আগামীর নক্ষত্র গড়ে উঠুক বিনয়ের আলোয়!

পিতা-মাতার কাছে সন্তান কেবল রক্ত-গোশতের কোন শরীর নয়; সন্তান হ’ল তাদের অস্তিত্বের অংশ, স্বপ্নের চারাগাছ এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সেতুবন্ধন। প্রত্যেক পিতা-মাতা চান সন্তান বড় হয়ে অনেক বড় কিছু হবে, সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বড় আলেম, বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি হবে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি, আমার সন্তান যত বড়ই হোক না কেন, তার মধ্যে যদি ‘বিনয়’ না থাকে, তবে সে সমাজের জন্য কতটা ভয়ংকর হ’তে পারে?

যে গাছে ফল বেশী ধরে, সে গাছ মাটির দিকে ঝুঁকে থাকে। ঠিক তেমনি যে মানুষের জ্ঞান ও যোগ্যতা যত বেশী তার বিনয় তত গভীর হওয়া উচিত। আজকের এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে আমরা সন্তানদের ফাস্ট হ’তে শেখাই, স্মার্ট হ’তে শেখাই, কিন্তু মানুষ হ’তে শেখাতে ভুলে যাই। সন্তানদের ‘সাফল্য’ বা ‘ক্যারিয়ার’ নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত, তাদেরকে ‘মানুষ’ হিসাবে গড়ে তোলার ব্যাপারে ততটা মনোযোগী নই। ফলে তারা বড় হয়ে সফল হয় ঠিকই, কিন্তু তাদের অহংকারের দাপটে পরিবার ও সমাজ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আপনার সন্তানকে একজন বিনয়ী, পরোপকারী ও পরিশুদ্ধ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চাইলে নিম্নের বিষয়গুলো আজ থেকেই চর্চা শুরু করুন।

১. আপনিই তাদের আয়না, তাই নিজে বিনয়ী হোন!

সন্তানকে শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা পড়িয়ে ‘মানুষ’ বানানো যায় না। তাকে মানুষ বানাতে হ’লে নিজেকেও একজন খাঁটি মানুষ হিসাবে তার সামনে উপস্থিত হ’তে হবে। শিশুরা নছীহত শুনে যা শেখে, তার চেয়ে হাযার গুণ বেশী শেখে পিতা-মাতার আচরণ দেখে। আপনি যদি বাসার কাজের লোক, রিকশাচালক বা অধীনস্থদের সাথে ধমক দিয়ে কথা বলেন, আর সন্তানকে বলেন, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তা কখনোই কাজে আসবে না। তাই সন্তানের সামনে উঁচু-নীচু ভেদাভেদ ভুলে সবার সাথে কোমলভাবে ও সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আনাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি নয় বছর রাসূল (ছাঃ)-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। কিন্তু আমার জানা নেই যে, কোন কাজ আমি করেছি, অথচ তিনি সে ব্যাপারে বলেছেন, এরূপ কেন করলে? কিংবা কোন কাজ করিনি, সে ব্যাপারে বলেছেন, কেন অমুক কাজটি করলে না।[1]

পরিবারের ভেতরে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যথাযথ সম্মান করুন এবং গৃহের মুরববীদের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখুন। সন্তান যখন দেখবে আপনারা বড়দের সম্মান করছেন, সেও তা শিখবে। নিজের ভুল হ’লে সন্তানের সামনেই বিনয়ের সাথে ‘সরি’ বা দুঃখিত বলুন। এতে তারা শিখবে যে, ভুল স্বীকার করলে কেউ ছোট হয়ে যায় না, বরং এতে সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

২. ‘শুকরিয়া’ ও কৃতজ্ঞতার সংস্কৃতি

আজকের শিশুরা অনেক কিছুই না চাইতেই পেয়ে যায়। ফলে তাদের মধ্যে পাওনাদার মনোভাব তৈরী হয়। তারা ভাবতে শুরু করে, সবকিছু পাওয়া আমার অধিকার। এই মনোভাবই অহংকারের মূল।

তাই সন্তানকে শেখান যে, সে যা খাচ্ছে, পরছে বা ব্যবহার করছে- তা তার কোন কৃতিত্ব নয়, বরং আল্লাহর দয়া এবং পিতা-মাতার পরিশ্রমের ফল। ছোটখাটো যেকোন প্রাপ্তিতে আলহামদুলিল্লাহ এবং কারও কাছ থেকে ছোট কোন সাহায্য পেলেও সন্তানকে ‘ধন্যবাদ’ বা ‘জাযাকাল্লাহ’ বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শেখান। কৃতজ্ঞতা অহংকারের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। রাসূল (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিও শুকরিয়া আদায় করে না’।[2]

৩. নিজের কাজ নিজে করতে অভ্যস্ত করুন!

