান আপনার সন্তান আলেম হোক, তবে আপনাকে প্রথমে নিজেকে কুরআনের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। কারণ সন্তান পিতার কর্ম দেখে বড় হয়, পিতার কথা শুনে নয়। যে সন্তান তার পিতাকে কখনো গভীর রাতে কুরআন বুকে জড়িয়ে কাঁদতে দেখেনি, যে মেয়ে তার মাকে দেখেনি পরম ব্যাকুলতায় আল্লাহর আয়াতের গভীরে ডুবে যেতে, সেই কোমল হৃদয়ে কুরআনের মহববত কিভাবে জনমাবে? আমরা মুখে কুরআনের কথা বলি, কিন্তু আমাদের হাতজোড়া সঁপে দিয়েছি আধুনিক যন্ত্রপাতির কাছে। এটা কেবল গাফলতি নয়, বরং আমানতের খেয়ানত।

দ্বিতীয় দরজা : ছালাতের ডাক ও আমাদের অলসতার প্রহর

আর একটু ঘুমিয়ে নেই, অফিসের কাজটা শেষ করে নেই, ছালাত তো পরেও পড়া যাবে। এই ছোট ছোট বাক্যগুলো আমাদের নিজেদের কাছে তুচ্ছ মনে হয়। কিন্তু আমাদের সন্তানরা এই বাক্যগুলো তাদের আত্মার গভীরে খোদাই করে নেয়। আললাহ তা‘আলা ছালাতের গুরুতব সম্পর্কে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন, ‘সুতরাং দুর্ভোগ সেই ছালাত আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের ছালাত সম্পর্কে উদাসীন’ (মা‘ঊন ১০৭/৪-৫)। রাসূলুললাহ (ছা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে ছালাতের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে ছালাত না পড়লে তাদের প্রহার করো’।[3]

কিন্তু এই হাদীছে প্রহারের আগে একটি শর্ত আছে, আর তা হ’ল পিতা-মাতা নিজে ছালাত আদায়কারী হওয়া। যে পিতা নিজে বেপরোয়াভাবে ছালাত ত্যাগ করেন, তিনি কি কখনো সন্তানকে ছালাতে অভ্যস্ত করতে পারবেন? যে পিতা নিজের সন্তানকে দ্বীনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখেন, তিনি তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেন। কারণ যে হৃদয়ে শিশুকাল থেকে দ্বীনের বীজ বোনা হয় না, সেখানে পরবর্তীতে দুনিয়ার আগাছা গজিয়ে ওঠে।

সে যখন দেখে দুনিয়ার সামান্য স্বার্থে, একটু আরামের ঘুমে কিংবা প্রিয় কোন কাজের বাহানায় তার আববা-আম্মা কত সহজে ছালাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে বা অবহেলা করছে, তখন তার অবচেতন মন একটা জিনিস শিখে নেয় যে, ছালাতকে পেছনে ঠেলে দেওয়া যায়। পরবর্তীতে সেই সন্তান যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মগণ থাকবে, আপনি তাকে কিভাবে বলবেন, ছালাতের সময় হয়েছে, আড্ডা ছাড়ো? সে তো তার প্রথম শিক্ষকের কাছ থেকেই শিখে এসেছে যে, দুনিয়ার আননেদর কাছে ছালাতকে থামিয়ে রাখা যায়।

তৃতীয় দরজা : রাতের নিস্তব্ধতা ও আমাদের জাগরণ

আমরা অধিকাংশ অভিভাবক আক্ষেপ করি, আহা! আমাদের তরুণ সমাজ ফজর পড়তে পারে না, তাহাজ্জুদের স্বাদ জানে না। কিন্তু হে উম্মাহর অভিভাবক! একটু স্মৃতির পাতা ওল্টান। আপনার সন্তান ছোটবেলা থেকে রাতের অন্ধকারে আপনাকে কি করতে দেখেছে? সে দেখেছে, নতুন বছরের সূচনালগেণ সামান্য আতশবাজির রোশনাই দেখার জন্য কিংবা পর্দার ভেতরের কোন কাল্পনিক দুনিয়ায় ডুব দেওয়ার জন্য আপনি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে আছেন। কিন্তু সে কি কখনো দেখেছে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, যখন আরশের মালিক প্রথম আসমানে নেমে এসে ডাকতে থাকেন, তখন তার পিতা-মাতা মুছাল্লায় (জায়নামাযে) সিজদায় কাঁদছে?

