পুত্র সন্তানদের আচরণ সংশোধনে অনেক সময় পিতা-মাতা বা অভিভাবক যেভাবে উপদেশ দেন বা শাসন করেন, তা ফলপ্রসূ না হয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, বকা-ঝকা বা মারধর যদি প্রকাশ্যে হয় বা ঘন ঘন হয়, তাহ’লে সন্তান আরও যেদী, নির্লিপ্ত বা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা পুত্র সন্তানদের মানসিক গঠনের ওপর আলোকপাত করব। বোঝানোর চেষ্টা করব, কিভাবে ছেলে সন্তানদের উপদেশ দেয়া ও সংশোধন করা উচিত।
পুত্র সন্তানের মনস্তত্ত্ব : ছেলে সন্তানরা তুলনামূলকভাবে বেশী আত্মসম্মানবোধ (ego/self-respect) ধারণ করে। সাধারণত তারা সরাসরি এবং স্পষ্ট যোগাযোগ পসনদ করে। তারা দীর্ঘ বক্তৃতা বা পুনরাবৃত্তিমূলক উপদেশ শুনতে অস্বস্তি বোধ করে। প্রকাশ্যে অপমানিত বা দোষারোপ হ’লে অধিক প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। আবেগ প্রকাশে সংকোচবোধ করে বা অন্তর্মুখী হয়ে থাকে। নির্দেশ বা বকার চেয়ে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা অধিক পসনদ করে। আসুন! আমরা পুত্র সন্তানকে গঠনমূলক ভাবে উপদেশ দেওয়ার উপায় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি।
প্রথমত - স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিন যে, কোন আচরণটি আপনি পসনদ করেন না। কারণ পুত্র সন্তানরা সরাসরি কথা বুঝতে পসনদ করে। তাই তাদেরকে বকাঝকা না করে পরিষ্কারভাবে বলুন, কোন আচরণটি আপনার অপসনদনীয় এবং কেন এটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এভাবে বলবেন না যে, ‘তুই কোনদিন মানুষ হবি না!’ বরং এভাবে বলুন, ‘তুমি আজকে যেভাবে ছোট ভাইকে ধমক দিয়েছ, সেটা আমাদের পরিবারে গ্রহণযোগ্য না। আমরা সবার সাথে সবসময় সম্মান দিয়ে কথা বলি।’ আপনি যদি এভাবে অপরাধ বা ভুল আচরণটি নির্দিষ্টভাবে উলেলখ করেন, তাহ’লে শিশুটি বুঝতে পারবে, কি নিয়ে অভিযোগ করা হচ্ছে। এতে সে সংশোধনের সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয়ত - ব্যাখ্যা দিন, কেন এই আচরণটি খারাপ। শুধু ‘এটা করো না’ বললে শিশু বুঝতে পারবে না যে, কেন এটি করা উচিত নয়। বরং তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝান যে, এই আচরণের ফলে তার নিজেরই ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে বলবেন না যে, ‘তুই একটা বেয়াদব ছেলে। বড়দের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে?’ বরং এভাবে বলুন, ‘যদি তুমি বড়দের সাথে অভদ্রভাবে কথা বল, তাহ’লে ভবিষ্যতে সবাই তোমাকে এড়িয়ে চলবে। তুমি কখনো শ্রদ্ধা পাবে না।’ এভাবে যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা দিলে সন্তান নিজেই উপলব্ধি করতে পারবে যে, এই আচরণের ফলাফল কি হ’তে পারে। এতে আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেক বেশী।
তৃতীয়ত - কখনোই জনসম্মুখে উপদেশ বা অপমান নয়। পুত্র সন্তানরা তাদের সম্মান নিয়ে খুব সচেতন। তাই তাদের ভুলগুলো শুধরে দিতে হ’লে একান্তে ডেকে নিয়ে শান্তভাবে বলুন। প্রকাশ্যে বকা দিলে তারা লজ্জা পাবে এবং যেদী হয়ে উঠতে পারে। ভাই-বোন, আত্মীয় বা বন্ধুদের সামনে এভাবে বলবেন না যে, ‘তুই তো সবসময় বাড়াবাড়ি করিস!’ বরং এভাবে বলুন, ‘তোমার সাথে আমি একটু একা কথা বলতে চাই’। তাকে আলাদাভাবে নিয়ে শান্তভাবে বোঝান। জনসম্মুখে বলা হ’লে শিশুর আত্মসম্মান আহত হয়। সে অপমানবোধ করে ও প্রতিরোধমূলক আচরণ করতে পারে।