সন্তানকে রাজপুত্র বা রাজকন্যার মতো বড় করবেন না। যে নিজের কাজ নিজে করতে জানে না, সে অন্যকে ছোট মনে করতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজের জুতায় নিজে তালি লাগাতেন, কাপড় সেলাই করতেন, ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন।[3]

তাই সন্তানকে তার নিজের স্কুলব্যাগ বহন করতে দিন। খাওয়ার পর নিজের প্লেটটি ধুয়ে রাখার অভ্যাস করান। নিজের কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করতে অভ্যস্ত করুন। নিজের বিছানা গোছানোর দায়িত্ব তাকেই দিন। পারিবারিক নানা কাজ করিয়ে নিন। এতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে উঠবে। তাদের মধ্যে শ্রমের মর্যাদা ও বিনয় তৈরি হবে।

৪. মানুষের সাথে মেশার সুযোগ দিন!

আপনার সন্তান যদি সারাক্ষণ ঘরে আটকে থাকে, গভীর অধ্যয়নে মত্ত থাকে এবং শুধু নিজের স্ট্যাটাসের বন্ধুদের সাথেই মেশে, তবে সে দুনিয়ার বাস্তবতা বুঝবে না। সে গরীব বা সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা করতে শিখবে। তাই মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে গ্রামে যান, আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ নিতে বলুন। সবার সাথে মিশতে অভ্যস্ত করুন। ইয়াতীমখানা বা বস্তিতে নিয়ে যান। নিজের হাতে গরীব-অসহায়দের দান করতে শেখান। যখন সে দেখবে, তার বয়সের অন্য শিশুটি একবেলা খাবারের জন্য কি সংগ্রামই না করছে, তখন তার মন নরম হবে এবং আল্লাহর প্রতি বিনয়ী হবে।

৫. সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত করুন!

আধুনিক যুগে পিতামাতারা অনেক সময় ভালোবেসে সন্তানকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিলাসিতা দিয়ে ফেলেন। এতে সন্তানের মধ্যে অহংকার তৈরি হ’তে পারে। তাই তাকে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করুন। সবসময় ফাস্ট ফুড বা দামী খাবারের পরিবর্তে ঘরে তৈরি সাধারণ খাবার খাওয়ান। তাকে বোঝান যে, খাবার হ’ল আল্লাহর নে‘মত এবং শরীরের প্রয়োজন, বিলাসিতার বস্ত্ত নয়। ক্ষমতা থাকলেও সবসময় ব্যক্তিগত গাড়ি বা দামী বাহন ব্যবহার না করে মাঝে-মধ্যে ভ্যান-রিকশা সহ গণপরিবহনে চড়ার অভিজ্ঞতা দিন। অল্প দূরত্বে হেঁটেই কাজ সারার মানসিকতা তৈরি করুন। এতে সে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মেশার সুযোগ পাবে এবং বাস্তবতা বুঝতে শিখবে। দামী ব্র্যান্ডের পোশাক বা লেটেস্ট মডেলের গ্যাজেট থাকলেই যে মানুষ বড় হয় না, এই শিক্ষা দিন। পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোষাকই যে যথেষ্ট, তা তাদের বোঝান। কোনটি তার ‘প্রয়োজন’ আর কোনটি তার ‘বিলাসিতা বা ইচ্ছা’ এই দু’টির পার্থক্য বোঝান।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিনয়বশত মূল্যবান পোষাক পরিধান ত্যাগ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সকল সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং ঈমানের পোষাকের মধ্যে যে কোন পোশাক পরার অধিকার দিবেন’।[4]

৬. তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও তুলনা বন্ধ করুন!

কখনো সন্তানের সামনে অন্য কারো সমালোচনা করবেন না বা কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন না। কারো গায়ের রঙ কালো, কেউ দেখতে অসুন্দর কিংবা কারো শারীরিক কোন ত্রুটি আছে এসব নিয়ে সন্তানের সামনে ভুলেও হাসাহাসি করবেন না। বরং তাকে বোঝান, ‘আল্লাহ যাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন, সেটাই সুন্দর।

ওরা গরীব, ওদের সাথে মিশবে না- এই কথাটি সন্তানের মনে অহংকারের পাহাড় তৈরি করে। তাকে শেখান যে দরিদ্রতা কোন পাপ নয় এবং ধনী হওয়া কোন যোগ্যতা নয়। অনেক পিতামাতা ভাবেন, অন্যের সাথে তুলনা করলে সন্তান যেদ করে ভালো ফলাফল করবে। যেমন ‘ও ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে আর তুমি ফেল করেছ’। এই তুলনা সন্তানের মনে হিংসা ও বিদ্বেষ তৈরি করে। সে তার বন্ধুকে আর বন্ধু মনে করে না, বরং প্রতিপক্ষ ভাবে। তাকে বোঝান, প্রত্যেকের মেধা আলাদা। কেউ পড়াশোনায় ভালো, কেউ ব্যবহারে ভালো, আবার কেউ হয়তো হাতের কাজে দক্ষ। অন্যের সাথে তুলনা না করে তাকে ‘গতকালকের নিজের’ চেয়ে ‘আজকের নিজেকে’ উন্নত করার শিক্ষা দিন।

৭. সহমর্মিতার শিক্ষা দিন!