রাসূলুললাহ (ছা.) জানিয়েছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকী থাকে। তিনি বলেন, কে আমাকে ডাকছ, আমি তার ডাকে সাড়া দেব?’।[4] যে জাগরণ কেবল দুনিয়ার বিনোদনের জন্য, তা কখনো সন্তানের অন্তরে তাহাজ্জুদের তৃষ্ণা জাগাতে পারে না।

সালাফদের মায়েরা কিভাবে সন্তান গড়তেন, তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত দেখুন। ইমাম আহমাদ (রহ.) শৈশবেই পিতৃহারা হন। তাঁর মা ছাফিয়্যাহ বিনতে মায়মূনা (রহ.) চরম দারিদ্রের মধ্যেও এক হাতে ছেলেকে মানুষ করেছিলেন। ভোররাতে যখন চারদিক অন্ধকার থাকত, তখন তিনি পরম মমতায় সন্তানকে ঘুম থেকে তুলতেন, ওযূ করিয়ে দিতেন এবং তীব্র শীতের মধ্যেও মাদ্রাসায় বা ইলমের মজলিসে নিয়ে যেতেন। পথের অন্ধকার ও একাকীতব দূর করতে তিনি ছেলেকে বলতেন, ‘বৎস! তুমি এগিয়ে যাও, আমি তোমাকে আল্লাহর দরবারে আমানত হিসাবে সোপর্দ করলাম’। মায়ের এই গভীর ঈমান ও দূরদর্শিতাই পরবর্তীকালে ইমাম আহমাদকে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম এবং আহলুস সুন্নাহর আলোকবর্তিকা হিসাবে গড়ে তুলেছিল।

চতুর্থ দরজা : সুনণাহর সুবাসহীন এক কৃত্রিম জীবন

রাসূলুললাহ (ছা.)-এর সুনণাহ কেবল বাহ্যিক কিছু লেবাসের নাম নয়। সুনণাহ হ’ল তাঁর অনুপম চরিত্র, তাঁর সততা, তাঁর অমায়িক ব্যবহার, তাঁর ঘরের মানুষদের সাথে সদাচার। আললাহ তা‘আলা রাসূল (ছা.) সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুললাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (আহযাব ৩৩/২১)। আয়েশা (রাঃ)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রাসূল (ছা.)-এর চরিত্র কেমন ছিল? তিনি বলেছিলেন, ‘তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন’।[5]

কিন্তু আমাদের একি অদভূত দ্বিমুখীতা! আমরা সন্তানকে নছীহত করি, কখনো মিথ্যা বলো না। অথচ একটু পরেই দরজায় কোন পাওনাদার এলে আমরা সন্তানকে ইশারা করে বলি, যাও বলে আস, আববা ঘরে নেই। ঘরের ভেতরে স্ত্রীর সাথে আমাদের আচরণ কর্কশ, প্রতিবেশীর সাথে আমাদের সম্পর্ক হিংসা-বিদ্বেষে ভরা। রাসূলুললাহ (ছা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সততা পুণ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং পুণ্য জানণাতের দিকে পরিচালিত করে। আর মানুষ সত্য বলতে বলতে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়’।[6]

সালাফদের অনেকেই বলতেন, ইলমের আগে আদব শেখো। কারণ আদব ছাড়া ইলম মানুষকে আরও অহংকারী করে। এই যে আমাদের কথার সাথে কাজের দূরতব, এই দৃশ্যটি সন্তানের কোমল মনকে বিষিয়ে তোলে। তারা দ্বীনকে তখন এক ধরনের অভিনয় মনে করতে শুরু করে, যা মুখে বলা হয়, কিন্তু জীবনে পালন করা হয় না।

