ভূমিকা : উঠতি বয়স তথা ‘কৈশোর’ কালের এক অত্যন্ত নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই সময়ে একজন কিশোর বা কিশোরীর মন ও শরীরে ঘটে যায় নানামুখী পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ধারায় যখন সবকিছু ওলটপালট মনে হয়, তখন জীবনে বন্ধুর আবির্ভাব ঘটে এক নতুন প্রভাবক হিসাবে। এসময় পিতা-মাতা এবং পরিবারের সদস্যদের চেয়েও বন্ধুদের কথাই যেন অধিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। বন্ধুত্বের প্রভাবের বলয় হয়ে ওঠে অনেক বেশী শক্তিশালী।
বন্ধুত্বের এই মুদ্রার দু’টি পিঠ রয়েছে। একটি উজ্জ্বল, অন্যটি অন্ধকার। বন্ধুদের ইতিবাচক সংস্পর্শ যেমন জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিতে পারে, তেমনি নেতিবাচক প্রভাব জীবনকে ঠেলে দিতে পারে ঘোর অমানিশায়। এজন্যই বলা হয়, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। ইসলাম সুন্দর বন্ধুত্বের স্বীকৃতি দেয় এবং এর প্রতি উৎসাহিত করে। একজন ভাল বন্ধু কেবল মানসিক সমর্থনের উৎস নয়, সে সাহস ও অনুপ্রেরণার বাতিঘর, যে একাকিত্বের আঁধার দূর করে। এমন বন্ধুর হাত ধরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। বিপরীতে অসৎ সঙ্গ জীবনে বিভ্রান্তির ধোঁয়াশা তৈরি করে। খারাপ বন্ধুরা দুনিয়াতে মানুষকে বিপথগামী করে এবং পরকালে তাকে নিক্ষেপ করে অন্তহীন লজ্জা ও জাহান্নামের আগুনে। যে কঠিন দিবসে পথভ্রষ্ট মানুষটি অনুশোচনায় নিজের হাত কামড়ে ধরে আর্তনাদ করে বলবে, ‘হায়, আফসোস আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করতাম!’ (ফুরক্বান ২৫/২৮)। সুতরাং জীবনের এই সন্ধিক্ষণে বন্ধু নির্বাচনে বিচক্ষণ হওয়াই শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
বন্ধু-বান্ধবজনিত কিছু সমস্যা :
যদিও বন্ধুত্ব জীবনের অপরিহার্য অংশ, তবুও উঠতি বয়সে এর কারণে কিছু গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। নিমেণ সেগুলো উল্লেখ করা হ’ল-
১. অসৎ সঙ্গ : উঠতি বয়সে সবচেয়ে বড় সমস্যা হ’ল অসৎ সঙ্গ বা বন্ধু নির্বাচনে ভুল করা। অসৎ বন্ধুর অন্যায় আচার- আচরণ, বিশ^াস, মিথ্যাচারিতা, নীতিহীনতা, মাদক-ধূমপান, বড়দের সম্মান না করা ইত্যাদি খারাপ গুণগুলো এ বয়সে খুব সহজেই বন্ধু-বান্ধবের উপর প্রভাব ফেলে। কারণ মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন, الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়। অতএব তোমাদের প্রত্যেককে লক্ষ্য করা উচিত যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করেছে’।[1] মূলত মানুষ বিপথগামী হয় এ পর্যায় থেকেই। এজন্য বন্ধু নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা যরূরী।
২. অতি বন্ধুত্ব : অতিরিক্ত কোন কিছুই ভাল নয়। যেকোন বিষয় নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রাখা উচিত। বন্ধুত্বকেও একটি স্বাভাবিক ও নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে রাখা প্রয়োজন। এজন্য নবী করীম (ছাঃ) বলেন, ‘নিজের বন্ধুর সাথে ভালবাসার আধিক্য প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার শত্রু হয়ে যাবে। তোমার শত্রুর সাথেও শত্রুতার চরম সীমা প্রদর্শন করবে না। হয়ত সে একদিন তোমার বন্ধু হয়ে যাবে’।[2] এতে বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরো গাঢ় হয়। বর্তমান সময়ে কিছু ছেলে-মেয়েদের মধ্যে অতি বন্ধুত্ব দেখা যায়। এতে বন্ধুর উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তোলে এবং পরিবার, পড়াশোনা ও কাজের প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়। অহেতুক খোশগল্প, আড্ডা ও ঘুরাঘুরি ইত্যাদি কাজে বেশী সময় নষ্ট হয়। এতে তাদের লেখাপড়ার মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় অতি বন্ধুত্ব সমকামিতার মত জঘন্য পাপের দুয়ারও খুলে দেয়।