এটি বিনয় অর্জনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। সন্তান যখন রাস্তায় কোন ভিক্ষুককে দেখবে কিংবা ছিন্নমূল কোন শিশুকে দেখবে, তখন তাকে ঘৃণা করতে দেবেন না। তাকে গভীরভাবে বোঝান- আল্লাহ চাইলে আজ তুমি ঐ অবস্থায় থাকতে পারতে, আর সে তোমার জায়গায় থাকতে পারতো। আল্লাহ তোমাকে ভালো রেখেছেন, এটা তোমার কৃতিত্ব নয়, এটা আল্লাহর দয়া।

এই চিন্তাধারাটি সন্তানের মনে কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি করবে। সে ভাববে, আমাকে আল্লাহ অনেক দিয়েছেন, তাই আমার দায়িত্ব হ’ল যাদের নেই তাদের পাশে দাঁড়ানো। এই বোধ থেকেই প্রকৃত মানবিকতার জন্ম হয়।

৮. ভুল সংশোধনে হোন কৌশলী!

সন্তানকে প্রকৃত বিনয়ী রূপে গড়ে তুলতে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে অভিভাবককে হ’তে হবে অত্যন্ত কৌশলী ও প্রজ্ঞাবান। সন্তানের কোন উদ্ধত আচরণকে যেমন প্রশ্রয় দিয়ে হেসে উড়িয়ে দেওয়া অনুচিত, তেমনি সবার সামনে তাকে তিরস্কার করে লজ্জিত করাও হিকমতের পরিপন্থী। কারণ এতে তার আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় এবং যিদ বেড়ে যায়। এর পরিবর্তে নিরিবিলি পরিবেশে তাকে স্নেহের সাথে ভুলের স্বরূপ বুঝিয়ে দিন এবং তার অনুভূতির দুয়ার খুলে দিতে প্রশ্ন করুন, তোমার সাথে কেউ এমন আচরণ করলে তোমার কেমন লাগত? এভাবেই তাকে অন্যের জায়গায় নিজেকে রেখে চিন্তা করতে শেখান।

৯. সেবার মানসিকতা তৈরি করুন!

বিনয় চর্চার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হ’ল মানুষের সেবা করা। বাসায় মেহমান এলে সন্তানকে বলুন তাদের পানি এগিয়ে দিতে বা নাশতা পরিবেশন করতে। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য তথা দাদা-দাদী, নানা-নানী বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে কেমন আচরণ করতে হয়, কিভাবে তাদের খেদমত করতে হয় তা হাতে-কলমে শেখান। বৃদ্ধদের সেবা করতে তাকে উৎসাহিত করুন। যখন সে নিজের হাতে অন্যকে খাওয়াবে বা সেবা করবে, তখন তার মনের অহংকার গলে পানি হয়ে যাবে। এছাড়া পশুপাখির প্রতি সদয় হ’তে শেখান। অবলা প্রাণীর প্রতি মায়া মানুষকে নিষ্ঠুরতা থেকে দূরে রাখে।

১০. সন্তানের সাফল্যের নানা গল্পের সাথে বিনয় যুক্ত করুন :

সন্তানের প্রতিটি ছোট-বড় অর্জনে প্রশংসার পাশাপাশি তাদের বিনয়ী হ’তে শেখান। যেমন পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য তাদের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেওয়ার সময়ই স্মরণ করিয়ে দিন যে, এই সাফল্যের পেছনে শিক্ষক, সহপাঠী ও গুরুজনদের দো‘আ এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। এতে সন্তান শিখবে যে সাফল্য অহংকারের নয় বরং কৃতজ্ঞতার বিষয়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের অহংকারমুক্ত রেখে এমন এক অপরাজেয় যোদ্ধায় পরিণত করবে, যে বিজয়ের শিখরে পৌঁছেও বিনয়ে মাথা নত রাখতে জানে।

১১. ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করুন!