পঞ্চম দরজা : দুনিয়ার ইঁদুর দেŠড় ও আখেরাতের শূন্যতা

এই প্রসঙ্গের শুরুতে একটি গল্প বলা যাক। ধরুন, আপনি আপনার সন্তানকে একটি রাজকীয় জাহাযে তুলে দিলেন। জাহাজের ভেতর সুইমিং পুল আছে, থ্রি-ডি সিনেমা হল আছে। আছে পৃথিবীর সবচাইতে সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। সন্তানকে বিদায় জানানোর সময় আপনি তাকে বারবার মনে করিয়ে দিলেন, কিভাবে চামচ দিয়ে স্যুপ খেতে হয়, কিভাবে টাই বাঁধতে হয়, আর কিভাবে লাইনের সবার আগে গিয়ে ফার্স্ট কলাস কেবিনটা দখল করতে হয়। কিন্তু খুব ছোট্ট একটি জিনিস আপনি তাকে বলতে ভুলে গেলেন। আপনি তাকে বললেনই না যে, জাহাজটার গন্তব্য কোথায়! আপনি তাকে শেখালেন না যে, ঝড় এলে কিভাবে লাইফ জ্যাকেট পরতে হয়, জাহাজ যদি কোনদিন ডুবে যায় তবে কিভাবে বাঁচতে হয়। আমরা কি আমাদের সন্তানদের সাথে ঠিক এই কাজটাই করছি না?

আমাদের সকালগুলো আজকাল কেমন যেন যান্ত্রিক। ঘুম থেকে উঠেই আমাদের ডাইনিং টেবিলের গল্পগুলো শুরু হয় লাভ আর ক্ষতির নিখুঁত হিসাব দিয়ে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরা গল্প করি, অমুকের ছেলেটা এবার গোল্ডেন এ-পলাস পেয়েছে, তমুকের পিতা অমুক জায়গায় পাঁচ কাঠা জমি কিনেছে, অমুক কোম্পানির সিইও-র বেতন নাকি প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা! আমাদের কচি সন্তানটি যখন এক কোণে বসে নাশতা খেতে খেতে পিতা-মাতার এই মোহময় আলোচনা শোনে, তখন তার অবচেতন মন খুব নীরবে একটি মারাত্মক বার্তা গ্রহণ করে। সে শিখে নেয়, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার ও সফল হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হ’ল টাকা, ক্ষমতা আর জিপিএ-৫!

সন্তানের জিপিএ-৫ নিশ্চিত করার জন্য, তাকে কোন ভালো কোচিংয়ে ভর্তি করানোর জন্য আমরা পিতা-মাতারা রাতের পর রাত জেগে থাকি। আমাদের চোখে ঘুম থাকে না, কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। অথচ সেই সন্তানটা রাতে এশার ছালাত না পড়েই ঘুমিয়ে গেল কি-না, তার হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর জাহানণামের ভয় ঢুকল কি-না তা নিয়ে আমাদের বিনদুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তার দুনিয়ার ক্যারিয়ারের জন্য আমরা যতটা বিনিদ্র রজনী কাটাই, তার আখেরাত গড়ার জন্য আমরা তার এক শতাংশও করি না। হায় আক্ষেপ!