৩. জীবনের লক্ষ্য হারানো : এই বয়সের প্রধান কাজ হ’ল পড়ালেখা করা। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা অসৎ বা লক্ষ্যহীন বন্ধুর সঙ্গে মিশে একসময় নিজের জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। জীবনকে শুধুমাত্র বিনোদন ও ভোগবিলাসের বস্ত্ত মনে করে সময় কাটানোর ফলে ছাত্রদের মধ্যে আত্মপ্রেরণা বা সাফল্যের আগ্রহ নষ্ট হয়। এতে সে নিজের লক্ষ্য বা স্বপ্ন থেকে সে সরে যায়। কিছু বন্ধু অন্যের সাফল্য দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে ভুল পরামর্শ দেয়। এতে অনেকের আত্মবিশ^াস কমে যায় এবং নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।
৪. কিশোর গ্যাং : কিশোর গ্যাং বর্তমান সময়ে এক ভয়ংকর আতঙ্কের নাম। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের সংখ্যা অতীতের তুলনায় এখন অনেক বেশী। রাষ্ট্রের সচেতন মহল কিশোর গ্যাং নিয়ে খুবই চিন্তিত। ২০২৪ সালে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী শুধুমাত্র ঢাকায় ১২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের মধ্যেও প্রায়ই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
বরগুনা শহরে আলোচিত রিফাত হত্যাকান্ডে জড়িয়ে ২০১৯ সালে আলোচনায় আসে ইংরেজী ‘০০৭’ নামের গ্যাংটি। এর আগে ঢাকার উত্তরায় খেলার মাঠে একজন কিশোরকে নির্মমভাবে হত্যা করে আলোচনায় আসে ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার গ্রুপ’ নামের দু’টি কিশোর গ্যাং। এরকম অসংখ্য ঘটনা দেশে নিয়মিত ঘটছে। এসমস্ত কিশোর গ্যাং সদস্যদের মাধ্যমে শহরাঞ্চলে চুরি, ছিনতাই, রাহাযানি, পকেটমারা, ইভটিজিং, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি অন্যায় অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে। এর সদস্যরা মূলত তাদের সঙ্গী-সাথীদের মাধ্যমেই এই অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে।
৫. হিরোইজম : ইংরেজী ‘Hiroism’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ বীরত্ব। যা সাধারণত ইতিবাচক হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ইদানীং এই শব্দটি আর ইতিবাচক অর্থে যায় না বরং নেতিবাচক অর্থ প্রকাশ করে। উঠতি বয়সের ছেলেদের মধ্যে এই মনোভাব বেশী তৈরী হয়। এগুলো বিভিন্নভাবে তাদের থেকে প্রকাশ পায়। যেমন কিছু ছেলে হাই স্পিডে রোডে বাইক চালিয়ে নিজের বীরত্ব প্রদর্শন করে। দ্রুত গতি, ওভারটেকিং, রাস্তায় এঁকেবেঁকে চলার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আবার ছোট ছোট ছাত্ররা তাদের পিতৃতুল্য শিক্ষককে অসম্মান-অপদস্থ করে। এসব কাজের মাধ্যমে কিশোর বয়সের ছাত্ররা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন ও হিরো সাজাতে চায়। নিজেকে সবার থেকে আলাদা, উন্নত ও শক্তিশালী প্রমাণ করতে তারা হিরোইজমের চর্চা করে। বন্ধু-বান্ধবের প্ররোচনায় প্রেমিকার সামনে নিজেকে হিরো সাজাতেও এই কাজগুলো তারা করে থাকে। ফলে র্যাগিং, মারামারি ও খুনোখুনি পর্যন্ত হয়। পরবর্তীতে যখন সে কর্মজগতে প্রবেশ করে দেখে এই হিরোইজমের কোন মূল্য বাস্তব জগতে নেই; ঠিক তখন এর চূড়ান্ত অবসান ঘটে। তবে তার আগে যে ক্ষতি হয়ে যায় সে ক্ষতি অপূরণীয়।
৬. পরিবারের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি : উঠতি বয়সের কিশোররা নতুন পরিবেশে নতুন বন্ধু তালাশ করে। অধিক বন্ধু-বান্ধব বা অতি বন্ধুত্বের কারণে অনেক সময় পরিবারের সাথে সন্তানের দূরত্ব তৈরী হয়। কিছু বন্ধু পরিবারের নিয়ম-নীতি, পরামর্শকে তুচ্ছ মনে করতে শেখায়। অনেকে পরিবারের চেয়ে বন্ধুদের কাছে বেশী খোলামেলা হয় এবং বন্ধুর মতামতকে অধিক প্রাধান্য দেয়। এতে পরিবারের সাথে যোগাযোগ কমে যায়। এ বিষয়ে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করছি। আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের একটি ছেলে দীর্ঘদিন ঢাকায় কোন এক মাদ্রাসায় লেখাপড়া করত। পরিবারের সাথে তার বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগ কম হ’ত। ঈদের ছুটিতে সে বাড়ীতে আসলেও সে পাশের গ্রামের এক বন্ধুর বাড়ীতে গিয়ে সময় কাটাত। হঠাৎ একদিন ছেলেটি হতাশাজনিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করে। এই হতাশা মূলত তৈরী হয়েছিল পরিবারের সাথে দূরত্বের কারণে। বর্তমানে এরকম সমস্যা প্রায়ই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও পরিবারের মধ্যে সমতা বজায় রাখা যরূরী।