সন্তানকে কেবল জয়ের মন্ত্র শেখাবেন না, বরং পরাজয়কে হাসিমুখে বরণ করে নেওয়ার শক্তিও তাদের মধ্যে তৈরী করুন। সন্তান যখন ব্যর্থ হয়, তখন সে বুঝতে পারে যে সে ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং তারও সীমাবদ্ধতা আছে। এই উপলব্ধিই তাদের মনে ‘আমিই সেরা’ এমন মিথ্যা অহংকার বা দম্ভ জন্মাতে দেয় না। তাদের বোঝান যে, জীবনে হোঁচট খাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়, বরং নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে নতুন করে শেখার একটি সুযোগ। যে সন্তান ছোটবেলা থেকে ব্যর্থতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে শেখে, বড় হয়ে সে অন্যের প্রতি অনেক বেশী সহানুভূতিশীল ও বিনয়ী হয়, কারণ সে জানে যে কোন মানুষই নিখুঁত নয়।

১২. দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন!

শুধু কুরআন মুখস্থ করা বা ছালাত আদায় যথেষ্ট নয়। ইবলীসও বড় জ্ঞানী ছিল, কিন্তু শুধু ‘অহংকার’-এর কারণে সে বিতাড়িত হয়েছে। তাই সন্তানকে শোনান যে, ফেরআউন ও নমরূদ ধ্বংস হয়েছে তাদের অহংকারের জন্য। কারূণের বিপুল সম্পদ তার কোন কাজে আসেনি। রাববুল আলামীন তাকে তার সমস্ত সম্পদ ও বিশাল প্রাসাদ সহ তাকে মাটিতে দাবিয়ে দিয়েছেন। এসব গল্প তার মনে গেঁথে দিন।

তাকে শেখান যে, অর্থের প্রাচুর্য বা বিত্ত-বৈভব মানুষকে বড় করে না; বরং যার মন যত বিশাল এবং ব্যবহার যত সুন্দর ও বিনয়াবনত সে-ই প্রকৃত ধনী। যে গাছে যত বেশী ফল ধরে, ফলের ভারে সেই গাছটি তত বেশী মাটির দিকে ঝুঁকে থাকে। অথচ ফলহীন গাছ টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক তেমনি, যারা প্রকৃত জ্ঞানী ও জান্নাতী মানুষ, তারা কখনো অহংকার করেন না; বরং তারা সবসময় বিনয়ী ও নম্র হন। সন্তানকে বুঝান, উদ্ধত হয়ে মানুষের ওপরে থাকার চেয়ে, বিনয়ে মাথা নত করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াতেই জীবনের আসল সার্থকতা।

১৩. বিনয়-নম্রতার মর্যাদা অনুধাবন করানোর চেষ্টা করুন!

নিম্নোক্ত হাদীছগুলোতে বিনয়-নম্রতার মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে। যা অনুধাবন করলে সন্তান সদা সর্বদা বিনয়ী হ’তে উদ্বুদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ ‘যে বান্দা আল্লাহর জন্য বিনীত হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন’।[5]

তিনি বলেন, أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَنْ يَحْرُمُ عَلَى النَّارِ أَوْ بِمَنْ تَحْرُمُ

عَلَيْهِ النَّارُ، عَلَى كُلِّ قَرِيبٍ هَيِّنٍ سَهْلٍ، ‘আমি কি তোমাদেরকে জানাব না যে, কারা জাহান্নামের জন্য হারাম বা কার জন্য জাহান্নাম হারাম করা হয়েছে? জাহান্নাম হারাম আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী প্রত্যেক বিনয়ী ও নম্র লোকের জন্য’।[6] তিনি আরো বলেন, إِذَا أَحَبَّ اللهُ عَبْدًا أَعْطَاهُ الرِّفْقَ ‘আল্লাহ কোন বান্দাকে ভালবাসলে তাকে নম্রতা দান করেন’।[7]

অতএব প্রিয় অভিভাবক! সন্তানকে আলেম, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যারিস্টার বানানোর স্বপ্ন দেখার আগে তাকে মানুষ বানানোর স্বপ্ন দেখুন। এমন সন্তান গড়ে তুলুন, যে বড় হয়ে বড় কোন চেয়ারে বসলেও তার পা থাকবে মাটিতে। যার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মানুষ আপনার জন্য দো‘আ করবে। আসুন! আমাদের সন্তানদের হৃদয়ে বিনয়ের বীজ বুনে দিই। কারণ বিনয়ী মানুষই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং আর মানুষের কাছে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়। রাববুল আলামীন আমাদের তাওফীক দান করুন-আমীন!


[1]. মুসলিম হা/২৩০৯।

[2]. আবূদাঊদ হা/৪৮১১; ছহীহাহ হা/৪১৬।

[3]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৬৪৪০।

[4]. তিরমিযী হা/২৪৮১; ছহীহাহ হা/৭১৮।

[5]. মুসলিম হা/২৫৮৮; মিশকাত হা/১৮৮৯।

[6]. তিরমিযী হা/২৪৮৮; ছহীহাহ হা/৯৩৮।

[7]. ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৬৬৬।






বিষয়সমূহ: বিবিধ
আরও
আরও
.