আললাহ তা‘আলা আমাদের এই ভয়ংকর মানসিকতা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে কত চমৎকার করেই না সতর্ক করেছেন! ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছনণ করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরসমূহে উপস্থিত হচ্ছ’ (তাকাছুর ১০২/১-২)। এই যে কে কার চেয়ে বেশী টাকা কামাবে, কে কত বড় বাড়ী বানাবে, এই ইঁদুর দেŠড় খেলতে খেলতেই একদিন হঠাৎ আমাদের সামনে মালাকুল মউত এসে পড়েন। আমরা টেরই পাই না যে আমাদের সময় শেষ! আমরা ভাবি, ব্যাংকে কোটি টাকা আর দামী গাড়ি থাকলেই বুঝি জীবন সফল। অথচ আমাদের প্রিয় নবী (ছা.) সুখের সংজ্ঞা দিয়েছেন একদম অন্যভাবে। তিনি বলেছেন, ‘সম্পদের প্রাচুর্যে ধনী হওয়া যায় না, বরং ধনী হ’ল সেই হৃদয়, যা আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ’।[7] যে হৃদয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল আছে, যে হৃদয়ে আখেরাতের তৃষ্ণা আছে, সেই তো প্রকৃত ধনী।

হাসান বাছরী (রহ.) চমৎকার একটি কথা বলেছিলেন। কথাটি শুনলে গা শিউরে ওঠে। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি তো আর কিছুই নও, তুমি হ’লে কেবল কতগুলো দিনের সমষ্টি। তোমার জীবন থেকে যখন একটি দিন চলে যায়, মনে রেখো, তোমার অস্তিতেবর একটি বড় অংশই চিরতরে হারিয়ে যায়’। তাহ’লে ভাবুন তো, আমাদের জীবনের এই যে দিনগুলো চলে যাচ্ছে, সেগুলো কি আমরা আল্লাহর স্মরণে কাটাচ্ছি, নাকি স্রেফ একটি অন্ধ দুনিয়ার পেছনে ছুটে পার করে দিচ্ছি? যখন আমাদের পুরো জীবনটা জুড়ে কেবল দুনিয়ার জাঁকজমক, ব্যাংকের ব্যালেন্স আর মানুষের বাহবা পাওয়ার সাধনা প্রকাশ পায়, তখন আমাদের সন্তানের কচি মনে আখেরাতের আকাঙ্ক্ষা কিভাবে তৈরি হবে? সে তো আমাদের দেখেই বড় হচ্ছে। সে ধরে নেয়, এই চার দেয়ালের পৃথিবীর সমৃদ্ধিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। এর বাইরে যে একটি অন্তহীন জীবন আছে, যেখানে আমাদের অনন্তকাল থাকতে হবে, সেটা তার কাছে তখন রূপকথার মতো মনে হয়।

হে সম্মানিত অভিভাবক! সন্তানকে দুনিয়ার ইঁদুর দেŠড়ে প্রথম বানানোর আগে একবার ভাবুন, কবরের প্রথম রাতে যখন তাকে একা রেখে আসা হবে, তখন আপনার দেওয়া এই জিপিএ-৫ আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চাকরি কি তার কোন কাজে আসবে? যদি না আসে, তবে কেন আমরা তাদের আসল গন্তব্যের কথা ভুলে এই ক্ষণস্থায়ী জাহাজের চাকচিক্য নিয়ে এতটা ব্যস্ত? সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই চলুন, ওদের হাতটা ধরে জানণাতের পথে হাঁটা শেখাই। সালাফদের যুগে মায়েরা তাদের সন্তানদের ঘুম থেকে জাগিয়ে বলতেন, হে বৎস! ওঠো, ছালাত আদায় করো। আমি চাই না হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে আমি লজ্জিত হই। তাঁরা মুখে যা বলতেন, তাঁদের চোখ, হাত আর হৃদয় তা-ই সাক্ষ্য দিত। তাই সেই সন্তানেরা হয়েছিল ইমাম, মুজাহিদ, আলেম; যাদের কথা আজও ইতিহাস বলে।

অভিভাবক হিসাবে আমাদের করণীয়

সন্তানকে সালাফদের আদর্শে এবং নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হ’লে কেবল মুখে বলাই যথেষ্ট নয়, বরং নিজেদের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটানো যরূরী। আজ থেকেই আমরা আমাদের পরিবারে নিম্নের পাঁচটি সহজ অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি।-