৭. মাদকাশক্তি : কিশোরদের মাদক সেবনের শুরুটা হয় মূলত বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে। বন্ধুদের জোরাজুরিতে বা তাদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অথবা কৌতুহলবশত নেশা করা শুরু করে। অতঃপর নেশার অন্ধকার গলিতে হাবুডুবু খেয়ে সে তার জীবন ধ্বংস করে। কিছু বন্ধু মাদককে মজা বা আধুনিকতা হিসাবে উপস্থাপন করে। একবার খেলে কিছু হয় না, এটা সবাই খায়, তুমি কেন খাবে না? এমন কথা বলে ভুলাতে থাকে। বন্ধু-বান্ধবের উৎসাহে বা চাপে পড়ে অনেকেই প্রথমবার মাদক সেবন করে। আবার বন্ধুদের সামনে নিজেকে সাহসী বা স্টাইলিশ প্রমাণ করতেও কেউ কেউ মাদক সেবন করে। উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে মাদক সেবনের মাত্রা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দৈনিক কালের কন্ঠের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে দেড়কোটি মাদকাসক্তের মধ্যে ৮০ শতাংশই কিশোর। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত।[3]
৮. অন্যান্য সমস্যাসমূহ : উপরোক্ত সমস্যাগুলো ছাড়াও অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, পর্ণগ্রাফী আসক্তি, সমকামীতার মত অন্যায় কাজের শুরুটা হয় খারাপ বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমেই। তাদের মধ্যে অনেকেই মজার ছলে বা ইচ্ছে করেই অশ্লীল ভিডিও, ছবি ও গল্প শেয়ার করে বলে, ‘এটা তুমি এখনও দেখোনি’? অনেক বন্ধু ‘আধুনিকতা’ বা ‘ফ্রি লাইফ’-এর নামে অবৈধ সম্পর্ককে উৎসাহ দেয়।
যে সমস্ত ছেলে অথবা মেয়েদের মধ্যে গলায় গলায় ভাব, রাস্তাঘাটে চলার সময় হাত ধরে চলে, একই বিছানায় ঘুমায় তাদের সমকামীতায় জড়ানোয় সম্ভাবনা অত্যধিক। এরাই একসময় ভিন্নরুচির সম্পর্ক বা সমকামিতাকে স্বাভাবিক বলে প্রচার করে। এসমস্ত কাজে একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তা থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে যায়। এর ফলাফলে চরিত্র নষ্ট, আত্মসম্মানহানি, পরিবারে ভাঙ্গন, মানসিক অবসাদ, অপরাধ প্রবণতা অধিক হারে বেড়ে যায়।
পরিত্রাণের উপায় :
১. পরিবারের ভূমিকা : পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম ও শক্তিশালী সংগঠন হ’ল পরিবার। পরিবার হ’ল শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষালয়। বর্তমান আধুনিক বিশে^ পরিবার ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ইসলামে পরিবারের বিরাট ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং পিতা তার সন্তানদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।[4] সন্তানকে বন্ধু-বান্ধবজনিত সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে পরিবারের দায়িত্বশীলরা নিমেণাক্ত ভূমিকা নিতে পারেন-
(ক) সন্তানকে যথাযথ ভালোবাসা ও যত্ন নেওয়া : পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হ’ল সন্তানকে বেশী বেশী ভালোবাসা ও তাদের সময় দেওয়া। যখন সন্তান ঘরে ভালোবাসা ও মমতা পায় তখন সে বাইরে খারাপ বন্ধুত্বে মানসিক প্রশান্তি খুঁজে বেড়ায় না। ঘরে আদর-যত্ন পেলে অসৎ বন্ধুর প্রভাব কমে যায়। নবী করীম (ছাঃ) শিশুদের খুব বেশী ভালবাসতেন। ছোটদের চুমু খাওয়ার নির্দেশ দিতেন।