চতুর্থ বিষয়, ছেলেরা অনেক সময় অভিমানী হয়। তাই তার ইগো ও আত্মমর্যাদার প্রতি সম্মান দেখান। ছেলে শিশুরা তাদের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে গর্ববোধ করে। তাই তাদের সাথে এমনভাবে কথা বলুন যেন তারা বুঝতে পারে যে আপনি তাদের মতামতকে গুরুতব দিচ্ছেন। এভাবে বলবেন না যে, ‘তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না, তুমি সবসময় অলসতা কর।’ বরং এভাবে বলুন, ‘আমি জানি তুমি পারো, শুধু একটু মনোযোগ দিতে হবে। তুমি যদি চেষ্টা করো, অবশ্যই ভালো ফলাফল করতে পারবে।’ কারণ ইতিবাচক মনোভাব শিশুকে উৎসাহিত করে। তাই তাদেরকে অপমান বা হুমকি নয়।
পঞ্চম বিষয় হ’ল, তাদেরকে শেখানোর মনোভাব রাখতে হবে। শিশুকে শুধু বকা না দিয়ে বরং তার মতামত জানতে চান এবং তার সমস্যা বুঝতে চেষ্টা করুন। এতে সে আপনার সাথে খোলামেলা আলোচনা করতে পারবে। তাদেরকে এভাবে বলবেন না যে, ‘তুমি কেন সব সময় বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘুরে বেড়াও?’ বরং এভাবে বলুন, ‘তোমার বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে, তাই না? কিন্তু আমাদের বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। সব বন্ধু ভালো হয় না। এছাড়াও বন্ধুদের সাথে যদি অধিক সময় কাটাও তবে পড়াশোনার ক্ষতি হ’তে পারে। তাই আমি চাই, তুমি বাড়ির কাজ ও পড়াশোনার দিকেও সময় দিবে।’
ষষ্ঠ বিষয়, ইতিবাচক সমর্থন দিন। যখন সন্তান ভালো কাজ করে, দায়িতবশীল হয়, তখন তাকে উৎসাহিত করুন। এতে সে বুঝবে যে, সে নিজের ভালো আচরণের জন্য প্রশংসা পাচ্ছে। তাকে এভাবে উৎসাহ দিতে পারেন যে, ‘তুমি যে পিতার সাথে কুরবানির গোশত কাটার কাজে সাহায্য করেছ, আমি খুব খুশি হয়েছি! এভাবে সব সময় পিতাকে সাহায্য করে যাও।’
যেহেতু উপদেশ বা শাসনও এক ধরনের যোগাযোগ, তাই তা হ’তে হবে রুচিশীল, সম্মানজনক। মনে রাখবেন, ভালো উপদেশ মানে শুধুই ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; বরং এমনভাবে বলা, যেন সেই উপদেশটি শ্রোতার হৃদয়ে গেঁথে যায় এবং নিজের ভুলটা সে নিজেই বুঝে নেয়। সবশেষে বলব, পুত্র সন্তানদের সাথে যোগাযোগ একটি শিল্প। যা চর্চার মাধ্যমে নিখুঁত হয়। তাদের মানসিকতা বুঝে, সম্মান দিয়ে এবং যুক্তি সহকারে কথা বললে তারা আরো সহযোগিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, আমাদের লক্ষ্য শুধু আজ্ঞাবহ সন্তান গড়া নয়। একজন দায়িতবশীল, আত্মবিশবাসী এবং সুখী মানুষ হিসাবে তাদের গড়ে তোলা।
সুতরাং, পুত্র সন্তানদের উপদেশ দিতে গিয়ে বকা-ঝকা, অপমান বা তুলনা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের মন বুঝে সম্মানের সাথে সঠিকভাবে বোঝানো উচিত। তবেই শিশুর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং সে একদিন গঠনমূলক, আত্মবিশবাসী ও দায়িতবশীল একজন মানুষ হয়ে উঠবে। আপনিও হবেন এক অনন্য শিল্পী, যিনি কথার মাধ্যমে (সন্তানদের) এক সুনদর চরিত্র গড়ে তুলছেন।
* সহকারী শিক্ষক, শান্তি নিকেতন ইন্সটিটিউট, ফেনী।