১. ঘরে কুরআনের পরিবেশ তৈরি করা : প্রতিদিন সন্তানের সামনে অন্তত ১৫-২০ মিনিট কুরআন তেলাওয়াত করুন। আপনার তেলাওয়াত শুনে সন্তানের অন্তরেও আল্লাহর কালামের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে।

২. ছালাতের বাস্তব প্রশিক্ষণ : নিজে জামা‘আতে ছালাত আদায়ের অভ্যাস করুন এবং মসজিদে বা ছালাতের ওয়াক্তে সন্তানকেও পরম মমতায় সাথে নিয়ে যান। এটি তাকে শৈশব থেকেই ছালাতের প্রতি অনুরাগী করবে।

৩. সালাফদের জীবনীর সাথে পরিচয় : সপ্তাহে অন্তত একটি দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে বসুন। এই সময়ে রাসূলুললাহ (ছা.)-এর সীরাত, ছাহাবী এবং সালাফদের অনুপ্রেরণামূলক জীবনী পাঠ করুন ও আলোচনা করুন।

৪. আদর্শ আচরণের মডেল হওয়া : সন্তানের সামনে মিথ্যা, গীবত, পরনিনদা ও হিংসার মতো বদভ্যাসগুলো পুরোপুরি পরিহার করুন। মনে রাখবেন, সন্তান আমাদের মুখের কথার চেয়ে আমাদের আচরণ দেখে বেশী শেখে।

৫. দো‘আর মাধ্যমে দিনের সমাপ্তি : প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে সন্তানকে কাছে বসিয়ে সংক্ষিপ্ত দো‘আ করুন। আল্লাহর কাছে তাদের নেক নিয়ত, উত্তম চরিত্র ও হেদায়াতের জন্য আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করুন।

আপনি নিজে তা-ই হয়ে উঠুন, যা আপনি আপনার সন্তানের মাঝে দেখতে চান। হে সম্মানিত পিতা! হে স্নেহময়ী মাতা! আললাহ আমাদের এই পবিত্র আমানত রক্ষা করার তাওফীক দান করুন। আমাদের সন্তানদের কবলব আলোকিত করুন কুরআনের নূরে। আমাদের ঘরগুলো হোক তাহাজ্জুদের কানণায় মুখরিত, ছালাতের আযানে প্রকম্পিত ও সুনণাহর সুবাসে সুরভিত।-আমীন।

-জাহিদ হাসান*

সহকারী শিক্ষক, শান্তি নিকেতন ইন্সটিটিউট, ফেনী।


[1]. বুখারী হা/৮৯৩; মুসলিম হা/১৮২৯।

[2]. বুখারী হা/৫০২৭।

[3]. আবুদাঊদ হা/৪৯৫, সনদ ছহীহ।

[4]. বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮।

[5]. মুসলিম হা/৭৪৬।

[6]. বুখারী হা/৬০৯৪; মুসলিম হা/২৬০৭।

[7]. বুখারী হা/৬৪৪৬।






সন্তান আমার আয়না - জাহিদ হাসান
পরিবারে অগ্রাধিকার ব্যবস্থাপনা - জাহিদ হাসান
ভাই-বোনদের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ়করণ ও হিংসা দূরীকরণে করণীয় - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
শিশুদের ছিয়াম : কেন, কখন এবং কিভাবে অভ্যস্থ করবেন? - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
আগামীর নক্ষত্র গড়ে উঠুক বিনয়ের আলোয়! - ড. আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব
শিশুদের জন্য স্ক্রিন টাইম ও কন্টেন্ট নির্বাচন - জাহিদ হাসান
বই হোক সন্তানের নিত্য সঙ্গী - জাহিদ হাসান
শিশুদের আদব : পারিবারিক শিক্ষার প্রথম পাঠ - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
উঠতি বয়সে বন্ধু-বান্ধবজনিত সমস্যা : উত্তরণের পথ - মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
শিশুর আবেগকে অবহেলা নয় - জাহিদ হাসান
পুত্র সন্তানদের উপদেশ ও শাসনের সঠিক কৌশল : একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ - জাহিদ হাসান
আরও
আরও
.