(খ) খোলামেলা যোগাযোগ : পিতামাতা যদি সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে তাহ’লে সন্তান তার সমস্যাগুলো সহজেই শেয়ার করে। এভাবে পরিবার সহজেই বুঝতে পারে, সে কোন বন্ধুর প্রভাবে বা অন্য কোন কারণে ভুল পথে যাচ্ছে কি-না। নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে তার পরিবারের সদস্যরা এমনকি অন্যান্য ছাহাবীরাও তাদের মনের কথা খুলে বলতেন। একদিন ফাতেমা (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে নিজের কাজের সুবিধার্থে একটি দাসী চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) তাকে ঘুমানোর পূর্বে একটি আমল শিখিয়ে দেন এবং বলেন এটা একটি দাসীর চেয়েও উত্তম হবে।[5] এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় পরিবারের সদস্যদের মাঝে এমন সম্পর্ক থাকা উচিত যাতে সন্তান পিতা-মাতার কাছে তার মনের কথা খুলে বলতে পারে।
(গ) বন্ধু নির্বাচনে দিকনির্দেশনা প্রদান : অভিভাবকদের উচিৎ সন্তানের বন্ধু নির্বাচনে তাকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। তাদের বুঝাতে হবে, মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে গড়ে উঠে। ভাল বন্ধু ও খারাপ বন্ধুর উদাহরণ দিতে হবে। বন্ধু মানুষের জান্নাত অথবা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে, অসৎ সঙ্গীর দুনিয়াবী কুফল ইত্যাদি বিষয়ে কুরআন-হাদীছ ও বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে হবে। সন্তানকে শেখাতে হবে, কোন বন্ধু তাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে আর কোন বন্ধু তাকে বিপথে নিয়ে যাবে। সর্বোপরি সন্তানকে ভাল বন্ধু খুঁজে দিতে সাহায্য করতে হবে। নবী করীম (ছাঃ) মদীনায় হিজরতের ১ম বছরে আনছার ও মুহাজির ছাহাবীদের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে দিয়েছিলেন (সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ২৬৬ পৃ.)।
(ঘ) সময় নিয়ন্ত্রণ ও নযরদারী : পিতা-মাতার উচিৎ নিজেদের সময় হিসাব করে চলা। পাশাপাশি সন্তানদেরও রুটিন অনুযায়ী চলতে সহযোগিতা করা। তাহ’লে তারা অসৎ সঙ্গ থেকে দূরে থাকার সাথে সাথে অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে রক্ষা পাবে। এছাড়া সন্তানরা কোথায় যায়, কোন বন্ধুদের সাথে মেশে, মোবাইল ফোনে কী করে, কোন ওয়েবসাইট ভিজিট করে সেদিকে সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। মোবাইলে যাতে অশ্লীল কোন কিছু দেখতে না পারে এজন্য ‘কাহ্ফ গার্ড’-এর মত এ্যাপ ইনস্টল করতে পারেন। অন্যদিকে এই তদারকি বা খবরদারী যেন গোয়েন্দাগিরীর মত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ গোয়েন্দার মত আচরণ করলে সন্তানরা বিরক্ত হয়। এর ফলাফল হিতে বিপরীতও হ’তে পারে। কারণ প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত কিছু বিষয় রয়েছে। সর্বোপরি তদারকি হবে দায়িত্বশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ।
(ঙ) প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান : প্রত্যেক আদম সন্তান ভুলকারী। আর তওবাকারীই সর্বোত্তম ভুলকারী।[6] সন্তান ভুল করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। যদি দেখা যায় সন্তান খারাপ বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়েছে, তাহ’লে উচিত হবে বকাঝকা না করে তাকে সুন্দরভাবে বুঝানো। প্রয়োজনে তার সাথে কাউন্সেলিং করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তুমি উপদেশ দিতে থাক, কারণ উপদেশ মুমিনের উপকারে আসবে’ (যারিয়াত ৫১/৫৫)। নবী করীম (ছাঃ) বলেন, দ্বীন হ’ল নছীহত।[7]
তবে শুধু সন্তানকে উপদেশ দিলেই হবে না। নিজেকেও সে অনুযায়ী আদর্শ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ মানুষের মধ্যে কথার চেয়ে কাজের প্রভাব বেশী পড়ে। এছাড়াও সন্তানকে নিয়ে মাঝে-মধ্যে কোন দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থান অথবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ঘুরতে যাওয়া প্রয়োজন। এতে শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি অর্জিত হয় এবং অসৎ বন্ধুর সাথে জড়ানোর সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
(চ) পারিবারিক অনুশাসন : এক সময় গ্রামে সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন খুব বেশী থাকলেও বর্তমানে তা নেই বললেই চলে। বন্ধু-বান্ধবের প্রভাবে যখন উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা হয় তখন পারিবারিক অনুশাসনই তাকে রক্ষা করার শক্তিশালী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। ঠিকমত ছালাত আদায় করা, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায় কাজে নিষেধ করা, ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, দায়িত্বশীলতা শৃঙ্খলা ইত্যাদির বিষয়ে পারিবারিক অনুশাসন সন্তানকে বন্ধু-বান্ধবজনিত সমস্যা থেকে দূরে রাখে এবং তাকে দায়িত্বশীল ও আত্মনিয়ন্ত্রিত করে ভবিষ্যতে আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। এজন্যই নবী করীম (ছাঃ) পরিবারের উপর থেকে শিষ্টাচারের লাঠি উঠিয়ে নিতে নিষেধ করেছেন।[8]
২. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের ভূমিকা : শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবারের পর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হ’ল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বর্তমান সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সামজিক বিকাশ ঘটানোও অন্যতম দায়িত্ব। অধ্বঃপতনের এই যুগে ক্লাসে নিয়মিত ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, অনুশাসন ও মূল্যবোধের পাঠ থাকা উচিত। ইদানীং ইসলামের অপব্যাখ্যা করে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী অনেক তরুণকে লেখাপড়া ছেড়ে চরমপন্থা ও জঙ্গীবাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আত্মঘাতি হামলাও করছে। অথচ এগুলোতে ইসলামের সামান্যতম নির্দেশনা নেই। ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এজন্য প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও শিক্ষককে নযর রাখতে হবে, কোন শিক্ষার্থী কার সাথে মিশছে, তার আচরণে হঠাৎ কোন পরিবর্তন আসছে কি-না? এজন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিস-এর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। যেমন ‘ল্যাংগুয়েজ ক্লাব’ গঠন করা। যেখানে শিক্ষার্থীরা বিদেশী ভাষা শিখবে। এ কাজের মাধ্যমে ইতিবাচক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এছাড়াও সুস্থ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বৃক্ষরোপণ, বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম প্রভৃতি সৃজনশীল কাজে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত রাখলে খারাপ বন্ধুদের সাথে মেশার সুযোগ কম পাবে। শিক্ষকের কথা ও আচরণ শিক্ষার্থীদের উপর দারুন প্রভাব ফেলে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পিতামাতার চেয়ে শিক্ষককে অধিক মূল্যায়ন করে। এজন্য যেসকল শিক্ষার্থীর উপর বন্ধু-বান্ধবের খারাব প্রভাব আছে তাদেরকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও ভালবাসা দিয়ে বোঝানো উচিত। সম্ভব হ’লে অভিভাবকের সাথে কথা বলে পরামর্শ দিতে হবে। দরদপূর্ণ ভালবাসা শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে ফিরে আসতে ও তার মানসিক বিকাশে খুব ভাল কাজ করে। এজন্যই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছোট্ট ছাহাবী মু‘আয (রাঃ)-কে একটি দো‘আ শিক্ষা দেয়ার পূর্বে তাকে বলেছিলেন, يَا مُعَاذُ، وَاللهِ إِنِّي لَأُحِبُّكَ ‘হে মু‘আয! আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে ভালোবাসি’।[9] উক্ত হাদীছ থেকে শিক্ষণীয় হ’ল ছোটদের কোন উপদেশ দেওয়ার আগে তাদের ভালবাসতে হবে। এবিষয়ে একটি প্রবাদ প্রণিধানযোগ্য- ‘শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে’।
৩. সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয় : মানুষ সামাজিক জীব। একজন মানবশিশু সামাজিকীকরণের মাধ্যমে ক্রমশ সামাজিক মানুষে পরিণত হয়। এজন্য ব্যক্তির প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। রাষ্ট্রনেতাদের উচিত কিশোর ও তরুণদের সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ করা এবং এসব সমস্যায় যেন তারা জড়ানোর সুযোগ না পায় সে ব্যবস্থা করা। এজন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন, সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা এবং যেসকল সংগঠন মানুষকে ন্যায়ের পথে ডাকে ও অন্যায় থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা করা। এছাড়াও গণমাধ্যম গুলোতে অশালীনতার পরিবর্তে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বদা এই হাদীছটি মনে রাখতে হবে ‘তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই স্ব স্ব দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।[10]
সুতরাং যে যত বড় নেতা বা দায়িত্বশীল তার জবাবদিহিতা ততোধিক।
৪. ব্যস্ত বা চাকুরিজীবী অভিভাবকদের করণীয় : আধুনিক বস্ত্তবাদী দুনিয়ায় সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। পরিবারকে যথেষ্ট সময় দেওয়ার সুযোগ অনেক অভিভাবকেরই হয়ে ওঠে না। ফলে সন্তান সময় কাটানো ও মানসিক শূন্যতা ঘুঁচানোর জন্য বন্ধু-বান্ধবকেই বেছে নেয়। এক্ষেত্রে উঠতি তরুণ ও যুবকরা অসৎ সঙ্গীর ফাঁদে পড়ে যায়। এ সমস্যা থেকে বাঁচতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমতঃ মায়েদের যথাসম্ভব চাকরী না করে সংসার ও সন্তান প্রতিপালনে মনোনিবেশ করা উচিত। কারণ তাদের প্রধান কাজই এটি। মায়ের অভাব অন্য কোন কিছু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়তঃ নিকট আত্মীয় যেমন- দাদা-দাদী, নানা-নানী, খালা, ফুফুর তত্ত্বাবধানে সন্তান প্রতিপালন বা দেখাশুনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কাজের মেয়ে বা বুয়া দ্বারা সন্তান প্রতিপালন করলে তাতে সন্তানের সঠিক পরিচর্যা ও মেধার বিকাশ হয় না। তৃতীয়তঃ সন্তানকে মানসম্মত ও বিশ^স্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার বা আবাসিক রাখা যেতে পারে। যেখানে শিশুবান্ধব পরিবেশ ও শিক্ষক রয়েছে এবং মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি ছাত্রদের অন্যান্য মানবিক গুণাবলী বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয় সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সন্তানের জন্য বেছে নিতে হবে।
উপসংহার : বন্ধু-বান্ধবজনিত সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হ’লে পবিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে একসাথে ভূমিকা রাখতে হবে। যখন উঠতি বয়সের তরুণ ও যুবকরা সৎ বন্ধুত্বের পরিবেশ পাবে, তখন আগামীতে আমরা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে পারবো। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন -আমীন!
মুহাম্মাদ মীযানুর রহমান
* শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, দিনাজপুর সরকারী কলেজ।
[1]. তিরমিযী হা/২৩৭৮; মিশকাত হা/৫০১৯; ছহীহাহ হা/৯২৭।
[2]. তিরমিযী হা/১৯৯৭; ছহীহুল জামে‘ হা/১৭৮।
[3]. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২১শে মার্চ ২০২৫।
[4]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫।
[5]. বুখারী হা/৩১১৩।
[6]. ইবনু মাজাহ হা/৪২৫১; মিশকাত হা/২৩৪১
[7]. মুসলিম হা/৫৫; মিশকাত হা/৪৯৬৬।
[8]. আহমাদ, মিশকাত হা/৬১; ছহীহুত তারগীব হা/৫৭০; ইরওয়া হা/২০২৬, সনদ ছহীহ।
[9]. আবূদাউদ হা/১৫২২, মিশকাত হা/৯৪৯।
[10]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/৩৬৮৫।